অলি আহাদঃ দেশপ্রেমিকতা যাঁর রাজনীতির একমাত্র ধর্ম -অধ্যাপক মোমেনুল হক

ফন্ট সাইজ:

জনাব অলি আহাদের রাজনৈতিক জীবন যেমন সংগ্রামমূখর তেমনি বহ্নিপ্রতিম। সুদীর্ঘ ৩৮ বছরের নিকট সান্নিধ্যের কারণে নিঃশংকচিত্তে  আমি বলতে পারি নীতির প্রশ্নে, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে, অসাম্প্রদায়ীকতার প্রশ্নে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর প্রশ্নে তাঁর মতো অটল চিত্ততা দেখিয়েছেন এমন রাজনীতিবিদের সংখ্যা এদেশে বিরল। মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর ত্যাগ তিতিক্ষার আদর্শের  একনিষ্ঠ অনুসারী জনাব অলি আহাদের রাজনৈতিক পদচারণা অর্ধশতাব্দীর ঊর্ধকাল। উপমহাদেশের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র আবাসভূমি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কর্মী হিসেবে এ মেধাবী ছাত্রের রাজনৈতিক জীবন শুরু। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যুবলীগ প্রতিষ্ঠা, ৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে, তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খানের শাসনতন্ত্র বিষয়ক মূলনীতি রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠনে, প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার, ৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারী অগ্নিগর্ভ দিনের জন্ম দেয়ায় তাঁর বিপ্লবী অবদান এ জাতির ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।

তাঁর ঝঞ্ঝামুখর জীবনের একটি অত্যন্ত উজ্জল অধ্যায় দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু ষাটের দশকে স্বাধীকার আন্দোলনে তাঁর নির্ভীক চিত্তিতা এবং ৬৯- ৭০ সালে স্বাধীন বাংলা মুক্তি ফৌজ গঠন করার মত দুঃসাহসী পদক্ষেপ গ্রহণের সাক্ষী আমি, যাঁরা সেদিন তাঁর সাথে ছিলেন আজকের শ্রীভ্রষ্ট রাজনীতির পঙ্কিল আবর্তে পড়ে তাঁরা যদিও তাঁর নাম উচ্চারণ করেন না কিন্তু পরম শ্রদ্ধার সাথে এ কথা বলেন জনাব অলি আহাদ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শীর্ষস্থানীয় সংগঠক।
আবার স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে তিনিই অশান্ত বিদ্রোহীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। মাওলানা ভাসানীর জনভিত্তি বেশী ছিল সেজন্যে তাঁর নাম বেশী উচ্চারিত হয়। কিন্তু ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রথম যিনি জনসমাবেশে’ ৭১ পরবর্তী সময়ে আন্দোলন ঘোষণা করেন তিনি অলি আহাদ।
ক’দিন আগে আমার এক বন্ধু বলেছিলেন অলি আহাদ সাহেব সব সময়ই দেশের পক্ষে বলেন কিন্তু তাঁর রাজনীতি খানিকটা দূর্বোধ্য। আমি অলি আহাদের এ আপাতঃ সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে জানি। সংগ্রামী পুরুষ হিসেবে তিনি শেখ মুজিবকে অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব মনে করেন। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে মনে করেন শেখ মুজিব বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সর্বনাশ করেছেন।
তাঁর কাছ থেকে শতকরা ১০০ ভাগ নিখাদ ছাড়পত্র- যাকে বলে Blank cheque পাওয়া কঠিন। সেজন্য যে অলি আহাদ বলেন, “ছয়দফা ভিত্তিক স্বাধীকার আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছিল বলিষ্ঠ এবং অনবদ্য; মুজিব স্ত্রী মহিয়সী নারী, সে অলি আহাদই বলেন, মুজিব ভাই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এ কথা সঠিক নয়। স্বাধীনতার ঘোষণা আমরা মেজর জিয়ার কন্ঠেই শুনেছি এতে বিস্মিত হওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ তিনি যে ঘটনা যে অবস্থায় দেখেছেন তাই বলবেন, Expediency Politics এ তিনি বিশ্বাসী নন। অলি আহাদ সাহেবের পড়াশুনার পরিধি এবং বিস্তৃতি অনেক বেশী, সাধারণ আলাপচারিতায় এটা বোঝা কঠিন। কারণ ভনিতা বা ভঙ্গিমা তিনি জানেন না। তিনি যেমন লন্ডনভিত্তিক Rise of European Liberalism (ইউরোপীয় উদারনৈতিকতাবাদ), কিংবা হিটলারের অভুদ্যয়ে জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির অবিমৃষ্যকারী ভূমিকা, কিংবা কমিউনিস্ট বিশ্বে Polycentrism (বহু কেন্দ্রিকতা) কিংবা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মার্শাল প্ল্যান সম্পর্কে নিজস্ব বক্তব্য দিতে সক্ষম তেমনি বিশিষ্ট পদার্থ বিজ্ঞানী Stephen Hawkins এর সাম্প্রতিক গবেষণা সম্পর্কেও অবহিত।
তাঁকে অন্তরঙ্গ আলোকে দেখার সৌভাগ্য আমার রয়েছে। তাঁর সমগ্র ব্যক্তিত্বে রয়েছে সারল্য- যা আজকের রাজনীতিতে অকল্পনীয়, মধুর ভাষায় কথা বলতে পারেন না- তাঁর বক্তব্য, সবসময়েই ঝাঁঝালো (ইংরেজীতে যাকে বলে Caustic Tone) । অন্যায়ের প্রতিবাদ যেই করুক তাঁর প্রতি অলি আহাদ সমর্থন দেবেনই- সমর্থন না চাইলেও। কিন্তু তিনি- এটা সহজে বোঝা যায় না। কোন প্রবন্ধ অলি আহাদ সাহেব সম্পর্কে লেখা আমার পক্ষে কঠিন। এত ঘটনা আমি প্রত্যক্ষ করেছি তাতে একটি বই লিখলেও শেষ হবে না। আমি ব্যথিত হই যখন দেখি তাঁর সমসাময়িকরা যারা তাঁর সম্পর্কে চায়ের টেবিলে উচ্ছসিত প্রশংসা করেন তাঁরা প্রকাশ্যে তাঁর অবদান সম্পর্কে বলতে কুন্ঠিত হন-  সম্ভবতঃ ব্যক্তিবাদভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কর্তা বা কর্ত্রীর ভীতিতে।
অলি আহাদ সাহেব অত্যন্ত আবেগপ্রবণ মানুষ তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তিনি আবেগ তাড়িত হন না। আমার কাছে তিনি মিনতির ভঙ্গিতে একটি কথা বলেছিলেন। সেটা অনুল্লেখিত থাকা সঠিক নয় বলেই আমি মনে করি। সম্ভবতঃ ১৯৯৪- ৯৫ সাল। অলি আহাদ সাহেব গুরুতর অসুস্থ। আমাকে আমার গ্রীন রোডের বাসায় বলেছিলেন, “আমার সময় বোধ হয় শেষ, আরও দু- একজনকে বলেছি, আপনাকেও বলছি। যদি পারেন আমার মৃত্যুর পর আমাকে ভাষা আন্দোলনের শহীদান বরকত- সালামের কবরের পাশে মসজিদের সন্নিকটে কবরস্থ করার চেষ্টা করবেন।” তাঁর অগোচরে আমি অশ্রু সংবরণ করতে পারছিলাম না। কিন্তু সেদিন আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে অলি আহাদের ব্যক্তিত্বে show- manship নেই কিন্তু মনের গহীনে একুশের শহীদানদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা কতটা তা পরিমাপ করা কঠিন। পঞ্চাশ বছর রাজনীতি করলেন, প্রথম হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হলেন। আমার জানামতে তাঁর মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ কতবার তিনি ঘৃণায় প্রত্যাখ্যান করেছেন- যে মানুষটি কিছুই চাইলেন না তাঁর অন্তিম বাসনার কথাটা না লিখলে ভবিষ্যতে হয়ত আমিও স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারি।
জনাব অলি আহাদ সম্পর্কে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মন্তব্য বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধু মরহুম অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম সাহেবকে আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আচ্ছা ৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা ভঙ্গে ব্যাপারে কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত অমান্য করে অলি আহাদ সাহেব ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার ব্যাপারে প্রস্তাব আনলেন কেন এবং এত অনমনীয় মনোভাব গ্রহণ করলেন কেন ? তিনি তো তখন কমিউনিস্ট পার্টির বিশ্বস্থ লোক ছিলেন।”
অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন- আমার প্রশ্নের পর তিনি অনেক্ষণ চুপ করে থাকলেন যাকে বলে “Pregnant Silence” অনেক্ষণ পর ইংরেজীতে বললেন “Are you really curious to know about it ?” আমি বললাম ‘yes’ তিনি বললেন: I am not sure to what extent Oli Ahad was involved with the Communist Party. But one thing I can say with utmost certainly, Oli Ahad is not an ideologue. He has not taken in the past nor shall take dictation from any aurthority or party if it is not aimed at welfare of the people & country. I repeat Mr. Oli Ahad is not an ideologue-his only political religion is ''Patriotism” আমার মনে হয় অলি আহাদ সাহেবকে বোঝার জন্য এর বেশী বলার নেই। 
[অধ্যাপক মোমেনুল হকঃ বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও শিক্ষক।]