অলি আহাদ এক সাচ্চা দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদীর প্রতিকৃতি -এহসানুল হক সেলিম

ফন্ট সাইজ:
  ‘৫২ এর রক্তস্নাত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, মহান একুশে ফেব্রুয়ারী আর সেই ভাষা আন্দোলনের সিপাহশালার অলি আহাদ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক জীবন্ত কিংবদন্তী। তাঁর বিচক্ষণতা, একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা, নির্ভীকতা, একগুয়েমীজেদ আর দুর্জয় সাহসই সমস্ত প্রতিকূলতাকে ছিন্ন করে নুরুল আমীন সরকারের জারীকৃত ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার ক্ষেত্র সৃষ্টি করে রক্তস্নাত ২১শে ফেব্রুয়ারীর কালজয়ী ইতিহাসের স্রষ্ঠা হয়ে যান। ছোটবেলা থেকেই তাঁর নামটির সাথে আমি পরিচিত ছিলাম। মুরুব্বিদের কাছ থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিপ্লবী কর্মকান্ডের বীরত্বপূর্ণ কার্য্যক্রমের কাহিনী শুনে শিহরিত হতাম। রোমাঞ্চিত হতাম। তাঁকে দেখার খুব ইচ্ছে হতো। যখনই তাঁকে দেখতে চেয়েছি তখনই শুনেছি তিনি কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে কালাতিপাত করছেন। বিপ্লবীদের জীবন এমনই হয়।
বৃটিশ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস পড়তে গিয়ে কখনো নেতাজী সুভাষ বসু, খকনো ডঃ এম.এন.রায়, রাস বিহারী বসূ ইত্যকার অনেক বিপ্লবীর কাহিনী পড়েছি। একেক সময় একেক জনকেই মনে হয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী। সেই আমার আদর্শ। বিশেষ করে নেতাজী সুভাষ বসুর প্রতিই দুর্বলতা ছিল একটু বেশি। জনাব অলি আহাদকে নেতাজীর সাথেই বেশি মিলাতাম আর তুলনা করতাম। তাঁর সাথে আমার দেখা না হলেও মনে মনে তাঁকেই আমার জীবনের আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করলাম। 
১১ দফা আন্দোলনের পর ১৯৬৯ সালে জুন মাসে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ দ্বিধা বিভক্ত হয়। একাংশের নেতৃত্বে আল মুজাহিদী আরেক অংশের নেতৃত্বে তোফায়েল আহমদ। আমি আল মুজাহিদী নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের সাথে একাত্ব ছিলাম। সেই সময় জনাব আতাউর রহমানের নেতৃত্বে জনাব অলি আহাদসহ দেশের বেশ কিছু বরেণ্য রাজনীতিবিদের নেতৃত্বে জাতীয় প্রগতি লীগ (National Progressive League) নামে একটি রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ঢাকার হোটেল ইডেনে এক সম্মেলনের মাধ্যমে দলের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক কমিটি গঠন করা হয়। এবং দলের নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করা হয় জাতীয় লীগ (National League) দলের সভাপতি নির্বাচিত হন জনাব আতাউর রহমান খান। অল পাকিস্তান কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন জনাব অলি আহাদ। অল পাকিস্তান ভিত্তিক এ দলটি জনাব আতাউর রহমান খান, শাহ্ আজিজুর রহমান, অলি আহাদ, আবদুল হামিদ চৌধুরী, আমেনা বেগম, খয়রাত হোসেন, দিলদার আহমদ, ফেরদৌস আহমদ কোরেশী, আবুল কালাম আজাদ, দেওয়ান সিরাজুল হক, আশরাফ হোসেন, আকবাল আনসারী খান, অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম, নুরুর রহমান প্রমূখ বরেণ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে গঠিত হয়। রাজনৈতিক কর্মসূচীতে আমাদের ছাত্র সংগঠন বাংলা ছাত্রলীগ এ দলটিকে সমর্থন দেয়। বাংলা ছাত্রলীগে তখন আমার অবস্থান ছিল কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক। সেই সুবাদে অলি আহাদ সাহেবের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় হয় ৬৩, বিজয় নগরস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। তার পর থেকে দীর্ঘ দিন তাঁর সাথে একজন রাজনৈতিক কর্মী ও তাঁর আদর্শের একজন একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে আমার অতিবাহিত হয়। সদীর্ঘ এই সময়ে তাঁর সাথে চলার পথে তাঁকে অতি নিকট থেকে দেখার ও জানার সুযোগ আমার হয়েছে। 
সত্যিকার অর্থে একজন নির্লোভ, সৎ চরিত্রবান, আপোষহীন সংগ্রামী, জাতীয় স্বার্থে নিবেদিত প্রাণ, ত্যাগী মহান জাতীয়তাবাদীর সঠিক প্রতিকৃতিই দেকতে পাওয়া যায় জনাব অলি আহাদের মধ্যে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষনের প্রশ্নে নির্ভীক সাহসী উচ্চারনে অলি আহাদ এই প্রবীণ বয়সেও তারুণ্যের বাঁধভাঙ্গা সিংহ গর্জনে গর্জে উঠেন। অনেকে বলেন তিনি প্রচন্ড একরোখা মানুষ। তিনি ছাড় দিতে জানেন না। তিনি তাঁর চিন্তা চেতনায় শতকরা একশতভাগ অটল থাকেন। আপোষের অলিগলি বেয়ে ক্ষমতায় আরোহনের সিঁড়ি তিনি মাড়াননি। চির বিদ্রোহী অলি আহাদ তাঁর এই সততাম দেশ প্রেম আর আপোষহীনতার ঝান্ডা উচুঁ করে ক্ষমতার লোভনীয় সব প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছেন। ক্ষমতা তাঁর পায়ের কাছে গড়াগড়ি খেয়েছে কিন্তু আপোষ করে তিনি সেই ক্ষমতায় অংশ গ্রহনের জন্য লোভনীয় অনেক প্রস্তাব দিয়েছেন, অনেক লোভনীয় পদ পদবী দেয়ার প্রলোভন দিয়েছেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহন করেননি। তিনি পাকিস্তান আমলের মতোই স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের শাসনামলে হাসিমুখে কারাভোগ করেছেন। স্বাধীনতার পর ‘৭৩ সালে তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ প্রকাশনা ও সম্পাদনা শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে আধিপত্যবাদ বিরোধী পত্রিকা হিসেবে সুপরিচিত ইত্তেহাদে তিনি শাসকশ্রেণীর সকল অন্যায় অত্যাচার আর জাতীয় স্বার্থ বিরোধী সকল কার্যক্রম সোচ্চারভাবে তুলে ধরেছেন। তাদের অপকর্ম আর ব্যর্থতায়, জাতীয় স্বার্থবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বজ্রনিগুঢ়- সত্য উচ্চারণে তৎকালীন শাসক মুজিব, জিয়া, এরশাদ প্রত্যেকেই তাঁর পত্রিকা নিষিদ্ধ করেছেন। তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছেন। 
১৯৬৯ সালের শেষদিক থেকে শুরু করে সুদীর্ঘকাল সময় তাকে অতি নিকট থেকে দেখার আমার সুযোগ হয়েছে তার সান্নিধ্যে অনেক দুঃসহ সময় অতিক্রম করেছি বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে, মুক্তিযুদ্ধ উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশ ৭২-৭৫ সালে আওয়ামী দুঃশাসনের সময়। 
আমাদের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে জনাব অলি আহাদ এক জীবন্ত কিংবদন্তী। নির্ভীকতায়, সাহসিকতায়, কুণ্ঠাহীন সত্যভাষনে, ত্যাগ তিতিক্ষায় অগ্নিশুদ্ধ, নির্লোভ চরিত্রের গৌরবময় অহংকারে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত মহান এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব অলি আহাদ আমাদের জাতীয় রাজনীতির পরিচিত আবহের মধ্যে ব্যতিক্রম। 
জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ-জনাব অলি আহাদ পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ডে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, পাকিস্তানের সাথে এ অঞ্চলের মানুষ একরাষ্ট্রের কাঠামোতে বসবাস করতে পারবেনা। নিজস্ব স্বকীয়তায় স্বাধীনসত্বা নিয়েই বাঁচতে হবে। তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্রমে এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পাশাপাশি সকল সম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও তাঁর অবস্থান ছিল প্রশ্নাতীত। 
দল কর্তৃক ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহনের পর ৪ঠা ডিসেম্বর মজলুম জননেতা মওরানা ভাসানীর সাথে ন্যাপ-জাতীয় লীগের যৌথ উদ্যোগে পল্টনের জনসভা- যে জনসভা থেকে স্বাধীন পূর্ব বাংলার ঘোষনা দেয়া হয়। পর দিন ৫ই ডিসেম্বর নিজ শহর ব্রাহ্মনবাড়িয়া ন্যাপ জাতীয় লীগের যৌথ সভায় প্রধান অতিথির ভাষনে নির্বাচন বর্জন করে স্বাধীনতার সংগ্রামে দলমত নির্বিশেষে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান জানান। তাঁর বক্তব্য যেমনি স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্ততি নিতে দেশবাসীকে উজ্জীবিত করেছিলেন তেমনি এটার অনিবার্যতা ২৫শে মার্চ‘৭১ এ প্রমানিত হয়। নির্বাচনোত্তর কালে তিনি বসে থাকেননি জনাব আতাউর রহমান খানের সাথে রাজনৈতিক কর্মসূচীতে মতানৈক্য হলে ১০ই জানুয়ারী ’৭১ইং কুমিল্লায় দলীয় কনফারেন্সের মাধ্যমে দরের নাম বাঙলা জাতীয় লীগ করেন এবং দলকে পুনর্গঠিত করে। সেদিন তিনি নবজাগ্রত জাতীয়তাবাদের বিকাশকে স্বাগত জানিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে আওয়াজ তুলেনঃ “স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
কে বাঁচিতে চায় !” 
জাতীয় লীগের এই বিভাজনের প্রভাব আমাদের ছাত্র সংগঠনের উপরও পড়ে। আমার নেতৃত্বে বাংলা ছাত্র লীগের একাংশ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র শক্তি মিলে একটি নতুন ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে তিনি আমাদেরকে নবগঠিত ছাত্র সংগঠনের নাম ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর “ফরওয়ার্ড ব্লকের” অনুকরণে “ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস্ ব্লক” নারকরণের জন্য বলেন। ১৭ই ফেব্রুয়ারী “ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস্ ব্লক” গঠনের পর সুভাষ বসুর নেই ঐতিহাসিক উক্তি “তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” মুদ্রিত করে আমরা সারা দেশে ব্যাজ পরিবেশন করি। এতে “মুক্তি ফৌজগঠন করো। বাংলাদেশ স্বাধীন করো” শ্লোগান ও উৎকীর্ণ ছিল। 
রেসকোর্স (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের জনসভার আগের দিন ৬ই মার্চে বাংলা জাতীয় লীগ পল্টন ময়দানে এক জনসভায় করে সে জনসভা হতে জনাব অলি আহাদ শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে বলেন “মুজিব ভাই আপনি স্বাধীনতা ঘোষণা কুরুন আমরা আপনার সাথে আছি”। এবং আওয়াজ তুলেনঃ মুক্তি ফৌজ গঠন করো- বাংলাদেশ স্বাধীন করো। 
ত্যাগ যত বড়ই হোক না কেন রক্ত যতই ঝরুক না কেন দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। এই ছিল তার প্রতিজ্ঞা। দেশবাসীকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করার জন্য তিনি উল্কার মতো সারা বাংলাদেশে জনসংযোগ করে বেরিয়েছেন। তার বক্তৃতা, বিবৃতিতে তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে আপোষের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে সরাসরি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ গ্রহণের আহবান জানান। ১৭ই মার্চ চট্টগ্রামে লালদীঘি ময়দানে ঐতিহাসিক জনসভা শেষে আন্দর কিল্লাস্থ জাতীয় লীগের কার্যালয়ে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে অবজারভার পত্রিকার সিনিয়র এক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেন- আপনি যেভাবে সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলেছেন এতে তো বায়াফ্রার মতো গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। এ ব্যাপারে ভেবে দেখেছেন কি? উত্তরে তিনি সিংহের মতো গর্জন করে বলেছিলেন “Let it be Byafra- রক্ত যতই ঝরুক দেশকে স্বাধীন করতে হবে”। 
গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একজন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিবিদ অলি আহাদ চেয়েছিলেন যেহেতু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছে তাই স্বাধীনতা আন্দোলনে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য স্বাধীনতাকামী দলসমূহকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। বিশাল হৃদয়ের অধিকারী জনাব অলি আহাদকে কখনো ব্যক্তি স্বার্থকে সমষ্টিগত কিংবা জাতীয় স্বার্থের উর্ধ্বে স্থান দিতে দেখিনি। আগরতলায় ‘৭১ এর এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি ও আনসার হোসেন ভানু অবস্থান করছিলাম। জনাব ভানুকে যে মিশন দিয়ে তিনি ভারতে পাঠিয়েছিলেন সেই মিশনেরই অংশ হিসেবে মানিক চক্রবর্তীর মাধ্যমে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্ণেল কানার্জির সাথে সাক্ষাতের সময় কর্নেল বানার্জির জনাব অলি আহারে জন্য একটি ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বেতার ট্রান্সমিটার দেবার কথা বলেন। সীমান্ত সন্নিকটবর্তী গ্রাম- দূর্গাপুরে অপস্থানরত জনাব অলি আহাদকে একথা বরার পর তিনি সরাসরি তা প্রত্যাখান করে বলেন যে, ইতিমধ্যে স্বাধীনবাংলা বেতার চালু হয়েছে এখন আমি যদি অন্য একটা বেতার কেন্ত্র চালু করি তাহলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ব্যাহত হতে পারে। কাজেই ওটা আমি নেবনা বরঞ্চ উনাকে বলে দিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের যন্ত্রটি কোন কারনে ক্ষতি হলে ওটা যেনো Replace করা হয়। 
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি চেয়েছিলেন যথা সম্ভব শীঘ্র প্রবাসী সরকার গঠন করা হোক এবং যুদ্ধের কৌশল ও সাহায্য সহযোগীতার ব্যাপারে ভারত সরকারের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করা হোক। তিনি চেয়েছিলেন ভারত যে সাহায্য সহযোগীতা করবে সেটা স্বল্প মেয়াদী কিংবা দীর্ঘ মেয়াদী যাই হোক সনা কেন এ ব্যাপারে এটা স্বচ্ছতা থাকা দরকার কারণ এত রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত। এ বিষয়ে তিনি আবদুল মালেক উকিল, জহুর আহমদ চৌধুরীসহ অনেক আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলেছেন চাপ প্রয়োগ করেছেন। অবশেষে ১০ই এপ্রিল ‘৭১ মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়। যা নাকি পরবর্তীতে কুষ্টিয়ার মেহেপুরের বৈদ্যনাথ তলায় ১৭ই এপ্রিল ঘোষণা করা হয়। জনাব অলি আহাদ চেয়েছিলেন এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই ব্রাহ্মবাড়ীয়া মুক্ত অঞ্চলকে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করে সেখান থেকেই অস্থায়ী সরকারের ঘোষণা দেয়া হোক। কিন্তু এটা তিনি করাতে পারেননি। উপরন্ত অলি আহাদ সাহেবের তৎপরতাকে ভারতীয় ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকার ও আওয়ামী লীগ ভালো চোখে দেখেনি। তাইতো আমরা একদিন আগরতলা থেকে সোনামুড়ি যাবার পর গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে পুলিশের একজন সি.আই এবং সোনামুড়ি থানার ও.সি জিজ্ঞাসাবাদের নামে প্রকান্তরে থানায় নিয়ে আটক করে। এবং ও.সি এর বাসভবনে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেন। সেখানেই ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার একজন উর্ধতন কর্মকর্তা উনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। এভাবে প্রায় ৪ দিন উনাকে আটক রাখেন। আমাদের সাথে ত্রিপুরা রাজ্য শাখা সি,পি, আই সাধারণ সম্পাদক বাবু সমর চৌধুরীও ছিলেন। যিনি পরবর্তীতে ত্রিপুরার মূখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। উনাকে অবশ্য আটক করা হয়নি। প্রতি পদে পদে আওয়ামী লীগের ইন্ধনে কংগ্রেস সরকার ভারতে তাঁর অবস্থানকে দুরুহ করে তুলে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে তাঁর মাতার দাম ১০ হাজার টাকা। পাক সামরিক জান্তা তাঁকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে নগদ ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। সেই সব দুঃসহ দিনগুলোতে তাঁর সাথে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। 
লাখো শহীদের আত্মত্যাগ আর অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে রক্ত সাগর পাড়ি দিয়ে বহু কাংখিত স্বাধীনতা অর্জিত হয়‘৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্যদিয়ে। দেশ স্বাধীন হবার পর উনার মধ্যে দেকতে পাই এক ধরনের উঃকণ্ঠা। পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পনের সময় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জেনারেল অরোরার সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর অনুপস্থিতি। দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবস্থান ও তাদের ব্যাপক লুটপাঠ। তাঁরা কবে বাংলাদেশ থেকে যাবে এ ব্যাপারে কোন নিশ্চয়তা না থাকা। এ সব বিষয়ে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। উনার নির্দেশে  ১৪ই জানুয়ারী‘৭২ এ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস্ ব্লক এক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাধীনতা বরণ উৎসব পালন করে এবং যথা শীঘ্র সম্ভব সারাদেশে মুক্তি যোদ্ধাদের হাতে ছড়িয়ে থাকা অস্ত্র উদ্বার এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ফেরৎ পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য শেখ মুজিবের প্রতি আহবান জানালাম। ভারতীয় সেনাবাহিনীর লুটপাটের বিরুদ্ধে, এবং তাদের ফেরৎ পাঠানোর জন্য তিনি সোচ্চার হলেন। 
আওয়ামী লীগের লুটপাট, স্বজন প্রীতি, দুর্নীতি, আইন শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতার সুফল ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি “আজাদ বাংলার” ডাক দেন। আওয়ামী শাসনামলে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, ছিলাম পিন্ডির অধীনে হয়ে গেলাম দিল্লীর অধীন। তাই তিনি ডাক দিলেন “দিল্লী নয় ঢাকা।” 
’৭৩ এর সাধারন নির্বাচনে তাঁর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে দেখেছি যে কিভাবে মিডিয়া ক্যু’-এর মাধ্যমে জয়কে পরাজয়ে রূপান্তরিত করা যায়। রাত ১২টার পর যখন তিনি তার প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী থেকে ২৬ হাজার ভোটে এগিয়ে ব্রাহ্মনবাড়ীয়া নির্বাচন কমিশন অফিসে বসে সকলের সামনে টেলিভিশনে ঘোষণা শুনলাম যে তিনি ১০ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছেন। এ অভিজ্ঞতা আমার সারা জীবনেও ভুলতে পারিনি। আমি এ খবর শুনে চরম উত্তেজনায় দিক বিদিক জ্ঞানশূন্য। এমতাবস্থায় কাজী পাড়ায় স্নেহ্ননিড়ে গিয়ে উনাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে এ খবর জানাতে উনি নিরুত্তাপ কণ্ঠে শুধু বললেন “এখন গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন এর পরিণাম তাঁরা ভোগ করবে”। আমি বললাম মামলা করবো, তিনি বললেন কোন লাভ হবে না। 
ছাত্র রাজনীতির সাথে যারা জড়িত তাদের লেখাপড়ার ব্যাপারে তিনি খুব সচেতন। এ ব্যাপারে তিনি কোন ছাড় দিতেন না। আমাদের বলতেন শুধু চুংগা ফুকলে চলবেনা সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত হতে হবে। লেখা পড়া না করে রাজনীতি করে নেতা হলে দেশের জন্য কোন মঙ্গল হবে না। অশিক্ষিত নেতৃত্ব দেশকে অতলে নেয়া ছাড়া কিছু দিতে পারে না। সংগঠনের কাজে অনেক সময় সন্ধার পর পার্টির অফিসে দেখলেই ডেকে বলতেন কি ছাত্রনেতা লেখাপড়া ফেলে এখানে কি করছেন? লেখাপড়া না শিখলে দেশকে কিছু দিতে পারবেন না। ব্রাহ্মবাড়ীয়া আমার নিজের এলাকা। জাতীয় লীগের কমিটি হবে। আমি সংগত কারনেই একদিন আগে চলে গেলাম। সার্কিট হাউসে রাতে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে তিনি আলাপ আলোচনা করেছেন কমিটি গঠনের ব্যাপারে। এক পর্যায়ে তিনি আমাকে দেখে রেগে একেবারে আগুন। বললেন লেখাপড়া ফেলে এখানে কি? আপনি ছাত্রনেতা আপনার তো এখানে কোন কাজ নেই। ছাত্রদের হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না। অথচ নুতন দলের কমিটি গঠনে নেপথ্যে আমারও একটা ভুমিকা ছিল। কিন্তু তিনি আমার উপস্থিতি মেনে নিলেন না। 
মুজিব-ইন্দিরা স্বাক্ষরিত ২৫ বৎসর মেয়াদী বাংলা ভারত মৈত্রী চুক্তির বিরুদ্ধে তিনি অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি এই চুক্তিকে দিল্লির দাসত্ব বলে অভিহিত করেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদের ক্রীড়নক আওয়ামী সরকারের ভারতীয় স্বার্থ সংরক্ষন ও তাবেদারীর বিরুদ্ধে তিনি ব্যাপক আন্দোলন শুরু করেন। পারিপার্শ্বিক অবস্থায় তিনি মনে করেন যে লোখো মানুষের আত্ম বলিদান আর অসংখ্য মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা পিন্ডির কবল থেকে ছিনিয়ে এনেছিলাম, ভারতীয় সেবাদাস আওয়ামী চক্রের মাধ্যমে তা দিল্লীর অধীনে চলে গেছে। তাই তিনি ডাক দিলেন দিল্লি না ঢাকা। দিল্লির কবল থেকে দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করতে তিনি দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিলেন ‘আজাদ বাংলা’ কায়েমের আহবানের মাধ্যমে। 
সরকারের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি তার আজাদ বাংলার ডাক সারা দেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিলেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ’ পত্রিকা ও তাঁর সংগঠন বাংলা জাতীয় লীগের কার্যক্রমের মাধ্যমে। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে তিনি মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর সাথে জাতীয় যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। 
অবস্থা এমন দাঁড়ায় একদিকে ‘৭৪ এর দূর্ভিক্ষ, বিপর্যস্ত অর্থনীতি, আইন শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, সন্ত্রাস আর ছিনতাই, খুন রাহাজানী, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, এমনিতর অরাজক পরিস্থিতিতে দেশবাসী বিপর্যস্ত, আওয়ামী সরকার দিশেহারা। শেখ মুজিব প্রকাশ্য জনসভায় বলতে বাধ্য হচ্ছেন “আমার চারদিকে পা’চাটা আর চোরের দল”। রাজনৈতিক আন্দোলনকে দমনের লক্ষ্যে বিশেষ ক্ষমতা আইন জারী, দেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা এতদসত্বেও তারা পার পেলেননা। তাদের সমস্ত ব্যার্থতাকে ঢাকার জন্য আত্মরক্ষা ও আজীবন দেশকে নিজেদের গোলাম বানিয়ে শাসন করার ব্যর্থ প্রয়াসে সকল নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে সংসদে মাত্র ১৩ মিনিটে সংবিধান সংশোধন করে একদলীয় ‘বাকশাল’ রাজত্ব কায়েম করে। সমস্ত রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হলো। সমস্ত পত্র পত্রিকাকে বন্ধ করে দিয়ে মাত্র ৪টি পত্রিকাকে সরকারী মালিকানায় চালু করা হলো। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার এই শংকাকুল দুর্বিষহ অবস্থা দেশবাসী মেনে নিতে পারছিলনা। তাদের মধ্যে একধরনের ভয়মিশ্রিত চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। আওয়ামী বাকশালী চক্র আজীবন দেশের মানুষকে গোলাম বানিয়ে শাসন করার দুর্বিনীত অভিলাশে অক্টোপাশের মতো গোটা দেশকে গ্রাস করার প্রক্রিয়ায় নিরলস কার্যক্রম চালিয়ে যেতে লাগলো। 
কিন্তু এই আমাবস্যার ঘোর অন্ধকারের মাঝে হঠাৎ আলোর ঝলকের মতো ‘৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট সোবেহ সাদেতে এদেশের দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনীর কতিপয় অকুতোভয় সূর্য সন্তান নিজেদের জীবনকে বাজী রেখে সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে এক বিয়োগান্তক ঘটনার মধ্যদিয়ে শাসন ক্ষমতার ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটায়। ক্ষমতার এই পট পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বাকশালের পতনের সাথে সাথে অবরুদ্ধ গণতন্ত্রের দ্বার উম্মোচিত হয়। জাতি আবার তার কাংখিত গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পায়। রুশ-ভারত অক্ষশক্তির প্রাথমিক পরাজয় ঘটে এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও তার দোসরদের অবস্থাও তথৈবচ। তারা পর্দার অন্তরালে ঘাপটি মেরে থাকে। পটপরিবর্তনোত্তর খন্দকার মোশতাক আহমদ সরকার অলি আহাদকে কারাগার থেকে মুক্তি দেন আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ফিরে আসে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, আস্সালামুআলাইকুম ও বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। 
তিনি ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের ফলশ্রুতিতে আধিপত্যবাদ বিরোধী সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যদিয়ে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠায় একমনাদের নিয়ে একটি ব্যপক ভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের বাস্তবতা অনুধাবন করেন। 
আধিপত্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ আর সম্প্রসারনবাদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য, এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ়প্রত্যয়ে খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে তিনি নিজ দল বাংলা জাতীয় লীগকে অবলুপ্ত করে ডেমোক্রেটিক লীগ গঠন করেন। এদিকে বিচারপতি আবু সাদাত মোঃ সায়েমকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় বসলেন। এক পর্যায়ে ডেমোক্রেটিক লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। দলী প্রধান খন্দকার মোশতাক, সাধারন সম্পাদক শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদত কে, এম, ওবায়দুর রহমান প্রমুখকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন এবং মশিউর রহমান (যাদু মিয়া), কাজী জাফর আহমদ ও মওদুদ আহমদসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের মন্ত্রীত্ব ও অন্য সুযোগ সুবিধা দিয়ে তিনি তাদেরকে তাঁর কাছে টানলেন। জনাব অলি আহাদকেও জেনারেল জিয়া অনেক লোভনীয় প্রস্তাব দেন তাঁর সরকারে অংশ গ্রহণের জন্য কিন্তু জনাব অলি আহাদ তা প্রত্যাখ্যান করেন। 
জনাব অলি আহাদ ১৫ই আগষ্টের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনকে জাতির জন্য ‘নাজাত’ মনে করতেন। তাই তিনি দলের অভ্যন্তরে মতদ্বৈততা সত্ত্বেও ১৫ই আগষ্ট কে ‘নাজাত’ দিবস হিসেবে পালন করেন। 
২৩শে মে ১৯৮০ সালে বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত ডেমোক্রেটিক লীগের প্রথম ঐতিহাসিক লাখো মানুষের সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়। এ হামলার জন্য অলি আহাদ আওয়ামী বাকশালী চক্রকে দায়ী করেন। আর দলীয় প্রধান খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াকে দায়ী করেন। আমার মনে হয় এর পর থেকেই খন্দকার মোশতাক সাহেবের সাথে অলি আহাদ সাহেবের সতদ্বৈততা শুরু হয়। এরপর আমরা দেখলাম রহস্যজনকভাবে খন্দকার মোশতাক সাহেব সংগঠনের কার্যক্রমে এমন ভূমিকা পালন করতে লাগলেন যাতে করে সংগঠনের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হতে লাগলো। অলি আহাদ সাহেব সংগঠনিক কার্যক্রমকে যতই জোরদার করার মাধ্যমে আন্দোলনে গতি সঞ্চার করতে চাইতেন- বিভিন্নভাবে তিনি বাধাগ্রস্থ হতে লাগলেন। 
৩০শে মে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে দেশে সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়। সেই অবস্থায় আমরা অলি আহাদ সাহেবকে দেখেছি সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষাকল্পে সমস্ত রাজনৈতিক দলসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার সাহেবের সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তৎকালীন সেনা বাহিনীর প্রধান হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ বিদেশী সাংবাদিকদের নিকট রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন। যা নাকি সম্পূর্ণ বে-আইনি এবং সেনাবাহিনীর চাকুরী বিধিমালা ও শৃঙ্খলা পরিপন্থি। সেনা শাসন বিরোধী জনাব অলি আহাদ এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে সেনাপ্রধান এরশাদের বিরুদ্ধে তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে চাপ প্রয়োগ করেন। অথচ কিছু দিনের মধ্যেই দেখা গেল সাত্তার সাহেবকে সরিয়ে জেনারেল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এরশাদ সাহেব ক্ষমতা দখল করার আগে জনাব অলি আহাদ সাহেবের সমর্থন চেয়েছিলেন বিনিময়ে ওনাকে বিশেষ পদে অসীন করার প্রলোভনও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ঘৃনাভরে তিনি সে প্রলোবন প্রত্যাখ্যান করে জেনারেল এরশাদকে বলে দিয়েছিলেন যে, যদি বাংলাদেশের সমস্ত লোকও তাঁকে সমর্থন করে সেক্ষেত্রে একজন ব্যতিক্রম থাকবে সে হচ্ছে অলি আহাদ। কোন উচ্চাভিলাশী ক্ষমতালোভী সেনা কর্মকর্তার উচ্চাভিলাশকে তিনি অতীতে যেমনি প্রশ্রয় দেননি এখনো দিবেন না। তার বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন করে যাবেন। এরশাদ সাহেব ক্ষমতা দখলের পরও বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে জনাব অলি আহাদকে ক্ষমতায় অংশ গ্রহণের জন্য রাজী করানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হন। অলি আহাদ সব সময়ই ঐ সমস্ত প্রস্তাব ঘৃনাভরে প্রত্যাখ্যান করতেন। তিনি সামরিক আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও ইত্তেহাদের মাধ্যমে লেখনী চালিয়ে যান। অতঃপর এরশাদ ক্ষীপ্ত হয়ে উত্তেহাদের প্রকাশনা বন্ধ করে দেন এবং তাঁকে গ্রেফতার করে সামরিক আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। 
শেরে বাংলা নগরে বিশেষ সামরিক আইন আদালতে তার বিচার অনুষ্ঠিত হয়। শুনানীর দিনগুলোতে আমরা সেখানে যেতাম। সামরিক আদালতে বন্দি অলি আহাদ সাহেব একটি জবানবন্দি দেন। ইংরেজীতে লিখিত নাতিদীর্ঘ ঐ জবানবন্দিটি ছিল একটি ঐতিহাসিক দলিল। 
উক্ত জবানবন্দিতে তিনি সামরিক আইন ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে এমন সমালোচনা করেন যা শুনে আমরা ভীত সম্ভস্ত্র হয়ে গেলাম। আমাদের রাজনৈতিক সহকর্মী প্রয়াত এডভোকেট আবদুল আহাদ মিয়া রসিকতা করে বরেণ যে এই জবানবন্দিতে তিনি যতগুলো সামরিক আইনের ধারা লংঘস করেছেন তার বিচার হলে অন্তত ৩৬৫ বৎসর জেল হবে আর ১ কোটি টাকার উর্ধ্বে জরিমানা হবে। আমরা দেখরাম কঠিন কঠিন সব ইংরেজী শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে বজ্রনিগূঢ় কন্ঠে পিন পতন নিরবতায় সামরিক আদালতে দাঁড়িয়ে নির্ভকচিত্তে অবলীলায় জেঃ এরশাদ আর তার সামরিক আইনের চৌদ্দ গোষ্ঠি উদ্ধার করে তার জবানবন্দি পাঠ করে যাচ্ছেন। এরকমটি একমাত্র অলি আহাদকে দিয়েই সম্ভব। আরো মজার ব্যাপার হলো সামরিক সরকার কিন্তু অলি আহাদ সাহেবকে সাজা দিতে সাহস করেন নি। বেম কিছুদিন কারাগারে আটক রাখার পর সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। 
এক পর্যায়ে দলের সাধারণ সম্পাদক শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন দলের একাংশ নিয়ে দল ত্যাগ করেন এবং পরবর্তীতে এরশাদ সাহেবের মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেন। খন্দকার মোশতাক সাহেবের সাথে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিষয়ে মতদ্বৈত্বতার কারনে বিশেষ করে খন্দকার মোশতাক সাহেবের রহস্যজনক ভুমিকার কারনে একসাথে দল চালানো জনাব অলি আহাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠে। তাই তিনি আলাদা অবস্থান গ্রহণ করেন এবং মোশতাক সাহেবকে বাদ দিয়ে ডেমোক্রেটিক লীগকে আলাদাবাবে পুণর্গঠিত করেন। আজো পর্যন্ত তিনি ডেমোক্রেটিক লীগ নিয়েই আছেন। বহু পূর্বেই খন্দকার মোশতাক আহমদের ডেমোক্রেটিক লীগের বিলুপ্তি ঘটেছে। 
রত্মগর্ভা মায়ের সন্তান অলি আহাদ। যারা তিন তিনটি ভাই সি,এস,পি একভাই বিজ্ঞানী। তিনি নিজে বি,কম এ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করা সত্ত্বেও আপোষহীন রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার কারনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিরদিনের জন্য বহিস্কৃত হন। তরুন বয়সে পাকিস্তান আন্দোলন থেকে শুরু করে বর্তমানে সত্তুর উর্ধ্ব প্রবীণ বয়সেও যিনি দেশের কল্যাণ চিন্তায় রাজনীতিতে প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় করেন। সেই তিনি ব্যক্তি জীবনে ঢাকা শহরে একটুকরো জমিরও মালিক হতে পারেননি। বলা যায় হতে চেষ্টা করেননি। উপরন্ত সর্বকালের সরকার বিরোধী আপোষহীন রাজনীতির কারনে তাঁর পরিবারকে চরম খেসারত দিতে হয়েছে। সি,এস,পি ভাইয়েরা যোগ্যতা থাকা সত্বেও যুগ্ম সচিবের উপরে পদোন্নতি পাননি। যোগ্যতা থাকা সত্বেও বিজ্ঞানী ভাই ডঃ করিম কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলর হতে পারেননি। স্ত্রী প্রফেসর রাশিদা বেগম (সাবেক ডি,জি, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা) সচিব হতে পারেননি। তাঁর গোটা পরিবারকেই রাজরোষের শিকার হতে হয়েছে। এতে তাঁর আক্ষেপ থাকলেও ভ্রুক্ষেপ নেই। 
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জীবন্ত কিংবদন্তী জনাব অলি আহাদ তাঁর স্পষ্ট ভাষন আর অপ্রিয় সত্য উচ্চারণের কারনে অনেকের কাছেই তিনি গ্রহনযোগ্য নন। তাঁকে এড়িয়ে চলতে সকলেই সচেষ্ট। তাঁর এই সত্যনিষ্ঠ নির্ভীকতা, স্পষ্টবাদিতা আর নির্ভেজাল স্বচ্ছতাই তাঁকে একলা চলতে বাধ্য করে। স্বার্থের ঠুলিপড়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাঁকে ভয় পায়। জাতীয় রাজনীতিতে তিনি তাই মনের মাধুরী মিশিয়ে অবিভাবকের মতো সকলের ত্রুটি বিচ্যুতি আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেন। যারা সরকার পরিচালনা করেন কিংবা বিরোধী দলে অবস্থান করেন কাউকে তিনি ছাড় দেননা। তাইতো আমরা দেকি যে, তাঁর রাজনৈতিক মিত্র বলে যারা পরিচিত তাদের সম্পর্কেও কুণ্ঠাহীন ভাবে স্পষ্ট সত্য উচ্চারণে রাখ-ঢাক করেন না। এমনি করেই তাঁর সারাজীবনের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে- তাঁর কাছে কোন বিশেষ ব্যক্তি বা দল বড় নয় বড় হচ্ছে দেশ ও জাতি। ত্যাগ তিতিক্ষার কষ্ঠিপাথর যাচাইয়ে দেশ প্রেমের কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ তিনি একজন সাচ্চা দেশ প্রেমিক জাতীয়তাবাদী নেতা। তাইতো আমরা দেখি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয়নেত্রী থাকা কালে জনাব অলি আহাদকে জাতীয়ভাবে সম্বর্ধনা দেন। জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সেই সম্বর্ধনা সভায় বেগম খালেদা জিয়া “অলি আহাদকে “জাতির বিবেক” হিসেবে আখ্যায়িত করেন আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ বলেন অলি আহাদের জন্ম না হলে ভাষা আন্দোলন সফল হতো না, বাংলাদেশও স্বাধীন হতো না।” আমাদের জাতীয় ইতিহাসে তাঁর নামটি স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। আগামী প্রজন্ম তাঁকে অনুসরন ও অনুকরন করবে। ইতিহাস তাঁকে সেখানেই নিয়ে যাবে। পরম করুনাময়ের কাছে আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য আর দীর্ঘায়ু কামনা করি। কামনা করি তিনি যেনো সুস্থ শরীরে জাতির এই দুর্দিনে কান্ডারী হতে পারেন। জাতিকে দিক নির্দেশনা দিতে পারেন। 
[এহসানুল হক সেলিম মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ]