বাংলাদেশের অভ্যুদয় : ঐতিহাসিক পটভূমি

ফন্ট সাইজ:

     বাংলাদেশ নিজস্ব কারণে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সংগ্রামে লিপ্ত হয়। প্রথমতঃ ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোরে অধিবেশনে বংগীয় প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজজুল হকের প্রস্তাবক্রমে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশগুলির সমবায়ে ভারতীয় উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে দুইটি মুসলিম প্রধান স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করিবার পরিকল্পনা ছিল। ইহাই পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব হিসাবে খ্যাত হয়। দ্বিতীয়তঃ প্রাসাদচক্রের রাজনীতি ও ক্ষমতা দখলের আবর্তে পাকিস্তান গণতন্ত্রের মূল বক্তব্য জনগণের সার্বভৌমত্ব অর্থাৎ জনগণের রায়ে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনের নীতি বিসর্জন দেয়। তৃতীয়তঃ রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থাৎ শাসন ক্ষমতায় পূর্ব পাকিস্তানী বংগ ভাষাভাষীদের কার্যকর অনুপস্থিতি বাংগালী মন-প্রাণকে বিষাক্ত ও বিদ্রোহী করিয়া তোলে। পশ্চিম পাকিস্তানের স্থানীয়, ভারত হইতে আগত মোহাজের, সরকারী সামরিক-বেসামরিক কর্মচারী, রাজনীতিবিধ, পুঁজিপতি, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী শ্রেণীর মধ্যে আভ্যন্তরীণ স্বার্থগত কলহ ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানী বাঙ্গালীদের উপর নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ও আধিপত্য বজায় রাখিবার প্রয়াসে তাহারা ছিল ঐক্যবদ্ধ ও বদ্ধপরিকর। পাকিস্তান সামরিক বিভাগে বরাদ্দ অর্থের উপর সৈন্য বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের প্রশ্নাতীত একচেটিয়া সর্বময় ক্ষমতা ছিল। বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বাজেটের সিংহভাগ উপর পার্লামেন্টের বা জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারের কোন প্রকার অর্থপূর্ণ নিয়ন্ত্রন ছিল না। শাসকচক্রের স্বার্থে দেশ শাসিত হইত এবং জনগণ পরিণত হইয়া পড়িয়াছিল নেপথ্যের বস্তুতে। সংখ্যাধিক্য হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানীগণ পর্যবসিত হইয়াছিল শাসিতের শ্রেণীতে। জনগণের সার্বভৌমত্ব হরণকারী এই প্রাসাদ চক্রেরই মদদগার হিসাবে যুক্ত হয় সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন শক্তি। তাই (ক) ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে একচেটিয়া জয়লাভ করিয়াও সরকার গঠনের কিছুকালে মধ্যে শেরে বাংলা ফজলুল হকের মন্ত্রিসভাকে পদচ্যুত হইতে হয়। (খ) ১৯৫১ সালের ১৬ই অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ভাষণদানকালে প্রকাশ্যে জনষভায় নিহত হন। (গ) ১৯৫৩ সালে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বেআইনিভাবে বরখাস্ত হন। (ঘ) ১৯৫৪ সালের অক্টোবরে বেআইনিভাবে গণপরিষদ বাতি ঘোষিত হয়। (ঙ) ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারীতে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর সেনাপতি জেনারেল আইউব খান সামরিক শাসন জরি ও সর্বময় ক্ষমতা দখল করেন এবং (চ) ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান ব্যাপী প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কর্তৃক ৩১৩ জাতীয় পরিষদে আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন দখণ করা সত্ত্বেও জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসিতে দেওয়া হয় নাই। তৃতীয়তঃ অনস্বীকার্য য, ভৌগোলিক অবস্থান ও ভাষা সংস্কৃতির মৌলিক প্রভেদের দরুন পাকিস্তানী জাতিত্ববোধের দ্রুত উন্মেষ বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং চতুর্থতঃ অর্থনৈতিক উন্নয়নের বৈষম্য বাংগালী জীবনে হতাশার সৃষ্টি করে। সামরিক-বেসামরিক বিভাগে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, লাইসেন্স-পারমিট বন্টন ইত্যাদি ক্ষেত্রে পর্বতমাণ বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানী জনমনে গভীর অসন্তোষ ও তিক্ততার কারণ হইয়া দেখা দেয়। সংকটের গুরুত্ব তুলিা ধরিবার নিমিত্ত কিছু কিছু পরিসংখ্যান নিম্নে দেওয়া হইল:

শিক্ষা
    পূর্ব পাকিস্তান    পশ্চিম পাকিস্তান
    ১৯৪৭-৪৮    ১৯৬৮-৬৯    ১৯৪৭-৪৮    ১৯৬৮-৬৯
প্রাথমিক বিদ্যালয়    ২৯৬৩৩    ২৮৩০৮    ৮৪১৩    ৩৯৪১৮
মাধ্যমিক বিদ্যালয়    ৩৪৮১    ৩৯৬৪    ২৫৯৮    ৪৫৭২
কলেজ    ৫০    ১৭৩    ৪০    ২৭১
মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং
কৃষি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়    ৩    ৯    ৪    ১৭
বিশ্ববিদ্যালয়    ১    ৪    ২    ৬
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র    ১৬২০    ৮৮৩১    ৬৫৪    ১৮৭০৮


    লক্ষণীয় যে, ১৯৫০-৭১ মুদ্দতে ৭২০ কোটি ডলার ঋণ-এর আশ্বাস পায়, তন্মধ্যে ৪৪০ কোটি ডলার ঋণ প্রকৃতপক্ষে খরচ হইয়াছিল। ইহার মধ্যে ৮০ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ হইয়াছে এবং বাকী ৩৬০ কোটি ডলারের মধ্যে ৩৩.৪% ও ৬০.৮% যথাক্রমে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হইয়াছে। বাকি ৫.৮% অনির্ধারিত রহিয়াছে।
        পূর্ব পাকিস্তান    পশ্চিম পাকিস্তান
১৯৪৭-১৯৬৯    উন্নয়ন খাতে    ৩০০০ কোটি    ৬০০০ কোটি
১৯৪৭-১৯৬৫    রপ্তানী আয়    ১৬২৮ কোটি    ১৩১৯ কোটি
১৯৬৫-১৯৬৮    রপ্তানী আয়     ৪৭২ কোটি    ৪২২ কোটি
১৯৪৮-১৯৬৫    আমদানী ব্যয়    ১২০৭ কোটি    ২৮৯৯.৮২ কোটি
১৯৬৫-১৯৬৮    ”    ৩৯৩.৭৬ কোটি    ৯৮৩.৮ কোটি
১৯৫৮-১৯৬৭    বৈদেশিক মুদ্রা
(উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ)    ২০%    ৮০%
    মার্কিন সাহায্য ব্যয়    ৩৩%    ৬৬%
    মার্কিন ব্যতীত অন্যান্য
দেশের সাহায্যে ব্যয়    ৪%    ৯৬%
১৯৫০-১৯৭১    মোট বৈদেশিক ঋণ    ৩৩.৪%    ৬০.৮%
(অনির্ধারিত ৫.৮%)
    কেন্দ্রীয় চাকুরী (বেসামরিক)    ১৫%     ৮৫%
    দেশ রক্ষা ব্যয়    ১০%    ৯০%

    (অথচ ১৯৫০-৫১ হইতে ১৯৬৮-৬৯ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় রাজস্ব আয় ৩৭৯৬ কোটি টাকার মধ্যে ২১৩২ কোটি টাকা দেশরক্ষা বিভাগ খাতে ব্যয় হয়।)

        পূর্ব পাকিস্তান    পশ্চিম পাকিস্তান
১৯৬৪-৬৮    সার বিতরণ    ৩৭১,০০০ টন (৩৩%)    ৭৩৯,০০০ টন (৬৬%)
১৯৬৪-৬৯    উন্নত বীজ বিতরণ    ৪০,০০০ টন (১১%)    ৩৪২,০০০ টন (৮৯%)
১৯৬০    মাথা পিছু আয়    ২৬৯ টাকা    ৩৫৫ টাকা
১৯৭০    মাথা পিছু আয়    ৩০৮ টাকা    ৪৯২ টাকা
১৯৬৪-৬৯    আন্তঃআঞ্চলিক
বাণিজ্য রফতানী    ৩১৭.৪ কোটি    ৫২৯ কোটি

    এইভাবেই একদিকে পূর্ব পাকিস্তানের রফতানি আয় পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতি উন্নয়নে ব্যয় হইতে থাকে এবং অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি পশ্চিম পাকিস্তানের কলকারখানা ও ক্ষেত খামারের আশ্রিত বাজারে পরিণত হয়। তাই চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বিবেচনার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত উপদেষ্ঠা মন্ডলীর প্রতিবেদনে করুণ চিত্র ফুটিয়া উঠে। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায়, এই যাবত পূর্ব পাকিস্তানের ২৬০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থাৎ ১২৩৮ কোটি টাকা পশ্চিম পাকিস্তানে পুঁজি পাচার হয়। ইহারই অবধারিত ফল গ্রাম বাংলা অধিবাসীদের ১৯৫৯-৬০ সালের বাজার দর অনুযায়ী ১৯৪৯-৫০-১৯৫৩-৫৪ সালের মাথাপিছু আয় ২২৮ ঠাকা হইতে কমিয়া ১৯৬৪-৬৫, ১৯৬৭-৬৮ সালে ১৯৮ টাকাতে দাঁড়ায়। ক্রেতা সাধারণের অবস্থা নিম্নলিখিত তুলনামূলক বাজার দর হইতে বুঝা যাইবে:    
    পূর্ব পাকিস্তান    পশ্চিম পাকিস্তান
প্রতিমণ চাউল    ৩৫.০০ টাকা    ২০-২৫ টাকা
প্রতিমণ আটা     ২৫-৩০ টাকা     ১৫-২০ টাকা
প্রতিসের সরিষার তৈল     ৫.০০ টাকা    ২.৫০ টাকা

    ১৯৭১ সালের ৯ মাস যুদ্ধকালে পূর্ব পাকিস্তান হইতে পশ্চিম পাকিস্তানে ৩০০ কোটি টাকার সম্পদ পাচার হয় এবং ব্যাংক হইতে ৮৬ কোটি টাকা ঋণ লওয়া হয়। সিন্ধু অববাহিকা পরিকল্পনা, ওয়ার্কস প্রজেক্ট-তারবেলা বাঁধ, গোলাম মোহাম্মদ ব্যারাজ, জলবদ্ধতা ও লবণাক্ততা দূরীকরণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পায়ন ও সহজ ও দ্রুততর হয়। পশ্চিম ভারতের কাথিওয়ার ও কচ্ছ এলাকা হইতে আগত বড় বড় ব্যবসায়ী, পাক পাঞ্জাবের চিনিয়ট শহরবাসী দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, ভারতীয় গুজরাট ও কাথিওয়ার হইতে আগত তৃতীয় বৃহত্তম ব্যবসায়ী,বোহরা, খোজা, ইসমাইলীয়া ও খোদা ইশ্নাসারী সম্প্রদায় এবং পশ্চিম পাকিস্তানী বড় বড় সামন্ত প্রভুরা পশ্চিম পাকিস্তানকে কেন্দ্র করিয়া পাকিস্তানী অর্থনীতিতে পুঁজি বিনিয়োগ করে। ফলে পাকিস্তানের অর্থনীতি ২২টি পরিবারে কুক্ষিগত হইয়অ পড়ে। শিল্প সম্পদে ৬৬%, বীমা সম্পদের ৭৫%, ব্যাংক সম্পদের ৮০% এই ২২টি পরিবারের আয়ত্বে চলিয়া যায়। এই অবাংগালী পুঁজিপতি গোষ্ঠীই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বেশীরভাগ শিল্প ব্যবসার মালিক। ইহাই বাংগালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আক্রোশের কারণে পরিণত হয় এবং ইহাতেই আপামর বাংগালী জনতার সর্বস্তরে অভিযোগ ও বিদ্বেষের মানসিকতা জন্ম নেয়।
    উপরে বর্ণিত দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ কার্যকারণসমূহ সগরে-বন্দরে, স্কুল-কলেজে, কলে-কারখানায়, ক্ষেতে-খামারে, সামরিক-বেসামরিক কার্যালয়ে পূর্ব পাকিস্তানী বংগ ভাষাভাষীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের মূল জীবনী শক্তি হিসাবে কাজ করে এবং এই সামজিক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিচালিত আন্দোলনই যুগপৎ পাকিস্তান অংগেচ্ছেদের মূল শক্তিতে পরিণত হয়।
    ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হইবার পরপরই পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর নিকট দিবালোকের ন্যয় স্বচ্ছ হইয়া উঠে যে, ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করিয়অ আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতায় পরিণত হইয়াছেন এবং ৮৮ আসনের অধিকারী পিপলস পার্টি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর ক্ষমতার গদিতে আসীন হইবার চিন্তা দিবাস্বপ্ন মাত্র। তাই তিনি সময়ক্ষেপ না করিয়া ২০শে ডিসেম্বর ঘোষণা করিলেন “পিপলস পার্টি জাতীয় পরিষদে বিরোধীদলীয় আসন গ্রহণ করিতে প্রস্তুত নহে।” এমনকি ক্ষমতার গরজে ও কায়েমী স্বার্থের প্ররোচণায় তিনি দুই প্রধানমন্ত্রীর থিউরী প্রচার করিতেও কুণ্ঠিত হইলেন না। সামরিক চক্র ইহার সুযোগ গ্রহণ করে। সামরিক চক্র জনগণের নির্বাচিত আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টির মধ্যে পাস্পরিক রাজনৈতিক কলহের সদ্বব্যবহার করিতে এবং সেই উদ্দেশ্যে বিভিন্নভাবে কায়েমী স্বার্থবাদীদের মারফত জান্তাা হাঁসের উপর এত পীক্ষা-নিরীক্ষা করিল- সেই হাঁস অর্থাৎ পাকিস্তান অস্তিত্ব হারাইল এবং সামরিক জান্তা শিরকুলমণি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সোনার ডিম অর্থাৎ ক্ষমতা হারাইলেন। ভাগ্যে বন্দীজীবন। পাকিস্তান অংগচ্ছেদের বিনিময়ে ক্ষমতা পিপাসু জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতা পাইলেন। ক্ষমতার সিংহভাগ ভোগী পাঞ্জাবী কায়েমী স্বার্থ বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠতার দুঃস্বপ্ন হইতে মুক্তি পাইল। বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাবের জনসংখ্যা ৫৩% অর্থাৎ সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ, বেলুচিস্তান প্রভৃতি প্রদেশের মোট জনসংখ্যারও অধিক। সুতরাং বোধগম্য কারণেই অতঃপর পাকিস্তানে (সাবেক পশ্চিম পাকিস্তান) এক ব্যক্তি এক ভোট নীতির গণতন্ত্র প্রবর্তনে পাঞ্জাবী কায়েমী স্বার্থ মহল গোঁড়া সমর্থক হইতে দ্বিধা করিবে না। বরং তাহাদের স্লোগান হইবে যে, গণতন্ত্রই পাকিস্তানের রক্ষা কবচ- কেননা It suits them well! অর্থাৎ ইহাই তাহাদের ভাল মানায়।
    পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার এক ব্যক্তি এক ভোট গণতান্ত্রিক নীতি সংখ্যাগুরু বাংলাদেশের মোকাবিলায় পাঞ্জাবকে অত্যন্ত বেকায়দায় ফেলিয়াছিল। পাঞ্জাববাসীদের দেশপ্রেম ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অখন্ডত্বের বিশ্বাস ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ অন্যান্য প্রদেশগুলির উপর লুণ্ঠন ও আধিপত্য বজায় রাখা সম্ভব, নতুবা স্বার্থের খাতিরে পাকিস্তান ও ইসলাম বিসর্জন দিতে পাঞ্জাবীদের এতটুকু বাধিতনা। স্বীয় হীন-উদ্দেশ্য চরিতার্থ করিতে সিন্ধু প্রদেশের জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো ও সীমান্ত প্রদেশের জেনারেল ইয়াহিয়া খান সর্বনাশা ভূমিকা গ্রহণ করেন। ভবিষ্যৎ ইতিহাসে এই দুই ব্যক্তিই মর্মান্তিক কলঙ্কজনক ও বিয়োগান্তক নাটকের দুরাচার নরাধম (Villain) হিসাবে চিত্রিত হইবেন।  

    উপনির্বাচনী প্রহসন ও শান্তি কমিটি
    ১৯৭০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর নগরে পাকিস্তান ন্যাশনাল প্রোগ্রেসিভ লীগ ও অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খানের নেতৃত্বে জাষ্টিস পার্টির প্রতিনিধিদের মধ্যে যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হইয়াছিল, তাহাতে ভৌগোলিক কারণে “পাকিস্তান দুই অর্থনীতির রাষ্ট্র” এই যুক্তি গ্রহণে জাষ্টিস পার্টির প্রতিনিধিদল অস্বীকৃতি জানায় এবং ইহার মধ্যে তাঁহারা বিচ্ছিন্নতাবাদের গন্ধ আবিস্কার করেন। জওয়াবে তখন তাহাদিগকে বলিতে বাধ্য হইয়াছিলাম যে, পাকিস্তান যদি পৃথক হইয়া যায় তাহা হইলে ক্রমশঃ পাঠান, বেলুচ ও সিন্ধীগণ স্ব-স্ব স্বাধীনতা সংগ্রামে অবতীর্ণ হইবে। ১৯৭৪-৭৫ সালের পাঠান ও বেলুচের মুক্তি সংগ্রাম এক নির্মম সত্য ঘটনা। সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হইতে পারে বটে তবে ইতিহাস নিজস্ব পথেই অগ্রসর হয়। স্মর্তব্য যে, সমগ্র বিশ্ববাসী পাক সেনা বাহিনীর বর্বর হামলার প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত প্রেসিডেন্টের দিল্লী হইতে প্রেরিত ২রা এপ্রিল (১৯৭১) তারিখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কিট লিখিত পত্র, ১১ই আগষ্ট (১৯৭১) ও ২৯শে সেপ্টেম্বর (১৯৭১) মস্কো হইতে প্রচারিত ভারত-সোভিয়েত দুইটি পৃথক ইশতেহার এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও মহাচীনের “রাজনৈতিক সমঝোতা” প্রস্তাবেও স্বেচ্ছাচারী ইয়াহিয়া খান কর্ণপাত করেন নাই বরং তিনি দুইবার ১০ই জুন (১৯৭১) ও ৫ই সেপ্টেম্বর (১৯৭১) “সাধারণ ক্ষমার” প্রহসন অভিনয় করেন। শুধু তাই নয়, তিনি আগষ্ট (১৯৭১) তারিখে আওয়ামী লীগ দলীয় ৭৯ জন জাতীয় পরিষদ সদস্য (উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিবুর রহমান ও ডঃ কামাল হোসেনের এ.ই ১১১ ও ১১২ নির্বাচনী এলাকা শূন্য ঘোষিত হয় নাই) এবং ১৯শে আগষ্ট ’৭১ তারিখে ১৯৪ জন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য অযোগ্য ঘোষণা করিয়া তদস্থলে সেনাবাহিনীর ছত্র-ছায়ায় উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। তদানুসারে ২০শে নভেম্বর ও ১৯শে ডিসেম্বর (১৯৭১) মধ্যে উপ-নির্বাচনের নামে সদস্য বাছাই প্রহসন অনুষ্ঠিত হয় এবং ১২ই আগষ্ট (১৯৭১) ডঃ আবদুল মোত্তালেব মালিককে গভর্নর নিযুক্ত করিয়া সর্বজনাব আবুল কাসেম (কাউন্সিল মুসলিম লীগ), আখতার উদ্দীন আহমদ (কনভেনশন মুসলিম লীগ), মাওলানা এ.কে.এম ইউসুফ (জামায়াতে ইসলাম), মাওলানা ইসহাক (নেজামে ইসলামী), নওয়াজেশ আহমদ (কাউন্সিল মুসলিম লীগ), মাওলানা আব্বাস আলী খান (জামায়াতে ইসলামী), মুজিবুর রহমান (কাইয়ুম মুসলিম লীগ), ওবায়দুল্লাহ মজুমদার (আওয়ামী লীগ), অধ্যাপক শামছুল হক (আওয়ামী লীগ), এ এস এম সোলায়মান (কৃষক শ্রমিক পার্টি), প্রাক্তন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ  প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান পিডিপি নেতা জসিম উদ্দিন, এ কে মোশাররফ হোসেন এমপিএ, (পিডিপি), মং সুপ্র“ চৌধুরী (পার্বত্য চট্টগ্রাম) সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা গঠনের প্রহসন অভিনয় নিষ্পন্ন হইয়া যায়। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সংহতি ও অখন্ডত্ব বজায় রাখিবার তাগিদে এবং সামরিক শাসনকর্তা ও জনগণের মধ্যে যোগসূত্র প্রতিষ্ঠাকল্পে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় অখন্ডত্বে বিশ্বাসী নিম্নলিখিত রাজনীতিবিদগণ সমবায়ে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি (পূর্ব পাকিস্তান) গঠন করেন:

    ১। সৈয়দ খাজা খয়েরুদ্দীন                আহবায়ক
    ২। মাওলানা নূরুজ্জামান                    প্রচার সম্পাদক
    ৩। এডভোকেট নূরুল হক মজুমদার            অফিস সম্পাদক
    ৪। এডভোকেট এ কিউ এম শফীকুল ইসলাম        কোষাধ্যক্ষ

    কার্যকরি কমিটির সদস্যবৃন্দ হইলেন:
    ১। অধ্যাপক গোলাম আযম
২। মাহমুদ আলী
৩। আবদুল জব্বার খদ্দর
৪। মাওলানা সিদ্দিক
৫। আবুল কাসেম
৬। ইউসুফ আলী চৌধুরী (মোহন মিয়া)
৭। মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ মাসুম
৮। আবদুল মতিন
৯। আবদুল খালেক
১০। ব্যারিষ্টার আখতার উদ্দিন
১১। পীর মোহসেন উদ্দিন (দুদু মিয়া)
১২। এ.এস.এম সোলায়মান
১৩। এ.কে. রফিকুল হোসেন
১৪। আতাউল হক খান
১৫। তোয়াহা বিন হাবিব
১৬। মেজর আফসার উদ্দিন
১৭। ইয়াহিয়া বাওয়ানী
১৮। হাকিম ইরতিজাউর রহমান খান আকুন-জাদা
১৯। সাত্তার কারওয়াদিয়া
২০। আবু আহমদ শাহ এবং
২১। মোহাম্মদ ভাই।

১১৬ নং বড় মগবাজার, ঢাকা-২, শান্তি কমিটি সদর দফতর স্থাপতি হয়। শান্তি কমিটি যে কেবল মুক্তিবাহিনী বা বাংলাদেশ সমর্থকদের দমনে ব্যস্ত ছিল, তাহা নহে, পাক সেনাবাহিনীদের অকথ্য পাশবিক অত্যাচার ও লুণ্ঠন হইতেও দেশবাসীকে রক্ষা করিতে আপ্রাণ সচেষ্ট ছিল; উভয় বাস্তবতাকে স্বীকার করাই হইবে সত্য ভাষণ। শেষ রক্ষা হইল না। এমনকি বিশ্ব ব্যাংক প্রতিনিধি মিঃ পিটার কারগিল কর্তৃক সরেজমিনে পূর্ব পাকিস্তনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষনের রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমতঃ অশান্ত অবস্থা নিরসন, দ্বিতীয়তঃ ভারত হইতে শরনার্থীদের প্রত্যাবর্তন এই শর্তদ্বয় পূরণ না হওয়া অবধি “এইড টু পাকিস্তান কনসর্টিটিয়াম” ২১শে জুন (১৯৭১) “প্যারিস বৈঠকে” কোন প্রকার সাহায্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ, মূলধন নিয়োগের যথাযত পরিস্থিতি অবিদ্যমান। অন্যদিকে দুই মহাযুদ্ধ বৃহৎ শক্তি আমেরিকা ও গণপ্রজাতন্ত্রী মহাচীনের প্রজেষ্টায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এবং ৭ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংহতি ও অকন্ডত্বের পক্ষে ১০৪ ভোট জোগাড় হইয়াছিল সত্য কিন্তু পাক-ভারত সশস্ত্র সংঘর্ষের মুহূর্তে (ডিসেম্বর ১৯৭১) মহাচীন ও যুক্তরাষ্ট্র বাস্তব ও কার্যকর সহায়তাদানে বিরত থাকে। উল্লেখ্য যে, জাতিসংগ সাধারণ পরিষদে ১১টি ভোট বিপক্সে যায়, ১০টি রাষ্ট্র ভোটদানে বিরত ছিল। মহাচীন ৬, ১১ ও ১২ই এপ্রিল (১৯৭১) এবং ৫, ১৯ ও ২৭শে নভেম্বর (১৯৭১) পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংহতি রক্ষার সংগ্রামে দৃঢ়ভাবে পাশে থাকিবার প্রতিশ্র“তি দিলেও এবং কলম্বিয়া ব্রডকাষ্টিং সিষ্টেমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পাকিস্তান আক্রান্ত হইলে হস্তক্ষেপ করিবার অভিমত উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ করিলেও ডিসেম্বরের পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানকে একাই যুদ্ধ করিতে হইয়াছে। ৫ই নভেম্বর (১৯৭১) জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে ৯ সদস্যবিশিষ্ট এক প্রতিনিধি দল মহাচীন গমন করে। তৎকালীন অস্থায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীপেঙ ফি পাকিস্তানকে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সমর্থন দানের প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত আপোষ রফারও পরামর্শ দেন। মহাচীন পিকিং হইতে আগাগোড়া বাস্তাব সাহায্যদানের লম্বা চওড়া প্রতিশ্র“তি ঘোষণা করিলেও, কার্যক্ষেত্রে তাহাদের সকল প্রতিশ্র“তি কথার তুবড়িতে পরিণত হয়। বাস্তবে কিছুই হয় নাই

বাংলাদেশ ভারতীয় স্বার্থ
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালোরাত্রিতে পাক বাহিনীর অতর্কিত হামলা ৬ দফা ভিত্তিক সাংবিধানিক দাবীকে স্বাধীনতার দাবীতে রূপান্তরিত করে। অবস্থাদৃষ্টে পূর্ব পাকিস্তানী আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের ভারতীয় সাহায্য প্রার্থনা বৈরী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে খন্ড-বিখন্ড করিবার সুবর্ণ সুযোগ হিসাবেই অপেক্ষমান ভারতীয় নেতৃবৃন্দের দ্বারস্থ হয়। এইভাবেই কালের প্রবাহে, ঘটনাস্রোতে আকস্মিক মোড় পরিবর্তনের ফলে পূর্বে বর্ণিত ভারতীয় নিজস্ব কারণ ও বাংলাদেশের নিজস্ব কারণ একই ঘটনাস্রোতে লীন হইয়া বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়। আমি ভারতীয় অভিসন্ধি সম্বন্ধে সর্বদাই সন্দিগ¦ ছিলাম। ভারত বৃহৎ দেশ, তাহার প্রয়োজনও বৃহৎ। ছোট ছোট দেশ বড় বড় দেশের স্বার্থে উচ্ছন্নে যাইদে বাধ্য হয়। কেবলমাত্র দৃঢ়চেতা সৎ সাহসী নেতাই কোন ছোট দেশকে বৃহৎ দেশের ছোবল হইতে রক্ষা করিতে পারেন। সিকিম রাজ্য ও কাশ্মীর রাজ্যের দুর্বল নেতৃত্ব দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ব্যর্থ হইয়া দেম দুইটিকে বৃহৎ ভারতীয় রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর নেতা ১৯৫৪-৫৮ সালের মধ্যে বিশেষতঃ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক একচেটিয়া বিজয়ের পর নিজেদের কার্যকলাপের দ্বারা প্রমাণ করিয়াছেন যে, নীতি, আদর্শ, সততা তাহাদের মুখের বুলি মাত্র- চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ নহে, অর্থাৎ বুকের বুলি নহে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অক্টোবর মাসে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের সাথে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, প্রশাসনিক, সামরিক ও বাণিজ্য সমঝোতা বিষয়ে ৭ দফা গোপন চুক্তি সম্পাদন করে। সুতরাং সেই গোপন চুক্তি অনুযায়ী স্বাধীন বাংলাদেশ কাগজে কলমে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পাইলেও কার্যক্ষেত্রে ভারতের বংশবদ রাষ্ট্রে পরিণত হইবে তাহা আর বিচিত্র কি! অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের সরকার ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যুদয় হওয়া সত্ত্বেও ভারতের মাটি হইতে ঢাকায় পদার্পন করে ২০শে ডিসেম্বর। ইহা এক অভাবনীয় ও অচিন্তনীয় ঘটনা। শুধু তাই নয়, স্বদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করিয়াই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের সরকার ১লা জানুয়ারী (১৯৭২) এক আদেশে বলে বাংলাদেশের মুদ্রামান শতকরা ৬৬ ভাগ হ্রাস করেন। উল্লেখ্য যে, এই সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের মুদ্রামান ছিল ভারতীয় মুদ্রামান হইতে বেশী। তাজউদ্দিন সরকার এক ঞোষণায় দুই মুদ্রামানের বিনিময় হারের সমতা আনিতে চাহিয়াছিলেন বটে, কিস্তু ফল দাঁড়াইল অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি এবং জনজীবনে আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্য। দ্বিতীয়তঃ ভারতীয় ও বাংলাদেশ অর্থনীতিদ্বয়কে পরস্পর সম্পূরক ঘোষণা করা হয় এবং এতদিন যাবত ভারতে পাট বিক্রির উপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তাজউদ্দিন সরকার ১৯৭২-এর ১লা জানুয়ারী হইতে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে।

তাজউদ্দিন সরকারের উক্ত ঘোষণা অর্থনীতির মূল সত্যকে অস্বীকার করা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বিশ্ব বাজারে ভারত ও বাংলাদেশ পাট, চা, চামড়া বিক্রির ব্যাপারে পরস্পরের প্রতিযোগী। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার শতকরা ৯০ ভাগ উপার্জন ছিল কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্যের উপর নির্ভলশীল। আবার ভারত ও বাংলাদেশ স্ব-স্ব শিল্পের প্রয়োজনে বিদেশ হইতে কাঁচামাল, তুলা আমদানী করে। উভয় রাষ্ট্রকে বিশ্ব বাজার হইতে স্ব-স্ব প্রয়োজনে খাদ্য ক্রয় করিতে হয়। মুদ্রামানের হ্রাস উহার উপর প্রচন্ড বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এক কথায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আত্মনাশা নীতি দেশের অর্থনীতিকে ভাংগিয়া চুরমার করিয়া দেয়। তৃতীয়তঃ ভারতীয় সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস হইতে মুদ্রিত বাংলাদেশের নোটের সংখ্যা সরকার কর্তৃক ঘোষিত সংখ্যা হইতে অনেক অধিক বলিয়া জনসাধারণের মধ্যে একাটা ধারণার সুষ্টি হয়। তাহাদের এই ধারণা বদ্ধমূল হয় ভারতের মুদ্রিত নোট অচল বলিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর মুজিব সরকারের এক অভিনব ও বিস্ময়কর ঘোষণায়। এই ঘোষণায় বলা হয় যে, ভারতে মুদ্রিত নোট দুই মাস যাবত বদল করা যাইবে। ইহার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য যে কোন সাধারণ চোখেও ধরা পরিতে বাধ্য। এইভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রকট মুদ্রাস্ফীতির অভিশাপের শিকারে পরিষত হয়। চতুর্থতঃ চরম বিস্ময়কর ঘটনা পরিলক্ষিত হয় বাংলাদেশের বাজারে। কেনা-কাটায় ভারতীয় মুদ্রার অবাধ প্রচলন শুরু হয়। ভারতীয় সৈন্য, ভারতীয় ব্যবসায়ী, ভারতীয় সাধারণ নাগরিক বাংলাদেশের বাজার হইতে দুর্লভ বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রীত বিদেশী পণ্যদ্রব্য ও দেশীয় মাছ, আলু, ডিম, মোরগ, হাঁস, রসুন, মরিচ ইত্যাদি কয়েকশত কোটি টাকার দ্রব্য ভারতীয় মুদ্রায় অবাধে ক্রয় করিয়অ ভারতে লইয়া যায়। আবার বিভিন্ন কলকারখানা হইতে শত শত কোটি টাকার মেশিনপত্র ও যন্ত্রপাতির খুচরা অংশ, কাঁচামাল ভারতের মারোয়ারী শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা পাচার করিয়া লইয়া যায়।

      পৃথিবীর ইতিহাসে বহু রাষ্ট্র বৈদেশিক রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাহায্য সহায়তায় স্বাধীনতা অর্জন করিয়াছে; কিন্তু বন্ধু রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীয় কাগজী নোটের বিনিময়ে অর্থাৎ বিনামূল্যে সংঘবদ্ধ প্রতারনার দ্বারা লুটপাট করিয়া সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রকে এইভাবে নিঃস্ব করিবার নির্মম নজীর আর কোথাও নাই। বাংলার মাটিরই সন্তান ছিলেন তাজউদ্দিন। অথচ তাহার সরকার ভারতীয় কাগজী মুদ্রা বেআইনীভাবে চালু হইতে বাধা দেয় নাই। দেশ বিক্রি আর কাহাকে বলে? পঞ্চমতঃ ৯৩০০০ যুদ্ধ বন্দী বাংলাদেশ হইতে যে দামী দ্রব্য লুট করিয়া আত্মসাৎ করিয়াছিল ভারতীয় সেনা বাহিনী যুদ্ধ বন্দীদের নিকট হইতেসেইগুলি ছিনাইয়া লইয়াছে; আত্মসাৎ করিয়াছে ও ভারতে স্বীয় পরিবার-পরিজনের নিকট পাঠাইয়া দিয়াছে। তদুপরি যুদ্ধবন্দীগণ যুদ্ধের নয় মাসে (১৯৭১ মার্চ হইতে ডিসেম্বর) বাংলাদেশের নাগরিকদের নিকট হইতে যে বিপুল পরিমাণ পাকিস্তানী মুদ্রা বিভিন্নভাবে অর্জন করিয়াছিল; ভারতীয় সৈন্যরা সেই কাঁড়ি কাঁড়ি ঠাকা দ্বারা বাংলাদেশ হইতে মাল ক্রয় করতঃ ট্রাকে স্বদেশে প্রেরণ করিয়াছে। একটি সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের দু®প্রাপ্য সম্পদ বন্ধুতেÍ নামাবলীর আড়ালে এইভাবে বাংলাদেশস্থ বিভিন্ন সামরিক ছাউনী হইতে  (millitary Cantonment) ভারতে স্থানান্তরিত করিবার প্রতিবাদে তাজউদ্দিন সরকার টু শব্দটি পর্যন্ত করেন নাই।
ভারতীয় দৈনিক সংবাদপত্র “অমৃতবাজার”-এর ১২ই মে (১৯৭৪) সংখ্যার রিপোর্ট অনুসারে ভারত সরকার দুই হইতে আড়াই শত রেলওয়ে ওয়াগন ভর্তি অস্ত্রশস্ত্র বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধক্রমে স্থানান্তরিত করিয়াছে। অথচ ১৯৭৩ সালের ১১ই জুলাই বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, ভারতে কোন অস্ত্রশস্ত্র পাচার হয় নাই; বা ওইয়াও যায় নাই। ১৯৭৪ সালের ১৭ই জুন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর প্রকাশ করেন যে, ভারতে স্থানান্তরিত অস্ত্রশস্ত্র বাংলাদেশকে ফেরত দেওয়া শুরু হইয়াছে। দুই মন্ত্রীর এই দুই বক্তব্যের মধ্যে স্ব-বিরোধিতা লক্ষণীয়। দেশ ও জাতীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা আর কাহাকে বলে? আর কাহাকেই বা বলা হয় স্বাক্ষী গোপাল সরকার> স্বর্ণের ভরি ১৭১ টাকা মানে স্থানান্তরিত অস্ত্রশস্ত্রের মূল্য যদি ৪৫০ কোটি টাকা হয়, তাহা হইলে স্বর্ণভরি ১০০০ টাকা মানে উক্ত অস্ত্রশস্ত্রের মূল্য প্রায় ২৭০০ কোটি টাকা হয়। তদুপরি মহাচীন কর্তৃক নির্মিত জয়দেবপুর অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরী হইতে অস্ত্র নির্মাণ যন্ত্রপাতি ভারতে স্থানান্তরের অেিযাগ উত্থিত হয়। আমরা বাংলা জাতীয় লীগ উপরোক্ত বক্তব্যগুলি জনসাধারণ্যে তুলিয়া ধরি এবং দিল্লীর দাসত্ব হইতে মুক্তি লাভের আখাংখায় দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হইয়া ‘আজাদ বাংলা’ আন্দোলন গড়িয়া তুলি।

ভারতের সহিত গোপন চুক্তি
        ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে ভারত সরকারের সাথে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার প্রশাসনিক, সামরিক, বাণিজ্যিক, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে একটি সাতদফা গোপন সমঝোতা চুক্তি সম্পাদন করেন। চুক্তিগুলো নিম্নরূপঃ

১.    প্রশাসনিক বিষয়কঃ যারা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে শুধু তাঁরাই প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োজিত থাকতে পারবে। বাকীদের শুন্য জায়গা পূরণ করবে ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাবৃন্দ।
২.    সামরিক বিষয়কঃ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে অবস্থান করবে। ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাস থেকে আরম্ভ করে প্রতিবছর এ সম্পর্কে পুনরীক্ষণের জন্য দু’দেশের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
৩.    বাংলাদেশের নিজস্ব সেনাবাহিনী বিষয়কঃ বাংলাদেশের নিজস্ব কোন সেনাবাহিনী থাকবে না। অভ্যন্তরীণ আইন-শৃংখলা রক্ষার জন্য মুক্তিবাহিনীকে কেন্দ্র করে একটি প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা হবে।
৪.    ভারত-পাকিস্তান সর্বাত্মক যুদ্দ বিষয়কঃ সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে অধিনায়কত্ব দেবেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান। এবং যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তি বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর অধিনায়কত্বে থাকবে।
৫.    বালিজ্য বিষয়কঃ খোলা বাজার ভিত্তিতে চলবে দুদেশের বাণিজ্য। তবে বাণিচে=জ্যর পরিমাণের হিসাব নিকাশ হবে বছর ওয়ারী এবং যার যা প্রাপ্য সেটা স্টার্লিং এ পরিশোধ করা হবে।
৬.    পররাষ্ট্র বিষয়কঃ বিভিন্ন রাষ্ট্রের সংগে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রশ্নে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের সংগে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে এবং যতদুর পারে ভারত বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে সহায়তা দেবে।
৭.    প্রতিরক্ষা বিষয়কঃ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বিষয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করবে ভারত।

গোপন চুক্তি প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকারঃ
... বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের সাথে ভারত যে ৭ দফা গোপন চুক্তি করে সে ব্যাপারে জনাব মাসুদুল হক রচিত “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র” এবং সি.আই.এ” শীর্ষক গ্রন্থে মুক্তি যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দিল্লীতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র দূতের দায়িত্ব পালনকারী জনাব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। জনাব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী পরবর্তীতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পীকার ছিলেন। ১৯৮৯ সালের ২৭শে ডিসেম্বর প্রদত্ত জনাব চৌধুরীর-এ সাক্ষাৎকারের সংশ্লিষ্ট অংশ উক্ত গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ১৬৩ থেকে ১৬৬ পৃষ্ঠা হুবহু নীচে তুলে ধরা হলোঃ

প্রশ্নঃ অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে যে গোপন সাত দফা চুক্তি করে , প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা কি সেই সাত দফার মধ্যেই একটি? রক্ষীবাহিনীই কি এই প্যারামিলিশিয়া বাহিনী?
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ঃ ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে ভারত সরকারের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেম সরকার এক লিখিত চুক্তিতে প্যাক্ট নয়-এগ্রিমেন্টে আসেন। এই চুক্তি বা এগ্রিমেন্ট অনুসারে দ’পক্ষ কিছু প্রশাসনিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক সমঝোতায় আসেন। প্রশাসনিক বিষয়ে তা হলো যারা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছে, শুধু তারাই প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োজিত থাকতে পারবে। বাকীদের চাকুরীচ্যুত করা হবে এবং সেই শূন্য জায়গা পূরণ করবে ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। স্বাধীনতার পর বেশ কিছু ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাংলাদেশে এসেও গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু (শেখ মুজিব) এসে তাদেরকে বের করে দেন।

    সামরিক সমঝোতা হলো ঃ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে অবস্থাস করবে (কতদিন অবস্থান করবে তার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ন)। ১৯৭২ সালের সভেম্বর থেকে আরম্ভ করে প্রতিবছর এ সম্পর্কে পুনরীক্ষণের জন্য দু'দেশের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশের নিজস্ব সেনাবাহিনী থাকবে না।
    আভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য মুক্তিবাহিনীকে কেন্দ্র করে একটি প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা হবে। এই লিখিত সমঝোতাই রক্ষীবাহিনীর উৎস।
    আর ভারত পাকিস্তান সর্বাত্মক যুদ্ধবিষয়ক সমঝোতাটি হলো ঃ সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে অধিনায়কত্ব দেবেন ভারতীয় সেনাবহিনী প্রধান। মুুক্তিবাহিনীর সর্বাধিকনায়ক নন। এবং যুদ্ধচলাকালীন সময়ে মুক্তিবাহিনী ভারতীয় বাহিনীর অধিনায়কত্বে থাকবে।
    চুক্তির এই অসুচ্ছেদটির কথা মুক্তিবাহিনী সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমারীকে জানানো হলে তীব্র ক্ষোভে দিনি ফেটে পড়েন। এর প্রতিবাদে রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থি থাকেন না।
    ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে কোলকাতা সফরে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ কতাবার্তার মাঝে প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে বলেনঃ ‘আমার দেশ থেকে সেনাবাহিনী ফিরিয়ে ব্সরত হরব।’ শেখ মুজিব এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এত সহজভাবে তুলতে পারেন, ভাবতেও পারেননি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। তার এই অপ্রস্তুত অবস্থার সুযোগ নিয়ে শেখ মুজিব নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর আদেশই যধেষ্ট।’ অস্বস্তিকর অবস্থা পাশ কাটাতে মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে রাজি হতে হয় এবং জেনারেল মানেকশকে বাংলাধেম থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের নিদক্ষণ নির্ধারণের নির্দেশ দেন।
    বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে যে চুক্তি হয়, সেটা খোলা বাজার (ওপেন মার্কেট) ভিত্তিক। খোলা বাজার ভিত্তিতে চলবে দু'দেশের বাণিজ্য। তবে বাণিজ্যের পরিমাণের হিসাব-নিকাশ হবে রছরওয়ারী এবং যারা যা প্রাপ্য, সেটা ষ্টার্লিং-এর পরিশোধ করা হবে।
    স্বাধীনতার পর পরই চুক্তি অনুসারে খোলা বাজারভিত্তিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। দু'দেশের সীমান্তের তিন মাইল খুলে দেয়া হয়। শেখ মুজিব এটা বন্ধ করে দেন।
    বৈদেশিক বিষয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার যে চুক্তিতে আসেন-সেটা হলঃ বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রশ্নে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে এবং যতদূর পারে ভারত এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সহায়তা দেবে।
    মূলতঃ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করবে ভারত।
    এই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। চুক্তি স্বাক্ষরের পর মুহূর্তেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
    ভারত সরকারের সঙ্গে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গৃহীত এই পুরো ব্যবস্থাকেই অগ্রাহ্য করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ কারনে আমি বিনা দ্বিধায় বলতে পারি যে, ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১-এ বাংলাদেশ পাকিস্তান সৈন্যমুক্ত হয় মাত্র। কিন্তু স্বাধীন-সার্বভৌম হয় ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারীতে। যেদিন শেক মুজিব পাকিস্তান জেল থেকে মুক্ত হয়ে ঢাকা আসেন। বস্তুতঃ শেখ মুজিব ছিলেন প্রকৃত সাহসী এবং খাঁটি জাতীয়তাবাদী।

(স্বাক্ষর)
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী
২৭ ডিসেম্বর ১৯৮৯”

পরবর্তীকালে এই সাতটি চুক্তি স্বল্প-পরিমার্জিতরূপে ১৯৭২ সালের ১৯শে মার্চ ঢাকার বুকে বংগভবনে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত ২৫ সালা “বন্ধুত্ব সহযোগীতা ও শান্তি চুক্তি’ তে মহাসমারোহে সন্নিবেশিত করা হয়। বাংলা জাতীয় লীগ ইহাকে ‘দাসত্ব দুক্তি’ বলিয়া আখ্যায়িত করে। উপরোক্ত দেশীয় স্বার্থ বিরোধী ও স্বাজাতিদ্রোহী নীতি অবলম্বন ও অবাধ লটতরাজ প্রতিরোধে অনীহা প্রদর্শন একমাত্র সাক্ষীগোপাল সরকারের পক্ষেই সম্ভব। দেশীয় স্বার্থ ও দেশীয় সম্পদকে বন্ধু রাষ্ট্রের ছোবল হইতে সংরক্ষণে চরম ব্যর্থতার সন্তোষজনক কোন জওয়াব তাজউদ্দিন আহমদ কিংবা শেখ মুজিবর রহমানের ক’ট-তর্ক ভাণ্ডারে ছিল কি?
    ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত হইতে বিশ মাইলের মধ্যে অবস্থিত এলাকায় অবাধ বাণিজ্য প্রচলনেরন মানসে ২৭শে মার্চ (১৯৭২) সীমান্ত অবাধ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন মুজিব সরকারের ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায়। এই চুক্তি কি সর্বনাশই না সাধন করিয়াছে জাতীয় অর্থনীতিতে। আরো ন্যাক্কারজনক অধ্যায় সংযোজিত হয় শেখ মুজিবুর রহমান যখন ১৯৭৪ সালের ১৬ই মে দিল্লী শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বেরুবাড়ী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পদযুগলে নৈবদ্য হিসাবে অর্পন করেন। ইহার প্রতিবাধে যখন গন-আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছিলাম সেই সময়ে ১৯৭৪ সালের ৩০শে জুন মুজিব সরকার আমাকে কারারুদ্ধ করে। মুজিবের অভিশপ্ত ও সর্বনাশা নেতৃত্ব হইতে বাংলাদেশ মুক্তি পায় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট। এই দিন বাংলাদেশের ইতিহাসে সংযোজিত হয় এক নবতর অধ্যায়। এই নবতর অধ্যায় সৃষ্টিকারী ১৫ই আগষ্টের প্রকৃত নায়ক কর্ণেল আবদুর রশীদ ও লেঃ কঃ ফারুকের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকিবে। এই ১৫ই আগষ্টের সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হন শেখ মুজিব এবং ওই দিনই রেডিও এবং টেলিভিশন হইতে নব-নিযুক্ত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদ বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে গোটা জাতির পক্ষ হইতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বুলুন্দ আওয়াজ উচ্চারণ করেন। গোটা দেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচে। নূতন করিয়া শুরু হয় নবতর পথযাত্রা।

    ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার প্রসঙ্গে.জে. এন. দীক্ষিতের সাফাই
    ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জে, এন, দীক্ষিত ৪-৭-৯৫ ইং

      INDIAN EXPRESS পত্রিকায় তার লিখিত নিবন্ধে প্রকাশ করেন যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন যে ভারতীয় সেনাবাহিনী যেস অন্ততঃ এক বৎসর বাংলাদেশে অবস্থান করে কিন্তু ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার আশংকায় উপরোক্ত প্রস্তাব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর পূর্বঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেঃ জেনারেল জগজিৎসিংহ অরোরা এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে নিখিল চক্রবর্তীর এক প্রশ্নোত্তরে বলেন, “ভারতীয় বাহিনীর ইষ্টার্ণ হেডকোয়ার্টার ছিল কলিকাতায়। ঢাকা অভিমুখে মার্চ্চ করার আগে আমরা ঢাকায় কতদিন থাকব সেটা নিয়ে ভাবলাম। আমি ঢাকায় আমাদের অবস্থানের সময়সীমা নির্দ্ধারণ করেছিলাম তিন মাস। আমরা ঢাকায় তিন মাস থাকব। এটা এই জন্য ঠিক করেছিলাম যে যদি আমরা এর বেশী থাকি আমরা আর লিবারেশন আর্মি হিসাবে অভিনন্দিত না হয়ে অকপেশন আর্মি (দখলদার বাহিনী) হিসাবে চিহ্নত হব। তাই আমরা ৩ মাসের বেশী থাকিনি।” (দৈনিক ইনকিলাব-১২-৩-৯৪ ইং) উপরোক্ত উক্তিগুলিই প্রমাণ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের দাবী সত্য নহে। অথচ এটি নিছক ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিজেদের এবং সৈয়দ নজরুল ও তাজউদ্দিন গংদের সাফাই ছাড়া অন্য কিছু নয়।

    যুদ্ধোত্তর পাকিস্তান
    যুদ্ধ চলাকালে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান জনাব নূরুল আমিনকে প্রধানমন্ত্রী ও জুলফিকার আলী ভুট্টোকে উপ-প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। ১৬ই ডিসেম্বরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অংগচ্ছেদের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২০শে ডিসেম্বর (১৯৭১) পাকিস্তান জাতীয় পরিসদে স্যংখাগুরু সদস্যবৃন্দের নির্বাচিত সংসদীয় নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর হস্তে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার অর্পন করেন। প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন পশ্চিম পাকিস্তানেই ইন্তেকাল করেন এবং করাচীতে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সমাধি পার্শ্বেই তাঁহাকে সমাধিস্থ করা হয়। জনাব নূরুল আমিনের পক্ষে ইহা পরম সৌভাগ্যের বিষয় যে, কায়েদে আযমের পার্শ্বেই তিনি অন্তিম শয্যায় শায়িত আছেন।
    ক্ষমতা হস্তান্তরকালে জেনারেল ইয়াহিয়া বন্দী শেখ মুজবুর রহমানকে ফাঁসী দেয়ার পরামর্শ দেয়। উত্তরে ক্ষমতাগ্রহণকারী জুলফিকার আলী ভুট্টোর উক্তি প্রণিধানযোগ্য If I kill Mujib, not a single West Pakistani will ever come home অর্থাৎ “আমি মুজিবকে হত্যা করিলে একজন পশ্চিম পাকিস্তানী আর দেশে আসিতে পারিবে না। ” ৯৩০০০ যুদ্ধবন্দী ও কয়েক হাজার পাকিস্তানী বেসামরিক কর্মচারীবৃন্দ বাংলাদেশে আটক। Partition & After Math-Memoirs of an Ambasador by kewal singh I.C.S.-Foreign secretary-Govt. of India. জনাব জুলফিকার আলী ভূট্টো প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণের কিয়ৎ কালের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগার হইতে মুক্তি দিয়া এক গৃহে অন্তরীণ করেন এবং ৩রা জানুয়ারী করাচীতে অনুষ্ঠিত জনসভায় দেয় ভাষণ অনুসারে ৮ই জানুয়ারী (১৯৭২) শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিদান করিয়া বাংলাদেশে প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। বিষয়টি নিঃসন্দেহে জনাব ভুট্টোর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সাক্ষ্য বহন করে। ১৯৭১ সালের ১১ই আগষ্ট নাকি গোপন সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। মুক্তির পর শেখ মুজিবুর রহমান ৮ই জানুয়ারী (১৯৭২) অপরাহ্ন ১২টা ৩৫মিঃ লণ্ডন বিমান বন্দরে অবতরণ করেন। তথায় একদিন অবস্থানের পর ১০ই জানুয়ারী বৃটিশ সরকার প্রদত্ত রাজকীয় বিমান বাহিনীর ‘কমেট’ বিমানযোগে ঢাকার পথে ভারত সরকার কর্তৃক দিল্লীতে আয়োজিত সম্বর্ধনা উপলক্ষে শেখ মুজিব সকাল ৮-৩০ মিনিটে কয়েত ঘন্টার জন্য পালাম বিমান বন্দরে অবতরণ করেন। ভারতীয় প্রেসিডেন্ট ভি, ভি, গিরি ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহিত মত-বিনিময় ও দিল্লী সম্বর্ধনা সমাপনের পর অপরাহ্ন ১টা ৪২ মিনিটে বৃটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট বিমানেই শেখ মুজিব ঢাকা বিসান সবন্দরে অবতরণ করেন। নেতার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ও শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ প্রাণঢালা সম্বর্ধনা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে ঢাকা বিমান বন্দর হইতে ঢাকা রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত দীর্ঘপথ লোকে লোকারণ্য হয়। তেজগাঁ বিমান বন্দর হইতে ঢাকা রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত ৪ মাইল পথ ট্রাকযোগে অতিক্রম করিতে ২ ঘন্টারও অধিক সময় লাগে। স্বচক্ষে অবলোকন না করিলে জনগণের এই স্বতঃস্ফ’র্ত অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালবাসার গভীরতা অনুধাবন করা অসম্ভব। এই দৃশ্য অভূতপূর্ব; ছিল আবেগপ্রসূত; এই দৃশ্য অবিস্মরণীয় এবং ঐতিহাসিক।
    সেইদিন তাঁর সম্মানে রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত সংবর্ধনা সম্ভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে তিনি বলেন যে, “আমি একজন মুসলমান। মৃত্যু আমার একবারই হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ...।” তাঁর সেদিনের সেই সাহসী ও সময়োপযোগী সুস্পষ্ট উচ্চারণ বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তিতে মজবুত করতে নতুন মাত্রা যোগ করে।

    প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ মুজিব
    ১১ই জানুয়ারী (১৯৭২) টেলিফোন বাজিয়া উঠিল। রিসিভার তুলিয়া একটি অতি পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম। কন্ঠস্বরটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের। কলেজ জীবন হইতে বন্ধুত্ব; কিন্তু কলিকাতায় প্রকাসী অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আমাদের মত ভিন্ন দলীয় জাতীয়তাবাদীদের সহিত শোভনীয় আচরণ প্রদর্শন করেন নাই। যাহা হউক, টেলিফোনে তাজউদ্দিন কুশলাদি জিজ্ঞাসার পর আমাকে বলেন, শেখ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন করিবার সিদ্ধান্ত লইয়াছি ও প্রস্তাবও করিয়াছি। কারণ তিনি যে কোন পদেই বহাল থকিুন না কেন, তাঁহার ইচ্ছা-অনিচ্ছাতেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালিত হইবে। শেখ সাহেবের মানসিক গড়ন তুমিও জান; আমিও জানি। তিনি সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রনে অভ্যস্থ। অতএব ক্ষণিকের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য পার্লামেন্টারী কেবিনেট পদ্ধতির প্রশাসন প্রহসনে পরিণত হইবে। তিনি প্রেসিডেন্ট পদে আসীন থাকিলে নিয়মতান্ত্রিক নাম-মাত্র দায়িত্ব পালন না করিয়া মনের অজান্তে কার্যতঃ ইহাকে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির প্রশাসন পরিণত করিবেন। এইদিকে প্রেসিডেন্ট পদে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে নির্বাচনের কথা ভাবিতেছি। তোমার মত কি?
    তদুত্তরে তাঁহাকে বলি “তোমার সিদ্ধান্ত সঠিক। নামমাত্র প্রেসিডেন্টের ভূমিকা পালন শেথ সাহেবের শুধু চরিত্র বিরুদ্ধ হইবে না; বরং উহা হইবে অভিনয় বিশেষ। কেননা, ক্ষমতার লোভ তাঁহার সহজাত।” তাজউদ্দিন অপর প্রান্তে সশব্দে হাসিয়া উঠিলেন। বলিলেন, “আমি জানিতাম, মৌলিক প্রশ্নে তোমার আমার মধ্যে মতভেদ হইবে না।”।
    ১২ই জানুয়ারীর এক ঘোষণায় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে গণপ্রহাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করিলেন বটে; কিন্তু উত্তরকালে ঘটনা প্রবাহে বন্ধুবর তাজউদ্দিনের সদিচ্ছার শেষ রক্ষা হইল না।
    ভারত-বাংলা দাসত্ব চুক্তি
    প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানের আমন্ত্রণক্রমে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৭ই মার্চ (১৯৭২) ঢাকা সফরে আসেন। লক্ষ লক্ষ জনতা তাঁহার আন্তরিক অভ্যর্থনা জানায়। ১৯শে মার্চ উভয় প্রধানমন্ত্রী যুক্ত ইশ্তেহার প্রকাশ করেন ও ২৫ বৎসর মেয়াদী “বন্ধুত্ব, সহযোগীতা ও শান্তি চুক্তি” স্বাক্ষর করেন। আমাদের বাংলা জাতীয় লীগের দৃষ্টিতে চুক্তিটি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব খর্বকারী সামরিক চুক্তি অন্য কথায় দাসত্ব চুক্তি ছাড়া কিছুই ছিল না। ১৯৫৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান অনুরূপ পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করিয়াছিল। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সে সময়ে এই পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে। কিন্তু ক্ষমাতায় অধিষ্ঠিত হইবার পর সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান খান, মানিক মিয়া (সম্পাদক ইত্তেফাক) প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতা পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির গোঁড়া সমর্থকে পরিণত হন। সেই শেখ মুজিবুর রহমানই পুনরায় ক্ষমতার মোহে ভারতের সহিত ২৫ সালা দাসত্ব চুক্তি তথা সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করিলেন। লক্ষণীয় যে, পুনঃ পুনঃ অভিযোগ সত্ত্বেও মুজিব-তাজউদ্দিন ভারতের সহিত গোপন জুক্তি অস্বীকার করিতেন, ঠিক যেমন পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির সর্বনাশা গোপন ধারাগুলি পাক-সরকার প্রকাশ্যে উচ্চকণ্ঠে পুরঃপুরঃ অস্বীকার করিতেন।

Treaty of Friendship, Co-operation and Peace

between the People's Republic of Bangaldesh

and the Republic of India

 

Inspired by common ideals of peace, secularism, democracy, socialism and nationalism.

Having struggled together for the realisation of these ideals and cemented ties of friendship through blood and sacrifices which led to the triumphant emergence of a free, sovereign and independent Bangladesh,

Determined to maintain frateral and good neighbourly relations and transform their border into a border of eternal peace and friendship,

Adhering firmly to the basic tenets of non-alignment, peaceful co-existence, mutual co-operation, non-interference in intemal affairs and respect for territorial integrity and sovereignty,

Determined to safeguard peace, stability and security and to promote progress of their respective countries through all possible avenues of mutual co-operations,

Determined further to expand and strengthen the existing relations of friendship between them,

Convinced that the further development of friendship and co-operation meets the national interests of both States as well as the interests of lasting peace in Asia and the world.

Resolved to contribute to strengthening world peace and security and to make efforts to bring about a relaxation of International tension and the final elemination of vestiges of colonialism, recialism and imperialism,

Convinced that in the present-day world international problems can be solved only through co-operation and not through conflict or confronation,

Reaffirming their detennination to follow the aims and principles of the United Nations Charter,

The people's Republic of Bangladesh, on the one hand, and the Republic of India, on the other, have decided to conclude the present Treaty,

Article : 1

The High Contracting Parties, inspired by the ideals for which their respective peoples struggled and made sacrifices together, solemnly declare that there shall be lasting peace and friendship between their two countries and their peoples. Each side shall respect the independence, sovereignty and territorial integrity of the other and refrain form interfering in the intemal affairs of the other side.

The High Contracting parties shall further develop and strengthen the relations of friendship, good—neighbourliness and all-round co-operation existing between them, on the basis of the above-mentioned principlies as well as the principles of equality and mutual benefit.

Article : 2

Being guided by their devotion to the principle of equality of all peoples and states, irrespective of race or creed, the High Contracting parties condemn colonialism and recialism in all their forms and manifestations and reaffirm their determination to strive for their final and complete elemination.

The High Contracting parties shall co-operate with other states in achieving these aims and support the just aspirations of peoples in their struggle against colonialism and racial discrimination and for their national liberation.

Article : 3

The High Contracting parties reaffirm their faith in the policy of non-alignment and peaceful co-existence, as important factors for easing tension in the world, maintaining international peace and security and strengthening national sovereignty and independence.

Article : 4

The High Contracting Parties shall maintain regular contacts with each other on major international problems affecting the interests of both States, through meetings and exchanges of views of at all levels.

Article : 5

The High Contracting Parties shall continue to strengthen and widen their mutually advantageous and all-round co-operation in the economic, scientific and technical fields. The two countries shall develop mutual co-operation in the fields of trade, transport and communications between them on the basis of the principles of equality, mutual benefit and the most favoured nation principle.

Article : 6

The High Contracting Parties further agree to make joint studiesand take joint action in the fields of flood control, river basin development and the development of hydro-electric power and irrigation.

Article : 7

The High Contracting parties shall promote relations in the fields of art, literature, education, culture, sports and health.

Article : 8

In accordance with the ties of friendship existing between the two countries each of the High Contracting Parties solemnly declares that it shall not enter into or participate in any military alliance directed against the other party.

Each of the High Contracting Parties shall refrain from any aggression against the other Party and shall not allow the use of its territory for committing any act that may cause millitary damage to or constitute a threat to the security of the other High Contracting Party.

Article : 9

Each of the High Contracting Parties shall refrain from giving any assistance to any third party taking part in an armed conflict against the other party. In case either Party is attacked or threatened with attack, the High Contracting Parties shall immediately enter into mutual consultations in order to take appropriate effective measures to eleminate the threat and thus ensure the peace and security of their countries.

Article : 10

Each ofthe High Contracting Paities solemnly declares that it shall not ttndettake any commitment. secret of open, toward one or more states which may be incompatible with the present Treaty.

Article : 11

The present Treaty in signed for a term of twenty-tive years, and shall be subject of renewal by mutual agreement of the High Contracting Parties.

The Treaty shall come into force with immediate effect from the date of its signature.

Article : 12

Any differences in interpreting any article or articles of the present Treaty that may arise between the High Contracting Parties shall be setled on a bilateral basis by peaceful means in a spirit of mutual respect and understanding.

Done in Dhaka on the Nineteenth Day of March, Nineteen Hundred and Seventy two.

(Sheikh Mujibur Rahman)

Prime Miniscr

For the People`s Republic of Bangladesh

(Indira Gandhi)

Prime Minister

For the Republic of india.

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ও ভারতীয় সাধারণতন্ত্রের মধ্যে মৈত্রী সহযোগীতা ও শান্তি চুক্তি
    শান্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের একই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে,
এই আদর্শের বাস্তবায়নের জন্য একযোগে সংগ্রাম এবং রক্তদান ও আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে বন্ধুত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করার ফলশ্রুতি হিসেবে মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের বিজয় অভ্যুদয় ঘটিয়ে,
    সৌভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও সৎপ্রতিবেশীসূলভ সম্পর্ক রক্ষায় এবং উভয় রাষ্ট্রের সীমান্তকে চিরস্থায়ী শানিত ও বন্ধুত্বের সীমান্ত হিসেবে রুপান্তরিত করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে, নিরপেক্ষতা, শান্তিপূর্ণ সগ অবস্থান, পারস্পরিক সহযোগীতা, অপরের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা, আঞ্চলিক অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে সম্মান প্রদর্শনের মূলনীতিসমূহের প্রতি দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল থেকে,
    শান্তি স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা রক্ষার দৃঢ় সংকল্প এবং সম্ভাব্য সকল প্রকারের পারস্পরিক সহযোগীতার মাধ্যমে স্ব-স্ব দেশের অগ্রগতি সাধনের জন্য,
    উভয় দেশের মধ্যে বর্তমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো সম্প্রসারণ ও জোরদার করার জন্য দৃঢ় সংকল্প হয়ে,
    এশিয়া তথা সমগ্র বিশ্বের স্থায়ী শান্তির স্বার্থে এবং উভয় রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের খাতিরে বন্ধুত্ব ও পারস্পারিক সহযোগীকা আরো সম্প্রসারণের ব্যাপারে স্থিরবিশ্বাসী হয়ে,
    বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা প্রশমন এবং উপনিবেশবাদ, বর্ণবৈষম্য ও সাম্রাজ্যবাদেরে অবশেষসমূহ চূড়ান্তভাবে নির্মল করার জন্য প্রচেষ্টা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে,
    আজকের বিশ্বে আন্তর্জাতিক সমস্যাসমূহের সমাধান শুধুমাত্র সহযোগীতার মাধ্যমে সম্ভব, বৈরীনীতি বা সংঘাতের মাধ্যমে নয়- এ ব্যাপারে স্থিরনিশ্চত হয়ে,
    জাতিসংঘ সনদের নীতিমালা ও লক্ষ্যসমূহ অনুমরণের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা পুনরুল্লেখ করে এক পক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অন্য পক্ষে ভারতীয় সাধারণতন্ত্র বর্তমান চুক্তি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
    
    অনুচ্ছেদঃ এক
    চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয়পক্ষ, স্ব স্ব দেশের জনগণ যে আদর্শের জন্য একযোগে সংগ্রাম এবং ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মর্যাদার সঙ্গে ঘোষণা করছে যে, উভয় দেশ ও সেখানকার জনগণের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও বন্ধুত্ব বজায় থাকবে। একে অন্যের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখন্ডত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং অপরের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে। চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষ উপরে উল্লেখিত নীতিমালার ভিত্তিতে এবং সমতা ও পারস্পারিক লাভজনক নীতিসমূহের ভিত্তিতে উভয় দেশের মধ্যকার বর্তমান বন্ধুত্বপূর্ণ সুপ্রতিবেশীসূলভ ও সার্বিক সহযোগীতার সম্পর্কের আরো উন্নয়ন ও জোরদার করবে।

    অনুচ্ছেদঃ দুই
    জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি সমতার নীতিতে আস্থাশীল থাকার আদর্শে পরিচালিত হয়েই চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষ সর্বপ্রকারের ও ধরণের উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্যবাদের নিন্দা করছে এবং তাকে চূড়ান্তভাবে ও সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার জন্য প্রচেষ্টা চালানোর ব্যাপারে তাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞার কথা পুনরুল্লেখ করছে।
    চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষ উপরোক্ত অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সহযোগীতা করবে এবং উপনিবেশবাদ ও বর্ণষৈম্য বিরোধী সংগ্রাম জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে জনগণের ন্যায়সংগত আশা আকাঙ্খার প্রতি সমর্থনদান করবে।

    অনুচ্ছেদঃ তিন
    চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষ বিশ্বে উত্তেজনা প্রশমন, আন্তর্জাতিক শানিত ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা জোরদার করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে জোট নিরপেক্ষতা ও মান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতির প্রতি তাদের আস্থার পুনরুল্লেখ করছে।

    অনুচ্ছেদঃ চার
    উভয় দেশের স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক সমস্যাবলী নিয়ে চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষ সকল স্তরে বৈঠক ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করবে।

    অনুচ্ছেদঃ পাঁচ
    চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষ অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও কারগরী ক্ষেত্রে পারস্পারিক সুবিধাজনক ও সার্বিক সহযোগীতা জোরদার ও সম্প্রসারিত করে যাবে। উভয় দেম সমতা ও পারস্পারিক সুবিধার নীতির ভিত্তিতে এবং সর্বাধিক সুবিধাদানের নীতি অনুযায়ী (Most favoured nation polict) বাণিজ্য, পরিবহন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে পারস্পারিক সহযোগীতা প্রসারিত করবে।

    অনুচ্ছেদঃ ছয়
    বন্যা নিয়ন্ত্রন, নদী অববাহিকার উন্নয়ন এবং জলবিদ্যুৎ শক্তি ও সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে যৌথ সমীক্ষা পরিচালনা ও যৌথ কার্যক্রম গ্রহণে চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।

    অনুচ্ছেদঃ সাত
    চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষ শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য ও খেলাধূলার ক্ষেত্রে সম্পর্ক প্রসারিত করবে।

অনুচ্ছেদঃ আট
    দুইটি দেশের মধ্যকার বর্তমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অনুযায়ী চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষের প্রত্যেকে মর্যাদার সঙ্গে ঘোষণা করছে যে তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোন সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হবে না বা অংশগ্রহণ করবে না।
    চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষ একে অন্যের উপর আক্রমণ থেকে নিবৃত্ত থাকবে এবং তাদের এলাকায় এমন কোন কাজ করতে দেবে না যা চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন কোন পক্ষের সামরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে বা কোন পক্ষের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

    অনুচ্ছেদঃ নয়
    চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষের কোন এক পক্ষের বিরুদ্ধে তৃতীয় পক্ষ সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হলে চুক্তিকারী প্রত্যেকে এতদউল্লেখিত তৃতীয় পক্ষকে যে কোন সাহায্য প্রদানে বিরত থাকবে। এছাড়া যে কোন পক্ষ আক্রান্ত হলে অথবা আক্রান্ত হবার ভীতি দেখা দিলে এই ধরনের ভীতি নিশ্চিহ্ন করবার উদ্দেশ্যে যথাযত সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষ সঙ্গে সঙ্গে পারস্পারিক আলোচনায় মিলিত হয়ে নিজেদের দেশের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং শান্তি স্থাপন সুনিশ্চিত করবে।

    অনুচ্ছেদঃ দশ
    চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষের প্রত্যেকে মর্যাদার সংগে ঘোষণা করছে যে, এই চুক্তির সঙ্গে অসামাঞ্জস্য হতে পারে এ ধরণের গোপন অথবা প্রকাশ্যে এক অথবা একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে কোন প্রকার অঙ্গীকার করবে না।

    অনুচ্ছেদঃ এগারো
    এই চুক্তি পঁচিশ বছরের মেয়াদের জন্য স্বাক্ষরিত হলো এবং চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষের পরস্পারিক সম্মতিতে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এই চুক্তি সহি হবার দিন থেকে কার্যকরী হবে।

    অনুচ্ছেদঃ বারো
    এই চুক্তির কোন একটি অথবা একাধিক অনুচ্ছেদের বাস্তব অর্থ করবার সময় চুক্তিকারী উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন পক্ষদ্বয়ের মধ্যে কোন মত-র্পাক্য দেখা দিলে তা পারস্পারিক শ্রদ্ধা এবং সমঝোতার মনোভাবের উপর ভিত্তি করে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় নিষ্পত্তি করতে হবে।
    ঢাকায় সম্পাদিত। তারিখ উনিশে মার্ছ, ঊনিশ’শ বাহাত্তর সাল।

(শেখ মুজিবুর রহমান)

প্রধানমন্ত্রী
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পক্ষে

(ইন্দিরা গান্ধী)
প্রধানমন্ত্রী
ভারত সাধারণতন্ত্রের পক্ষে।

    ভারত-বাংলাদেশ ‘বন্ধুত্ব, সহযোগীতা ও শান্তি’ চুক্তির প্রকাশ্য ধারাগুলি পাঠ করিলেই পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির ধারাগুলির কথা স্মরণে আসে। তাই ২০শে মার্চ চট্টগ্রাম জিলা জাতীয় লীগ কর্মী সম্মেলনে ও ২২শে মার্চ অপরাহ্নে চট্টগ্রাম জাতীয় লীগ কর্তৃক আহূত লালদীঘি ময়দানে প্রকাশ্য জনসভায় আমি উক্ত চুক্তিতে “দাসত্ব-চুক্তি” বলিয়া অভিহিত করি এবং ইহার বাতিল দাবী করি। ইহার কয়েক দিনের মধ্যেই ২৭শে মার্চ (১৯৭২) ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অবাধ বাণিজ্য চুক্তি নামে আরেকটি অসম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আমাদের আশংকাই সত্য হইল। তাই আমরা বাংলা জাতীয় লীগ দিল্লীর দাসত্ব মোচনের দাবীতে “আজাদ বাংলা” আন্দোলনের ডাক দেই। ভারতীয় শক্তি ও বাংলাদেশ ভারতীয় সেবাদাস মহল আমাদের বিরুদ্ধে নানাপ্রকার অবাঞ্ছিত পন্থা গ্রহণ করে। এমনকি জীবন নাশের হুমকি প্রদর্শন করে; আমাকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ‘আজাদ বাংলা’ আন্দোলন সমগ্র দেশে ব্যাপ্তি লাভ করে। সে সময়ে ভারতের বিরুদ্ধে এবং ভারতের আশ্রিত মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে জনমতকে আশা ও ভাষাদানের পরিণতিতেই সংঘটিত হয় ১৫ই আগষ্টের অভ্যুত্থান, এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই শুরু হয় বাংলাদেশের সত্যিকারের জয়যাত্রা। ফলশ্রুতিতে ২৪শে আগষ্ট (১৯৭৫) আমি কারাগার হইতে মুক্তিলাভ করি। উল্ল্যে যে, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ী ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশে প্রবেশের সংগে সংগে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত একাকার হইয়া যায়। বিনা অনুমতিতে বা বিনা দলিলেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় জনতার পণ্যের স্রোত প্রবাহিত হইতে থাকে। বাংলাদেশ বাস্তবে ভারতের বাজারে পরিণত হয়। বাংলাদেশ হইতে লক্ষ লক্ষ গাইট পাট অবাধে সীমান্ত পারের পাটকলগুলির চাহিদা মিটাইতে আরম্ভ করে। ভারতীয় পাটকলগুলির পূর্ণোদ্যমে দুই-তিন শিফটে কাজ চালু হইয়া যায়। এমনকি বাংলাদেশের পাট-লোপাট করিয়া ভারত নূতন করিয়া বিদেশে কাঁচা পাট রফতানী শুরু করিয়া দেয়। স্মর্তব্য, কাঁচা পাটের অভাবে ইতিপূর্বে ভারতীয় পাটকলগুলি অতিকষ্টে এক শিফটে কাজ করিত এবঙ ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাক-ভারত বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ হইয়া যাওয়ায় ভারত বাধ্যতঃ সিংগাপুরের মাধ্যমে প্রতি বৎসর ১০ হইতে ১৫ লাখ বেল পাকিস্তানী উচ্চমানের পাট চড়ামূল্যে ক্রয় করিতে হইতে। পাক কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-মুখর শেখ মুজিবর রহমান পাট রফতানীর মাধ্যমে উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পাকিস্তানেরই একাংশ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয়ের বিরুদ্ধে আদা-জল খাইয়া সোচ্ছার ছিলেন। অথচ তাঁহারই শাসনামলে ভারত অবাধে বাংলাদেশের পাট লুণ্ঠন করিয়া চলিল।শুধু তাই নয়, বাংলাদেশী কাঁচা পাট রপতানী দ্বারা ভারত নিয়মিতভাবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করিয়া চলিল। অথচ শেখ মুজিব টু শব্দটি উচ্চারণ করিলেন না। উহা কোন্ স্বার্থের বিনিময়ে কিংবা কোন্ বিশেষ কারণে? তিনি কি জ্ঞাত ছিলেন না যে, ভারতের পাটশিল্পজাত পন্য রফতানী প্রসূত অর্জিত বৈদেশিক মুত্রা আয়ের মাত্র ১৫% হইতে ১৭%; কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি কাঁচাপাট ও পাটশিল্পজাত পণ্য রফতানী  আয়ের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল? কি মাহেন্দ্রক্ষণেই না বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, আর কি মাহেন্দ্রক্ষণেই না ভারত অবাধ সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য যে, এই সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তি ছাড়পত্র বলেই বাংলাদেশের (ক) বিদেশ হইতে সাহায্যপ্রাপ্ত পণ্যদ্রব্য (খ) ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপান হইতে উন্নতমানের আমদানীকৃত পণ্যদ্রব্য (গ) বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্যদ্রব্য ও আমদানীকৃত চাউল ও অন্যান্য সামগ্রী (ঘ) বাংলাদেশের প্রটিন সমৃদ্ধ ডিম, নদীনালার মাছ, জমির শাক-সব্জি, তরি-তরকারী, গৃহপালিত হাঁস-মোরগ, গরু, বকরি (ঙ) সোনা-রূপা, তামা, ছোট খাট কল-কারখানা, যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ সীমান্তের অপর পার ভারতে অবাধে পাচার হইতে থাকে। অপরপক্ষে একই পথে ভারত হইতে আসিতে থাকে তামাক, মসলা প্রভৃতি অনাবশ্যক পণ্য। শুধু তাই নয়, একইভাবে বাংলাদেশ ক্রমে ক্রমে ভারতীয় শিল্পজাত পণ্য দ্রব্যের বাজারে পরিণত হয়। আর ইহারই পরিণতিতে সম্পদে ক্রম-নিঃস্ব বাংলাদেশ অবশ্যম্ভাবী ভাবেই নিপতিত হয় মারাত্মক ত্র“দ্রাস্ফীতির কবলে।
    একদিকে মওলানা ভাসানীর সোচ্চার কণ্ঠ এবং অন্যদিকে আমাদের বাংলা জাতীয় লীগের আন্দোলনের ফলে সমগ্র বাংলাদেশ ক্রমশঃ অবাধ বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হইয়া উঠে। মুজিব সরকার পরিশেষে জনমতের চাপে পড়িয়াই ১৯৭৩ সালে অবাধ সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত রাখিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ইতিমধ্যে কালো টাকায় পরিচালিত সীমান্ত বাণিজ্য সংঘবদ্ধ চোরাচালানের রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে; সর্বনাশা দুর্নীতি অনুপ্রবেশ করিয়াছে জাতীয় জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আর চরিত্রহীনতা জীবনের ও জীবন যাপনের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হইয়া পড়িয়াছিল। সীমান্তে অবাধ চোরাচালানের সমালোচনার জওয়াবে বাংলাদেশ রাইফেলস প্রধান বিগ্রেডিয়ার চিত্তরঞ্জন দত্ত অকস্মাত বেসামাল উক্তি করেন যে, “সীমান্ত চোরাচালান সম্পূর্ণ বন্ধ (ফবধফ ংঃড়ঢ়) হইয়াছে এবং ভারত-বিরোধীরাই চোরাচালান সম্পর্কে মিথ্যা প্রচারণা করিতেছে।” যদিও বিগ্রেডিয়ার চিত্তরঞ্জনের অন্যায় মন্তব্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্রিকা সীমান্ত চোরাচালানের উপর তথ্যমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে; ইত্তেফাকের কলামিষ্ট লুব্ধক-তাঁহার ‘স্থান-কাল-পাত্র’ কলামে বিগ্রেডিয়ার চিত্তরঞ্জনকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ প্রদাস করিয়াছেন এবং এমনকি আওয়ামী লীগের কোন কোন নংনদ সদস্যও অবিচ্ছিন্ন চোরাচালানের বিরুদ্ধে সরব কণ্ঠে নিন্দামুখর হইয়া উঠিয়াছিলেন তথাপি বিগ্রেডিয়ার চিত্তের বিরুদ্ধে দিল্লীশ্বরের ভয়ে মুজিব সরকার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নাই।
    এইদিকে ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ মিল, ফ্যাক্টরী, কল-কারখানাগুলি রাষ্ট্রায়ত্ত ঘোষণা করা হয়। দলীয় ও অযোগ্য পরিথ্যক্ত মিল-কারখানাগুলির প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। সুযোগ পাইয়া নগণ্য সংখ্যক ব্যতিক্রম ব্যতীত সাধারণ শ্রমিক নেতি ও মাতব্বর ধরণের শ্রমিক ও মিল কারখানার প্রশাসকবৃন্দ লুটপাটের অবাধ রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সর্বত্র আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি, সরকারে অমার্জনীয় মৌর সম্মতি, ক্ষেত্র বিশেষে আওয়ামী লীগারদের সহযোগীতা এবং অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রশাসকদিগকে দালাল আইনে ভীতি প্রদর্শন এভং সর্বোপরি প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা ইত্যাকার বহু কারণেই সামগ্রিক উৎপাদন ধসিয়া পড়ে। এককথায় দেশ তীব্র বেগে ধাবিত হইতে থাকে মরহুম ডঃ মাজহারুল হকের ভাষায় “রসাতলের পানে।”

    জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু ঐতিহাসিক কার্যত্রমঃ
    ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী মুজিব ভাই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই জাতীয় স্বার্থে কতিপয় যুগান্তকারী কার্যক্রম গ্রহণ করেন যেমন-

    ভারতের সাথে প্রবাসী সরকারের গোপন বাণিজ্যিক সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী স্বাধীনতার পর পরই খোলা বাজার ভিত্তিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। দু'দেশের সীমান্তের ৩ মাইল খুলে দেয়া হয়। শেখ মুজিব তা বন্ধ করে দেন।
    প্রশাসনিক গোপন সমঝোতা অনুযায়ী যশোহর, কুষ্টিয়া ও পাবনা ইত্যাদি জেলায় ভারতীয় কিছু কর্মকর্তা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে এসে পৌঁছেছিলেনও অন্যান্য স্থানেও বাসার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু মুজিব ভাই তাদের ফেরত পাঠালেন এবং অন্যদের আসা বন্ধ করলেন। দেশীয় অফিসার যাহারা ভারতে যেতে পারেননি বা যাননি এবং যাহারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তাহাদের সকলকে বহাল রেখেই প্রশাসন চালানোর নির্দেম দিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের এই সিদ্ধান্ত ছিল যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক। তিনি যদি সেদিন এই সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না করতেন তাহলে আমাদের যে সেমস্ত অফিসার ’৭১ এ ভারতে যাননি তারা সবাই ডিসমিস হতেন। বাঙ্গালী মুসলমানদের শতকরা ৯৫ ভাগ চাকুরী হারাতেন। শূন্যস্থান পূরণ করতো ভারতীয় অফিসাররা। তারাই আমাদের প্রশাসনের নিয়ন্ত হতো ফলশ্র“তিতে আমাদের স্বাধীনতার অস্তিত্ব কতটুকু থাকতো তা সহজেই অনুমেয়। তবে আমাদের সামরিক বেসামরিক প্রশাসনের যাহারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণেরজন্য ভারতে গিয়েছিলেন ইতিমধ্যে তাহাদের চাকুরীতে ২ বৎসরের জেষ্ঠতা প্রদান করা হয়। যা ছিল ঘোরতর অন্যায়। কেননা যাহারা পাকবাহিনীর প্রশাসন ছেড়ে দেশ ছেড়েছিলেন তাহারা তাহারা বিবেকের তাড়নাই তাহা করেছিলেন। দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতেই তাহা করেছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সর্বোচ্চ ত্যাগের আদর্শের ৃমহিমায় তাহারা মুক্তি সংগ্রামের রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কোন পুরস্কার, কোন বিনিময় কিংবা প্রাপ্তির জন্য নয়। এই ত্যাগরে মহিমাকে কোন কিছুর বিনিময়ে ছোট করা অন্যায় ও অনৈতিক। অথচ ২ বৎসর সিনিয়রিটির নামে এটি করে ত্যাগের মহিমায় ভাস্কর ভবিষ্যৎ ইতিহাসে ওই প্রাপ্তি নিজের কাছেই নিজেকেই ছোট করে দেয়। আর এই কাজটি করেছে দিল্লীশ্বরী ইন্দিরা গান্ধীর বংশবদ বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ। ফলে দেশে কোন আদর্শ বা চরিত্র নাই, লোভের হুতাশনে আজ দেশের শিক্ষা, প্রশাসন, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি লণ্ডভণ্ড।
    স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দেয় বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্যের অবস্থান। শেখ মুজিব ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। ১০ই জানুয়ারী দেশে ফেরার প্রাক্কালে লণ্ডন হয়ে দিল্লীর পালাম বিমান বন্দরে অবতরণের পর দিল্লীতে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহিত মতবিনিময়ের এক পর্যায়ে দেশী-বিদেশী সংবাদিকদের উপস্থিতিতে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে দেশ হতে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের সময় জানতে চান এবং অনতিবিলম্বে সৈন্য প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। এতে ইন্দিরা গান্ধী কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও সময় মতো প্রত্যাহার করা হবে বলে তাঁকে আশ্বস্ত করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারী মাসে কোলকাতা সফরে গিয়ে শেখ মুজিব ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আলোচনাকালে দেশ হতে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যাপারে পীড়াপিড়ি করে ইন্দিরা গান্ধী কর্তৃক জেনারেল মানেক’শকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারে দিনক্ষণ ঠিক করতে নির্দেশ দিলেন তার বাংলাদেশ সফরের পূর্বেই যেনো সেনা প্রত্যাহারের কাজ শুরু করা হয়। সে মতো ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারের কাজ শুরু হয়। ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য এক ঐতিহাসিক ঘটনা এবং এটা শেখ মুজিবের মতো দৃঢ়চেতা সাহসী নেতার জন্যই সম্ভব হয়েছে। এজন্য জাতি তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
    পাক সেনাবাহিনীর ৯৩,০০০ যুদ্ধবন্দী সেনা সদস্যের পাকিস্তানে ফেরত নিতে ভারতের সাথে পাকিস্তানের আলোচনার সময় শেখ মুজিব এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অপরাধে বিচার দাবি করেন। এবং বাংলাদেশের সম্মতি ছাড়া তাদের পাকিস্তান ফেরত পাঠানোর বিরোধিতা করেন। পাকিস্তান দাবি করে যে তাহারা ভারতীয় কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে বাংলাদেশ কমান্ডের কাছে নয়। প্রশ্নোত্তরে শেখ মুজিব বললেন ভারতীয় কমান্ড নয় যৌথ কমান্ডের কাছে।
    এদিকে ১৯৭২ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদের ব্যাপারে গণচীন তার ভোটে ক্ষমতা প্রয়োগ করে ফলে বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ লাভ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে শিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
    শেখ মুজিব ’৭৩ সালের অক্টোবর জাপান সফরে যান। সেখানে তিনি চীন সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, ‘চীর মাহান দেশ। চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক সুদীর্ঘকালের তাদের কাছে সৌভ্রাতৃত্ব আর সৌহার্দ্যমূলক আচরণই আমরা আশা করবো। কিন্তু বাংলাদেশকে কেউ দাবায়ে রাখতে চাইলে আমরা মাথা নত করবো না।’ এই সময় চীনের সাথে আমাদের সম্পর্কোন্নয়ন অতীব জরুরী ছিল এবং দক্ষ ও সুদূর প্রসারী দুরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের মাধ্যমেই তা সম্ভব ছিল।
    ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানে ইসলামী সম্মেলন। বাংলাদেশকে এতে অংশগ্রহণ করানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানে নিতে আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুরারী বুমেদীন তাঁর নিজস্ব বিমান ঢাকা পাঠিয়ে দিলেন। সকলেই দ্বিধান্বিত। তখনও পর্যন্ত পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় নাই। তাজউদ্দিন গং পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য ইসলামী সম্মেলনে শেখ মুজিবের যোগদানে সম্মত নয়। সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী ভারতের সাথেও কথা বলতে হয়। তাই শেখ মুজিবকে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আলোচনা করে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বললে- শেখ মুজিব রাগান্বিত হয়ে তাজউদ্দিনকে বললেন, “আমি কাহারো বংশবদ নই, আমার দেশের সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হবে। আমি ইসরামী সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তান যাবো।’ অবশেষে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। অতঃপর ভারতের সাথে কথা না বলেই শেখ মুজিব ইসলামী সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তানের লাহোরে চলে গেলেন। বাংলাদেশ ওআইসি সদস্যপদ লাভ করে। পরবর্তীতে ’৭৪ সালেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশ আসেন। অন্যদিকে চীন জাতিসংঘে তার প্রদত্ত ভেটো প্রত্যাহার করে নেয়। ফলশ্র“তিতে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। এটা শেখ মুজিবের কূটনৈতিক সাফল্যেরই ফলশ্র“তি। এটা সম্ভব হয়েছে তার চরিত্রের দৃঢ়তা ও বৈপ্লবিক গুনাবলীর কারণে। তিনি যদি ইসলামী সম্মেলনে না যেতেন, পাকিস্তানের স্বীকৃতি না পেতেন, চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন না করতেন তাহলে জাতিসংঘে ছীন তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ অব্যাহত রাখতো আর বিরুদ্ধ থাকা মুসলিম দেশগুলোও আমাদের সমর্থন দিতো না। জাতিসংঘে আমাদের সদস্যপদ লাভ শুধু বিলম্বিতই হতো। গোপন সমঝোতা চুক্তির বাধ্যবাধকতায় দেশ পরিচালনায় তাজুদ্দিনের সাথে তার চরম মতদ্বৈততার কারণেই তাজউদ্দিনকে মন্ত্রীসভা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হন। শুধু মন্ত্রী সভাই নয় পরবর্তীতে ‘বাকশাল’ গঠনেও দেখা যায় বাকশালের সদস্যপদও তাকে দেয়া হয়নি।

    প্রসঙ্গ বেগম মুজিবঃ
    মুজিব সহধর্মীনি বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আমাদের সম্মানিত ভাবী। তার ত্যাগ-তিতিক্ষা-প্রজ্ঞা আর কষ্ট সহিষ্ণুতা অতুলনীয়। রাজনৈতিক কারণে মুজিব ভাই বছরের পর বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। কারাগারের বাইরের জীবনও ছিল আন্দোলন সংগ্রাম আর সংগঠন নিয়ে ব্যপৃত। অন্যদিকে ভাবী সংসার চালানো, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া থেকে শুরু করে দেশের রাজনৈতিক পতিবিধি আর দলের নেতাকর্মীদের খোঁজ-খবর রাখতেন। প্রয়োজনে উপদেশ দিতেন বুদ্ধি দিতেন। দুর্যোগে দুর্বিপাকে কখনো তিনি মুষড়ে পরতেন না। সাহস হারাতেন না। বুদ্ধিমতি ও সাহসী এই মহিয়সী নারী নেপথ্যে থেকে এদেশের রাজনীতিতে অনেক অবদন রেখেছেন। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। অনেক কষ্ট স্বীকার করেছেন। অনেক দিক-নির্দেশনাও দিয়েছেন। বিশেষ ক্ষেত্রে সংকটময় মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত নিতে মুজিব ভাইকে সহযোগীতা করেছেন। অনেক সময় তাঁকে প্রভাবিতও করেছেন।
    আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় মুজিব ভাই ক্যান্টনমেন্টে বন্দী। দেশের উত্তল-ইত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জেনারেল আয়ুবের মসনদ টলটলায়মান। সে সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনার লক্ষ্যে আয়ুব খান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এক গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেন। শেক মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে প্রস্তাবিত গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত রাখার প্রস্তাব করা হলো এবং ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়অ, আতাউর রহমান খান, আবুল মুনসুর আহমদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ আয়ুবের দেয়া প্যারোলে মুক্তি প্রস্তাব মেনে নিলেন। যদিও গণবাদী ছিল ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের। বেগম মুজিব কিন্তু প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি ছুটে এলেন আমার কাছে। আমাকে তিনি বললেন যে মামলা প্রত্যাহার না হলে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গোল টেবিলে যাওয়া কি ঠিক হবে না। তিনি সেটা চান না। তিনি এ ব্যাপারে আমার মত জানতে চাইলেন। আমি তাকে বললাম আমি আপনার সাথে একমত এবং আরো বললাম যে আপনি কি মুজিব ভাইকে ক্যন্টনমেন্টে এই খবর পাঠাতে পারবেন। তিনি বললেন, পারবেন। আমি ভাবীকে বললাম আমার কাজ আমি করবো আপনি মুজিব ভাইকে একথাটি জানিয়ে দিন আর এক্ষণি আপনি তোফায়েল আহমদসহ ছাত্রলীগের সংগ্রামরত নেতৃবৃন্দের সাথে দেখা করুন এবং তাদেরকে এ ব্যাপারে বলুন। প্রয়োজনে আপনি ইকবাল হলে চলে যান। ভাবী সে সময় এ ব্যাপারে যা যা তাঁর পক্ষে করণীয় সব কিছুই করেছিলেন। ক্যন্টনমেন্টের কারাগারে মুজিব ভাইয়ের নিকটও যথারীতি খবর পাঠিয়ে দিলেন। এমনকি তিনি মুজিব ভাইকে এমনও বলে দিয়েছিলেন যদি প্যারোলে মক্তিতে রাজী হন তাহলে তাঁর সাথে চিরদিনের মতো সম্পর্ক ছিন্ন হবে। এর পরবর্তী ইতিহাস সকলের জানা। নেপথ্যে থেকে ভাবী এমনি অনেক কঠোর ভূমিকা পালন করেছেন। যা নাকি যে কোন মূল্যায়নে সঠিক ছিল। অনেক ক্ষেত্রে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনে turing point হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সন্তানসন্ততিসহ অবরুদ্দ এই ঢাকা শহরে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় দীর্ঘ নয় মাস অতিবাহিত করেন। ২৫শে মার্চ ’৭১ রাত্রিতে দেশের পরিস্থিতি যখন দ্রুত অবনতিশীল সে সময় মুজিব ভাই ভাবীকে ডেকে বললেন, ‘শোন হাসিনার’মা দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। জানি না কপালে কি আছে? আমার যদি কিছু হয় খোকা রইল সে তোমাদের দেখাশুনা করবে। মুজিব ভাই গ্রেফতার হয়ে যাবার পর মুজিব ভাইয়ের আপন ফুফাতো ভাই একমাত্র এই মুমিনুল হক খোকা সেই দুঃসহ দিনগুলিতে নিজের চীবন বাঝী রেখে ভাবী ও তাঁর সন্তানদের পাশে ছিলেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য শেখ জামালের ভারতে চলে যাওয়ার কারণে তাকে বধ্যভূমিতে পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। আল্লাহর অশেষ রহমতে খোকা বেচে যান। দুঃখের দেিন সুদিনের স্বজনেরা পাশে থাকে না। এ সত্যটি ভাবী মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন। ২৫শে মার্চ কালো রাত্রির পর ধানমন্ডির ৩২নং বাসা ছেড়ে সন্তানসন্ততিসহ প্রথমে মালীবাগ পরে মগবাজার এভাবে এ বাসা ও বাসা করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এরমধ্যে শেখ কামাল ভারতে চলে গেলে তিনি উতলা হয়ে পড়লেন। উপায়ন্তর না দেখে তিনি কামালের খোঁজে খোকাকে ধানমন্ডিতে তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার পুত্র আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বাসায় পাঠান। তাতেই যত গন্ডগোল হয়ে গেলো। খোকাকে নিয়ে মঞ্জু ও তার মা বেগম মানিক মিয়াসহ মগবাজারের যে বাসায় ভাবী থাকতেন সে বাসায় হাজির। পরবর্তী অধ্যায়- মঞ্জুর বাসায় আইএসআই প্রধান মেজর জেনারেল ওমরের সাথে খোকার সাক্ষাতের ব্যবস্থা। পরিণতিতে পাক বাহিনীর ঠিক করে দেয়া ধানমন্ডির ১৮ নয় সড়কের বাসায় তাদের প্রহরাধীনে ভাবী তাঁর সন্তানাদিসহ ১৯৭১ এর বিজয় দিবস তৎপরবর্তী ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী মুজিব ভাই এর ঢাকা প্রথ্যাবর্তন পর্যন্ত সেই বাড়ীতেই অন্তরীণ ছিলেন। এই যে ভাবী তার সন্তান সন্ততিসহ পাক বাহিণীর পাহারাধীন বাড়ীতে নজরবন্দী অবস্থায়, শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্যে ছিলেন এটাই সুহৃদ মঞ্জু ও মঞ্জুর মার খেলা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ১৬ই ডিসেম্বর ’৭১ বিজয় দিবসে রেসকোর্স ময়দানে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের পরও ১৮ নং সড়কে যে বাসায় ভাবী থাকতেন সে বাসা থেকে পাকিস্তানী সেনা প্রহরা প্রত্যাহার না হওয়াতে ভাবীসগ পরিবারের সকলের জীবন আশংকা দেখা দেয়। এরই মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর তারা সেখানে আসলেন এবং পাকিস্তান সৈন্যদের সেখান থেকে সরে না যাওয়ার কারণ জানতে চাইলেন ও চলে যেতে বললে পাক সেনারা ১ ঘন্টা সময় চাইল। কিন্তু মোমিনুল হক খোকা তাদের দুরিঅভিসন্ধি আঁচ করতে পেরে মেজর তারাকে অনুরোধ করলেন তিনি যেনো তাদের চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। তার ভয় ছিল যদি মেজর তারা চলে যায় সে সুযোগে পাক সেনারা তাদের সকলকে নিমিষে হত্যা করে ফেলবে। মেজর তারাও ব্যাপারটি বুঝতে পেরে তিনি পাক সেনাদেরকে তার উপস্থিতিতেই সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করে। মুজিব ভাই দেশে আসার পর ভাবী এ প্রসঙ্গটি তাঁকে বলেন এবং মেজর তারার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধে তাকে বাসায় নিমন্ত্রন করেন। স্বস্ত্রীক মেজর তারা বাসায় এলে ভাবী মিসেস তারাকে একটি হীরার নেকলেস উপহার দেন আর খোকা মেজর তারাকে একটি ওমেগা ঘড়ি উপহার দেন। [মুক্তিযুদ্ধকালে বেগম মুজিবের সেই দুঃসহ দিনগুলো সম্পর্খে মোমিনুল হক খোকা লিখিত ‘অন্তরালে স্মৃতি সমুজ্জল : বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবার ও আমি’ বইটি পড়লে বিস্তারিত জানা যাবে।] 

শেখ মুজিবুর রহমানের কারাজীবন
নান বানোয়াট, ভুল, বিভ্রান্তিকর জনরব ও অতি উৎসাহীদের মিথ্যা-প্রচারণা অপমোদনের জন্য সরকারী দলিলসহ আমার জানামতে সঠিক তথ্য নিম্নে দেওয়া হইল:

onfidential

Government of the People's Republic of Bangladesh. Office of the D.I.G. of Prisons, Dacca Division, Central Jail Dacca.

Memo No.                               SB dated                                           1974

 

To,

The Inspector-General of Prisons,

Bangladesh, Dacca.

Subject : Background materials on the prison life of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, the Prime Minister of Bangladesh.

Reference : Your Memo No, 258/Con-5/74 dt. 2-7-74.

In obedience to your memo, under reference I am to submit a detailed report regarding detention of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman as per records available in Dacca Central Jail.

1. He was committed to Dacca Central Jail on 1-1-1950 under section 18(2)B.P.S.O. VII of 1946.

2. Convicted on 12-9-1950 to R.I. for three months under section 147 P.P.C. and was transferred to Gopalganj Sub-Jail on 26-10-50 to answer a charge and was again readmittcd to Dacca Central Jail on 30-8-51 on transfer from Faridpur Dist. Jail as per G.O. No. 1036-H.S. dated 21-3-51 and was retransferred to Faridpur Dist. Jail on 15-2-1952.

3. He was again committed to Dhaka Central Jail on 31-5-1954 in connection with Kotwali P.S Case No 33 (3) 53 u/s 7 (1) 3 by the S.D.O. (S), Dacca and became a security prisoner on 18-S-1954 asper G.O. No. 2577-H.S dt. 12-7-1954 and under G.O. No. 3302-H.S. dt. 3-8-1954 and was released on 18-12-1954 under G.O. No. 145 (P)1'54 dated 18-12-11954.

4. Again he was committed to Dacca Central Jail on 12-10-1958 as an under trail prisoner in connection with 5A of E. Pak. . Act. LXX-H/58 and ufx. $(2) of Act II/47 by the S.D.O. (S), Dacca and became a security prisoner or 20-10-58 under Special Power Ordinance 1958 and was released on 17-12-1959 under G.O. No. 949—H.S. dated 17-12-1959.

5. Again in the year 1962 on 7-2-62 he was committed to Dhaka Central Jail as a security prisoner as per G.O. No. 254-H.S. dated 27-2-62 and 512-H.S. dt. 31-2-62 under section E.P.S.O. 1958 and was released on 18-6-62 under G.O. No. 1159 dt. 19-6-62.

6. Again on 8-5-66 he was committed to Dacca Central Jail under rule 32 D.P.R. 1965. He was convicted on 27-4-67 to suffer 8.1. for 1-3-0 months in connection with G.R. No. 1891/66 under section 47(5) D.P.R. 1965 under rules 32 of 1965 by Mr, Aftabuddin Ahmed Magistrate, lst Class, Dacca the trial of which was held inside the Jaill Office and was released on bail on 1-6-67. He was confined in Dacca Central Jail upto 17-1-68 and was taken to Dacca Cantonment in connection with "Agartala Conspiracy Case" from the Jail Gate.

 

(K. A. AWAL)

Dy. Inspector-General of Prisons,

DaccaDivision, Central Jail, Dacca.

 

The following informations are to be added to the above :

01. Arrested on llth March 1948 and released on 15th March 1948.

02. Sk. Mujibur Rahman was arrested on 19th April, 1949 for his participation in the movement against expulsion of students by the authorities of Dhaka University in connection with the students support of fourth class employees of the University and (if my memory does not fail me) released on 27th June 1949.

03. Arrested on 17th January 1968 in connection with Agartala Conspiracy case and after the withdeawal of the said case released on 22nd Februaby (1969) from Dhaka Contonment.

04. Sk. Mujibur Rahman again arrested on the night of 25th March 1971 and released from Mianwali Jail, Pakistan on 8th January 1972.

He suffered imprisonment for a period of about 8 years Since 1948 to 1972 before taking over as the President of Bangladesh.

বঙ্গানুবাদ
গোপনীয়

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
ঢাকা বিভাগীয় কারা পরিদর্শক-এর কার্যালয় ঢাকা বিভাগ,
কেন্দ্রীয় কারাগার, ঢাকা।

    প্রতি
    মহা কারা পরিদর্শক
    ঢাকা, বাংলাদেশ
    বিষয় : বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারাজীবন সংক্রান্ত তথ্যাবলী।
    সূত্র : আপনার স্মারক নং ২৫৮/কন-৫/৭৪ তাং ২-৭-৭৪
    সূত্রে বর্ণিত আপনার স্মারক মোতাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রাপ্ত রেকর্ডের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডিটেনশন সংক্রান্ত বিশদ রিপোর্ট পেশ করিতেছি :
    
    ১। ১৯৪৬ সালের বি.পি.এস.ও ঠওও ধারার সেকশন ১২(২)-এর অধীনে ১-১-১৯৫০ সালে তাঁহাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক করা হয়।
    ২। ১২-৯-১৯৫০ সালে ১৪৭ পি.পি.সি. সেকশনের অধীনে তাঁহাকে তিন মাসের কারাদণাড দেওয়া হয় এবং একটি অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য ২৬-১০-৫০ গোপালগঞ্জ সাব জেলে বদলী করা হয় এবং ৩০-৮-৫১ তারিখে জি.ও নং ১০৩৬ এইচ.এস তাং ২১-৩-৫১ মোতাবেক ফরিদপুর ডিষ্ট্রিক্ট জেল হইতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয় এবং ১৫-২-১৯৫২ তারিখে আবার ফরিদপুর ডিষ্ট্রিক্ট জেলে বদলী করা হয়।
    ৩। আবার ৩১-৫-১৯৫৪ তারিখে ৭(১)৩ ধারার অধীনে পি.এস কেইস নং ৩৩ (৩) ৫৩-এর কারণে ঢাকার মহকুমা অফিসার (সাউথ) কর্তৃক তাঁহাকে আবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক করা হয় এবং জি.ও নং ২৫৭৭ এইচ.এস তাং ১২-৭-১৯৫৪ এবং জি.ও নং ৩৩০২ এইচ.এস তাং ৩-৩-১৯৫৪ অনুযায়ী নিরাপত্তা বন্দী হন এবং জি.ও. নং ১৪৫ (পি), ৫৪ তাং ১৮-১২-১৯৫৪ অনুযায়ী ১৮-১২-১৯৫৪ তারিখে মুক্তি পান।
    ৪। আবার ইষ্ট পাক এ্যাক্ট খঢঢ-ওও/৫৮-এর ৫ক এবং এ্যাক্ট ওও/৪৭-এর সেকশন ৫(২)-এর অধীনে ঢাকা মহকুমা অফিসার (সাউথ) কর্তৃক ১২-১০-১৯৫৮ তারিখে তাঁহাকে বিচারাধীন আসামী হিসাবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক করা হয় এবং ১৯৫৮ সালের স্পেশাল হিসাবে পাওয়ার অর্ডিন্যান্সের অধীনে ২০-১০-১৯৫৮ তারিখে নিরাপত্তা বন্দী হন এবং জি.ও নং ৯৪৯ এইচ.এস তাং ১৭-১২-১৯৫৯ মোতাবেক ১৭-১২-১৯৫৯ তারিখে মুক্তি লাভ করেন।
    ৫। আবার জি.ও নং ২৫৪ এইচ.এস তাং ২৭-২-৬২ এবং জি.ও নং ৫১২ এইচ.এস তাং ৩১-২-৬২ মোতাবেক এবং ১৯৫৮ সালের ই.পি.এ.ও এর অধীনে তাঁহাকে ৭-২-৬২ তারিখে নিরাপত্তা বন্দী হিসাবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক করা হয় এবং জি.ও নং ১১৫৯ তাং ১৮-৬-৬২ মোতাবেক ১৮-৬-৬২ তারিখে মুক্তি দেওয়া হয়।
    ৬। আবার ১৯৬৫ সালের ৩২ ডি.পি.আর-এর অধীনে ৮-৫-৬৬ তারিখে তাঁহাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী করা হয়। ২৭-৪-৬৭ তারিখে ১৯৬৫ সালের ৪৭ (৫) ডি.পি.আর ও ১৯৬৫ সালের রুলস ৩২-এর অধীনে জি.আর. নং ১৩৯৩/৬৬ অধীনে জেলখানার অভ্যন্তরে তাঁহার বিচার হয় এবং ঢাকার প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট জনাব আফতাবউদ্দীন আহমদ তাঁহাকে ১ মাস ৩ দিনের সাধারণ কারাদন্ড দেন। ১-৬-১৯৬৭ তারিখে তিনি মুক্তি পান। ১৭-১-৬৮ পর্যন্ত তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন এবং জেল গেট হইতে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র বিচারের ব্যাপারে তাঁহাকে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়।

স্বাক্ষর- ডি.আই.জি প্রিজন
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার।

উপরে বর্ণিত তথ্যাবলীর সহিত নিম্নতথ্যাবলী যোগ করিতে হইবে
    ১। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ গ্রেফতার ও কারামুক্তি ১৫ই মার্চ ১৯৪৮ইং।
    ২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিম্ন বেতনভুক কর্মচারী ধর্মঘটকে সক্রিয় সমর্থনের অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ছাত্র বহিস্কারের প্রতিবাদে আন্দোলন করিবার কারণে শেখ মুজিবর রহমান ১৯শে এপ্রিল ১৯৪৯ইং তারিখ গ্রেফতার হন ও বোধহয় (আমার স্মৃতিভ্রম যদি না হইয়া থাকে) ২৭শে জুন (১৯৪৯) মুক্তি পান- অর্থাৎ ২ মাস ৯ দিন কারাবাস করেন।
    ৩। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হইয়া ১৯৬৮ সালের ১৭ই জানুয়ারী গ্রেফতার হন এবং ঐ মামলা প্রত্যাহার করিবার পর ঢাকা সেনানিবাস হইতে ২২শে ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯ সালে মুক্তি পান।
    ৪। শেখ মুজিবুর রহমান ২৫শে মার্চ ১৯৭১ সালের দিবাগত রাত্রে পুনরায় গ্রেফতার হন এবং ১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারী পাক সরকারের মীয়ানওয়ালী কারাগার হইতে মুক্তি পান।

    ১৯৪৮ সাল হইতে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে সর্বমোট প্রায় ৮ বৎসর তিনি কারাজীবন ভোগ করেন।

কলকারখানা রাষ্ট্রায়ত্বকরণ
    ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ কলমের এক খোঁচায় দেশের যাবতীয় কলকারখানা রাষ্ট্রায়ত্ব করা হইল। পূর্ব হইতে কোন ইনভেন্টরী তৈয়ার না করিয়অ প্রশাসকদের তত্ত্বাবধানে মিল-কলকারখানার পরিচালনার দায়িত্বভার দেওয়া হইল। অবশ্য পূর্বেই পরিত্যক্ত মিল-কলকারখানাগুলিতে প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। এইদিকে আবার রাষ্ট্রায়ত্ত করিবার পর কোন কোন মিল-কারখানার মালিকদের তাহাদের স্ব স্ব মিলের প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা নামধারী শ্রমিকদের অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং সাবেক অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রশাসকদিগকে দালাল আখ্যা দান ও ভীতি প্রদর্শন মিল কারখানার ব্যবস্থাপনাকে প্রগসনে পরিণত করে এবং সামগ্রিক উৎপাদনসমূহ ক্ষতির সম্মূখীন হয়। অধিকাংশ কলকারখানাই অযোগ্য প্রশাসক ও শ্রমিক নেতৃত্বের যোগসাজশে লুটপাপের আখড়ায় পরিণত হয়। অবশ্য ইহাই ছিল স্বাভাবিক। কেননা যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং কলকারখানা ধ্বংসের জন্য ভারতীয় মারোয়াড়ী গোষ্ঠী সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে নানাভাবে লিপ্ত, তখন শেখ মুজিব এবং তাহার সরকার ত্যাগী, সচেতন ও সজাগ দেশপ্রেমিক শক্তিকে সুসংহত ও সুসংগঠিত না করিয়া সর্বনাশা সস্তা বুলির আশ্রয়ে আসর বাজীমাৎ করিবার তালে ছিলেন। আর তাই অন্যকিছু বিবেচনা ও বাস্তবতা বিচার না করিয়াই জাতীয় শিল্প ও অর্থনীতিকে কলমের এক খোঁচায় ধ্বংসের মুখে ঠেলিয়া দিতে তাহারা এতটুকু কুণ্ঠিত হন নাই। ভারতীয় অভিজ্ঞ নেতৃত্ব তাহাদের শিল্প-কারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত করিবার মত সর্বনাশা পথ কেন মাড়ায় নাই, তাহা অনুধাবন করিবার মত ধীশক্তি শেখ মুজিব কিংবা আওয়ামী লীগের কোন নেতার ছিল না। তদুপরি ছিল রুশপন্থীদের উস্কনী। ফলতঃ মুজিব সরকারের চরম অবিমৃষ্যকারিতাই দেশের সমগ্র অর্থনীতি লণ্ডভণ্ড করিয়া ফেলে। কথায় বলে, দেবদূতগণ যেখানে যাইত সাহস পায় না মূর্খরা তড়িঘড়ি করিয়া সেখানে প্রবেশ করে।

জেনারেল ওসমানীই সর্বাধীনায়ক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন-
কোন বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ নাই

      গণপ্রজাতন্ত্রী প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার পর ১২ই এপ্রিল ১৯৭১-এর পূর্বাহ্ন হতে বঙ্গবীর ওসমানীকে মুক্তিবাহিনী গঠন ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রীর সমমর্যাদায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বা কমান্ডার-ইন-চীফ নিযুক্ত করা হয়। চীফ অব ষ্টাফ বা প্রিন্সিপাল ষ্টাফ অফিসার নিযুক্ত করা হয় মেজর জেনারেল (তখন লেঃ কর্নেল) এম এ রবকে। ডেপুটি চীফ অব ষ্টাফ নিযুক্ত করা হয় লেঃ কর্নেল এ আর চৌধুরীকে। জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বঙ্গবীর ওসমানীকে কর্নেল থেকে জেনারেল পদে উন্নীত করেন যা ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে কার্যকরী করা হয়। গণপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার জন্য বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী ১৯৭২ সনের ৭ই এপ্রিল সর্বাধিনায়কের পদ থেকে পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করার পর সর্বাধিনায়কের পদ ও যৌথ কমান্ড বিলুপ্তি ঘোষণা করেন; যা ১৯৭২ সনের ২৭শে এপ্রিল বাংলাদেশ গেজেটে নিম্নলিখিতভাবে প্রকাশিত হয়।

MINISTRY OF DEFENCE NOTIFICATIONS

NO Ol/l7!72 (NGO) 108 DEF/SECY—7th April. 1972 with a view to effectively participate in the proceedings of the Constituent Assembly as an MCA. General M.A.G. Osmany. p.s.c. M.C.A. resigned his appointment as C-in-C. Bangladesh Forces, and his resignation having been accepted by the president. He vacated the temporary appintment of C-in-C. Bangladesh Forces with effect from 7th April l972 (forenoon). Accordingly he is reverted to the pension list from the same date. No. UI-31-33/72-l l0(3) DEF/SECY-7th April 1972 with the vacation of the appointment of Temporary C-in-C. Bangladesh Forces. The combined command of Bangladesh·Forees has been abolished with ceffect from 7th April 1972 (forenoon) and replaced by three separate commands for the Bangladesh Army, Navy and Air Force with the following Acting Chiefs of staff with immediate effect and until further orders. বঙ্গবীর ওসমানী ১২ই এপ্রিল ’৭১ ইং থেকে ৭ই এপ্রিল ’৭২ ইং পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন।
    এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ গণপরিষদের ১৯৭২ সনের ৩১শে অক্টোবরের অধিবেশনের বিররণী হতে বঙ্গবীর ওসমানীর বক্তৃতার একটি অংশ নিমেন্ম প্রদত্ত হলো (সংবিধান সংশোধনের একটি প্রস্তাব দেয়ার তিনি এই বক্তব্য দেন)

    মাননীয় স্পীকার সাহেব
    “দল, মত, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমগ্র বাঙ্গালী জাতীয় ঐক্যবদ্ধভাবে দৃঢ় সংকল্প আর সাহসিকতার সঙ্গে, বীরত্ব আর নিষ্ঠার সঙ্গে শত্র“র বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন প্রায় হতাশাজনক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে। আর এ সংগ্রামই হল ইতিহাসে প্রথম মুক্তি সংগ্রাম, যেখানে সাংবিধানিক উপায়ে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। এই সংগ্রামে আওয়ামী লীগ সরকার বাঙ্গালী জাতিকে বিজয়ের পথে, মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। এতে বাংলাদেশের সকল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছিল। এই যুদ্ধে আমার অপ্রাপ্য সম্মান ছিল বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করার।”

যুব সমাজের অধঃপতনঃ দেশময় নৈরাজ্য
    দেশের বিভিন্ন পর্যায় ও শ্রেণীর লোক মুক্তিযুদ্ধে শামিল হইয়াছিল। ইহাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল ছাত্র সম্প্রদায়। “দাসত্ব বরণ অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়” এই ছিল ছাত্র সমাজের দৃঢ় পণ। দেশের স্বার্থে উৎসর্গিত প্রাণ এই ছাত্র সমাজ ১৬ই ডিসেম্বর (১৯৭১) বিজয় দিবসের পর হইতেই নেতৃত্বের চরিত্রহীনতা ও ভ্রান্তনীতির দরুণ ত্যাগের মহিমা ও দেশপ্রেমর তাৎপর্য অনুধাবন করিবার মত অনুকূল আবহাওয়া হইতে নির্মমভাবে বঞ্চিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিবার কারণে যে ৯ মাস তাহারা পড়াশুনা করিতে পারে নাই, সেই ৯ মাস ছাত্র সম্প্রদায় কর্তৃক ত্যাগ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত ছিল এবং পরবর্তী শিক্ষা বৎসরের নির্ধারিত পরীক্ষায় তাহাদের যথারীতি অংশগ্রহণ করিবার মধ্যেই নিহিত ছিল জাতীয় স্বার্থ। পক্ষান্তরে সংক্ষিপ্ত কোর্সে পরীক্ষা দিলে বা বিজ্ঞান পরীক্ষায় প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা ব্যতীত ডিগ্রী গ্রহণ করিলে অথবা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করিবার অজুহাতে ঢালাও পরীক্ষার উত্তীর্ণ হইবার দাবী আদায় করিলে পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হারাইয়া যায় অর্থাৎ ডিগ্রী অর্থহীন হইয়া পড়ে। জ্ঞানার্জনে বা বিদ্যা শিক্ষায় কোন সংক্ষিপ্ত পন্থা নাই। কন্তিু আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিহীনতার কারণে এবং বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল ও শিক্ষা বিভাগীয় সুপণ্ডিত, জ্ঞানী, গুণী বলিয়া পরিচিত মহল এই সময়ে শিক্ষাঙ্গণে, পরীক্ষা ক্ষেত্রে ও শিক্ষাদানের ব্যাপারে কলঙ্কময় অধ্যায় সংযোজন করিয়াছেন। উহাই যে তরুণ সমাজের নৈতিক অধঃপতনের অন্যতম কারণ বিবেকবান মাত্রই তাহা স্বীকার না করিয়া পারিবেন না। বস্তুততঃ অস্বীকার করিবার উপায়ও নাই যে, নীতিহীন নেতৃত্ব, অস্ত্রের ঝনঝনানির নিকট শিক্ষা গুরুদের আত্মনমর্পণ, শিক্ষাঙ্গণে চরিত্রহীন, উচ্ছৃঙ্খল ও জ্ঞানার্জন বিবর্জিত পরিবেশ সৃষ্টিতে এক শ্রেণীর সতলববাজ মহলের সাং ও উৎসাহ যুব সমাজকে অধঃপতনের আবর্থে ঠেলিয়া দিয়াছিল। এবং শিক্ষাঙ্গনই যেহেতু এই দেশের নাগরিক সচেতনতার মূল কেন্দ্র, সুতরাং পরিণতিতে, দেশময় নৈরাজ্য সৃষ্টিতে দেরী হয় নাই। এই প্রসঙ্গে জগৎবরেণ্য রাষ্ট্রনীতিবিদ স্যার উইনষ্টন চার্চিলের ফরাসী-বিপ্লব মূল্যায়ন সংক্রান্ত মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্যঃ

"Now France gavea frightful demonstration 0f what happens when the social forces unleashed by reformers break free from all ccntrol." ইহার মর্মার্থ এই যে, সামাজিক যে সব বিধি-বিধান শক্তি হিসাবে সমাজকে পরিচালিত করে-সমাজ সংস্কারকগণ নিজেরাই যখন সেইসব বিধি-বিধানকে নস্যাৎ করতঃ শক্তিকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করেন; তখন অবস্থা যে কি ভয়াবহ হইতে পারে, ফরাসী
দেশ উহার জ্বলস্ত উদাহরণ। অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ একই ব্যাধিতে আক্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল।
বস্তুতঃ বাংলাদেশের যে কোন রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থায় ছাত্র ও শ্রমিক শ্রেণীর অত্যন্ত সংঘবদ্ধ ও কার্যকর ভূমিকা বিদ্যমান। শিক্ষাঙ্গন ও শিল্পাঙ্গন দুইটিই মূলতঃ যুব শ্রেণীভুক্ত অথচ মুজিব সরকারের নীতিহীনতায় এই দুই গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী হইয়া পড়িয়াছিল ধ্বংসন্মুখ। আজাদী উত্তরকালে উভয় শক্তিকেই দেশ গঠনের যথাযতভাবে নিয়োজিত করিতে মুজিব সরকার ব্যর্থ হন মারাত্মকভাবে। জাতীয় নেতৃত্বের নীতিহীনতায় যুব সমাজে আইন অমান্য হইতে আইন ভঙ্গের প্রবণতা অত্যন্ত উৎকটভাবে দেখা দেয়। সর্বত্রই আইন-শৃঙ্খলা পরিণত হয় অতীতের বস্তুতে। অবস্থা তখন এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয় যে, কোথাও জানমাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা বলিয়া যে কিছু আছে, তাহা মনে হইত না। শুধু মনে হইত সমাজের সর্বস্তরে অরাজকতা বিরাজমান।
অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাক-সরকার কর্তৃক সংগঠিত রাজাকার, আল্বদর, আল্সামস ইত্যাদি বাহিনী, দুর্ধর্ষ স্বভাব অপরাধী, মাক্সীয় দর্শন অনুসারী বিভিন্ন অস্ত্রধারী বাহিনী ও সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার এক অংশ আইন-শৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতির জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল। কিন্তু সব চাইতে বেশী দায়ী ছিলেন মুজিব সরকার। কেননা, সবদেশেই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ত্র উদ্ধার সরকারের অবশ্য করণীয় দায়িত্বের অঙ্গীভুত। ইহার ব্যতিক্রম হইলেই সমাজ জীবনে শান্তি অতীতের কাহিনীতে পর্যবসিত হয়। পরিতাপের বিষয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাহার আওয়ামী লীগ সরকার অস্ত্র উদ্ধার কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত নিজস্ব বেসরকারী লালবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী কিংবা ভারতের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গঠিত রক্ষীবাহিনীর যথেচ্ছ অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ দূরে থাকুক, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে উৎসাহ দান করিতে কুণ্ঠিত হইত না। এমন কি ডাকাতি, রাহাজানি, হত্যা, মারপিট, লুট, ধর্ষণ, ছিনতাই, জবর-দখল ইত্যাদি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ও আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কিছুই করা সম্ভব হইত না। কেননা, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবর্গ ও সংসদীয় সদস্যগণের নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী পুলিশ শুধু নয়, বরং বাংলাদেশ রাইফেলস এবং এমন কি সৈন্য বাহিনী পর্যন্ত তাহাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হইত। প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার আর কাহাকে বলে? কথায় ও কাজের গরমিলের দরুণ প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান অচিরেই আস্থা হারাইয়া ফেলেন। তাই তাঁহার আবেদন সত্ত্বেও অস্ত্রধারীরা অস্ত্র জমা দেয় নাই, অনেকে স্বীয় আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই অস্ত্র লুকাইয়া রাখিয়াছিল। মারাত্মক মারাণাস্ত্রেরও আপন আপন বৈশিষ্ট্য আছে- আর তাহা এই যে, উহা মালিককে অনেকটা বেপরোয়া করিয়া তোলে।
এইভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্বার্থে আইন-শৃঙ্খলা, প্রশাসন এমন কি আইন-আদালত পর্যন্তযথেচ্ছ ব্যবহৃত হইবার ফলে, আইন-কানুন ও প্রশাসনিক সদুদ্দেশ্য ও নিরপেক্ষতার উপর দেশবাসী ক্রমশঃ আস্থা হারাইয়া ফেলে। যেখানে আইনের শাসনের ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অপপ্রয়াস, সেখানেই অবক্ষয়ের সূত্রপাত। আর কোথাও একবার অবক্ষয়ের সূত্রপাত হইলে তাহা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অলক্ষ্যে বিস্তৃতি লাভ করে। শান্তি ও স্বস্তি, স্থিতি ও সমৃদ্ধি হয় অপসৃয়মান। নিঃসংশয়ে বলা যায় যে, শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে বাংলাদেশে প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়জীবন, মূল্যবোধ ও চরিত্র এক কথায় সর্বস্তরে এই অবক্ষয়ের দৌরাত্মই পরিলক্ষিত হইত। প্রশাসন কর্মচারীরা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশংকায় সর্বক্ষণ ম্রীয়মান থাকিতেন। “রাষ্ট্রপতি আদশে ৯” সরকারী কর্মচারেিদর সকল ক্ষমতা, নৈতিক ও চারিত্রিক দৃঢ়তা, কর্ম উদ্যেগ ও উদ্যম অপহরণ করিয়া নিয়াছিল। ফলে গোটা প্রশাসন ব্যবস্থাই নতজানু প্রশাসনে পর্যবসিত হইয়া পড়িয়াছিল।