ভাষা সৈনিক সুলতানের মতো অলি আহাদের মৃত্যু যেন ঢাকা মেডিকেলের বারান্দায় না হয় -বখ্তিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

ফন্ট সাইজ:

ছোট পার্টির পক্ষে বেমানান বিরাট বড় এক নেতা হয়ে রইলেন তিনি তিন দশক ব্যাপী। প্রথম জীবনে নাকি কমিউনিষ্ট আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন কিন্তু ছয় দশক থেকে তাকে দেখেছি সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলতে। বেসামরিক স্বৈরশাসককেরও তিনি কখনও মেনে নেননি। তার ছাত্রজীবনের গৌরবময় অধ্যায় ছিল বিপিসি রিপোর্ট এবং ভাষা আন্দোলনে তার বিপ্লবী ভূমিকা। সমগ্র আন্দোলনে তার তেজোদ্দীপ্ত ভূমিকা অনন্য বৈশিষ্টের দাবি রাখে। অলি আহাদের অনমনীয় ভূমিকার কারণে সেদিন ভাষা আন্দোলন থিতিয়ে পড়েনি বা সমঝোতার চোরাপথে হারিয়ে যাওয়াও সম্ভব হয়নি। অবশ্য অনমনীয় ভূমিকায় অলি আাহাদ একক ছিলেন একথা বলছি না তবে তিনি কার ভূমিকায় সোচ্চার ছিলেন। পেশা হিসেবে রাজনীতি এদেশে অত্যন্ত কঠিন। ন্যায় অন্যায়ের সাথে হাত ধরাধরি করে চলতে হয় যেন সুযোগ সুবিধা ভোগ করার পথ উম্মুক্ত থাকে আর না হয় নিতান্ত কণ্টকপূর্ণ পতে জীবন চলার পথ শেষ করে অসহায়ভাবে জীবনের পরিসমাপ্তির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আমাদের দেশের রাজনীতিতে এমন দু’একজন ট্র্যাজেডির নায়কের সাক্ষাত মেলে যারা ক্ষমতার লোভ আর কামিনীকাঞ্চনের মোজকে উক্ষেকা করেছেন চিরদিন, অলি আহাদ তাদের মাঝে অন্যতম। অলি আহাদের জীবনে নৈতিক বিচার সার্বত্রিক; সেখানে “যদি” বা “তবে”র স্থাস সেই। সম্ভবতো মরালিটির ব্যাপারে তিনি ইমানুয়েল কান্ট এর অনুসারী। তার জীবনে মনে হয় ম্যাকিয়াভ্যালির পাঠ নেওয়া সম্ভব হয়নি। অত্যাচার, উৎপীড়ন ইত্যাদির ভীতি অথবা সাময়িক লাভালাভের প্রশ্ন তাকে কোন দিন প্রভাবিত করতে পারেনি। তিনি যেটাকে নীতিগতভাবে সঠিক মনে করেছেন তাকেই অবলম্বন করে অগ্রসর হবার চেষ্ঠা করেছেন। তাই রাজনৈতিক মহলে তাকে নিয়ে কখনও অনিশ্চয়তা, সন্দেহ ইত্যাদির প্রশ্ন দেখা দেয়নি। অলি আহাদকে অনেকে কর্কশভাষী এবং দাম্ভিক বলে মনে করে থাকেন। মহৎ কাজে ফাঁকি চলে না একথায় যারা বিশ্বাস করেন তারা অনিয়ম দেখলেই গর্জে উঠেন। এটা দাম্ভিকতা নয়। ১৯৪৮ সালে কায়দে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে শামসুল হক ও অলি আহাদের কথা কাটাকাটি হয়েছিল। জিন্নাহ যখন অলি আহাদকে আঙ্গুল উঁচু করে বলেছিলেন, I know you. তার প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন। I Konw you are the governor general whom the queen of England can remove our appeal. এটা ছিল অলি আহাদের এক রকম সাহস আর নির্ভীকতা। এটা কোন অশালীন ঔদ্বত্য নয় কিংবা মস্তানিভাবের প্রকাশও নয়। এটা ছিল তার আত্মবিশ্বাস প্রসত এবং যে কোন পরিস্থিতিতে মেরুদন্ড খাড়া করে দাঁড়াবার শক্তি। ছাপ্পান্ন সালে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আর অলি আহাদ ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক। এ দূ’মহান ত্যাগী পুরুষের কর্ম প্রচেষ্টায় আওয়ামী লীগ বাংলার মাটিতে তৃণমূল পর্র্যায়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। মওলানা ভাসানী ছিলেন তখন সংগঠনের সভাপতি। সম্ভবত সেটা ছিল আওয়ামী লীগের স্বর্ণযুগ। তিন মহান জাতীয়তাবাদীর কর্মকৌশলে আওয়ামী লীগ তখন তার কর্মীবাহিনীকে স্বাধীনতা সংগ্রামের পাঠ দেয়া আরম্ভ করেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের মানসিক প্রস্ততির কাল মূলতঃ তখন থেকেই শুরু। বঙ্গবন্ধু এবং অলি আহাদের মাঝে বিরোধ ছিলো। অথচ এ দু’ত্যাগী পুরুষের ভিতর কোথাও যেন একটা গভীর মিল ছিল যা বারবার ঢাকা পড়ে গেছে গেছে খন্ডখন্ড বিরোধের কোলাহলে। সত্তরের নির্বাচনে যখন মওলানা ভাসানী এবং অলি আহাদ অনুধাবন করলেন জাতীয়তাবাদী ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়া কখনও ঠিক হবে না তখন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়কে নিশ্চিত করার জন্য তারা তাদের স্ব স্ব দলের সব প্রার্থীর প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেছিলেন। জলোচ্ছ্বাসের কথা বলা ছিল বাহানা মাত্র। সত্তরের নির্বাচনের পরে যখন আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে আসলো তখন মওলানা এবং অলি আহাদ সারাদেশে ন্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য মিটিং মিছিল আরম্ভ করে দিয়েছিলেন। যতটুকু মনে পড়ে স্বাধীনতার পক্ষে একা মওলানা ভাসানীয় ২৫শে মার্চের পূর্ব পর্যন্ত ৮৬টি জনসভা সমগ্র দেশে ঘুরে ঘুরে করেছিলেন। অলি আহাদও স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে তার সীমিত সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। অনেকের ধারণা, বঙ্গবন্ধুর পরামর্শেই মওলানা আর অলি আহাদ স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের কাজ আরম্ভ করেছিলেন। ১ মার্চ থেকে যখন বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন তখন অলি আহাদ পল্টনে জনসভা করে বঙ্গবন্ধুকে রেকোর্সের খোলা আকাশের নিচে পার্লামেন্টের অধিবেশন ডেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্যের সম্মতিক্রমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা ঘোষণা দেয়ার আহবান জানিয়েছিলেন। সে সভাটির কথা টিভিতে সেদিন খুবই গুরুত্ব সহকারে সচিত্র প্রচার করেছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর যে কয়জন নেতা ও দল সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল তার মাঝে অলি আহাদ এবং তার দল বাংলা জাতীয় লীগ অন্যতম। তার দলের ছাত্র সংগঠন ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্ট ব্লক এর কেন্দ্রীয় সভাপতি লুৎফর রহমানসহ বহু কর্মী স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। 

স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালীন সময়ে জামায়াতের নেতা গোলাম আজম বায়তুল মোকাররমের এক সমাবেশে অলি আহাদকে বঙ্গবন্ধুর চেয়েও জাতির জগন্যতম শত্রু বরে আখ্যায়িত করে তার খতনা করা হয়েছিল কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, পাঁচ দশকে অলি আহাদ যখন ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে যুবলীগ নিয়ে কাজ করছিলেন তাঁতী বাজারে মুসলীম লীগের গুন্ডারাও তার খত্না নিয়ে একই প্রশ্ন তুলেছিল। 
অলি আহাদ ছাত্র হিসেবেও মেধাবী ছিলেন। কিন্তু বি কম পাশ করার পর উচ্চশিক্ষা লাভ করা তার পক্ষে  সম্ভব হয়নি। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে এম কম ক্লাশে ভর্তি হতে সুযোগই দেয়নি। তার ভর্তি হওয়ার আবেদন প্রত্যাখান করার পর পাকিস্তান অবজারবার সম্পাদকীয় লিখেছিল। নাতিদীর্ঘ সম্পাদকীয়ের শেষাংশে বলা হয়েছিল।
“A student who has taken a rather prominent part in the battle of the scripts and also in the B.P.C. movement has been denied admission into the University. That is tantamount to denying the possibility of acquiring high academic distinction to this boy who stood first in the examination leading to his graduation”. অনাড়ম্বর জীবনে বিশ্বাসী অলি আহাদ চিরদিন রাজনৈতিক মিশনারী ওয়ার্ক বলে মনে করেছেন। তাই কখনও তিনি ক্ষমতার জন্য কোথাও আত্মবিক্রি করে বসেননি বা ক্ষমতার জন্য চোরাগলিতে ঘুরে বেড়ানোও তার স্বভাব ছিলো না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্ভবত তিনি ষ্পষ্টবাদিতার ও স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন কথা বলে রাজনীতি করার শেষ ব্যক্তিত্ব। তার তিরোধানের পর বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে শেষ পরিচ্ছন্ন মানুষটিরই অবসান হবে বলে আশংকা করি। অলি আহাদ তার দীর্ঘ জীবনের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে লিপিবদ্ধ করে যাবার তাগিদে “জাতীয় রাজনীতি ৪৫ থেকে ৭৫” নামে এক বই লিখেছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক এ গ্রন্থের প্রতিটি ছত্রে ছত্রে তার স্পষ্টবাদিতার ছাপ সুস্পষ্ট। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে তার মতামত প্রকাশ করেছেন সরাসরি যার সঙ্গে পাঠক একমত হতে পারেন নাও পারেন কিন্তু পাঠককে স্বীকার করতেই হবে যে তিনি ঘটনা বিশ্লেষণে নির্লিপ্ত ও লনর্বাক্তিকতার পরিচয় দিতে পেরেছেন খুবই দক্ষতার সাথে। ভাষা আন্দোলনে অলি আহাদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা সর্বজনবিধিত ঘটনা সে ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে নিয়ে কতিপয় বামপন্থি বিতর্ক দৃষ্টি করেছে বারবার। অথচ অলি আহাদ তার গ্রন্থে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। ঘটনাকে বাড়িয়ে বলা বা কাউকে ছোট করার জন্য ঘটনাকে  অথচ অলি আহাদ তার গ্রন্থে প্রকাশ পায়নি। অথচ তিনি বইটা রচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলে জেলখানায় বসে। শুধু গুণের সামর্থ্যে গুণীজনের পক্ষে সমাজে স্বীকৃতি পাওয়া ক্রমেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে। যারা সৎ এবং স্পষ্টভাষী তারা জীবন কাটান অবহেলার অন্ধকারে। দুনিয়া থেকে বিদায় নেন রিক্ত হস্তে। 
অলি আহাদ দীর্ঘ ১০/১১ বছর জেলখানায় ছিলেন। জিন্নাহ থেকে এরশাদ প্রত্যেকের কারাগারে থাকার সৌভাগ্য তার হয়েছে। মূলতঃ তার যৌবনের স্বর্ণদিনগুলো কেটেছে কারাগারের অন্ধপ্রকোষ্ঠে। আইয়ুবের জেলে থেকে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে তিনি তার বাবার শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন আর এশাদের জেলখানা থেকে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে তার গর্ভধারিনী জননীর শবযাত্রায় শরিক হয়েছিলেন। এ রকম বহু নির্মমতার শিকার হওয়াই ছিল অলি আহাদের রাজনৈতিক জীবনের বাস্তবতা। জীবনের মধ্যপথে এসে বিয়ে করেছেন। একটি মাত্র কন্যা সন্তান্ কোনো ঘর বাড়িও নেই শহরে। 
বর্তমানে অলি আহাদের বয়স সত্তর বছর। রোগে শোকে কাতর হয়ে পড়ে আছেন এলিফ্যান্ট রোডের বাসায়। দীর্ঘদিন ব্যাপি দূরারোগ্য রোগে ভুগছেন। বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন। একবার আলাপ প্রসঙ্গে বললেন, অর্থের সংকুলান হলে রিয়াদ হাসপাতাল যেতেন। আত্ম-সম্মানরোধ প্রকট সম্ভবত সে কারণে তার শেষ আকাঙ্কার কথা কাউকে বলতেই পারছেন না। একবার বললেন, মানুষের চিন্তার বিষয় মৃত্যু নয়। মানুষের চিন্তার বিষয় হচ্ছে অসম্মান। সুতরাং বুঝলাম এখনও আত্ম-সম্মানবোধ সম্পর্কে প্রচন্ডভাবে সতর্ক তিনি। রিয়াদ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে নিজে উৎসুক হলেও সে কথা হয়তো তিনি কাউকেও বলবেন না। 
ভাষা সৈনিক সুলতান দীর্ঘদিন রোগশোকে ভুগে অবশেষে ঢাকা মেডিবেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। অলি আহাদকে দেখে সে কথাই মনে পড়লো। অর্থ সম্বলহীন এ সংগ্রামী সিংহ শাবকটিরও কি শেষ পরিণতি ভাষা সৈনিক সুলতানের মতো হবে। এ জাতি গুণীজনের মর্যাদাদানে প্রচন্ডভাবে উদাসীন। মহাকবী আলাউল খুবই আক্ষেপ করে লিখে গেছেন “মন্দকৃর্তি ভিক্ষাবৃত্তি হইল পরবশ”। শেষ বয়সে আলাউল ভিক্ষা করেই জীবন নির্বাহ করেছিলেন। বীর সমাদৃত না হলে বীর জন্ম নেয় না। সুতরাং মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী সবার প্রতি আবেদন-আপনার অলি আহাদের চিকিৎসার ব্যাপারে উদ্যোগী হউন। মৃত্যুর পরে আর মরণ নেই। হয়তো অলি আহাদ মৃত্যুকে পার হয়ে অমরত্বের দিকে চলে যাবেন তবে জাতির ললাটে এ দুভাগ্যের কথা লেখা থাকবে যে তার এক বীর সন্তান বিনা চিকিৎসায় মরে গেছে । 
[ বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীঃ বিশিষ্ট রাজনীতিক ও কলামিষ্ট। নিবন্ধটি সাপ্তাহিক সুগন্ধা কাগজ-এর ৬ নভেম্বর, ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়। ]