একজন স্পষ্টবাদী অলি আহাদ -ডঃ তারেক শামছুর রেহমান

ফন্ট সাইজ:
অলি আহাদ রাজনীতি করেন। লেখকও বটে। বইও লিখেছেন একটি, ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫’। তবে তার লেখক সত্তা হারিয়ে গেছে রাজনীতির কারণে, যেখানে তিনি সফল নন। কিশোর বয়স থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িয়ে আছেন। আজো রাজনীতির পথে হাটছেন। অলি আহাদ কি তাহলে একজন ব্যর্থ রাজনীতিবিদ ? তাকে মুল্যায়ন করার সাহস আমার নেই। একজন সাধারণ মানুষ আমি। রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র। রাজনৈতিক পরিবারেই আমার জন্ম। সেই ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। আজও দেখছি। তবে সে দেখার মাঝে পার্থক্য রয়েছে যথেষ্ট। বয়স, বিবেক, মেধা আর জ্ঞানের সমন্বয়েই চলমান রাজনীতিকে দেখছি। আর এভাবেই আমার পরিচয় অলি আহাদের সাথে। আমি একসময় খুব গর্ব অনুভব করতাম যখন তিনি ফোন আমার প্রকাশিত কোন রাজনৈতিক প্রবন্ধ পড়ে মন্তব্য করতেন। নিঃসন্দেহে তিনি একজন বড় মাপের মানুষ। এই মানুষটি যখন আমার লেখার  শেষটুকু পড়েন, তখন আমার ভালো লাগে। ইদানিং যদিও তার সাথে আমার আর কথা হয় না।
 
লেখার শুরুতে একটি প্রশ্ন রেখেছিলাম- অলি আহাদ কি একজন ব্যর্থ রাজনীতিবিদ ? প্রশ্নটি রেখেছি একারণেই যে একজন রাজনীতিবিদের চাওয়া- পাওয়া থাকে। রাজনীতিবিদের মূল টার্গেটই হচ্ছে ক্ষমতায় যাওয়া। এই ক্ষমতায় যাওয়াটিকে তারা দেশ সেবা হিসাবে মনে করেন। রাজনীতিবিদরা হচ্ছে কৌটিল্য ম্যাকিয়াভেলির আদর্শ রুপ। সেই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আসনে রাজার উপদেষ্টা হিসাবে ব্রাহ্মণ পন্ডিত কৌটিল্য। ক্ষমতায় থাকার জন্য সব ধরণের শঠতা, চতুরতা, ক্ষমতা প্রদর্শনের কথা বলেছিলেন কৌটিল্য। একই ধরণের কথা বলেছিলেন ম্যাকিয়াভেলী তার ‘দি প্রিন্স’ গ্রন্থে। মূল কথা ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতায় যাওয়া। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে কতটুকু সফল হয়েছেন, সেটি ভিন্ন কথা। কিন্তু তারা যে কৌটিল্য আর ম্যাকিয়াভেলির জন্যে আদর্শ থেকে সরে যাবেন- এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের অনেকেই হয়ত জীবনে কৌটিল্য কিংবা ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রদর্শন পড়েন নি। কিন্তু ব্যক্তি জীবনে অনেকটা অজান্তেই কৌটিল্য আর ম্যাকিয়াভেলিকে গ্রহণ করে নিয়েছেন। এক্ষেত্রে বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ অলি আহাদের অবস্থান কোথায় ? তিনি রাজনীতি করেছেন। এবং প্রচলিত অর্থে তিনিও ক্ষমতায় যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় যান নি কিংবা যেতে পারেন নি। তাহলে কি বলবো এটা তার ব্যর্থতা ? ভাষা আন্দোলনের প্রথম দিককার কথা, সেই ১৯৪৮ সালের মার্চে তিনি আন্দোলন করতে গিয়ে জেলে গিয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে যুব লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অলি আহাদ। ১৯৫২ সালে মহান ভাষা আন্দোলনে যুব লীগের ভূমিকা কারো কাছে অজানা নয়। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার বরণ করেছিলেন তিনি। তারপর আওয়ামী লীগ যখন গঠিত হয় তখন ১৯৫৩ সালে অলি আহাদ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক। তারপর সাংগঠনিক সম্পাদক। আওয়ামী লীগে থেকে ১৯৫৭ সালের সেই ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন সোহরাওয়ার্দীর সাম্রাজ্যবাদী নীতির। প্রতিবাদ করেছিলেন আরো একজন মাওলানা ভাসানী। ফলশ্রুতিতে অলি আহাদ সাসপেন্ড হলেন। ভাসানীর সাথে আওয়ামী লীগ থেকে বেড়িয়ে এসে গঠন করলেন ন্যাপ। দায়িত্ব নিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের। কিন্তু এখানেও তিনি তার অবস্থান ধরে রাখতে পারলেন না। ১৯৫৮ সালে জেল ও ১৯৬৩ সালে জেল থেকে বেড়িয়ে আসার দীর্ঘদিন পর আতাউর রহমানকে সাথে নিয়ে গঠন করলেন জাতীয় লীগ। তিনি হলেন এই দলের সাধারণ সম্পাদক। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে যে ক’জন রাজনীতিবিদ মুজিব শাসনের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। অলি আহাদ ছিলেন তাদের একজন। তার এই প্রতিবাদের কারণে তাঁকে মুজিব আমলে কারাভোগ করতে হয়। আগস্টের ৭৫ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরই তিনি জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। পঁচাত্তুর পরবর্তী রাজনীতিতে জাতীয় লীগ নিস্ক্রিয় হয়ে গেলে, তিনি গঠন করেছিলেন ডেমোক্রেটিক লীগ। আজ তিনি এর সভাপতি। পঁচাত্তুর পরবর্তী রাজনীতিতে বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির জন্ম এ দেশের রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছিল। অলি আহাদের মত ব্যক্তিত্ব এই প্রক্রিয়ায় নিজেকে জড়িত করেননি। ক্ষমতায় গিয়ে দল গড়া- এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করতেন না অলি আহাদ। আর এ কারণেই ক্ষুদ্র পরিসরে ডেমোক্রেটিক লীগ দিয়ে তিনি আজও রাজনীতির ময়দানে সোচ্চার। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে, ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের জন্ম দিয়ে যে রাজনীতির শুরু, সেখানে কি পেলেন তিনি ? হয়তঃ জবাব আসবে ‘হালুয়া- রুটির’ জন্য অলি আহাদ রাজনীতি করেননি। কথাটা হয়ত সত্য। কিন্তু তার চাইতেও বড় সত্য রাজনীতি করে মানুষ কিছু নীতি বাস্তবায়ন করার জন্য। আর নীতি বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই ক্ষমতায় যেতে হবে। তবে বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই ভালো কিছু করা কঠিন জিনিস। ভাসানী ক্ষমতায় যাননি। কেননা তিনি ক্ষমতায় যাবার রাজনীতি করতেন না। মুজিব গিয়েছিলেন। কিন্তু বিতর্কিত হয়েছিলেন তিনি। আজো মৃত মুজিবের ভূল রাজনীতি মানুষ স্বরণ করে। আতাউর রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বটে। কিন্তু তিনি জাতীয় রাজনীতিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারেননি। অলি আহাদ প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন, নিদেনপক্ষে মন্ত্রী হওয়া তার জন্য কঠিন কিছু ছিলনা। কিন্তু হননি। আর আজ মানুষ তার দল সম্পর্কে জানে খুব কমই। আজীবনই ‘বিদ্রোহী’ অলি আহাদ। এই ‘বিদ্রোহী’ মনোভাব একদিকে তাকে ‘বিতর্কিত’ করেছে যেমনি, তেমনি অন্যদিকে তিনি প্রশংসাও কুড়িয়েছেন। এরশাদ জামানায় ছ’বার তাকে জেলে নেয়া হয়েছিল। সামরিক আদালতে তার বিচার হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। এরশাদের সামরিক শাসনামলে সামরিক আদালতে দাঁড়িয়ে এরশাদের বিরুদ্ধে কথা বলতেও তিনি পিছপা হননি। সেদিন বিচারের কাঠগড়ায়  দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, “এই প্রসঙ্গে (এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ) হয়ত তার সাময়িক ব্যক্তিগত  সুবিধা হবে, কিন্তু সমস্ত জাতির ভাগ্যে নেমে আসবে বিপর্যয়। পরিবর্তিতে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং সাংবিধানিক কাঠামো হবে ধ্বংস প্রাপ্ত। সেটাই আজ ঘটছে।” তবে এটা সত্য। যে আদালত তার বিচার করেছিল, সেই আদালতের জন্ম নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুললেও, তিনি স্বীকার করেছিলেন, “সামরিক আইন একটি বাস্তবতা, সেহেতু আমাকে মাননীয় আদালতকে মানতে হয়”। অলি আহাদের এই বক্তব্য যথেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাস্তবতাকে এবং প্রচলিত আইনের প্রতি তিনি সম্মান দেখিয়েছেন। সামরিক আইনকে তিনি সমর্থন করেননি। সামরিক শাসনকে সমালোচনা করতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেননি। কিন্তু বিদ্যমান  ব্যবস্থার প্রতি তিনি সম্মান জানিয়েই তার সমালোচনা করেছিলেন। আর এ কারণেই অলি আহাদ অনন্য। যার যতটুকু প্রাপ্য, তাকে ততটুকু দিতে তার এতটুকু কার্পন্য নেই। এক সময় মুজিবের খুব কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। অথচ তাকে সমালোচনা করতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেননি। মনে আছে বেগম খালেদা জিয়া যখন বিরোধী দলে, তখন তার পাশে থেকে তার প্রতি সমর্থন ছুড়ে দিয়েছিলেন। যতদূর জানি সময়- অসময়ে বেগম জিয়া তার কাছ থেকে পরামর্শও নিতেন। বেগম জিয়া আজ আবারো সরকার গঠন করেছেন। আমার ধারণা ছিল অলি আহাদের মত ব্যক্তিত্ব যিনি বিএনপির মিত্র ছিলেন, তাকে সংসদে দেখতে পাব। অলি আহাদ যদি সংসদে যেতে পারতেন, আমার বিশ্বাস তার কাছ থেকে দেশ ও জাতি কিছু আশা করতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। বিএনপির সাথে ৭ দলের দূরত্ব এখন বেড়েছে। বিএনপি গড়ে তুলেছে চারদলীয় ঐক্যজোট, ৭ দল তথা অলি আহাদ এখানে উহ্য। তবুও অলি আহাদের মতো ব্যক্তিত্বের চাওয়ার কিছু নাই। তিনি বর্তমান সরকারেরও সমালোচনা করেছেন  তার চিরাচরিত ভঙ্গীতে। অতীতেও রাখ- ঢাক করে কথা বলতেন না। আজও বলেন না। এটাই তার স্বভাব। তার সম্পর্কে আমার জানার খুব বেশী সুযোগ হয়নি। তবুও তার বই পড়ে, তার মতামত পত্রিকার পাতায় দেখে যতটুকু আমার মনে হয়েছে একজন ব্যক্তি অলি আহাদের এই সমাজে অত্যন্ত প্রয়োজন। আমাদের দুর্ভাগ্য তিনি ৭৪- এ পা দিয়েছেন।
পশ্চিমা সমাজে ৭৪ খুব বেশী বয়স নয়। কিন্তু আমাদের এখানে বেশী। শরীরও সুস্থ নয়। অসুখ- বিসুখ লেগেই আছে। কিন্তু অসুস্থতা তাঁকে কাবু করতে পারেনি কখনো। কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে তার মত ব্যক্তিত্বকে আমরা মূল ধারায় পেলামনা কেন। জবাবও খুঁজে পেয়েছি এক সময়। কালো টাকা, মাস্তানতত্ত্ব, পদলেহীতা, মিথ্যাবাদীতা আমাদের রাজনীতিকে নোংরা করে দিয়েছে। এই নোংরা রাজনীতি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নষ্ট করে দিচ্ছে সব ধরণের নিয়মনীতি, শৃংখলা আর ভালোলাগা। এই নষ্ট সমাজে অলি আহাদের মত লোক অচল। তবুও তিনি থাকুক তার নিজস্ব বলয় নিয়ে। থাকুন তার প্রতিবাদী কন্ঠস্বর নিয়ে। আমরা ভাববো এই নষ্ট হয়ে যাওয়া সমাজে তবুও একজন মানুষ আছেন, যিনি সুবিধার কাছে মাথা নত করেননি। এবং আগামীতেও করবেন না। মাথা নত না করার এই যে রাজনীতি- এই রাজনীতি তাকে আরো অনেক দূরে নিয়ে যাক। আমাদের প্রত্যাশা এটাই। 
[ডঃ তারেক শামসুর রেহমানঃ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজনৈতিক নিবন্ধকার]