অলি আহাদ আপোষহীন যোদ্ধা -ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল

ফন্ট সাইজ:
“সমাজ ও মানুষের কল্যাণের জন্য, দেশের অগ্রগতি সাধনে রাজনীতি করতে হলে অনেক কষ্ট সইতে হবে। নির্যাতন নিপীড়ন সইতে হবে। দেন্য জীবন বরণ করে নিতে হবে। হাজারো লোভ লালসার মাঝে নিজেকে সততার সহিত অটল রাখতে হবে। বিপদের যত বড় ঝড় ঝাপটাই আসুক অম্লান বদনে সহ্য করে নিতে হবে। আর তা যদি পারেন ইতিহাসের কোনায় বিজয়ীর নামটি থাকতেও পারে। আর দালালী করলে আমার সাথে চলে লাভ নেই। আমি ভিন্ন পথের মানুষ। আমি নগদ চাই না। দালালী আমাকে দিয়ে হয় না, হবে না। অনেকেই আছেন যারা রাজনীতির ব্রত জীবন ছেড়ে দালালী করে সটকাট পথে মন্ত্রী, প্রধান মন্ত্রী কিংবা বেনিফিসারী হয়েছে। তাদের কথা আলাদা। এ জাতীয় লোক সর্বকালেই ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। তা নিয়ে আমি কখনো চিন্তা করি না। রাজনীতিতে প্রত্যেকটি মানুষের একটি এইম এন্ড অবজেক্ট থাকতে হবে। স্বপ্ন এবং আদর্শ ছাড়া রাজনীতি কখনো মানুষের কল্যাণ আনতে পারে না। রাজনীতিবিদও তার মঞ্জিলে পৌঁছতে পারেনা। আমার পথ, আমার ষ্টাইল ভিন্ন। সেজন্য আমার সাথে অনেকের মিল হয়না। আমি সব সময় সত্য বলতে চাই, সৎ পথে চলতে চাই। যতদিন বেঁচে আছি সত্য কথা বলবোই। তাতে কেউ পছন্দ করুক অথবা না করুক তাতে আমার কিছু আসে যায় না। তাতে আমি দুঃখিতও নই”। 
এক নিমিষে কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনের সব চাইতে পোড় খাওয়া বর্ষিয়ান অথচ চীর সবুজ, ৫২-র ভাষা আন্দোলনের প্রধাননেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্থপতি, মজলুম জননেতা অলি আহাদ। 
অর্ধশতাব্দীর বেশী সময় ধরে বৃটিশ, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অলি আহাদ বিরতিহীন ভাবে সবচাইতে বেশী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। 
প্রায় ছয় দশকের মত রাজনৈতিক জীবনে অলি আহাদ বহু জাতীয় বিবর্তন পরিবর্তনের অগ্রসৈনিক থেকেও কখনই নিজের আদর্শ বিশ্বাসকে জরাঞ্জলি দেননি। সমকালীন রাজনীতিতে অলি আহাদ একজন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দার্শনিক চরিত্রের অধিকারী অলি আহাদ চলনে বলনে নিজস্ব একটা ষ্টাইল লালন করেন। যা আজকের দিনে খুব একটা চোখে পড়ে না। হাজারো সমস্যা সংকুল রাজনীতিতে বড়রা যখন স্বার্থপরের মত কৌশল করে অপেক্ষা করেন, আত্মরক্ষায় নিজেকে আড়াল করে রাখেন, নিজস্ব দায়িত্ব অবস্থান থেকে পালিয়ে স্বার্থপরের মত বাঁচতে চান। অলি আহাদ তখন বিবেকের ভূমিকায় সোচ্চার হন, মহাবিদ্রোহীর মত গর্জে উঠেন। প্রতিবাদ করেন, সমালোচনা করেন, কখনও কখনও জাতীয় অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পরামর্শ দেন, পথ দেখান জাতিকে। এজন্য আহতও হন, আঘাতপ্রাপ্তও হন। তবুও নীতিতে অনড় পথ চলতেই থাকেন। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র অলি আহাদ একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক, আপাদমস্তক সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ, সমসাময়িক কালে অলি আহাদের মত বয়সে অভিজ্ঞতায় এবং দেশের মানুষের প্রতি দয়া, প্রেম ও নীতি-আদর্শের প্রতি অবিরল ধারাবাহিক বলিষ্ঠতা রক্ষা করে হিমালয়ের মত চরিত্র নিয়ে চলতে দ্বিতীয় জন খুঁজে পাওয়া যায় না এই বাংলাদেশে। 
সাবেক কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় ইসলামপুর গ্রামে ১৯২৮ সালে জনাব অলি আহাদ জন্মগ্রহণ করেন। সে মোতাবেক তাঁর বয়স প্রায় ৭৫ বৎসর। এ বয়সেও অলি আহাদ চির তরুণ, চির যুবা। বিশেষ করে তাঁর একাকী চলনে তার ক্ষুরধার অনলবর্ষী বক্তৃতায় আজকের ২৫ বছরের যুবককেও হার মানায়। অলি আহাদের বাবা মরহুম আব্দুল ওহাব ছিলেন ডিষ্ট্রিকট রেজিষ্ট্রার। সংগত কারণেই পড়াশুনার প্রতি শৈশব কাল থেকেই একটা গাইডেন্স ছিল। ছাত্র হিসাবে তিনি অত্যন্ত মেদাবী ছিলেন। ১৯৪৪ সালে হোমনা হাই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করে অলি আহাদ ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। কিশোর অলি আহাদ স্কুল জীবন থেকেই মূলতঃ রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে উঠেন এবং ভারতের মুসলমানদের মুক্তির জন্য রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তদানীন্তন ভারতীয় মুসলিম সমাজে যে জাগরণ গড়ে উঠে সময়ের সে আন্দোলনের সু-বাতাস কিশোর অলি আহাদের মনকে আলোড়িত করে উজ্জীবিত করে তোলে। সেই সময়কার রাজনৈতিক ঘটনাবলী বিশেষ করে এ অঞ্চলে মুসলিম জাগরণে অলি আহাদের মনে রেখাপাত করে। তাছাড়া পড়ার প্রতি আগ্রহী অলি আহাদ বিভিন্ন পত্র পত্রিকা পাঠ করে খেলার মাঠে কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের বিজয় কিংবা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর রচনা সমগ্র কিংবা বিখ্যাত গায়ক আব্বাস উদ্দীনের মুসলিম রেঁনেসার উদ্দীপনামূলক গান তখনকার দিনের মুসলমান তরুনদের মতই অলি আহাকে রাজনীতিতে উদ্দীপ্ত করে ভারতের বুকে মুসলমানদের স্বীয় এবং স্বতন্ত্র বাসভূমি প্রতিষ্ঠা করার দাবী অলি আহাদের কচি মনে দারুনভাবে বাসা বাঁধে। যার ফলশ্রুতিতে অপরিণত বয়সে প্রস্তাবিত মুসলমানদের বাসভূমি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করার দাবীর একজন সক্রিয় ছাত্রকর্মী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। 
১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের আলাদা বাসভূমি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন দানা বাঁধে। এ সময়ে সারা দেশে মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে দারুন চেতনা পরিলক্ষিত হয়। ছাত্র সংগঠনগুলি নিজস্ব আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার মানসে সংগঠিত হতে থাকে। 
১৯৪৪ সালে ঢাকা কলেজে পড়াকালীন অলি আহাদ ছাত্র রাজনীতির সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েন। ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী অলি আহাদ পাকিস্তান আন্দোলনের পুরোধা সংগঠন মুসলিম কর্মী শিবিরের একজন সক্রিয় কর্মী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। এ সময়ে তিনি মুসলীম ছাত্রলীগে এত বেশী জড়িয়ে পড়েন যার কারণে ১৯৪৬ সালে আই.এস.সি. পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে তিনি আই.এস.সি পরীক্ষা দেন এবং কৃতিত্বের সাথে পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি,কম, ক্লাসে ভর্তি হন। বি,কম, পড়া এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকাকালীন অলি আহাদের নাম একজন সাহসী দৃঢ় সত্যবাদী সম্ভাবনাময় বিপ্লবী তরুণ ছাত্র নেতা হিসাবে তখনকার দিনের ছাত্রনেতা বা বিভিন্ন পেশার অলি আহাদের বন্ধুরা তাকে আগামী দিনের এক উজ্জল সম্ভাবনাময় ছাত্র নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাবে বলে নিশ্চিত হন। কারণ অলি আহাদ নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করেছেন। তার জীবন চলার পথে সময় জ্ঞান বিরাট একটি গুণ পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া ধৈর্য্য, সাহস, কর্ম উদ্দীপনা, সাংগঠনিক দক্ষতা, লোভ লালসাহীন অধ্যবসায় সমৃদ্ধ সাচ্চা দেশ প্রেমিক চরিত্র চিত্রনে তরুন বয়সেই সবার দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন। সব চাইতে বড় জিনিস অলি আহাদের সত্যবাদিতা ও সাহসিকতা তার বিরুদ্ধবাদীরাও স্বীকার করে। এরপর আর অলি আহাদ পিছনে ফিরে তাকাননি। তিনি চলেছেন অবিরত, চলেছেন বাধা বিঘ্নহীন পথে। মুজাহিদের মত অকুতভয়ে সাহসীর ভূমিকায়। পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনে অলি আহাদ বহু বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে আসেন এবং নিজস্ব কর্ম ও চরিত্র গুনে নেতাদের দৃষ্টি কাড়েন। এসময় তিনি কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ,কে, ফজলুল হক, খাজা নাজিম উদ্দিন, লিয়াকত আলী খাঁন প্রমুখ জাতীয় নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন। খুব অল্প বয়সেই কর্মদক্ষতায় অলি আহাদ জাতীয় ছাত্র রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করেন। জনাব অলি আহাদ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। 
অলি আহাদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি আন্দোলন করতে গিয়ে ১১ বছর বারাবরণ করেছেন। দুই বছরের অধিককাল আত্মগোপন করে থেকেছেন। তিনি প্রথম কারাবরণ করেন ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে’ সময় ছিল ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ। 
১৯৪৯ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খানের শাসনতন্ত্র সম্পর্কিত মূলনীতি রিপোর্টে পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের অঙ্গিকার না থাকায় এর বিরদ্ধে যে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে অলি আহাদ তার মুখ্য ভুমিকা পালন করেন।
মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অলি আহাদ সংগঠনকে অসাম্প্রদায়িক না করার প্রতিবাদে তারই গড়া সংগঠন থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের দাবী আদায়ে অলি আহাদ অন্যতম সংগঠনের ভূমিকা পালন করে। ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় যুবলীগ। যার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অলি আহাদ। অলি আহাদের নেতৃত্বে যুবলীগই এদেশে প্রগতিশীল আন্দোলনের সূচনা করেন। তাঁর কর্মতৎপরতা নিরলস সাংগঠনিক প্রচেষ্টা ও আন্দোলনে সাফল্য আনয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তাত্ব ইতিহাস এ সংগঠনের অমূল্য অবদান। ৫০ সালে অলি আহাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে বি,কম, পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম,কম, ক্লাসে ভর্তি করা হয়নি। 
রাজনৈতিক কারণে অলি আহাদকে বহিস্কার করা হল। অথচ দেশ স্বাধীন হয়ে গেলো আজ অবধি অলি আহাদের উপর দেয়া বহিস্কার আদেশ বাতিল করা হলনা। পৃথিবীর কোন জনপদে এ ধরনের ঘটনা চোখে পড়ে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোন ব্যাখ্যাও আজ অবধি দিল না। সেদিনের সংবাদপত্রগুলি এ বিষয়ে অনেক সম্পাদকীয় লিখে প্রতিবাদ করেছিল। নিয়তির কি পরিহাস যে মহান স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট তৈরী করার জন্য জীবনে ১১টি বছর অলি আহাদ জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যৌবনে সর্বোত্তম সময়টি ব্যয় করে দেশের স্বাধীনতা এনেছিল সে অলি আহাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিস্কার আদেশ আজো অবধি কলঙ্ক হিসাবে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেল। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীর প্রেক্ষাপট তৈরীতে অলি আহাদ এক অনন্য ভূমিকা রাখেন। তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তিনি আগ্রসৈনিকের ভুমিকা রাখেন। রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর উদ্যোগ ও কার্য্যকরি অগ্রণী ভূমিকা ইতিহাসের ম্যূায়নে প্রথম এবং প্রধানতম। তার সংগ্রামী উপস্থাপন তেজদীপ্ত বাগ্মিতা তৎকালীন ছাত্র ও যুব সমাজকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে উজ্জীবিত করে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য করেছিল। 
২১শে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষ্য করে গণমানুষের মাঝে যে চেতনা ধীপ্ত আন্দোলন পর্যায়ক্রমে গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছির তার রূপকার অলি আহাদ। ২২ ও ২৩শে ফেব্রুয়ারীর জনতার যে গণ উত্তাল তরঙ্গ কিংবা শহীদ মিনার নির্মাণ এ সবই ঘটেছিল মহা নায়ক অলি আহাদের নেতৃত্বে। ১৯৫৩ সালে অলি আহাদকে বন্দি করা হয়। তখন তিনি ব্রাহ্মনবাড়ীয়ায় অন্তরীন ছিলেন। অন্তরিন আদেশ বাতিল হলে তিনি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন, যা পরবর্তী কালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে রূপান্তরিত হয়। ১৯৫৫-৫৬ সালে অলি আহাদ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। জনাব অলি আহাদের সমসাময়িক অনেক প্রখ্যাত নেতাই এ কথা স্বীকার করেছেন যে অলি আহাদ ও মরহুম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে সব চাইতে শক্তিশালী জুটি হিসাবে এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেন। তাদের নেতৃত্বে ও অক্লান্ত পরিশ্রম প্রচেষ্টায় আওয়ামী লীগ এর সাংগঠনিক ভীত শক্তিশালী হয়। যার কারণে মুসলিম লীগ দৃশ্যপট থেকে সরে যাচ্ছিল। আওয়ামী লীগ এক নূতন মাত্রায় জনগণের মনে আসন গেড়েছিল। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগের কাগমারী সম্মেলনে অলি আহাদ পাক মার্কিন সামরিক চুক্তি ও বাগদাদ চুক্তি, সিয়াটো নামক সামরিক চুক্তি বাতিলের জোর দাবী জানান। 
সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্লোগান দিয়ে এ দেশে জন্ম নিয়েছিল কম্যুনিষ্ট পার্টি। এটা ছিল কম্যুনিষ্ট পার্টির আদর্শিক ভিত্তি। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে যে দু’জন নেতা বক্তব্য রাখেন তাদের মধ্যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং কম্যুনিষ্ট ব্যক্তিত্ব অলি আহাদ। সেদিন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার অলি আহাদকে নেহেরুর দালাল হিসাবে আখ্যায়িত করেছিল। এর মাসুল তাঁর সাথে মওলানা আব্দুল হামিদখান ভাসানীকেও দিতে হয়েছিল। 
এ কারণে অলি আহাদ দল থেকে সাসপেন্ড হন। এর প্রতিবাদে আইন পরিষদের ৮ জন সদস্য তার পক্ষে পদত্যাগ করেন। মওলানা ভাসানীও বেড়িয়ে এলেন। মওলানা আব্দুর হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। অলি আহাদ হলেন এ পার্টির যুগ্ন সম্পাদক। এর পর এলো মার্শাল-ল বা সামরিক শাসন। সনটি ছিল ১৯৫৮ সাল। আবার কারাগারে যেতে হল অলি আহাদকে। ১৯৬৩ সালের দিকে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন। প্রতিষ্ঠিত হল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে এন,ডি,এফ। অলি আহাদ চেষ্ঠা করলেন এন,ডি,এফ কে সু-প্রতিষ্ঠিত করার, কিন্তু পারলেন না। এরপর ১৯৬৯ সালে আতাউর রহমান খানকে সভাপতি করে জাতীয় লীগ গঠিত হয়। অলি আহাদ হন জাতীয় লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। এ সময়ে বাংলার স্বাধীনতার আন্দোলন প্রায় তুঙ্গে। ৭ দফা আন্দোলন নিয়ে মাঠে নামলো জাতীয় লীগ আতাউর রহমান ও অলি আহাদের নেতৃত্বে। ফলশ্রুতিতে অলি আহাদ কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেন। 
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপ রচনায় অলি আহাদের ভূমিকা ইতিহাসে সমৃদ্ধ। তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন শীর্ষ সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কার ভবিষ্যদ্বানী আজ অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। তিনি চেয়েছিলেন দেশের মাটিতেই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হবে। সময় যতদিনই লাগুক তাতে ক্ষতি নেই তবুও জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতা আসবে তার মূল্য অপরিসীম। সুদূর প্রসারী চিন্তা থেকে অলি আহাদ বাংলার স্বাধীনতাকে  মূল্যায়ন করার প্রয়াস নিয়েছেন। 
স্বরাজ গঠনের সহায়ক শক্তি হিসাবে জাতিকে নিরংকুশ স্বাধীনতা এনে দিতে চেয়েছিলেন অলি আহাদ। তিনি আগাম বুঝতে পেরেছিলেন ভারতীয় সামজিক সাম্রাজ্যবাদ সম্প্রসারণবাদ বাংলাদেশকে কখনই স্বাধীন হতে দিবে না। ভবিষ্যতে ভারত বাংলাদেশকে তাদের অঙ্গরাজ্য হিসাবে আগ্রাসিত করবে। বাংলাদেশকে সব সময় পদানত করে রাখবে। ভারত তাদের স্বার্থ উদ্ধার করার জন্য সাময়িক সহযোগীতা হয়তো করবে কিন্তু ভবিষ্যতে তাদেরই অঙ্গরাজ্যের মত ব্যবহার করবে। 
মধ্যযুগ থেকে এ পর্যন্ত ভারতের আগ্রাসী চরিত্রই প্রকাশ পেয়েছে। ভারত কখনই এ অঞ্চলে কোন স্বাধীন রাষ্ট্র বরদাস্তত করতে পারেনি এবং পারে না। রাজনীতিতে মেধাবী পরিপক্ষ ও দূরদর্শী অলি আহাদ তা সত্যিকার অর্থেই বুঝতে পেরেছিলেন বলেই ভারত নির্ভর স্বাধীনতা চাননি। সে কারণেই তিনি দেশের মাটিতেই জনযুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন যা দিল্লীর পছন্দ হয়নি। যুদ্ধকালীন ৯ মাসের মধ্যেই অলি আহাদের ভবিষ্যদ্বানী অক্ষরে অক্ষরে ফলতে মুরু করে। আমরা যারা বয়সে তরুণ, রাজনীতিতে অত পরিপক্ষ নই আমরা দেখলাম ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে একটা অপরিণত অবস্থায়  এনে দর কষাকষি করে দেশের নেতাদেরকে আগাম চুক্তি করতে বাধ্য করেছেন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন কিছু ঘটনাবলী তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ মিলে। সেপ্টেম্বরে-অক্টোবরের দিকে ভারতের দেরাদুনে তৎকালীন নেতাদের ডেকে চুক্তির ভিত্তিতে ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বিজয় নির্ধারিত হয়। তার আগে ৫-৬ মাসে উল্লেখযোগ্য কোন সশস্ত্র সহযোগীতা ভারত বাংলাদেশকে করেনি, ক্যাম্পগুলোর খরচ বহন ব্যাতিরেখে। শুধু তাই নয়, জাতীয় নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং কাজী জাফর আহমদ সহ স্বরাজ গড়ার মানসিকতার অনেক নেতাকে নজরবন্দী করে রাখা হয়েছে। সেক্টরে সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যেতে দেয়া হয়নি। প্রবাসী সরকারের সাথে চুক্তির পরই ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতা করতে লাগলো এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পশ্চাতে থেকে সাহায্য করতে শুরু করলো। মুক্তিযোদ্ধারা পুরো ৯ মান অগ্রণী বাহিনী হিসাবে কখনও সম্মুখ যুদ্ধ, কখনও গেরিরা যুদ্ধ করে শত্রুকে পর্য্যদস্ত করে স্বাধীনতা তরান্তিত করলো। যুদ্ধকালীন ভারতীয় সরকার বা মিত্র বাহিনীর অনেক আচরন আমাদের তরুন মনে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছিল যা অলি আহাদ এবং জাতীয় অনেক নেতাই পূবাহ্নে সাবধান করেছিল জাতিকে। কিন্তু তখন আমাদের কিছুই করার ছিল না। কারণ নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্ব ছিল চুক্তিবাদী আওয়ামী প্রবাসী সরকারের হাতে। তাছাড়া জাতি যার উপর সমস্ত বিশ্বাস জমা দিয়ে নেতা হিসাবে মেনে নিয়েছিলেন সেই বঙ্গবন্ধুও ছিলো না। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের হাতে বন্দি। এমতাবস্থায় সমগ্র জাতি প্রবাসী সরকারের উপর নির্ভরশীল ছিল। আমি আজ নিশ্চিতভাবে আশ্বস্ত এবং বিশ্বাস করি সেদিন যদি অলি আহাদের কথায় আমরা জনযুদ্ধের পথ ধরে স্বাধীনতা সংগ্রাম করতে পারতাম, তাহলে একদিন না একদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হতোই। কেননা দেশের ভিতরেই সে প্রেক্ষাপট তেরী হয়েছিল। সাড়ে সাত কোটি মানুষই শত্রু নিধনের আকাংখায় উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ মিলে যখন আপামর সাধারণ মানুষ পাক বাহিনীর অত্যাচার অবিচার সহ্য করেও নিশ্চিত বিপদ জেনেও মুক্তিযোদ্ধাদের খেতে দিয়েছে, থাকতে দিয়েছে, শত্রুর গতিবিধি জানিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন রক্ষা করেছে। ঘরের ধান বিক্রি করে যুদ্ধে সাহায্য করেছে। ১৬ই ডিসেম্বর বাংলার পূর্ব আকাশে স্বাধীনতার লাল সূর্য উদয় হল। দেশ বিজয় লাভ করলো সত্য, কিন্তু বিজয়ের মুহূর্তে নূতন করে অজান্তেই পাকিস্তানের উপনিবেশের হাত থেকে দিল্লীর উপনিবেশের হাতে আমরা হস্তান্তরিত হলাম। 
স্বাধীনতার জন্য লাখো লাখো ভাই-বোন জীবন বিসর্জন দিল ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত। কিন্তু বেইমানী আর মোনাফেকীর কারণে আমরা তাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা আজো পরিপূর্ণ ভোগ করতে পারছিনা। নিজ দেশে আজো পরবাসী আমরা। স্বাধীনতার উষালগ্নে জনাব অলি আহাদ ভারতের সাথে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী ২৫সালা দাসত্ব চুক্তির বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিলেন। যার জন্য আজীবন সংগ্রামের সাথী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে ১৪ মাস কারাগারে আটকে রাখেন। হয়তো আরো থাকতে হতো। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট এক সামরিক অর্ভূত্থানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু নিহত হন। যা কারোই কাম্য ছিল না। তবু নিয়তিকে কেউ ঠেকাতে পারেনা। এত বিশাল জনসমর্থন নিয়ে যে নেতা বাংলার ভাগ্য নির্ধারক হয়ে মসনদে বসলেন, দোর্দন্ড প্রতাপে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করলেন অথচ তারই মৃত্যুর পর একজন মানুষও এ দেশে প্রতিবাদ করলো না, রুখে দাঁড়ালো না। হিমালয়সম ইমেজ নিয়ে যিনি বাংলার স্বাধীনতার ধারক বাহক হয়ে নিরংকুশ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন অথচ মাত্র তিন বছরের মাথায় তার ইমেজ শূণ্যের কোঠায় চলে আসলো। অবাক বিস্ময়ে সারা বিশ্বের মানুষ বিষয়টি অবলোকন করলো, রাজনীতিকরা এর তাৎপর্য অনুধাবন করার চেষ্ঠা করলো। বাংলাদেশের মানুষ চিরকালই স্বাধীনচেতা, ধর্মভীরু। স্বাধীনতার প্রশ্নে এ অঞ্চলের মানুষ কখনই মাথা নত করেনি। কখনো কারো অধীনস্থ থাকতে শিখেনি। অসীম সাহসিকতায় ইংরেজকে এদেশ থেকে উৎখাত করেছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দলনের এই পূর্ব বাংলার মানুষই সবচাইতে বেশী আত্মত্যাগ করেছে ইতিহাস তার স্বাক্ষ্য বহন করে। পিতা, পিতামহের কষ্টার্জিত পাকিস্তান যখন এ অঞ্চলের মানুষকে পরাধীন করতে চাইলো তখনও একই রক্তের ধর্মের মানুষ মেনে নেবে না। ফলশ্রুতিতে আজীবন বাংলার জনগণের ত্যাগী নেতা এ দেশের আলালের ঘরের দুলাল শেখ মুজিবের ভারত প্রীতি নতজানু পররাষ্ট্র নীতিকে কেউ সমর্থন করতে পারেনি। জীবন দিয়েই তার মাশুল দিতে হয় বঙ্গবন্ধুকে। 
বঙ্গবন্ধুর ইন্তেকালের পর অলি আহাদ কারাগার থেকে মুক্ত হলেন। অলি আহাদ আজ অবধি অশান্ত চির বিদ্রোহীর ভূমিকা পালন করে চলেছেন। নূরুল আমিন, নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান, আইয়ুব খান, শেখ মুজিবুর রহমান, জেনারেল জিয়াউর রহমান, প্রেসিডেন্ট হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ উল্লেখিত সরকারের সময় জনাব অলি আহাদ গণমানুষের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে, আন্দোলন করতে গিয়ে বার বার কারারুদ্ধ হয়েছেন। শুধুমাত্র এরশাদ সাহেবের আমলেই অলি আহাদ ছয়বার কারাবরণ করেছেন। মানুষের জন্য দেশের জন্য কথা বলতে গিয়ে অলি আহাদকে সারাটি জীবন অত্যাচার অবিচার নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করেন নি। বহুবার তাকে মন্ত্রীত্বের লোভ দেখানো হয়েছে কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেন নি। লোভ লালসা তাকে তার নীতি আদর্শ থেকে কখনও একচুলও টলাতে পারে নি। তিনি সজ্ঞানে আজন্ম বেছে নিয়েছেন কংকটাকীর্ণ বন্ধুর পথ। চিরদিনই সত্যের পক্ষে জনগণের গান গেয়ে গেছেন। পরভাব মানেননি। 
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সাথে ছিল অলি আহাদের নিবিড় সম্পর্ক। ইতিহাস থেকে জানা যায় মওলানা ভাসানী অলি আহাদকে সন্তানতুল্য ভালবাসতেন। মাওলানা ভাসানীর লেখা পত্রগুলি যা তিনি বিভিন্ন সময় অলি আহাদকে রাজনীতির বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে স্বহস্তে¡ লিখেছিলেন, তা থেকেই প্রতীয়মান হয় অলি আহাদ মওলানা ভাসানীর সব চাইতে বিশ্বস্ত স্নেহাস্পদ রাজনৈতিক সহচর ছিলেন। মওলানা ভাসানী যখনই কোন রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন প্রথমেই তিনি স্মরণ করেছেন অলি আহাদকে। জেলে কিংবা আত্মগোপন করে যেখানেই ছিলেন পত্র মাধ্যমে অলি আহাদকে দলের কর্মসূচী পালন করার নির্দেশ দিতেন। মহাসংকটে অলি আহাদ পার্টি বা দলের জন্য যেভাবে অকুতভয়ে অকুণ্ঠ চিত্তে নেতার নির্দেশ পালন করেছেন বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে তার উদাহরণ মেলা ভার। 
জনাব অলি আহাদের জীবনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড পর্যালোচনা করলে রাজনীতির মৌলিক বিষয়গুলো অনায়াসেই চোখের সামনে ধরা পড়ে। যা থেকে নূতন প্রজন্ম অনেক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। বর্তমান রাজনীতির দৈন্যতার এই দিনে অলি আহাদের কালজয়ী লেখা ১৯৪৫ থেকে ৭৫ প্রতিটি রাজনীতিক নেতা-কর্মী কিংবা অনুসন্ধিৎসু পাঠকের পড়া একটি আদর্শবাদী রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য আদর্শ কি হওয়া উচিৎ তা বুঝা বা শেখা যাবে। একটি আদর্শবাদী রাজনীতি বা সংগঠন গড়ে তুলবার জন্য এবং তার ভিতরের কর্মী বাহিনীকে লালন করার পদ্ধতি শেখানোর জন্য অলি আহাদের জীবনের ঘটনাবলী সম্মিলিত ইতিহাস সমৃদ্ধ বইটি পড়া অপরিহার্য্য। অলি আহাদের সারা জীবনের শিক্ষা দীক্ষা ব্যক্তি জীবন, সংগ্রামী জীবন এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ড তথা সাংগঠনিক তৎপরতার পদ্ধতিগত দিক জানার জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক কর্মীদের সামনে এটি একটি মডেল হতে পারে। যার পথ ধরে আগামী প্রজন্ম একটি সুস্থ সৎ প্রগতিশীল রাজনৈতিক অনুকরণীয় অনুস্মরণীয় কর্মী হতে পারে। স্বাধীনতা লাভের পর অলি আহাদ লাখো শহীদের রক্তের কেনা স্বাধীনতা অর্থবহ করে তোলার জন্য নূতন উদ্যমে ও আঙ্গিকে দেশটাকে গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। 
স্বরাজ গড়ার মাননসিকতায় অলি আহাদ সবাইকে নিয়ে একটি জাতীয় ঐক্য রচনা করতে চেয়েছেন। অলি আহাদের বিশ্বাস ৯০% মুসলিম অধ্যুষিত এদেশটাকে স্বাধীন রাখতে হলে সর্বাগ্রে জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য্য। অলি আহাদ অনেক বড় বড় নেতাদের সাথে রাজনীতি করেছেন একসাথে গাঁট ছাড়া বেঁধে জোট বা ঐক্য করে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সে ঐক্য ভেঙ্গে গেছে। অলি আহাদ তাঁর অবস্থান ঠিক রেখে নীতি আদর্শের প্রতি অনড় থেকে একাকী পথ চলেছেন। মানুষের জন্য দেশের জন্য স্বদেশীকতার প্রশ্নে আপোষহীন হয়ে অবিরত আন্দোলন করেছেন। নীতির প্রশ্নে এক চুলও তাকে কেউ টলাতে পারেনি। 
প্রত্যেকটি মানুষেরই কিছু না কিছু ক্ষমতার লোভ থাকে কিন্তু অলি আহাদ সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্র। তিনি মনে করেন বিরোধী অবস্থান থেকেও দেশের কাজ করা যায়। দেশের অগ্রগতি সাধনের জন্য ভূমিকা রাখা যায়। 
মানুষের জন্য দেশের জন্য কাজ করতে ক্ষমতায় যাওয়া অপরিহার্য্য নয়। বিরোধী অবস্থানে থেকেও দেশের প্রগতির জন্য নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করা যায়, যদি সদিচ্ছা থাকে। 
জননেতা অলি আহাদের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় খুব বেশী দিনের নয়। ১৯৯৭ সালে যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ ও সাবেক উপপ্রধান মন্ত্রী জননেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি আলাদাভাবে আত্মপ্রকাশ করে। তখন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সৄষ্টি, ক্ষমতা থেকে নামাবার অভিগ্রায়ে আমরা ক’জন নূতন একটি ফর্মুলা উদ্ভাবন করি। জাতীয়তাবাদী ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছোট বড় দলগুলিকে একটি বিরোধী দলীয় ঐক্যজোট বা ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে দেশে গণ আন্দোলন সৃষ্টি করে আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ফর্মুরা এই রকম। যেহেতু আওয়ামী লীগ পূর্বাপর মোট ভোটের ৩৬% শতাংশ পেয়ে জাতীয় পার্টি এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে সরকার গঠন করতে সমর্থ হয়েছে। সেহেতু আওয়ামী লীগকে এক ঘরা করে বাকী ছোট বড় সমস্ত দলগুলিকে নিয়ে একটি বিরোধী বৃহত্তর ঐক্যজোট করে আন্দোলন নির্বাচন এবং সরকার গঠনব একটি আগাম নকশা জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।
এ কাজগুলি এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কাজী জাফর আহমদ প্রথমেই যার শরণাপন্ন হলেন তিনি হলেন ডেমোক্রেটিক লীগের সভাপতি, সব চাইতে বর্ষীয়ান জননেতা জনাব অলি আহাদ সাহেব। অলি আহাদ সাহেব কাজী জাফর আহমদ সাহেবকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। নিজের ছোট ভাইয়ের মত মনে করেন। সর্বোপরি একজন শরীফ ঘরের সন্তান হিসাবে সম্মান করেন। আমার যতদূর মনে পরে বেশ কয়েকদিন অলি আহাদ কাজী জাফর আহমদ আলোচনার পর বেশ কয়েকটি দলের সাথে কথা বলেন কাজী জাফর আহমদ। এ সময় জামাতে ইসলামের আব্দুল কাদের মোল্লা, শফিউল আলম প্রধান, শওকত হোসেন নীলুসহ অনেকেই প্রতিদিন আমরা রাতভর গুপ্ত মিটিং করে মোটামোটি একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হই। কিন্তু বড় দল বি,এন,পি, নেত্রী খালেদা জিয়াকে কনভেন্স করবে কে? দায়িত্ব দেয়া হল অলি আহাদকে। তিনি ম্যাডাম জিয়াকে রাজী করালেন। অবশেষে ৭ দলীয় জোট গঠিত হল। প্রথম প্রোগ্রাম দেয়া হল বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে লংমার্চ। আন্দোলন দানা বাঁধতে লাগলো। কাজী জাফর আহমদ, অলি আহাদ, শফিউল আলম প্রধান, শওকত হোসেন নীলু, কামরুজ্জামানসহ আমরা কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে বিরোধী আন্দোলন জোরদার করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। 
তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশব্যাপী আন্দোলনের কর্মসূচী দিলেন। এ সময়ে তিনি যখনই কোথাও জনসভা করতেন সর্বাগ্রে তিনি কাজী জাফর আহমেদ, অলি আহাদ সাহেবকে ডেকে পাঠাতেন। বড় সভাগুলিতে কাজী জাফর, অলি আহাদ ম্যাডামের দুই পাশের চেয়ারে উপবেশন করতেন। এ সময় জনাব অলি আহাদের অনলবর্ষী বক্তৃতা সবার মনে আগুন ধরিয়ে দিত। অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে সেদিন অলি আহাদ আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামাবার জন্য জনগণকে সংগঠিত করতে অনেকাংশেই সমর্থ হয়েছিলেন। 
কিছুদিন পর জাতীয় পার্টি এরশাদ এবং জাতীয় পার্টি (জা-মো) পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হল। তারপরই ৭ দলীয় ঐক্যজোট ভেঙ্গে ৪ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করা হল। অলি আহাদসহ অন্যরা বাদ পড়লেন ঐক্যজোট থেকে। কি জন্য, কি কারণে আওয়ামী বিরোধী আন্দোলনের জোট গঠনে অন্যতম মূল উদ্যোক্তা অলি আহাদ বাদ পড়লেন দেশবাসী কিছুই জানতে পারল না। দেশের মানুষ আশা করেছিল নির্বাচনে কিংবা সরকার গঠনে অলি আহাদ সাহেবের ভূমিকা থাকবে। কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় এই অভিজ্ঞ বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাকে এতটুকু তার প্রাপ্য সম্মান দেয়া হল না। 
রাজনীতিতে এ ধরনের নির্মম আচরণ কারো কাছেই কাম্য নয় অথচ তাই হল তাই হচ্ছে এই দুর্ভাগা দেশে। 
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জনাব অলি আহাদ এমন একটি চরিত্র যার তুলনা শুধুমাত্র তিনি নিজেই। অন্য কারো সাথে তার তুলনা করা বোকামী ছাড়া আর কিছু না। জনাব অলি আহাদের রাজনৈতিক আদর্শ চলমান রাজনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। একটি স্বতন্ত্র ষ্টাইল নিয়ে তিনি রাজনীতি চর্চা করেন। রাজনীতিকে তিনি জীবনে মিশন বা ব্রত মনে করেন। জনকল্যাণই যার মূল লক্ষ্য। যার জন্য তিনি ব্যক্তিগত চাল চলনে সময়ানুবর্তিতা, সত্যবাদতিা, মিতব্যয়িতা সর্বোপরি কঠোর অনুশীলনের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত অতিবাহিত করেন। জনাব অলি আহাদের মত হিমালয় সম ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে এসে জীবনের অনেক অপূর্ণতার খেদ মিটে যায়। না পাওয়ার ব্যাথা বেদনা মন থেকে মুছে যায়। মনে হয় পাবার চেয়ে দেয়ার আনন্দ অনেক। সবাই তো পাবার জন্যেই দৌড়াচেচ্ছ। দেবার মানসিকতা ক’জনের আছে এই দেশে। এ শুধু অলি আহাদের পক্ষেই সম্ভব।
অলি আহাদ সাহেব দীর্ঘ রাজনীতিক জীবনে অসংখ্য কর্মী অনুসারী তৈরী করেছেন। যারা রাজনীতির বিভিন্ন কেন্দ্রবিন্দুতে সাফল্য নিয়ে অবস্থান করছেন। সবাইর কথা আমি বলতে পারবোনা তবে যে দূ’জন অনুসারীকে আমি খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে জেনেছি তাদের দু’জনের একজন সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি, আরেকজন মুন্সি আবদুল মজিদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দু’জন মানুষ অলি আহাদ সাহেবের জীবনের সাথে নিজেদের একাত্ম করে নিয়ে যেভাবে সংগঠন করে চলেছেন সত্যিকার অর্থেই এরা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। 
আমরা এমন এক দেশে বসবাস করি যে দেশে বীর সন্তানদের জীবদ্দশায় মূল্যায়ন করা হয় না। এ জাতি দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝে না। সে কারণেই আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তনও হয় না।
এ জাতি হয়তো অলি আহাদ সাহেবের কাছ থেকে আরো অনেক কিছু পেতে পারতো। যদি তাকে দেশের অগ্রগতির প্রশ্নে কাজে লাগাতো। কিন্তু আমরা মনের দিক দিয়ে এতই দরিদ্র যে আমরা আমাদের বীর সন্তানদের সঠিক মূল্যায়ন করিনা, করতে জানিনা। যার পরিণতিতে জাতীয় জীবনে অগ্রগতির চেয়ে অবনতিই পরিলক্ষিত হয়। 
সময় এসেছে পিছনে ফিরে তাকানোর, আমাদের সমৃদ্ধ অতীতের যারা শ্রেষ্ঠ, মহান গুনী মহাজন তাদের জীবনের অবদানগুলি জাতির সামনে বেশী বেশী করে তুলে ধরতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য অলি আহাদ সহ আমাদের পিতা পিতামহ যারা বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করেছেন কিংবা জাতিসত্তার উন্মেষের জন্য, স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন যারা সত্য ও ন্যায় নিষ্ঠার জন্য আজীবন লড়েছেন। মানুষের কল্যাণের জন্য সততা, নিষ্ঠা ও সত্যিকার দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখেছেন সে সমস্ত মানুষের জীবন কাহিনী লিপিবদ্ধ করে আগামী দিনের বংশধরদের জন্য তৈরি করে যেতে হবে। শত ব্যর্থতার পাদপিঠে দাঁড়িয়ে সফলতার পথ রচনা করতেই হবে। যদি হতাশা আসে অলি আহাদ এর মত আদর্শবাদী ত্যাগী নেতাদের প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাদের চরিত্র চিত্রন করে আগামী দিনের জন্য “অলি আহাদদের মত আরো ভাল মানুষ চাই”-সর্বাগ্রে এই শ্লোগান দিয়ে যাই। 
[লেখক মহান মুক্তিযুদ্ধের ২নয় সেক্টরের-ঢাকা মহানগরী (রমনা তেজগাঁও) এর প্লাটুন কমান্ডার, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ।]