• হোম
  • চির বিদ্রোহী অলি আহাদ
  • অলি আহাদ মহান ভাষা আন্দোলনের প্রধান নেতা -খালেদা জিয়া

অলি আহাদ মহান ভাষা আন্দোলনের প্রধান নেতা -খালেদা জিয়া

ফন্ট সাইজ:
 [১২ই মার্চ, ১৯৯৯ শুক্রবার বিকেল ৪টায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ’জননেতা অলি আহাদের জাতীয় সংবর্ধনা কমিটির’ সভায় প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রদত্ত ভাষণ]
 
মাননীয় সভাপতি, বিদ্রোহী জননেতা অলি আহাদ ও সুধীমন্ডলী-
আসসালামু আলাইকুম। 
 
আজ আমরা যে জনপদ এবং যে রাষ্ট্রের গর্বিত নাগরিক বিংশ শতাব্দির চল্লিশ দশক থেকে পরবর্তী প্রতিটি দশকের বিশাল সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন আমাদের বর্তমান সত্তা এবং মননকে নির্মাণ করেছে। আর এই প্রতিটি দশকেরই নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট আছে। 
 
প্রত্যেক জাতির জন্য ইতিহাস-বোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস-বোধ একটি জাতির আত্মোপলব্ধিকে স্বচ্ছ করে, চেতনাকে শানিত করে এবং জাতীয় প্রত্যয়কে নতুন নতুন বিজয়ে অনুপ্রাণিত করে। 
 
ইতিহাসই যুগে যুগে এক-একজন মহান ব্যক্তিত্বের মানুষকে সৃষ্টি করে। আবার বিরল প্রতিভা এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এই মহানায়কেরা নতুন ইতিহাস রচনা করে, সমাজকে বিকাশের নতুন সোপানে অধিষ্ঠিত করেন, জাতিকে সঙ্কট উত্তরণের দিক-নির্দেশনা দেন এবং মানুষকে মহৎ মর্যাদা দেন। 
 
আমাদের সমকালে অলি আহাদ এমন একজন মানুষ। 
 
৪০-এর দশক ছিল বৃটিশ উপনিবেশবাদ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের সব চাইতে ঘটনাবহুল এবং চূড়ান্ত বিজয়ের দশক। আমাদের জাতিস্বত্তার উন্মেষ এবং নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দশক। অলি আহাদের রাজনৈতিক জীবনের শুরু এই দশকে। এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক নিপীড়ন বিরোধী লড়াই আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে তিনি ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। চূড়ান্ত বিচারে এ লড়াই-ই হচ্ছে সর্বোত্তম গণতান্ত্রিক সমাজ এবং সমৃদ্ধ সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন সেদিন তাকে গৃহের নিরাপদ অবস্থান থেকে রাজনীতির বন্ধুর পথে টেনে এনেছিল। 
 
৫০-এর দশক ছিল এই স্বপ্ন ভঙ্গের দশক নিপীড়ন ও বঞ্চনামুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ এলো না। আমাদের জাতিসত্তার উপর আঘাত এলো। ‘৫২’ র ভাষা আন্দোলন ছিল তারই বিরুদ্ধে গর্জে উঠা। ইতিহাস বিকৃতির শত প্রচেষ্টা সত্বেও এ সত্যটি আজ ১২ কোটি মানুষের কাছে স্পষ্ট যে, অলি আহাদ মহান ভাষা আন্দোলনের প্রধান নেতা। এই দশকেই তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন এবং সকল মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে উঠে। এ সংগ্রামেও মওলানা-ভাষানীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী নেতা অলি আহাদ। এই দশকেই অন্যান্য গণতান্ত্রিক নেতা ও কর্মীদের সাথে অলি আহাদের জেল জীবনের শুরু। 
 
আইয়ুব খানের সামরিক শাসনকালে ৬০-এর দশকের পুরোটাই ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কাল। এখানেও এনডিএফ গঠন থেকে সকল পর্যায়ে অলি আহাদের অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। 
 
৭০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছর ছিল মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তী কালের ভারতের পুতুল সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ফ্যাসিষ্ট একদলীয় শাসনের কবল থেকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অসম সাহসী লড়াই এর বছর। রাজনৈতিক নেতা অলি আহাদ এই দুই লড়াই এ সামনের সারিতে ছিলেন। তাঁর পত্রিকা সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’ তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। রাজনীতিবিদ অলি আহাদ এবং সম্পাদক অলি আহাদকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। ‘ইত্তেহাদ’ নিষিদ্ধ হয়েছিল। 
 
৮০-র দশকে গণতন্ত্র এবং সংবিধানের উপর আবার যখন আঘাত এলো অলি আহাদ রাজপথে নেমেছিলেন। 
 
আমাদের জাতি এবং ইতিহাসের একটি দুর্ভাগ্য এই যে, আমরা গণতন্ত্রের পথে প্রগতির পথে পা বাড়িয়েছি তখনই দেশী ও বিদেশী প্রতিকূল শক্তি আঘাত হেনেছে, সবকিছু তছনছ করেছিলাম। সংবিধানকে তার মহৎ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিলাম। অর্থনীতিকে জনকল্যাণ মুখী বিকাশের পথে এনেছিলাম। রাষ্ট্রীয় মর্যাদাকে বিশ্ব দরবারে সমুন্নত করেছিলাম। ৯৬-এর সাজানো নির্বাচনের পর জাতীয় বিশ্বাসঘাতক গণতন্ত্র হত্যাকারীরা ক্ষমতা দখলের পর সব কিছু আবার তছনছ হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা এবং অখন্ডতা, সংবিধান, গণতন্ত্র, অর্থনীতি, জাতীয় সংস্কৃতি এবং আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ সবকিছুই আজ আবার বিপন্ন। আজকের লড়াই তাই সর্বাত্মক। 
 
৪০-এর দশকের তরুণ অলি আহাদ আজকের বর্ষীয়ান জননেতা অলি আহাদ আবারো সংগ্রামের প্রথম সারিতে এসে দাঁড়িয়েছেন। 
 
অলি আহাদ আমাদের রাজনীতিতে এক অনন্য ব্যাক্তিত্ব। নীতির প্রশ্নে তিনি কখনও আপোষ করেননি। প্রলোভন কখনও তাকে বশীভূত করেনি। বলা যায় তিনি আজ “জাতির বিবেকে” পরিণত হয়েছেন। 
 
আজ আমরা এখানে জনাব অলি আহাদকে সমর্থন জানাবার জন্য সমবেত হয়েছি। তাকে সর্বোত্তম সম্মান আমরা কি দিতে পারি? আমি বিশ্বাস করি, বর্তমান গণবিরোধী, সংবিধান লঙ্ঘনকারী, রাষ্ট্রীয় অখন্ডত এবং অস্তিত্ব বিরোধী শাসকগোষ্ঠীর বিরোদ্ধে যে জাতীয় ঐক্য আমরা গড়ে তুলেছি তাকে আরো দৃঢ় করা এবং যে সংগ্রাম আমরা চালিয়ে যাচ্ছি তাকে সফল করাই হবে জননেতা অলি আহাদের প্রতি জাতির দেয়া সবচাইতে বড় সম্মান। স্বাধীন স্বদেশ, গণতান্ত্রিক সমাজ এবং সমৃদ্ধ সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্নকে বাংলাদেশে মূর্ত এবং অক্ষয় রূপ দিই। 
 
আমি জনাব অলি আহাদের সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘ জীবনের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর দরবারে দো’আ করছি।