চির উন্নত শির অলি আহাদ -বাহাউদ্দীন চৌধুরী

ফন্ট সাইজ:
বাঙালী মুসলমানের ইতিহাসে ক্ষণজন্মা মানুষের জন্ম বিরল ঘটনা। অলি আহাদ তেমনি একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তি। বাঙালি মুসলমানের সুদীর্ঘ ইতিহাসে বড় মাপের মানুষ হয়তো অনেকেই জন্মগ্রহণ করেছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া ইতিহাসে মহাপুরুষ বা মহামানব হিসেবে স্থান করে নিতে পারেননি অধিকাংশ বড় মাপের মানুষ। আমি এখানে ইংরেজীতে বলা বিগম্যান ও গ্রেটম্যান’র মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে চাইছি। বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসে রাজনীতিবিদদরে মধ্যে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল হাশিম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া আর কোন ব্যক্তি এই বিরল সম্মানের অধিকারী হতে পারেন কিনা তা আমার জানা নেই। এই রাজনৈতিক নেতাগণ তাদের জীবনে অসাধারণ সাফল্য প্রদর্শন করেছেন। এদের মেেধ্য দুইজন রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। 
কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারেননি বা বড় দলের নেতা হননি বলে এই বিরল প্রজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ রত্নটি জনগণের চোখের আড়ালে থেকে গেছে।
চরিত্রের দৃঢ়তা, নীতিনিষ্ঠা, আদর্শের প্রতি অনমনীয় আস্থা, সততা ও নির্মোহ, নির্লোভ ত্যাগের একমাত্র দৃষ্টান্ত চির বিদ্রোহী জননেতা অলি আহাদ। দুর্নীতি পরায়ন এই দেশের রাজনীতিতে অলি আহাদ একমাত্র আলোকবর্তিকা। বাঙালি নিজের নায়কদের চিনতে অনেক ক্ষেত্রেই ভুল করে। তাই আজ অলি আহাদ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে। অনুকরন ও অনুসরণ করার আহবান জানাতে হবে। কিশোর বয়স থেকেই অলি আহাদ সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের তিনি ছিলেন একজন অগ্রনী সৈনিক। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের প্রধান সেনাপতি। তার প্রজন্মের সব চাইতে ধীমান ও সংগ্রামী এই নেতা মুসলিম লীগ সরকারের স্বৈরাচারী অত্যাচারের বিরুদ্ধে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়েও আইয়ুব খান পর্যন্ত সব সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। শুধু তাই নয় স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও তিনি সকল অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেন এবং কারা নির্যাতন ভোগ করেন। সকল সরকারের আমলেই তিনি নির্যাতিত হয়েছেন এবং কারা বরণ করেছন। অনেক সরকারই তাকে ক্ষমতায় অংশগ্রহণ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু আদর্শ ত্যাগ করে নিজের ব্যক্তিগত লাভ তিনি কখনো চাননি, তাই ঘৃণাভরে এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। অলি আহাদের অনেকে মতামতের সঙ্গে আমার মতের মিল নেই, তবু এ দেশের ইতিহাসের এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষকে আমি হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা জানাই। তার দীর্ঘজীবন কামনা করি এবং আশা রাখি আমৃত্যু তিনি তার লড়াই চালিয়ে যাবেন।
[বাহাউদ্দীন চৌধুরীঃ বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সাবেক তথ্য সচিব]