অর্ধ-শতাব্দীর চলমান ইতিহাসঃ অলি আহাদ -আসাদ চৌধুরী

ফন্ট সাইজ:
ছোটবেলা থেকেই আমার ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, গল্পের বইর নায়কই নন, তরতাজা কিছু মানুষ আমার কাছ থেকে হিরোর মর্যাদা পেয়ে আসছেন, তাদের মধ্যে অলি আহাদ একজন। রবীণ হুড, দস্যু মোহন, বাহরাম এরা যেমন প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ছিলেন, গাজীউল হক, আবদুল মতিন, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, এমাদউল্লাহ, শেখ মুজিব, মওলানা ভাসানী অর্থাৎ মুসলিম লীগের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যারা রুকে দাঁড়িয়েছিলেন, দেশ ও সমাজকে সচেতনতা উপহার দিয়েছিলেন, সংঘবদ্ধ করার প্রয়াস নিয়েছিলেন- তাঁরা আমার ভীষণ প্রিয় ছিলেন। এদের মধ্যে এমাদউল্লাহকে আমি চোখে দেখিনি-আর আমার প্রিয় হিরোদের দেখেছি অনেক পরে-মুক্তিযুদ্ধের সময় গাজীউল হক এবং আরো অনেক পরে মতিন ভাইকে। 
ভাষা আন্দোলনে যুক্তফ্রন্ট গটনে, সরকারের পতনের ব্যাপারে আমাদের পরিবারের ভূমিকা উজ্জ্বল। আমার বাবা মরহুম মোহাম্মদ আরিফ চৌধুরী (বশীর আল হেলাল বাংলা একোডেমীর ইতিহাস লিখতে গিয়ে বন্ধনীতে ধানু মিয়া লিখেছেন, আব্বার ডাক নাম ধনু মিয়া, এই সুযোগে সংশোধন করে নিলাম) কংগ্রেস করলেও নেহেরুর এক ভাষণের পর মুসলিম লীগে চলে এসেছিলেন।’ ৪৬ এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে যুক্তবঙ্গের শেষ আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন। পাকিস্তান হাসেলের আগে-পরে টের পেয়েছিলেন সাধারণ গরিব-দুঃখীদের জন্য এই আজাদী আসেনি। তখন থেকেই তিনি মুসলিম লীগ বিরোধী রাজনীতির উদ্যোগ নেন। আমার চাচাতো ভাই বাহাউদ্দীন চৌধুরী মুসলিম লীগ বিরোধী আন্দোলন করে সেই উত্তাল সময়ে জেল খেটেছিলেন, তাঁর কক্ষ সঙ্গী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আমার এক চাচা আবদুর রহমান চৌধুরী (পরে মাননীয় বিচারপতি) যেমন পাকিস্তান আন্দোলনে তেমনি মুসলিম লীগ বিরোধী আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন, তখনও তিনি ছাত্রই ছিলেন। আমাদের পরিবারের কৃতি সন্তান আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ছাত্রাবস্থায় লিখেছিলেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী’ আমাদের বরিশালের আবদুল লতিফ পরে আলতাফ মাহমুদ এই কবিতার সুরারোপ করেছিলেন। আমার ফুফাতো বাই আমিনুল হক চৌধুরী নির্বাচনে প্রাদেশিক আইন পরিসদের যুক্তফ্রন্টের নৌকা নিয়ে জয়ী হয়েছিলেন। 
অলি আহাদ, এই নামটি, ‘৪৯-’৫৪-র দিকে বহুল উচ্চারিত একটি নাম। যিনি আন্দোলন করেছেন,সংগঠন করেছেন, যুব লীগকে মায়ের আঁচল দিয়ে ঢেকে রক্ষা করেছেন, সংগঠনের স্বার্থে পুলিশের হাতে ধরা-না-পড়ে গোপনে কাজ করেছেন। আমার প্রিয় হিরোদের একজন এই অলি আহাদ। যিনি এই বয়সেও, জনপ্রিয়তা বা জেল জুলুমের তোয়াক্কা না-করে জাতিকে সতর্ক করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সত্য ও বিবেকের তাড়না তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন। 
ক্ষমতালোভী রাজনীতিরচর্চার ব্যর্থতার পরিমাণ আমরা যতোটুকু ভাবছি, হয়তো, তারও চেয়ে বেশিই হবে, কম হবে না। অর্থাৎ যে ত্যাগ এদেশের সৎ রাজনীতিবিদগণ স্বীকার করে নিজেদের পরিবারে নিজেদেরকে প্রায় অপদার্থের পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন তার পরিমাণও তো কম নয়। পাশাপাশি সুবিধাখোর মানুষগুলো চাটুকারিতা চামচামি করে ক্ষমতাকে কীভাবে কলুষিত করেছে তা তো হরহমেশাই দেবছি। রাজনৈতিক আচরণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সামান্য প্রতিফলনও আমরা দেখি না অথচ গণতন্ত্রের জন্য মাইক-ফাটানো ব্যক্তিত্বের অন্ত নেই। প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না-হওয়ায় সন্দেহ সংশয় বেড়ে যাচ্ছে এবং এক পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য যে-কোন নীচু পর্যায়ের কাজেও পিছ-পা হচ্ছে না। গত কয়েক সপ্তাহ (সেপ্টেম্বর/ অক্টোবর, ২০০২) ধরে কাহজে যে-সব লেখালেখি হচ্ছে এ-সব পড়ে আমি যদি এ-রকমই কিছু ভেবে বসতে বাধ্য হই, তাহলে বোধ হয় তেমন দোষের হবে না। এই অবস্থায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন নিতান্তই অলীক স্বপ্ন-আর এই অনৈক্য আর যাই হোক গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করতে পারবে না। কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতি এবং আড়ৎদারির ভঙ্গির অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সামন্তবাদী ধ্যানধারণায় অভ্যস্ত এই সমাজটিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী পরবর্তী বৃটিশ-রাজ, গোটা উপমহাদেশের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপে মহাত্মাগান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ-বাম সংগঠনসমূহ যে-উলোট-পালোট করে গেলেন, সেই লিগেসি নিয়েই এই অঞ্চল। পাকিস্তান অর্জিত হবার পর স্বপ্নভঙ্গের কারণ শুধু নানকার বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে গুলিবর্ষণই শুধু নয়, আমাদের ভাষা সংস্কৃতিকে ভুলিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র, জাতিসত্তার বিলোপ ঘটানোর যে সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য আয়োজন চলছিলো আমাদের সৌভাগ্য আমাদের অগ্রজরা তা রুখতে পেরেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতির দাপটে ঘুরে ফিরে সেই দুষ্টচক্রের মধ্যেই ঘুরপাক খেয়েছে সমাজ। সংসদে না গিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চায় নজির হিসেবে আমাদের দেশটি সম্ভবত দুর্নীতির মতোই এ ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন হবে। 
যে সহে, সে রহে। অলি আহাদের মতো নির্ভীক, তেজস্বী সাহসী ও নির্লোভ মানুষটি সমাজের এই কাপুরুষ আপ্তবাক্যটি মেনে নেননি বলেই বিভিন্ন সময়ে পদে পদে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন, সেই পাকিস্তানী আমলে, তাঁর সবচেয়ে গৌরবময় প্রহরে- (তাঁর বইটি ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ৭৫’ এই দিক থেকে অভিজ্ঞতার, তত্ত্ব ও তথ্যের দিক থেকে ঐতিহাসিকদের কাছে আকরগ্রন্থ হিসেবেই বিবেচিত হবে এক সময়) এমন কি বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশেও-বিনা বিচারে জেলখানায় ধুঁকে ধুঁকে প্রহর গোনার কাজটি তাঁকে করতে হয়েছিল। কারণ একটাই তার অনাপোসী মনোভাব- যা সত্য বলে বুঝেছিলেন, সেখান থেকে বিন্দুমাত্র সরে না-আসার দৃঢ় অঙ্গীকার।
মওলানা ভাসানীকে সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদরা যেম ব্যবহার করেছেন- আমার কেন যেন মনে হয়- (মনে হওয়াটা মোটেও উচিৎ হচ্ছে না) অলি আহাদকেও বোধহয় ব্যবহার করা হয়েছে। এবং তিনিও কখনো রাজনৈতিক জেদের কারণেই এমন সব লোকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে যার বিন্দুমাত্র যোগ নেই। এর ফল তার জন্য তো বটেই, রাজনীতিতেও নতুন কোন মাত্রা যোগ করতে পারেনি। মওলানা ভাসানীকে, তাঁর মতো অসাম্প্রদায়িক লোক আমার চোখে কম পড়েছে, যেমন তার প্রতিপক্ষ এবং সগযোগীরা নির্দ্বিধায় সাম্প্রদায়িকতার জোব্বা পরিয়ে দিয়েছেন তাঁর ভারত-বিদ্বেষী মনোভাবের জন্য, অলি আহাদ যিনি মনে প্রাণে অসাম্প্রদায়িক-তাঁর কাঁধেও এই জোব্বা চাপানো হয়েছে। মুজিব বিরোধী হিসেব যিনি যে-সময়ে পরিচিতি লাব করেছেন, সেই পঞ্চাশের দমকেই আওয়ামী লীগকে অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলদে গিয়ে যে বিরোধ-এবং যেখানে তিনি লড়াকু সৈনিকের ভূমিকা নিয়েছিলেন-দেশ স্বাধীন হবার পর, দুর্ভাগ্যবশত তাঁকে অন্য অবস্থানে দেখা যায়। ব্যক্তিগত কারণ অবশ্যই থাকতে পারে- কিন্তু রাজনীতিতে তার প্রভাব সুফল বয়ে যে আনেনি-১৫ আগষ্ট ঘটনার পর যারা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাটুকু নিয়েছেন বা নিচ্ছেন-তাদের সঙ্গে অলি আহাদের সম্পর্কের অমিলটুকু রাজনৈতিকভাবে সনাক্ত করা হয়তো একটু কঠিনই হয়ে পড়বে। বোধহয় অতি সরলীয়করণের ঝুঁকি নিলাম। অথচ অলি আহাদ যিনি, সৎ, সাহসী নির্ভীক, তেজস্বী, ত্যাগী এই জমানায় এই গুণের মানুষ পাওয়া প্রায় দুর্লভ- কীভাবে পরিস্থিতির শিকার হয়ে রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়লেন। বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি বঞ্চনার শিকার হয়েছেন (শুধু তিনি নন, তার অগ্রজ এবং অনুজেরাও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন) তবু তিনি থেমে থাকেন নি। 
উপমহাদেশের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের মূল্যায়নে তিনি যে মেধা ও যোগ্যতা প্রদর্শন তরেছেন তার তুলনা হয় না, অথচ নিজেকে তিনি সেভাবে দাঁড় করাতে পারেন নি। 
বর্তমান রাজনীতিতে রাজনীতিবিদদের চেয়ে অরাজনৈতিক ব্যক্তিরাই দাপট ও প্রভাব বেশী। সেখানে অবসর প্রাপ্ত সরকারী কর্মচারী, সেনাবাহিনীর অবসর প্রাপ্ত অফিসার, বৈধ বা অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল বিত্তের ব্যবসায়ীদের প্রতাপের সামনে রাজনীতিবিদরা নিস্প্রভ হয়ে পড়ছেন-এছাড়া ডাইনেস্টি স্টাইলে তো উপমহাদেশে আর নতুন কিছু নয়। রাজনীতিতে দুবৃত্তায়ন কতোটা গভীরতা পেয়েছে সঠিক জানিনা, তবে পেশাদার সন্ত্রসীরা যেভাবে রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও আশকারা পেয়ে আসছে, আইন শৃঙ্খলার অবনতির পাশাপাশি এ-সবও রাজনৈতিক আচরণে প্রভাব ফেলবে। এ পরিস্থিতিতে জনগণের ওপর আস্থাশীল অলি আহাদের মতো বড়ো মাপের মানুষ সমাজ পরিবর্তনে কী ভূমিকা রাখবেন বা রাখতে পারবেন আমি জানি না। তবে মাঝে মাঝে মধ্যে তিনি যখন বিবৃতি দেন সেখানে সত্য ভাষণ দেখে বিচলিত বোধ করি। বেআক্কেল বোকা, গাঁজা বা আফিমখোর মানুষগুলোর মুভেই সাহসী সত্য-উচ্চারণ শোনা যায়, আর সবই তো গোঁজামিল। মন্ত্রী-মিনিস্টারদের আয়ের উৎসই হোক-প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ডঃ বি. চৌধুরীর পদত্যাগই হোক – তাঁর, অলি আহাদের, অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ় এবং অনড়।
 
ইলা মিত্রের সংবর্ধনায় রাশেদ খান মেননেন কথায় একটি কবিতা পড়েছিলাম। নিজেকে যোগ্য মনে হয়নি- অলি আহাদের মত বড় মাপের মানুষের সম্পর্কে লিখতে গেলে যে যোগ্যতা প্রয়োজন, তাও আমার নেই, তবুও তাঁকে শ্রদ্ধা করি- সম্মান করি এবং মূল্যবোধের এই সংকটের প্রহরেও তাঁর কাছেই এখনও আমরা কিছু হলেও আশা রাখি, এই কথা বলার সুযোগটুকু নিলাম।জানি, অত্যন্ত ভালভাবেই জানি, তিনি লোভের বশবর্তী হয়ে কিছু বলবেন না, তিনি ভয় পেয়ে চুপ করে  থাকবে না, ব্যক্তি স্বার্থ-প্রণোদিত হয়ে এমন কিছু বলবেন না বা করবেন না- যা দেশের ক্ষতি করবে, সমাজের ক্ষতি করবে। 
অর্ধশতাব্দঅর চলমান ইতিহাস অলি আহাদ সাহেবকে আমার শ্রদ্ধা এবং অভিনন্দন। 
[ কবি আসাদ চৌধুরীঃ সাহিত্যিক, বুদ্বিজীবী ও শিক্ষক ]