চির বিদ্রোহী অলি আহাদ -নূরন্নবী

ফন্ট সাইজ:
স্বাধীনচেতা, চির বিদ্রোহী, চির প্রতিবাদী এক অসাধারণ বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক নেতা অলি আহাদ। আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল সেই পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিক থেকেই, যখন আমরা দু’জনেই যুবক ছিলাম। আমরা কখনও এক রাজনৈতিক দল করিনি, তবে জীবনের কোন কোন সময় একসঙ্গে রাজনীতি করেছি। বন্ধুত্বের ভিত্তি রাজনৈতিক। এই বন্ধুত্ব আমার জন্য সম্মানের।
শুধু রাজনৈতিক কারণে যে বন্ধুত্ব তা কিছুটা উপরসা। না, আমাদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। কারণ, মানুষ হিসাবেও অলি আহাদ চমৎকার। বন্ধু বৎসল তো বটেই। তার উপর এমন কিছু মানবিক গুণাবলী আছে, এমন এক ধরণের চমৎকার ব্যক্তিত্ব যা সহজেই আকর্ষণ করে। আর ঠিক এই ব্যক্তিত্বের কারণেই তিনি হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক নেতা। নির্ভীক, ষ্পষ্টভাষী, সাহসী, দৃঢ়চিত্তের এক মানুষ। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি তিনি নিজের বিশ্বাসের প্রতি অটল থেকেছেন বারাবার। যাকে অন্যায় মনে করেছেন তার সংগে কখনও আপোষ করেননি। এই আপোষ ও সুবিধাবাদ জিনিসটি তার চরিত্রে একেবারে অনুপস্থিত। সেজন্য হয়তো আমাদের প্রচলিত রাজনীতির ধারায় তাকে অনেক খেসারত দিতে হয়েছে। কিন্তু তিনি পরোয়া করেননি।
আগেই বলেছি, আমরা কখনও একত্রে এক রাজনৈতিক সংগঠন করিনি। আমার রাজনীতির শুরু কলকাতায় বৃটিশ আমলে। আমি করতাম কমিউনিস্ট পার্টি। জীবনে অন্য কোন পার্টি আর করিনি। আওয়ামী লীগ বা ন্যাপও করিনি। তরুণ অলি আহাদ তখন ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মী। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প পরেই তার রাজনীতির ধারা পরিবর্তিত হলো। তিনি প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে অংশ নিলেন। সেদিন যে স্বল্পসংখ্যক তরুণ নতুন রাজনীতির ধারার উদ্ভোধন ঘটিয়েছিলেন তার সর্বাগ্রে অলি আহাদের নাম আসতে পারে। ১৯৪৮ সালে যে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়, অলি আহাদ ছিলেন তার অন্যতম শীর্ষ স্থানীয় নেতা। ১৯৪৮ সালেই তিনি কারাবরণ করেন। এই প্রথম জেলে যাওয়া। তারপর যে কতবার জেলে গেছেন, তা আমার সঠিক জানা নাই। শুনেছি এ পর্যন্ত মোট ১৭ বার গ্রেফতার হয়েছেন। আত্মগোপনেও থেকেছেন দুইবার। আইয়ুব আমলেই শুধু ৬/৭ বছর আত্মগোপনে থেকেছেন। আমিও বহুবার জেলে গেছি, কিন্তু কখনও একসঙ্গে জেলে থাকার সুযোগ হয়নি। 
যে কথা বলছিলাম, পাকিস্তান আমলের শুরুতেই অলি আহাদ কারাবরণ করেন। আমার ক্ষেত্রেও তাই। তারপর পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে, সময়টা আমার ঠিক মনে নাই, দুজনেই সদ্য জেল থেকে বেরিয়েছি। এমনই এক সময় মোহাম্মদ তোয়াহার ৪৩ যোগীনগরের বাড়ীতে আমাদের দুজনের প্রথম দেখা হয়। ঐ বাড়ীটা ছিল তখনকার প্রগতিশীল বাম সংগঠন যুব লীগের অফিস। এরপর কত ঘটনায় কতবার দেখা হয়েছে, একত্রে কাজ করেছি, কখনও কখনও বিতর্কও করেছি, কিন্তু পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অক্ষুন্ন ছিল। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টির তিনজনের প্রকাশ্য টিমের একজন ছিলাম আমি। আর অলি আহাদ ছিলেন ভাসানী নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের তরুণ অংশের প্রভাবশালী নেতা। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি করেননি, কিন্তু কমিউনিস্টদের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল ছিল। বিশেষ করে কমরেড খোকা রায়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। আমার ব্যক্তিগত ধারণা তখনকার কমিউনিস্ট নেতৃত্বে এই সাহসী অত্যন্ত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন তরুণকে ধারণ করতে পারে নি।
অলি আহাদ অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি বি. কম পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। তবু রাজনৈতিক কারণে তাকে পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তি হবার সুযোগ টুকু দেয়নি। তিনি খুব পড়ুয়া এবং জ্ঞানপিপাসা অপরিসীম। অন্যদিকে অলি আহাদের ছিল অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা। তিনি ছিলেন যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা  সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগের প্রচার ও সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরবর্তীতে ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদক। এ সবই পাকিস্তান আমলের কথা।
১৯৫৭ সালের দিকে তদানিন্তন আওয়ামী লীগের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। একদিকে সোহরাওয়ার্দী- শেখ মুজিব, অপরদিকে মাওলানা ভাসানী। সোহরাওয়ার্দী- মুজিব পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের বিরোধি করেন এবং পাক মার্কিন সামরিক চুক্তি, সিয়াটো সেন্টোর পক্ষে অবস্থান নেন। ভাসানী  দৃঢ়ভাবে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে বক্তব্য রাখেন এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন  অবস্থান গ্রহণ করেন। সেই সময় অলি আহাদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী অবস্থানের কারণে সোহরাওয়ার্দী- মুজিব অংশের চক্রান্তের ফলশ্রুতিস্বরুপ আওয়ামী লীগ থেকে সাসপেন্ড হন। পরে তিনি ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। ভাষা আন্দোলনে, পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে ঐ পঞ্চাশের দশকের অলি আহাদের যে ভূমিকা ছিল তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গৌরবের। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা আজকের প্রচার মিডিয়া এসব কথা বলে না। আজকের প্রজন্মও এসব কাহিনী জানেনা।
অলি আহাদের এই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই কমিউনিস্ট হিসাবে আমারও তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। মনে আছে ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় আমাকে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে পাঠানো হয়েছিল ভাসানীর নেতৃত্বাধীন কর্মী শিবিরে। উদ্দেশ্য পার্টি কর্মীরা যাতে ভালভাবে নির্বাচনে অংশ নেয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা। তখন অলি আহাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। সে অনেক কাল আগের কথা। এরপর আবার অলি আহাদের সঙ্গে একত্রে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আশির দশকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়।
অলি আহাদ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ভিতর অবস্থান করেহ সাহসের সঙ্গে গোপনে স্বাধীনতার স্বপক্ষে কাজ করে যান। এরপর দেশ স্বাধীন হলে প্রথম আওয়ামী লীগ আমলে তিনি অন্যায় নির্যাতন ও ফ্যাসিবাদ শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। তারপর থেকে তিনি লাগাতার বিদ্রোহের পতাকা বহন করে চলেছেন। কারণ এখনও পর্যন্ত জনগণের পক্ষের কোন শক্তি ক্ষমতায় আসেনি। তাই অলি আহাদের মতো মানুষকে তো বিদ্রোহের পতাকা বহন করতেই হবে। আজ আমাদের দুজনেরই বয়স হয়েছে। তবু আশা করবো অলি আহাদের মতো মানুষের কন্ঠে মানুষ শুনবে প্রতিবাদের ধ্বনি, বিদ্রোহের বাণী। কারণ এক কথায় যদি অলি আহাদকে চিত্রিত করতে হয়, তবে বলতে হবে তিনি হলেন চির বিদ্রোহী।
[কমরেড নূরন্নবীঃ বাম রাজনীতিবিদ]