ভাষা আন্দোলনের ইতহাস বিকৃতকরণ ও তার নায়কেরা -বদরুদ্দীন উমর

ফন্ট সাইজ:
[১৯৯৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী কোলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় এই নিন্ধটি প্রকাশ হওয়ার পর শেখ হাসিনা সরকার পত্রিকার ঐ সংখ্যাটি বাংলাদেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।]
 
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাস ছিল এক অবিস্মরণীয় গণজাগরণ, গণআন্দোলন এবং অভ্যুত্থানের মাস। ১৯৫৩ সাল থেকেই ২১শে ফেব্রুয়ারী এই গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পালিত হয়েছে। কিন্তু ১৯৭২ সাল থেকেই এখানে শুরু হয়েছে, অন্য এক প্রক্রিয়া, যার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এই ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাস পরিণত হয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবসায়ী এবং মতলববাজ বুদ্ধিজীবীদের বাণিজ্যিক উৎসবে। এ জন্যেই আমরা যারা পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলনের বিস্তারিত তথ্যের সাথে পরিচিত, যারা তথাকথিত ভাষা সৈনিক না হলেও ভাষা আন্দোলনকে নিজেদের অভিজ্ঞতায় প্রত্যক্ষভাবে দেখেছি, তাদের জন্য এই বাণজ্য উৎসব, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিস্ময়কর না হলেও, যথেষ্ট পীড়াদায়ক। 
এই পীড়ন গত কয়েক বছর ধরে বেশী মাত্রায় চলছে এবং নিয়মিতভাবে এর মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজকের দৈনিক সংবাদপত্রের পাতায় ‘এ মাসে ভাষা সৈনিক ও রাজবন্দিদের সম্মেলন’ শীর্ষক এক খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হচ্ছে যে, “মহান ভাষা আন্দোলনে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য” সরকার নিয়ন্ত্রিত শিল্পকলা একাডেমীতে “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসনী, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ ২১ জন ব্যক্তিত্বকে জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানের জন্য” এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এই সম্মেলনের আহ্বায়কদের মধ্যে দুই একজন আছেন একুশে ফেব্রুয়ারীর আন্দোলনের সময় যাঁদের একটা প্রান্তিক ভূমিকা ছিল। কিন্তু সেই প্রান্তিক ভূমিকা তাঁদের নির্লজ্জ এবং অবাধ আত্মপ্রচারণা এবং প্রধান প্রচার মাধ্যমগুলি কর্তৃক তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে এই প্রচারকে এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়মিত ব্যাপারে দাঁড় করানোর ফলে, এই সব মিথ্যার অবাধ পরিমাণগত বৃদ্ধি মিথ্যার গুণগত পরিবর্তন সাধন করে তাকে প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে অপরিচিত লোকদের কাছে, বিশেষতঃ নতুন প্রজন্মের কাছে, উপস্থিত করছে এমন এক পরম সত্য হিসেবে, যে "সত্যের" বিরোধিতা বাঙলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শুধু যে সাধারণভাবে মূল্যহীন তাই নয়, অনেক দিক থেকে রীতিমতো বিপজ্জনক। 
এ তো গেল বর্তমান ‘ভাষা- সৈনিক’ নামে আত্মপ্রচারে লিপ্ত ব্যক্তিদের কথা। এবার আসা যেতে পারে “ভাষা আন্দোলনের অবিস্মরণীয় অবদানের চন্য” যাদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানের কথা বলা হয়েছে তাঁদের প্রসঙ্গে। যে তিনজন নাম এব্যাপারে ঘোষণা করা হয়েছে তাঁদরে মধ্যে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য অবশ্যই স্মরণযোগ্য। কিন্তু অন্য দুইজন অন্য কারণে স্মরণযোগ্য হলেও ভাষা আন্দোলনে “অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য” স্মরণযোগ্য, একথা ঠিক নয়। 
প্রথমত মওলানা ভাসানীর কথা। ঢাকার বার লাইব্রেরীতে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠনের জন্য ৩১শে জানুয়ারী ১৯৫২ তারিখে যে সভা হয় তাতে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু এই সভাপতিত্বের পর তাঁকে আর আন্দোলনে দেখা যায় নি। ২০শে ফেব্রুয়ারী ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয় তাতে সভাপতিত্ব করেন নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক (১৯৪০-৪৭) আবুল হাসিম। এ কারণে, ২৫শে ফেব্রুয়ারী তাঁকে গ্রেফতার করে ১৯৫৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত সিলেট ও ঢাকা জেলে বিনা বিচারে আটক রাখা হয়। 
১৩ই মার্চ মওলানা ভাসানীর নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হয় এবং ১০ এপ্রিল তিনি ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আত্মসমর্পন করেন। এই ভুমিকার কারণে ভাষা আন্দোলনে মওলানা ভাসানীর “অবিস্মরণীয় অবদানের” কথা বলার অর্থ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিষয়ে মুর্খতা অথবা নির্ভেজাল রাজনৈতিক মতলববাজী। এখানে আবার বলা দরকার যে, ভাষা আন্দোলনে মওলানা ভাসানীর অবদান ৩১শে জানুয়ারীর সভায় সভাপতিত্ব করার বেশি কিছু না হলেও, এ দেশের রাজনীতিতে তাঁর অন্য অবদান ও ভূমিকার জন্য তিনি অবশ্যই স্মরণীয়। এ দুই বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার মধ্যে কোন ইতিহাস জ্ঞান অথবা সত্যনিষ্ঠা নেই। 
শেখ মুজিবর রহমানের ক্ষেত্রে একথা আরও সত্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে কার্যতঃ তাঁর কোনও সম্পর্ক ছিল না। ১৯৪৯ সালের ১১ই অক্টোবর ঢাকার আরমানীটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে তৎকালীন খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষাবস্থার প্রতিবাদে এক জনসভা হয়। সেই সভায় ভাসানী ছাড়া শেখ মুজিবর রহমানসহ আরও অনেকে বক্তৃতা করেন। জনসভায় যথেষ্ট উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং তারপর মিছির বের হলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশ মওলানা ভাসানী, তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবর রহমানসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। এইভাবে ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে গ্রেফতার হয়ে শেখ মুজিব ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি লাভ করে ১৯৫২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী, যে সময়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকারীদেরকে বিপুল সংখ্যায় গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র অনেক সদস্য আত্মগোপন কের আছেন। এই পরিস্থিতিতে জেল থেকে শেক মুজিবর রহমানের মুক্তি লাভ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, তৎকালীন ভাষা আন্দোলনে তাঁরও কোন ভূমিকা ছিল না এবং আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে মুক্ত দেওয়াটা সরকার নিজেদের জন্য অসুবিধাজনক বা বিপজ্জনক কিছুই মনে করেনি। 
কিন্তু শেখ মুজিবের কোন ভূমিকা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ দল এবং তাদের অনুসারী বুদ্ধিজীবীরা তাঁকে সেই আন্দোলনের নেতা, এমনকি মূল নেতা হিসেবে আখ্যায়িত ও প্রচার করে আসছে। এবং তাদের সেই প্রচার এখন এক ভয়ঙ্কর কুৎসিত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। ওপরে তাঁর “অবিস্মরণীয় অবদানের” জন্য তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানের কথা যেভাবে বলা হয়েছে তার মধ্যেই এই কুৎসিত মিথ্যার একটা পরিচয় পাওয়া যায়। 
এই মিথ্যা যে শুধু অন্যেরাই প্রচার করেছে তাই নয়। ১৯৭২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী এক টেলিভিশন প্রোগ্রামে তিনি নিজেই একথা বলেন। আমি অবাক বিস্ময়ে তাঁর মুখ নিঃসৃত কথা টেলিভিশনে শুনে এবং আমার লেখায় তার প্রতিবাদ করি। কিন্তু মিথ্যার বাহবা ধ্বনি এই প্রতিবাদের দ্বারা স্তব্ধ হওয়ার কোন অবস্থা তখন ছিল না, এখনো নেই। 
এ প্রসঙ্গে শেখের বক্তব্য ছিল এই যে, ভাষা আন্দোলন চলাকালীন অবস্থায় কিছুতা অসুস্থ হলে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হলে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে। সেইভাবে হাসপাতালে থাকার সময় সেখানকার পায়খানার জানালা থেকে কাগজের চিরকুট ছুঁড়ে ছুঁড়ে তিনি ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান এবং সে আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন। তাই যদি হয় তাহলে ১৯৫২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী তৎকালীন নূরুল আমিন সরকার তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দেয় কীভাবে? যিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পায়খানার গবাক্ষ থেকে ভাষা আন্দোলন পরিচালনা করছিলেন তাঁকে কীভাবে সেই সংকটজনক সময়ে সরকার মুক্তি প্রদান করলো? এ রাজনৈতিক মারফতী বা আধ্যাত্মবাদের মহিমা বোঝা আমাদের মতো ক্ষুদ্র বুদ্ধিসম্পন্ন লোকদের কর্ম নয়। 
দ্বিতীয়তঃ সে সময় শেখ মুজিব নেতৃস্থানীয় আওয়ামী লীগারদের মধ্যে একজন হলেও আওয়ামী লীগের মধ্যে তখন ভাসানী, শামসুল হক, নারায়ণগঞ্জের ওসমান আলীসহ অন্য নেতারাও ছিলেন এবং শেখের এমন অবস্থা ছিল না যাতে তিনি তৎকালে ওই রকম এক আন্দোলন নেতৃত্ব দিতে পারতেন। বস্ততঃপক্ষে সে সময়ে আওয়ামী লীগের নিজেরাই তেমন কোনও রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তি ছিল না। সে কারণে আওয়ামী লীগের কোন মুখ্য তো  নয়ই, এমনকি কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও যে সে আন্দোলনে ছিল এমন বলা চলে না, যদিও তাদের মুসলিম ছাত্র লীগের বিভিন্ন স্তরের কিছু কর্মী ও নেতা তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে সব থেকে সক্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল নারায়ণগঞ্জের খান সাহেব ওসমান আলীর। এ কারণে তাঁর ও তাঁর সমগ্র পরিবারের ওপর যে নির্যাতন হয়েছিল সেটা অন্য কারও উপর হয়নি। 
পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিষ্ট পার্টি ২০শে ফেব্রুয়ারী সন্ধা রাত্রের ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’র বৈঠকে তাদের প্রকাশ্য প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ২১শে তারিখে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরোধীতা করে। তাদের দিক থেকে সে সময় এই বিরোধীতার যুক্তি সঙ্গত কারণ ছিল। ১৯৪৮-৫০ সালে রণদিবে লাইনের হঠকারিতা এবং তার পরিণতিতে পার্টি ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিপুল ক্ষতির কথা মনে রেখে স্বভাবত” কোনও পূর্ব প্রস্ততি ছাড়া ওই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহনের বিষয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের কৃতিত্ব ছিল এই যে, ২১শে ফেব্রুয়ারী ছাত্রেরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পর যে পরিস্থিতির উদ্ভব হল সে পরিস্থিতির ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে তারা সঙ্গে সঙ্গেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। আন্দোলনের সমর্থনে তখন মউিনিষ্ট পার্টিই গোপনে সব থেকে অধিকসংখ্যক লিফলেট ছেটে প্রকাশ করে। এ ব্যাপারে পার্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ছাত্রকর্মী হিসেবে হাসান হাফিজুর রহমান যথেষ্ট কাজ করেন। সেই লিফলেটগুলি বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত [আমার দ্বারা সম্পাদিত ‘ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গঃ কতিপয় দলিল’-এর দ্বিতীয় খণ্ডে ছাপা হয়েছে।]
কমিউনিষ্ট পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে ‘যুবলীগ’ই সে সময় সাংগঠনিকভাবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যদিও একথা বলা যাবে না যে, তৎকালীন আন্দোলন কোনও একটি সংগঠন অথবা কোনও একজন সেতার পরিচালনাধীন বা নেতৃত্বাধীন ছিল। কিছু সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তখনকার ভাষা আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ততার দিকটি ছির খুবই উল্লেখযোগ্য, তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী। একথা বলার অর্থ, সেই আন্দোলনে সব কিছু ছাড়িয়ে জনগণের ভূমিকা শহর থেকে গ্রামঞ্চল পর্যন্ত সর্বত্রই ছিল সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে পূর্ব বাঙলার গনহণই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত নায়ক। [এ কারণেই আমি নিজে তিন খণ্ডে প্রকাশিত ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ তাঁদের উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করেছি] 
‘পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ’ সাংগঠনিকভাবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কারণেই সেই সংগঠনের নেতা ও কর্মীদের সক্রিয়তা ছিল সব থেকে বেশী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন যবলীগের দুই সহ-সভাপতি মহম্মদ তোয়াহা ও নারয়ণগঞ্জের শামসুজ্জোহা, সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ, দুই যুগ্ম সম্পাদক ইমাদুল্লাহ ও মহম্মদ সুলতান প্রভৃতি। পাবনার আবদুল মতিনের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। এঁদের মধ্যে আবার যদি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে একজনের নাম করতে হয় তাহলে তিনি হলেন, অলি আহাদ। বর্তমানে তাঁর নাম এখন সব থেকে গুরুত্বূর্ণ ‘ভাষা সৈনিক’ হিসেবে কেউ করে না। কিন্তু একজনের বর্তমান অবস্থা দেখে তার অতীত ভূমিকার বিচার কোনও যোগ্য ঐতিহাসিক এবং ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিই করবেন না। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমাকে যে চিঠি দেন সেই চিঠির লিখিত বক্তব্য থেকে আমি একটা অংশ উদ্বৃত করছি। চিঠিটি তিনি আমাকে লিভেছিলেন অলি আগাদ তাঁর এক রাজনৈতিক আত্মজীবনীমূলক বইয়ে তাঁর সম্পর্খে একটি ব্যাপারে অন্যাভাবে দোষারোপ করার পর প্রকৃত ঘটনার বর্ণনা প্রসঙ্গে। তিনি তাতে লেখেন, “জেল থেকে বেরিয়ে অলি আহাদ আমাকে বলেন যে, গোলাম মাহবুবের কথায় তাঁর আমার সম্পর্কে সন্দেহ হয়েছিল এবং এই মিথ্যে সন্দেহের জন্য তিনি আমার কাছে মাফও চান। এখন শুনছি, তাঁর স্মৃতিকথায় আমার সম্পর্কে একটা বক্রোক্তি আছে। অলি আহাদদের পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মপস্থা সম্পর্কে আমার তীব্র বিরাগ থাকলেও ভাষা আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বের জন্য আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি। প্রকাশ্য তাঁর নাম বহু সভায় বলেছি- যখন তাঁর কথা ভুলে সবাই শেখ মুজিবের নাম বলছিলেন।” 
আনিসুজ্জামান শেখ মুজিবের প্রতি “শত্রুভাবাপন্ন” নন। শেখ মুজিব বরং তাঁর একজন শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু আনিসুজ্জামানের এই বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, অলি আহাদ ও শেখ মুজিবের মধ্যে প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রাহ্য ভূমিকা কার ছিল। কাজেই শেখ মুজিবর রহমান পরবর্তী সময়ে এদেশের রাজনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলেই তিনি মাতৃজঠর থেকেই “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” ঃ“পূর্ব বাঙলা স্বাধীন করো” বলে কোন হুঙ্কার ছাড়েননি। কিন্তু এই হুঙ্কারই এখন তাঁর দলের লোকজন এবং তাঁদের সমর্থক এবং অনুগৃহীত বুদ্ধিজীবীর দর ছাড়ছেন। এই কাণ্ডকাখানার তুফানে এ ক্ষেত্রে যা কিছু সত্য সবই খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গল্পে পাশ্ববর্তী দুই গ্রামের মাষ্টারদের বিধ্যার লড়াইয়ের কথা। ম্যিথার ডাক-ঢোল, কাড়ানাকাড়া কীভাবে মিথ্যাকে সাধারণ অশিক্ষিত অথবা তথ্য সম্পর্কে অনবহিত লোকদের সামনে সত্য রূপে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, সেটাই হল, সেই গল্পের মর্মার্থ। প্রভাত মুখোপাধ্যায় দুই গ্রামের অশিক্ষিত লোকদের বৌদ্ধিক ও বিদ্যাগত দুরবস্থার যে কাহিনী সেখানে বর্ণনা করেছেন তার থেকেও করুণ দুরাবস্থা আজ সারা বিশ্বের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সব থেকে গৌরবোজ্জল ভূখণ্ড এই বাঙলার জনগণের। 
[বদরুদ্দীন উমরঃ বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, ‘স্বনামধন্য লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। লেখাটি লেখক সম্পাদিত মাসিক “সংস্কৃতি” সপ্তম বর্ষ সংখ্যা, মার্চ, ১৯৯৮ প্রকাশিত। এখানে নিবন্ধটি ভাষা আন্দোলনের অংশটি ছাপা হয়েছে]