অলি আহাদঃ আপোষহীন সংগ্রামী -আখতার-উল-আলম

ফন্ট সাইজ:
 [প্রীতিভাজন মুন্সী আবদুল মজিদ দীর্ঘদিন যাবৎ প্রবীণ রাজনীতিবিদ অলি আহাদের একনিষ্ঠ অনুসারী ’ একজন ত্যাগী রাজনৈতিক কর্মী। তিনি যখন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ওই প্রবীণ রাজনীতিবিদদের উপর কিছু লিখবার জন্য জেদ ধরে রইলেন, তখন তাঁকে বলেছিলাম, কিছু পয়েন্ট তো দেবেন যা দেখে শুনে কিছু লিখে দিতে পারি। সুতরাং রচিত এই নিবন্ধের পুরা কৃতিত্ব মুন্সি সাহেবের; আর যা কিছু দোষ ত্রুটি পুরোটাই আমার।]
অলি আহাদ সাহেবের কথা মনে হলেই মনে পড়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতার কয়েকটি লাইন:
“যেথায় মিথ্যা ভন্ডামী ভাই
করবো সেথায় বিদ্রোহ,
ধামা ধরা জামা ধরা
মরণ ভীতু , চুপ রহ!”
 
অলি আহাদকে যারা চির বিদ্রোহী বলেন, তারা ভুল কিছু বলেন না। সেদিকের বিচারে অলি আহাদ যেন জাতীয় কবির ‘বিদ্রোহী’ কবিতারই মূর্তপ্রতীকঃ যাঁর –“শির নেহারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রীর!”
অলি আহাদ সাহেবের সাথে আমার বয়সের ব্যবধান দশ/এগারো বছর । তারপরেও তার সাথে, তার ফ্যামিলির সাথে শুধু বন্ধুত্ব নয়, সহমর্মীতার এক অচ্ছেদ্য সম্পর্ক কেমন করে যে গড়ে উঠেছে-তার ইতি বৃত্ত অনেক দীর্ঘ। শুধু এই টুকু বলা চলে যে, তাঁর রচিত “জাতীয় রাজনীতি ৪৫ থেকে ৭৫” পুস্তকের জন্মদাতা তিনি বটে, কিন্তু তার ধাত্রীপনা করতে হয়েছিল আমাকেই। মাঝখানে বিদেশ তেকে ফিরে এসেও দেখেছি, পুস্তকটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ নিয়ে বিব্রত। খোশরোজ কিতাব মহলের অগ্রজতুল্য মুহীউদ্দীন আহমদকে বলতেই তিনি রাজী হয়ে গেলেন। বাজারে সেই সংস্করণও বোধ হয় এখন দু®প্রাপ্য। মাঝখানে কি এক খেয়ালের বসে তিনি আমাকে “দৈনিক ইত্তেহাদ” পত্রিকা প্রকাশের “নো-অবজেকশন পত্র” লিখে দিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থাভাবে সে পত্রিকা প্রকাশের “নো-অবজেকশন পত্র” লিখে দিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থাভাবে সে পত্রিকা প্রকাশিত হতে পারে নাই। তবে, সে অন্য ইতিহাস। এখানে তার উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক।
ব্যাক্তিগত আলাপ আলোচনায় রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং জাতীয় রাজনীতির হাল চাল সম্পর্কে তাঁর ক্ষোভ ও ক্ষুদ্ধতা স্বতঃই প্রকাশ পায়। কিন্তুৃ নীতির প্রশ্নে অটল থাকার ব্যাপারে তাঁর মত এদেশে আমি আর কাইকে খুঁজে পাই নাই। একদিক দিয়ে এই বিষয়টা তাঁকে যেমন অন্য অনেকের কাছ থেকে আলাদা করে রেখেছে, তেমনি দেশ ও জাতি পেয়েছে বিবেকের এমন এক কণ্ঠস্বর- যা এখনো যে কোন সংকট মুহূর্তে যে কারো বিরুদ্ধে সুতীব্র উচ্চারণে ফেটে পড়তে দ্বিধা করে না। উদাহরণসরূপ উপস্থিত, ভাষা আন্দোলনের ‘অজানা তথ্য’ সম্পর্কে তাঁর কিছু বক্তব্য হুবহু এখানে তুলে ধরতে চাই। যেমন-
ভাষা আন্দোলনের অজানা তথ্য
“মাওলানা মওদুদী, দেওবন্দী হোসেন আহমদ মাদানী, মাওলানা আজাদ গোষ্ঠীর মোল্লারা ও গান্ধী মহারাজের চেলারা আগাগোড়া হিন্দুস্থানে মুসলিম আবাস ভূমির বিরুদ্ধে ছিলেন। তেমনি তাঁরা ছিলেন ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারী ও ২১ শে ফেব্রুয়ারী -উত্তর ঢাকা নারায়ণগঞ্জের রাজপথ কাঁপানো রক্তাক্ত সংগ্রামের ও বিরুদ্ধে। মূলতঃ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিল তাদের অবস্থান। কৌশলে বলতেন, ‘আরবী হরফে বাংলা লিখতে চাই।’ একই ভাবে বাংলার রক্তক্ষয়ী আজাদী সংগ্রামেও তাঁরা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী।”
“রক্তস্নাত ২১ শে ফেব্রুয়ারীর পূর্বদিন ২০শে ফেব্রুয়ারী অপরা‎হ্নে নূরুল আমীন সরকার ১৪৪ ধারা জারী করে। জারীকৃত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে ধনুর্ভঙ্গ পণ গ্রহণ করে কমরেড মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিষ্ট পার্টি, আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতৃত্ব (মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী তখন ঢাকার বাইরে নরসিংদীর গ্রামাঞ্চলে জনসভায় ছিলেন) যথা আতাউর রহমান খান, জেনারেল সেক্রেটারী শামসুল হক, তদানীন্তন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সহ -সভাপতি খয়রাত হোসেন এম এল এ, মিসেস আনোয়ারা খাতুন এম এল এ , তমুদ্দীন মজলিস নেতা অধ্যাপক আবুল কাশেমসহ পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুল হক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খান, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর কাজী গোলাম মাহবুব ও পূর্ব পাকিস্তান যুব লীগের সহ-সভাপতি মোঃ তোয়াহা প্রমুখ অনেকেই জনাব আবুল হাশিম এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় ২১ শে  ফেব্রুয়ারীতে জারীকৃত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে ভোট প্রদান করেন। অপরদিকে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ , ঢাকা ইউনিভার্সিটি কমিটি অব একশন কনভেনর আবদুল মতিন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন সহ -সভাপতি গোলাম মাওলা, ফজলুল হক হলের সহ সভাপতি শামসুল আলম ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ভোট দেন। অর্থাৎ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ৪ ভোট এবং বিপক্ষে ১১ ভোট পড়ে। ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার পক্ষে তাদের যুক্তি ছিল, সামনে নির্বাচন।সিদ্ধান্ত হবে হটকারী। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের আন্দোলনে গেলে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবো। নির্বাচনে অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে যাবে।”
একুশে ফেব্রুয়ারীর আমতলার সভায় টিয়ার গ্যাস শেলে জ্ঞান হারিয়ে ছিলেন জনাব গাজীউল হক। জ্ঞান ফিরে পাবার পরেপরেই তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। এ ঘটনার পর তাঁকে আর ঢাকায় দেখা যায় নাই। ২২ শে ফেব্রুয়ারী সকালে গাজীউল হক ময়মনসিংহে ডঃ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর শুশুর, সাবেক এম এল এজনাব আবদুল মজিদ সাহেবের বাড়ীতে স্যুট কোট পরিহিত অবস্থায় হাজির হন বলে জানা যায়। তারপর বগুড়া শহরে ঘটে তার আবির্ভাব।”
“আরেকজন জনাব এম আর আখতার মুকুল ঐতিহাসিক ২১ ফেব্রুয়ারী আমতলার ছাত্র জনসভার পরপরই তিনি ঢাকা হতে উধাও হন এভং কোলকাতা নগরীতে নিরাপদ আশ্রয়ে কাল কাটান। জনাব শহীদুল্লাহ কায়সারও  তার দল কমিউনিষ্ট পার্টির নির্দেশে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে ছিলেন।কিন্তু হঠাৎ একদিন কমরেড শহিদুল্লাহ কায়সার কলিকাতা হতে প্রকাশিত কমিউনিষ্ট পার্টির মুখপত্র ‘দৈনিক স্বাধীনতা’ বিক্রি করতে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে আসেন। তাতে ঢাকার পুলিশের গুলির খবর ছিল। অলি আহাদ সাহেব তাঁকে পত্রিকা গুলিসহ মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণ হতে বিদায় করেছিলেন। উল্লেখ্য, ভারতীয় পত্রিকা ‘স্বাধীনতা’ এদেশে সাম্প্রদায়িকতার উস্কানী ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে-মুসলিম লীগের তরফ থেকে এ ধরণের প্রচারণা ছিল তখন এন্তার। একমাত্র মেডিকেল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি গোলাম মাওলা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র মেডিকেল হোস্টেলেই অবস্থান করেন এবং আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন। কমিউনিষ্ট পার্টির নির্দেশেই বোধহয় ঢাকার উত্তপ্ত রাজপথে ২১শে ফেব্রুয়ারীর রাত হতে জনাব মোঃ তোয়াহা ও আবদুল মতিনকে দেখা যায় নাই। ৭ মার্চ “গ্রেফতার দিবস” সন্ধ্যারাতে জনাব তোয়াহা ও আবদুল মতিন আন্দোলন সম্বন্ধে আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন, এবং সেই সভাতেই সর্বজনাব সাদেক খান, হেদায়েদ হোসেন চৌধুরী, মুজিবুল হক ও মীর্জা গোলাম হাফিজের সাথে জনাব অলি আহাদ গ্রেফতার হন। জনাব কাজী গোলাম মাহ্বুব সভায় উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করতে ব্যার্থ হয়।”
“যুবলীগ সহ-সভাপতি শামসুজ্জোহা, কার্যকরী কমিটির সদস্য শফি হোসেন খান, ডঃ মুজিবর রহমান ও আজগর হোসেনের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলন তীব্র রুপ ধারণ করে। নূরুল আমীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জবাসীকে উজ্জীবিত করেন যুবলীগের এই অকুতভয় নেতা ও কর্মীরা। নারায়ণগঞ্জ মর্গান হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষায়ত্রী ছিলেন মমতাজ বেগম। মমতাজ বেগমকে ২৯শে ফেব্রুয়ারী গ্রেফতার করা হলে যুবলীগ নেতা শফি হোসেন-এর নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ শহর অগ্নিস্ফূলিঙ্গে পরিণত হয়। নূরুল আমীন তাঁর গদী রক্ষার্থে ইপিআর বাহিনীর আর্মড কোর নারায়ণগঞ্জের দিকে প্রেরণ করেন। নারায়ণগঞ্জের মানুষ চাষাঢ়া হতে পাগলা পর্যন্ত দীর্ঘ ৬ মাইল রাস্তায় ১৬০টি বটগাছ কেটে ফেলে ইপিআর আর্মড কোরের বিরুদ্ধে অবরোধ সৃষ্টি করে।”
“এতদ্বসত্ত্বেও দানব শক্তির অত্যাচারে গোটা নারায়ণগঞ্জ তছনছ হয়ে যায়। নারায়ণগঞ্জের নির্বাচিত এম এল এ খান সাহেব ওসমান আলীর চাষাঢ়ার দ্বিতল বাড়ী লুন্ঠিত হয় এবং দৈহিক অত্যাচার আর নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয় পরিবারের সকল সদস্য। এমনকি শ্রদ্ধেয় এম এল এ খান সাহেব ওসমান আলীর উপরেও শারিরীক নির্যাতন চালিয়ে তার কোমর ভেঙ্গে দেওয়া হয়।”
“শেখ মুজিবর রহমান ১৯৫২ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারী কারামুক্তি পেলেন। কিন্তু ঢাকা নারায়ণগঞ্জের আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ঢাকায় এলেন না। এমন কি নুরুল আমীনের দানবীয় শাসনের বিরুদ্ধে ৫ই মার্চ দেশব্যাপী যে হরতালের ডাক দেওয়া হয়, শেখ মুজিব সেই হরতালে অংশ গ্রহণ করার জন্য ঢাকায় পর্যন্ত আসেন নাই। মারমুখো জনতাকে নেতৃত্ব দান তো দূরের কথা। বরং বাস্তব সত্য এই যে, শেখ মুজিব সেই সময়ে কোটালীপাড়ায় নিজ বাড়ীতে মাতা-পিতার স্নেহের আশ্রয়ে-স্বস্তিতে শান্তিতে কাল কাটিয়েছেন। তারপরও মুখপোড়া আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় দালাল-চামচারা বলে যে, ১৯৫২ সালে শেখ মুজিব ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ধিক্বার তাদের এই মিথ্যাচারে!”
“ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত ২১শে ফেব্রুয়ারী ছাত্র-হত্যার প্রতিবাদ ও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীকে প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনে যারা জীবন বাজী রেখে সার্বক্ষণিক রাজপথ দখল করে রাখেন, এবং আন্দোলন-মুখর লাখো সংগ্রামী জনতাকে নেতৃত্ব দেন, তারা হলেন, মেডিকেল কলেজ ছাত্র আজমল হোসেন, আবদুস সালাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোঃ সুলতান, পূর্বপাকিস্তান যুবলীগের যুগ্ন-সম্পাদক এডভোকেট ইমাদুল্লাহ, আনিসুজ্জামান, নেয়ামাল বাসির, সাহিত্যিক হাসান হাফিজুর রহমান, কাজী আজিজুর রহমান, ডাঃ মঞ্জুর হোসেন, আমীর আলী প্রমুখ যুবলীগের শত শত নেতাকর্মী। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সে- দিনের ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের আন্দোলন উত্তাল দিনগুলিতে আন্দোলন পরিচালনা ও নেতৃত্ব দেয় মুলতঃ পুর্ব পাকিস্তান যুবলীগ।”
আপোষহীন সংগ্রামী
ঔপনিবেশিক  আমল থেকে পাকিস্তান  আন্দোলন এবং পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়- সে এক সুবিস্তৃত  ইতিহাস। ইতিহাসের এই ধারায় রাজনীতির পথ পরিক্রমায় পরিচালিত হয়েছে বহু আন্দোলন, বহু সংগ্রাম। এই আন্দোলন ও সংগ্রামে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত থেকে অনেকেই নানা ভূমিকা পালন করে গেছেন। কিন্তু আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়, প্রতিটি  সংগ্রামের বাঁকে বাঁকে আপোষহীন ভূমিকা পালন করেছেন, তেমন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অস্তিত্ব গোটা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় খুবই বিরল। আজ এখানে তেমনি এক বিরল নেতৃত্ব সম্পর্কে কিছু আলোচনা করছি। তিনি একই সঙ্গে যেমন আপোষহীন তেমনি দৃঢ়চিত্ত। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দেলনের অন্যতম সিপাহসালার নাম তার অলি আহাদ। অলি আহাদ শুধু একটি নাম নয়, অলি আহাদ একটি সংগ্রামের নাম- সংগ্রামী ইতিহাসের একটি অনন্য অভিধা। অনেকেরই হয়ত অজানা যে, মুসলিম লীগের স্বেচ্ছাচারী শাসনের প্রতিবাদে প্রথম আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং পরে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার পিছনে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে পাক- মার্কিন সিয়াটো সেন্টো চুক্তির বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথেও সৃষ্টি হয় অলি আহাদের বিভেদ। অবশ্য মাওলানা ভাসানীর অবস্থানকে সমর্থন জানাতে গিয়েই অলি আহাদ সেদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে বিরোধে জড়িয়ে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগেই থেকে গেলেন; শেখ মুজিব মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিয়ে আবার সাধারণ সম্পাদক হলেন; আর অলি আহাদ নীতির প্রশ্নে আপোষহীন থাকার কারনে দল থেকে ছিটকে পড়লেন।
সেই থেকে শুরু হলো আপোষহীনতার পথে অলি আহাদের যাত্রা। রাজনীতি সংগ্রামের দুর্গম গিরি মরু কান্তার, পেরিয়ে তাঁর সেই যাত্রা আজো অব্যাহত। আজো যেখানইে স্বৈরাচারী একনায়ক, কিংবা যেখানেই গণতন্ত্রের নামাবলি গায়ে- দেয়া কোন ফ্যাস্টিক শাসক, সেখানেই তাদের গণবিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে অলি আহাদের কন্ঠ বর্জনির্ঘোষ।
তাঁর সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ্’ সকল আগ্রাসন আধিপত্যবাদ আর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছিল এক দ্রোহের বহ্নিশিখা। কিন্তু শাসকদের নগ্ন হস্ত ঐতিহ্যবাহী ইত্তেহাদের প্রকাশনা বন্ধ করে দিতে মোটেও দেরি করে নাই। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের পক্ষ থেকে কোন না কোন সময়ে অলি আহাদকে ক্ষমতার ভাগ দেওয়ার প্রলোভনও কম দেওয়া হয় নাই। কিন্তু তিনি অবলীলায় তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। শেখ মুজিব তাঁর ক্ষমতারোহণের প্রথম পর্যায়েই অলি আহাদকে মন্ত্রিত্বের পদ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার হাতছানি কোন সময় অলি আহাদকে তাঁর বিদ্রোহী ভূমিকা থেকে টলাতে পারে নাই। ফলস্বরুপ এমন একটি সরকার ছিলনা যে, সরকার অলি আহাদকে কারাগারে আটক করে নাই।
পরিতাপের বিষয়, বঞ্চনা ও নিষ্পেষণে জর্জরিত দেশের যে কোটি কোটি মানুষের জন্য অলি আহাদ সংগ্রাম করেছেন ও আজো সংগ্রাম করেছেন ও আজো সংগ্রাম করে যাচ্ছেন, সে খবর রাখে কয়জনে? এ ব্যাপারে অবশ্যই মূল ভূমিকা পালন করার কথা ছিল সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবিদের। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা উচ্চকন্ঠ-তারা তো অনেকেই বিবেক বন্ধক রেখে মহাসুখে কালাতিপাত করছেন। তাদের কল্যাণেই আজ কত নাম না জানা, অখ্যাত, ভুঁইফোঁড় নেতার জীবন কথার নামে কল্পকাহীনি সাজিয়ে পত্র-পত্রিকায়  প্রতিনিয়ত প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে ও হচ্ছে। প্রতিনিয়ত সাময়িকী ম্যাগাজিনে এদেশের প্রচ্ছদ- কাহিনী ছাপা হচ্ছে কত পাতি নেতা, নর্তকী, গায়িকা ও নায়িকাদের নিয়ে। কিন্তু এ দেশের আন্দোলন সংগ্রামের এক জীবন্ত কিংবদন্তী, সৎ, নির্লোভ, আপোষহীন, প্রচারবিমুখ, দেশপ্রেমিক ও সত্যিকার একজন জাতীয়তাবাদী নেতার ভূমিকা- ভিত্তিক কোন প্রচ্ছদ কাহিনী দেশবাসীর কাছে তুলে ধরার কথা এ যাবত কেউ ভেবে দেখার প্রয়োজনটুকু পর্যন্ত বোধ করে নাই। রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করলে অলি আহাদ শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাই নন; একজন সফল রাষ্ট্রনায়কের সকল গুনও তাঁর মধ্যে বিদ্যমান। টগবগে যৌবন থেকে শুরু করে গত অর্ধশতাব্দীকাল রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃপ্ত পদচারণায় নীতির প্রশ্নে অটল ও অবিচল থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহণ বড় কথা নয়। বড় কথা হল নীতির প্রশ্নে নিরাপোষ থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা; এবং আগামী বংশধরদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গঠনের স্বার্থে বর্তমানকে অবহেলায় বিসর্জন দেওয়া।
শৈশব, কৈশোর, যৌবন
বাংলাদেশের তথা এ উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অলি আহাদের পুস্তক এক অনবদ্য জাতীয় ইতিহাস। “জাতীয় রাজনীতি ৪৫ থেকে ৭৫” নামক এই স্মৃতিকথা মুলক পুস্তকেও তিনি আত্মপ্রচারে সষত্নে পরিহার করেছেন। সেই পুস্তক পাঠ করে কেউ তাঁর ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের ঘঠনাবলী জ্ঞাত হতে পারবেন না। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় যেটুকু উদ্ধার করা যায়, তা হলো, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার সদর থানাধীন ইসলামপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২৮ সালে জনাব অলি আহাদের জন্ম। তাঁর পিতা মোঃ আব্দুল ওহাব ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট রেজিষ্ট্রার। ছয় ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। হোমনা ও কুমিল্লা জেলা স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। দাউদকান্দি হাইস্কুল থেকে ১৯৪৪ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে (তদানীন্তন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ) বিজ্ঞান বিভাগে। ঢাকা কলেজে ভর্তির পরপরই ঢাকা কলেজ মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এসময়েই তিনি পরিচিত হন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আল্লামা আবুল হাসিমের সাথে। মুসলিম লীগ কর্মী- শিবিরে আগত কর্মীদের উদ্দেশ্যে নিয়মিত ভাষণ দিতেন আবুল হাশিম। ইসলামের নীতি আদর্শের ব্যাপারে, বিশেষত পবিত্র কালেমার ব্যাখ্যায় রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনে ইসলামের মূল্যবোধের উপরে জনাব আবুল হাশিমের প্রদত্ত ভাষণ অলি আহাদকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। সেই কর্মী সমাবেশেই তাঁর সাথে পরিচয় ঘটে সর্বজনাব শামসুল হক, শামসউদ্দিন আহমদ, কমরুদ্দিন আহমদ, মোহম্মদ তোয়াহা, তাজউদ্দিন আহমদ, নঈমউদ্দিন আহমদ ও শওকত আলীর সাথে। এক পর্যায়ে তিনি মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের সাথে জড়িয়ে যান। রাজনৈতিক জীবনে জনাব অলি আহাদ পাকিস্তানের জনক কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাবশিষ্য। এখনো কায়েদে আজমের প্রতি তাঁর অপার শ্রদ্ধা। রাজনীতির পরিমন্ডলে খুব কম রাজনীতিবিদকেই তিনি মনে করেন কায়েদে আজমের সমকক্ষ। জিন্নাহর সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ছাত্র জীবনেই ১৯৪৬ সালে আখাউড়া রেলষ্টেশনে। ৪৬- এর নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় কায়েদেআজম এসেছিলেন সেখানে। সেদিন রেলের সেলুন থেকে জানালা পথে আঙ্গুলের ইশারায় তাকে ডাকলেন কায়েদে আজম। বুকে তখন মুসলিম লীগের ব্যাজ। তিনি কাছে গেলে কায়েদে আজম তাঁর পরিচয় জেনে বললেন, "Young boy, remember character first. After election rejoin classes”  অর্থাৎ “তরুণ বালক, স্মরণ রেখো চরিত্রই প্রথম। নির্বাচনের পর পড়াশুনায় মনোনিবেশ করবে।” কায়েদে আজমের সেই উপদেশ আজো তাঁকে প্রেরণা যোগায়।
অথচ এহেন শ্রদ্ধার পাত্র কায়েদে আজমের মুখের উপরেও  অলি আহাদ কথা বলতে ছাড়েন নাই। স্পষ্টভাষায় তাঁর অগ্রগণতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদ করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কায়েদে আজমের সাথে দ্বিতীয় বার অলি আহাদের দেখা হয় মিন্টু রোডে (সাবেক গণভবনে)। তখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি নিয়ে ছাত্র নেতারা কায়েদে আজমের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। তাদের বক্তব্য শুনে কায়েদে আজম বলেছিলেন, "In the interest of the integrity of Pakistan, if necessary, you will have to change your mother tongue.” কায়েদে আজমের এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করে অলি আহাদ বলেন,  "Sir, Britain, U.S.A. Canada, Australia & Newzeland speak the same language, preach the same religion, come of the same stock, could they form one state? Despite the same religion, Islam, same language Arabic, same semetic blood and same land Arab, why are there so many stateson Arab land?”  এভাবে বিতর্কের এক পর্যায়ে তাঁর দিকে তর্জনী নির্দেশ করে কায়েদে আজম বলেছিলেন। "I know you also,” অলি আহাদও সমানতালে জবাব দিয়েছিলেন, "I also know you are the Governor General whom the Queen of England can remove on our appeal.”
জীবন স্মৃতি মিনার
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৫২ সালে অলি আহাদের আপোষহীনতার মুখে ছাত্রনেতৃবর্গ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আজ অনেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের কৃতিত্বের দাবীদার। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, এই কৃতিত্বের হকদার  একমাত্র অলি আহাদ। ইতিহাস আরও সাক্ষী দেয়, সেদিন ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পরিনামে ২১ শে ফেব্রুয়ারী আজ হয়েছে শহীদ দিবস; সৃষ্টি হয়েছে জতীয় শহীদ মিনার। এমনকি সেই ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে আজকের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। দুঃখের বিষয়, সেই অলি আহাদকে এ পর্যন্ত কোন সরকারই একুশে পদক কিংবা অনুরুপ কোন রাষ্ট্রীয় পদকে সম্মানে ভূষিত করার মত মানসিক উদারতা প্রদর্শন করতে পারে নাই। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের নিরপেক্ষ ভাবে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করলে একথাই বলতে হয় যে, সেদিনের বিদ্রোহের সালাম, বরকত, রফিকদের আত্মত্যাগের স্মৃতিস্মারক যদি হয়ে থাকে পাথরে নির্মিত জাতীয় শহীদ মিনার, তাহলে অলি আহাদ হলেন সেই ২১ শে ফেব্রুয়ারীর জীবন্ত স্মৃতি মিনার।
উল্লেখ্য, ভাষা আন্দোলনে অলি আহাদের ভূমিকা ভিত্তিক একটি অনুষ্ঠানের ভিডিও চিত্র ধারণের পরও তা টিভিতে প্রচার করা হয় নাই। দুঃখজনক এই ঘটনাটি ঘটেছিল বেগম খালেদা জিয়া প্রথম প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে। অবশ্য পরে বিরোধী দলের নেত্রী হিসাবে বেগম খালেদা জিয়া অলি আহাদের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে আসেন এবং তাকে ‘জাতির বিবেক’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। খালেদা জিয়া আবারও দেশের প্রধান মন্ত্রীর আসন অলংকৃত করেছেন। জীবন সায়াহ্নে অলি আহাদের মত সংগ্রামী নেতাকে কোন না কোন ভাবে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করার মত উদারতা কি খালেদা জিয়ার জোট সরকার কি দেখাতে পারবে?
অলি আহাদঃ রাজনৈতিক সংগঠক
সমকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে যে নৈতিক ও আদর্শিক ধস নেমেছে তাতে লাখ লাখ টাকা ছাড়া রাজনৈতিক সংগঠন চালানো দুস্কর। টাকা ছাড়া কোন একটা সভা সমাবেশ তো দূরের কথা, একটি কর্মীসভাও করা সম্ভব হয় না। রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে এখন ত্যাগ ও আদর্শের মনোভাব ও প্রভাব বলতে গেলে অনুপস্থিত। এই অবস্থায়, আজ যখন রাজনীতিবিদ অলি আহাদের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক দল টিম টিম করে তার অস্তিত্ব বজায় রেখে চলছে। সত্যি বলতে কি, অলি আহাদের নীতি আদর্শের অনুসারী কতিপয় সংগ্রামী নেতা- কর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগেই আজও সংগঠনটি টিকে আছে। অলি আহাদের যে পরিচিতি, এবং তাঁর বন্ধুত্বের যে পরিধি, তাতে তিনি সেভাবে চাইলে বা যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান যে করতে পারেন না, তা নয়। কিন্তু নীতির প্রশ্নে অটল অলি আহাদ মনে করেন, যে শোষক ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে তিনি চিরদিন আপোষহীনভাবে লড়ে যাচ্ছেন, সেই গোষ্ঠীর কারো কাছে দলের জন্য অর্থ সাহায্য চাওয়া মানেই নিজেকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করা। ইতিহাস সাক্ষী, পাকিস্তানের ইস্কান্দার মীর্জা, আইয়ুব, মোনায়েম থেকে শুরু করে স্বাধীন  বাংলাদেশের মুজিবী দুঃশাসনের আমলেও অলি আহাদ বার বার কারান্তরালে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখলকারী সামরীক শাসক জেনারেল এরশাদ তাঁকে পরপর ছ’বার জেলে নিয়ে এক্ষেত্রে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন। এই সময় একবার জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়ে অলি আহাদ বাসায় এসেছেন। আমার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করে বসলেন, “আবার কবে জেলে যাচ্ছেন?” একটু থমকে গিয়ে হো হো করে হেসে উঠেছিলেন অলি আহাদ। জীবনে ১২ বছর কারাভোগ ছাড়াও বছরের পর বছর আত্মগোপন করে কাটাতে হয়েছে অলি আহাদকে। জিয়াউর রহমানও তাঁকে গ্রেফতার করেছিলেন, কিন্তু পরদিনই মুক্তির নির্দেশ দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিব সর্বমোট ৮ বৎসর ২ দিন জেল কেটেছিলেন। অথচ তিনি নিজে দাবী করে গেছেন এবং অন্যেরাও বেড়াচ্ছেন যে, তিনি নাকি ১৪ বছর কারান্তরালে ছিলেন। এই দাবী মোটেও সঠিক নয়।
সামরিক ট্রাইবুন্যালে অলি আহাদ
১৯৮২- এর পর অলি আহাদ একমাত্র রাজনৈতিক নেতা যাঁকে এরশাদের সামরিক সরকার বিশেষ সামরিক ট্রাইবুন্যালে বিচারের সম্মুখীন করেছিল। সে দিন সামরিক আদালতে দাড়িঁয়ে অলি আহাদ অকুতোভয়ে সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে যে বিবৃতি থেকে প্রেরণা লাভ করতে পারেন। আগেই বলেছি, অলি আহাদের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ’ ছিল ছাপার অক্ষরে এক জীবন্ত দ্রোহ। এই নিবন্ধ লেখক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক থাকা অবস্থায়, সম্পাদকের অনুমতিক্রমে দীর্ঘকাল ইত্তেহাদে সম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখেছিলেন। উল্লেখ্য যে, ইত্তেহাদের সম্পাদকীয় কলামের উপরে ছাপা হতো বিদ্রোহের সেই অগ্নিবাণীঃ “অসত্যের কাছে নত নাহি হবে শির, ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যায় বীর।” এই বাণী সম্পাদকীয় নিবন্ধের উপরে শুধু মুদ্রিতই থাকতোনা, ইত্তেহাদের প্রতিটি পৃষ্ঠায় প্রতিটি ছত্রে এই ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন ঘটতো। যাহোক ১৯৮৪ সালের ৮ই অক্টোবর ৭নং সামরিক আদালতে প্রদত্ত অলি আহাদের সেই ঐতিহাসিক জবানবন্দীর একটি অংশ নিম্নে উদ্ধৃতি করা হলোঃ- 
“আমার বিবেক আর আজীবন রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের কাছে বিশ্বস্ত থেকে আমি বলতে চাই যে, তাত্ত্বিক কিংবা আদর্শগত কোন দৃষ্টিকোণ থেকেই সামরিক আইন প্রশাসন আমার কাছে গ্রহনীয় নয়, যিনিই এটা জারী করুন না কেন; হোন তিনি জেনারেল আইয়ুব, অথবা জেনারেল ইয়াহিয়া অথবা লেঃ জেনারেল জিয়াউর রহমান অথবা মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর কিংবা লেঃ জেঃ এইচ. এম. এরশাদ। বিচারাসনে উপবিশষ্ট হওয়া মাননীয় আদালতের ক্ষমতার উৎস হচ্ছে ১৯৮২ সনের ২৪ শে মার্চের মার্শাল ল প্রক্লামেশন। যেহেতু সামরিক আইন একটি বাস্তবতা; সেহেতু আমাকে মাননীয় আদালতকে মানতে হয়। আধুনিক ইতিহাস রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে জেনারেলদের অধিষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেছে। তাদের শাসন তাদের স্ব স্ব দেশ ও জনগণের জন্যে বয়ে এনেছে বিপর্যয়। দৃষ্টান্ত স্বরুপ বলা যায়, নবাব সিরাজুদ্দৌলার সেনাপতি মীর জাফর আলী খান বাংলাকে দাসত্ব শৃংখলে আবদ্ধ করার জন্য দায়ী। এই শৃংখলের পথ ধরেই ভারত ১৯০ বছর ধরে পরাধীনতার শৃংখলে শৃংখলিত হয়। নেপোলিয়ন বোনাপার্টি  ফ্রান্সের বিপর্যয় ডেকে আনে। জার্মানীর হিটলার সভ্যতাকে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত করে। গণতান্ত্রিক সিস্টেমেও জেনারেলদের শাসন আকর্ষণীয় কিছু নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল আইসেন হাওয়ার (আইখ) সোভিয়েত রাশিয়ার আকাশে ইউ-২ গোয়েন্দা বিমান পাঠিয়ে ১৯৬০ সনে প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য রাষ্ট্র প্রধানদের শান্তি- সম্মেলন বিপর্যয় করে ফেলেন। জাপানের জেনারেল তোজো তার দেশকে উপহার দিয়েছেন পরাজয় আর বিপর্যয়। সাম্প্রতিক কালের সমর- নায়কদের শাসনের ইতিহাসও চরম ব্যর্থতার আলেখ্য। জেনারেল আইয়ুব, আর্জেন্টিনার জেনারেল গলতিয়ারী, বার্মার জেনারেল নেউইনের শাসন এই নির্মম বাস্তবতারই প্রমাণ বহন করে।” 
আন্দোলনের পুরোধা
অলি আহাদ মুসলিম লীগ সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলনের পুরোধা কর্মী ছিলেন। তিনি ছিলেন পূর্বপাকিস্তানের মুসলিম ছাত্র লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তীকালে নীতির প্রশ্নে আপোষহীনতার কারণে তিনি ছাত্র লীগের এবং আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। কালের পরিক্রমায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত ছাত্র লীগেরই আপোষহীন সংগ্রামী ভূমিকা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টিতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে।
বস্তুতঃ ধাপে ধাপে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার প্রতিটি পর্যায়ে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন অলি আহাদ। সবাই জানেন, ১৯৭১ সালে শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণায় দোদুল্যমানতা প্রদর্শন করেছিলেন। এমনকি ৭ই মার্চের ভাষণেও সুস্পষ্ট কিছু বলেন নাই। অথচ ৬ই মার্চ, ১৯৭১ ন্যাশনাল লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে অলি আহাদ নির্বাচিত পরিষদ সদস্যদের প্রতি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র ঘোষণার এবং প্রয়োজনে স্বাধীনতাকামী সকল রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ঐক্যবদ্ধ মুক্তিফ্রন্ট গঠনের আহবান জানান। বাংলা ন্যাশনাল লীগের ছাত্র সংগঠন ফরোয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লক মুজিব- ইয়াহিয়া আলোচনা চলাকালে যে প্রচারপত্র ছেড়েছিল, তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল “আপোষের চোরাবালীতে বাংলার এ স্বাধীনতার উদিত সূর্য যেন মেঘাচ্ছন্ন না হয়।”
এছাড়াও ফরোয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লক “তোমরা আমায় রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” নেতাজী সুভাষ বোসের এ উক্তি সম্বলিত ব্যাজ বিতরণ করে। এতেও “মুক্তিফৌজ গঠন করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো” শ্লোগান উৎকীর্ণ ছিল। এর আগে ১৯৭০ এর ৪ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানের জনসভায় মাওলানা ভাসানীসহ বক্তৃতাকালে এবং ৫ই ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় সমাবেশে ভাষণদান কালে অলি আহাদ স্বাধীনতা ঘোষণার দাবী জানান। ১৯৭১ এর ৬ই মার্চ পল্টনের সমাবেশে শেখ মুজিবের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, “মুজিব ভাই, আপনি স্বাধীনতা ঘোষণা করুন। আমরা দেশবাসী আপনার সাথে আছি।”
অলি আহাদসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা ও দল যখন অবিলম্বে স্বাধীনতা ঘোষণার দাবী জানাচ্ছিলেন, তখন শেখ মুজিব তার দলবলসহ ইয়াহিয়া খানের সাথে শর্ত সাপেক্ষে আপোষ আলোচনায় ছিলেন ব্যস্ত। কিন্তু স্বাধীনতার পরে দেখা গেল শুধু আওয়ামী লীগ একাই স্বাধীনতার সকল কৃতিত্ব দাবী করছে। শুধু তাই নয়, তাদের উপরে পাক হানাদারদের নির্যাতনের নানা কল্পিত কাহিনী প্রচার করে তারাই যে সে সময়ে দেশবাসীর একমাত্র নেতৃত্বে ছিল, শতমুখে সেই দাবী প্রচার করে চলছে।
এদিকে সিদ্দিক সালেকের Witness to Surrender পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৫শে মার্চ  Operation Search Light চলাকালে যাদেরকে জীবিত বা মৃত গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল সেই তালিকায় অলি আহাদ ছিলেন নবম ব্যক্তি। তিনি তাঁর সহগামীদের নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে তাদের নেতৃত্ব দেন। যদিও সেই অবস্থায় আওয়ামী লীগ সব সময়ই অলি আহাদ এবং তাঁর অনুসারীদের কোনঠাসা করার চেষ্টা করেছে।
আজাদ বাংলা আন্দোলন 
স্বাধীনতার পর ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রখে দাড়াঁন অলি আহাদ। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের দাবী জানান তিনি। ২৫ সালা গোলামী চুক্তির বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। বাংলাদেশের পুতুল সরকার ও আগ্রাসী ভারতের বিরুদ্ধে আজাদ বাংলা কায়েমের ডাক দিয়ে তিনিই প্রথম আন্দোলন শুরু করেন।
১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ ইন্দিরা গান্ধী ঢাকা সফর করেন এবং ১৯ মার্চ ভারত বাংলাদেশ ২৫ বছর মেয়াদী তথাকথিত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিনই ২০শে মার্চ ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামে জেলা জাতীয় লীগের কর্মী সম্মেলনে এবং ২২শে মার্চ লালদিঘী মাঠের জনসভায় অলি আহাদ এ চুক্তিকে গোলামীর চুক্তি হিসেবে অভিহিত করে এই চুক্তি বাতিলের দাবী জানান। কিন্তু ওই চুক্তি বাতিল না করে বরং মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ২৭শে মার্চ মুজিব সরকার ভারত- বাংলাদেশ অবাধ সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির বিরুদ্ধে অলি আহাদ ১৯৭৩ সালের ২৩শে ডিসেম্বর সারা দেশব্যাপী ‘আজাদ বাংলা দিবস’ পালনের ডাক দেন এবং পল্টনে জনসভার কর্মসূচী ঘোষণা করেন। কিন্তু ২২শে ডিসেম্বরই আসে তাঁর জন্য এক চরম দুঃসংবাদ। তাঁর অভিবাবকতুল্য বড়ভাই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীন অধ্যাপক ডঃ আব্দুল করিম ইন্তেকাল করেন। তাঁকে অলি আহাদের ভাই হবার অপরাধে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর পদে নিয়োগ না দিয়ে তাঁর জুনিয়ারকে সে পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। ২৩ শে ডিসেম্বর অগ্রজের জানাজা পড়ে লাশ কবরে শায়িত করে বেদনাবিধুর মন নিয়েও অলি আহাদ পল্টন ময়দানে নির্ধারিত জনসভার মঞ্চে এসে হাজির হন এবং মুজিবী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষায় বক্তব্য রাখেন।
একই ভাবে ১৯৭৩ সালের ২৫ শে সেপ্টেম্বর বিশেষ ক্ষমতা আইনের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করেন এবং এই নিবর্তন মূলক আইন বাতিলের দাবী জানান। তাঁর এই সাহসী ভূমিকাই অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে আন্দোলনমুখী চেতনা জাগ্রত করতে সহায়তা করে। তাঁর প্রচেষ্ঠায় ১৯৭৪ সালের ১৪ই এপ্রিল গঠিত হয় সর্বদলীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং তার নেতৃত্বাধীন বাংলা জাতীয় লীগের ৬৩, বিজয় নগরস্থ অফিসকেই সর্বদলীয় ঐক্যফন্টের অফিস হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ২৩ শে এপ্রিল পল্টনে অনুষ্ঠিত হয় ঐক্যফন্টের জনসভা। জনসভায় বিপুল জনসমাগম হয়। এতে ক্ষমতাসীন মুজিব সরকারের টনক নড়ে। সরকার দেশের সকল বড় বড় শহরে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে- যাতে বিরোধী দল কোন সমাবেশ করতে না পারে। ঐক্যফন্ট ১৪৪ ধারা প্রত্যাহারের দাবী জানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় কর্মীসভা করে আন্দোলন অব্যাহত রাখে।
সরকারের জরিমানাঃ ১৫ স্বর্ণমোহর 
২রা জুন, ৭৪ ঢাকা বার লাইব্রেরী হলে মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ঐক্যফন্টের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, সরকার ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার না করলে বা মেয়াদান্তে তা পুনঃপ্রবর্তন করলে ৩০ শে জুন ১৪৪ ধারা অমান্য করা হবে। সরকার ২৫ শে জুন থেকে পুনরায় ১৪৪ ধারা বহাল করলে অলি আহাদ ২৮ শে জুন এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রীট আবেদন পেশ করেন। ৩০ শে জুন তারিখে সরকার অলি আহাদকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটকাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠায়। মাওলানা ভাসানীকে গ্রেফতার করলেও কারাগারের পরিবর্তে সন্তোষের বাড়িতে গৃহবন্দী করে রাখে। ৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের রায়ে ১৪৪ ধারা জারীর আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং মহামান্য আদালত আবেদনকারী অলি আহাদকে মামলার খরচ বাবদ ১৫টি স্বর্ণমোহর প্রদানের নির্দেশ দেন।
বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য ও বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছিলেন। অলি আহাদ তখন কারাগারে, মাওলানা ভাসানী গৃহবন্দী। এই ফাঁকে সর্বদলীয় ঐক্যফন্টের নেতারা ঘোষিত ওয়াদা থেকে সরে গেলেন এবং ঐক্যফন্টের ব্যানার গুটিয়ে নিজ নিজ দলের ব্যানারে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দিলেন। ঐক্য ভেঙ্গে যাওয়ায় মুজিব সরকার হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। বাংলা জাতীয় লীগ অলি আহাদসহ নেতৃবৃন্দের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ও মুক্তির দাবিতে ১৭ নভেম্বর পল্টন ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করে এবং এটাই ছিল মুজিব আমলের সর্বশেষ বিরোধী দলের জনসভা। এরপর পল্টনে শুধু নয় কোথাও কোন জনসভা হতে পারে নাই। কেননা এরপর ২৮ ডিসেম্বর, ‘৭৪ জারী করা হয় জরুরী অবস্থা। আর গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়া হয় ১৯৭৫ সালের ২৫ শে জানুয়ারী সব দল ও সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। চীফ হুইপ শাহ মোয়াজ্জেমের উত্থাপিত শাসনতন্ত্রের ৪র্থ সংশোধনী বিল ১১ মিনিটের মধ্যে ব্রুট মেজরিটির জোরে কোন সমালোচনার তোয়াক্কা না করেই পাশ করা হয় এবং সংসদীয় সরকারের পরিবর্তে একদলীয় প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। শেখ মুজিবকে ‘যেন তিনি নির্বাচিত’ হিসাবে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়।
কি বিচিত্র এই দেশ! সেই আওয়ামী লীগ আজ সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক হিসেবে নিজেদের কৃতিত্ব দাবীদার! অথচ বাকশাল ঘোষণার অব্যাহতি পূর্বের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ উল্লাহ্কে তারা সে দিন অপেক্ষারত একটি বিদেশী প্রতিনিধি দলকে সাক্ষাৎদানের জন্য মাত্র ১৫ মিনিট সময় পর্র্যন্ত দিতে রাজী হয় নাই। এমনকি কোন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে বঙ্গভবন কিংবা সংসদ ভবনে শপথ গ্রহণের সময় দিতে কিংবা ধৈর্যধারণের সৌজন্যটুকু পর্যন্ত প্রদর্শন করতে পারে নাই। সংসদের লবীতেই শেখ মুজিবকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ করানো হয়। শুরু হয় নতুন শ্লোগানঃ “এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ”।
বাকশাল এবং অতঃপর 
বাকশাল আমলে উন্মোচিত হলো নীতিহীন রাজনীতিবিদ কবি সাহিত্যিক অধ্যাপক বুদ্ধিজীবিদের আর এক চরিত্র। প্রবীন নেতা আতাউর রহমান খান, হাজী দানেশ সহ বহু নেতা বাকশালে যোগদানের অনুমতি চেয়ে মুজিব বন্দনার নয়া রেকর্ড সৃষ্টি করলেন। ব্যতিক্রমদের তালিকায় শীর্ষে থাকলেন অলি আহাদ। জেলের ভেতরেও তাঁকে প্রলুব্ধ করা হয়েছে ক্ষমতার প্রতি, কিন্তু তিনি ছিলেন অনড়। অন্যদিকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের বুলি কপচানো কবি সাহিত্যিক অধ্যাপক বুদ্ধিজীবি সাংবাদিক কলামিষ্টরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন বাকশালে যোগ দিতে। মাত্র গুটি কয়েক সাংবাদিক সেদিন চরম চাপের মুখেও অনড় থেকেছেন। বাকশালে যোগদান না করে তাঁরা এদেশের সাংবাদিকতার সংগ্রামী ঐতিহ্যকেই সমুন্নত রেখে গেছেন। সেদিন যেসব সাংবাদিক, কলামিষ্ট, বুদ্ধিজীবি দল বেঁধে মুজিব বাকশালে যোগদান করেছিলেন, তাদের তালিকা অলি আহাদের “জাতীয় রাজনীতি ৪৫ থেকে ৭৫” পুস্তকে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এদেশের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এই পুস্তকটি একটি বিশ্বস্থ দলিল। যাহোক, এভাবেই সেদিন মাঠে একদলীয় আওয়ামী বাকশালী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কোন সুযোগ রইলো না, আর সাহসী কন্ঠ অলি আহাদ তখন বন্দী হয়ে রইলেন অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে।
গোটা দেশ জুড়ে শুরু হলো খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, লুন্ঠন আর সন্ত্রাস। শুরু হল দুর্ভিক্ষে অনাহারে মৃত আদম সন্তানের লাশের মিছিল। প্রতিবাদ করার সব গণতান্ত্রিক পথ রুদ্ধ। সারাদেশ যেন এক ভয়াল মৃত্যুপুরী। এমনি সময়ে ১৫ই আগষ্টের সুবেহ সাদেকের সময়ে ইথারে ভেসে এল সমকালীন বিশ্ব ইতিহাসের অমিত ক্ষমতাধর শাসক শেখ মুজিবের পতনের ঘোষণা। গোটা দেশ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত চমকে উঠল। কারণ মুজিবের পতন যেমন ছিল অবিশ্বাস্য তেমনি দুর্ভাগ্যজনক ছিল তাঁর পতনের প্রক্রিয়াটি। প্রচন্ড ক্ষোভের ঘুর্ণিঝড়ে শেখ মুজিব একা নন, তার গোটা পরিবার, তার বংশধারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। ১৫ই আগস্টের পর অলি আহাদসহ অন্যান্য রাজবন্দীগণ মুক্তি পেলেন কারাঅন্তরাল থেকে। এর পরের ইতিহাস কম বেশী সবারই জানা।
উল্লেখ্য, ১৫ই আগস্ট ৭৫- এর পর বাংলাদেশ সত্যিকারের স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্থান করে নিল বিশ্ব দরবারে। একে একে মুক্ত হলো সংবাদপত্র সমূহ। ইত্তেফাকসহ অন্যসব সংবাদপত্র মালিকরা ফিরে পেলেন নিজ নিজ মালিকানা। এই নিবন্ধের লেখক বাকশালে যোগদান না করায় ইত্তেফাক থেকে চাকুরিচ্যুত হয়েছিলেন। আবার তিনি ইত্তেফাকে অধিষ্ঠিত হলেন। বাকশাল আমলে পত্রিকা বন্ধ হওয়ার কারণে শতশত সাংবাদিক  চাকুরী হারিয়ে সেদিন পথে পথে ঘুরেছেন। বাকশালে যোগদান করেও তারা কেউ রেহাই পান নাই। আজও এদেশে ১৬ জুন সংবাদ পত্র জগতে ‘কালো দিবস’ হিসাবে পালিত হয়ে থাকে। ওই তারিখেই শেখ মুজিবের বাকশাল সরকার সংবাদপত্র কুক্ষিগত করে। যাহোক, ১৫ আগস্টের পর নিষিদ্ধ ঘোষিত সব দল নিজ নিজ ব্যানার ফিরে পেল। ৩রা নভেম্বর ঘটলো পালটা অভ্যুত্থান। ইত্যবসরে জেলখানায় নিহত হলেন স্বাধীনতা যুদ্ধকালের ৪ নেতা তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান। ৭ই নভেম্বর বন্দী সেনা প্রধান জিয়াউর রহমানকে সিপাহী জনতা মুক্ত করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করলো। স্বীয় মা ভাইয়ের অতি উৎসাহের খেসারত দিয়ে প্রাণ হারালেন পাল্টা অভূত্থানের নেতা জেনারেল খালেদ মোশাররফ। বাকশালের পেট থেকে সিজারিয়ান অপারেশন করে আওয়ামী লীগকে নবজন্ম দিলেন খালেদা জিয়া। শেখ হাসিনাকে প্রবাস থেকে ফিরে আসার সুযোগও তিনি করে দিলেন। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলেন ১৭ই এপ্রিল’ ৮১, আর জিয়া নিহত হলেন ৩০ মে, চট্টগ্রামে। এরপর এরশাদ কিভাবে ক্ষমতা দখল করলেন, তা কম বেশী সবার জানা। আজ ১৫ই আগস্টের পটÑপরিবর্তনের নায়করা মৃত্যুর মুখোমুখি; অথচ তাদের জানবাজির ফল ও ফসল ভোগীরা তাঁদের সপক্ষে একটি মাত্র শব্দ উচ্চারণ করার নৈতিক সাহস পর্যন্ত প্রদর্শন করতে পারছেন না। রাজনীতির খেলা সত্যিই বড় বিচিত্র !
শুরুতে জাতীয় কবির যে কবিতা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম, সেই ধামাধরা- জামা ধরাদের চির ‘বিরোধী হচ্ছেন অলি আহাদ। ‘হতাশা’ আর ‘আপোষ’ এ দুটি শব্দ তাঁর রাজনৈতিক অভিধানে নাই। পবিত্র হাদিসে আছে, ‘জালিম সরকারের মুখের উপর হক কথা বলা উত্তম জেহাদ’। আমাদের তোষামোদী আর আপোষ কামীতার রাজনীতিতে অলি আহাদকে যদি ‘মর্দে মোজাহিদ’ বলি, ভূল বলা হবেনা। দেখা যায়, ক্ষমতায় যে সরকারই থাকুক, সে সরকারের যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে অন্যরা চুপ থাকলেও তিনি প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। শাসকগোষ্ঠীর যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া প্রকাশে তিনি আজও দ্বিধাহীন ও অকুন্ঠ। তিনি বিশ্বাস করেন, জনতার মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটবেই।
উপসংহার
ক্ষমতার রাজনীতিতে দৃশ্যতঃ অলি আহাদ সফল নন। কিন্তু গণমানুষের কল্যাণে জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের ভূমিকা বিশ্লেষণে তাঁর সফলতা ঈর্ষনীয়। আগেই বলেছি, একজন রাষ্ট্রনায়কের যে গুণাবলী থাকার কথা তার সবটুকুই তাঁর চরিত্র ও চিন্তায় বিদ্যমান। তাঁর সান্নিধ্যে একঘন্টা কাটাতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ে একমাস পাঠ নেয়ার জ্ঞান অর্জন করা যায়। তাঁর মুখ নঃিসৃত প্রতটিি বাক্যইে রয়ছেে অনুসন্ধৎিসু মনরে চন্তিা ও সৃষ্টশিীল রচনার অবমিশ্রি উপাদান। বশ্বি রাজনীতরি প্রতটিি ঘটনা শুধু তাঁর নখর্দপনে নয়, চলমান ঘটনাবলীর ব্যাপারে তার বজ্ঞি- বশ্লিষেণও সত্যি চমৎকার। দশেীয় সংবাদপত্র পাঠরে পাশাপাশি বশ্বিরে খ্যাতনামা দনৈকি পত্রকিা ও ম্যাগাজনি তনিি গভীর মনোযোগ দয়িে নয়িমতি পাঠ করনে। জাতকিে নতেৃত্ব দতিে হলে যে জ্ঞান স্পৃহা থাকা অপরিহার্য জীবনসায়াহ্নে এসওে অলি আহাদরে মধ্যে আজো সইে জ্ঞান স্পৃহা অপরসিীম। বলতে দ্বধিা ও সংকোচ দুটাই বোধ করছি যে অলি আহাদরে সাথে আমার যে সহর্মমীতা তা তাঁর রাজনীততিে নয়, বরং তাঁর ব্যক্তি জীবনরে সততা ন্যায়নষ্ঠিা অমায়কি সৌজন্যমূলক ব্যবহারে এবং বশিষেতঃ এই জ্ঞান স্পৃহার ক্ষত্রেইে।
আল্লাহ্ তাঁর আরো হায়াত দারাজ করুন এবং জাতরি ববিকে হসিবেে তাঁকে আরো বলষ্ঠি ভূমকিা পালনরে তওফকি এনায়তে করুন, আমীন।