উজান স্রোতের আপোষহীন দুঃসাহসী মাঝি -আবদুল গফুর

ফন্ট সাইজ:
নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি প্রায় অপরিচিত একটি নাম। অপরিচিত হবারই কথা। তিনি কোন মন্ত্রী- মিনিস্টার নন। হতে পারতেন সবই। তাঁর ছেলের বয়সী অনেকেই মন্ত্রী হয়েছে, মিনিস্টার হয়েছে। বড় দলের নেতা হয়েছে। কিন্তু তিনি পারেন নি। কেন পারেননি? তাঁর সম্বন্ধে বলতে গেলে, সেটাই বলতে হয় প্রথমে। ফিরে তাকাতে হয় তাঁর ৭৪ বছরের দীর্ঘ জীবনের দিকে।
জন্মেছিলেন ১৯২৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। মুসলমানদের মধ্যে যখন শিক্ষার হার একেবারেই নগণ্য, তখনও তাঁর পরিবারের খ্যাতি ছিল শিক্ষিত পরিবার হিসাবে। এখনও তাঁর নিকটজনদের প্রায় সকলেই মেধা, যোগ্যতা ও উচ্চ শিক্ষার সুবাদে সমাজে স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি নিজেও ছাত্র জীবনে রেখেছেন মেধার স্বাক্ষর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালে কারাজীবন তাঁর প্রায় নিত্যসঙ্গী হওয়ার পরও তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে বি.কম পাশ করেন। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে এম.কম এ ভর্তির অনুমতি দেয়া হয়নি। হলে, তিনি এম.কম পরীক্ষায়ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতেন। রাজনীতিতে জড়িয়ে না পরলে সি এস পি হয়ে প্রশাসনের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়া, অথবা ডক্টরেট ডিগ্রী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হওয়া তাঁর জন্যে কোন ব্যাপারই ছিল না।
কিন্তু সে পথে তিনি যাননি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন রাজনীতির পথ। রাজনীতিরও গতানুগতিক পথে থাকলে সামাজিক খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা লাভ কোনটাই তাঁর জন্য কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু এক্ষেত্রেও তাঁর ছিল ব্যতিক্রমী ভূমিকা। রাজনীতিকে অন্যান্য অধিকাংশের মত তিনি প্রতিষ্ঠা লাভের হাতিয়ার করতে চাননি। চেয়েছেন শোষিত, বঞ্চিত মানুষদের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করতে। চেয়েছেন ক্ষমতার রাজনীতির গতানুগতিক ধারার গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে না দিয়ে জাতির মুক্তি ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠির কল্যাণের স্বার্থে আজীবন সংগ্রামী পথে চলতে।
তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন ছাত্র জীবনেই। চল্লিশের দশকে আর দশজন মুসলমান ছাত্রের মত তিনিও জড়িত হয়ে পড়েন পাকিস্তান আন্দোলনে। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মন প্রাণ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন একটি স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। এই সুবাদেই তিনি সংস্পর্শে আসেন বিপ্লবী রাজনীতিবিদ আল্লামা আবুল হাশিমের। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নব গঠিত রাষ্ট্রের কর্ণধারদের আচরণে স্বাভাবিক কারণেই মর্মাহত হন তিনি। শুরু হয় সংগ্রামের নতুন পর্যায়। ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন পাকিস্তান আন্দোলন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, সব শেষে পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ সকল আন্দোলনেই ছিল তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা। নয় মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের পর অবশেষে একদিন এলো একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বর। নতুন করে স্বাধীনতা এলো জাতির জীবনে- জন্ম নিলো স্বাধীন বাংলাদেশ। এবার কি ইতি হল তাঁর সংগ্রামের? না, ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে যায় আধিপত্যবাদী ভারতের চক্রান্তে এদেশের কিছু সেবাদাসের যোগসাজসে লাখো শহীদের রক্তের মূল্যে অর্জিত এ স্বাধীনতা মিথ্যা, অর্থহীন করে দেয়ার এক নতুন ষড়যন্ত্র। আবার তিনি নামলেন রাজপথে, ডাকদিলেন নতুন সংগ্রামের। দেশে চলছে শেখ মুজিবের শাসন। সেই শেখ মুজিব- যাঁর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তান আমলে অংশ নিয়েছেন ভাষা আন্দোলনে, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এবং এসবের পরিনামে যার সাথে একযোগে কারাভোগ করেছেন, তাঁর প্রিয় সেই শেখ মুজিব ভাইয়ের শাসনামল। ভাগ্যের পরিহাস তিনি তার স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর প্রিয় মুজিব ভাইয়ের শাসনামলেই নিক্ষিপ্ত হলেন কারাগারে। অবশেষে এলো পচাত্তরের পট পরিবর্তন। মুক্তি পেলেন কারান্তরাল থেকে। সবার সাথে তিনিও মুক্তি ও স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললেন। কিন্তু এবার কি অবসান হলো তাঁর সংগ্রামের ? ১৫ আগস্টের স্বস্থি আর ৭ নভেম্বরের মুক্তি উল্লাসের রেশ কাটতে না কাটতেই আধিপত্যবাদী চক্রান্তে প্রাণ দিতে হল প্রেসিডেন্ট জিয়াকে। দেশে আবার ফিরে এলো সামরিক শাসনের অভিশাপ। শুরু হলো জেনারেল এরশাদের সেনাপতি শাসন। সুতরাং আবার রাজপথে নামলেন তিনি।
সে সংগ্রামেরও অবসান হলো একদিন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণ- আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হলেন সামরিক ডিরেক্টর জেনারেল এরশাদ। ১৯৯১ সালে দেশে শুরু হল গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা। এরপর থেকে দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের মারফৎ সরকার গঠনের এ স্তরেও কিন্তু তাঁর সংগ্রামের ইতি হয়নি। দেশে এখন অবাধ নির্বাচনের মারফৎ সরকার পরিবর্তনের পালা শুরু হলেও দেশ থেকে দুর্নীতি, সন্ত্রাসের মূলোচ্ছেদ সম্ভব হচ্ছে না। সরিষার মধ্যেই যেখানে ভূত, সেখানে ভূত কিভাবে দূর হবে ? তা ছাড়া সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদী অপশক্তির কাছে নতি স্বীকার করে না, শাসকদের মধ্যে এমন নিরাপোষ মনোভাবই বা কে কতটা দেখাতে পারছেন ? সুতরাং ৭৪ বছরের এ বৃদ্ধ জননেতাকে আজও রাজপথেই দেখা যাচ্ছে যথাসাধ্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে।
 
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন বিভিন্ন আন্দোলনে। সম্পৃক্ত হয়েছেন বহু সংগঠনের সাথে- মুসলিম লীগ, গণ আজাদী লীগ, ছাত্র লীগ, যুব লীগ, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, জাতীয় লীগ, ডেমোক্রেটিক লীগ ইত্যাদি ইত্যাদি অন্তরঙ্গ সম্পর্কে এসেছেন অনেক নেতার এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, আবুল হাশিম, আতাউর রহমান খান, কমরুদ্দিন আহমদ, শামসুল হক, মাহমুদ আলী, শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, কমরেড আবদুল মতিন, আবদুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ। কিন্তু এদের কম জনের প্রতিই তিনি শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধা বজায় রাখতে পেরেছেন। কারো প্রতি তিনি শ্রদ্ধা হারান সুবিধাবাদিতার কারণে। আবার কারো কারো প্রতি তিনি শ্রদ্ধা হারান সংশ্লিষ্টদের স্বাবরোধিতা, নীতিহীনতা, স্বার্থপরতা, দুর্নীতি, দেশপ্রেমহীনতা বা কাপুরুষতার কারণে। প্রধানতঃ বিপ্লবী ভাষা সৈনিক হিসাবে তাঁর ব্যাপক পরিচয় থাকলেও তিনি অদ্যাবধি এমন একজন রাজনৈতিক নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল, ভাষা আন্দোলনে বিরোধিতার জন্য যাঁর সাথে তিনি তর্কও করেছেন সামনা সামনি। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের অবিসম্বাদিত নেতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। বৃটিশ সরকার ও ব্রাহ্মণবাদী নেতৃত্বের প্রবল বিরোধতিার মুখে পাকিস্তান দাবীতে জিন্নাহর অটল ও অনমনীয় মনোভাব এবং ইতিহাসের সেই ঘোর দুর্দিনে এক প্রতিকূল পরিবেশে পাকিস্তান প্রতিষ্টার আন্দোলনে তাঁর নিঃস্বার্থ, বলিষ্ঠ ও আপোষহীন ভূমিকার কারণে তিনি জিন্নাহর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কখনও কার্পন্য করেন না। আরেক জন আপোষহীন সংগ্রামী জননেতার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা অপরিসীম। তিনি মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ভাসানীর মতই শোষিত বঞ্চিত গণ মানুষের স্বপক্ষে তাঁর আজীবন সুদৃঢ় অবস্থান। মাওলানার মতই অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য নির্যাতন, আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং জাতীয় স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সপক্ষে তাঁর উচ্চকন্ঠ নিরাপোষ ভূমিকা।
তাঁকে অনেকে ব্যর্থ রাজনীতিবিদ বলবেন। কারণ তিনি এতদিন ধরে রাজনীতি করেও না যেতে পেরেছেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়, না হতে পেরেছেন একটি বড় দলের নেতা। কিন্তু এত তাঁর কোন দুঃখ নেই। নীতিহীনতা, সুবিধাবাদিতা, আপোষকামীতার পথে আগালে এসব তার জন্য কোন সমস্যাই ছিল না। জীবন- যৌবনের বিরাট অংশ কেটেছে তাঁর জেলে জেলে। বয়সের গুরুভার দৈহিকভাবে তিনি এখন অনেকটাই বিধবস্ত। কিন্তু মানসিক ভাবে তিনি এখনও বিপ্লবী তারুণ্যের অফুরন্ত শক্তিতে ভরপুর। তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি ভাঙ্গেন তবুও মচকান না। উজান স্রোতে নৌকা চালাতে অঙ্গীকারবদ্ধ এই নিরাপোষ দুঃসাহসী মাঝিটির নামই অলি আহাদ।