• হোম
  • চির বিদ্রোহী অলি আহাদ
  • অলি আহাদ আদর্শবান ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেদীপ্যমান থাকবেন -কাজী জাফর আহমদ

অলি আহাদ আদর্শবান ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেদীপ্যমান থাকবেন -কাজী জাফর আহমদ

ফন্ট সাইজ:
[১২ই মার্চ শুক্রবার ১৯৯৯ জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘অলি আহাদ জাতীয় সংবর্ধনা কমিটি’ আয়োজিত সভায় সাবেক প্রধানমন্ত্রি জননেতা কাজী জাফর আহমদ এর ভাষণ]
 
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। 
আজকের এই ব্যতিক্রমধর্মী ঐতিহাসিক সংবর্ধনা সভার প্রিয় সভাপতি প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম। আজকের সভার প্রধান অথিতি বিরোধী দলের সম্মানীয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং যাকে কেন্দ্র করে সংবর্ধনা জানাবার জন্য আজ আমরা সবাই সমবেত হয়েছি, সেই অকুতোভয় আপোষহীন রাজনীতিবিদ, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি জাতীয় আন্দোলনের সিপাহসালার, জাতীয় নেতা জনাব আলি আহাদ এবং উপস্থিত সুধীবৃন্দ। 
 
আজকের বক্তব্যের শুরুতেই আমি কিছু স্মৃতিচারণ করতে চাই। সুমহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আমরা যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর সুদীর্ঘ ৪৭ বছরের এই রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় যে কয়েকজন রাজনীতিবিদ সব সময় আমার শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন, তার মধ্যে জনাব অলি আহাদ তালিকার শীর্ষেই ছিলেন। আমি অলি আহাদকে শ্রদ্ধা করি। কারণ তিনি তাঁর নীতি ও বিশ্বাসে অটল, আপোষ শব্দটি তার অভিধানে নেই। তিনি যা বিশ্বাস করেন, তা প্রকাশ করতে তিনি নির্ভয়, দুর্যয়, সাহসী। তিনি নির্লোভ, ক্ষমতার মোহ থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, মেধাবী ছাত্র হিসেবে রাজনৈতিক জীবনে তাঁর পদচারণা শুরু। আন্দোলন সংগ্রামের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দিনগুলোতেও তিনি বি.কম পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম স্থান অধিকার করে সেদিন এক অনন্য অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আজও যে কয়েকজন হাতে গোণা রাজনীতিবিদ লেখাপড়া করে রাজনীতি করেন, তিনি তাদের শীর্ষ স্থানে আছেন। শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নয় ব্যক্তিগত ও সাংসারিক জীবনেও তিনি নীতিবান, আদর্শবান ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেদীপ্যমান থাকবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। তবে শুধু এ কারণেই জনাব অলি আহাদকে আমি শ্রদ্ধা করি তা নয়, তাঁকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করার পেছনে ঐতিহাসিক কারণও আছে। এখন আমি সে ইতিহাস তুলে ধরতে চাই। 
 
প্রথমেই আসে ভাষা আন্দোলনের কথা। আজকে একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, ভাষা আন্দোলন না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। আর অলি আহাদের জন্ম না হলে ভাষা আন্দোলন সফল হত না, বাংলাদেশও স্বাধীন হত না। আমি ইতিহাসের পাতা থেকে এ সম্পর্কে কিছু উদ্ধৃতি দিতে চাই। আমরা সবাই জানি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী যেদিন ঐতিহাসিক আমতলা সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হয়েছিল, তার আগের দিন রাতে অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী সর্বধলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেছেন সাবেক অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের প্রাজ্ঞ সাধারণ সম্পাদক জনাব আবুল হাশিম। সেদিন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির অধিকাংশ সদস্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলেও তৎকালীন যুব লীগের সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির  আহ্বায়ক আবদুল মতিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে খুব জোরালো ভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করেছিলেন। আমি বদরুদ্দিন উমর লিখিত ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইটির ১৭৬ পৃষ্ঠা থেকে কিছু উদ্ধৃতি এখানে তুলে ধরছি। ১৪৪ ধারা প্রসঙ্গে তৎকালীন আওয়ামী মুসলীম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক বলেছিলেন, প্রথমত আওয়ামী মুসলীম লীগ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, দ্বিতীয়ত গোলযোগের সুযোগ গ্রহণ করে সরকার প্রস্তাবিত সাধারণ নির্বাাচন অনিশ্চয়তার গর্ভে নিক্ষেপ করবে এবং তৃতীয়ত রাষ্ট্রবিরোধী ও ধ্বংসাত্মক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে একথা বলে তিনি সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষে নিজের মত প্রকাশ করেছিলেন। ইতিহাসে একথা লেখা আছে জনাব আবুল হাশিম নিজেও এবং আওয়ামী লীগ নেতা কমরুদ্দীন উমরের বই থেকে আবার উদ্ধৃত করছি, (পৃষ্ঠা ১৭৬) ১৪৪ ধারা পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে জনাব শামসুল হককে সদস্য হিসেবে কর্তব্য পালনের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে। তার সদস্য পদ চক্রান্ত করিয়া খারিজ করা হইয়াছে। এমনকি টাঙ্গাইল উপ নির্বাচনে পরাজিত হইবার পর মুসলীম লীগ সরকার অদ্যবদি আর কোন উপ নির্বাচন দেন নাই। শুধু তাই নয়, বিনা অজুহাতে আমাদের পুনঃ পুনঃ ঘোষিত শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে বানচাল করিবার অসৎ উদ্দেশ্যে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করিয়াছে। অতএব ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করিয়া সরকারকে সমুচিত জবাব দিব” জনাব অলি আহাদ আরো বলেন “যাহা হয় হইবে ইহাতে দ্বিধা দ্বন্দ্বের অবকাশ নাই। এবার যদি সরকারের হঠকারী মনোভাব রুখিতে না পারি তবে ভবিষ্যতে সামান্যতম প্রতিবাদও করিতে পারিব না। গত বছর অর্থাৎ ১৯৫১ সালের মার্চ মাসেও সরকার ১৪৪ ধারা জারি করিয়া ঢাকা জেলার লাইব্রেরী হলে যুব সম্মেলনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়াছিলেন। এই মুহুর্তে সম্মিলিত গণশক্তি যদি সরকারের অন্যায় অবিচার প্রতিরোধ করিতে ব্যর্থ হয় তবে আর কখনো প্রতিরোধ করিতে পারিব না। সুতরাং নাউ অর নেভার।”
 
জনাব অলি আহাদের এই বক্তব্যকে সেদিন সমর্থন করেছিলেন জনাব আবদুল মতিন। সেদিন জনাব তোয়াহা কোন জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারেননি। কারণ কমিউনিষ্ট পার্টি ছিল তার মূল সংগঠন। যার শৃঙ্খলা তাঁকে মেনে চলতে হত। এ প্রশ্নে পরদিন ২০ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে দীর্ঘ বিতর্ক চলে এবং পরবর্তীকালে ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ১১ জন সদস্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে মত প্রকাশ করে। মাত্র ৪ জন সদস্য যার শীর্ষস্থানে ছিলেন জনাব অলি আহাদ ও জনাব আবদুল মতিন। তাঁরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে দৃঢ় মত প্রকাশ করেন। এ ভোটাভুটির পর আমি আবারও উদ্ধৃতি করছি “বদরুদ্দিন উমরের পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি।” (পৃষ্ঠা ১৭৯) থেকে, এই ভোটাভুটির পর অলি আহাদ বৈঠকস্থলে সভাপতিকে শুনিয়ে থাকেন যে, “সর্বদলীয় কমিটির দিদ্ধান্ত যাই হোক আগামী কাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে।” তার এই ধরনের উক্তির পর সভার সভাপতি জনাব আবুল হাশিম বলেন যে, সে অবস্থায় সর্বদলীয় কমিটির আর কোন প্রয়োজন হবে না। কাজেই ১৪৪ ধারা এভাবে ভঙ্গ হলে সেই সঙ্গে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির অস্তিত্ব বিলুপ্তি হবে। এ কথার পর আবুল হাশিমের বক্তব্যটিও প্রস্তাব আকারে গৃহীত হয়। সুতরাং ইতিহাসের এই অধ্যায়টি যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে একথা স্বীকার করতেই হবে, ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী রাতে সেদিন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে অলি অাহাদ এবং তার সাথীদের ভূমিকাই পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রসভা এবং সমাবেশ হয়েছিল, সেই ছাত্রসভা এবং সমাবেশে আবার আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সেদিন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জনাব শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে নানা যুক্তি দিতে থাকেন। কিন্তু জনাব গাজীউল হকের সভপতিত্বে যে ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বলাবাহুল্য., এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে অলি আহাদের ভূমিকা ছিল অসামান্য এবং আরেকজনের ভূমিকাও এভানে স্মরণীয়। তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহ্বায়ক জনাব আবদুল মতিন। তাহলে আমরা একথা স্পষ্টতই বলতে পারি, সেদিন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে যদি সিদ্ধান্ত গৃহীত না হত তাহলে ভাষা আন্দোলন কোনদিন সাফল্যমন্ডিত হতে পারত না। এবং ভাষা আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনও বিকশিত হতে পারত না। সে জন্যই এই ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য দেরিতে হলেও আজকে যারা জনাব অলি আহাদকে সংবর্ধনা জানাবার জন্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন, আমি তাদেরকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ জানাই। সাথে সাথে একথা চলছে। একটি বিশেষ দল তাদের নেতার পক্ষে কথা বলতে যেয়ে ইতিহাসকে বিকৃত করে চলেছে। কিন্তু ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমি জানি, ইতিহাস নীরবে নিভৃতে সত্যের জয়গান গেয়ে যায়। প্রতি ৫০ বছর পর সত্যিকারভাবে ইতিহাস লিখিত হয়। সুতরাং আজকে যারা স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃতি করছেন, একদিন ইতিহাস তাদের আসল চরিত্রকে উদঘাটিত করে দেবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এ প্রসঙ্গে আমি একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই। ১৯৫৬ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কাগমারী সম্মেলন হিসেবেই ইতিহাসে এটা খ্যাতি অর্জন করেছে। সেই কাগমারী সম্মেলনে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সেদিন অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে তাঁর একটি ঐতিহাসিক উক্ত উচ্চারণ করেছিলেন। তা হচ্ছে যে, “পূর্ব বাংলাকে যেভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের এককেন্দ্রিক বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠী শোষক করে চলেছে, যেভাবে পূর্ব বাংলার জনগণ অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকারে পরিণত হচ্ছে, তাতে এমন দিন আসতে পারে যেদিন পূর্ব বাংলার মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলতে বাধ্য হবে”। ইতিহাসে একথা লিপিবদ্ধ আছে, মওলানা ভাসানীর এই বক্তব্যের স্বপক্ষে যিনি সেদিন অত্যন্ত বলিষ্ঠতার সাথে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি হচ্ছেন জনাব অলি আহাদ। ইতিহাসে একথা লেখা আছে, মওলানা ভাসানীর এই উক্তির পর জনাব সোহরাওয়ার্দী, জনাব শেখ মজিবুর রহমান প্রমুখ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সেদিন তাদের ছাত্র লীগের মাধ্যমে মওলানা ভাসানীর ফাঁসি দাবী করেছিলেন। আমার আজও স্মরণ আছে, সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের তৎকালীন সহ-সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা জনাব এটিএম শামসুল হক। সেই সভাতেই মওলানা ভাসানীর ফাঁসী দাবী করা হয়েছিল এবং ফাঁসীর দাবীতে গণস্বাক্ষর অভিযান শুরু করা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে জনাব অলি আহাদের প্রাসঙ্গিক কথাটাই আমি বলতে চাই। ঠিক সেই একই কাগমারী সম্মেলনে জনাব অলি আহাদকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারের প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছিল। এর কারণ ছিল জনাব অলি আহাদ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে মওলানা ভাসানীর প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবী, সামরিক চুক্তি বিরোধী তার যে ভূমিকা, তার ভূমিকার প্রতি বলিষ্ঠ সমর্থন দিয়েছিলেন। এ পুস্তিকাটির নাম ছিল ‘পূর্ব বাংলা শ্মশান কেন’? আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব অলি আহাদ ছিলেন শেখ মুজিবুরের প্রতিদ্বন্দ্বী। শেখ মুজিবের পরিবর্তে জনাব অলি আহাদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হবেন, একথা সবাই মনে করতেন। কারণ জনাব শেখ মুজিবুর রহমান সে সময় একই সাথে প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু জনাব অলি আহাদ ‘পূর্ব বাংলা শ্মশান কেন’? এই বইটি ছাপানোর অভিযোগে আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটিতে শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং অলি আহাদকে বহিষ্কার করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। শেষ পর্যন্ত জনাব অলি আহাদকে বহিষ্কারের প্রতিবাদে ৮জন ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন। জনাব অলি আহাদকে বহিষ্কার করা হয়। এই বহিষ্কার করার মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগে ভাঙ্গনের সূচনা এবং এরই ক্রমধারায় মওলানা ভাসানী সেদিন পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তান উভয় প্রদেশের যারা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধিকারে বিশ্বাসী, তাদেরকে নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক কনভেনশন আহ্বান করেছিলেন। আমার মনে আছে, এই গণতান্ত্রিক কনভেনশন উপলক্ষে পল্টন ময়দানে সে ঐতিহাসিক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, এই জনসভায় উপস্থিত হয়েছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সীমান্ত গান্ধী বলে পরিচিত খান আবদুল গাফফার খান, পাঞ্জাব শার্দুল মিয়া ইফতেখার উদ্দিন, জিয়ে সিন্ধ আন্দোলনের নেতা জি এম সৈয়দ, আবদুল মজিদ সিন্ধী, বেলুচিস্তানের আবদুল সামাদ খান, খায়ের বখশ মারী, গাউস বখশ বেজেনজো, মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরী, মাহমুদুল হক ওসমানী প্রমুখ নেতা। পল্টন ময়দানে যে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেদিন সে জনসভায় আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদী কায়দায় হামলা চালিয়েছিল। ইতিহাসের রেকর্ডকে নির্ভূল করে রাখার জন্য আমাকে এখানে বলতেই হবে। সেই হামলার নেপথ্য হোতা ছিলেন জনাব শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং। সেদিন সে গণতান্ত্রিক কনভেনশনের উদ্যোগে যে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই জনসভায় যখন দেড়শ থেকে দুইশ লাঠিধারী এবং মারাত্মক অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছিলেন তখন সবচেয়ে বেশী নির্যাতিত হয়েছিলেন জনাব অলি আহাদ। মিয়া ইফতেখার উদ্দিনও সেদিন আহত হয়েছিলেন। কিন্তু অলি আহাদকে আমি দেখেছি যে, তার পিঠের উপর দিয়ে একের পর এক লাঠির আঘাত চলছে কিন্তু অলি আহাদ নির্ভিকভাবে তখনও ছিড়ে যাওয়া মাইকের তার সংযোগ দিচ্ছিলেন এবং জনসভাকে চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছিলেন। এই নির্ভীক অলি আহাদ সেদিন বাংলাদেশের স্বাধিকার অর্জনে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের সূচনা করেন যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছিল- সে প্রশ্নেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূুমিকা তিনি পালন করেছিলেন। 
 
দ্বিতীয় যে ভূুুমিকাটির জন্য অলি আহাদ ইতিহাসে তার স্থান করে নিয়েছেন, সেটি হচ্ছে ১৯৭১ সালের সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দিনগুলোতে তিনি মওলানা ভাসানীর সাথে মিলে সেদিন ‘আজাদ পূর্ব পাকিস্তানের’ দাবী উত্থাপন করেছিলেন। জনাব শেখ মুজিবুর রহমানের কোন প্রকার সুস্পষ্ট ঘোষনার পূর্বেই ১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানে মওলানা ভাসানী এবং অলি আহাদ সম্মিলিতভাবে স্বাধীনতার দাবী উত্থাপন করেছিলেন। জনাব অলি আহাদ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেদিন তাঁকে হুলিয়ার বেড়াজালে আবদ্ধ থেকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। এরপর বাংলাদেশ স্বাধীন হল। স্বাধীন হওয়ার পর এখানে আমি জনাব অলি আহাদের ঐতিহাসিক দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী ভূমিকার কথা উল্লেখ করতে চাই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা প্রত্যক্ষ করলাম যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের অস্ত্রশস্ত্র, গোলা বারুদসহ বিভিন্ন সম্পদ লুন্ঠন করে চলেছে। আমরা আরো প্রত্যক্ষ করলাম, বাংলাদেশকে ভারতের অর্থনৈতিক কলোনী করার জন্য একটা সুস্পষ্ট প্রয়াস চলছে। শুধু তাই নয়, তৎকালীন আওয়ামী তাঁবেদার সরকার ভারতের সাথে তথকথিত ২৫ বছরের গোলামী চুক্তি এবং ৭ দফা গোপন চুক্তি করেছিল। ফ্যাসিবাদ তার বিষাক্ত থাবা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সেদিন রক্ষী বাহিনী, নীল বাহিনী, লাল বাহিনী এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী বাহিনী নির্বিচারে দেশপ্রেমিক এবং প্রগতিশীল লোকদের হত্যা করেছিল। আনুমানিক প্রায় ৩০ হাজার দেশপ্রেমিক বীর সন্তানকে সেদিন আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী সরকার তাদের প্রত্যক্ষ মদদপুষ্ট বিভিন্ন বাহিনী দ্বারা হত্যা করেছিল। ঠিক সেই মুহুর্তে গর্জে উঠেছিলেন জনাব অলি আহাদ। সেই সময় তিনি তার পত্রিকা ‘ইত্তেহাদ’ প্রকাশ করেছিলেন। সেদিন তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন ‘আজাদ বাংলা’র। সেদিন যে কথা তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন তা হচ্ছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের শাসন এবং শোষণমুক্ত স্বদেশীকায় উদ্ধুদ্ধ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা। সেদিন তিনি নির্বিচার ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগাসনের বিরুদ্ধে তাঁর কন্ঠকে সোচ্চার করেছিলেন। নির্ভয়ে তিনি তার পত্রিকায় বক্তব্য প্রকাশ করেছিলেন। জনাব অলি আহাদের সাথে অনেকের মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে তাঁর যে ভূমিকা তা ইতিহাসে দেদীপ্যমান থাকবে। সেদিনও তিনি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযাত্রী হিসেবে সেই ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনের নেতৃত্ব সমসীন ছিলেন এবং এ কারণে জনাব অলি আহাদের সাথে শেখ মুজিবের একদিন যে অত্যন্ত প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তার পরও শেখ মুজিব তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল। ইতিহাসে একথা লিপিবদ্ধ আছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট যেদিন ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন হল, যেদিন বাকশালী একনায়কত্বের অবসান ঘটলো। দুঃশাসনের তিমিরাবরণ ভেদ করে সেদিন নবীন সূর্যের উদয় ঘটলো, সেদিন কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন জনতার নেতা অলি আহাদ। আমি আমার বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করতে চাই জনাব অলি আহাদ তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আজকের দিনে তার স্বভাব সুলভ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। যখন বাংলাদেশের এক দশমাংশ অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ আর খনিজ সম্পদে ভরপুর পার্বত্য চট্রগ্রাম আমাদের হাতছাড়া হতে চলেছে, যখন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের হাতে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য চট্রগ্রামকে তুলে দিতে চলেছে, যখন বাংলাদেশকে ভারতীয় পণ্যের বাজারে পরিণত করা হয়েছে, যখন বাংলাদেশের শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যখন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মহাসংকটের সম্মুখীন, যখন ফ্যাসিবাদ আবার তার বিষাক্ত নখর নিয়ে, বিষাক্ত থাবা নিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে আত্মপ্রকাশ শুরু করেছে, যখন বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের ওপর সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করার নতুন নীলনক্শা আঁকা হয়েছে, যখন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি যশোরে উদীচীর সাংস্কৃতিক সম্মেলনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটনার সাথে সাথে বলেছিলেন, এ ধরণের বিস্ফোরক দ্রব্য শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর হাতেই থাকতে পারে। আমরা মনে করি, আমাদের দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনী কখনোই এ ধরণের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে না। তাহলে একটি পার্শ্ববর্তী দেশের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এই ধরণের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্ম দিয়েছে। যার মাধ্যমে চলমান আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা যায় এবং তারা বিরোধী দলের ওপর আক্রমণ শুরু করতে পারে। মৌলবাদী বলে এখন যেসব ইসলামপন্থী দল আছে তাদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়েছে। কিন্তু আসল নীলনকশা হচ্ছে সামগ্রিকভাবে বিরোধী দলীয় আন্দোলনকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দেয়ার। জাতীয় জীবনের এই তমসাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতেও জনাব অলি আহাদ জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে চলেছেন। ৭ দল তথা আজকে যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার পেছনে তার অবদানকে আমরা সবাই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। পার্বত্য চট্রগ্রাম প্রশ্নে যে ঐতিহাসিক লংমার্চ হয়েছে, এ লংমার্চ শুরু করার পেছনে তাঁর যে ভূমিকা তা আমাদের সবসময় স্বীকার করতে হবে। বস্তুত আজকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য যুক্তফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা, নির্বাচনী ঐক্য এবং একটি দেশপ্রেমিক জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা সকল জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামী শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পেছনে তিনি আন্দোলনের মস্তিষ্কের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। আমি তার দীর্ঘ জীবন কামনা করছি এবং পরম করুণময় আল্লাহ তাআ’লার কাচে প্রার্থনা করছি, আল্লাহ আমার পরমায়ূ নিয়ে হলেও যেন জনাব অলি আহাদকে দীর্ঘজীবন দান করেন এবং তাঁর প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের বর্তমান আন্দোলনকে মঞ্জিলে মকুসদে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ইতিহাস নির্ধারিত ভূমিকা পালন করেন। এ প্রসঙ্গে আমি একটি কথা বলতে চাই। যারা অলি আহাদের এই সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেছেন, তারা অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। আমাদের জাতিও একটি বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি হিসেবে পৃথিবীর কাচে পরিচিত। আমরা সাধারণত আমাদের দেশের যারা বীর সন্তান তাদেরকে তাদের জীবিত অবস্থায় সম্মান করতে জানি না কিন্তু জনাব অলি আহাদ তার জীবদ্দশাতেই আজকে যে সম্মান পেয়েছেন সেজন্য জনাব অলি আহাদ  জাতীয় সংবর্ধনা কমিটিকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। এ প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই যে, আজকের এই সভায় বিরোধী দলের সম্মানীয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয় এ সমাবেশের প্রধান অতিথি হয়ে তিনি শুধু জনাব অলি আহাদের প্রতি সংবর্ধনা জানাননি, তাকেই শুধু সম্মানিত করেননি তিনি সমস্ত রাজনীতিবিদদেরও সম্মানিত করেছেন। সে জন্য আমি তাকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”
খোদা হাফেজ // বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।