অলি আহাদ সাহেবের কথা -বদরুদ্দীন উমর

ফন্ট সাইজ:
অলি আহাদ সাহেবের সাথে আমার প্রথম দেখা ও পরিচয় হয় ঢাকায়। ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে। ঐ বছরই পূর্ব ও পশ্চিম বাঙলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় ফেব্রুয়ারী মাসে। তখন ছিল আমার আই, এস, সি, পরীক্ষা। বর্ধমানে সে সময় পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আমি ঢাকায় আসি ১২এপ্রিল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তখন কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা করে পশ্চিম বঙ্গ ও পূর্ব বঙ্গের  পরীক্ষার্থীদের জন্য। সেই অনুযায়ী এপ্রিল মে মাসে আমি ঢাকায় পরীক্ষা দেই।
আবদুল জলিল সাহেব কলকাতায় মুসলিম লীগের একজন কর্মী ছিলেন। তিনি কলকাতায় আমাদের বাড়ীতে অনেক দিন ছিলেন। বিয়ের পর ১৯৪৬ সালে অন্য বাড়ীতে উঠে যান। ঢাকায় এসে আমি জলিল সাহেবের বাসায় উঠি। তাঁর স্ত্রী জয়নাব আখতার ছিলেন একজন ভাল ছাত্রী এবং সরকারী ইডেন কলেজের অধ্যাপক। যতদূর মনে হয়, জলিল সাহেবের বাসাতেই অলি আহাদ সাহেবের সাথে আমার দেখা হয়।
আমার আব্বা আবুল হাশিম সাহেব সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন ১৯৫০সালের ২২শে এপ্রিল। জলিল সাহেব্ তাঁদের জন্য ২১ নং গোপীবাগ থার্ড লেনে একটি  বাড়ী ভাড়া করে দেন। তাঁরা ঢাকায় এসে সেখানেই ওঠেন।কলকাতা থেকে ট্রেনে গোয়ালন্দে এসে স্টীমারে তাঁরা নারায়ণগঞ্জে আসেন। সেখান থেকে ঢাকায়। আমি পরীক্ষার জন্য নারায়ণগঞ্জ যেতে পারিনি। যাঁরা গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অলি আহাদ সাহেব ছিলেন।
ঢাকায় আসার আগে পূর্ব বঙ্গের মুসলিম লীগের অল্প বয়স্ক নেতা  ও নেতৃস্থানীয় কর্মীদের মধ্যে আমাদের পারিবারিক ঘনিষ্টতা ছিল টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাহেবে এবং মুন্সীগঞ্জের শামসুদ্দীন আহমদ সাহেবের সাথে। এছাড়া বরিশালের নূরুদ্দীন আহমদ সাহেব দেশ বিভাগের আগে কলকাতায় ছিলেন মুসলিম ছাত্র লীগের তথাকথিত বাম অংশের প্রধান ও সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তাঁকেও ভালভাবে চিনতাম। শেখ মুজিবুর রহমান তখন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র এবং মুসলিম ছাত্রলীগের একজন নেতৃস্থানীয় কর্মী ছিলেন। তিনি আমাদের বাসায় আসতেন, কাজেই তাঁকেও চিনতাম। এঁরা সকলেই আমাদের বর্ধমান ও গ্রামের বাড়ীতেও গেছেন।
কমরুদ্দীন আহমদ সাহেব, তোয়াহা সাহেবের সাথে ঢাকায় আসার পর অনেক ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হলেও তাঁদের সাথে কোন পূর্ব পরিচয় ছিল না অলি আহাদ সাহেবের সাথে। প্রথম দুজনের লেখাতেই দেখেছি যে, তাঁরা আমাদের গ্রামের বাড়ীতে গেছেন। কিন্তু তখন তাঁদের সাথে কোন পরিচয় হয়নি।
জলিল সাহেবের বাসায় যখন ালি আহাদ সাহেবের সাথে দেখা হয় তখন তিনি আর ছাত্র লীগ বা মুসলিম লীগ করতেন না, কিন্তু অন্য কোন সংগঠনের সাথেও জড়িত ছিলেন না, যদিও নানা প্রকার রাজনৈতিক তৎপরতা তাঁর ছিল। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ধর্মঘটে নেতৃস্থানীয় ভূমিকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে বহিষ্কার করে। যে সব ছাত্র সেই ধর্মঘটের সাথে যুক্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন। তাঁর শুধু জরিমানা হয়েছিল সামান্য টাকা, অলি আহাদ সাহেবের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই  ছিল সব থেকে কঠোর। এর থেকে বোঝা যায় সেই ধর্মঘট আন্দোলনে তাঁর ভূমিকাই ছিল অন্যদের থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে পরে আমি জেনেছি, কিন্তু তখন আমি ঢাকায় নতুন কাজেই সে সময় সবার সাথে পরিচয় ঠিক মত ছিল না।
১৯৫১ সালের দিকেই অলি আহাদ সাহেবের রাজনৈতিক কাজ কর্মের সাথে আমার কিছুটা পরিচয় হয়। তখন যে সব রাজনৈতিক সভা সমিতি হতো সেগুলিতে মাঝে মাঝে যেতাম এবং প্রায়ই তিনি সেগুলিতে থাকতেন এবং বক্তৃতা করতেন। নিজের বক্তব্য তিনি অনেক সময়ে উত্তেজিতভাবেই বলতেন। 
যতদূর মনে পড়ে সে সময়ে তাঁর একটি সাইেকেল ছিল, যেমন অন্য অনেকেরও ছিল। সেই সাইকেলে চড়ে তিনি তখনকার ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতেন। আগেকার সেই সাইকেল ঢাকা শহরে আর নেই। ১৯৬৮-৬৯ সালেও আমি তোয়াহা সাহেবকে সাইকেলে চড়তে দেখেছি। আহসাবউদ্দিন সাহবেকেও দেখেছি চট্টগ্রামে সাইকেলে চড়তে। কিন্তু আজকাল কোন রাজনৈতিক নেতা অথবা মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক সাইকেল চড়ে ঘুরছেন এমন দৃশ্য চোখে পড়ে না। এমনকি ছাত্রেরাও ঢাকায় এখন আর সাইকেলে চড়ে না।
১৯৫১ সালের প্রথম দিকে যুবলীগ গঠিত হয় এবং অলি আহাদ সাহেব তাঁর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মনে হয় যুবলীগের সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকার সময়টাই অলি আহাদ সাহেবের রাজনৈতিক জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়। একজন রাজনেতিক নেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি সেই সময়েই গঠিত হয়। 
১৯৪৭ সালের জুলাই মাস থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানে যুব লীগই ছিল এরকম একটি রাজনৈতিক সংগঠন। রাজনৈতিক দল না হলেও এই যুব সংগঠনটি ছিল খুব রাজনীতিকৃত এবং এর ওপর কমিউনিষ্ট পার্টির প্রভাব যথেষ্ট ছিল। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার ব্যপারেও কমিউনিষ্ট পার্টির সহায়তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৫১ সালের মার্চ মাসে যুবলীগ গঠিত হওয়ার পর অল্পদিনের মধ্যেই সংগঠনটির শাখা পূর্ব বাংলার বিভিন্ন শহর এবং অঞ্চলে গঠিত হয়। প্রগতিশীল রাজনীতিক কর্মীদের মধ্যে যুব লীগ বেশ উৎসাহ সৃষ্টি করে, কারণ তখন তাঁরা মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বাইরে এমন একটি সংগঠনের জন্য উৎসুক ছিলেন যার মাধ্যমে তাঁদের চিন্তা চেতনা ও আকাঙ্খার অভিব্যক্তি ঘটাতে পারতো।
সংগঠনটির  প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এ ক্ষেত্রে অলি আহাদ সাহেব খুব কৃতিত্বের সাথে নিজের দায়িত্ব পালন এবং সফলতা প্রমাণ করেন। বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে শাখা সংগঠনগুলির মধ্যে সক্রিয়তা দেখা দেয় এবং নানা ধরনের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কর্মসূচী তাঁরা নিয়মিতভাবে পালন করতে থাকেন।
১৯৫১ সালের ৩০ ও ৩১ শে ডিসেম্বর ঢাকার বার লাইব্রেরী হলে পূর্বপাকিস্তান যুব লীগের প্রথম বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অলি আহাদ সাহেব যে রির্পোট প্রদান করেন তাতে যুব লীগের নিজস্ব সাংগঠনিক কাজ কর্মের রিপোটিং এর সাথে দেশের তৎকালীন পরিস্থিতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কেও অনেক তথ্য উপস্থিত করা হয়। 
এই রিপোর্টে তিনি যুবলীগ সম্পর্কে বলেন যে, এটি কোনরাজনৈতিক দলের শাখা বা প্লাটফরম নয়। যুব লীগের এই বৈশিষ্ট্যের কথা স্মরণ রেখেইে একে সমাজের একটি সত্যিকার গণপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সংগঠনের সদস্য ও কর্মীদের প্রতি তিনি আহবান জানান। মনে হয় সরকারী এবং বেসরকারী কোন কোন মহল থেকে যুব লীগের বিরুদ্ধে প্রচারণা কারণেই এ কথা বিশেষভাবে বলার প্রয়োজন হয়। 
অলি আহাদ সাহেবের এই রির্পোটে ভাষা আন্দোলনের অব্যবহিত পূর্বে দেশের অবস্থার একটি সামগ্রিক চিত্র সংক্ষেপে, কিন্তু বেশ স্পষ্টভাবে, উপস্থিত করা হয়।  এ দিক দিয়েও রির্পোটটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভিক্ষ, লবণ সংকট, দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি, কলকারখানার  শ্রমিকদের মজুরী, কৃষক সমাজের দূরবস্থা, যুবকদের বেকারত্ব, পাট চাষীদের অবস্থা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির ইত্যাদি ছিল রির্পোটটির আলোচ্য বিষয়। এছাড়া ভাষার প্রশ্নে সরকারের নানা বক্তব্যের বিষয়ও অর্ন্তভূক্ত।
ভাষার দাবী এবং আন্দোলন সম্পর্কে রিপোর্টটিতে অলি আহাদ সাহেব যা বলেন তার মধ্যে শুধু তাঁর নয়, ঐ সময়ে প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা যাঁরা করতেন তাঁদের সকলেরই চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটে। ভাষার দাবী যুব লীগ পুরোপুরি সমর্থন করে এবং ভাষা আন্দোলনে যুব লীগ কর্মীরা সর্বত্র সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন, একথার পর তিনি বলেন, “এখানে ইহা জানাইতে চাই যে, আমাদের এই দাবী অন্য কোন ভাষার বিরুদ্ধে নয়।  সমস্ত ভাষাই নিজ নিজ মর্যাদায় ও সত্তায় প্রতিষ্ঠিত হোক ইহাই আমরা চাই। আমরা ইহাও চাই যে, পূর্ব বঙ্গে যে আবাঙ্গালী জন সাধারণ বাস করিতেছেন তাঁহাদের ভাষার মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা হোক।”
পঞ্চাশ বছরেরও আগে ভাষা আন্দোলনের সময় এখানকার কর্মীদের যে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গী ছিল স্বাধীন বাঙলাদেশের উগ্র জাতীয়তাবাদী মাসক শ্রেণীর মধ্যে তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। এখন বাঙলাদেশে আবাঙালী উর্দূভাষীদের নিজেদের ভাষার মাধ্যমে শিক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। এখন বাঙালাদেশে যে অবাঙালী উর্দূভাষীদের নিজেদের ভাষার মাধ্যমে শিক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই শুধু তাই নয়, উর্দু প্রেসের কোনও অস্তিত্ব নেই, এমনকি তাদের সাধারণ নাগরিক অধিকার পর্যন্ত নানা প্রতিক্রিয়াশীল চক্রান্তের কবলে পড়ে অপহৃত। 
রিপোর্টটির শেষ দিকে যুবলীগের সাংগঠনিক তৎপরতা, কাজের ঘাটতি এবং লক্ষ্য সম্পর্কে অলি আহাদ সাহেব যা বলেন সেটা উল্লেখযোগ্য । যুবলীগের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কথা বলা সত্ত্বেও তিনি বলেন, “পূর্ব বাংলায় গত ৯ মাসের যুব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা দেখিয়েছি যে, বিভিন্ন প্রশ্নে যুব সমাজ নিজেদের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন আন্দোলন করিয়াছেন। যুব লীগ সাধ্যমত সেই সব আন্দোলনে সাহায্য করিয়াছে। কিন্তুু একটি বিষয়ে আমাদের কাজের গলদ অতীব স্পষ্ট। তাহা হইল যে, আমরা যুব লীগের কর্মীগণ যুব সমাজের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়া, যেমন বেকার সমস্যা, গরীব যুবকদের মজুরী  বাড়ানোর প্রশ্ন, ছাত্রদের  শিক্ষা বা বাসস্থানের সমস্যা, মেয়েদের শিক্ষার সমস্যা বিষয়গুলি নিয়া আন্দোলন গড়িয়া তুলিতে বিশেষ চেষ্টা করি নাই। যুব সমাজের শরীর গঠন, খেলাধুলা প্রভৃতির জন্য আন্দোলনও আমরা করি নাই। যে সমস্ত প্রশ্ন বা সমস্যা সাধারণভাবে সময়ে সময়ে সারা দেশ বা যুব সমাজকে আলোড়িত করিয়া তুলিয়াছে আমরা সেই বিষয় নিয়া আন্দোলন করার ভিতরেই আমাদের কর্ম প্রচেষ্টা সীমাবদ্ধ রাখিয়াছিলাম। আমাদের কাজের ধারার এই গলদ আজ দূর করা দরকার।” 
১৯৫২ সালের ২৭ শে জানুয়ারী পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকায় এক বক্তৃতায় উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলার পরই নতুন পর্যায়ে আবার ব্যাপকভাবে ভাষা আন্দোলন সংঘঠিত হতে থাকে। এই আন্দোলনে যুবলীগ ও সেই সাথে তার সম্পাদক অলি আহাদ সাহেব খুব সক্রিয়ভাবেই অংশ গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, ভাষা আন্দোলনকে কিছুটা সংগঠিত রূপ দিতে যুব লীগের প্রচেষ্টাই সে সময় ছিল সব থেকে উল্লেখযোগ্য।
২০শে ফেব্রুয়ারী ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারীর পর সেটা ভঙ্গ করা হবে কিনা এ প্রশ্ন ঐ দিন সন্ধ্যায় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম কমিটির বৈঠকের প্রধান বা একমাত্র আলোচ্য বিষয় ছিল। সে সময় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্যে অলি আহাদ সাহেব নিজের বক্তব্য উত্থাপিত করেন।এ প্রসঙ্গে ঐ বৈঠকে তিনি বলেন, “১৯৪৯ সালে টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব বঙ্গ আইন পরিষদে জনাব শামসুল হককে সদস্য হিসাবে বক্তব্য রাখার অধিকার হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে। তাঁহার সদস্যপদ চক্রান্ত করিয়া খারিজ করা হইয়াছে। এমনকি টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর মুসলিম লীগ সরকার অদ্যাবদি আর কোন উপনির্বাচন দেয় নাই। শুধু তাই নয় বিনা অজুহাতে আমাদের পুনঃ পুনঃ ঘোষিত শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে বানচাল করিবার অসৎ উদ্দেশ্যেই  সরকার ১৪৪ ধারা জারী করিয়াছে। অতএব ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করিয়া সরকারকে সমুচিত জবাব দিব।” 
অলি আহাদ সাহেব এবং অন্য যাঁরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ছিলেন তাঁদের কৃতিত্ব এই ছিল যে, তাঁরা সাধারণ ছাত্রদের মেজাজ সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পেরেছিলেন। কারও কারও ধারণা যে সে মেজাজ ২০ ও ২১ শে ফেব্রুয়ারী তাঁরা তৈরী করেছিলেন। এ ধারণা সঠিক নয়। অলি আহাদ সাহেব ও তাঁর মত নেতৃস্থানীয় কর্মীরা আসলে সাধারণ ছাত্রদের তৎকালীন মেজাজকে সঠিকভাবে নিজেদের চিন্তায় ধারণ করতে পেরেছিলেন এবং তাঁদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্তের মধ্যে তার অভিব্যক্তি ঘটেছিল। 
২১শে ফেব্রুয়ারী ছাত্রেরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন। আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে তখন অলি আহাদ সাহেব ও তাঁর মত নেতৃস্থানীয় কর্মীরা আসলে সাধারণ ছাত্রদের তৎকালীন মেজাজকে সঠিকভাবে নিজেদের চিন্তায় ধারণ করতে পেরেছিলেন এবং তাঁদের ১৪৪ ধারা, ভঙ্গের সিদ্ধান্তের মধ্যে তার অভিব্যক্তি ঘটেছিল।
২১ শে ফ্রেুয়ারী ছাত্রেরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন। আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে তখন অলি আহাদ সাহেবকে অনেক রকম কাজ করতে হয়েছিল। বিভিন্ন রকম যোগাযোগ, কাজের সমন্বয় সাধন, তাৎক্ষণিকভাবে অনেক প্রকার করণীয় নির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাতি ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রধান ছিল। যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে অধিষ্ঠিত থাকায় তাঁর কতকগুলি সুবিধা ছিল যা অন্যদের ছিল না।
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির এক প্রস্তাব অনুযায়ী ২১ শে ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ সম্পর্কিত গৃহীত সিদ্ধান্তের বিপরীতে ১৪৪ ধারাভঙ্গ হলে সর্বদলীয় কমিটি বিলুপ্ত হবে এই মর্মে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পর যে অভাবিতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তাতে শুধু ছাত্রদের সংগ্রাম কমিটির পক্ষে তার মোকাবেলা করা সম্ভব ছিল না। এ কারণে অলি আহাদ সাহেবসহ অন্য অনেকেই তখন উপলব্ধি করেছিলেন যে ২০শে ফেব্রুয়ারী সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির  আত্মবিলোপের প্রস্তাব সত্ত্বেও তাকে আবার পুনরুজীবিত করা দরকার।
মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ভেতরে খোলা জায়গায় (বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মীনারের জায়গায়) ২২ শে ফেব্রুয়ারী পূর্ব দিন নিহত ছাত্র এবং অন্যদের গায়েবী জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। সে জানাযাতে যুবলীগের নেতা ইমাদুল্লাহ্ সভাপতিত্ব করেন এবং বক্তৃতা করেন অলি আহাদ । অন্য কাউকে সেখানে বক্তৃতা করতে দেয়া হয়নি।ফজলুল হক সাহেব, আবুল হাশিম সাহেব, জানাযায় এসেছিলেন। ফজলুল হক সাহেব সম্পর্র্কে অলি আহাদ সাহেব নিজেই বলেন, “ফজলুল হক যেগদান করতে এসেছিলেন কিন্তু তাঁকে বলতে দেওয়া হয়নি। তিনি ৫০০ টাকা চাঁদাও দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু আমি খুব রুঢ় ভাষায় তা প্রত্যাখান করি। কারণ আমি মনে করেছিলাম যে তিনি পরোক্ষভাবে আন্দোলনকে ঘুষ দিয়ে নজর নিজের স্বার্থে তাকে বিপ্লবী পথ থেকে অন্য দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।”
অলি আহাদ সাহেবের এই ধরনের চিন্তা সঠিক ছিল বলে মনে হয় না। যে কারণে তাঁরা সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সে কারণেই ফজলুল হক সাহেবের মত ব্যক্তির সমর্থন ও সহযোগিতা আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল। ভাষা আন্দোলন কোন সংকীর্ণ বিপ্লবী আন্দোলন ছিল না। সেটা ছিল ব্যাপক জনগণের এক ধরনের অভ্যুত্থান।
২২শে ফেব্রুয়ারী ঢাকায় সাধারণভাবে জনগণস যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন এবং মিছিলে যে ভাবে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, সরকার ও সরকার সমর্থক প্রতিষ্ঠান, সংবাদপত্র ইত্যাদির বিরুদ্ধে মারমুখী হয়েছিলেন তার থেকে বলা চলে যে, ঐদিন ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উচ্চতম পর্যায়। তার পরও আন্দোলন কয়েকদিন অব্যাহত থাকলেও তার গতি ছিল নিম্নমুখী। 
আন্দোলনের  নিম্নগতির বিষয়টি অলি আহাদ সাহবেও উপলব্ধি করেছিলেন। এ ব্যাপারে অলি আহাদ সাহেবের নিজের কথা হলো নিম্নরূপ, “২৩ তারিখে রাত্রে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে ব্যারাকের ৬/৫ নম্বর রুমে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির একটি বৈঠক সঅনুষ্ঠিত হয়। তাতে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ গতি সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিলো। এক পর্যায়ে আবুল হাশিম সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ”Oli Ahad, how far do you want to go” তার জবাবে আমি বললাম, Honourable retreat একথা বলার সময় আমি চিন্তা করেছিলাম যে আন্দোলনে ইতিমধ্যে ভাটা পড়েছে এবং আমাদের resources খুব Limited ছিল। সেজন্য মুভমেন্টকে এমন পর্যায়ে ঠেলে নিয়ে যাওয়া Wise হবে না যেখানে তার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রেফলবো। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্পর্কে কোন বিস্তারিত আলোচনা এখানে সম্ভব নয় এবং তার প্রয়োজনও নেই। অলি আহাদ সাহেবের রাজনৈতিক জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং মহত্তম অধ্যায় সম্পর্কে বলতে গিয়েই এ সম্পর্কে সামান্য কিছু কথা বলার প্রয়োজন হলো ।
ভাষা আন্দোলনে বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে অনেক আবোল তাবোল এবং মতলববাজী কথাবার্তা ১৯৭১ সালের পর থেকে শোনা যায়। প্রকৃত ইতিহাস রচনা এবং ঐতিহাসিক  ঘটনার পর্যালোচনার ক্ষেত্রে আবোল তাবোল অথবা মতলববাজীর স্থান নেই। কেউ সে চেষ্টা করলেও সেটা স্থায়ী হওয়ার নয়।
 
শেষ করার আগে এখানে একটি কথা বলারে প্রয়োজন। অলি আহাদ সাহেবের বর্তমান রাজনীতি তাঁর পূর্ববর্তী রাজনীতি থেকে ভিন্ন হওয়ার কারণে ভাষা আন্দোলনের আলোচনা প্রসঙ্গে অনেকেই তাঁর কথা তেমন কেউ বলতে চায় না। উপরন্ত অন্য অনেকের প্রান্তিক  ভূমিকাকেও গৌরবান্বিত করা হয় এক ধরণের রাজনীতির সাথে তাঁদের সম্পর্কের কারণে এ ধরনের প্রচেষ্টা কোন যোগ্য ঐতিহাসিক, এমনকি কোন যোগ্য ব্যক্তিরও উপযুক্ত নয়। 
কোন বিশেষ আন্দোলন বা ঘটনার ইতিহাস আলোচনা বা পর্যলোচনার সময় সেই আন্দোলন বা ঘটনার ইতিহাস সম্পর্কিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ পরর্বতী কালে কি করেছেন বা কোন অবস্থানে আছেন, সেটা কার পছন্দ কার অপছন্দ, সেটা দিয়ে তাঁর বা তাঁদের পূর্ববর্তী ভূমিকার মূল্যায়ণ করতে যাওয়া একদিকে যেমন সেই ব্যক্তির প্রতি অবিচার, তেমনি সেই আন্দোলনের সঠিক চরিত্র উপলব্ধি ইতিহাস জ্ঞান সঠিকভাবে অর্জনের ক্ষেত্রে এক বিপদজনক প্রতিবন্ধক। 
ভাষা আন্দোলনে অলি আহাদ সাহেবের ভূমিকা যাঁরা অগ্রাহ্য করেন, উপেক্ষা করেন অথবা ছোট করে দেখাতে চান তাঁরা প্রাকানন্তরে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতিকরণের প্রচেষ্টাতেই লিপ্ত থাকেন। তাঁদের এই অপকর্ম  সমর্থনযোগ্য নয়। ১৮ জুন, ২০০০২
 [বদরুদ্দীন উমর স্বনামধ্য  বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবীদ]