সামরিক আদালতে অলি আহাদের জবানবন্দি

ফন্ট সাইজ:

[২২ নভেম্বর, ১৯৮৩ সালে সামরিক শাসক এরশাদ জননেতা অলি আহাদকে গ্রেফতার করে। ৮ অক্টোবর, ১৯৪৮ সালে ৭ নং সামরিক আদালতে জনাব অলি আহাদ নিম্মোক্ত জবানবন্দি প্রদান করেন]
 
মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়, 
আমি নির্দোষ, 
আক্রোশ চরিতার্থ করার হীন উদ্দেশ্যেই এ্ মিথ্যা মামলা আমার বিরুদ্ধে দায়েল করা হয়েছে। ভারত সরকারের সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনাকে তরান্বিত করার স্বপক্ষে বর্তমান সরকারের নতজানু নীতির বিরুদ্ধে আমার আপোষহীন ভূমিকা এবং আমার সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকার মাধ্যমে প্রশাসকের উচুঁ তলার দুর্নীতি সম্পর্কিত লেখনীই এ মিথ্যা মামলা সাজানোর মূল কারণ। আমার পত্রিকায় প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের গুলশানের বাড়ীর ছবি ছাপানো হয়েছিল। ছবি সম্বলিত সে সংখ্যা এবং মামলায় পেশকৃত পত্রিকার অন্যান্য সংখ্যার মধ্য দিয়ে পত্রিকার ভূমিকাও অত্যন্ত পরিস্ফুট। 
বেআইনীভাবে মামলাটিকে চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেটের কোর্ট থেকে এ বিশেষ সামরিক আইন আদালতে আনা হয়েছে। এমনকি রেকর্ডকৃত তথ্য থেকেই এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে মামলাটি মিথ্যা ও বানোয়াট; সর্বোপরি গত ৩রা অক্টোবর (৮৪) এক সরকারী আদেশে সাপ্তাহিক ইত্তেহাদের প্রকাশনাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। 
উপরোক্ত বক্তব্য ছাড়াও আপনার অনুমতিক্রমে আরও কিছু বলতে চাই। শুনেছি, এক আদেশ বলে স্থির করা হয়েছে যে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের বিশেষ নির্দেশ ছাড়া সামরিক আইন বিধির অধীনে কাউকেই ২৪শে এপ্রিলের (৮৪) পরে গ্রেপ্তার করা হবে না; কিংবা ২৪শে এপ্রিলের (৮৪) পরে চার্জশীট করা হলে সামরিক আইন বিধির অধীনে বিচার অনুষ্ঠিত হবে না। মনে হয়, আমার বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা ক্রোধ ও আক্রোশমূলক এক ব্যতিক্রম। কিন্তু এ ব্যতিক্রমধর্মী ব্যবস্থা আমাকে বিস্মিত করেনি। একদিকে স্বৈরশাসকের উৎপীড়ন অন্যদিকে অগণিত মহৎ ব্যক্তিত্বের অবর্ণনীয় আত্মত্যাগের ভুরি ভুরি নজীর ইতিহাসের পাতায় লেখা রয়েছে। অত্যাচারের বেদীতে নিঃশংক আত্মত্যাগের ভিত্তিভূমিতেই গড়ে উঠেছে মানবীয় মূল্যবোধ ও সভ্যতার সুরম্য প্রাসাদ। মানবতার সেবার পথ চিরদিনই কণ্টকাকীর্ণ। সৃষ্টির আদি প্রত্যুষ থেকেই শুরু হয়েছে ক্রুসেডারেদের বিঘ্নসংকুল অভিযাত্রা। সভ্যতার অগ্রযাত্রার বেদীমূলে উৎসর্গীকৃত হয়েছেন অগণিত মহৎ প্রাণ। অনেকের ভাগ্যে নেমে এসেছে উৎপীড়ন, আক্রোশ আর নির্যাতন কিন্তু কাফেলার অব্যাহত অগ্রযাত্রা বিঘ্নিত হয়নি; ভবিষ্যত বংশধরদের জন্যে তাঁরা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। এটা এক সদাপ্রবাহমান চিরন্তন ধারা, আত্মত্যাগের অনির্বান আদর্শ পরবর্তী বংশধরদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ঘৃণ্য ও নীচ মানসিকতাসম্পন্ন ইতিহাসের খলনায়করা এ অভিযাত্রাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। মহান প্রচারক, রাজনীতিক কিংবা মূল্যবোধের প্রবক্তারা তাঁদের বিশ্বাসের বিনিময়ে পার্থিব খ্যাতি ও স্বাচ্ছন্দ্যকে বরণ করে নেন নি। ইতিহাসের এই গৌরবময় ধারার প্রেক্ষিতে আমি অতি নগণ্য। কিন্তু সভ্যতা ও মূল্যবোধের সেই পার্থিত মান ও গুণগত মর্যাদাকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে যে মহান অভিযাত্রিরা আজও এই রৌদ্রস্মাত পৃথিবীতে বেঁচে আছে, আমি তাঁদের সেই অভিযাত্রার একজন অংশীদার। আমার কাছে ন্যায়ের সপক্ষে আত্মত্যাগের দূর্নিবার প্রেরণা এক অতীন্দ্রিয় সুষমায় অভিষিক্ত। 
এখানে আমার সাথে আরও চারজন আছে, যারা তারুণ্যের প্রদীপ্ত চেতনায় উজ্জীাবত। মৌল প্রশ্ন হচ্ছে, আমাকে সামরিক আইন বিধির অধীনে গ্রেপ্তার ও বিচার করার জন্য প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের এতটা আক্রোশের কারণ কি? ক্ষমতার শীর্ষদেশে অধিষ্ঠিত গুটিকতক ব্যক্তি বোধ হয় এই নিরেট সত্য বিস্মৃত হয়েছেন যে, তাদের চাকুরী প্রাপ্তী, প্রমোশন কিংবা বর্তমান অবস্থানের জন্য তারা আমাদের মত রাজনীতিকদের কাছেই ঋণী, যে রাজনীতিকরা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছেন। ’৪৭ সালে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি স্বাধীন ও স্বার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের অভ্যুদয়ের ফলেই লেঃ কর্নেল আইয়ুব খান ত্বরিত প্রমোশন পেয়ে রাতারাতি জেনারেল হতে পেরেছিলেন। 
অকৃতজ্ঞ আইয়ুব খাঁন হাতে ন্যস্ত বন্দুক-ক্ষমতার মাধ্যমে সাংবিধানিক সরকারকে উৎখাত করে, সংবিধান বাতিল করে, এমনকি পাকিস্তানের স্রষ্ট্রাদের উপর চাপিয়ে দেয় নির্যাতনের ষ্টীমরোলার এবং এর মধ্যদিয়ে পাকিস্তান বিভাজনের বীজও বপন করে। যদি কায়দে আজমের নেতৃত্বে রাজনীতিকরা পাকিস্তানের জন্ম না দিত, যদি দিল্লী সরকারই থাকত অখন্ড ভারতের ভাগ্যনিয়ন্তা তাহলে লেঃ জেঃ এরশাদ তো দূরের কথা জেনারেল আইয়ুবের মত ব্যক্তিবর্গও যে ঐশ্বর্য ও মর্যাদা ভোগ করেছেন বা করছেন তা তাদের ভাগ্যে জুটত না। ভারতীয় দেশরক্ষাবাহিনী রাজনীতিকদের ভূমিকা যেভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জেনারেলরা তা পারেননি, ফলে নবকিছুই তারা লন্ডভন্ড করে ফেলেছেন। সে কারণেই শত বিচ্যুতি সত্বেও ভারত আজকের দিন পর্যন্ত সুযোগের পূর্বপ্রান্তে গণতন্ত্রের এক সুরক্ষিত দূর্গ। 
প্রাক’৪৭ থেকেই রাজনীতিকদের অবর্ণনীয় ত্যাগ স্বীকারের ফলশ্রুতিতেই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এইচ,এম, এরশাদ ছিলেন একজন লেফটেনেন্ট কর্ণেল। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে তাঁর কোন অবদান নেই। এমন কি ’৭১ সনের ভয়াল ও রক্তক্ষরা মুক্তিযুদ্ধের সময় অত্যন্ত চতুরতার সাথে তিনি সৈয়দপুর (রংপুর) থেকে তদানিন্তন পশ্চিম পাকিস্তানে বদলীর ব্যবস্থা করেছিলেন, উদেশ্য ছিল ঝুঁকিপূর্ণ রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করা। কিন্তু বাংলাদেশের জন্মের পর, অবাঞ্ছিতভাবে ত্বরিত প্রমোশন পেয়ে তিনি লেফটেনেন্ট জেনারেল পদে উন্নীত হন, পরে তাঁকে সেনাবাহিনী প্রধান নিয়োগ করা হয়। জনশ্রুতি আছে, ’৭১ সালের ১৫ই এপ্রিল তিনি তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন, আবার ৩০শে এপ্রিল (৭১) করাচী ফিরে যান। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি তা করেন নি। ঘটনার সত্যতা পারলে তিনি অস্বীকার করুন। 
সেনাবাহিনীর চেইন অব কম্যান্ডের প্রধান থাকার সুযোগে এবং তাঁর হাতে ন্যস্ত অস্ত্র ক্ষমতার পুরোপুরি সুযোগ গ্রহণ করে তিনি ১৯৮২ সনের ২৪শে মার্চ সাংবিধানিক সরকারকে পদদলিত করে সামরিক অভ্যূত্থান ঘটান, নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করেন, সামরিক আইন জারি করে দেশ ও জাতির উপর চাপিয়ে দেন তাঁর স্বৈরশাসন। 
 
জনাব চেয়ারম্যান, 
করাচী ও রাওয়ালপিন্ডি শাসকদের সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা রয়েছে; সুতরাং এ সম্পর্কিত কোন উল্লেখ ব মন্তব্য নিস্প্রয়োজন। 
এখানে একটি তথ্যের অবতারণা বোদ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ‘৮১ সনের নভেম্বরে তাঁর ষ্টাফের একজন কর্ণেলের মাধ্যমে সেনাভবনে আহুত সম্পাদকদের এক সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য আমাকে আহবান জানিয়েছিলেন। বিনম্রভাবে অথচ দৃঢ়তার সাথে সে আমন্ত্রণ আমি প্রত্যাখ্যান করি। কারণ দেখিয়ে বলেছিলাম যে, একজন সরকারী চাকুরে হিসেবে দেশের প্রেসিডেন্টের অনুমতি ব্যতিরেখে শান্তিকালীন সময়ে (Peace time) পত্রিকার সম্পাদকদের সম্মেলন ডাকার সাংবিধানিক অধিকার তাঁর নেই। সার্ভিস কোডকে নিদারুণভাবে লংঘন করে তিনি ‘৮১ সনের শরৎকালে (২০-১১-৮১ এবং ২৭-১১-৮২) ভারতীয় সাংবাদিক ও দেশীয় পত্রিকার সম্পাদকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য পেশ করেন। একাধিকবার অনুরোধ সত্বেও আমি এতে যোগ দেইনি। 
১৯৮১ সনের ১৬ই নভেম্বর বিচারপতি আবদুস সাত্তার দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই লেঃ জেঃ এররশাদের আচরণ দেশপ্রেমিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ও তথ্যভিজ্ঞ মহলের কাছে সন্দেহের বিষয় ছিল। নির্বাচিত সরকার উৎখাত ও সংবিধানকে পদদলিত করার জন্য যেন তিনি প্রয়াসী না হন সেজন্য পরোক্ষভাবে তাঁকে সতর্ক দেয়া আমার কর্তব্য বলেই মনে করেছি। সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছি, এই প্রয়াসে হয়ত তাঁর সাময়িক ব্যক্তিগত সুবিধা হবে কিন্তু সমগ্র জাতির ভাগ্যে নেমে আসবে বিপর্যয়; পরিণতিতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংবিধানিক কাঠামো হবে ধ্বংসপ্রাপ্ত। সেটাই আজ ঘটেছে। 
সংবিধান বহির্ভূত পন্থায় ক্ষমতা দখলের পর থেকেই প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আমার বিরুদ্ধে তাঁর আক্রোশ চরিতার্থ কারার আয়োজন শুরু করেন। স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্টের বিরুদ্ধে অধীনে আমাকে গ্রেপ্তার করে মাননীয় সেশনস জজের স্পেশাল ট্রাইবুনালের সামনে বিচারের জন্য নেয়া হয় কিন্তু দুর্ভাগ্য স্পেশাল ট্রাইবুনাল মুক্তি দেন। তারপর আমাকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সচিবালয়ে (সাবেক পার্লামেন্ট হাউজ, তেজগাঁ, ঢাকা) লেঃ কর্নেল ফকির সালাহউদ্দিনের সমীপে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। আমার পরবর্তী পরীক্ষা ছিল স্বরাষ্ট্র সচিব এম, কে, আনোয়ারের সামনে উপস্থিত হয়ে আমাকে আচরণ ব্যাখ্যা করা। লক্ষ্য করুন, কি ধরনের হয়রানির শিকারে আমাকে পরিণত করা হয়েছে। আমি খোদাভীরু, কিসের পরোয়া আমার? 
‘৮২ সনের সেপ্টেম্বরে আমার সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদের’ প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়, ‘৮৩ সনের নভেম্বরে গ্রেপ্তার করে আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং আমার ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে মামলা শুরু করে, গণ আন্দোলনের চাপের মুখে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট আমাদের মুক্তির আদেশ দিতে এবং আনীত মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। 
রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে সংলাপ শুরু হয়। ক্ষমতাসীন জেনারেলদের সাথে প্রাক সংলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে তাঁদের উদ্দেশ্যে আমাকে বলতে হয়েছিল, “যেহেতু ক্ষমতা লিপ্সায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে আপনারা সবকিছু বিপর্যস্ত করে ফেলেছেন সেহেতু আপনাদেরকেই সাংবিধানিক নীতিমালার মধ্যে ফিরে আসতে হবে অন্যথায় দেশের সংবিধানকে নিদারূণভাবে লঙ্ঘন করার অভিযোগে আপনাদেরকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। প্রশাসনের সাথে জনসাধারণের সহজাত আবেগমথিত সম্পৃক্ততা কেবলমাত্র ‘৭২’র সংবিধানের পুনরুজ্জীবন ও নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা প্রত্যর্পনের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব অন্যথায় দেশের ভাগ্যে থাকবে নৈরাজ্য ও উচ্ছৃংখলতা যা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কেনো দেশপ্রেমিকের কাছে কাম্য হতে পারে না।” 
উপরোক্ত ঘটনাবলীই সরকার পক্ষের বিভিন্ন দলিলপত্রে বর্ণিত বানোয়াট আক্রোশজনিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অমর্যাদাকর অভিযোগ নামক কাহিনীর ভিত্তিতে আমাকে গ্রেপ্তার করা ও বিচার অনুষ্ঠানের পটভূমি। আত্ম-প্রবঞ্চনায় বিমোহিত একজন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এর বেশী কিছু আশা করা যায় না। কামনা করি, আল্লাহ তাঁর সহায় হোন ও আলোর পথ দেখান। যে ভদ্রলোক লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে অধিষ্ঠিত হয়ে দেশরক্ষা বাহিনীকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবমাননা করেছে তাঁকে কে বোঝাবে? কোয়েটার অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তিনি, লেঃ কর্ণেল ব্যাংকের উর্ধ্বে উন্নীত হওয়ার কোন যোগ্যতা তাঁর ছিল না। কিন্তু নির্মম পরিহাস। তিনি আজ লেফটেন্যান্ট জেনারেল। 
 
মাননীয় চেয়ারম্যান, 
আপনার সামনে উপস্থিত করানোর পটভূমি যাতে আপনি অনুধাবন করতে পারেন সে জন্য আমি আরও কিছু বলতে চাই। ‘৮২ সনের জুনে ঢাকা টেলিভিশনের সাথে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দেয়া সাক্ষাতকারের কতিপয় বিবৃতি সম্পর্কে আমি আমার পত্রিকায় প্রশ্ন তুলেছিলাম, আমি তাঁর গুলশানের বাড়ী নির্মাণ সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলেছিলাম, সমস্ত রাজনৈতিক জীবন ধরে আমি বিভিন্ন সরকারের বিরুদ্ধে নীতি ও নীতিআশ্রয়ী রাজনীতির ভিত্তিতেই সংগ্রাম করেছি, কখনই ব্যক্তিগত কারণে কিংবা ব্যক্তি স্বার্থে বিরোধীতা করিনি। এটা আমার মর্যাদাবোধ, সততা ও সম্মানের পরিপন্থি। 
নীতিগত প্রশ্নে আমার দৃঢ় ভূমিকা আমার সহোদরদের জন্যও ডেকে এনেছি ভোগান্তি। ভারতের সেবাদাস শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি আমার অনুজকে (উচ্চ সরকারী পদে অধিষ্ঠিত, সাবেক সি,এস,পি) জুলুমের শিকারে পরিণথ করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। এমনকি সংস্থাপন বিভাগ ও জেনারেল এরশাদ নিয়োগকৃত ক্যাবিনেট সাব-কমিটির তাঁর প্রাপ্যপদে নিয়োগের সুপারিশ সত্ত্বেও। সত্য ঘটনা উপস্থাপনের স্বার্থে আমাকে বলতেই হয়, যদিও ১৯৭৬ সনে তদানিন্তন প্রেসিডেন্ট বিচারপতি এ, এস, এম, সায়েম আমার কথিত অনুজকে এডিশনাল সেক্রেটারী পদে নিয়োগ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে দিয়েছিলেন, তবুও জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁর প্রবর্তিত মার্শাল ডেমোক্রেসির প্রতি আমার নীতিগত বিরোধিতার কারণে তাঁর নিয়োগ গেজেট না করার সিদ্ধান্ত নেন, এমনকি ১৯৮০ সনে ১৯-৩০ মে রাত্রে নিহত হওয়া পর্যন্ত এ নিয়োগ গেজেট করা হয়নি। বিনা অপরাধে অযোগ্য চক্রান্তকারী শাসক ও প্রশাসকদের হাতে নির্যাতন ভোগের কি নির্মম পরিহাস। 
দিল্লী সরকারের কাছে বাংলাদেশকে বিকিয়ে দেয়ার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আমার কঠোর ও আপোষহীন ভূমিকার জন্য আমার উপর নির্যাতনের ষ্টিমরোলার চাপিয়ে দেয়া ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানের আক্রোশ আমার নিম্মোক্ত সহোদরদের উপর নিপতিত হয়; 
 
ক) জৈষ্ঠ ভ্রাতা এ.কে.এম.এ. সাত্তার, সাবেক পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারী। 
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অপট করেন। 
 
খ) দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আজিজুর রহমান, সাবেক পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অপট করেন। 
 
গ) অগ্রজ মরহুম ডঃ আবুল করিম ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীন অব ফ্যাকাল্টি অব এগ্রিকালচার একজন পোস্ট ডক্টরেট নাফিল্ড স্কলার। 
 
ঘ) অনুজ আমিরুজ্জামান সাবেক সি এস পি তিনিও বাংলাদেশের পক্ষে অপট করেন। 
 
ক্ষমতাসীন ব্যক্তির প্রতি সহোদরদের মধ্যে কেউ নীতিগত কারণে বিরোধী, সেজন্য সরকারী চাকুরী জীবনে এমন নিষ্ঠুর নির্যাতনের ঘটনা টোটালিটারিয়ান, কমিউনিষ্ট, নাজী বা ফ্যাসিষ্ট সমাজ ছাড়া অন্য যে কোন সমাজে অকল্পনীয়। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানের ভগ্নিপতি সৈয়দ হোসেন সাবেক পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের একজন সেকশন অফিসার থেকে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সরকারের এডিশনাল সেক্রেটারী পদে উন্নীত হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ‘বোন জামাইর’ জন্য কি ত্বরিত প্রমোশন। 
উল্লেখ্য, ‘৪৮ সাল থেকে প্রায় সব কটি সরকার আমাকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে কিন্তু কখনই আমি বিবেক বিক্রি করিনি; সে কারণেই আমাকে নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হতে হয়েছে বহিস্কৃত, বার বার হতে হয়েছে কারারুদ্ধ। আবারও বলছি, আমি খোদাভীরু, সর্বশক্তিমান আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে মাথা নত করিনা। আমার পরিবারের বা শিক্ষায়তনের কিংবা রাজনৈতিক ইনষ্টিটিউটের কেউ তরুণ বয়সে আমাকে কারও কাছে মাথা নত করার শিক্ষা দেননি, যদিও বা তিনি দৈহিক বা আর্থিক শক্তির একচ্ছত্র অধিপতি হন। আকর্ষণীয় বা অভিশপ্ত কোন প্রকার প্রলোভনের কাছেই আত্মসমর্পন করতে আমি শিখি নি। 
আমার বিবেক আর আজীবন রাজনৈতিক প্রশিক্ষনের কাছে বিশ্বস্ত থেকে আমি বলতে চাই যে, তাত্ত্বিক কিংবা আদর্শগত কোন দৃষ্টিকোন থেকেই সামরিক আইন প্রশাসন আমার কাছে গ্রহণীয় নয়, যিনিই এটা জারি করুন না কেন-হোন তিনি জেনারেল আইয়ুব, অথবা জেনারেল ইয়াহিয়া অথবা লেঃ জেনারেল জিয়াউর রহমান অথবা মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর কিংবা লেঃ জেঃ এইচ,এম, এরশাদ। বিচারাসনে উপবিষ্ট হওয়ার মাননীয় আদালতের ক্ষমতার উৎস হচ্ছে ১৯৮২ সনের ২৪শে মার্চের মার্শাল ‘ল প্রক্লাম্যাশন। যেহেতৃ সামরিক আইন একটি বাস্তবতা, সেহেতু আমাকে মাননীয় আদলতকে মানতে হয়। 
আধুনিক ইতিহাস রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জেনারেলদের অধিষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেছে। তাঁদের শাসন তাঁদের স্ব স্ব দেশ ও জনগণের জন্যে বয়ে এনেছে বিপর্যয়, দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, নবাব সিরাজুদ্দৌলার সেনাপতি মীরজাফর আলী খান বাংলাকে দাসত্ব শৃংখলে আবদ্ধ করার জন্য দায়ী এই শৃংখলের পথ ধরেই ভারত ১৯০ বছর ধরে পরাধীনতার শৃংখলে শৃংখলিত হয়। নেপোলিয়ন বোনাপার্টি ফ্রান্সের বিপর্যয় ডেকে আনে। জার্মানীর হিটলার সভ্যতাকে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত করে। গণতান্ত্রিক সিষ্টেমে ও জেনারেলদের শাসন আকর্ষণীয় কিছু নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল আইসেনহাওয়ার (আইখ) সোভিয়েত রাশিয়ার আকাশে ইউ-২ গোয়েন্দা বিমান পাঠিয়ে ৬০ সনে প্যারিসে অনুষ্ঠিবত্য রাষ্ট্র প্রধানদের শান্তি সম্মেলন বিপর্যস্ত করে ফেলেন, জাপানের জেনারেল তোজো তাঁর দেশকে উপহার দিয়েছেন পারজয় আর বিপর্যয়। সাম্প্রতিক কালের সমরনায়কদের শাসনের ইতিহাস চরম ব্যর্থতার আলেখ্য। জেনারেল আইয়ুব, আর্জেন্টিনার জেনারেল পলতিয়ারী, বার্মার জেনারেল নে উইনের শাসন এই নির্মম বাস্তবতারই প্রমাণ বহন করে। আধুনিক মানব-সম্পর্কের (human relationship)  জটিল আবর্তে মানবসম্পর্কীয় বিষয়াবলী পরিচালনার গুণ বা বৈশিষ্ট্য একজন সমর বিশারদের নেই। এর জন্যে প্রয়োজন মানব-সম্পর্কে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও ধ্যানধারণায় সমৃদ্ধ রাষ্ট্রনায়ক (stateman) অথবা দার্শনিক রাজা (philosipher king) । দমন করার ধারণা ও প্রশিক্ষণ কখনই বৈদগ্ধ্য ও সেবার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেলরা অনিবার্যভাবেই রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হবেন; সাম্প্রদায়িক ইতিহাসে তার সরব বর্ণনা ভূরি ভূরি। 
আমার শিক্ষা, জ্ঞান ও বিশ্বাসের নির্দেশ হচ্ছে যে, কেবলমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরই জনপ্রতিনিধি রচিত সংবিধান মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিকার রয়েছে এবং সংবিধান প্রসূত কোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ যদি সংবিধানের অংশ বিশেষও লঙ্ঘন করে তবে তাকে আইনানুগ বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। 
সামরিক আইন প্রশাসনকে মেনে নেয়ার অর্থ হবে উপরোক্ত বিশ্বাসের সরাসরি পরিপন্থি। উপরোক্ত অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে; জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, ৭ দলীয় জোট, ১৫ দলীয় জোট এ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞ আইনজীবিবৃন্দ ও ‘৭২’র সংবিধান মোতাবেক বিচার বিভাগের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামে লিপ্ত। 
রাষ্ট্র পরিচালনায় সাংবিধানিক আইন পুনঃপ্রতিষ্ঠার মহান সংগ্রামের আমি একজন কর্মী মাত্র। আমি নিজেকে বিপুলভাবে পুরস্কৃত বোধ করব যদি আমার ক্ষুদ্র ও বিনীত প্রচেষ্টা দেশে সাংবিধানিক আইন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সামান্যতম অবদান রেখে থাকে। 
আমি আবারও জোর দিয়ে বলছি আমি নির্দোষ এবং আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগরে সাথে কোনভাবেই জরিত নই। 
[সামরিক আদালতে ইংরেজী প্রদত্ত জবানবন্দীটির বাংলা অনুবাদ]