অলি আহাদ ও বায়ান্ন ভাষা আন্দোলন -আনিসুজ্জামান

ফন্ট সাইজ:
ঢাকার প্রিয়নাথ হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাম করে আমরা তিন বন্ধু-সৈয়দ আহমদ হোসেন, নেয়ামাল বাসির, আর আমি ১৯৫১ সালে জগন্নাথ কলেজে প্রথম বর্ষ আই এ ক্লাসে ভর্তি হই। আমাদের মধ্যে আহমদ ছিল সবচেয়ে রাজনীতিমনস্ক। নেয়ামাল ও আমার রাজনীতি করার কোনো বাসনা ছিল না, কিন্তু দেশের ভালোমন্দ  নিয়ে ভাবনা ছিল মনে। আমদের অগ্রজপ্রতিম বন্ধু খোন্দকার আনোয়ার হোসেন ছিলেন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী। তিনি আমাদের ঠেললেন পূর্ব পাকিস্তান  যুবলীগের দিকে।
এরই মধ্যেই শান্তিনগরের ভাড়া বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি নিজস্ব ঠিকানা ঠাটারিবাজারে ৮৭ বামাচরণ চক্রবর্তী রোডে। অদূরে যোগীনগর লেন, তার ৪৩/১ নম্বর বাড়িতে যুবলীগের অফিস। এই দোতালা বাড়ির ওপর তলায় সহ-সভাপতি মোহাম্মদ তোয়াহা সপরিবারে বাস করতেন। নিচের তলায় ছিল যুবলীগের অফিস। সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদও ওই বাড়িতেইথাকতেন-খুব সম্ভব তোয়াহা সাহেবের পরিবারভূক্ত হয়ে। 
অলি আহাদের সম্পর্কে প্রথমে শুনেছিলাম আমার মামাতো ভাই সৈয়দ কামরুজ্জামানের কাছে। সেই ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এসসি পড়তেন সংখ্যাবিজ্ঞানে। তাঁর কাছে ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে অলি আহাদের সাহসী ভূমিকার কথা শুনি। অলি আহাদ যে জিন্নাহকে মুখের ওপর বলেছিলেন যে, আপনি পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল হলেও আমাদের আবেদনক্রমে ইংল্যান্ডের রাজা ওই পদ থেকে আপনাকে সরিয়ে দিতে পারেন, তা শুনে রীতিমতো বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম। আরো জানতে পারি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি কম (পাস) পরীক্ষা দিয়ে অলি আহাদ প্রথম স্থান অধিকার করেন, কিন্তু তাঁর এম কম ক্লাসে ভর্তি হতে দেন নি। ভালো ছাত্রের প্রতি সবারই শ্রদ্ধাবোধ থাকে; তার ওপরে, তাঁর প্রতি এই অবিচারের কথা জেনে মানুষটিকে আমি প্রথমাবধি খুব সম্মানের চোখে দেখতে শুরু করি।
আমরা তিন বন্ধুই যুবলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েছিলাম শিথিলভাবে। অফিসটা আমার বাড়ির কাছে হওয়ায় আমি সেখানে বেশি যেতে এবং বেশিক্ষন থাকতে পারতাম। আমার পূর্ব পরিচিতদের মধ্যে প্রকৃত প্রস্তাবে একমাত্র কে জি মুস্তাফা ছিলেন যুবলীগে এসেই এক এক করে পরিচয় হয় মোহাম্মদ ইমাদুল্লাহ, মোহাম্মদ সুলতান, তাজউদ্দীন আহমদ, এম এ ওয়াদুদ, কামরুদ্দিন আহমদ, প্রাণেশ সমাদ্দার, ডাক্তার এম এ করিম, মোতাহার হোসেন সিদ্দিকী,মীর্জা গোলাম হাফিজ, উর্দূভাষী সৈয়দ ইউসুফ হাসান, ঢাকা শহরের নেতৃত্বস্থানীয় আদি বাসিন্দা আবদুল হালিম, নারায়ণগঞ্জের শামসুজ্জোহা ও শফি হোসেন খান, বরিশালের আলী আশরাফ, ফেনীর খাজা আহমদ ও আবদুল জব্বার খদ্দর, ময়মনসিংহের আবদুর রহমান সিদ্দিকী ওরফিকুল হোসেন, কুমিল্লার মফিজুল ইসলাম, সিলেটের নূরুর রহমান, পীর হাবিবুর রহমান ও তারা মিয়া, চট্টগ্রামের চৌধুরী হারুনুর রশীদ, বগুড়ার গোলাম মহিউদ্দীন, ঢাকা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সৈয়দ আবদুর রহিম মোক্তার  ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল মতিন, এস এ বারী এটি, আবদুস সামাদ (পরে আবদুস সামাদ আজাদ) বাহউদ্দিন চৌধুরী, আনোয়ারুল হক খান এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মনজুর হোসেনের মতো অনেক নেতা কর্মীকে। যুবলীগ অফিসের পাশে একটি বাড়িতে আবুল হাসনাত ও আবুল বরকত দুই ভাই থাকতেন-তাঁদের মধ্যে বরকতই যুবলীগে বেশি আসা-যাওয়া করতেন। যুবলীগে আমি যোগ দেওয়ার পরে ডিসেম্বরের শেষে ঢাকায় সংগঠনের বার্ষিক সম্মেলনের আয়োজন শুরু হয়। চিঠিপত্র দিয়ে পূর্ববঙ্গের প্রতিটি জেলার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে অলি আহাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। আমি তাঁকে সাহায্য করতে শুরু করি এবং অল্পকালের মধ্যে তিনি আমাকে যুবলীগের কাজকর্ম ইংরেজিতেই হতো ভাষা আন্দোলনের সময়েও। প্রায় ভাঙ্গা একটা টাইপ রাইটার ছিল অফিসে-তাতে আমি দু আঙ্গুলে টাইপ করতাম, সাধারণ সম্পাদকের হয়ে স্বাক্ষর দিতাম, খামে ঠিকানা লিখে ডাকে দিয়ে আসতাম।
ডিসেম্বরের শেষ দুই দিনে ঢাকা বারের মিলনায়তনে যুবলীগের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। সভাপতি মাহমুদ আলী এলেন সিলেট থেকে। তিনি ও অলি আহাদ স্ব স্ব পদে পুনর্নিবাচিত হলেন। ইমাদুল্লাহ ও সুলতান যুগ্ন সম্পাদক হলেন। সম্মেলনে সারা দেশ থেকে প্রতিনিধি এসেছিলেন। ঢাকায় যাঁরা খুব সক্রিয় ছিলেন না যেমন, মাহমুদ নূরুল হুদা তাঁরাও যোগ দিয়েছিলেন। সম্মেলনের বিরতির সময়ে দুই সাংবাদিক -এস এম আলী ও এ বি এম মুসা আমাকে ডেকে জানতে চেয়েছিলেন, যুবলীগে আমি কেন সম্পৃক্ত হয়েছি। কী জবাব দিয়েছিলাম, তা মনে নেই, কিন্তু মনে হয় তাঁরা তা শুনে অখুশি হন নি। সম্মেলনে খুব সফল হয়েছিল। তার জন্যে প্রধান কৃতিত্ব ছিল অলি আহাদের সাংগঠনিক ক্ষমতার।
সম্মেলনের রেম হতে না হতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন পূর্ব পাকিস্তান সফরে এলেন এবং ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারিতে পল্টন ময়দানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ঘোষণা করলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এর প্রতিক্রিয়া ঘটলো সঙ্গে সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবানে ৩০ জানুয়ারিতে ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট ও সভা হলো। সেদিন সন্ধ্যায় বার লাইব্রেরিতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভপতিত্বে সর্বদলীয় একটি সভা হয়। হল ভরে গিয়েছিল লোকে, আমিও এক কোণে দাঁড়িয়েছিলাম। সেখানে কাজী গোলাম মাহবুবকে আহবায়ক করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এই সভাতেই ঢাকায় ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট, ১১ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস এবং ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশন শুরুর দিনে প্রদেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ও সভা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ছিল একটি শিথিলবদ্ধ সংগঠন। এর শরিকরা যার যার মতো আন্দোলনে সংগঠিত হচ্ছিলেন। রাজনৈতিক দলের মধ্যে এতে ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ ও খেলাফতে রব্বানী পার্টি তবে শেষটির তেমন শক্তি ছিল না, এর সমর্থকরা যুক্ত ছিলেন প্রধানত তমুদ্দিন মজলিসের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের জোরালো সংগঠন ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবসিক হলগুলিতে, মেডিক্যাল কলেজে, জগন্নাথ কলেজে আলাদা করে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে উঠেছিল  এবং সকল জেলা শহরে ও অনেক মহকুমা শহরেও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদকে সক্রিয় রাখতে অলি আহাদ অনেক সময় ও শ্রম  দিয়েছিলেন। তাছাড়া, যুবলীগের সকল ইউনিটকে আন্দোলনের কাজে সমস্ত শক্তি নিয়োগ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আন্দোলনের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে একটি পুস্তিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং তা লেকার বার দেওয়া হয় মোহাম্মদ তোয়াহাকে। তিনি যখন লিখতে সময় পাচ্ছিলেন না, তখন অলি আহাদ স্থির করেন, যুবলীগের পক্ষ থেকেই অমন একটি পুস্তিকা প্রচারিত হবে। সেটা লেকার বার তিনি আমাকে দিয়েছিলেন। আমি লিখে দিলে তিনিই তা সংশোধন করে ছেপে বের করেন। পুস্তিাকার নাম ছিল ‘রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন সাব-টাইটেল ছিল ‘কি ও কেন?’ লেখক হিসেবে এতে কারো নাম ছিল না, শুধু যুবলীগের প্রকাশনা হিসেবেই এটা উপস্থাপিত হয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্পর্কে এটাই ছিল ফেব্রুয়রী মাসে প্রকাশিত প্রথম পুস্তিকা। পরে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পুস্তিকাটি বের হয়। সেটি লিখেছিলেন বদরুদ্দীন উমরঃ আমার লেখাটার চেয়ে সেটি আরেকটু বড়ো ও ভালো ও হয়েছিল।
৪ তারিখে আমরা ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট করলাম। আমি গিয়েছিলাম পোগোজ ও সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে ধর্মঘট করাতে। প্রথমটা নির্বিঘ্নে ঘটলো, কিন্তু সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলের সামনে দাঁড়াবার কিছুক্ষণ পরে পুলিশ এসে যাওয়ায় পিঠটান দিতে হলো। কলেজে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আগেই গঠন করা হয়েছিল, তার উদ্যোগে সভা করা হলো। ১১ তারিখে ট্রেনে  ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে কয়েকবার আসা-যাওয়া করে আন্দোলনের জন্যে কিছু অর্থ সংগ্রহ করলাম। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের প্রাদেশিক প্রধান অফিস ছিল আমাদের কলেজের সামনে। অলি আহাদের নির্দেশে সেখানে বার দুই গিয়েছিলাম কর্মচারী সমিতির এক নেতার সঙ্গে ২১ তারিখের ধর্মঘট সম্পর্কে আলাপ করতে। উত্তেজনার মধ্যেই দিন কাটছে, কেননা এমন অভিজ্ঞতা আমার পক্ষে নতুন। ২০ফেব্রুয়ারী বিকেলের পরে কলেজ থেকে বাসায় ফিরছি, হঠাৎ মাইক্রোফোন যোগে পরদিন ১৪৪ ধারা জারি করার ঘোষণা শুনে একেবারে বিমুঢ় হয়ে গেলাম। আমার সঙ্গে আহমদ, নেয়ামাল ও আরো দু-একজন ছিল। সকলে ফিরে এলাম কলেজে, সেখানে কিছু কথাবার্তা বলে আমার বাসায় এলাম। যুবলীগ অফিসে খোঁজ নিয়ে জানলাম সন্ধ্যায় নবাব পুর রোডে আওয়ামী  লীগ অফিসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। আমরা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য নই, তবে অনেক বলে কয়ে জগন্নাথ কলেজ সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আহমদ হোসেন ও আমাকে পর্যবেক্ষক হিসেবে সভায় উপস্থিত থাকতে দেওয়া হলো। আমাদের আর কজন বন্ধুকে নিয়ে নেয়ামাল সভাস্থলের সামনে রাস্তার ওপরে অপেক্ষা করতে লাগলো সিদ্ধান্ত জানার আশায়। 
সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগলো। মওলানা ভাসানী ঢাকায় ছিলেন না, তাই সভাপতিত্ব করলেন আবুল হাশিম। বেশির ভাগই ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে। তাঁদের মূল বক্তব্য ছিল যে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে সরকার দমননীতির আশ্রয় নেবে, তাতে গণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পরের বছরে পূর্ববঙ্গে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা, সরকার সেটা বন্ধ করার সুযোগ পাবে। অলি আহাদ আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন, ১৪৪ ধারা জারি হলেও আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। বৈঠকে তিনি খুব জোর দিয়ে এই অন্যায় আদেশ অগ্রাহ্য করে সরকারের আন্দোলন দমন করার প্রয়াস ব্যার্থ করে দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁকে সমর্থন করে বক্তৃতা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক আবদুল মতিন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি গোলাম মওলা এবং ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি সামসুল আলম। আমরা ভেবেছিলাম, মোহাম্মদ তোয়াহাও অলি আহাদের প্রস্তাব সমর্থন করবেন। তিনি কয়েকবার ঘরের বাইরে গেলেন এবং শেষ পর্যন্ত অধিকাংশের পক্ষেই মত দিলেন। পরে শুনেছিলাম, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার বিষয়ে তিনি কমিউনিষ্ট পার্টির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন, কিন্তু তেমন কোনো সিদ্ধান্তের সংবাদ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সংঘাত এড়াবার পক্ষে মত দেন। যুবলীগের দুই নেতা যাঁরা এক সঙ্গে থাকতেন তাঁদের এই মতপার্থক্য দেখে আমরা অবাক হয়েছিলাম। সভায় সংখ্যাধিক্যের ভোটে সিদ্ধান্ত হলো যে,১৪৪ ধারা জারির পরিপ্রেক্ষিতে ২১ তারিখের কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হলো তবে সংগ্রাম পরিষদের কোনো সদস্য যদি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু করে কিংবা ২১ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠেয় সভায় যদি এই সিদ্ধান্ত উপেক্ষিত হয়, তাহলে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ আপনা থেকেই ভেঙে যাবে।
সভা ভাঙতে অনেক রাত হলো। অলি আহাদ আমাদের বললেন, পরদিন যথাসময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের প্রাঙ্গণে উপস্থিত থাকতে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি মুজিবুল হকের সঙ্গে আমি খানিক দূর হেঁটে এসেছিলাম। বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত সবাই মানবে কিনা, তাঁর কাছে একথা জানতে চাইলে তিনি চিন্তিতভাবে বললেন কো যাক। এর মধ্যে আহমদ হোসেনের খোঁজে তার এক প্রতিনিধি হারিকেন হাতে বেরিয়ে পড়েছিলাম। 
নবাবপুর ও ঠাটারিবাজারের সংযোগস্থলে তিনি তাকে পেলেন। নেয়ামাল চলে গেল আলু বাজারে তার মেসে। আমি বাড়ির পথ ধরলাম। তবে স্থির হলো, পরদিন সকালে বন্ধুরা আগে আমার বাড়িতে জড়ো হবে, তারপর সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া যাবে। 
যতোদূর মনে পড়ে, নেয়ামাল বাসির, তোফাজ্জল হোসেন, আবদুর রহিম, আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারুল ইসলাম ও শফিকুর রহমান সবাই জগন্নাথ কলেজের আগে-পরের চাত্র-আমাদের বাসায় জমায়েত হয়। আমার মা ও বোন সকলকে পরটা-ডিম খাইয়ে দিলেন যাত্রার আগে। মা আমাকে জিজ্ঞাস করছিলেন, পুলিশ যদি আমাদের ধরে নিয়ে যায়, তাহলে ছাড়িয়ে আনার জন্য কোথায় কার কাছে তদবির করতে হবে। এতে বোঝা যায়, সেদিন যে একটা সংঘাতময় ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, অন্তঃপুর বাসিনীরাও তা অনুমান করতে পড়েছিলেন। 
১৪৪ ধারা বাঁচিয়ে আমরা কলা ভবনের প্রাঙ্গণে পৌঁছে বিপুল জনসমাগম দেখি। ছাত্র ও সাধারণজনের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি বেশ উত্তেজনাকর হয়ে ওঠে। পরে জানতে পারি, ফজলুল হক মুসলিম হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কিছুসংখ্যক নেতৃস্থানীয় ছাত্র আগের রাতেই অনানুষ্ঠানিক সভা করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কলাভবন প্রাঙ্গণে গাজীউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সেই সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক আগের রাতে গৃহীত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত ও তার যৌক্তিকতা সকলকে জানান, তবে সভা তা মানতে রাজি হয়নি। অধিকাংশ বক্তাই ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে মত দেন। অলি আহাদ সে-সময়ে মধুর দোকানে বসে ছিলেন-তিনি বক্তৃতা দেন নি। তবে যাঁরাই তাঁকে বক্তৃতা দিতে বলেছিল বা তাঁর মতামত জানতে চাইছিল, তাদের সবাইকে তিনি বলেছিলেন যে, আগের রাতে তিনি ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে কথা বলেছিলেন, সেটা না করলে আন্দোলনের বড়োরকম ক্ষতি হবে, তবে বক্তৃতা দিয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভাঙ্গার দায়িত্ব তিনি নিতে চান না।
১৪৪ ধারা ভাঙ্গার প্রস্তাব সভায় গৃহীত হলো, প্রথম দশজনের দলটি বেরিয়ে গেল। অলি আহাদ আমাকে মধূর দোকানের সামনে ডেকে নিয়ে যুবলীগ অফিসের চাবি দিয়ে বললেন যে, যে কোনো মুহূর্তে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে যেতে পারেন। অফিসের দায়িত্ব আমার থাকবে। ইমাদুল্লাহ যাতে গেফতার না হন, সেই চেষ্টা করা হবে-তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আমি যেন কাজ করি।  অবস্থা বুঝে অফিসের কাগজপত্র নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে হবে এবং সকল ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাকতে হবে। এই দায়িত্ব আমার ওপরে রইলো বলে আমি যেন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে না যাই। আমি তাঁর কথা অনুযায়ী কাজ করেছিলাম। তবে আমার সহপাঠিদের মধ্যে নেয়ামাল বাসির ও আমীর আলী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে কারাবরণ করেছিল।
আইনভঙ্গকারীদের সামাল না দিতে পেরে পুলিশ কলাভবনের গেটে মৃদু লাঠিচার্জ করে। তাতে কাজ না হওয়ায় কাদাঁনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। আমাদের দিক থেকে ইট পাটকেল ছোড়া হয় পুলিশকে লক্ষ করে-নেতারা নিষেধ করলেও সে কথা কেউ শোনেনি। আমি গা থেকে গেঞ্জি খুলে পুকুরে তা ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম চোখে পানি দেবো বলে। তখন কলাভবনের দোতলার বারান্দায় ভাইস-চ্যান্সেলর ডক্টর সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনকে দেখতে পাই। অন্য ছাত্রদের পিছু পিছু আমিও তাঁর দিকে গিয়েছিলাম। ছাত্রদের দাবিতে ভাইস-চ্যান্সেলর কথা দেন, তিনি পুলিশের আচরণের প্রতিবাদ করবেন।
নিচে নেমে দেখি, মধুর দোকানের কাছে কলাভবন আর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে লোহার যে রেলিং ছিল, সকলে মিলে সেটা ভেঙ্গে ফেলেছে এবং ওই পথ দিয়ে প্রথমে হাসপাতালের প্রাঙ্গণে এবং পরে আরেকটু পশ্চিমে মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলের গেট দিয়ে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় বের  হবার চেষ্টা করলে পুলিশ আবার লাঠিচার্জ করে এবং কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এক সময়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ আমাকে সতর্ক করে দেন যে, গুলি চলতে পারে।  তার কিছুক্ষণ পরই গুলিবর্ষণ হয়। 
গুলি চলার পরপরই আমরা শুনতে পাই, আবুল বরকত, সালাম ও রফিকউদ্দীন নামে তিনজন ছাত্র নিহত হয়েছে। এই সালামকে আমরা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র এবং আন্দোলনের কর্মী বলে ধরে নিয়েছিলাম। তিনি মারা যাননি, পরে মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের একটি ঘরে মাইক্রোফোন বসানো হয় গুলিবর্ষণের পরে। যিনি পারছিলেন, তিনিই বক্তৃতা করছিলেন। তোয়াহা সাহেব ইংরেজিতে করতে যতো পারদর্শী ছিলেন, বাংলায় তেমন বলতে পারতেন না। তিনি আমাকে বক্তৃতা লিখে দিতে বললেন। আমি লিখে এক এক পাতা তাঁর হাতে দিই, তিনি তা দেখে বক্তৃতা করেন। কিন্তু বলার গতি সব সময়ে লেখার গতির চেয়ে দ্রুত হয়-তাল সামলাতে পারছিলাম না। শেষে তাঁর ইঙ্গিতে আমিও একটা বক্তৃতা দিই পুলিশের উদ্দেশো। খানিক পরে ব্যবস্থাপক পরিষদ থেকে বেরিয়ে এসে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সেখান থেকেই বক্তৃতা করেন।
কলাভবনের পেছন দিকে রেল লাইন ধরে সন্ধ্যার দিকে আমি বাসায় ফিরি। জানতে পারি, সান্ধ্য আইন জারি হয়েছে।
অলি আহাদ তখন থেকে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলেই ঘাঁটি গাড়লেন। প্রকৃতপক্ষে ২১ ফেব্রুয়ারী রাত থেকে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলই হয়ে ওঠে আন্দোলনের সদর দপ্তর। ২২ তারিখ সকালে ওই হোস্টেলের প্রাঙ্গণে গায়েবি জানাজা এবং ইমাদুল্লাহ্র সভপতিত্বে মানুষের বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দেন। আমি তখন নেয়ামালের জামিনের জন্যে আমার ভাই সৈয়দ কামরুজ্জামানের সঙ্গে সৈয়দ আবদুর রহিম মোক্তারের বাড়ি এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বৃথাই ঘুরে ফিরছিলাম। আদালত থেকে ফেরার পথে নওয়াবপুর রোডে যেখানে সেদিন গুলি চলেছিল, সে জায়গাটা দেখি এবং দূর থেকে ‘সংবাদ’ অফিসে লাগানো আগুন ও আগুন লাগানো ‘মনিং নিউজ’ অফিসের ধোঁয়া দেখতে পাই। তবে অলি আহাদের সঙ্গে সেদিন আমার খো হয় নি। তারপরে আমি অনেকবার মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে গিয়ে আবদুল মতিন, আহমদ রফিক ও সাদেক খান প্রমুখ নেতা ও কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, কিন্তু তাঁর সাক্ষাৎ পাইনি। ২৩ ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদের প্রচেষ্টায় গুলিবর্ষণের জায়গায় রাতারাতি শহীদ মিনার তৈরী হয়। ‘আজাদ’ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন যিনি গুলিচালানার প্রতিবাদে ব্যবস্থাপক পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন, তিনিি তা উদ্বোধন করেন। মওলানা তর্কবাগীশ ছোটো একটি বক্তৃতা  দিয়ে মোনাজাত করেছিলেন। অসংখ্য মানুষ শহীদ মিনারে টাকা পয়সা দান করেছিলেন। আমার মা সেখানে একটি সোনার চেন দিয়ে আসেন। চেনটি ছিল আমার ছোট একটি মৃত বোনের- সেখানে তার স্মারক হিসেবে মা সেটি রক্ষা করেছিলেন। পরে পুলিশ শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে দেয়, সে সময়ে আমরা অনেকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ছিলাম। অশ্রু রুদ্ধ কন্ঠে ইমাদুল্লাহ ‘ক্যামেরা, ক্যামেরা’  বলে চিৎকার করছিলেন, আর বলছিলো ওরা মিনার ভাঙছে কেউ একটা ছবি তুলে রাখো।’ 
২২ বা ২৩ ফেব্রুয়ারিতে ইমাদল্লাহ্ আর আমি যুবলীগ অফিস থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র  আর টাইপরাইটারটা আমাদের বাসায় নিয়ে আসি। পরে পুলিশ অফিস সিল করে দেয়। কিন্তু ইউনিট গুলোর ঠিকানা আমাদের কাছে থাকায় ইমদিুল্লাহ্ স্বাক্ষরে সেখানে চিঠিপত্র পাঠাতে পারি।
এর মধ্যে আন্দোলনে ভাটা পড়তে শরু হয়। সেই সুযোগে ২৮ তারিখে অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, কাজী গোলাম মাহবুব, আবদুল মতিন ও শামসুল হক প্রমুখ নেতার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি মারফত বেরিয়ে যায়। তাঁরা অনেকে এ ক’দিন প্রায় আত্মগোপনে  আছেন। তবে কেউ চিরকুটে একটি বিশেষ শব্দ লিখে আনলে বুঝতে হবে যে, তিনিই তাকে পাঠিয়েছেন। আমি প্রথম চিরকুট পাই চিকিৎসক আবদুল করিমের হাতে। তিনি জানালেন, এরপর যিনি চিরকুট নিয়ে আসবেন, আমি যেন বিনা প্রশ্নে তাঁর সঙ্গে যাই। দ্বিতীয় চিরকুট নিয়ে এলো আমার পূর্বপরিচিত আশারাফুল ইসলাম এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যাপনা করেন। তাঁর সঙ্গে দক্ষিণ মৈশন্ডির ভূতের গলিতে এক বাসায় গিয়ে অলি আহাদকে পেলাম। তিনি জানতে চাইলেন, শান্তিনগরে ডাক্তার মোতালেবের বাড়ি আমি চিনি কিনা। ডাঃ মোতালেব ছিলেন আমার অগ্রজপ্রতিম বন্ধু আব্দুল মালেকের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, সুতরাং তাঁর বাসা আমি ভালো করে চিনতাম। অলি আহাদ বললেন সন্ধ্যার পরে সেখানে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা বসবে সেখানে তাঁকে পৌঁছে দিতে হবে। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে রিকশায় চেপে আহাদ ভাই ও আমি শান্তিনগরে রওনা হলাম। নির্দিষ্ট জায়গায় তাঁকে পৌঁছে দিয়ে আমি হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরলাম। আমি যেহেতু সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলাম না, সেহেতু ওই বৈঠক আমার উপস্থিতি থাকার কথা ওঠেনি। এমনকী, আহাদ ভাইকে ফিরিয়ে আনার জন্যেও আমাকে থাকতে বলা হয়নি।
আমি অন্যত্র লিখেছিলাম এবং আরো কেউ কেউ লিখেছেন যে, সভাটা হয় ফেব্রুয়ারির শেষে। অলি আহাদ লিখেছেন, ৭ মার্চ, শুক্রবার, সন্ধ্যা সাতটায়। সেই রাতেই ডাঃ মোতালেবের বাড়ি ঘেরাও করে অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন, মীর্জা গোলাম হাফিজ, মুজিবুল হক ও হেদায়েত হোসেন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে। কাজী গোলাম মাহবুব মাচার উপরে শুয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করেন। সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের বাইরে সভার খবর জানা ছিল মাত্র কয়েকজনের। নেতারা ধরা পড়ার পরে তার জন্যে একেকজন আমাদের একেজনকে দায়ী করতে থাকেলেন। কেউ দায়ী করলেন ডাঃ মোতালেবের ভাই আবদুল মালেককে- সে কথা তাঁর কানে যাওয়ার রটনার উৎস বলে আমাকে গণ্য করে আমাকে গণ্য করে তিনি ছিলেন হেদায়েত হোসেন চৌধুরীর বন্ধু এবং মুসলিম লীগের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন। মোহাম্মদ তোয়াহা মনে করেন, মুজিবুল হক বা হেদায়েত হোসেন চৌধুরীর কাছ থেকে খবর বেরিয়ে যায়। কাজী গোলাম মাহবুব দায়ী করেন আমাকে।
কাজী গোলাম মাহবুব যদিও শান্তিনগরের বাড়িতে গ্রেপ্তার এড়াতে পারেন, তবে সরকারের দেওয়া সময়সীমার মধ্যে তিনি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। জেলে গিয়ে তিনি তাঁর সন্দেহের কথা অলি আহাদকে জানান। তাঁর একটা ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, গোয়েন্দা বিভাগে বশীর নামে আমার কোনো আত্মীয় কাজ করতেন (আমার এমন কোনো আত্মীয় ছিলেন না) এবং আমার কাছ থেকে সভার খবর তাঁর কাছে পৌঁছে যায়। কাজী গোলাম মাহবুবের কথাটা তোয়াহা একেবারে উড়িয়ে দেন, কিন্তু অলি আহাদ তা বিশ্বাস করেন যে, তাঁর সন্দেহ ছিল অমূলক।
আগেই বলেছি, ফেব্রুয়ারির শেষে ভাষা-আন্দোলন দূর্বল হয়ে পড়ে। মার্চে আর আন্দোলনের রেশ থাকেনি। সংগ্রাম পরিষদের নেতারা গ্রেপ্তার হয়ে যাওয়ায় আন্দোলন নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। সারা দেশেই রাজনৈতিক কর্র্মীদের ধরপাকড় চলছিল। নেতারা কেউ জেলে কেউ আত্মগোপনে। এ অবস্থায় আতাউর রহমানন খানকে আহবায়ক করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনগর্ঠিত হয় এবং ঢাকা বারের মিলনায়তনে এপ্রিলের শেষদিকে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সারা প্রদেশ থেকে কিছু নেতা এবং অনেক কর্মীর সমাগম হয়। সেখানে ইমাদুল্লাহ্ ও আমি ছিলাম- তবে আমাদের কোনো ভূমিকা ছিল না।
যুবলীগের প্রতিনিধিত্ব করেন সভাপতি মাহমুদ আলী। এই সভায় সদ্য কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানও বক্তৃতা করেন। তবে আন্দোলন আর নতুন করে অগ্রসর হতে পারে নি।
১৯৫৩ সালের সেপ্টেম্বরে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে অলি আহাদকে তাঁর গ্রামে অন্তরীণ করে রাখা হয়। সম্ভবত এই অন্তরীণ অবস্থায়ই তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। শুরু হয় তাঁর জীবনের আরেক অধ্যায়। তবে ভাষা-আন্দোলনে নেতৃত্বদান তাঁর জীবনের সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সে-সময়ে তিনি যে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেন, তা সত্যই বিরল। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সারা প্রদেশে যুবলীগ কর্মীদের বড়ো ভূমিকা ছিল। সেই ভূমিকার পেছনে ছিল অলি আহাদের উদ্যোগ, সৎসাহস ও যথাযথ পরিকল্পনা।
 
[প্রফেসর আনিছুজ্জামানঃ ভাষা সৈনিক, চেয়ারম্যান বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।]