অগ্রজতুল্য অলি আহাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি -এমাজ উদ্দীন আহমদ

ফন্ট সাইজ:
দেশের অন্যতম বরেণ্য জননেতা অলি আহাদকে আমি চিনি আমার ছাত্রাবস্থা থেকেই। আজও মনে আছে, ১৯৫২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই এবং ঐ দিনই ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে হলে আসি। ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হই দুটি কারণে। এক, হলটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের খুব কাছাকাছি। কাছাকাছি বলছি এজন্যে যে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন ছিল আজকের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হসপিটালের পূর্বাংশ। দুই, ফজলুল হক মুসলিম হল তখন ছিল প্রগতিবাদী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু । এমনিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বরাবর চি‎িহ্নত হয়েছে জনস্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার এবং ফজলুল হক মুসলিম হল ছিল তারই হৃদয়স্বরূপ। বলতে কোনো দ্বিধা নেই, ফজলুল হক মুসলিম হকের সাবেক ছাত্র হিসেবে আজও আমি গর্ব অনুভব করি।
হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে জানার সুযোগ হয়েছিল এই হলের সাবেক ছাত্র নেতাদের সম্পর্কে। জেনেছিলাম তখন ফজলুল হক মুসলিম হলের নেতৃস্থানীয় ছাত্র অলি আহাদ সম্পর্কে। তখন তাঁকে যে শ্রদ্ধার চোখে দেখেছি আজও তা অব্যাহত রয়েছে। আজও তিনি আমার অগ্রজতুল্য, শ্রদ্ধেয়, পরম আকর্ষনীয় এক জাতীয় নেতা। তাঁর লেখা জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫’ গ্রন্থটি রিভিউ করেছিলাম ১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি। বাংলাদেশে রাজনীতি সম্পর্কে, এর গতি প্রকৃতি, রাজনীতির প্রধান লবকুশীদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, হাজারো ঘটনাক্রমের বিন্যাস সম্পর্কে, বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতির মর্মবাণী সম্পর্কে তাঁর যে অর্ন্তদৃষ্টি তা আমাকে অভিভূত করে। বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর এই গ্রন্থটিই সর্বাধিক বস্তুনিষ্ঠ। হাজারো টানাপোড়েনে ক্লিষ্ট বাংলাদেশে রাজনীতি ক্ষেত্রে এমন সব বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং সত্যের পথ এমনভাবে কণ্টকিত হয়েছে যে, সঠিক পটভূমিকা ব্যতীত তার যথার্থ অনুধাবন সম্ভব নয়। রাজনীতিক অলি আহাদ এই পটভূমিকা উপস্থাপন করে বাংলাদেশ রাজনীতির বিশ্লেষক ও গবেষকদের জন্যে তৈরি করেছেন উর্বরতম ক্ষেত্র।
রাজনীতি ক্ষেত্রে যে পথটি অত্যন্ত সহজ এবং পরিচিত অর্থাৎ অর্থ বিত্তের আকর্ষণে পথ চলা, ক্ষমতার করিডোরে পা রেখে দায়িত্বহীনভাবে ছুটে চলা, পদ ও পদবির আকর্ষণে চার দিককে টালমাটাল করা, সে পথ তাঁর ছিল না। ছিল না মন্ত্রীত্ব লাভের উদগ্র আকাঙক্ষা। আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলনের সমুদ্র মন্থনে যে অমৃত উঠে এসেছিল তাতে তিনি ভাগ না বসিয়ে স্বেচ্ছায় গলগধকরণ করেছেন গরলকেই এবং সেই গরল পান করেই তিনি হয়েছেন নীলকণ্ঠ। হয়ে রয়েছেন কালের সাক্ষী। তাঁর এই ভূমিকাই তাঁকে রাজনৈতিক মহলে করেছে সর্বজন শ্রদ্ধেয়, করেছে কালজয়ী ত্যাগী প্রাজ্ঞ রাজনীতিক। তিনি প্রতিনিয়ত অনুধাবন করেছেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা হলো কল্যাণমুখী কর্তৃত্ব, প্রভাব বা বৈভব অর্জনের নয়, ক্ষমতার বলয় বৃদ্ধির মাধ্যমও নয়। ছাত্রাবস্থায় তিনি অনুভব করেছিলেন, অনগ্রসর এই জনপদের জনসমষ্টির জীবনমান উন্নয়নই মুখ্য বিষয় এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যেই তিনি ছাত্র রাজনীতিকে বেছে নিয়েছিলেন। বলতে কোনো দ্বিধা নেই, চল্লিশের দশকের সমাপ্তি পর্বে এবং পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধে এদেশে ছাত্র রাজনীতির যে গৌরবজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি হয় তার মূল ছিল অলি আহাদের মতো দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, প্রাজ্ঞ, একনিষ্ঠ, সৃজনশীল ছাত্রনেতার অবদান। বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় ঐতিহ্যের সৃষ্টিকর্তাদের অন্যতম হলেন অলি আহাদ। বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ এবং ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা চিরস্মরণীয়। তাঁকে শুধু ভাষা সৈনিক বলা ঠিক নয় এক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল সেনাপতির। 
বাংলাদেশের রাজনীতি এক খরস্রোতা স্রোতস্বিনীর মতো। হাজারো দিকে বাঁক নেয়া, অসংখ্য স্রোতধারায় সমৃদ্ধ এবং জাতীয় স্বার্থের নিরিখে সূচিত আষাঢ়-শ্রাবনে দুকূল ছাপিয়ে ওঠা বৈশিষ্ট্যময় গতিময়তায় এদেশের অনেক সুসন্তান  এই প্রবাহে অবদান রেখেছেন। তাদের কেউ হয়েছেন কালোত্তীর্ণ, কালজয়ী। কেউ কেউ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছেন। অলি আহাদ কিন্তু আজো দাঁড়িয়ে রয়েছেন। স্বল্প-উচ্চতা সম্পন্ন এই জনারণ্যে বিরাট মহীরুহের মতো। কেউ কেউ তর্জনী নির্দেশ করে তার অবমূল্যায়নে প্রবৃত্ত হয় বটে, কিন্তু জনস্বার্থের সার্থক অভিভাবক রুপে, জাতীয় স্বার্থের ধারক রূপে, কল্যাণকর রাজনৈতিক লক্ষ্যের প্রবক্তা রূপে আজো তিনি রয়েছেন এই জনারণ্যে প্রবল প্রকান্ড অশ্বত্থের মতো মাথা উঁচু করে। তাঁর তুলনা শুধু তিনি নিজেই। জাতীয় সংকটকালে এসব ব্যক্তিত্বের বাণী সাবধান বাণীর মতোই, অনেকটা বিবেকের বাণী তুল্য।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন গ্রহণের মুখে, সংশয়ে ও দ্বিধায় আচ্ছন্ন। যুক্তির জোর এখন জোরের যুক্তির নিকট অবনতমস্তক। কল্যাণমূলক প্রত্যয় এখন ক্ষমতার রাজনীতির হাতে বন্দী। গণতন্ত্রের কথা সবাই জোরে শোরে উচ্চারণ করলেও সমাজ জীবনের সর্বস্তরে অগণতান্তিদ্রকতা প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করেছে। অধিকার সমুন্নত রাখার অঙ্গীকারে ক্ষমতাসীন হয়েও কোনো সরকার নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে সাফল্য লাভ করেনি। অধিকার দায়িত্ববোধের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত হয়নি। সুশাসনের পাঠ এখনো আমাদের প্রশাসকদের সমাপ্ত হয়নি। স্বশাসনের দাবি এখনো আদর্শিক। এমনি দুঃসময়ে কোন দিকে তাকাবে সমাজ ? এহেন অন্ধকারে আলোর  দিশা কে দেবেন ? আমার তো মনে হয় অলি আহাদের মতো ব্যক্তিরা এখনো এ সমাজে রয়েছেন। তাদের ন্যায়নিষ্ঠতা এখনো পথ দেখাতে সক্ষম। সুশাসন ও স্বশাসনের দাবি নিভৃতে ক্রন্দনরত হলেও অলি আহাদের মতো প্রাজ্ঞ রাজনীতিকদের আদর্শ এই দুঃসময়ে হতে পারে পথের ঠিকানা। তারাই হতে পারেন এই ঘন অন্ধকারে আলোর দিশারী। আজকে তাই তাঁকেই স্মরণ করছি। স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধা ভরে।
[প্রফেসর এমাজ উদ্দীন আহমদঃ সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]