তৃতীয় মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে অলি আহাদ

ফন্ট সাইজ:

কবিন্দ্র রীবন্দ্রনাথ ঠাকুর হতে শুরু ব্রাহ্মন্যবাদী নেতা ও তাদের অনুচর যারাই বাংলার জমিদার ছিল তারাই বাংলার কৃষক প্রজাদের রক্ত শোষণ করে কোলকাতা তথা পশ্চিম বঙ্গের ধনাঢ্য শ্রেণীতে পরিণত হওয়ার সাথে সাথে ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষত হয়ে উঠে এবং সেই সুবাধে ইংরেজদের পদহেলনকারী হিসেবে বঙ্গের প্রশাসনিক কেন্দ্রস্থল “রাইটার্স বিল্ডিং” এককভাবে সাম্প্রদায়িক কবজা করে যাতে বঙ্গীয় মুসলমানদের কোন স্থান ছিল না। শুধুমাত্র কয়েকটা ছিঁটে ফোটা কেরানী ও পিয়ন ছাড়া। প্রশাসনিক কর্তা ব্রাহ্মণ হিন্দুদের ঐকান্তিক প্রচার প্ররোচনা ও উৎসাহে বাংলার কাঁচা পাটের ব্যবসা হিন্দীভাষী ব্রাহ্মণ মাড়োয়ারী সম্প্রদায় কুক্ষিগত করে। ফলশ্রুতিতে কোলকানা-হুগলীতে শত শত পাটকল (Jute Mills) গড়ে উঠে। আর এই পাটকল মালিকদের সহায়তায় নব্য ধনাঢ্য ব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায় পশ্চিম বঙ্গে নানা শিল্প কারখানা গড়ে তুলে। পূর্ব বাংলায় একটিও পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয় নাই- অথচ কাঁচা পাট ছিল বাংলার মাটির। ফলে ইংরেজ ও ইংরেজী শিক্ষিত ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় আরাম আয়েসে বসবাসের জন্য সুরম্য আধুনিক কোলকাতা ও তার আশপাশ গড়ে তুলে। 

বাংলার মুসলমান কৃষক প্রজা ও অচ্ছ্যুত হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্মানজনক জীবন যাপনের কোন সুযোগ সুবিধা ছিল না। হিন্দু ব্রা‏হ্মণ্য সম্প্রদায়ের প্রতিভূ অর্থাৎ স্যার আশুতোষ মুখার্জী, রীবন্দ্রনাথ ঠাকুর সম বড় ব্রা‏হ্মন হিন্দু কর্তারা ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করে বঙ্গ-আসাম প্রদেশ প্রতিষ্ঠা বাতিলের দাবীতে হিন্দু পরিচালিত প্রবল গণ-আন্দোলন গড়ে তুলে এবং ইংরেজ সরকারের কৃপা আকর্ষণ করে বঙ্গ-আসাম প্রদেশ রদ করতে সফল হয়। যার মুল কারণ যাতে মুসলমান আর অচ্ছ্যুত হিন্দুরা স্বাবলম্বী এবং অগ্রসর সম্প্রদায়ে পরিষত হতে না পারে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় স্যার আশুতোষ মুখার্জী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত উচ্চ বর্ণের হিন্দু শ্রেণী আদাজল খেয়ে বাধা দেয় উদ্দেশ্য মুসলমান ও অচ্ছ্যুত সম্প্রদায় যেন জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর হতে না পারে। অভিজাত ধনাঢ্য উচ্চ হিন্দু সম্প্রদায়ের কুচক্রান্ত বাংলার নয়নমনি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর জমিদার নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ঠিকই ধরে ফেলেন। তিনি তার সউদ্যোগে দিল্লী- কোলকাতা ইংরেজ কর্তৃপক্ষের সাথে দেন-দরবার করে রবীন্দ্রনাথ- আশুতোষ মুখার্জীর মত মুসলমান ও অচ্ছ্যুত হিন্দু সম্প্রদায় বিদ্বেষীদের সর্ব প্রকার প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য বাদা বিপত্তিকে পরাজিত করে স্বীয় জমিদারী বন্ধক রেখে-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাই আজ আমরা যত সামান্যই হউক না কেন জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পাই। সুযোগ পাই স্কুল কলেজে অধ্যয়ন করার, প্রশাসক হওয়ার। ১৯৫৭ সালে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নার ডাকে সমগ্র বঙ্গদেশের মুসলমানরা পৃথক আবাস ভূমির দাবীতে একচেটিয়া ভোট দিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবীকে শক্তিশালী করে। ফলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গীয় প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। হিন্দু কংগ্রেস নেতা বামরাজ্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগী গান্ধী মহারাজ গোষ্ঠী ও গান্ধী মহারাজ পদলেহী গাদ্দার মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, দেওবন্দের হোসেন আহমদ মাদানী, পাঠান কোটের মাওলানা মওদুধী গোষ্ঠীকে পরাস্ত করার প্রচেষ্ঠায় বঙ্গীয় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ জেনারেল সেক্রেটারী আবুল হাশিম, আজাদ হিন্দু-আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের অগ্রজ শরৎ চন্দ্র বোস, বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন পরিষদ কংগেস দলীয় নেতা মানিকগঞ্জের জমিদার কিরণ শংকর রায় ও অচ্ছ্যুত হিন্দু সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র নেতা তদানীন্তন মন্ত্রী যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল হিন্দুস্থানের গভর্ণর জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনকে ‘স্বাধীন বঙ্গ রাষ্ট্র’  (Free dtate of Bengal) প্রতিষ্ঠার দাবীতে গণভোটের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু গান্ধী মহারাজ ও তদীয় চেলা নেহেরু প্যাটেল গণভোট হতে দেয় নাই। এত বিশ্বাসঘাতকতা ও গাদ্দারী সত্ত্বেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমরা বিজয়ী হই। ইহাই আমাদের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ-
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর একই লুণ্ঠন শোষণ ও শাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে পাঞ্জাবী স্বার্থান্বেষী মহাচক্রের নেতৃত্ব সামরিক-বেসামরিক চাকুরী, ব্যবসা বাণিজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। প্রথম আঘাত আসে মায়ের ভাষার উপর। মায়ের ভাষা বাংলা লিখতে হবে আরবী হরফে। এ প্রস্তাব করে বাঙ্গালী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ফজলুল রহমান, তার সমর্থনে আসে মওলানা মাদানীর চেলা কিশোরগঞ্জের মওলানা আতাহার আলী। বাধ্য হয়ে বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত ছাত্রযুব সম্প্রদায় মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে গর্জে উঠলো। যেই পাটের অর্থে গড়ে উঠেছিল কোলকাতা ও তার আশপাশ সেই পাটের টাকায় করাচী-লাহোর-পেশোয়ার, গড়ে উঠলো সুরম্য হয়ে। 
পূর্ববঙ্গেও ব্যবসা বাণিজ্যে চাকুরীতে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম হলো উর্দু ভাষীদের। গর্জে উঠে বাংলা। ১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ হক-ভাসানী যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার পক্ষে একচেটিয়া রায় দেন। ১৯৪৮-৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার দাবীতে খাজা নাজিমুদ্দিন ও মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীনের বুলেটের সামনে ছাত্র যুবক বুক চিতিয়ে দেয়। রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। পাঞ্জাবী গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, ইসহাকের মির্জা, আইয়ুব-মোনায়েম খাঁ বাঙ্গালীদের দাবিয়ে রাখতে দানবীয় শক্তি ব্যবহার করে অত্যাচার-নির্যাতনের ষ্টীম রোলার চালায়। ১৯৬৬ সালে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে ৬ দফার প্রবল আন্দোলন মুজিব-কমোডর মোয়াজ্জেম হোসেন-সার্জেন্ট জহুরুল হক সহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। গর্জে উঠে ছাত্র-জনতা, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর গণবিদ্রোহ গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলন কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র জনতার মিলিত গর্জনে ভেসে যায় আইয়ুব-মোনায়েমের ষড়যন্ত্র, মুক্তি পায় সবাই কিন্তু মুক্তি পায়নি সার্জেন্ট জহুরুল হক। ঢাকা ক্যান্টেনমেন্টে বন্দী অবস্থায় পাক বাহিনী তাকে গুলি করে হত্যা করে। জনতার রুদ্ররোষে খড়খুটার মতো ভেসে যায় আইয়ুবের শাসন। আইয়ুবের পতনের পর জেনারেল ইয়াহিয়ার মসনদে আরোহন-১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে ৬ দফার প্রবক্তা শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ একচেটিয়া বিজয় পায়। আর বাঙ্গালীকে চিরদাসে পরিণত করতে শুরু হয় ইয়াহিয়া-ভূট্টো চক্রের মরণ কামড় ষড়যন্ত্র। নরখাদক ইয়াহিয়া-ভূট্টো জাতীয় লোকদের পরিকল্পনায় ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মূল আসামী কমডোর মোয়াজ্জেম হোসেনকে পাক হানাদার বাহিনী এলিফ্যান্ট রোডে হত্যা করে এবং বাঙ্গালী নিধন পর্বে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ৬ দফা আন্দোলনের একচ্ছত্র নেতা শেক মুজিব পাক বাহিনীর রিকট আতমসমর্পণ করে। অন্যদিকে মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী জাতীয় মুক্তির উদগ্র বাসনায় স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেবার মানসে তার চির বৈরী ভারতে গমন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। জয়ী হয় বাঙ্গালী প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ। ইহাই আমাদের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ- 
১৯৯২ সালে ৬ই ডিসেম্বর বাবরী মসজিদ ধ্বংসের উদ্যোক্তা ও তদস্থল রাম মন্দির প্রতিষ্ঠায় অতি সম্প্রতি অগ্রণী ভূমিকায় ব্রা‏‏হ্মণ্যবাদী বাজপয়ী- আদভানী সরকারের একান্ত প্রত্যক্ষ সমর্থক বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের উগ্র নেতৃত্ব রাম রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাক্কা গুজরাটে মুসলিম অধিবাসীদের উপর গণহত্যা আবার থেমে থেমে মুসলমানদের রক্তে গোসল আজও চলচে। শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী ও জ্যোতি বসুর অনুসারীরা হিন্দু বাংলা কায়েম করে দিল্লীর বংশবদ প্রদেশে পরিণত করার লক্ষ্যে আদাজল খেয়ে ১৯৪৭ সালে মাঠে নামে। অধুনা তাদেওই তলপী বাহক গোষ্ঠী বঙ্গভূমী প্রতিষ্ঠার আওয়াজের সহিত মুদুধী, হোসেন আহম্মদ মাদানী, মাওলানা আজাদের বংশবদ গোষ্ঠী বাংলায় নানা ষড়যন্ত্রে দেশকে টালমাটাল অস্থিতিশীল করার হীন প্রচেষ্টায় লিপ্ত- সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দেশে নৈরাজ্য অরাজকতা সৃষ্টিতে ষোলকলা পূর্ণ করবে। 
মুক্তিযুদ্ধের পর লুটেরা গাদ্দার হায়েনারা ব্যক্তি ও পারিবারিক স্বার্থে ৩১ বৎসরে দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারে পৌঁছে দিয়েছে। তাই আজ মোনাফেক গাদ্দারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে-রক্ত দিয়েছি আরো দেব-অর্থগৃধনু অশিক্ষিত আর অর্ধশিক্ষিত দুর্নীতি পরায়ন মন্ত্রীদের ‘গড ফাদার’ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবসান করবো। তাই তৃতীয় মুক্তিযুদ্ধের ডাক- 
সন্ত্রাস-দূর্নীতির বিরুদ্ধে-সৎ শিক্ষিত জ্ঞানী-বিজ্ঞানী নির্লোভ দেমপ্রেমিক নেতৃত্ব কায়েম করবই। 
 
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের ভাষায়- 
“সত্য-মুক্তি স্বাধীন জীবন লক্ষ্য শুধু যাদের
দেশের তরে প্রাণ দিতে আজ ডাক পড়েছে তাদের”
 
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ-সন্ত্রাস দুর্নীতি নিপাত যাক।
[ লেখাটি ৭ই এপ্রিল, ২০০২ তারিখে দৈনিক ইংকিলাবে প্রকাশিত হয়।]