জাতীয় রাজনীতির বিবেক পুরুষ অলি আহাদ -ডঃ মাহবুব উল্লাহ

ফন্ট সাইজ:
নির্লোভ নির্মোহ ও নির্ভিক একজন রাজনীতিকের নাম যদি আমরা জানতে চাই তাহলে বর্তমান বাংলাদেশে খুব বেশী লোকের নাম বলা যাবে না। জনাব অলি আহাদ এই সব বিরল গুণাবলী সম্পন্ন একজন রাজনীতিবিদ। আজীবন তিনি কখনো পিছপা হননি। জীবনের মোহের কাছে তিনি কখনো আত্মসমর্পণ করেননি। আমাদের জড়াগ্রস্ত ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থায় এরকম একজন আদর্শ পুরুষের অবস্থান জাতির জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয়। রাজনীতি ক্ষমতার লড়াই। কিন্তু সেই ক্ষমতার লড়াই যখন নিছকই ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে পরিণত হয় তখন সেই রাজনীতি মানুষের কোন কল্যাণ সাধন করতে পারে না। জনাব অলি আহাদের রাজনীতি হলো মানব কল্যাণবাদের রাজনীতি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের রাজনীতি। রাজনীতিতে বিবেকের কন্ঠধ্বনি হিসেবে তাঁর নাম এদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।
কিশোর বয়সেই রাজনীতিতে জনাব অলি আহাদের হাতে খড়ি হয়। সমকালীন সমাজের দ্বন্দ্ব ঘাতপ্রতিঘাত তাঁর চিন্তা ভাবনাকে রুপ দান করেছে। উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের এক ক্রান্তিলগ্নে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ সরকার তাদের শাসনামলে ইতিহাসে প্রথম বারের মতো সমগ্র ভারতবর্ষকে একটি একক শাসন ক্ষমতার অধীনে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। যেহেতু বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিম শাসকবর্গের হাত থেকেই ক্ষমতার রাজদন্ড হস্তগত করেছিল- সেহেতু মুসলমানদের প্রতি তাদের অবিশ্বাস ও সন্দেহ ছিল গভীর। তাই বৃটিশ শাসনের অন্ততঃ প্রথম একশত বছরে মুসলমানরা সকল প্রকার রাজানুগ্রহ থেকে বঞ্চিত ছিল। চাকুরী- বাকুরী, শিক্ষা- দিক্ষা, ব্যবসা- বাণিজ্য ও শিল্প সহ সকল ক্ষেত্রেই মুসলমানেরা তাদের প্রতিবেশী হিন্দু প্রজাবর্গের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়েছিল। হান্টার সাহেব সেই সময়কার মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কে বলেছেন, Muslims became drivers of water and heweres of wood. রাজ্যহারা মুসলমানেরা ইংরেজ বিরোধী প্রবল প্রতিক্রিয়ায় অন্ধ হয়ে ইংরেজী শিক্ষা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। ফলে তাদের অনগ্রসরতায় আরো তীব্র রুপ ধারণ করে। এই পর্যায়ে স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নওয়াব সলিমুল্লাহসহ মুসলিম নেতৃবৃন্দ ইংরেজ শাসনের কাছ থেকে সীমিত সুবিধা অর্জনের রাজনীতির সূচনা ঘটায়। কিন্তু তখনো মুসলমানরা পৃথক রাষ্ট্রগঠনের লক্ষ্য ব্যক্ত করেনি। বৃটিশ ভারতে মুসলমানরা আপ্রাণ চেষ্ঠা করেছে নিজেদের অধিকারের গ্যারান্টীসহ একটি ঐকবদ্ধ রাষ্ট্রে বসবাস করতে এবং ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করতে। কিন্তু রাজনৈতিক বিকাশের গতিধারায় যখন মুসলমানরা উপলব্ধি করলো একটি পৃথক রাষ্ট্রীয় সত্তা ছাড়া তাদের অধিকার নির্দিষ্ট করা সম্ভব না কেবল মাত্র তখনই তারা পৃথক রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবী তুলে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই দাবীর পিছনে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের যুক্তি উপস্থাপন করেন। জনাব অলি আহাদ ইতিহাসের এই ক্রান্তি লগ্নেই রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার সংস্পর্শে আসেন। তিনি লিখেছেন- “আব্বা দৈনিক আজাদ, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী, মাসিক মোহাম্মদী ও মাসিক সওগাতের নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। এই সকল দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রপত্রিকায় সচিত্র খেলার বিবরণ, বিশেষ করিয়া ফুটবল মাঠে কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ১৯৩৪ সাল হইতে ১৯৩৮ সাল এবং ১৯৪০ ও ১৯৪১ সালে ক্রমাগত একটানা বিজয় সংবাদ আমার কিশোর মনে তথ্য আবাল বৃদ্ধবনিতা মুসলমানদের মনে এক লুপ্তপ্রায় সত্তার পুণর্জাগরণের আহবান ও আবেদন জানাইত। গ্রামোফোন রেকর্ডে নজরুল রচনা ও আব্বাস উদ্দীনের কন্ঠ বাংলার মুসলমান মাত্রেরই যেনো গর্বের বস্তু ছিল। অর্থাৎ নজরুলের রচনা, গীত- গজল, আব্বাস উদ্দীনের কন্ঠ ও মোহামেডান স্পোর্টিং এর কলিকাতার খেলার মাঠের বিজয় আত্মজ্ঞান হারা মৃয়মান মুসলমান সমাজকে আত্মস্থ, আত্মসচেতন ও আত্মবলে বলীয়ান করার মূলে বিশেষ আবদান রাখিয়াছে। ফলে মুসলমানদের ভারতের বুকে স্বীয় ও স্বতন্ত্র বাসভূমির দাবী আমার কচি মনকে প্রবলভাবে আকর্ষন করে। তাই স্কুল জীবনেই অপরিণত বয়সে প্রস্তাবিত মুসলিম বাস ভূমি পাকিস্তান দাবীর সক্রিয় ছাত্র কর্মী হই।” বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের প্রথম দিকে হিন্দুত্ববাদী নেতা বাল গঙ্গাধর তিলকে গনেশ পুজা ও শিবাজী উৎসবকে অবলম্বন করে হিন্দু পুণর্জাগরণবাদের রাজনীতির সূচনা ঘটায়। লক্ষণীয় যে, এই প্রয়াসে যে সব প্রতীক ও উপলক্ষ ব্যবহৃত হয়েছে তার চরিত্র ছিল ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট। অন্যদিকে তৎকালীন বঙ্গদেশের মুসলমান সমাজ নিজস্ব সম্প্রদায়ের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার জন্য যে রাজনীতির সূচনা ঘটায় তার প্রতিক অবলম্বন গুলি ছিল সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ও ইহাজাগতিক। ফুটবল খেলা, গণ কবিতা কিংবা সাহিত্য নিঃসন্দেহে ইহাজাগতিক বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ ছিল। আর এগুলোকে কেন্দ্র করে মুসলিম স্বাতন্ত্রেবোধের উত্থান। সম্ভবত একারণেই জনাব অলি আহাদের রাজনৈতিক জীবন তাঁর নিজের সম্প্রদায়ের স্বার্থ চিন্তায় উদ্ভুদ্ধ হলেও তা মোটেও সাম্প্রদায়িক ছিল না।
 
যিনি একবার আত্মনিয়ন্ত্রণ চেতনার রাজনীতিতে উদ্ভুদ্ধ হন তিনি তো বারবার সেই রাজনীতির মধ্যেই তাঁর জনগণের অভীষ্ট লক্ষ্য পথ খুঁজে বেড়াবেন। একারণেই তিনি পাকিস্তান হওয়ার পরপরই ভাষা আন্দোলনে জড়িত হয়ে পড়েন। এখন পর্যন্ত আমাদের যে সব ভাষা সৈনিক বেঁচে আছেন এবং যারা পরলোক গমন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন জনাব অলি আহাদ। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর মতো ক’জন অত্যন্ত উচু মাপের ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন রাজনীতিবিদ ও পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্ণর জেনারেলে এর সামনে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেয়ার দাবীতে আলোচনা কালে তিনি যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন তা অতুলনীয়। জিন্নাহ বলেছিলেন In the interest of the intigrity of  Pakistan, if necessary, you will have to change your mother tongue জিন্নাহ’র এই উক্তি খন্ডন করতে গিয়ে জনাব অলি আহাদ বলেছিলেন "Sir, Britain, USA, Canada, Australia and Newzealand speak the same language, preach the same religion, come of the same stock, could they form one state ? Despite the same religion Islam, same language Arabic, same semetic blood, one same land Arab, why are there so many states on Arab land ?” জনাব অলি আহাদের এই উক্তি থেকে আমরা আঁচ করতে পারি সেই তরুণ বয়সেই তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পৃথক সত্তার নির্যাসটি অবচেতন মনে হলেও উপলব্দি করতে শুরু করেছিলেন। জিন্নাহ সাহেব যখন তাঁকে বললেন "I know you also”  প্রত্যুত্তরে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি বললেন "I also know that you are the governor general whom the queen of England can remove on our appeal”  কি সাহসী উচ্চারণ ! যার কোথা হতেও ভয় নেই তিনিই পারেন এমন উচ্চারণ করতে। জনাব অলি আহাদ আজীবন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। কি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, কি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং গত বত্রিশ বছরের ভারতীয় সম্পসারণবাদের সঙ্গে তিনি কখনো আপোষ সমঝোতা করেন নি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছিলেন বলেই তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পথ অবলম্বন না করে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর পথকেই অনুসরণ করেন। তবে মাওলানা ভাসানীর সাংগঠনিক কৌশল তার মনপুতঃ ছিলনা। রাজনৈতিক মতাদর্শগত সংগ্রাম তীব্র ও তীঘ্ন না করে কেবলমাত্র জেদের বশবর্তী হয়ে আওয়ামী লীগকে দ্বিধা বিভক্ত করা কিংবা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করা তিনি মেনে নিয়েছিলেন বটে কিন্তু অন্তরে মেনে নিতে পারেন নি। রাজনৈতিক জীবনে এই রকম সংকটের মুখোমুখি তাঁকে আরেকবার হতে হয়েছিল মরহুম জনাব আতাউর রহমান খানের সংগে যখন National League তিনি গঠন করেন। তখনও মরহুম আতাউর রহমান খানের বিবর্জিত রাজনৈতিক কৌশল তাঁর পছন্দ হয়নি। জনাব অলি আহাদ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে সন্দেহের চোখেই দেখতো। একজন আপাদমস্তক জাতীয়তাবাদীকে ভারত সন্দেহের চোখে দেখবে এটাই তো স্বাভাবিক। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ভারতীয় আধিপত্যবাদী নিগঢ় থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার জন্য তিনি ‘আজাদ বাংলা’ প্রতিষ্ঠার ডাক দেন। শেখ মুজিবের দুঃশাসন ও ভারতীয় শোষণের বলিষ্ঠ কন্ঠে প্রতিবাদ জানাতে তিনি কখনো কুন্ঠাবোধ করেন নি। ৭২- ৭৫ পর্বে আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়াস চালানো হয় এবং ৬ দলীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয় সেই ফ্রন্টে জনাব অলি আহাদের বলিষ্ঠ ভূমিকা আমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। জনাব অলি আহাদ তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে অনেকবার কারারুদ্ধ হয়েছেন। দেশের প্রয়োজনে অতীতে তার সংগে যাদের রাজনৈতিক বিরোধ ও মত পার্থক্য হয়েছিল তাদের সংগে পরবর্তীকালে ঐক্য মোর্চা করতেও তিনি ইতস্তত বোধ করেন নি। একজন নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিকের এটাই বড় গুণ। আওয়ামী লীগ যখন বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে তখনও তিনি গণমানুষের সংগ্রামের প্রেরণার উৎস হিসাবে ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমান চার দলীয় জোট সরকারের ত্রুটি বিচ্যুতির প্রতিবাদ জানাতেও তাঁর কোন জড়তা লক্ষ্য করা যায় না।
ন্যায় ও বিবেককে জাগ্রত রাখার জন্য সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিভাষায় Civil Society নামে একটি শব্দ যুক্ত হয়েছে। অবশ্য এই শব্দটি রাষ্ট্র বিজ্ঞানের দর্শনে বহু পুরাতন। কিন্তু আমাদের দেশে এটির প্রয়োজনীয়তা আমরা হাল আমলে উপলব্ধি করেছি। দুর্ভাগ্যের বিষয় বাংলাদেশে Civil Society  তে যাদের কথা শুনা যায় তারা কোন না কোন বড় দলের লেজুড় বৃত্তি করেন। সত্যিকার  Civil Society র সদস্যদের দলীয় রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। কিন্তু অলি আহাদ হলেন দলীয় পরিচয় নিয়ে মুলতঃ Civil Society রই সার্থক কন্ঠস্বর।
[ডঃ মাহবুব উল্লাহঃ সাবেক ছাত্রনেতা, সাবেক প্রো- ভাইস চ্যান্সেলর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থনীতির অধ্যাপক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়]