স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অবদান

ফন্ট সাইজ:

আজাদীর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অবদান ছিল বর্ণনাতীত। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনা করে সৈয়দ আব্দুস শাকের, মোস্তফা আনোয়ার, রেজাউল করিম চৌধুরী, রাশেদুল হাসান, আবুল কাসেম (সন্দ্বীপ, আমিনুর রহমান, বেলাল আহমদ, সরফুজ্জামান, আব্দুল্লাহ আল ফারুক ও কাজী হাবিবুদ্দিন বাংলা মায়ের এই দশজন দামাল ছেলেই ২৬শে মার্চ কালুরঘাট ট্রান্সমিশন ও রিসেপশন কেন্দ্র এবং আগ্রাবাদ ব্রপ বাষ্টিং ষ্টেশন দখল করেন। ৩০শে মার্চ কালুরঘাট বেতার ভবনে পাক বাহিনী বোমা বর্ষণ করিলে তাহারা ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারসহ গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেন। ৩রা এপ্রিল হইতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পূর্ণোদ্যমে চালু হয়।
    ২৯শে মার্চ উক্ত বেতার কেন্দ্র হইতে ঘোষণা করা হয় যে, শেখ মুজিব মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেই আছেন, নেতৃত্ব দিতেছেন এবং সংঘর্ষে জেনারেল টিক্কা খান নিহত হইয়াছেন। উক্ত ঘোষণা দেশবাসীর মনে বর্ণনাতীত সাহস সঞ্চার করে। ভারত গমনকালে হাটে-মাঠে, ঘাটে সংবাদটি প্রত্যেকের মুখে মুখে আমি স্বকর্ণে শুনিয়াছি এবং পাক বেতার কেন্দ্রের বিপরীত সত্য ঘোষণা কেহ সেই দিন বিশ্বাস করে নাই। স্বজাতি বেতার কেন্দ্রের ঘোষণার প্রতি যে কি অবিচল আস্থা স্বীয় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ব্যতীত উহা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। বাংগালী জাতির বদ্ধমূল ধারণাকে বিনষ্ট করিবার প্রয়াসেই পাকিস্তান সরকার করাচী বিমান বন্দরে বসা অবস্থায় বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসহ গ্রেফতারের খবর ২রা এপ্রিল পাকিস্তান অবজারবার পত্রিকায় প্রকাশ করে। ইহাই পরে ১৫ই এপ্রিল দৈনিক পূর্বদেশে ছাপা হয়।

    আগরতলা পুলিশী হয়রানি
    আগরতলা হইতে রওয়ানা হইয়অ সোনামোড়া শহরে টেকী হইতে অবতরণ করিলে আমাকে থানায় যাইতে অনুরোধ জানানো হয়। থানায় জিজ্ঞাসাবাদের পর থানার অফিসার-ইন-চার্জের বাসভবনে আমার রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা হয় অর্থাৎ ভদ্রভাবে পরোক্ষ ক্রিয়ায় আমাকে পুলিশী হেফাজতে আটক রাখা হয়। পরদিন ভোর ৮ ঘটিকায় ভারতীয় দেশরক্ষা বিভাগীয় সিকিউরিটি অফিসার ক্যাপ্টেন ঘোষ প্রায় দুই ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর আমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করেন। মনে হইল, তাহাদের মনের রোগ কিছুটা প্রশমিত হইয়াছে। তবে, আমার দৃঢ় ধারণা জন্মিল যে, আমার মতো স্পষ্টভাষী স্বাধীনচেতা জাতীয়তাবাদীদের জন্য ভারত ভূমিতে কোন আশ্রয় নাই; আশ্রয় রহিয়াছে তাহাদের পোষা মেরুদন্ডহীন আওয়ামী লীগ মার্কা জাতীয়তাবাদীদের তাহাদের জন্যই সর্বত্র অবারিত দ্বার।
    আগরতলা বাংগালী হিন্দুদিগকে পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংগালীর মরণপণ সংগ্রামে উৎফুল্ল মনে হইয়াছে। ইহা সর্ববাদী সত্য যে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে সীমান্তের ওপারের বংগভাষাভাষী হিন্দুদের নৈতিক, আর্থিক ও বাস্তব সমর্থন অর্থাৎ সর্বাত্মক সহায়তা ছিল অতুলনীয়। কিন্তু যখনই আমরা বাংলা ভাষাভাষী সকলে ঐক্যবদ্ধ হইয়অ বৃহত্তর বাংগালী জাতির জন্য বৃহত্তর স্বাধীন সার্বভৌম বঙ্গদেশ রাষ্ট্র গঠন মর্মে প্রস্তাবের অবতারণা করিয়াছি, তখন কেহ কেহ সরাসরি প্রস্তাবটি প্রত্যাখান করিয়াছেন, কেহ অন্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়া মূল আলোচনার মোড় ঘুরাইয়া দিয়াছেন। ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, ভাবের গভীর আদান-প্রদান এবং সর্বোপরি বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণের ফলে নিঃসন্দেহে এবং স্থির নিশ্চিত হইলাম যে, সীমান্ত পরপারের বঙ্গ ভাষাভাষী হিন্দুদের নিকট বৃহৎ ভারতীয় রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রকৃতই গর্বের বস্তু।
    তাহারা যতটাবা বাংগালী তাহার চাইতে অধিক ভারতীয়। ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণেই বোধহয় বঙ্গ ভাষাভাষী হিন্দুদের চিন্তা ভিন্নরূপ। অবাংগালীর শোষণ তাহারা স্বীকার করেন; কিন্তু বাংগালীর সত্ত্বা বিকাশের সংগ্রামে তাহারা আগ্রহী নহেন। পূর্ববংগ, পশ্চিমবংগ, আসাম, মেঘালয় ও পার্বত্য ত্রিপুরা এক সমৃদ্ধশালী বৃহত্তর এলাকা এবং উক্ত গোটা এলাকাই বংগ ভাষাভাষী অধ্যুষিত। ভাষা, সংস্কৃতি, রক্ত ও ভৌগোলিক অবস্থান যদি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি হয়, তাহা হইলে স্বাধীন ও সার্বভৌম বৃহত্তর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দাবী একান্ত স্বাভাবিক। সুতরাং কালের যাত্রায় এই দাবী উত্থিত হইবার বিরুদ্ধে সীমান্ত পারের বাঙ্গালীদের বাস্তব ও মনস্তাত্বিক বাধা কোথায়?
    স্মর্তব্য, বাংগালী হিন্দু জনতাই সাম্প্রদায়িকতার মন্ত্রে উদ্ধুদ্ধ হইয়অ ১৯৪৭ সালে বোস-সোহরাওয়ার্দী’র উত্থাপিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পরিকল্পনাকে আঁতুরড় ঘরেই হত্যা করে। যে মজ্জাগত ধ্যান-ধানণায় তাহারা সেইদিন আত্মবলির রাজপথ অবলম্বন করিয়াছিল, একদিন না একদিন ভারতে অবস্থানরত বংগ ভাষাভাষী হিন্দু জনতা নিজেদের সেই ভুল উপলব্ধি করিবে এবং বৃহত্তর স্বাধীন বংগদেশ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হইবে, এই বিশ্বাস ও প্রীতি লইয়া সেইদিনের অপেক্ষায় রহিলাম।

    ঢাকা প্রত্যাবর্তন
    ভারত ভূমিতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের দৌরাত্ম্যে মনে হইত যে, আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নাই। আমরা সংগ্রামরে প্রেরণায় ভারত ভূমিতে গিয়াছিলাম, প্রাণ বাঁচাইতে যাই নাই, ব্যবসা করিতে যাই নাই, ব্যাংক লুটের টাকা সামলাইতে যাই নাই, অসৎ কর্মে লিপ্ত হইতে যাই নাই। লুটের ঠাকাং জীবনভোগ করিতে যাই নাই, হোটেল রোস্তোরাঁয় বিলাস জীবন-যাপন করিতে যাই নাই, দয়ার ভিক্ষা চাহিতে যাই নাই, সর্বোপরি কাহারো সহিত ঝগড়া করিতেও যাই নাই। আমাদের ঝগড়া-বিবাদ জালেম জেনারেল ইয়াহিয়া সরকারের বিরুদ্ধে, অত্যাচারী পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে। তাই পাক-বাহিনী কবলিত কোটি কোটি বাংগালীদের সহিত সমভাবে মানসিক ও প্রয়োজনবোধে দৈহিক নির্যাতন সহ্য করিবার দৃঢ় সংকল্প লইয়া আমি, সহকর্মী এহসানুল হক সেলিম ও কবিরসহ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনকালে ইলিয়টগঞ্জ ব্রিজের সন্নিকটে আসিয়া দেখি যে, ব্রিজটি ভাংগা। কবিরই কিছুদিন পূর্বে ভারতীয় সৈন্য বাহিনীর এক ক্যাপ্টেন ও অন্যান্যের সহায়তায় ব্রিজটি বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে উড়াইয়া দিয়াছিল। উল্লেখ্য যে, পরবর্তীকালে ঢাকার মালিবাগের মোড়ে সশস্ত্র মোকাবেলায় পাক-বাহিনীর গুলিতে কবির শাহাদাৎবরণ করে। বলিতে ভুলিয়াছি যে, ভারতে অবস্থানরত আশ্রয় গ্রহণকারী বাংলা জাতীয় লীগ নেতৃবৃন্দ সর্বজনাব দেওয়ান সিরাজুল হক, আশরাফ হোসেন, এম.এম. আনোয়ার ও পরিমল সাহা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন এবং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম-সূচী গ্রহণের অনুরোধ জানাইয়াছিলেন, অবশ্য ফল বিশেষ কিছু হয় নাই।

    দেশে অবস্থানকারী বাংগালীদের অবদান
    ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ হইতে ১৫ই ডিসেম্বর এই সময়টা ছিল পূর্ব পাকিস্তানবাসী বাংগালীদের জন্য সহাসংকটকাল, মহাদুর্ভোগকাল ও মহাত্যাগের কাল। এই সময়ে আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের বাড়ীঘর কোন কোন ক্ষেত্রে ভষ্মীভূত হইয়াছে, কোন কোন ক্ষেত্রে বাজেয়াপ্ত হইয়াছে। ২৬শে মার্চ সন্ধ্যা ৭ টায় বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দেশে রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। দেশবাসীর জন-মাল ইজ্জতের কোন প্রকার নিরাপত্তা ছিল না। যখন তখন গ্রেফতার, পাশবিক ও দৈহিক অত্যাচার ও নির্যাতন ভোগ ছিল ভাগ্যলিপি। সীমান্ত পারে ভারত ভূখন্ডে আশ্রয়প্রার্থী কয়েক লক্ষ শরনার্থী ব্যতীত বাকী সাত কোটি নিরস্ত্র বাংগালী ছিল কার্যতঃ সশস্ত্র হিংস্র পাক বাহিনীর হাতে বন্দী। তাহারাই পাক বাহিনীর জুলুম সহ্য করিয়াছে; তাহারাই মুক্তিযোদ্ধাকে আহার, আশ্রয় ও ন্যান্য সাহায্য দিয়াছে। তাহারা আত্মবিসর্জন দিয়াছে; কিন্তু শত্র“ সেনার নিকট আত্মসমর্পণ করে নাই। ভাগ্যের কি পরিহাস, ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর মৃত্যুঞ্জয়ী এই জনতাই মুহূর্তের মধ্যে ভারতে আশ্রয়-প্রার্থী শরনার্থীদের দৃষ্টিতে পাক-বাহিনীর সহযোগীরূপে অভিযুক্ত হয় এবং এক পলকে পরিণত হয় এক অচ্ছুত শ্রেণীতে। আরো পরিতাপের বিষয়, ১৬ই ডিসেম্বরের পরে অনুষ্ঠিত অত্যাচার, অবিচার, লুটপাট, খুন, রাহাজানী ও মান-ইজ্জত এবং সতীত্ব হরণ ১৬ই ডিসেম্বরের আগেকার সময়ের মতই সমভাবে গ্রামজীবন ও বাংগালী জন-জীবনকে বিষাক্ত করিয়া তোলে। ভারত হইতে প্রত্যাগত মুষ্টিমেয় শরনার্থীই ছিল ইহার জন্য দায়ী। ইতিহাসের কি নির্মম শিক্ষা; ফরাসী বিপ্লবের কি মর্মন্তদ পুনরাবৃত্তি!
    আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া পাক-ভারত যুদ্ধ
    ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ নিরস্ত্র ভাষাভাষী পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর উর্দুভাষী পাক-বাহিনীর হামলা ও ডিসেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধ ছিল একাধারে পাকিস্তানী উর্দুভাষী কায়েমী স্বার্থ চক্র, ভারতীয় সম্পসারণবাদী কুচক্রী মহল এবং পাক-চীন ও পাক-সোভিয়েত বন্ধুত্বের ক্ষিপ্ত মার্কিন সম্রাজ্যবাদী মহলের বহুমুখী সাঁড়াশি অভিযানের সহিংস ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও প্রতিফল।
    জুলাই মাস হইতে জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উত্থান্ট সহানুভূতিশীল মনোভাবপ্রসূত যে সব প্রস্তাব দিয়া আসিতেছিলেন, ক’টবুদ্ধি ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধিতার ফলে সেইগুলি ব্যর্থ হয়। ফলে জাতিসংঘের ২৬তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের প্রস্তাবানুযায়ী অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পাক-ভারত সীমান্ত এলাকায় জাতিসংঘ প্রহরী নিয়োগের প্রচেষ্টা বানচাল হইয়া পড়ে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পরিকল্পনা মোতাবেক ২৬শে অক্টেবর (১৯৭১) যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও পশ্চিম জার্মানীর সমর্থন কুড়াইরার মানসে ভ্রমণ করেন ও রাষ্ট্রনায়কদের সহিত সাক্ষাৎ করেন। পূর্বাহ্নে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে যে কোন অবস্থা মোকাবেলার চিন্তায় সোভিয়েট রাশিয়ার সহিত ৯ই আগষ্ট (১৯৭১) শান্তি মৈত্রী ও সহযোগীতা চুক্তি  (TREATY OF PEACE, FRIENDSHIP & CO-OPERATION)  আজাদীর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অবদান ছিল বর্ণনাতীত। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনা করে সৈয়দ আব্দুস শাকের, মোস্তফা আনোয়ার, রেজাউল করিম চৌধুরী, রাশেদুল হাসান, আবুল কাসেম (সন্দ্বীপ, আমিনুর রহমান, বেলাল আহমদ, সরফুজ্জামান, আব্দুল্লাহ আল ফারুক ও কাজী হাবিবুদ্দিন বাংলা মায়ের এই দশজন দামাল ছেলেই ২৬শে মার্চ কালুরঘাট ট্রান্সমিশন ও রিসেপশন কেন্দ্র এবং আগ্রাবাদ ব্রপ বাষ্টিং ষ্টেশন দখল করেন। ৩০শে মার্চ কালুরঘাট বেতার ভবনে পাক বাহিনী বোমা বর্ষণ করিলে তাহারা ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারসহ গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেন। ৩রা এপ্রিল হইতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পূর্ণোদ্যমে চালু হয়।
    ২৯শে মার্চ উক্ত বেতার কেন্দ্র হইতে ঘোষণা করা হয় যে, শেখ মুজিব মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেই আছেন, নেতৃত্ব দিতেছেন এবং সংঘর্ষে জেনারেল টিক্কা খান নিহত হইয়াছেন। উক্ত ঘোষণা দেশবাসীর মনে বর্ণনাতীত সাহস সঞ্চার করে। ভারত গমনকালে হাটে-মাঠে, ঘাটে সংবাদটি প্রত্যেকের মুখে মুখে আমি স্বকর্ণে শুনিয়াছি এবং পাক বেতার কেন্দ্রের বিপরীত সত্য ঘোষণা কেহ সেই দিন বিশ্বাস করে নাই। স্বজাতি বেতার কেন্দ্রের ঘোষণার প্রতি যে কি অবিচল আস্থা স্বীয় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ব্যতীত উহা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। বাংগালী জাতির বদ্ধমূল ধারণাকে বিনষ্ট করিবার প্রয়াসেই পাকিস্তান সরকার করাচী বিমান বন্দরে বসা অবস্থায় বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসহ গ্রেফতারের খবর ২রা এপ্রিল পাকিস্তান অবজারবার পত্রিকায় প্রকাশ করে। ইহাই পরে ১৫ই এপ্রিল দৈনিক পূর্বদেশে ছাপা হয়।

    আগরতলা পুলিশী হয়রানি
    আগরতলা হইতে রওয়ানা হইয়অ সোনামোড়া শহরে টেকী হইতে অবতরণ করিলে আমাকে থানায় যাইতে অনুরোধ জানানো হয়। থানায় জিজ্ঞাসাবাদের পর থানার অফিসার-ইন-চার্জের বাসভবনে আমার রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা হয় অর্থাৎ ভদ্রভাবে পরোক্ষ ক্রিয়ায় আমাকে পুলিশী হেফাজতে আটক রাখা হয়। পরদিন ভোর ৮ ঘটিকায় ভারতীয় দেশরক্ষা বিভাগীয় সিকিউরিটি অফিসার ক্যাপ্টেন ঘোষ প্রায় দুই ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর আমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করেন। মনে হইল, তাহাদের মনের রোগ কিছুটা প্রশমিত হইয়াছে। তবে, আমার দৃঢ় ধারণা জন্মিল যে, আমার মতো স্পষ্টভাষী স্বাধীনচেতা জাতীয়তাবাদীদের জন্য ভারত ভূমিতে কোন আশ্রয় নাই; আশ্রয় রহিয়াছে তাহাদের পোষা মেরুদন্ডহীন আওয়ামী লীগ মার্কা জাতীয়তাবাদীদের তাহাদের জন্যই সর্বত্র অবারিত দ্বার।
    আগরতলা বাংগালী হিন্দুদিগকে পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংগালীর মরণপণ সংগ্রামে উৎফুল্ল মনে হইয়াছে। ইহা সর্ববাদী সত্য যে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে সীমান্তের ওপারের বংগভাষাভাষী হিন্দুদের নৈতিক, আর্থিক ও বাস্তব সমর্থন অর্থাৎ সর্বাত্মক সহায়তা ছিল অতুলনীয়। কিন্তু যখনই আমরা বাংলা ভাষাভাষী সকলে ঐক্যবদ্ধ হইয়অ বৃহত্তর বাংগালী জাতির জন্য বৃহত্তর স্বাধীন সার্বভৌম বঙ্গদেশ রাষ্ট্র গঠন মর্মে প্রস্তাবের অবতারণা করিয়াছি, তখন কেহ কেহ সরাসরি প্রস্তাবটি প্রত্যাখান করিয়াছেন, কেহ অন্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়া মূল আলোচনার মোড় ঘুরাইয়া দিয়াছেন। ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, ভাবের গভীর আদান-প্রদান এবং সর্বোপরি বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণের ফলে নিঃসন্দেহে এবং স্থির নিশ্চিত হইলাম যে, সীমান্ত পরপারের বঙ্গ ভাষাভাষী হিন্দুদের নিকট বৃহৎ ভারতীয় রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রকৃতই গর্বের বস্তু।
    তাহারা যতটাবা বাংগালী তাহার চাইতে অধিক ভারতীয়। ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণেই বোধহয় বঙ্গ ভাষাভাষী হিন্দুদের চিন্তা ভিন্নরূপ। অবাংগালীর শোষণ তাহারা স্বীকার করেন; কিন্তু বাংগালীর সত্ত্বা বিকাশের সংগ্রামে তাহারা আগ্রহী নহেন। পূর্ববংগ, পশ্চিমবংগ, আসাম, মেঘালয় ও পার্বত্য ত্রিপুরা এক সমৃদ্ধশালী বৃহত্তর এলাকা এবং উক্ত গোটা এলাকাই বংগ ভাষাভাষী অধ্যুষিত। ভাষা, সংস্কৃতি, রক্ত ও ভৌগোলিক অবস্থান যদি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি হয়, তাহা হইলে স্বাধীন ও সার্বভৌম বৃহত্তর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দাবী একান্ত স্বাভাবিক। সুতরাং কালের যাত্রায় এই দাবী উত্থিত হইবার বিরুদ্ধে সীমান্ত পারের বাঙ্গালীদের বাস্তব ও মনস্তাত্বিক বাধা কোথায়?
    স্মর্তব্য, বাংগালী হিন্দু জনতাই সাম্প্রদায়িকতার মন্ত্রে উদ্ধুদ্ধ হইয়অ ১৯৪৭ সালে বোস-সোহরাওয়ার্দী’র উত্থাপিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পরিকল্পনাকে আঁতুরড় ঘরেই হত্যা করে। যে মজ্জাগত ধ্যান-ধানণায় তাহারা সেইদিন আত্মবলির রাজপথ অবলম্বন করিয়াছিল, একদিন না একদিন ভারতে অবস্থানরত বংগ ভাষাভাষী হিন্দু জনতা নিজেদের সেই ভুল উপলব্ধি করিবে এবং বৃহত্তর স্বাধীন বংগদেশ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হইবে, এই বিশ্বাস ও প্রীতি লইয়া সেইদিনের অপেক্ষায় রহিলাম।

    ঢাকা প্রত্যাবর্তন
    ভারত ভূমিতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের দৌরাত্ম্যে মনে হইত যে, আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নাই। আমরা সংগ্রামরে প্রেরণায় ভারত ভূমিতে গিয়াছিলাম, প্রাণ বাঁচাইতে যাই নাই, ব্যবসা করিতে যাই নাই, ব্যাংক লুটের টাকা সামলাইতে যাই নাই, অসৎ কর্মে লিপ্ত হইতে যাই নাই। লুটের ঠাকাং জীবনভোগ করিতে যাই নাই, হোটেল রোস্তোরাঁয় বিলাস জীবন-যাপন করিতে যাই নাই, দয়ার ভিক্ষা চাহিতে যাই নাই, সর্বোপরি কাহারো সহিত ঝগড়া করিতেও যাই নাই। আমাদের ঝগড়া-বিবাদ জালেম জেনারেল ইয়াহিয়া সরকারের বিরুদ্ধে, অত্যাচারী পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে। তাই পাক-বাহিনী কবলিত কোটি কোটি বাংগালীদের সহিত সমভাবে মানসিক ও প্রয়োজনবোধে দৈহিক নির্যাতন সহ্য করিবার দৃঢ় সংকল্প লইয়া আমি, সহকর্মী এহসানুল হক সেলিম ও কবিরসহ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনকালে ইলিয়টগঞ্জ ব্রিজের সন্নিকটে আসিয়া দেখি যে, ব্রিজটি ভাংগা। কবিরই কিছুদিন পূর্বে ভারতীয় সৈন্য বাহিনীর এক ক্যাপ্টেন ও অন্যান্যের সহায়তায় ব্রিজটি বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে উড়াইয়া দিয়াছিল। উল্লেখ্য যে, পরবর্তীকালে ঢাকার মালিবাগের মোড়ে সশস্ত্র মোকাবেলায় পাক-বাহিনীর গুলিতে কবির শাহাদাৎবরণ করে। বলিতে ভুলিয়াছি যে, ভারতে অবস্থানরত আশ্রয় গ্রহণকারী বাংলা জাতীয় লীগ নেতৃবৃন্দ সর্বজনাব দেওয়ান সিরাজুল হক, আশরাফ হোসেন, এম.এম. আনোয়ার ও পরিমল সাহা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন এবং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম-সূচী গ্রহণের অনুরোধ জানাইয়াছিলেন, অবশ্য ফল বিশেষ কিছু হয় নাই।

    দেশে অবস্থানকারী বাংগালীদের অবদান
    ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ হইতে ১৫ই ডিসেম্বর এই সময়টা ছিল পূর্ব পাকিস্তানবাসী বাংগালীদের জন্য সহাসংকটকাল, মহাদুর্ভোগকাল ও মহাত্যাগের কাল। এই সময়ে আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের বাড়ীঘর কোন কোন ক্ষেত্রে ভষ্মীভূত হইয়াছে, কোন কোন ক্ষেত্রে বাজেয়াপ্ত হইয়াছে। ২৬শে মার্চ সন্ধ্যা ৭ টায় বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দেশে রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। দেশবাসীর জন-মাল ইজ্জতের কোন প্রকার নিরাপত্তা ছিল না। যখন তখন গ্রেফতার, পাশবিক ও দৈহিক অত্যাচার ও নির্যাতন ভোগ ছিল ভাগ্যলিপি। সীমান্ত পারে ভারত ভূখন্ডে আশ্রয়প্রার্থী কয়েক লক্ষ শরনার্থী ব্যতীত বাকী সাত কোটি নিরস্ত্র বাংগালী ছিল কার্যতঃ সশস্ত্র হিংস্র পাক বাহিনীর হাতে বন্দী। তাহারাই পাক বাহিনীর জুলুম সহ্য করিয়াছে; তাহারাই মুক্তিযোদ্ধাকে আহার, আশ্রয় ও ন্যান্য সাহায্য দিয়াছে। তাহারা আত্মবিসর্জন দিয়াছে; কিন্তু শত্র“ সেনার নিকট আত্মসমর্পণ করে নাই। ভাগ্যের কি পরিহাস, ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর মৃত্যুঞ্জয়ী এই জনতাই মুহূর্তের মধ্যে ভারতে আশ্রয়-প্রার্থী শরনার্থীদের দৃষ্টিতে পাক-বাহিনীর সহযোগীরূপে অভিযুক্ত হয় এবং এক পলকে পরিণত হয় এক অচ্ছুত শ্রেণীতে। আরো পরিতাপের বিষয়, ১৬ই ডিসেম্বরের পরে অনুষ্ঠিত অত্যাচার, অবিচার, লুটপাট, খুন, রাহাজানী ও মান-ইজ্জত এবং সতীত্ব হরণ ১৬ই ডিসেম্বরের আগেকার সময়ের মতই সমভাবে গ্রামজীবন ও বাংগালী জন-জীবনকে বিষাক্ত করিয়া তোলে। ভারত হইতে প্রত্যাগত মুষ্টিমেয় শরনার্থীই ছিল ইহার জন্য দায়ী। ইতিহাসের কি নির্মম শিক্ষা; ফরাসী বিপ্লবের কি মর্মন্তদ পুনরাবৃত্তি!
    আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া পাক-ভারত যুদ্ধ
    ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ নিরস্ত্র ভাষাভাষী পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর উর্দুভাষী পাক-বাহিনীর হামলা ও ডিসেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধ ছিল একাধারে পাকিস্তানী উর্দুভাষী কায়েমী স্বার্থ চক্র, ভারতীয় সম্পসারণবাদী কুচক্রী মহল এবং পাক-চীন ও পাক-সোভিয়েত বন্ধুত্বের ক্ষিপ্ত মার্কিন সম্রাজ্যবাদী মহলের বহুমুখী সাঁড়াশি অভিযানের সহিংস ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও প্রতিফল।
    জুলাই মাস হইতে জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উত্থান্ট সহানুভূতিশীল মনোভাবপ্রসূত যে সব প্রস্তাব দিয়া আসিতেছিলেন, ক’টবুদ্ধি ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধিতার ফলে সেইগুলি ব্যর্থ হয়। ফলে জাতিসংঘের ২৬তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের প্রস্তাবানুযায়ী অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পাক-ভারত সীমান্ত এলাকায় জাতিসংঘ প্রহরী নিয়োগের প্রচেষ্টা বানচাল হইয়া পড়ে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পরিকল্পনা মোতাবেক ২৬শে অক্টেবর (১৯৭১) যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও পশ্চিম জার্মানীর সমর্থন কুড়াইরার মানসে ভ্রমণ করেন ও রাষ্ট্রনায়কদের সহিত সাক্ষাৎ করেন। পূর্বাহ্নে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে যে কোন অবস্থা মোকাবেলার চিন্তায় সোভিয়েট রাশিয়ার সহিত ৯ই আগষ্ট (১৯৭১) শান্তি মৈত্রী ও সহযোগীতা চুক্তি Henry Broaudon of the Sunday Times Zvnvi “The Retrest of American Power” MÖ‡š’ wj‡L‡Qb-“The Indian Cabinet On April 28 (’71) had secretly decided to prepare for the possibility of war” বক্তব্যের অকাট্য প্রমাণিক সমর্থন পাওয়া যায় Mejor General Sukhwant Sing, ZrKvjxbDeputi Director, Military Operations at Army Heaf-Quarters কর্তৃক লিখিত ও ১৯৮০ সালে প্রকাশিত “The Liberation of Bangladesh” এর অংশ বিশেষে “The Army was asked to take over the guidance of all aspects of guerilla warfare on April 30, 1971.” ভারেতের পক্ষে যুদ্ধ পরিচালনার সর্বাধিনায়ক Field Marshal Sam Manekshaw বোম্বেতে এক জনসভায় ১৯৭৭ সালের ১৬ই নভেম্বর প্রকাশ করেন যে, ১৯৭১ সালে ডিসেম্বর ইন্দো-পাক যুদ্ধের ৯ মাস পূর্বে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী CABINET MEETING- এ উপস্থিত হইতে তলব করেন। ক্যাবিনেট সভায় তাহাকে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আঘাত হানার জন্য নির্দেশ দেন- কিন্তু Field Marshal আঘাত হানার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণে সময় প্রার্থনা করে।  International Commission of Jurists তদন্তের সিদ্ধান্ত যে, ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর ভারতীয় সাঁজোয়া বাহিনী পূর্ব পাকিস্তান ভূমিখন্ডে ঢুকিয়া পড়ে- সেইদিন হইতেই ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ আরম্ভ হয়- ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর নয়। তখনি পাকিস্তান অবস্থার বিপাকে মরিয়া হইয়া ভারতের উপর বিমান হামলা করিতে বাধ্য হয়।
    মাত্র কিছুদিনের মধ্যে অর্থাৎ ১৬ই ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানে পাক বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং ইহারই ফলে পূর্ব পাকিস্তান পাক বাহিনীর অত্যাচার হইতে মুক্ত হয়। বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যূদয় ঘটে বাংলাদেশের।
    ইতিপূর্বে ৬ই ডিসেম্বর ভারতীয় পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশনে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন। উল্লেখ্য যে, ১লা জুন মিঃ ফনীভূষণ মজুমদারের নেতৃত্বে মিসেস নূরজাহান মুর্শেদ ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন সমবায়ে গঠিত তিন সদস্যবিশিষ্ট পার্লামেন্টারী প্রতিনিধিদল ভারতীয় পার্লামেন্ট সেন্ট্রাল হলে অনুষ্ঠিত ভারতীয় পার্লামেন্টের উভয় পরিষদের যুক্ত অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দানের জন্য আকুল আবেদন জানাইয়াছিলেন। কিন্তু তখন ভারত সরকার অপেক্ষা করিবার নীতি গ্রহণ করিয়অ বিষয়টি এড়াইয়া গিয়াছিল। অবশ্য ইতিপূর্বে ৩১শে মার্চ ভারতীয় পার্লামেন্ট পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সহিত একাত্মতা ঘোষণা করিয়া সর্বপ্রকার সাহায্য দানের সংকল্প প্রকাশ করে এবং ১লা ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী পূর্ব পাকিস্তান হইতে পাক সৈন্য প্রত্যাহারের দাবী জানান। প্রকাশ, মুক্তির নয় মাস সংগ্রামে ১০৪৭ জন ভারতীয় সৈন্য প্রাণ হারায়, ৩ হাজার ৪৭ জন আহত হয় ও ৮৯ জন নিখোঁজ হয়।
    বলা আবশ্যক যে, ভারতীয় বাহিনীর এই ত্যাগ আমরা কৃতজ্ঞতার সহিত স্মরণ করি। এবং বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতীয় বাহিনী সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ না হইলে বাংলাদেশ অচিরেই ভিয়েতনামে পরিণত হইত আর মুক্তিবাহিনী কয়েক যুগ অবিরাম সংগ্রাম করিয়াও দেশকে পাক বাহিনী-মুক্ত করিতে পারিত কিনা সন্দেহ। সুতরাং ইহাও মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতে হইবে যে, ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল কালো দিনগুলিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতীয় জনগণ সম্ভাব্য ঝুঁকি সত্ত্বেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়অ বাংলাদেশেকে পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত করিবার চেষ্ট না করিলে অত্র এলাকার বংগভাষী মাত্রই হয়তো নগণ্য সংখ্যক উর্দু ভাষাভাষী ও তাহাদের নগণ্য সংখ্যাক স্থানীয় সমর্থকদের সেবাদাসে পরিণত হইত। সুতরাং কৃতজ্ঞ বংগ ভাষাভাষী আপামর জনগণ গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে রাজধানীর রাজপথে ১৬ই ডিসেম্বর ও ইহার পরবর্তী কয়েকদিন ভারতীয় নাগরিক ও ভারতীয় সেনাবাহিনীকে যে যততত্র স্বতঃস্ফূর্ত আস্তরিক ও প্রাণঢালা সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করিয়াছে তাহা বিস্ময়কর কিছু ছিল না। বাংগালী মজলুম জনগণ ১৯৭১-এর মার্চ হইতে ডিসেম্বর নয় মাসে যখন প্রায় ন্যূব্জদেহ, কুব্জপৃষ্ঠ, অতিমাত্রায় শ্রান্ত-ক্লান্ত ও অসহায়, বাংগালীর ফরিয়অদে যখন সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার আরশ পর্যন্ত কাঁপিতেছিল, তখনই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাংগালী জাতির মুক্তিদাতার ভূমিকাই গ্রহণ করেন।
    অবশ্য ইহা বলাও সত্যের অপলাপ হইবে যে, একমত্র মহান পরার্থপরতা বা মানবাধিকার নীতিতে উদ্বুদ্ধ হইয়াই ভারত পাক হানাদার বাহিনী বিতাড়নে সর্বশক্তি নিয়োগ করিয়াছিল। বরং আন্তর্জাতিক শক্তিতে পরিণত হইবার প্রবল আকাংখা এবং জাতীয় স্বার্থ চরিতার্থ করিবার মানসেই ভারত সেইদিন অস্ত্র ধরিয়অছিল। সুতরাং ইহার পরিণতি কি দাঁড়াইতে পারে, সেই চিন্তাও সেইদিন অনেকের মাথায় ছিল। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বাংলাদেশ সরকারের মেরুদন্ড, শক্তি, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের গভীরতার উপরই নির্ভর করিবে যে, ভারতীয় বিভন্ন স্বার্থান্বেষী শ্রেণী এই দেশকে একচেটিয়া লুট-পাট ও শোষণের যাঁতাকলে পরিণত করিতে সক্ষম হইবে কি হইবে না।
    ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাক বাহিনীর অধিনায়ক লেঃ জেঃ নিয়াজী ঢাকার রেসকোর্স দেশরক্ষা বাহিনীর যৌথ কম্যান্ড প্রতিনিধিদ্বয় ভারতীয় সেনা বিভাগের লেঃ জেঃ জগজিৎ সিং অরোরা ও বাংলাদেশ দেশরক্ষা বাহিনীর এ.কে খন্দকারের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করিলে পাক দেশরক্ষা বাহিনীর ৭৫ হাজার ও বেসামরিক ১৮ হাজার যুদ্ধবন্দীকে ভারত ভূমিতে স্থানান্তরিত করিয়অ তথায় আটক রাখা হয়।
    যে দলিলের মাধ্যমে এই আত্মসমর্পণ সংঘটিত হইয়াছিল তাহা নিম্নে দেওয়া হইল:

TEXT OF INSTRUMENT OF SURRENDER

The PAKISTAN Eastern Command agree to surrender all PAKISTAN Armed Forces in BANGLADESH to Lieutenant General JAGJIT SINGH AURORA, General Officer Commanding-in-Chief of the Indian and Bangladesh force in the Eastern Theatre. This surrender includes all PAKISTAN Land, Air and Naval forces as also all paramilitary forces and civil amied forces. These forces will lay down their arms and surrender at the places where they are currently located to the nearest regular troops under the command of Lieutenant General JAGJIT SINGH AURORA.

The PAKISTAN Eastern Command shall come under the orders of Lieutenant General JAGJIT SINGH AURORA as soon as this instrument is signed. Disobedience of orders will be regarded as a breach of the surrender terms and will be dealt with in accordance with the accepted laws and usages of war. The decision of Lieutenant General IAGJIT SINGH AURORA will be final, should any doubt arise as to the meaning or interpretation of the surrender terms. Lieutenant General Jagjit Singh Aurora gives a solemn assurance that personnel who surrender shall be treated with the dignity and respect that soldiers are entitled to in accordance with the provisions of the GENEVA convention and guarantees the safety and well- being of all Pak Military and Paramilitary forces who surrender. Protection will be provided to foreign nationals, ethnic minorities and personnel of - West Pakistan origin by the forces under the command of Lieutenant General Jagjit Singh Aurora.

JAGJIT SINGH AURORA

Lieutenant General

General Officer Commanding in Chief

Indian and Bangladesh Forces

in the Eastern Theatre

16, December, 1971

AMIR ABDULLAH KHAN NIAZI

Lieutenant General

Martial Law Administrator

Zone B and Commander

Eastern Command (Pakistan)

16, December, l971

অর্থাৎ পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ড পূর্ব রণাঙ্গনে ভারত ও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল অফিসার কম্যান্ডিং লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নিকট বাংলাদেশে অবস্থানরত সকল পাকিস্তানী সৈন্যের আত্মসমর্পণ করিতে সম্মত হইতেছে। পাকিস্তান স্থল, বিমান ও নৌ এবং প্যারামিলিটারী ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনী এই আত্মসমর্পণের অন্তর্ভূক্ত। এই বাহিনীরা লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার পরিচালনাধীন নিকটবর্তী সামরিক বাহিনীর নিকট অস্ত্র জমা দিবে। এই পত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার সাথে সাথে পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ড লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার পরিচালনাধীন হইবে। এই আদেশের লংঘন আত্মসমর্পণের শর্ত লংঘন বলিয়া বিবেচিত হইবে এবং প্রতিষ্ঠিত আইন ও যুদ্ধনীতি অনুসারে ইহার বিচার হইবে। আত্মসমর্পনের শর্তাবলীর অর্থ বা ব্যাখ্যার ব্যাপারে কোন সন্দেহ উত্থিত হইলে লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে।
লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এই মর্মে  আশ্বাস প্রদান করিতেছেন যে, জেনেভা কনভেশনের নিয়মাবলী অনুযায়ী আত্মসমর্পণকারী সকল পাকিস্তান সামরিক প্যারামিলিটারী বাহিনীর নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা হইবে। জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা পরিচালনাধীন বাহিনী সকল বিদেশী সাগরিক নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু এবং পশ্চিম পাকিস্তানী ব্যক্তিবর্গের রক্ষণাবেক্ষণ করিবে।

স্বাঃ/জগজিৎ সিং অরোরা
লেফটেনেন্ট জেনারেল
জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চীফ
পূর্ব রণাঙ্গনে ভারত ও
বাংলাদেশ বাহিনী
১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১।

স্বাঃ/আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজী
লেফটেনেন্ট জেনারেল
মার্শাল ল’ এডমিনিষ্ট্রেটর
জোন-বি এবং কমান্ডার
পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ড (পাকিস্তান)
১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১।


যুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণ প্রশ্নে
বাংলাদেশের মাটিতে পাক সেনাবাহিনী মুক্ত করিবার নীতিগত কারণ ছাড়াও ভারত নিজস্ব কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। প্রথমতঃ ভারত দ্বিখন্ডিত হইয়া পাকিস্তানী রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হইয়াছিল। অখন্ড ভারত বিশ্বাসী ভারতয় নেতৃবৃন্দ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল কখন সাফল্যের সহিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের বিলোপ ঘটানো যায়। পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিলোপ না হইলেও বরং তাহার রাষ্ট্রীয় অংগচ্ছেদের সুবর্ণ সুযোগই ১৯৭১ সালের এক মহাক্ষলে ভারতের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়। দ্বিতীয়তঃ ১৯৬২ সালের শেষার্ধে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত মৈত্রীর পটভূমিকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অঙ্গ পূর্ব পাকিস্তানের অস্তিত্ব ভারতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি স্বরূপ। ইহার অবশ্যম্ভাবী কার্যকারণেই ভারতকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে আসাম-নেফা সীমান্তে দেশরক্ষা ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে হয়। তৃতীয়তঃ আসাম, সীমান্তবর্তী নাগাভূমি, মিজোরাম প্রভৃতি ভারতীয় পার্বত্য এলাকাবাসী স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মরণপল সংগ্রামে লিপ্ত। পূর্ব পাকিস্তান এই সকল পার্বত্য উপজাতীয় বিদ্রোহী গেরিলা বাহিনীর মুক্তচরণ ভূমি ও আশ্রয়স্থল। চতুর্থতঃ পূর্ব পাকিস্তানের বর্ধনশীল পাট শিল্প বিশ্ববাজারে ভারতীয় পাট শিল্পকে কোণঠাসা করিয়া ফেলিয়াছে। পঞ্চমতঃ ভারতীয় বর্ধিষ্ণু শিল্প কারখানার শিল্পজাত দ্রব্যের বাজার অন্বেষণ।
উপরোক্ত কারণেই ৩১শে মার্চ (১৯৭১) ভারতীয় পার্লামেন্ট উভয় পক্ষের যুক্ত সভায় বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনকে সর্বোতভাবে সাহায্য-সহায়তা দানের প্রতিশ্র“তি ঘোষণা করে। সেইকথা আগেই বলিয়াছি, ইহা ছিল ২৭শে মার্চ ’৭১-এ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভারতীয় পার্লামেন্টে উদ্বেগ প্রকাশের প্রতিধ্বনি মাত্র। পূর্ব পাকিস্তান হইতে শরনার্থীদের অবাধে ভারতভূমিতে আশ্রয় গ্রহণে ভারত সরকার সীমান্ত অতিক্রমে কোন প্রকার বাধা দেয় নাই। ভারতীয় মন্ত্রীর (শ্রম ও পুনর্বাসন) লোকসভায় প্রদত্ত তথ্যানুসারে মুক্তিযুদ্ধকালে শরনার্থীদের সাহায্যের ৩২৬ কোটি টাকা, খরচের মধ্যে আন্তর্জাতিক সাহায্যের পরিমাণ ছিল সর্বসাকুল্যে ৩৬.৭৭ কোটি টাকা, বাকি ২৮৯.২৩ কোটি টাকা ভারত সরকার ব্যয় করে। পাক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানকে হিন্দু সম্প্রদায়মুক্ত করার প্রচেষ্টার ফলে ১৬ই আগষ্টের মধ্যে ভারতে ৫৯.৭১ লক্ষ হিন্দু, ৫.৪১ লক্ষ মুসলমান ও ৪৪ হাজার অন্যান্য সম্প্রদায় ভুক্ত শরনার্থী আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। অবশ্য পাকিস্তান সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী ১লা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ লক্ষ ২ হাজার ৬২৩ ব্যক্তি পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে। পাক জংগী সরকারের হয়ত ধারণা ছিল, ইহার ফলে বাস্তুত্যাগী হিন্দুরা ভারতে সাম্প্রদায়িক দাংগার সূত্রপাত করিবে এবং ইহারই অবশ্যম্বাবী প্রতিক্রিয়ায় মুসলমান মুক্তিযোদ্ধা ও শরনার্থীরা ভারত বিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করিবে আর ইহারই ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অঙ্কুরেই জনসমর্থন হারাইয়া ফেলিবে। অকপট মনে বলিতে হইবে, ভারতীয় জনতা ব্যাপকভাবে সুস্থ রাজনৈতিক চেতনা ও মানবিকবোধের বিরণ নিদর্শন স্থাপন করে। সাম্প্রদায়িক দু®কৃতিকারীদের যে কোন অপচেষ্টা সাধারণ ভারতবাসী অথ্যন্ত সতর্কতা ও ক্ষিপ্রতার সহিত স্তব্ধ করিয়অ দেয়। ইহা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারলব্ধ মন্তব্য, কাহারো সমর্থন-অসমর্থনের অপেক্ষা রাখে না। পাকিস্তান দ্বিখন্ডিত হওয়ার পশ্চাতে
বস্তুতঃ ভারতের জনসাধারণের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। ভারতীয় প্রভাবশালী উচ্চ মহলে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় স্বার্থে পাকিস্তান অখন্ডিত বা দ্বিখন্ডিত হইবার ঔচিত্যের প্রশ্নে মতভেদ ছিল। ভারতীয় ‘ইনষ্টিটিউট ফর ডিফেন্স ষ্টাডিস এন্ড এনালাইসিস’-এর মতানুসারে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় স্বার্থে পাকিস্তান ছিল অপরিহার্যভাবে প্রয়োজনীয়। ১৯৭১-এর মার্চ হইতে ডিসেম্বর অবধি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পদক্ষেপগুলি ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করিলে স্পষ্ট হয় যে, তিনি পাকিস্তান দ্বিখন্ডনের পক্ষে ছিলেন। উল্লেখ্য, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিখন্ডনের বিরুদ্ধে ভূমিকা গ্রহণ করে। ১৯৬৯-এর আগষ্টে ২২ ঘন্টা মেয়াদী পাকিস্তান সফরকালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা করিতে পাক সরকারকে অনুরোধ করে। ফলে পাক-মার্কিন সম্পর্কোন্নয়ন দেখা দেয়। চীন-মার্কিন বলয়ের এই প্রভাব অকার্যকর করিবার মানসেই ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার শরণ সিং ও সোভিয়েট রাশিয়অর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঁন্দ্রে গ্রোমিকো দিল্লীতে ৯ই আগষ্ট (১৯৭১) ২০ সালা রুশ-ভারত “শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগীতা” (কার্যতঃ সামরিক) চুক্তি সম্পাদন করেন। ১৯৬৯ সালের মে মাসে পাকিস্তান সফরকালে প্রকাশ করেন এবং পাক-সোভিয়েত ও পাক-চীন বন্ধুত্ব সমান্তরালভাবে ও সমভাবে চলিতেপারে না বলিয়া নছিয়ত করেন। পাক সরকার অবশ্য উপরোক্ত প্রতিপাদ্যের প্রতি দৃঢ়ভাবে দ্বিমত প্রকাশ করিয়অছিলেন। পাকিস্তানের দ্বিখন্ডিত হওয়াটা বোধহয় তাহারই ফল। এইদিকে আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী দেশগুলির সরকারী মত প্রভাবান্বিত করিবার প্রয়াসে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ২০ হইতে ২১শে সেপ্টেম্বর রাশিয়া সফর করিলেন এবং ৬ই অক্টোবর হইতে ১৩ই নভেম্বর বেলজিয়াম, অষ্ট্রিয়া, ইংল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানী ইত্যাদি সফর করিয়া পশ্চিমা শক্তিগুলির কার্যকরি হস্তক্ষেপ বন্ধের নিশ্চয়তা বিধান করিলেন। শুধু তাই নয় সফরান্তে মিসেস গান্ধী ইহার পরেও ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জন অবধি জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিক্রিয়াগুলি অত্যন্ত সুনিপুলভাবে মোকাবিলা করিলেন। পাক-ভারত সীমান্ত এলাকায় উভয় রাষ্ট্র সশস্ত্র সংঘর্ষের সম্ভাবনা এড়াইবার জন্য পারস্পরিক সৈন্য প্রত্যাহার প্রস্তাবের জওয়াবে ৩০শে নভেম্বর ভারতীয় রাজ্যসভায় বক্তৃতা কালে মিসেস গান্ধী স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করিলেন যে, বাংলাদেশ হইতে পাক-বাহিনী প্রত্যাহার করিলে তিনি পূর্ব সীমান্ত হইতে ভারতীয় সৈন্য বাহিনী প্রত্যাহার করিতে সম্মত আছেন। ইহার নির্গলিতার্থ বাংলাদেশ পাকিস্তানের অঙ্গ নহে। অন্যথায় ৩রা ডিসেম্বর হইতে ১৬ই ডিসেম্বর পাক-ভারত সশস্ত্র সংঘর্ষ ও বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল প্রধানমন্ত্রী ইনিÍা গান্ধীর রাজ্যসভায় ৩০শে নভেম্বর স্বতঃসিদ্ধ পরিণতি।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংগচ্ছেদ অভিযান নিশ্চিদ্র করিবার প্রয়াসে ইন্দিরা গান্ধী শরনার্থীদের ব্যয়ভার যথাসম্ভব নিজ দায়িত্বে গ্রহণ করেন। একই ইদ্দেশ্যে তিনি জনপ্রতিনিধি, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের বেতন, ভাতা ও বাসস্থানের সম্ভাব্য ব্যবস্থা করিলেন, অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ব্যয়ভার গ্রহণ করিলেন; আবার চীন সমর্থক জননেতা ও দলগুলির উপর কড়া পুলিশী নজর রাখিলেন। এইভাবেই অভ্যুদয় নাটিকার সফল যাবনিকাপাতের মাধ্যমে ১৯৬২ সালে মহাচীনের হস্তে পরাজয় ও ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের নিকট নাকানিচুবানি খাইবার কালিমা মুছিয়া ভারত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নেক্সনের স্বীকৃতি মোতাবেক ‘মেজর পাওয়ার’ অর্থাৎ বড় শক্তিতে উন্নীত হইল।