চির বিদ্রোহী অলি আহাদের মুখোমুখি

ফন্ট সাইজ:

আমাদের রাজনৈতিক গগনের নক্ষত্র, এই মুহুর্তে জাতির অভিভাবক হিসেবে বিবেক হিসেবে সবাই যাকে মনে করছি, জাতীয় নেতা অলি আহাদ সত্যিকার অর্থে এখন আর কোন ব্যক্তি বিশেষের নাম নয়। অলি আহাদ একটি বিশেষণ। একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের চিরকালের আপোষহীন বিদ্রোহের একটি বিশেষ ধারা। এজন্য নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একজন হয়েও তিনি সার্বজনীন। তাঁর নাম উচ্চারণ মাত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন একটি প্রতিকৃতি যিনি আজীবন ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন জাতীয় স্বার্থকে। কে কি বলবে, এ নিয়ে অলি আহাদের তেমন একটা মাথাব্যাথা কোন কালেই ছিলো বলে মনে হয় না। যা তিনি বোঝেন, যা তার বক্তব্য, তা তিনি অকপটে, সরবে, সহজ সরলভাবে উচ্চারণ করেছেন অকম্পিত কন্ঠে। আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অনেকটা নায়কের মতো। তিনি ’৬৯ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য মুক্তিবাহিনী গঠনের চিন্তা করেছিলেন। ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য ছুটে গিয়েছিলেণ আগরতলায়। কাগমারী সম্মেলন থেকে অলি আহাদকে বাদ দিলে লাবণ্য হারিয়ে যায়। আওয়ামী লীগের জনকদেরও একজন তিনি। জন্ম ১৯২৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ’৪৮-এ প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ভ পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রথম সাংগঠনিক সম্পাদক, ন্যাপের প্রথম যুগ্মসম্পাদক, এরপর জাতীয় লীগের সাধারণ সম্পাদক, ডিএল-এর সহসভাপতি। তাঁর সর্বশেষ রাজনৈতিক অবস্থান ডিএল-এর সভাপতি পদে। দেশের বর্তমান ক্রান্তিকালে এই টালটমাল রাজনৈতিক সংকটে তিনি আমাদের সেই আগের মতোই অনুপ্রাণিত করেছেন। দিচ্ছেন নির্দেশনা। বয়সের ভারে হয়তো তিনি কিছুটা ক্লান্ত। কিন্তু অন্তরে আজও রয়ে গেছে সেই অনির্বাণ তারুণ্য। অলি আহাদ ইতিহাস। অলি আহাদ ইতিহাসের সাক্ষী। সেই সাক্ষীর সাথে জড়িয়ে আগামীকালের জানা, অজানা, অনাগত পাঠকের স্বার্থে দেশপ্রেমিক মানুষদের স্বার্থে যারা সততা সন্ধান করে ফেরেন শিকড়, তাদের স্বার্থে তাঁর সকল প্রিয়-অপ্রিয় উচ্চারণ ধারণ করার জন্য দৈনিক ইনকিলাব থেকে তাঁর বাস ভবনে গিয়েছিলঅম গত ১৬ ফেব্রুয়ারী’ ১৯৯৮। এই সাক্ষাতকারটির ঐতিহাসিক মর্যাদা বিবেচনা করে আমরা প্রায় হুবহু পত্রস্থ করলাম। সাক্ষাতকার গ্রহণ ও গ্রন্থনা করেছেন ভাষা সৈনিক, ভাষা আন্দোলনের মুখপাত্র আধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক সৈনিকের সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল গফুর ও বিটিভির ‘কথামালা’র উপস্থাপক কবি আবদুল হাই শিকদার। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন ফাহিম ফিরোজ, লুৎফল খবীর, সৈয়দ মুজাম্মেল হোসেন, ওবায়দুল হক মাশকুর, মুন্সী আবদুল মজিদ, সাইফুদ্দীন মনি ও অধ্যাপক মোমেনুল হক। 
আবদুল গফুরঃ জনাব অলি আহাদ যে শুধু ভাষা আন্দোলনের সৈনিক বা সেনাপতি ছিলেন, তা নয়, তার একটা রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসও উজ্জ্বল অতীত রয়েছে। আমার মনে হয় যে, আমরা তার উজ্জ্বল অতীত সম্পর্কে আলোচনা করতে পারি। আপনি রাজনীতিতে আসলেন কিভাবে? এবং কি লক্ষ্যে?
 
অলি আহাদঃ আমার যখণ কিশোর বয়স, বা কিশোর বয়সের চেয়েও বেশী বা কম। সেই বয়সে বাসায় আব্বা কয়েকটি পত্রিকা রাখতেন। এর মধ্যে সওগাত, মোহাম্মদী, আজাদ, স্টার ইন্ডিয়া। ঐ সব পত্রিকায় মাঝে মাঝে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এর খবর পড়তাম। এবং তার খেলা যেদিনই দেখেছি সেদিনই মনটা উৎফুল্ল থাকত যে জিতেছে। এবং জেতার পর তারা কাপ নিয়ে গেল এবং কয়েক বছর ধরে একাধারে মোহামেডানের জয় হতে লাগল। এটা আমার মনে মধ্যে আস্তে আস্তে রেখাপাত করতে লাগল। আবার আব্বাস উদ্দিন সাহেব গায়ক। উনি কবি নজরুল ইসলামের গান বিভিন্ন সময়ে রেকর্ড করেন। ঐ সময় গ্রামোফোন চলত, গ্রামোফোনে তাঁর গান শুনতাম। নৌকা যাচ্ছে কলের গান বাজছে। তখনকার দিনে গ্রামোফোনকে বলতো কলের গান তা আমরা শুনতাম যে নৌকা যাইতেছে, গান হইতেছে। উদ্ধুদ্ধ হইতাম যে, আমরা মুসলমান, মুসলমানদের কথা সেখানে আসতেছে, ইসলামের কথা আসতেছে। নামায রোজার কথা আসতেছে, ঈদের কথা, রমজানের কথা আসতেছে। এর ফলে আমার মনের একটা পরিবর্তন হতে লাগল। পাশাপাশি আমি যখন স্কুলে পড়ি, আমার সাথে যে ছাত্রটি ছিল, কোন সময় সে ফার্স্ট হত কোন সময় আমি। কিন্তু যে বছর আমি সেকেন্ড হয়েছি সে বছর আমি দেখেছি যে আমার নম্বরটা কোথায় যেন গোলমাল হয়েছে। এটা আমার কিশোর মনের বিশ্বাস এর আমি কোন প্রমাণ দিতে পারব না। কিন্তু প্রমাণ না দিতে পারলেও বোঝার মত সেই শক্তিটুকু ছিল যে, এখানে হয়তো অংকে আমার এই নম্বরটুকু পাওয়া উচিত ছিল। বাংলায় হয়তো এ নম্বর পাওয়া উচিত ছিল, সেটা পাই নাই। সেকেন্ড হয়েছি। আবার কোন কোন বছর ফার্স্ট হয়েছি। এগুলো আমার মনে কাজ করত যে আমার শিক্ষকবৃন্দ যখন এইরকম, তার মধ্যে সামাজিক অবস্থা যে, আজান দিতে গেলে পাশে হিন্দু বাড়ী থাকলে, উলু ধ্বনি হলে পরে, আবার মোরগ রাখলে মোরগ তাদের বাড়ী গেলে, সেখানে মোরগটাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করত। কারণ, তাদের নাকি এতে শূচি থাকত না। এসব কারণে আমার মনের মধ্যে আস্তে আস্তে গভীর রেখাপাত করতে লাগল যে, মুসলমানদের এখন বোধ হয় আলাদাভাবে চলতে হবে। এছাড়া অন্য কোন পথ নাই। আবার গ্রামে যেহেতু থাকতাম। কোন কোন সময় গ্রামে দেখতাম যে, মহাজন, তারা আইসা বাড়ির মধ্যে জমিজমা কেড়ে নিয়া গেছে। জমি বন্ধক রেখে তারা টাকা এনেছিল এবং সেই টাকা ফেরত পাবার জন্য তারা নানারকম অত্যাচার করত। জমিদারদের অত্যাচারে কোন সীমা ছিলনা। কারণ, বাঙালী মুসলমানরা জমিদার ছিল না, জমিদার ছিল হিন্দুরা। এগুলো সামগ্রিকভাবে আমার ছোট্র মনের মধ্যে কাজ করেছে এবং তার ফলে আমি আস্তে আস্তে চিন্তা করতে লাগলাম যে, আমরা কিভাবে আমাদের দাবী দাওয়াগুলো প্রতিষ্ঠা করতে পারি। কিভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ হবে মুসলমান জাতি হিসাবে। আমার আব্বা চাকরি করতেন। ওনার মতো আরো যারা চাকরি করতেন তাদের মধ্যে বোঝা যেত কোথায় যেন কি একটা গন্ডগোল। তারও মূলে দেখা গেছে যেহেতু সে মুসলমান সেহেতু তার প্রমোশন হবে না। যেহেতু সে মুসলমান সেহেতু তার ট্রান্সফার ভাল জায়গায় হবে না। এই কথাগুলো আমাদের মনের মধ্যে কাজ করত। মিডল ক্লাস। লোয়ার মিডল ক্লাস তাদের মধ্যেই পিয়ন থেকে আরম্ভ করে বড় সাহেব্ পর্যন্ত। এমনই সময় মুসলিম লীগের ডাক আসল। আমার মনে হয় ১৯৪০-৪২, হ্যাঁ এরকমই বিয়াল্লিশেই শ্যামা- হক মন্ত্রিসভা-গঠিত হল। তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি, আমি কুমিল্লা জেলা স্কুলের ছাত্র। তখন শফিউল ইসলাম নামের একজন ছাত্র ছিলেন, তিনি ইন্টারমিডিয়েটে পড়তেন। তিনি আসতেন, উনার মুখে শুনতাম অনেক কথা। শোনার মধ্যে উনি মাঝে মাঝে আমাকে বলতেন-শোন অলি আহাদ, আজকে নাজিমুদ্দিন সাহেবের মন্ত্রিত্ব হবে। আজকে শ্যামা-হক মিনিস্ট্র ফল করবে। আজকে শ্যামা-হক মিনিষ্ট্রি অমূক জায়গায় গিয়েছিল। তার সাথে গিয়েছিল হাসানুজ্জামান। লাকসামের রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলেন, এমএলএ ছিলেন। তো তার কান কেটে দিল এবং কান কেটে দেয়ার পর ফজলুল হক সাহেব আর সেখানে নামতে পারেন নি। অর্থাৎ তিনি তার ইচ্ছামত তার বিশাল যে দেহ, বিশাল যে পপুলারিটি, বিশাল যে নেতৃত্ব- সব কিছু কয়েকটি ছাত্রের কাছে হার মেনে গেল। এতে আমাদের মন আরো উদ্বুদ্ধ হতে লাগল। তখন আমরা ধীরে ধীরে মুসলিম লীগ করার দিকে অর্থাৎ ছাত্রলীগ, মুসলিম ছাত্রলীগ করা আরম্ভ করলাম। 
 
মুসলিম ছাত্র লীগ করতে গিয়ে দেখা গেল, ইন দি মিন টাইম নাজিম উদ্দিন সরকার গঠন করেছেন। মুসলমানদের এখন দাবী দাওয়া প্রতিষ্ঠিত হবে। এটা আমাদের খুব উদ্বুদ্ধ করল এবং উদ্বুদ্ধ হয়েছি এতে কোন সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যে খান সাহেব মফিজউদ্দিন আহমেদ সাহেব, তিনি তখন পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী নাজিমউদ্দিন সাহেবের মন্ত্রিসভায়। তিনি আসবেন। কুমিল্লা সফরে। দাউদকান্দি যাবেন, বরকান্দা যাবেন। আমরাও তাকে রিসিভ করার জন্য যে মুসলিম মন্ত্রীসভা হয়েছে, অর্থাৎ অত্যাচার থেকে বাঁচা গেছে এবং তার মন্ত্রীত্বের একজন পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী বুঝতামই  কি, বুঝতাম মন্ত্রীদের সাথে আছেন। তিনি আসলে আমরা তাকে রিসিভ করলাম ‘আল্লাহু আকবার’, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ প্রভৃতি ধ্বনি দিয়ে। এটাই আস্তে আস্তে আমার মধ্যে, কাজ করতে লাগল। এই কারণেই আমি রাজনীতিতে ঢুকে পড়লাম এবং সেই ঢুকে পড়ার মূল কারণ ছিল মুসলমানদের দাবী দাওয়া প্রতিষ্ঠা করা। 
 
আবদুল হাই শিকদারঃ অর্থাৎ সেই সময়কার সামাজিক পরিস্থিতি আপনাকে কিছুটা অনুপ্রাণিত করেছিল রাজনীতিতে অংশ নেয়ার জন্য। 
অলি আহাদঃ অবশ্যই এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। 
আবদুল হাই শিকদারঃ আপনার জন্ম তো ১৯২৮ সালে?
অলি আহাদঃ ১৯২৮ সালে। 
আবদুল হাই শিকদারঃ এটা আপনার কুমিল্লা?
অলি আহাদঃ এটা কুমিল্লা ১৯২৮ সাল। 
আবদুল হাই শিকদারঃ না, আপনার হোমনা থানা। 
অলি আহাদঃ ১৯৩৯ সালে আব্বা ট্রান্সফার হয়ে দাউদকান্দিতে আসেন এবং সেখানে আমরা ছিলাম দাউদাকান্দি স্কুল থেকেই আমি ১৯৪২ সালে কুমিল্লা জেলা স্কুলে চলে গেলাম। তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। 
তখন ২য় মহাযুদ্ধ চলছে। ২য় মহাযুদ্ধের কারণে বোম্বিং হয়। ফেনীর উপরে জাপানী বোমাবর্ষণ হওয়ার পরে বৃটিশ গভর্ণমেন্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, আমাদের স্কুলকে সরিয়ে নেবে। আমি সেখান থেকে সরে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া অন্নদা হাই স্কুলে ভর্তি হলাম। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া অন্নদা হাই স্কুলেও আবার সেই গন্ডগোল দেখা দিল। থাকা খাওয়া নানা কষ্ট। সেখান থেকে আবার ফিরে আসলাম দাউদকান্দি হাই স্কুলে এবং দাউদকান্দি হাই স্কুল থেকেই আমি মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিলাম ১৯৪৪ সালে। 
 
আবুদল হাই শিকদারঃ তারপর আপনি ঢাকা চলে এলেন?
অলি আহাদঃ তারপর ওখান থেকে আমি ঢাকায় চলে এসে ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ভর্তি হই, বিজ্ঞান বিভাগে। 
আবদুল হাই শিকদারঃ ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ মানে এখন যেটি ঢাকা কলেজ?
অলি আহাদঃ হ্যাঁ, এখন যেটি ঢাকা কলেজ। তখন ফুলবাড়ীয়া স্টেশনের দক্ষিণদিকে ছিল এটা। ঢাকা কলেজ আগে ছিল হাইকোর্টে। এই হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের পুরানো বিল্ডিং যেটা, সেই বিল্ডিংএ ঢাকা কলেজ ছিল। ঢাকা কলেজ যুদ্ধের কারণে সেখান থেকে সরিয়ে ফুলবাড়ীয়া স্টেশনের দক্ষিণ দিকে দু’টি বাড়ী ভাড়া নেয়া হয়। ঐ দু’টি বাড়ীতে আমাদের ক্লাস হত। 
আবদুল হাই শিকদারঃ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আপনি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এলেন?
অলি আহাদঃ ইন্টারমিডিয়েট কলেজে থাকার সময়েই আমি মুসলিম ছাত্রলীগের সাথে জড়িত ছিলাম। বিশেষ করে ১৫০নং মোগলটুলিতে মুসলিম লীগের ওয়ার্কার্স ক্যাম্প ছিল এবং মুসলিম লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের নেতা ছিলেন জনাব শামছুল হক সাহেব। 
আবদুল হাই শিকদারঃ শামসুল হক মানে আমাদের টাঙ্গাইলের শামছুল হক?
অলি আহাদঃ টাঙ্গাইলের শামছুল হক যিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের ফাউন্ডার জেনারেল সেক্রেটারী ছিলেন। ওখানে আবুল হাশিম সাহেব, তদানীন্তন মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারী, তিনি আসতেন এবং আমরা তাকে বিপ্লবী চিন্তাবিদ বলেই মনে করতাম। তার সময়ে প্রথম কথা আসে যে, খোলাফায়ে রাশেদিনের সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্যই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এর আগে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হউক একথা হয়েছে। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হোক এ কথা হয়েছে। কিন্তু তার রূপরেখা কি? অর্থনীতির কি রূপ? সমাজের কি রূপ? তারপর রাষ্ট্রীয় কি রূপ? এ সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা দেয়া হত না। আমরা জনতামও না। তিনি আসার পরে এ বিপ্লবী চিন্তা আমাদের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। আমরাও তার অনুসারী হয়ে গেলাম। এখানেই ঢাকা কলেজে তিনি আমাকে ছাত্রলীগ করতে বললেন এবং আমি ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের মুসলিম ছাত্র লীগের প্রেসিডেন্ট হই। ১৯৪৫ সালেও আমি প্রেসিডেন্ট ছিলাম। তো, আমার পরে, জিল্লুর রহমান সাহেব আসেন। এই জিল্লুর রহমান, যিনি আজকে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী তিনি আসার পর তাকে আমি আমার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাই কলিকাতা। তখন নির্বাচনের ঘোষনা দেয়া হয়েছে। ১৯৪৫ সালে। 
 
আবদুল হাই শিকদারঃ অতঃপর?
অলি আহাদঃ ১৯৪৫-এ ঘোষনা দেয়। ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে আমি, আমার বড় ভাই, উনি তখন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র ছিলেন, আমরা ৬ ভাই। সবচে বড় ভাই যিনি, তিনি আমার রাজনীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। মাঝারো ভাই যিনি তিনিও রাজনীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। একমাত্র আব্বা.... আম্মা, এখন আর কি করব .... ছেলে যখন করে, কি করব। কিছুতো আর বলা যায় না. এ পর্যন্তই। আব্বা চান যে আমি ভাল ছাত্র হিসেবে বেরিয়ে আসি। তো এটা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। যে কোন কারণেই তারপরে আমার করিম ভাই-এর কাছে যিনি নাকি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, সলিমুল্লাহ হলের ছাত্র, উনার কাছে গেলাম যে আমি পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দেয়ার জন্য নবাবজাদা লিয়াকত আলী খানের একটা ঘোষনা এসেছে। সে ঘোষনায় আমি মনে করি আমি এ বছর পরীক্ষা দেব না আগামী বছর আমি পরীক্ষা দেব। তো করিম ভাই বলল যে, এখন আব্বাকে কি দিয়ে বুঝ দেই? বড় ভাইকে মাঝারো ভাইকে কি দিয়ে বুঝ দেই? আব্বা মনলেও তো, ওরা মানবে না। আমি বলি, সেটা আপনি পারবেন কিনা। কিন্তু আমি পরীক্ষা দিতে চাই না। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি পরবর্তীকালে আমার রেজাল্ট দিয়ে খুশি করব। পরে করিম ভাই বললেন- ঠিক আছে তাই যা, দেখি আমি কি করতে পারি। তো পরে আমি কথা অনুযায়ী কলিকাতা চলে গেলাম। কলিকাতা গিয়া ওখানে নুরুদ্দিন ভাইয়ের সাথে মুজিব ভাইয়ের সাথে আমার দেখা হল। 
আবদুল হাই শিকদারঃ মুজিব ভাই মানে ..... শেখ মুজিবুর রহমান ?
অলি আহাদঃ হ্যাঁ, শেখ মুজিবুর রহমান। তখন নেতা ছিলেন নুরুদ্দিন ভাই। নুরুদ্দিন ভাই ছিলেন অল বেঙ্গল মুসলিম লীগের একটিং জেনারেল সেক্রেটারী। আমরা তার সাথে দেখা করলাম। কথাবার্তার পর আমাকে বললেন এক কাজ কর। আমরা ওয়ার্কার্স ক্যাম্প প্রতি জেলায় জেলায় করতেছি, তোমাকেও আমরা সেখানে নিয়ে যেতে চাই। চারজনই করে ওয়ার্কার্স ক্যাম্পে নেতা থাকবে, প্রত্যেক জেলায়। ত্রিপুরা জেলায় তোমার বাড়ী। 
আবদুল হাই শিকদারঃ তখন কুমিল্লার নাম তো আসলে ত্রিপুরা জেলা ছিল। 
অলি আহাদঃ তখন ত্রিপুরা জেলা ছিল। কুমিল্লা জেলা ছিল না। আর ওটাই বৃহত্তর জেলা ছিল। কুমিল্লাতে আমাদের হেড অফিস। ডিস্ট্রিক্ট অফিস। সেই অনুপাতে আমাকে বলল যে, তুমি, খন্দকার মোশতাক আহমদ, সিরাজুল ইসলাম চাঁদপুরের আর রফিকুল হোসেন ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার। 
আবদুল হাই শিকদারঃ খন্দকার মোশতাক যিনি আমাদের এক্স প্রেসিডেন্ট ?
অলি আহাদঃ আমাদের এক্স প্রেসিডেন্ট খন্দাকার। তোমরা চারজন, খন্দকার মোশতাক হবে ওয়ার্কার্স ইন চীফ, রাজি আছ? তো আমি বললাম হ্যাঁ আমি রাজি। 
আমি তো পরীক্ষা দেব না এটা ডিসাইড করেই আসছি। প্রথম কাজ হল আমার পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত করা। তারপর পরীক্ষা দেয়া। এটা ১৯৪৫-এর কথা। ১৯৪৫ সালেই নির্বাচন ঘোষনা করা হল। ‘৪৫-এ লিয়াকত আলী খান আবেদন জানাইল যে, তোমরা সবাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য বেরিয়ে আসো, স্কুল ছাড়ো, কলেজ ছাড়ো। আমরাও সে আহবানে সাড়া দিয়ে কলেজ ছেড়ে দিয়ে ওনাদের কথা অনুযায়ী কুমিল্লাতে ওয়ার্কার্স ক্যাম্পে যোগ দিলাম। আমরা সেখানে সেই মফস্বলে নির্বাচন ১৯৪৬ সালের শেষ পর্যন্ত পরিচালিত করলাম। ঠিক আমরা পরিচালিত করিনি। যেহেতু কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ডাক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা, মুসলমানদের সেই স্বতন্ত্র বাসভূমির দাবী ওঠার পরেই দেখা গেল সমগ্র বাংলাদেশে, তখনকার বেঙ্গল-অল বেঙ্গলে অসম্ভব রকম সাড়া পড়ে গেল। আমাদের বেশি খাটা-খাটনি করতে হয়নি। আমাদের যেতে হয়েছে। বলতে হয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় ওয়াকার্স হিসেবে ওয়ার্কার্স আনতে হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় আমাদের ডাকে নির্বাচন হয়েছে। ডাক কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর। তিনি যা বলেছিলেন মানুষ তাই মেনে নিয়েছিল। কলাগাছকে ভোট দাও, কলাগাছকে ভোট দেয়ার জন্য মানুষ তৈরী হয়ে গিয়েছিল। যাকেই নমিনেশন দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন করা হয়নি। এই ভাবে আমরা সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসি।
এভাবে আমি মুসলিম লীগের সাথে পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ি। কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়ার মূল দৃষ্টিভঙ্গিটাই ছিল- আমরা চেয়েছিলাম যে, খোলাফায়ে রাশেদিনের সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু দুঃখের বিষয় যা অবশ্য পরবর্তীকালের কথা-খোলাফায়ে রাশেদিনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করব এই স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠিত করলাম তারপর দেখা গেল আর সেখানে খোলাফায়ে রাশেদিনের সমাজ ব্যবস্থা হয় না, হয় ঢাকা ক্লাবের সমাজ ব্যবস্থা। মদ খাওয়া, মাগীবাজি করা। ইসলামকে বাদ দিয়ে দেয়া, মুখে ইসলাম থাকা এগুলো এসে দাঁড়ায়ে গেল।
আবদুল হাই শিকদারঃ এটা ‘৪৭ সালের কথা ? মানে পাকিস্তান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল যে, অনৈসলামিক ব্যাপার, যেগুলোর বিরুদ্ধে আপনারা সংগ্রাম করেছেন সেগুলোই একেবারে হুবহু আরম্ভ হয়ে গেছে?
অলি আহাদঃ হ্যাঁ হুবহু আরম্ভ হয়ে গেছে।
অধ্যাপক মোমেনুল হকঃ পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য যে কার্যকলাপ গুলো হয়েছিল জনাব শেখ মুজিবুর রহমান, পাকিস্তান আন্দোলনে তার ভূমিকা কি ছিল?
অলি আহাদঃ জনাব শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আন্দোলনে ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম নেতা।
অধ্যাপক মোমেনুল হকঃ শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব পাকিস্তান আন্দোলনে একমাত্র অগ্রসেনানী ছিলেন?
অলি আহাদঃ একমাত্র সেনানী নন। সেনাপতি ছিলেন নুরুদ্দিন সাহেব।
আবদুল হাই শিকদারঃ ‘৪৭ সালে তখন তো আপনি কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র?
অলি আহাদঃ ‘৪৭ সালে এসে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হই।
আবদুল হাই শিকদারঃ দুটি প্রেক্ষিতে একটা হলো কলিকাতা কেন্দ্রিক আন্দোলন। অন্যটি ঢাকা কেন্দ্রিক আন্দোলন, আপনি দুটোর সাথেই সম্পৃক্ত ছিলেন?
অলি আহাদঃ দুটোর সাথেই সম্পৃক্ত ছিলাম।
আবদুল হাই শিকদারঃ এই খানে আমরা একটু জানতে চাই যেটা আমাদের অধ্যাপক মোমেনুল হক সাহেব বলেছেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের একটা বিরাট অবদান আছে আমাদের সেই সময়কার পাকিস্তান আন্দোলনে। তো তার ভূমিকাটা কি ছিল? একটু যদি ব্যাখ্যা করেন। 
অলি আহাদঃ পাকিস্তান আন্দোলনে ছাত্রদের সংগঠিত করার জন্য কলিকাতাসহ বিভিন্ন জেলায় জেলায় ঘুরে ছাত্র আন্দোলনকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তার খুব অগ্রণী ভূমিকা ছিল। মুসলিম লীগের যে দু’টি গ্র“প ছিল, সোহরাওয়ার্দী ও জনাব আবুল হাশিম সাহেব। আমরা দু’জনেরই সমর্থক ছিলাম। শেখ সাহেব আবুল হাশিম সাহেবের সমর্থক ছিলন সত্য, কিন্তু তিনি বলতেন আরে দুরু রবুবিয়াত, এসব হবে টবে না, যদিও আমি এসব বুঝি না। ধারও ধারি না। আমি সোহরাওয়ার্দী সাব-জিন্দাবাদ। সোহরাওয়ার্দী সাহেবও রবুবিয়াতের ধারও ধারেন না। বুঝেন না। এই ছিলেন শেখ সাহেব। শেখ সাহেব পাকিস্তানের পক্ষে, মুসলমানের পক্ষে তখনকার দিনে একজন অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী ছিলেন। এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। এমনকি বিহারে যখন মুসলমানদের কচুকাটা করা হয় তখন সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রাইম মিনিষ্টার। তখনকার দিনে বেঙ্গলের যে মুখ্যমন্ত্রী তাকে প্রধানমন্ত্রী বলা হত। প্রাইম মিনিষ্টার থাকাকালে উনি বিহারেও যাতে কাজ করা যায় তার চেষ্টা করেছেন। আবার গণভোট ‘৪৭ সালে যখন হয়, সেই গণভোটেও তিনি সিলেটে কাজ করেছেন। শেখ সাহেবের অবদানের কোন শেষ নেই। উনি সেনাপতি ছিলেন না, কিন্তু অবদান ছিল অনেক। 
অধ্যাপক মোমেনুল হকঃ এ কথাটা বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একটা মহল বলছে, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন। অখন্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন। 
অলি আহাদঃ সর্বৈব মিথ্যা কথা। এ কথা যে জন্ম দিয়েছে, তাকে আমার শক্ত ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় তার বাপের ......। এবং তারা দিল্লির দালাল।
আবদুল হাই শিকদারঃ এবং তারা শেখ মুজিবকেও ভালবাসে না।
অলি আহাদঃ শেখ মুজিবকেও ভালবাসে না। তারা দালালী করার জন্য শেখ সাহেবকে ব্যবহার করার জন্য যেটা দরকার, সেটা করে।
আবদুল গফুরঃ কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যে দ্বি-জাতি তত্ত্ব প্রকাশ করেছিলেন, যার ভিত্তিতে পাকিস্তান আন্দোলন হল এবং যার ভেতরে আপনি একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন, সেখানে শেখ সাহেবকেও দেখা যায়, এ ব্যাপারে সক্রিয় নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্র সমাজের ভেতরে। তাহলে কি আমরা বলব যে, তিনিও দ্বি-জাতি তত্ত্ব বাস্তবায়নের জন্য কাজ করেছেন তখন?
অলি আহাদঃ একশ’ পারসেন্ট। একশ’ ভাগ। তিনি হানড্রেড পারসেন্ট, বরং একটা সেকুলার স্ট্যান্ড আমাদের মনের মধ্যে ছিল। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে রয়টারের রিপ্রেজেন্টেটিভ ক্যাম্বলে যখন প্রশ্ন করলেন Well Qaid-e-Azam! Would it be a theocratic state, if Pakistan is acheived or a secular state? Qaid-e-Azam replied, It would be a secular state. আমরা এটার পক্ষে ছিলাম। শেখ সাহেব এটার পক্ষে ছিলেন না। উনি সেকুলার স্টেটও বুঝতেন না, থিওক্রেটিক স্টেটও বুঝতেন না। এর চেয়ে নির্মম সত্য নেই। এখন কেউ যদি বানিয়ে বলেন, যে উনি বুঝতেন থিওক্রেটিক স্টেট, ওনারে দিয়ে মুজিব বাদ লেখিয়েছেন, যেটা জীবনেও উনি লেখেননি, এটা লিখতে জানেনও না, জানলে তো উনি লিখবেন। সুতরাং উনি থিওক্রেটিক স্টেট বলেন, আর ডেমোক্রেটিক স্টেট বলেন, সেক্যুলার স্টেট বলেন, পিপলস্ স্টেট বলেন উনি কিছুই বুঝতেন না। উনি একটা জিনিস বুঝতেন ক্ষমতা পেতে হলে একটা বাহন দরকার। সেই বাহন সোহরাওয়ার্দী সাহেব। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের পিছনে থাকলে ক্ষমতা পাওয়া যাবে। তিনি ফাইটিং এলিমেন্ট ছিলেন। এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। ক্ষমতাকে লক্ষ্য করে ফাইটিং। আদর্শকে প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ছিলেন না। 
আবদুল হাই শিকদারঃ আচ্ছা, তাহলে আমরা একটা জিনিস দেখতে পাচ্ছি যে, সেদিনকার পাকিস্তান মুভমেন্টে বাংলাদেশের মুসলমানদের যে একটা বিরাট অংশ গ্রহণ ছিল 
এটার সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ডটা কি? কেন সেই সময়ে বাংলাদেশের মুসলমানরা পাকিস্তানের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল? এবং তারাই পরবর্তীকালে দেখা গেল পাকিস্তান ভাঙ্গলো। মুক্তিযুদ্ধ করল?
অলি আহাদঃ প্রথম কারণ হল। বাঙালীরা, বঙ্গবাসী মুসলমানরা ধর্মভীরু ছিল। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিস কর্তৃক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হওয়ার ফলে মুসলমানরা সর্বস্বান্ত হলো। মুসলমানরা জমিজমার উপরই নির্ভরশীল ছিল। জমিদার বলতেও তারাই ছিলেন, জায়গীরদার বলতেও তারাই ছিলেন, চাষী বলতেও তারাই ছিলেন, সুতরাং তাদের সেই অধিকারটা হিন্দুদের হাতে যখন চলে গেল, জমিদারী অর্থাৎ জমির মালিকানা এবং মধ্যস্বত্বভোগী যখন তারা হল তখন মুসলমানদের উপর ‘আস্তে আস্তে মহাজনী এবং নানাভাবে অত্যাচার আরম্ভ হল। এতে মুসলমানদের মনে আস্তে আস্তে বিরূপ মনোভাব এসে গেল। তারা চেয়েছে যে, তাদের থেকে আমরা মুক্তি চাই। এই হল প্রথম সামাজিক কারণ। এই সামাজিক কারণে পরবর্তীকালে ইসলামরে প্রতি তাদের সে বন্ধনের কারণটা হল, ইসলাম তারা গ্রহণ করেছে, ইসলাম যদি রক্ষা না পায় হিন্দুদের যে অত্যাচার হবে সে অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়া দায়। যেমন, বঙ্কিমচন্দ্রের বই লেখা এবং ঐ হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার করা। আবার মুসলমান হিন্দুর বাড়ীতে গেলে হুক্কাতে তামাক খাইতে না দেয়া, পানি চাইলে পরে পানি উপর থেকে ঢেলে দেয়া। আমরা হা করে সেই পানি খেতাম। এই ধরনের অত্যাচার ছোট ছোট অত্যাচার, কিন্তু এই অত্যাচার সামাজিক অত্যাচারের অন্তর্ভূক্ত এবং এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে তারা ছিল বলেই যখন শ্লোগান উঠল মুসলমানের জন্য ইসলামী স্টেট হবে। মুসলমানের কৃষ্টি রক্ষা পাবে। মুসলমানের আবাসভূমি হবে তাদের তাহজীব তমদ্দুন রক্ষা পাবে, মক্কা মদীনায় যেতে পারবে; এই ধরনের মনোভাব তাদের মধ্যে দৃঢ় হয়েছিল। আর চাকরি বাকরি, দেখা যেত মুসলমানরা বিএ পাশ করলেও চাকরি পায় না। আর হিন্দু ম্যাট্্িরক পাস না করলেও তার চাকরিটা দাদা দাদা করে হয়ে যায়। এটাও আরেকটা কারণ এবং এটা বোধ হয় মূল্য কারণ হয়ে দাঁড়ায় পরবর্তীকালে। এই মূখ্য কারণই গিয়ে দাঁড়ায় সব হিন্দুরা নিয়ে গেল, মুসলমানদের কিছু দিবে না এবং তার জন্য মুসলমানরা এই দাবীর পিছনে সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং এরই কারণে সেই নির্বাচনে জয়ী হয়।
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা অলি আহাদ ভাই, আপনি তো শেখ সাহেবের সাথে কলিকাতা থেকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। 
অলি আহাদঃ খুব ঘনিষ্ঠ।
আবদুল গফুরঃ তাহলে এই যে, একটা কথা বলা হয় যে, শেখ সাহেব পাকিস্তান আন্দোলনে বিশ্বাসী ছিলেন না। আপাতত সোরোওয়ার্দী সাহেবের সাথে ছিলেন এবং ‘৪৭ সাল থেকেই তিনি পাকিস্তানকে ধ্বংস করে বা এটাকে অবলুপ্ত করে একটা স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের জন্য চিন্তা করেছিলেন এ ব্যাপারে আপনার কি মতামত?
অলি আহাদঃ কম্যুনিস্ট পার্টি, পাকিস্তান হওয়ার পর পাকিস্তানকে নিন্দা করত এ কথা বলে আরে পাকিস্তান একটা স্টেট না কি? রানাঘাট টু কলিকাতা, রানাঘাট টু কলিকাতা ট্রেনে যেমন চিল্লাচিল্লি হয় ঠিক এই রকম একটা স্টেট। শেখ সাহেব এই কথা শোনার পরে খুব রাগ হয়ে গেলেন। তিনি আমাকে একদিন বললেন যে, অলি আহাদ দেখছসনি, এরা কয় কি? রানাঘাট টু কলিকাতা কয়। এই শুয়োরের বাচ্চাদের সংগে থাকা যাবে না। তাগোরে শিক্ষা দিতে হইব। অহন তাইলে কেমনে দিবেন? তখন ময়মনসিংহে একটা মিটিং ডাকা হইছিল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের। বললেন চল যাই। আমিতো যাবই। আমি গিয়া ঐটা ভাইঙ্গা দিয়া আসি এবং তিনি গেলেন সেখানে এবং ভাইঙ্গা দিলেন ঐটাকে। ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নকে আর দাঁড়াইতে দিলেন না। শেখ সাহেব পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন না বিপক্ষে ছিলেন এটাই তার প্রমাণ।
আবদুল হাই শিকদারঃ বদরুদ্দিন উমর তার বইতে লেখেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ‘৪৮ এর ১৬ই ফেব্র“য়ারী শেখ সাহেব টুপি মাথায় দিয়া মিটিংএ প্রিসাইড করতে বইসা গেলেন........
অলি আহাদঃ হ্যাঁ ১৬ ফেব্র“য়ারী। ১লা মার্চ ও ১৬ মার্চের সেই মিটিংয়ে তিনি প্রিসাইড করলেন এবং সেখানে তিনি পরিষ্কারভাবে বললেন, পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য যে কোন চেষ্টা হবে সেই চেষ্টা আমরা বাধা দেব। আমরা আন্দোলন করি ঠিক আছে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, ঠিক আছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে পাকিস্তানকে ভাঙ্গা হবে। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যে আসতেছেন আমরা এর পর আন্দোলন বন্ধ করে দেব। বন্ধ করে দিয়া আমরা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে রিসিভ করব। আমাদের নেতা, আমাদের পাকিস্তানের স্রষ্টা, পাকিস্তানের জনক। সুতরাং পাকিস্তান সম্পর্কে শেখ সাহেবের যে ধারণা এটা তো আমরা ভাল বলতে পারব। আর একটি কথা পরিষ্কার, তখনকার দিনে ‘৪৭-এর একটা কথা ছিল যে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের কথা ছিল। স্বাধীন সার্বভৌম বঙ্গভূমি কি? সোহরাওয়ার্দী সাহেব, আবুল হাশিম সাহেব, শরৎ বোস তারা যে Independent Bengal এর Plan করেছিলেন As a declaration of Cabinet Mission plan, As a declaration of grouping তার বিরুদ্ধে তারা যে আওয়াজ তুলেছিলেন সেটা হল স্বাধীন সার্বভৌম বঙ্গদেশ। তখনকার দিনে দুইটি শ্লোগার ছিল শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির। শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যে, বঙ্গভূমিকে দুই ভাগ করে ফেলা হবে। এক ভাগ হবে পশ্চিমবঙ্গ অন্যটি পবে পূর্ববঙ্গ। আমরা মুসলমানদের সাথে থাকবো না বা যদি কেবিনেট মিশন প্লান গৃহীতও হয় এরপর যদি ভারত প্রতিষ্ঠিত হয় তথাপিও আমরা মুসলমানদের সাথে থাকব না। আমরা পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গ দুই ভাগে বিভক্ত বঙ্গদেশ গড়ব। আমরা মুসলমানদের সাথে থাকব না।
আবদুল গফুরঃ অর্থাৎ উনি বলেছিলেন বোধ হয় একটি কথা, ভারত যদি ভাগ নাও হয় তবু বাংলা ভাগ করতে হবে। কারণ তারা মুসলমানদের রাজত্বে থাকতে চায় না। 
অলি আহাদঃ ঐটাই বলেছিলেন। এ ব্যাপারে পন্ডিত নেহুরু, প্যাটেল, আচার্য কৃপালিনী, গান্ধী তারা সবাই চেয়েছিলেন যে বঙ্গ বিভক্ত হোক এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনাইটেড বেঙ্গল হোক এটা তারা চাননি। তাদের চিন্তার বিরুদ্ধে ছিল যাকে এত কথা বলা হয়, তার নাম কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে আলাপ-আলোচনা করে ঘোষণা দিলেন- বেঙ্গল ইন্ডিপেন্ডেন্ট সভরেন এবং আমরা সেই দাবীটা সমর্থন করি। কিন্তু গান্ধীজি সেই সময় ঢাকাতে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি তখন আসলেন মিটিং করার জন্য, সে মিটিংটা ছিল করোনেশন পার্কে, সদরঘাটে। এবং সেই মিটিংয়ে তার দাবী ছিল বঙ্গভঙ্গ করতে হবে। যে হিন্দুরা একবার বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল ১৯০৫ সালে, সেই হিন্দুরাই শ্যামা প্রসাদের প্ররোচনায়, গান্ধীজির প্ররোচনায়, নেহরুর প্ররোচনায়, প্যাটেলের প্ররোচনায় এবং সামগ্রিক কংগ্রেসের প্ররোচনায় (কংগ্রেসের কিছু অংশ বাদ দিয়ে)
কিরণ শংকর রায়ের কথা বলি, শরৎচন্দ্র বোসের কথা বলি, এসএম দাসগুপ্ত- তাদের কথা বলি তারা সবাই ইন্ডিপেন্ডেন্ট বেঙ্গল-এর পক্ষে ছিলেন। কিন্তু আর বেশীর ভাগ কংগ্রেস ছিল বঙ্গভঙ্গের পক্ষে। যারা নাকি বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষে ছিলেন ১৯০৫ সালে তারাই পরবর্তীকালে দেখা গেল বাঙ্গভঙ্গের পক্ষে এবং কলোনিয়াল লাইনে সেই বঙ্গভঙ্গ হওয়া চাই। তারা ন্যাশনালিষ্ট ছিল না, সেক্যুলার ছিল না, তাদের কার্যকলাপে প্রমাণ আছে তারা কম্যুনাল। সে অবস্থায় যাকে কম্যুনাল বলা হয় কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তারা ঘোষণা করলেন, আমরা সভরেন বেঙ্গল, ইউনাইটেড বেঙ্গল, ইন্ডিপেন্ডেন্ট বেঙ্গল চাই, সেটা আমাদের দাবী। আমরা এটা ডিভিশন চাই না। সে অবস্থায় শেখ সাহেব, আমরাও যখন পাকিস্তান হল, আমাদের মনে মনে একটা কথা ছিল, আমরা উচ্চারণও করেছি জায়গায় জায়গায় যে, বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আমরা ইন্ডিপেন্ডেন্ট, সভরেন্ট বেঙ্গল চাইতে গিয়ে যা যা সংগ্রাম করা দরকার সেই সংগ্রাম আমরা করব। এই একটা সাধারণ আবহাওয়া আবুল হাশিমের যারা আমরা সমর্থক ছিলাম। তা আমাদের মধ্যে ছিল। কিন্তু শেখ সাহেব, ঐ, তার অংশ হিসেবে হয়তো বলতে পারে আমি স্বাধীন- সার্বভৌম বাংলাদেশ চাই। কিন্তু তা বললে পরেও শেখ সাহেবের কার্যকলাপে পরবর্তীকালে প্রমাণ হয়েছে অন্য রকম। সেটা ১৯৫৬ সালে মন্ত্রী যখন ছিলেন তখনকার অবস্থা পরবর্তীকালের অবস্থা যোগ-বিয়োগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় শেখ সাহেবের কোন প্রকার নীতি পরিষ্কার ছিল না। উনি বঙ্গভঙ্গ চান, যদি ক্ষমতায় থাকতে পারেন। উনি বঙ্গভঙ্গ চাই না যদি ক্ষমতায় না থাকতে পারি, আর অখণ্ড বঙ্গ চাই, যদি ক্ষমতা আমার হয়। আর যদি ক্ষমতা না হয় তাহলে অখণ্ড বঙ্গ কোর আর না হোক, আমার কিছু আসে যায় না। শেখ সাহেব ছিলেন এ ধরনের লোক। অর্থাৎ তার উপরে এ কথা আরোপ করা যে, ‘৪৭ সাল থেকে তিনি অখণ্ড বঙ্গের পক্ষে ছিলেন, এ কথা সত্য নয়।
আবদুল হাই শিকদারঃ এখানে একটা কথা ‘৪৭-এর পরবর্তীকালে আপনি বলেছেন ‘৬০-এর দশক পর্যন্ত শেখ সাহেব, স্বাধীন বাংলাদেশ বা স্বাধীন বংগের কোন কাজ করেন নাই।
অলি আহাদঃ না করেন নাই।
আবদুল হাই শিকদারঃ তাহলে এখন শেখ সাহেবের পরবর্তী ভূমিকাটা কিভাবে দখবেন আপনি?
অলি আহদঃ পরবর্তী ভূমিকা ?
আবদুল হাই শিকদারঃ হ্যাঁ।
অলি আহাদঃ আমি তো আগেই বলেছি। 
আবদুল হাই শিকদারঃ ‘৭০ পরবর্তী ভূমিকা, ‘৭১ পরবর্তী ভূমিকা।
অলি আহাদঃ পাকিস্তান থাকতে যে ষড়যন্ত্র ছিল, সেনাবাহিনীর তরফ থেকে কায়েমী স্বার্থের তরফ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের তরফ থেকে সেখানে তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। একথা তিনি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও প্রমাণ পেয়েছেন। যদিও তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন ইয়াহিয়া খানের ভাষায়, তিনি যেহেতু হতে পারবেন না, সেহেতু বাংলা বললে পরে, বঙ্গদেশ যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, পরে তিনি চীফ মিনিস্টার হতে পারবেন এবং হয়েছেনও তাই। এটুকু ক্যালকুলেশন শেখ সাহেবের পরিষ্কার ছিল। সেই আন্দোলনটার সময়, এর আগে নয়।
আবদুল হাই শিকদারঃ তাহলে ‘৭১ সালে এবং ‘৭১ পরবর্তী তাঁর যে ভূমিকা এটাকে একটু আপনি ব্যাখ্যা করবেন... 
অলি আহাদঃ ‘৭১ সালে তিনি, তার স্বাধীনতা আন্দোলনে যে ভূমিকা ছয় দফা আন্দোলনের প্রবক্তা, ছয় দফার জন্য তার ত্যাগ আছে, ডিটারমিনেশন আছে, সব কিছু আছে। তো ছয় দফা আন্দোলন, যখন তিনি নির্বাচনে জয়ী হলেন তখন আসল পরীক্ষা শুরু হল। ‘৭১ সালে যখন না-কি তিনি ছয় দফা দাবী আরম্ভ করতে করলেন, তখন কনফেডারেশন, প্রায় ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা করে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এই সবকিছুই তখন তার কাছে এটাই ছিল যে, যদি এটা হয় তাহলে পূর্ববঙ্গ স্বাধীন হবে, স্বাধীন হলে আমি হব এটার রাষ্ট্রপতি এবং সংগে সংগে সমস্ত সুনাম যা কিছু আছে সব আমার হয়ে যাবে এবং তাই সত্য। তিনি ‘৭১ সালে ..... এটাতে চেয়েছেন সত্য, কিন্তু আবার বুকের মধ্যে সেই সাহসটা ছিলনা। আমরা যখন ওনাকে দেখা করে বললাম- “মুজিব ভাই, আপনি একটা কাজ করেন, ইউনাইটেড ন্যাশনস-এ বলে দেন যে, আমরা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে চাই এবং আমরা সাহায্য চাই ইউনাইটেড ন্যাশন্সের। তিনি বললেন পাগল নাকি! কি কস তুই এইসব। এটা আমার দ্বারা হবে না। এটা সম্ভব না।” তাজ উদ্দিন আহমেদও ছিলেন তখন। তারাও সে কথাই বললেন যে, “এটা অতি বিপ্লবী কথা। আমরা এই অতি বিপ্লবী কথা বলেছি সত্য (তাদের ভাষায়), কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গেল যখন না-কি ২৫ তারিখে হামলা আসল, শেখ সাহেবকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সেনাপতি হিসেবে সংগ্রাম পরিচালনা করার জন্য রক্তাক্ত যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য তিনি অনুপস্থিত রয়ে গেলেন। অর্থাৎ বাড়ীতে থেকে গেলেন। কার পরামর্শে জানি না। পরামর্শ তো নিশ্চয়ই পেয়েছেন যে, বাড়ীতে থাকলে তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে এবং সেই গ্রেফতার করলে পরে, স্বাধীনতা আন্দোলন তিনি চেয়েছিলেন এই কথাটা প্রমাণিত হবে এবং গ্রেফতার হওয়ার পর যে একটা আলাপ আলোচনা সমঝোতা হয় সেই সমঝোতাতে এটাই দাঁড়াবে- শেখ সাহেব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন চেয়েছেন, স্বাধীনতা চান নাই তার জন্যই তিনি আত্মসমর্পণ করলেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জেলখানায় চলে গেলেন। এই হল তার ভূমিকা। 
আবদুল হাই শিকদারঃ স্বাধীনতার ঘোষণা যেটা বলা হচ্ছে যে, তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন চট্টগ্রামের জনৈক হান্নানের মাধ্যমে, এই স্বাধীনতার ঘোষণাটা কি ? ........
অলি আহাদঃ এইটা গাঁজাখোরি গল্প। মিছা কথার কোন ..... ইয়ে হয় না। শেখ সাহেব ফিরে আসার পর তিনি ঘোষণা দিছেন তা ছাপিয়ে দেয়া হয়। যেটা দাবী করে। আমার সাথে দেখা হল। আমি মুজিব ভাইকে বললাম- “মুজিব ভাই, আপনি এটা কি করলেন। আপনি তো কোন ঘোষণা দেন নাই। অথচ আপনার নামে একটা কাগজ বের কইরা দিছেন। আপনি জহুর আহম্মদ চৌধুরীকে টেলিফোন কইরা কি জানাইছেন? আমি নিজে জহুর আহম্মদ চৌধুরীর সাথে আগরতলায় আলোচনা করেছি। জহুর আহম্মদ চৌধুরী আমারে বলেছেন- “না, শেখ সাহেব আমাদের কোন ঘোষণা দেন নাই। আমরা জানি না।” তো ঘোষণা দেন নাই, জহুর আহম্মদ চৌধুরী জানেন নাই, অথচ তার কাছে টেলিগ্রাম পাঠাইছেন, সেটা ছাপাইলেন কি করে? তো আমি তর্ক করলাম যে, মুজিব ভাই এ কথাটা, এ কাজ করাটা ঠিক না, আপনার উচিত ছিল- এটা মাইনা নেওয়া যে, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষনা করেছে। এ কথা যদি বলেন তো আপনি ছোট হবেন ন্,া আপনিই প্রেসিডেন্ট এখন। একথা আপনাকে বুঝতে হবে, আপনিই প্রেসিডেন্ট। আপনি জাতির পিতা হিসেবে এখন পরিচিত হতে চান। এটা আপনাকে জানতে হবে। অতএব, আপনি জিয়াউর রহমানকে যদি সেই ক্রেডিটটা দিতেন যে, আমার পক্ষ হইয়া না হোক, দেশের সেই ক্রান্তিলগ্নে জিয়াউর রহমানের মত একজন মেজর স্বাধীনতা ঘোষণা করায় মানুষের মনের ভিতর সাহস ফিরে আসে। এটাতো আপনার বলা উচিত ছিল। এটা বললে আপনি বড় হইতেন। ছোট হইতেন না। তিনি মুচকি হাসলেন। কোন উত্তর দিলেন না।
আবদুল হাই শিকদারঃ আচ্ছা, এবার আমরা একটু ভাষা আন্দোলনের দিকে যাই। ১৯৫২’র একুশে ফেব্র“য়ারী তো ভাষা আন্দোলনের চরম মুহূর্ত। তো সেই ভাষা আন্দোলনে আপনার নিজের ভূমিকা এবং ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন ..........
অলি আহাদঃ আমি এ প্রসঙ্গে বলব না। সেটা আপনাদের বই পড়ে নিতে হবে।
আবদুল গফুরঃ আমি বরং একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই ........ এখন বাজারে একটা কথা একটা মহল প্রচার করছে, এবং প্রচুর পাঠ্যপুস্তক এ জিনিসটা ছাত্রদের পড়ানো হচ্ছে যে- ভাষা আন্দোলন কিভাবে শুরু হল? শুরু হল কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসলেন। তিনি বললেন যে, একমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা। এতে মানুষ ক্ষেপে গেল। এরপর থেকেই ........ এই যে, উনিতো আসলেন ১৯৪৮ সালের ১৯শে মার্চ। আমরা শুনি যে, ১১ই মার্চে আন্দোলন শুরু হয়েছে। তাহলে, ভাষা আন্দোলন আসলে শুরু হয়েছিল কবে? জিন্নাহ সাহেব আসার পর শুরু হল, না ‘৪৭-এ?
অলি আহাদঃ অনেক আগে থেকে ১৯৪৭ সালে যে আন্দোলন আরম্ভ হয় তখন আন্দোলন করতাম। আবুল কাশেম সাহেব, তমুদ্দুন মজলিশ গঠন করেন এবং তারপর তিনি রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন আরম্ভ করেন। রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের স্থপতি যদি কাউকে বলা হয়, শুরু করেছিল যদি কাউকে বলতে হয়, উদ্যোগী যদি কাউকে বলতে হয় তাহলে প্রথম নাম বলতে হয় জনাব আবুল কাশেম সাহেবের। প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম সাহেব। এবং তার অর্থ হল তার যে প্রতিষ্ঠান তমদ্দুন মজলিশ। আমরা ছাত্রলীগে উনার সাথে জড়িত হয়েছিলাম। এই হল আমাদের প্রকৃত ইতিহাস। এই ইতিহাস অন্য কোনভাবে নেয়ার কোন অবকাশ নাই। উপায় নাই। যদি নেয় তবে তা মিথ্যা কথা। বইয়ে লেখুক আর যেখানেই লিখুক।
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা আপনি তো ছাত্রলীগের প্রথম থেকেই। এই ছাত্র লীগের প্রতিষ্ঠা হয় বোধ হয় নতুন করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ হিসেবে ১৯৪৮ সালে। এবং আপনি তখন যতটুকু আমার মনে পড়ে ত্রিপুরা জেলার প্রতিনিধি ছিলেন?
অলি আহাদঃ ঢাকা সিটির কনভেনরও ছিলাম।
আবদুল গফুরঃ তাহলে ‘৪৭ সাল থেকে তমদ্দুন মজলিশের উদ্যোগে আবুল কাশেম সাহেবের উদ্যোগে ভাষা আন্দোলন শুরু হয় এবং আপনারা তখন বিচ্ছিন্নভাবে এর প্রতি সমর্থন করে আসছিলেন। 
অলি আহাদঃ একটা কথা ভুললে চলবে না। আমি অল বেঙ্গল মুসলিমলীগেও ছিলাম, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছি। তারপরে যখন এই আন্দোলন আসল আমরা মুসলিম ছাত্রলীগের
 
সদস্য হিসেবে আবুল কাশেম সাহেবকে আমরা সমর্থন করেছিলাম এবং মূল কথা হল, ভাষা আমরা চেয়েছি বাঙলা তার জন্য আমাদের অবস্থান যেখানেই থাকুক না কেন আমরা এটা করেছি। এর মধ্যে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আসার পর ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছে এটা সর্বৈব মিথ্যা কথা। ইতিহাস বিরুদ্ধ কথা। যারা বলে তাদেরকে চাবকানো দরকার, তাদের শুধু চাবকানো না, তাদের বিচার হওয়া দরকার।
অধ্যাপক মোমেনুল হকঃ পাকিস্তান হওয়ার পরে যে মুসলিম ছাত্রলীগ এখানে প্রতিষ্ঠিত হল, নিখিল পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ তার প্রতিষ্ঠাতা নিয়েও কিন্তু এখন বিভ্রান্তি আছে। আমি যতটকু পড়েছি তাতে আমরা জানি যে ফজলুল হক হলে এটা হয়েছিল। জনাব মোহাম্মদ তোয়াহা তখন ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ছিলেন। জনাব শেখ মুজিবর রহমানকে এটার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও কোন কোন বইয়ে লেখা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রন্থকাররা লিখেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে সাংবাদিকতার কাজ করতে গিয়ে আমি বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি যে, এর কোন দলিল পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে এর প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
অলি আহাদঃ প্রতিষ্ঠাতা ছিল কথাটায় আসেতেছি। নিখিল বংগ মুসলিম ছাত্রলীগে যখন দেখা গেল যে, নাজিমুদ্দিন সাহেবের সমর্থক ভরা, আমরা আশা করেছিলাম, নুরুদ্দিন সাহেব যিনি বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্ট লীগের একটিং জেনারেল সেক্রেটারী ছিলেন, তিনি কলিকাতা থেকে এসে এখানে আমাদের নেতৃত্ব দেবেন। উনি আসছিলেন আমার বাড়ী। তো উনাকে অনুরোধ করেও আমরা রাখতে পারি নাই। উনি কলিকাতা থেকে গেলেন। না আসার ফলে আমরা ইচ্ছা করেও পার নাই। তখন আমাদের মাঝে চিন্তা হল আব্দুল হামিদ চৌধুরী, মোল্লা জালালুদ্দিন আরো আমরা যারা আতাউর রহমান চৌধুরী তার পরে আব্দুর রহমান চৌধুরী অবশ্য ভীতু, পরে ভয়ে সে সইরা গেছে তারপর আবার আসছে। আব্দুল মতিন খান চৌধুরী ময়মনসিংহের; আমরা আলাদা আলাদা আলাপ করতে লাগলাম। ড়আমরা তো অল বেঙ্গল মুসলিম লীগের লোক, সোরায়ার্দী সাহেবের সমর্থক। আবুল হাশেম সাহেবের সমর্থক। সুতরাং আমরা একটা মুসলিম স্টুডেন্ট লীগ দাঁড় করাই। এটার ‘অল’টা কেটে দিয়া আমরা এখানে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ দাঁড় করাই। তো বললাম, চলেন ইনিসিয়েটিভ নেই। ইনিসেয়িটিভ নেয়ার মতো আর কেউ আগায় না। তখন আমি, আমাদের কিছু বন্ধু-বান্ধব ঢাকা কলেজের ছাত্র যারা ছিল, যারা নাকি আইসা আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হল, ওদেরকে বল্লাম ভাই কিছু একটা করতে হবে। করার জন্য রাজি আছে অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্ট লীগে যারা আছে তাদের একটা অংশ। তাদেরকে আমি বলেছি যে কাউন্সিল ডাকেন। কাউন্সিল ডাকলে যাই হোক, যতজনই হোক তাদের নিয়ে আমরা একটা সংগঠন দাঁড় করাই। কিন্তু তারা একবার রাজি হয় একবার পিছ পা দেয়। অর্থাৎ তারা নির্দ্বিধায় কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। দ্বিধা দ্বন্ধে ভুগতেছিল। এখন কথাটা হয়ে যায় ব্যক্তিগত মাতব্বরীর মত। আমি তাদের সাথে আলাপ করে বললাম যে, আমরা ফজলুল হক হলে একটা মিটিং ডাকি। তোয়াহা সাহেব ভাইস প্রেসিডেন্ট আছে, হল আমাদের দিবে এবং হলে আমরা সেই মিটিংটা ডাকি। তখন সেই অনুযায়ী আমি ওখানে মিটিংটা ডাকলাম। ডাকার পরে ফেনী কলেজের লেকচারার ছিলেন নাজমুল করিম সাহেব, পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সোসিওলজি ডিপার্টমেন্টের প্রধান ছিলেন। আমরা প্রিসাইড করার কাউকে পাচ্ছিলাম নাম, উনাকে প্রিসাইড করতে দিলাম। উনি আইসা বসে গেলেন। যদিও আমরা যানতাম, উনার সম্পর্কে ধারণা
ছিল উনি কমিউনিস্ট, উনাকে করা উচিত না। তথাপি আমাদের তখন উপায় ছিল না। উনাকেই বসাইছিলাম। শেখ সাহেব তখন এর কাছ দিয়াও ছিল না। জানতেনও না। উনি ঢাকায়ই ছিলেন না। জানবেন কি করে। আমরা মিটিং ডাকলাম ৪ঠা জানুয়ারী ‘৪৮। অতএব শেখ সাহেব প্রতিষ্ঠাতা এটাও মিথ্যা কথা। যেমনি মিথ্যা কথা ‘৪৭ সাল থেকে তিনি চিন্তা করতেন স্বাধীন বাংলাদেশ করা জন্য, ঠিক তেমনি এটাও জাজ্বল্যমান মিথ্যা। দিনের সূর্য যেমন সত্য আমার কথাও তেমন সত্য নঈমুদ্দিন আহমেদকে আমরা কনভেনার করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ অর্গানাইজিং কমিটিটা করি। আমার পক্ষে কনভেনার হওয়া তখন অসুবিধাজনক ছিল। কারণ তখন বয়স আমার কম এবং মাত্র ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। সুতরাং আমাকে ত্রিপুরা জেলার রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে নেওয়া হয় এবং ঢাকা সিটির কনভেনর করা হয়। আমি তাতে আমার সম্মতি দেই, এই হল সংগঠন গড়ার কাহিনী। 
আবদুল গফুরঃ ওই কমিটিতে বোধ হয় শেখ সাহেবকে ফরিদপুর জেলার প্রতিনিধি রাখা হয়েছিল ?
অলি আহাদঃ হ্যাঁ, শেখ সাহেবের অন্য ইস্পোটেন্সী আছে।
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা ১১ মার্চে যে আপনারা একটা প্রতিবাদ দিবস পালন করেছিলেন এটার পটভূমি কি ছিল, এটা একটু বলবেন ?
অলি আহাদঃ আমি কিন্তু ঢাকা সিটির মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলাম, শেখ সাহেবের দান আছে, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নাই। শেখ সাহেবের নামেই আমরা পরবর্তীতে অংশগ্রহণ করতে পারছি। নূরুদ্দিন ভাই রাজী হল না, তখন শেখ সাহেব দৌড়াদৌড়ি করে তার জানা শোনা যত ছেলেরা আছে তাদের দিয়ে দলটির কমিটিটা সেটআপ করতে সাহায্য করেছিলেন, এর মধ্যে সন্দেহ নেই। 
আবদুল গফুরঃ এই যে ১১ মার্চের যে আন্দোলনটা হয়, ১১ মার্চ প্রথম যে গণবিস্ফোরণ হয় ভাষার দাবীতে এটার পটভূমিটা কি। ‘৪৮ সালের ১১ মার্চের সেই আন্দোলনের পটভূমিটা কি? এটা ডাকা হল কেন প্রতিবাদ দিবস এবং ঐ দিনকার ঘটনা.......।
অলি আহাদঃ এটাতো পুরানো কথা। আগস্ট মাসের মিটিংয়ে বাংলাকে অন্যান্য ভাষায় সহিত যোগ করার জন্য, বক্তৃতা করার জন্য অধিকার দেওয়ার জন্য দাবী তোলা হয়, এ থেকে ভাষা আন্দোলন। আবুল কাশেম সাহেবের দেশপ্রেমের কারণে, আবুল কাসেম সাহেবের মাতৃভাষার প্রতি প্রবল আকর্ষণ এবং আনুগত্যের কারণে এই আন্দোলনটা আরম্ভ হয়।
১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী উর্দু, ইংরেজীর সহিত গণপরিষদের বাংলা ভাষা ব্যবহারের স্বপক্ষে দাবী উত্থাপন করেন বাবু ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। এই অপরাধে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান ও অন্যান্য বক্তা অসৌজন্যমূলক ভাষায় তাকে আক্রমণ করেন। ঢাকায় পুনঃপুনঃ দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ওকালতী করেন। এর কারণেই আবুল কাসেম সাহেব তমুদ্দুন মজলিসের একটা সভা ডাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে রশিদ বিল্ডিং-এর দোতালায়। সেই রশিদ বিল্ডিংয়ের দোতলার সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, আমরা একটি কমিটি অব একশন সেটআপ করব। সেই কমিটি অব একশন শামসুল আলম সাহেব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের ছাত্র তাকে কনভেনর করে করা হয়। আর পূর্বকার যে সাব-কমিটি করা হয়েছিল তমুদ্দুন মজলিসের, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন গাইড করার জন্য তা থেকে নূরুল হক সাহেব পদত্যাগ করেন। সেই 
দিনই আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি ১১ মার্চে যেহেতু পূর্ববঙ্গ এসেম্বলীর অধিবেশন, সেই অধিবেশন দিবসে প্রতিবাদ করার জন্য আমরা ১১ মার্চকে ঘোষণা করি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবীতে। 
আবদুল গফুরঃ ১১ মার্চতো আপনি গ্রেফতার হয়েছিলেন?
অলি আহাদঃ ১১ মার্চে আমি, শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরো অনেকে গ্রেফতার হয়েছিলাম। 
আবদুল গফুরঃ ওখানে কি গোলাম আযম সাহেবের কোন ভূমিকা ছিল?
অলি আহাদঃ নিশ্চয় ছিল। গোলাম আযম সাহেব তখন খুব ইমপর্টেন্ট লোক। উনি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ডাকসুর জেনারেল সেক্রেটারী এবং ফজলুল হক হলের যে নির্বাচন হয়েছিল তোয়াহা সাহেবের সাথে মিলে তিনি একই পক্ষ থেকে সেই নির্বাচন গাইড করেছিলেন। অতএব গোলাম আযম সাহেবের ডেফিনিটলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অন্যদের চেয়েও ভাল কন্ট্রিবিউশন ছিল।
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা, এর পরে তো কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্’র সাথে আপনাদের আলোচনা হয়। সে আলোচনা সম্পর্কে কিছু বলুন। 
অলি আহাদঃ আলোচনাটা, কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র সাথে আমরা দেখা করি। চীফ সেক্রেটারী ছিলেন আজিজ আহম্মদ সাহেব তার বাড়ীতে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ অবস্থান করছিলেন, আমরা ওখানে আলাপ-আলোচনা করলাম যে, স্যার, সভায় আপনি বলেছেন Urdu shall be the state language  এ কথাতে এবং Only state language  এ কথাতে আমরা খুব ব্যথা পেয়েছি। আমরা পূর্ব পাকিস্তানীরা মনে করি পূর্ব বঙ্গের জনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। আমরা মনে করি উর্দু state language হতে পারে, বাংলাও state language  হতে পারে এবং দু’ টোকেই করা উচিত। আর আপনার ভাষায়  state language যদি উর্দুকে করা হয় অর্থাৎ বাংলাকেও তার সাথে করা হয় তাহলে পাকিস্তান থাকবে না পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবে। এই কথাটির সাথে আমরা একমত নই। কারণ, বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে একই ধর্ম, একই ভাষা-তা সত্ত্বেও তারা একটা স্টেট। যেমন কানাডার কথা বলা যায়। আরব দেশের কথা বলা যায়। বিশেষ করে আরব দেশে ধর্ম এক জাতি এক ভাষা এক তা সত্ত্বেও একটা স্টেট নয়। অনেকগুলো স্টেট রয়েছে। এটা আমরা প্রমাণ করেছি যে, বিভিন্ন Multi language হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান একটা স্টেট হিসেবে দাঁড়াতে পারে এবং দাঁড়াবে। তার জন্য গণতান্ত্রিক মনোভাব থাকলে এটা সম্ভব। তা আমরা মনে করি এবং এ কারণে দু’ টো State Language হওয়া উচিত। তিনি এক স্টেজে আমাদের সাথে রাগ করে বসলেন। If necessary in the interest of the state, the interest of the integrated state, your language will have to be changed.  কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে সেখানে আমাদের দ্বিমত। দ্বিমত নয়, প্রকট Difference of opinion হয়। যদিও আমরা পরবর্তীকালে শুনেছি কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এটা বলতে চাননি। কিন্তু ওনাকে বলানো হয়েছে। জিন্নাহ’র মতো নেতাকে যদি বলাতে পারে এর’চে দুঃখের আর কি হতে পারে? যেমন কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববঙ্গ এসেম্বলিতে যখন এডড্রেস করতে আসলেন, মওলানা ভাসানী তিনি তখন সদস্য ছিলেন। তিনি উঠে বললেন ‘কায়েদে আযম, মুঝে এক সাওয়াল হ্যায় আপকে পাস, আপ বাতাইয়ে, হামিদুল হক চৌধুরীকে লিয়ে আপ ছে মাহিনেসে ন মাইনে কর দিয়া, ইন্তেখাব কে লিয়ে, হামলোগ কোন ক্যায়াস হ্যায়, যো এন্তকাবি কে লিয়ে যদি কনস্টিটিউশন চেঞ্জ করা যায়, আগার ইয়ে হো সাকতা। আপকে তারা পার্লামেন্টারিয়ান, আপকে তারা কনস্টিটিউসানকো এহি কর সাকতা হ্যায়। তো ক্যায়া নেহি হো সাকতা। তিনি জবাবে বললেন, মওলানা, ম্যায় নেহি মানতা এহি বাত, মুজে বোলানেই হোগা। ম্যায়েনে, কিয়া, হো গায়া”। কায়েদে আজমের এতটুকু মানসিক অবস্থা ছিল ভুলকে স্বীকার করে নেয়ার মত। এবং সেই ভুল তিনি স্বীকার করে নিয়েছিলেন। এখানেও আমরা যারা পরবর্তীকালে বিভিন্ন বই থেকে পড়েছি ....... এর পরে কায়েদে আযম কোনদিন উনার মৃত্যু পর্যন্ত রাষ্ট্র ভাষা সম্পর্কে state language shall Be the Urdu- এটা কখনোই বলেননি। এমনকি রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কোন কথাই বলেননি। এতটুকু তিনি নিজেকে সংবরণ করে নিয়েছিলেন। কায়েদে আযম যা তা নেতা নন। কায়েদে আযমের ডিটারমিনেশন অসম্ভব ছিল। কায়েদে আযম যা সত্য মনে করতেন তা বলতে এক সেকেন্ডও দেরী করতেন না। যেমন খেলাফত আন্দোলন। খেলাফত আন্দোলনের মওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী, গান্ধিজী তারা যখন করছিলেন ক্যালকাটা কনফারেন্স চলছে, তিনি দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, খেলাফত ইয়ে হোনা নেহী চাহিয়ে He was against this movement তার ফলে তার বক্তব্য শুনে মাওলানা শওকত আলী কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলীকে ডায়াসে মারতে গেলেন, ধরে তাকে থামানো হল। তারপর কায়েদে আযম সেখান থেকে বেরিয়ে আসলেন, বেরিয়ে এসে ট্রেনে উঠে পরিষ্কার চলে গেলেন। তারপর লন্ডন চলে গেলেন। তারপর তো রাজনীতিই ছেড়ে দিলেন। এই হল কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। সুতরাং উনি বুঝে ফেলেছেন আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। হয়তো একটা ক্ষতিও করে ফেলেছি। যার জন্য তিনি আর কখনো এ সম্বন্ধে, রাষ্ট্রভাষা কি হবে না হবে সে সম্পর্কে আর কিছু বলেননি। 
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা, তাহলে আমরা মোদাব্বের সাহেবের একটা বইতে পেয়েছি। উনি ওনার ভুলটা স্বীকার করেছিলেন ডাক্তার এলাহী বখশর কাছে। 
অলি আহাদঃ হ্যাঁ এলাহী বখশর কাছে। 
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা, একটা কথা তাহলে কায়েদে আযম চলে যাবার পরে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সাল পর্যন্ত কিন্তু খুব তীব্র আকার ধারণ করেনি কেন। হরফ নিয়ে একটা আন্দোলন হয়েছিলো, কিন্তু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে একজাক্ট, ‘৫২-তে যেভাবে আবার জন্ম নিল, সেভাবে আর কোন আন্দোলন হয়নি। সেটার কারণ কি?
অলি আহাদঃ যে কোন মুভমেন্টে আপস এন্ড ডাউন আছে। সে জন্যই একটা কথা মনে রাখতে হবে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এসে যখন বলে গেলেন। তার দ্বিমত প্রকাশ করে গেলেন। এখানকার মুসলমানরা একটু থ খেয়ে গেল। এটা না যে কায়েদে আযমের বক্তব্য গ্রহণ করেছেন কিন্তু তার একচ্ছত্র নেতা তার প্রিয় নেতা এই বক্তব্য দিয়ে গেছে, কি করা উচিত? কি কর্তব্যবিমুঢ় সবাই। কিন্তু ইয়ংগার জেনারেশন যারা ছাত্র ছিল তারা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে জিইয়ে রাখার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেই চেষ্টা ফলপ্রসু হয়নি।
আবদুল গফুরঃ এর আগে তো আমাদের যতটুকু মনে পড়ে ১১ মার্চকে রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয় এবং ১১ মার্চ আপনারা ‘৪৮ সালেই করেছিলেন তার পরে ‘৪৯ সাল, ‘৫০ সাল, ‘৫১ সাল ১১ মার্চকে রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হয়। কিন্তু এখানে একটা নতুন ধারা শুরু হল ‘৫২ তে। সংযোগন হল একটা নতুন দিগন্তের। এটার পটভূমিটা কি? তখন বোধ হয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিন।
অলি আহাদঃ খাজা নাজিমুদ্দিন সাহেব, ২৬ জানুয়ারী পল্টন ময়দানে বক্তৃতা করলেন, কিন্তু একটি জিনিস দেখতে হবে, একটা এডমিনিস্ট্রেশন যখন চলতে থাকে যখন ‘৪৭ সাল থেকে আরম্ভ করে ‘৫২ সাল পর্যন্ত এই পিরিয়ডটাতে এই সরকার সমন্ধে মানুষের মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হল। যেমন শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবর্তন হওয়ার পরে ১৫ আগস্ট সমগ্র দেশবাসী সেটাকে গ্রহণ করেছিল (কয়েকজনের কথা বাদই দিলাম)। তেমনি আজকে যে অবস্থা এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হাসিনা হয়তো বুঝতে পারছেন না যে, আজকে গণভোট দিলে পরে শতকরা নব্বইটি ভোট মুসলমানদের ওনার বিরুদ্ধে যাবে। যেমনি এই দেড়-দুই বৎসরে কোয়ালিটি চেঞ্জ হয়ে গেছে। তেমনি আমরা মানুষের-মাটির সাথে সম্পর্ক রাখি। মাটির আওয়াজ আমাদের কানে আসে এবং আমরা বুঝতে পারি যে, দেশের অবস্থা কি। তা না হলে রাজনীতি করে লাভ নেই। ঠিক তেমনি সে অবস্থার সাথে তুলনা করতে হবে ১৯৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২’র সাথে। নানা কারণে সামাজিক কারণ, অর্থনৈতিক কারণ, রাজনৈতিক কারণ, এসব কিছু মিলিয়ে একটা পরিবর্তনের দিকে মানুষের হাওয়া বইছে। যেমন ৩৫টা বাই-ইলেকশন বন্ধ করেন নূরুল আমিন সাহেবের সময়। এগুলি মানুষের মনের মধ্যে দাগ কাটতে লাগল। যেমন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্পর্কে যে নিউ মিডল ক্লাস গড়ে উঠল, সেই নিউ মিডল ক্লাস তারা চাইল, আমরা যে কেকটা পেয়েছি সেই কেকটার একটা অংশ আমরা পাইনি এবং তার অর্ধেকটা, পুরোটা না পাই। আমাদের অন্তত পাইতেই হবে। তো কেক বলতে কি কি জিনিস ছিল। আর্মিতে রিক্রুটমেন্ট, সিভিল রিক্রটমেন্ট, বিজনেসে তারপর শিক্ষা-দীক্ষায়, স্কুল কলেজ এগুলো পশ্চিম পাকিস্তানে হয়, পূর্ব পাকিস্তানে হয় না। এই প্রোপাগান্ডাগুলো অন্তর্শেলের মত কাজ করেছে। নাজিমুদ্দিন সাহেব এখানে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় একবার সই করেছিলেন। এবং সেই সইয়ের তিনি মর্যাদা রাখেননি। অর্থাৎ সেই সংগে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেন। সেই বিশ্বাসঘাতকতা, সেই গাদ্দারী জনগণের মনের মধ্যে কাজ করতে থাকল। state language  এটা হয়, তবে এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে চাকরি পাওয়া যাবে না।
আবদুল গফুরঃ সবচেয়ে বড় কথা উনি তার আগে যে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন, ওয়াদা করেছিলেন, সেই আগে ১৯৪৮ সালে, তা থেকে ফিরে আসেন। 
অলি আহাদঃ তখনই তিনি ফিরে আসেন। এই ফিরার পর থেকেই এ পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে দেখা গেল যে, ওনাকে বিশেষ করে ছাত্রমহল গ্রহণ করেনি। ছাত্র সমাজ গ্রহণ রা করার ফলেই সেই আন্দোলনের গোড়াপত্তন হয়। ১১ মার্চে যেমন পূর্ববঙ্গের লেজিসলেটিভ এসেম্বলীর অধিবেশন ডাকা হয় ঠিক তেমনি একুশে ফেব্রুয়ারীতে পূর্ববঙ্গ লেজসলেটিভ এসেম্বলীর অধিবেশন ডাকা হয়। আমরা এ সুযোগে মনে করলাম আন্দোলন দিতে হলে ঐ তারিখকে লক্ষা করে দিতে হবে। এবং পূর্ববঙ্গ এসম্বেলী দিয়েই, ঘোষণা করাতে হবে যে, স্টেট লেঙ্গুইজ অন্যতম ওয়ান অব দি স্টেট লেঙ্গুইজ এ প্রশ্নটা আমাদেরকে তুলতে হবে। সে জন্য এই আন্দোলন সে দিন ঘোষণা করা হয়। এর ঘোষণা করার, তারপর বাকীটা গণআন্দোলনে রূপ নেয়। 
আবদুল গফুরঃ সে সময়ে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ আলাদা ছিল, এটার ভূমিকা সম্পর্কে আপনি কাউন্ডলী বলবেন?
অলি আহাদঃ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ যেটা গঠিত হয় সেটাতো গঠিত হয়েছে ওখানে যারা ছিলেন তারাই বিভিন্ন সময়ে এসেম্বলীর মেম্বার পার্লামেন্টোরী মেম্বার তাদিগকে মোেরেন্ডাম দিতেন যে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হউক। এটাই কন্টিনিউ করতে লাগলো। আর আমার পূর্ব পাকিস্তান ইউথ লীগ, তখন আমি তখন পূর্ব পাকিস্তান ইউথ লীগের জেনারেল সেক্রেটারী।
আবদুল গফুরঃ আপতি তো ফাউন্ডার জেনারেল সেক্রেটারী?
অলি আহাদঃ আমি ফাউন্ডার জেনারেল সেক্রেটারী। তো আমাদেরও মনে হলো যে এই মতিন সাহেব যেহেতু আমাদের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের’ পূর্ব পাকিস্তান ইউথ লীগের অন্যতম সদস্য ছিলেন, তিনি আমাকে একদিন এসে বললেন, যে কিছু তো করতে হবে, আমি বলি নিশ্চয়ই করতে হবে, নাজিম উদ্দিন সাহেব এ ঘোষণা করেছেন, অতীতেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন আগামীতেও বিশ্বাসঘাতকতা করবেন। সুতরাং আমাদের দায়িত্ব হবে কিছু করার এবং চলেন আমরা একটা মিটিং ডাকি এই থেকে সূত্রপাত।
আবদুল হাই শিকদারঃ এখানে যে কথাটা অধ্যাপক আবদুল গফুর বললেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে যে দেখাটা হলো এবং তারপরে যে বিরাট গ্যাপ গেল, গ্যাপের পরে আবার ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দ্বারা এটা নতুনভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠলো বায়ান্ন সালে। এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নতুন ধরনের জাগরণ ঘটলো এই জাগরনটাকে একটু ব্যাখ্যা করলে আমাদের জন্য একটু ভাল হয়।
অলি আহাদঃ দেখেন তখন সোহরাওয়ার্দী সাহেব পাকিস্তানে এসেছেন। বিরোধী দলের নেতৃত্বের ভার নিয়েছেন মওলানা ভাসানী। তাখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগের তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট মওলানা ভাসানী সমগ্র দেশে বিশেষ কইরা পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি মহকুমার এমন কি কোন কোন থানায় পর্যন্ত নূরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে, মুসলীম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে, লিয়াকত আলী খান সরকারের বিরুদ্ধে নাজিমুদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে যা যা বলা দরকার তিনি বলেছেন এবং উদ্বুদ্ধ করেছেন। এতে জনগণ উত্তেজিত হয়েছে, মওলানা ভাসানীকে বিশ্বাসও করেছে। সে অবস্থায় ছাত্রদের আন্দোলন এবং এই দেশের স্বাভাবিক ভাবেই আন্ডার ডেভেলপ কান্ট্রিতে যা হয় ছাত্রদের প্রতি লোকজনের বিশ্বাস জাগে। ছাত্ররা আবার ইনিসিটিভও নেয় এবং ইনিসিটিভই ছাত্ররা নিয়েছে। একদিকে সোহরাওয়ার্দী সাহেব পার্লামেন্টারী লিডার আর এক দিকে মওলানা ভাসানী মাস লিডার। এই দুইজের নেতৃত্বে পাবলিক অপেনিয়ন ফর্ম হইতে লাগলো। কনসুলেটেড হইতে লাগলো এবং কনসুলেটেড হলোও তাই। সে অবস্থায় যখন ছাত্ররা আন্দোলনের ডাক দিল সাড়া পাওয়া গেল। এটাই হলো মূল কারণ এবং ছাত্ররা আন্দোলনের ডাক দেওয়ার ফলে, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডাক দেওয়ার ফলে সমগ্র স্কুল-কলেজ ও সমস্ত দেশের মধ্যে আগুন জ্বললো। কিন্তু আসল হলো, ঢাকা শহর। ঢাকা ইউনিভার্সিটি। জগন্নাথ কলেজ, ইন্টারমেডিয়েট কলেজ, ঢাকা ইন্টারমেডিয়েট কলেজ এইগুলো।
আবদুল গফুরঃ তো এই যে একটা রাজনৈতিক পরিবেশ, আপনি যেটা বলতে চাইলেন তাহলে এটা মওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী সাহেব, আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্টা এদিকে আপনারাও যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করে কাজ করছেন। মোটামুটিভাবে একটা রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। মুসলীম লীগ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন বা এ সংক্রান্ত অন্যান্য আন্দোলনের পটভূমি একটা সৃষ্টি হচ্ছে।
অলি আহাদঃ এর সাথে অবশ্য একটা কথা যোগ করতে হবে। আপনার সাথে যে সৈনিক পত্রিকা এবং বিশেষ কইরা আবুল কাশেম সাহেবের নেতৃত্বে তমুদ্দুন মজলিস গড়ে উঠে তাদের যে কার্যকলাপ হয় ঢাকা শহরে এটা অবিচ্ছেদ্য। এটাকে ছোট করে দেখার মত কোন উপায় যেমন ৪৮ সালেরটাতো ছোট করার জায়গাই নাই এবং এটাকেও ছোট করে দেখার কোন উপায় নেই। এ পাবলিক অপেনিয়ন সব। 
আবদুল গফুরঃ ধন্যবাদ। ১৯৫২ সালে যে একটা সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ হয় এটা বোধ হয় ৩০ জানুয়ারি কোন একটা মিটিংয়ে না কত তারিখে যেন। 
অলি আহাদঃ ৩০ তারিখে।
আঃ গফুরঃ সেখানে কারা কারা ছিলেন?
অলি আহাদঃ ব্যাপারটা হয়েছিল কি মুসলিম ছাত্রলীগের তরফ থেকে তারা আন্দোলনটা হউক এটা চায় নাই। সে না হাওয়াটা শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের জন্য। শেখ মুজিবুর রহমান সাব তখন জেলখানায় আমি যখন যুবলীগের সেক্রেটারী হিসাবে আইসা উপস্থিত হইলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে খালেক নেওয়াজ খান, জিজ্ঞাসা করলো কি করবেন? কি করতে চান অলি আহাদ সাহেব? আমি বলি করবো একটা কিছু, করতে হবে তো। করার জন্যই আছি। একটা কিছু করব, আপনারাও করবেন। সবাই মিলেই করবো। ইন দি মিন টাইম বুঝা গেল যে, তারা প্রিসাইড করবে। আমি সেটাতে রাজি না। মুসলিম ছাত্রলীগের কেউ প্রিসাইড করলে আন্দোলনটা বিক্রি করে দেবে আমার ধারণা তখন তাই। এটা কিছুতেই আমি রাজি ছিলাম না। কিছু বলি নাই তাদেরকে। আমি গাজীউর হককে ডেকে বললাম যে, আপনি মুকুলকে নিয়ে সেখানে একটা টেবিল পাতাইয়া মিটিং এ সভায় কে সভাপতিত্ব করবে ঘোষণা করে দেবেন। মুকুল ত্বরিত ছেলে। চট করে গিয়ে টেবিল একটা নিয়ে গিয়ে এটার উপর দাঁড়াইয়া বললেন যে, আমরা এখন এ সভায় প্রস্তাব করতেছি যে, গাজীউল হক সাব এ সভায় সভাপতিত্ব করবেন। এখনই সভা আরম্ভ। আমতলায় সভা এভাবে এটা গড়ে উঠে।
আবদুল গফুরঃ এটা তো হলো একুশে ফেব্রুয়ারির কথা।
অলি আহাদঃ না একুশে ফেব্রুয়ারীর আগে।
আঃ গফুরঃ না, একুশে ফেব্রুয়ারীর ভোর বেলা তো এটা।
অলি আহাদঃ না এটা হলো দ্বিতীয় বার, একুশে ফেব্রুয়ারির এটা হলো দ্বিতীয় বার। আর প্রথম বার হলো ওটা। গন্ডগোলটা ওখানে। কাজী গোলাম মাহবুব আইসা বললো যে, অলি আহাদ কাকে প্রিসাইড করতে বলবা আর প্রসেশান করবা? বললাম, না প্রসেশান তো করবোই, করতেই হবে। আর প্রিসাইড করবে কে, এটা এখনো ঠিক করতে পারি নাই। আপনারাও কি বলেন, দেখা দরকার। এর মধ্যে প্রস্তাব হয়ে গেল। 
আবদুল গফুরঃ শিকদার সাহেব বোধ হয় জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, বার লাইব্রেরী হলে যে আপনাদের মিটিং হয়েছিল সেখানে কে সভাপতিত্ব করেছে?
অলি আহাদঃ সেটায় সভাপতিত্ব করেন মওলানা ভাসানী। 
আবদুল গফুরঃ ওখানে বোধ হয় কনভেনার .......
অলি আহাদঃ কনভেনার কাজী গোলাম মাহবুব।
আবদুল গফুরঃ এবং আপনারা মেম্বার ?
অলি আহাদঃ হ্যাঁ। আমরা মেম্বার।
আবদুল হাই শিকদারঃ এখানে প্রশ্ন, যেহেতু সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনার ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব, কিন্তু আপনারা যখন মিটিংটা করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে, তখন এটা গাজীউল হক প্রিসাইড করলেন, এর রহস্যটা কি? কারণটা কি?
অলি আহাদঃ রহস্যটা হইলো আমরা তাহাদিগকে বিশ্বাস করি নাই। তারা বলতো আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করবো।
আবদুল হাই শিকদারঃ কাজী গোলাম মাহবুবরা?
অলি আহাদঃ কাজী গোলাম মাহবুবরা। তারা অর্থাৎ আওয়ামী মুসলিম লীগ বলতো, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করবো। শেখ মুজিবুর রহমান বলতো। তিনি তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছিলেন। তারা বলতো, আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করবো। শামসুল হক সাহেব ফাউন্ডার সেক্রেটারী। তিনি বলতেন, আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করবো। আতাউর রহমান খান বলতেন আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করবো। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন বলার অর্থ হলো ১৪৪ ধারাকে মাইনা নেওয়া, যদি সরকার দেয়। আমরা এটা মানার পক্ষে ছিলাম না। ঘোর বিরোধী ছিলাম। সে জন্যেই প্রিসাইড করতে যদি অন্য একজনকে দেই তাহলে মিটিংটা সেভাবেই নিয়ে যাবে। আর না হলে কিলাকিলি হবে। আমরা সেটা করতে চাই নাই।
আবদুল হাই শিকদারঃ এ মিটিংটার তারিখটা কতো? যে মিটিংয়ে গাজীউল হক সভাপতিত্ব করেন?
অলি আহাদঃ দুইটাতে, ৩০ তারিখও করেছে, ২১ তারিখও করেছে।
আবদুল হাই শিকদারঃ ৩০শে জানুয়ারী, আরেকটা ২১শে ফেব্রুয়ারী? এ দু’ টা মিটিং এ গাজীউল হক সভাপতিত্ব করেছে?
অলি আহাদঃ গাজীউল হক প্রিসাইড করেছে।
আবদুল হাই শিকদারঃ আচ্ছা, তাহলে একটা কথা, ইদানীং বলা হচ্ছে, এটা আমরা এখন একটু জানতে চাই আপনার কাছে, যে তমুদ্দুন মজলিস আন্দোলনটা দাঁড় করালো, কিন্তু একটা পর্যায়ে ‘৫২ সাল থেকে দেখা যায় তমুদ্দুন মজলিস আর এর মধ্যে নেই।
অলি আহাদঃ আমাদের হাতে কোয়ালিটেটিভ চেঞ্জ হয়ে গেল। তখন তমদ্দুন মজলিসকে নিয়েই সে আন্দোলনটা আরম্ভ করতাম। আমরা তমদ্দুন মজলিসের লোকদেরই হয়তো বসাইয়া দিতাম যে, প্রিসাইড কর। যেহেতু আমরা বুঝে ফেলেছি, খালেক নেওয়াজ খান, কাজী গোলাম মাহবুব তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে এবং তারা মিটিংয়ে দাঁড়াইয়া যখন বলে দেবে, ১৪৪ ধারা আমরা ভঙ্গ করবো না। আমরা যতই বলি, একটা গ্রুপ ছাত্র-জনতা তাদের সমর্থন করবেই। আর একটা গ্রুপ আমরা করবো না। তাতে হতো কি? আন্দোলন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। এটা প্রমাণিত হতো। তার জন্যই আমাদের পক্ষে তখন চিন্তা হইলো এইটা, আমাদের উপর আঘাত করার জন্য ১৪৪ ধারা দিলে পরে, নিয়ম ভঙ্গ তারা করলে, আমরাও নিয়ম ভঙ্গ করবো। এই কথা যদি তমদ্দুন মজলিস তখন ইয়ংগার জেনারেশনকে বলতো, তইলে তারা নেতৃত্ব দিত। 
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা, এই যে ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারী একটা সভা হয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে আপনি বলেছেন, এটা কি আপনার বইতে আছে ?
অলি আহাদঃ আছে। হয় ৩০, না হয় ৩১ পৃষ্ঠায় আছে।
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা আরেকটা মিটিং যে হয়েছিল, যখন ১৪৪ ধারা হঠাৎ ১৯ তারিখ বোধ হয় জারি করলো গভর্নমেন্ট।
অলি আহাদঃ ২০ তারিখ সন্ধ্যার সময়।
আবদুল গফুরঃ ২০ তারিখ সন্ধ্যার পরেই।
অলি আহাদঃ আমরা মিটিংয়ে বসলাম।
আবদুল গফুরঃ একটা জরুরী মিটিং।
অলি আহাদঃ খুব ইমার্জেন্সী মিটিং ডাকলাম, আবুল হাসিম সাহেব প্রিসাইড করলেন। ১১- আর ৪- এ ভোটাভুটি হলো।
আবদুল গফুরঃ অধিকাংশ লোক ভোট দিল বিরুদ্ধে।
অলি আহাদঃ ১১ জন ভোট দিলো ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা যাবে না। আর ৪ জন আমরা, ভাঙতে হবে। এই ৪ জনের একজন আমি, আবদুল মতিন, ফজলুল হক হলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জনাব শামসুল আলম এবং মেডিক্যাল কলেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট গোলাম মাওলা। আমরা এই ৪ জন ভোট দেই ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। তোয়াহা সাব ভোট দেয় নাই। তোয়াহা সাব ঐদিকে ছিল।
আবদুল হাই শিকদারঃ গাজীউল হক ?
অলি আহাদঃ গাজীউল হক তো মেম্বারই ছিল না। তোয়াহা সাব মেম্বার ছিলেন ইয়ুথ লীগের তরফ থেকে আমরা দুইজন। মাহমুদ আলী সাব সিলেটে থাকতেন, সেইজন্য মাহমুদ আলী সাব হইতে পারেন নাই। মাহমুদ আলী সাব ঢাকা থাকলে তিনি মেম্বার হইতেন। আর গাজীউল হক সাহেব তো আমাদের ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র।
আবদুল হাই শিকদারঃ এখানে কোশ্চেনটা হলো, ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ব্যাপারে আপনারা মাত্র ৪ জন পক্ষে থাকলেন, ভাঙ্গতে হবে। আর ১১ জন থাকলো বিরোধী, যে ভাঙ্গা যাবেনা। কিন্তু এই কমিটির মধ্যে গাজীউল হক ছিলো না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, ২০ তারিখের মিটিংটা গাজীউল হক প্রিসাইড করেছে-
অলি আহাদঃ না।
আবদুল হাই শিকদারঃ ২১ তারিখের মিটিংয়ে ....
অলি আহাদঃ বিশ তারিখের মিটিংয়ে আমরা ডিসাইড করেছি। ইউনিভার্সিটির ছাত্র, এটাতো ছাত্রদের মিটিং।
আবদুল হাই শিকদারঃ আচ্ছা আচ্ছা।
অলি আহাদঃ জনগণের মিটিং না। ছাত্র জনতা মিটিংয়ের মধ্যে তো, ছাত্রকে দেব, তার মধ্যে প্রমিনেন্ট।
আবদুল হাই শিকদারঃ তাহলে একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে যে, ভাষা আন্দোলনে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর একটা বড় ধরনের ভূমিকা আছে।
অলি আহাদঃ নিশ্চয়ই আছে। নিশ্চয়ই আছে। আগাগোড়া আছে।
আবদুল হাই শিকদারঃ আর একটা ব্যাপার, ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে এখন কথা বলতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে যে, কোন কোন গ্রন্থাগার যেমন মাজহারুল ইসলামের মত লেখকরা, মুনতাসির মামুন, এ জাতীয় লোকরা। এরা দেখা যাচ্ছে যে ভাষা আন্দোলনে জেল খানা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্ব দিয়েছে এ রকম কথাও লিখেছে।
অলি আহাদঃ এটা মিথ্যা কথা। এটা প্রশ্ন উঠে না, এমনকি শেখ মুজিবুর রহমান হাসপাতাল থেকে রিলিজ হওয়ার পরও চলমান আন্দোলনে সক্রিয় হয় নাই। তার নেতৃত্বে কোন নতুন  আন্দোলনও গড়ে ওঠে নাই। ইতিহাস সাক্ষী, এসব লেখা চরম মিথ্যাচার। জাতির সাথে চরম প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। শেখ মুজিব নেতৃত্ব দিল কিভাবে ? তার দল বলছে, আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করবো। আমরা ১৪৪ ধারা দিলে ভাঙ্গাবো না। তিনি করবেন কোথায় ? তারই লোক খালেক নেওয়াজ খান, তারই লোক কাজী গোলাম মাহবুব, তারই লোক জনাব শামসুল হক, তারা বলেছেন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবো না, জেলখানা থেকে উনি নেতৃত্ব দিবেন, নেতৃত্ব দিতে হলে তো কারো মারফত নেতৃত্ব দিতে হবে, হয় দিবে খালেক নেওয়াজ খান ছাত্র লীগের যে জেনারেল সেক্রেটারী, না হয় দিবে শামসুল হক চৌধুরী যে নাকি ছাত্রলীগের একটিং প্রেসিডেন্ট, না হয় দিবে কাজী গোলাম মাহবুব যিনি কলিকাতায় তার সাথে কাজ করেছেন, না হয় দিবে উনারই জেনারেল সেক্রেটারী শামসুল হক সাব, না হয় দিবে তখনকার দিনের মুসলিম লীগের ১৫০ মোগলটুলীতে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন শওকত সাহেব, তারা দিবেন। না হয় মানিক মিয়া দিবেন যে ইত্তেফাকের তখন এডিটর ছিলেন। তারা তো সবাই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে ছিল। অতএব তিনি নেতৃত্ব দিলেন, এটা সর্ব মিথ্যা কথা, মিথ্যা, মিথ্যা এবং এবসলিউটলি মিথ্যা।
 আবদুল হাই শিকদারঃ ইদানীং আর একটা কথা বলা হচ্ছে, বিভিন্ন মহল থেকে যারা হয়ত বিকৃত করছে তারাও বলছে যারা এটা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে তারাও বলছে যে, ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে, এ বিকৃতিটা কিভাবে হচ্ছে এবং কোথায় কোথায় হচ্ছে ?
অলি আহাদঃ প্রথম প্রধান বিকৃতি হইলো শেখ মুজিবুর রহমানকে’ ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের নেতা হিসেবে চিত্রিত করা। এরপর আর বিকৃতির কোন শেষ নাই। ভাষা আন্দোলন তো পপুলার আন্দোলন। রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন ঐতিহাসিক আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন বিপ্লবী আন্দোলন, বিশেষ করে ‘৫২ সালেরটা, কোয়ালিটেটিভ চেঞ্জ হয়েছে। এটার থেকে শেখ মুজিব বাদ পড়ে যাবে এটা কখনো চিন্তা করা যায় না এবং শেখ মুজিবকে বাদ যাতে না দিতে হয় তার জন্য তার ছাত্র অর্গানাইজেশন, খাইয়া না খাইয়া, তার দলের লোক খাইয়া না খাইয়া মুজিবের যারা সমর্থক তারা প্রচেষ্টা করতে লাগালো যে, শেখ মুজিবুর রহমান জেলখানা থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ সবই মিথ্যা কথা। সর্বৈব মিথ্যা। তো মিথ্যার বেসাতির সাথে দাঁড়ানো সম্ভব না।
আবদুল হাই শিকদারঃ আরো অন্যান্য বিকৃতির ব্যাপারে যদি একটু বলেন ?
অলি আহাদঃ আছে বিকৃতি, যেমন আতাউর রহমান খান। আতাউর রহমান খান যে আন্দোলনের দিন, একুশের আন্দোলনের দিন তিনি ছিলেন না। তিনি ছিলেন, ময়মনসিংহ। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গেল, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কমিটি যখন হয় তাকে কনভেনার করা হয়। যেমন আমরা জেলে যাওয়ার পর তাকে কনভেনার করা হলো রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের জন্য। সম্মেলন করার জন্য যে কমিটি হয়, সে কমিটিতে তাকে কনভেনার করা হয়। এখন সত্য কথা বললে তো অনেকের কাছে খারাপ লাগবে। তাহলেও আমারটা আমার বলে ফেলতেই হয় কে কি মনে করেন সেটা চিন্তা করার ব্যাপার নয়। মাওলানা ভাসানী, উনাকে আমরা বললাম, হুজুর আপনি এখন দূরে যাবেন না। ১৪৪ ধারা নুরুল আমিন যেটা দিয়েছে, সেটা ভাঙতে হবে। তিনি বললেন, না আমি দূরে যাব না, তবে আমি একটু নরসিংদী থেকে ঘুরে আসি। তিনি ঢাকা ছেড়ে চলে গেলেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হলো, কিন্তু তিনি আসলেন না। এটাই আবার অনেকে যারা নাকি কমিউনিস্ট, যারা নাকি প্রগতিশীল দাবী করে, তারা বলে বেড়ায় যে, মাওলানা ভাসানী সেদিন ছিলেন।
আবদুল হাই শিকদারঃ কিন্তু কোন কোন বইয়ে দেখা যায়, গায়েবানা জানাযায় পরের দিন তিনি ......
 
অলি আহাদঃ মিথ্যা কথা, মিথ্যা কথা। গায়েবানা জানাযা যখন করি তখন আমার বন্ধু আমার অর্গানাইজেশনের ইউথ লীগের জয়েন্ট সেক্রেটারী ছিলেন এডভোকেট এমাদুল্লাহ। এমাদুল্লাহ সেই মিটিংয়ে প্রিসাইড করেন, গায়বানা জানাযাতে এক গায়েবানা জানাযা হয় কোথায় লেখে ? সেটা বলেননি ? সেটা মেডিক্যাল কলেজের ব্যারাকে। কখন আর হয় কইতে পারবে ? না। এই সব মিথ্যা কথার সাথে তো সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়। ইতিহাসে বিকৃতি তো হবেই। তখন বেলা দশটা কি এগারটা।
আবদুল হাই শিকদারঃ একুশ তারিখে।
আবদুল গফুরঃ বাইশ তারিখে।
আবদুল হাই শিকদারঃ বাইশ তারিখে।
অলি আহাদঃ বাইশ তারিখে।
আবদুল হাই শিকদারঃ আন্দোলন কেন্দ্রিক যে শহীদ মিনার, শহীদ মিনারে প্রথম ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন তো মাওলানা ভাসানী করেছিলেন।
অলি আহাদঃ মোটেই না। সেটা করেছিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাহেব। আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাহেব দৈনিক আজাদের যিনি এডিটর ছিলেন এবং পূর্ব বঙ্গ এসেমব্লীর মেম্বার ছিলেন, যা থেকে উনি রিজাইন করেছিলেন।
আবদুল হাই শিকদারঃ তাহলে আমরা একটা কথা বলতে পারি। যেমন ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত বা এ জাতীয় অনেককে নিয়ে আমরা কথা বার্তা বলছি। কিন্তু আবুল কালাম শামসুদ্দিনের এই যে একটি ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী কর্ম এটার জন্য তো তাকে আমরা ভাষা আন্দোলনে অন্যতম সৈনিক বা একটা বিরাট ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তি বলতেই পারি।
অলি আহাদঃ নিশ্চয়ই বিরাট ভূমিকা তো বটেই। এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই তখনকার দিনে পূর্ববঙ্গ এসেমব্লীর সদস্যশীপ ছেড়ে দেওয়া একটা ইস্যুর উপড়ে ? যে ইস্যু উনার মুসলিম লীগ সৃষ্টি করেছে। যে ইস্যু নুরুল আমীন সাহেব সৃষ্টি করেছেন। যে ইস্যু খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব সৃষ্টি করেছেন, সেই মাওলানা আকরাম খার পত্রিকা আজাদের এডিটর হয়ে, পদত্যাগ করা এর প্রতিবাদ করা এটা চাট্টিখানি  কথা নয়।
আবদুল হাই শিকদারঃ আবার শেখ মুজিবের প্রসঙ্গে যাই। কোন কোন বইয়ে লেখা হচ্ছে যে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সেই বক্তৃতায় যখন তিনি বলছিলেন উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে তখন নাকি শেখ মুজিবুর রহমান নো নো করে উঠেছিলেন ?
অলি আহাদঃ শেখ মুজিবুর রহমানের নো নো বলার সুযোগ কোথায় ? এটাতো কনভোকশেন। কনভোকেশানে শেখ মুজিবুর রহমান আসবে কোত্থেকে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রেই নন। তিনি ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ছাত্র। এ কনভোকেশানে তিনি কি করে যাবেন ? অতএব এটা মিথ্যাকথা। এ মিথ্যা ভিত্তি করে মিথ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সাথে শেখ মুজিবুর রহমান প্রসঙ্গে যারা বলে তারাও জানেন মিথ্যা কথা বলছেন কিন্তু ওদের তো বলতে হবে।
আবদুল হাই শিকদারঃ ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রীক আমাদের দেশের যে সমস্ত বইপত্র আপনার চোখে পড়েছে এগুলোর মধ্যে আমরা কোনটাকে সবচেয়ে নির্ভরশীল বলতে  পারি।
অলি আহাদঃ বেশি কথা হইয়া যাইবে। নির্ভরশীল তো আমি আমারটাই মনে করি। কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুকআমার কিছু আসে যায় না। আমার একটা শব্দ তাদের যদি শক্তি থাকে তারা অস্বীকার করুক।
আবদুল হাই শিকদারঃ বদরুদ্দীন ওমর সাহেবের যে বইটা, এটার ব্যাপারে  আপনার মন্তব্য কি ?
অলি আহাদঃ বদরুদ্দীন ওমর সাহেবের বইকে একেবারে মিথ্যা বলা যাবে না শেখ সাহেব সম্বন্ধে অন্যখানে যেভাবে যেভাবে বলা হয়েছে একেবারে মিথ্যা সবই মিথ্যা বিকৃত, একথা বদরুদ্দীন ওমর সম্পর্কে বলা যাবে না। দুই/একটা ফ্যাক্টর এদিক সেদিক ভুল হতে পারে। ভুল, ভুলের কারণে হইতে পারে, এটার অন্য কারণ আমি মনে করি না।
আবদুল গফুরঃ সেই যে একুশে ফেব্রুয়ারী শেষ হলো, এরপরে আপনারা সেই রাত্রেই গোলাম মাওলা সাহেবের রুমে বসেছিলেন না ?
অলি আহাদঃ বসেছিলাম। গোলাম মাওলা না, আজমল।
আবদুল গফুরঃ যা হউক মেডিক্যালের একটা হোস্টেলে-
অলি আহাদঃ সেখানে আমরা শামসুল হক সাহেবকে আসার জন্য বলেছিলাম, তিনি আসেন নাই।
আবদুল গফুরঃ ওখানো কারা কারা উপস্থিত ছিল ?
অলি আহাদঃ গোলাম মাওলার কথা আমার মনে আছে। মতিন সাহেব আসেন।
আবদুল গফুরঃ গাজীউল হক ?
অলি আহাদঃ গাজীউল হকের তো প্রশ্নই আসে না।
আবদুল গফুরঃ কেন ?
অলি আহাদঃ গাজীউল হক চলে গেল বগুড়া।
আবদুল গফুরঃ কবে ?
অলি আহাদঃ ঐদিনই। বরঞ্চ গাজীউল হক আমাকে খবর দিল যে আমার শরীর খারাপ হয়ে গেছে। আমি একথা শুনে, মেডিক্যাল কলেজ থেকে দৌড়াইয়া হন্তদন্ত হইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে  গিয়া উনাকে দেখলাম একটা টেবিলের উপর শুইয়া আছে।
আবদুল গফুৃরঃ একুশ তারিখে ?
অলি আহাদঃ একুশ তারিখে।
আবদুল গফুরঃ  কখন ?
অলি আহাদঃ তখন বোধ হয় বেলা ৪টা কি সাড়ে ৪টা, তখন কিন্তু শীতের দিন। বেলা পড়তেছে। ৫টাও হইতে পারে। তো আমি বললাম যে, গাজীউল হক সাহেব, কি হইছে আপনার ? বলে জ্বর। বললাম এরকম হয় এতে কিছু আসে যায় না।আইসা পড়েন এখান থাইক্যা। এখন আমরা একটু বসবো, আপনি ইমপর্টেন্ট লোক, আপনাকে থাকতে হবে। বললেন আচ্ছা আসছি। কইয়া উনি আর আসলেন না। এরপর আমি লোকশ্রুতিতে শুনলাম, তিনি বগুড়া চলে গেছেন।
আবদুল গফুরঃ উনি কি গ্রেফতার হননি একুশে উপলক্ষে ? একুশে উপলক্ষে কারা কারা গ্রেফতার হলেন ?
অলি আহাদঃ না, গাজীউল হক সাহেব একুশে উপলক্ষে গ্রেফতার হননি। গুলী হওয়ার পরে উনি ছিলেন, গুলী হয় আড়াইটা কি তিনটায় এমন হবে। অপরাহ্ন বেলায়, এই হইলো কথা। গাজীউল হক সাহেবের সাথে দেখা আর পাই নাই, উনি আর আসেন নাই। আমরা দেখি নাই, হয়ত ছিলেন কোথাও। কোথায় ছিলেন জানি না।
আবদুল হাই শিকদারঃ আর একটা বিষয় একটু আমরা জানতে চাই, সেটা হলো যে ভাষা আন্দোলনের একটা পর্যায়ে আপনি বলেছিলেন যে, যদি জনক বা উদ্যেক্তা বলতে হয়, সেটা প্রিন্সিপাল  আবুল  কাশেমকে। পরবর্তী পর্যায়ে আপনারা যখন দায়িত্ব নিলেন, সে সময়ের আপোষহীন, সত্যিকারের, নেতৃত্বদানকারীর ভূমিকায় যে ক’জন ছিলেন, তাদের মধ্যে কাদেরকে আপনি  ক’জনকে সবচেয়ে বেশী  গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ?
অলি আহাদঃ ২১ তারিখ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, প্রথমতঃ কে জি মোস্তফার বরাত দিয়া নাম বলতে হয়, উনাকে রেডিও থেকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কেজি মোস্তফাকে, ভাষা আন্দোলনের নাম বললে কার নাম বললে, কার নাম বলবেন ? অলি আহাদ। ২য় নাম বললে কার নাম বলবেন ? অলি আহাদ আর মতিন। এরপরে ? এরপরে জানি না। এটাই বলল সরাসরি।
আবদুল হাই শিকদারঃ আচ্ছা, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। স্বাধীনতা, সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল ’৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরবর্তীতে আমরা দেখলাম ২৫ মার্চের পরে বা ২৫ মার্চের রাতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করলেন এবং আওয়ামী লীগরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল চারিদিকে। কেউ পালিয়ে এদিক সেদিক চলে গেল। এই যে আওয়ামী লীগের বিশৃংখলা অবস্থা, সেই সময়কার ব্যাপারটা যদি আপনি বলেন, কেন এরকম হ-য-ব-র-ল করেছিল ?
অলি আহাদঃ হ-য-ব-র-ল  হওয়ার কারণ হলো, শেখ সাহবে কখনো কোন আন্দোলনকে কনসলিডেট করে দিতে পারেন  নাই  ছড়াইয়া ছিটাইয়া আন্দোলন করেছেন এটা ঠিক। এবং আন্দোলন হয়েছে, এটাও সত্য। শেখ সাহেব আত্মসমর্পণ করার পরে তারা চেষ্টা সত্ত্বেও শেখ সাহেবকে যখন সেনাপতি হিসাবে মাঠে নিতে পারেন নাই, তাদের মধ্যে একটা দ্বিধাদ্বদন্ধ এসেছে, কি করবে ? আবার এটাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নাই, তাদের মোবিলাইজেশনের পিছনে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একটা সিংহ ভূমিকা ছিল। সেজন্য হাতছানি দিয়ে যখন দিল্লী ডাকে, তোমরা আসে. কি বলে এটাকে, বাস্তুহারা হও এবং আন্দোলনের গোড়াপত্তন কর, ভারত থেকে আমরা সাহায্য করবো। দিল্লী থেকে আমরা সাহায্য করবো, এ হাত ছানিতেও তারা, তাজউদ্দীন সাহেব তারা ছিলেন। তাই এই জন্য তারা ভারতে যাওয়ার দিকে লক্ষ্য রাখলেন। এখানে কনসলিডেট করার চেয়ে যেমন এটা আজকে অস্বীকার করবেন কিনা, করলে তো আমার কিছু যায় আসে না। আমি যেটা সত্যি জানি সেটাই বলবো। ২৫ তারিখের হামলার পরে। তারপরে যখন ২ ঘন্টার জন্য কারফিউ তোলা হইলো, ২ ঘন্টা না কয়েক ঘন্টার জন্য কারফিউ তোলা হইলো, আমি একটা বেবীটেক্সী নিয়ে গেলাম। বোধ হয় ২৬ তারিখে। যে তারিখেই হউক, আমি বেবীটেক্সী নিয়া চলে গেলাম। ২৬ না ২৭ বোধ হয়। চইলা গিয়া দেওয়ান সিরাজুল হক সাহেবের সাথে দেখা করলাম। আর সমস্ত শহরটা ঘুরে দেখলাম। আমার সাহস ছিল না এই জন্য যে, অবাঙ্গালী যারা অস্ত্র চালনা করছে, তারা আমাকে চেনে না। আর চিনে যারা তারা বাঙ্গালী। গোয়েন্দা বিভাগের লোক। সে গোয়েন্দার বিভাগের লোক আমাকে চিনবে কিন্তু ধরিয়ে দেবে না। এটা আমার একটা বিশ্বাস ছিল। সে জন্য আমি বাইর হয়ে গেলাম। ঘুরলাম। আসলাম আবার ফিরা। আবার গেলাম। সে অবস্থায় আমি আওয়ামী লীগের আ-ও দেখতে পাই নাই।
আওয়ামী লীগের আ না দেখলে তো তো আন্দোলন করা যাবে না। আন্দোলন করতে হলে তো আওয়ামী লীগ লাগবে। যেমন এখন বিএনপি লাগবে। এখন আন্দোলন করতে হলে বিএনপি ছাড়া হবে না। ঠিক তেমনি তখন আওয়ামী লীগ ছাড়া এ আন্দোলন করা সম্ভব ছিল না। আমি দৌড়াইয়া গেলাম আনিসুজ্জামান সাহেবের কাছে। আজাদের পরিবর্তী কালের এডিটর, বর্তমানে বাসসের প্রধান। উনার এখানে গিয়া বললাম যে, কি করবেন ? তো উনি বললেন, অলি আহাদ ভাই, কি করবো সব আওয়ামী লীগ ভাগছে। আমি বললাম ভাগছে তো কোথায় ভাগছে ? বলে, কলাতিয়া, বলি, কেন সেখানে ? বলে সেখান থেকে ইন্ডিয়া যাবে। তাহলে আপনি এক কাজ করেন, ওখানে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিল কোন হলের জানি, আমার ঠিক মনে নাই, সে ভাইস প্রেসিডেন্টকে বললাম, তো উনি বললো যে, কি করবো, আমি বললাম আপনি যান কলাতিয়া, কলাতিয়া গিয়া  আপনি তাদের সাথে আলোচনা করবেন। কইরা তাদের ফেরত আনেন। আমরা এখানে রেজিস্টেন্স করবো। উনি বললেন যে, ঠিক আছে। আপনার তো ভাল প্রস্তাব, আমি যাই। উনি গেলেন। গিয়া ফিরে আসলেন। পরের দিন আইসা বললেন যে, আমি কলাতিয়া গিয়া তাদের পাই নাই। তারা সব ইন্ডিয়াতে চলে গেছে। এটাই হলো তারা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়ার মূল কারণ।
আবদুল হাই শিকদারঃ আচ্ছা এমন কি আপনার মনে হয়, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অর্থ্যাৎ সে সময়কার জিয়াউর রহমান যদি স্বধীনতার ঘোষণাটা না দিত, তাহলে কি আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করতো ?
অলি আহাদঃ স্বাধীনতা সংগ্রাম ইন্দিরা গান্ধী তার প্রয়োজনেই করাতো, অতএব সেখানে অলি আহাদ যাক, তাজউদ্দিন আহমদই যাক, আর মেজর জিয়াউর রহমানই যাক আর ভাসানীই যাক সেটা হইতোই।
আবদুল হাই শিকদারঃ আচ্ছা এই যে, তড়িঘড়ি করে মুক্তিযোদ্ধটাকে হঠাৎ করে একসময় দেখা গেল যে, ইন্ডিয়া এর মধ্যে ইনভলব হলো, সরাসরি, একদম সৈন্যসহ যুদ্ধ ১৬ই ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করে দিল। এই তাড়াহুড়া করার কারণটা কি ছিল ? এটাকে গণযুদ্ধে রুপ না দিয়ে এভাবে মাঝ পথে .....।
অলি আহাদঃ আমি সেটার পক্ষেই। কারণ, ভারত যদি না আসত তা হইলে পরে মিছমার হইয়া যাইত সব। আবার যারা নাকি গেরিলা যুদ্ধ বলতেছিল, যেমন আ স ম আবদুর রব, তারা যুদ্ধের বেলায় কিছু নাই। এলাকায় আসতো না। তাদের সাথে আমার কথা হইছে আগরতলাতে। তারা থাকতো সেখানে আর গেরিলা যুদ্ধ করলেই, এটা ২০ বছর ২৫/৩০ বছরের ভিতরে, এর মধ্যে মানুষ শেষ হইয়া যাইতো। জানে, মানে, ধনে, বলে, জনে এখানকার সমস্ত কিছু ধ্বংস হয়ে যেত। এই জন্যই ইন্দিরা গান্ধীর এই হস্তক্ষেপটাকে আমি খুব সমর্থন করি। অতএব এটাকে আমি তাড়াহুড়া মনে করি না। যারা মনে করে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন।
আবদুল হাই শিকদারঃ আপনার এই সমর্থন করা, তাহলে এই যে, স্বাধীনতা যুদ্ধে মাওলানা ভাসানীকে অন্তরীণ বা গ্রেফতার করে রেখেছিল ইন্ডিয়া, এটার ব্যাপারে আপনার বক্তব্য ?
অলি আহাদঃ মাওলানা ভাসানীকে গ্রেফতার করে রাখা বা অন্তরীণ করে রাখা এজন্য যে, মাওলানা ভাসানী যেহেতু মাওলানা ভাসানী, তাহলে তখনকার স্বাধীন বঙ্গদেশের প্রেসিডেন্ট তাকেই ঘোষণা করতে হয়। মাওলানা ভাসানীকেই করতে হয়। ইন্দিরা গান্ধীর প্রয়োজনে যেহেতু এই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ তার প্রয়োজন ছিল, সেহেতু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘোষণা করা হইলো প্রেসিডেন্ট। আর একটিং প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করলো নজরুল ইসলাম সাবকে। প্রাইম মিনিস্টার তাজউদ্দিন আহমদকে। তারা তার হাতের মধ্যে ছিল। তো মাওলানা ভাসানী তার হাতের মধ্যে নয়। সে জন্য তাকে গ্রেফতার করে রাখল। তাকে হেয় করে রাখা হলো। ইচ্ছা থাকলেও তিনি কিছু করতে পারলেন না।
আবদুল গফুরঃ কিন্তু এ পাওয়াকে কি পূর্ণ পাওয়া বলা যায় ?
অলি আহাদঃ পূর্ণ স্বাধীন দেশ পাইতে দেরী হইলে ধনে জনে, বলে শেষ হয়ে যাইতে হইতো। সুতরাং পূর্ণ স্বাধীনতা পাইতো কি পাইতো না, সেকথা বলাও কঠিন। এখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরই প্রয়োজনে। ইন্দিরা গান্ধীর প্রয়োজনে। আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি এবং এটা আমি মনে করি জডিসাস ডিসিশান। এই ডিসিশানের ফলে বাংলাদেশ আজকে স্বাধীন হিসাবে আমরা আছি। আমার কোন কনফিউশান এ ব্যাপারে নাই।
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা, একটা ব্যাপার দেখা যায় একটা বইতে যে, ১৯৭১ সালে যখন মুজিব নগর সরকার ওখানে ছিল, ইন্ডিয়ার সয়েলে, তখন মুজিব নগর সরকারের একটিং প্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম এমন একটা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন ৭ দফা চুক্তি হিসাবে, যাতে বলা ছিল যে, মুক্তিবাহিনী  ইন্ডিয়ান কমান্ডের অধীনে থাকবে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাংলাদেশের নিজস্ব কোন সেনাবাহিনী থাকবে না। তারপর এখানকার যারা ব্যুরোক্রেটস রয়েছে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছে, তাদের যারা মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে নাই, তাদের রিটায়ার করিয়ে দেয়া হবে। প্রয়োজন বোধে শূণ্যপদ ইন্ডিয়ান কর্মকর্তাদের নিয়ে পূরণ করা হবে এবং পররাষ্ট্রনীতি নেয়ার সময় ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করা হবে। এ ধরনের অনেকগুলোই ছিল। তো এই যে চুক্তিটা স্বাক্ষর করার একটা সুযোগ পেল, এটা তো ইন্ডিয়ার মাটিতে ছিল বলেই। এবং ইন্ডিয়ার চাপ ছিল বলেই, এটা সত্যি না ?
অলি আহাদঃ নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। এখানেই তো বেশকম। যদি মাওলানা ভাসানী হইতেন প্রেসিডেন্ট প্রভিশনাল গভার্মেন্টের, প্রভিশনাল রাষ্ট্রের, স্বাধীন রাষ্ট্রের, তাহলে ইন্দিরা গান্ধী যে চুক্তি ৭ দফা সই করায়ে নিয়েছিলেন সেটা করাতে পারতেন না। সেই জন্যেই ইন্দিরার স্বার্থেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধীর স্বার্থেই মাওলানা ভাসানীকে অন্তরীণ করা হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর স্বার্থেই আমরা তার কাছে মাথা নত করেছি। এখানে ঐ বৃটিশের আমলে সিরাজদ্দৌল্লা যে ভুমিকা পালন করেছিল, মাওলানা ভাসানী সে ভুমিকা পালন করেছেন। আর যে ভূমিকা মীর জাফর পালন করেছেন সে বৃটিশের আমলে, সে ভূমিকাই পালন করেছেন তাজউদ্দিন এবং নজরুল ইসলাম তারা। সেই জন্য দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি না হলেও মোটামুটি কম্প্রোমাইজ করে নেয়া হয়েছে।
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা আর একটা প্রশ্ন, আমাদের ইতিহাসের পটভূমি যখন বিশ্লেষণ করতে দেয়া হয়, কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন; তারা বলতে চান, পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের বা আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের বিকাশের কোন সম্পর্ক নেই এবং যে লাহোর প্রস্তাবের কথা বলা হয়, অনেকে বলে যে, লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়েছে; লাহোর প্রস্তাবের একটা অংশ ‘৪৭ সালে বাস্তবায়ন হলো পার্টিশন অব ইন্ডিয়া। আর একটা বাস্তবায়িত হলো যে, ঐ দুই অংশের দুটো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে। আচ্ছা, এই যে ব্যাপারটা তারা বলতে চান যে, লাহোর প্রস্তাবের সাথে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বা বাংলাদেশ সৃষ্টির কোন সম্পর্ক নাই। এ সম্পর্কে আপনার কি ধারণা ?
অলি আহাদঃ লাহোর প্রস্তাব না হলে পাকিস্তান হতো না। দিল্লী কনভেনশনের প্রস্তাব না হলে পাকিস্তান হতো না। পাকিস্তান না পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হতো না। অর্থ্যাৎ আমরা দিল্লীর সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকতাম, অখন্ড ভারতের অংশ হিসাবে পশ্চিম বঙ্গ আছে তারা কি স্বাধীনতা পেয়েছে ? স্বাধীনতা যুদ্ধ করতে পারছে ? আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করতে পেরেছি। যেহেতু পাকিস্তান  হয়েছিল, সেহেতু পূর্ববঙ্গ স্বাধীন হয়েছে। যদি আমরা পাকিস্তান না হয়ে বা পাকিস্তান  হওয়ার পরও যদি ভারতের অধীনে থাকতাম অর্থ্যাৎ পশ্চিমবঙ্গের সাথে থাকতাম তাহলে সমস্ত বঙ্গদেশই আজকে হিন্দুস্থানের পদতলে থাকতো। অতএব যে যা বলুক না কেন, এটা হল, জ্ঞানপাপীদের কথা। এর মধ্যে একজন আছে শওকত উসমান। শওকত উসমানের কাছে আমার প্রশ্ন জনাব, ভারত বিভক্তির পরে আপনারা সুন্দর দেশটিতে থাকলেন না কেন ?  আপনাদের মতো এরকম বহু লোক এসেছেন এখানে। এখানকার কলাটা, মূলাটা চোষার জন্য এবং খেয়েছেন আপনারা। আবার এখন উল্টা বাক্য আওড়ান। উল্টা বাক্য যখন তো দয়া করে দিল্লীতে যান, পশ্চিমবঙ্গে যান, পশ্চিমবঙ্গের স্বাধীনতা চান। তাহলে বুঝবো ওখানের বাঙ্গালীরা স্বাধীনতা চায়। কিন্তু ঐ বাঙ্গালীরা স্বাধীনতা চান না। আপনারা অখন্ড ভারত চান। আমাদের পরাধীনতা চান। এপরাধীনতার জন্য কি আমরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে আরম্ভ করে, ‘৪৭ থেকে আরম্ভ করে বহু ত্যাগ করেছি, বহু জেল খেটেছি, বহু কষ্ট করেছি ? নিজের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক্সপেল করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আর পড়তে পারলাম না। বিদেশে আর পড়তে পারলাম না। যেহেতু এখানকার এক্সপালশান আছে আমার। সেহেতু এ রেফারেন্সে সেখানে আর হয় না। বার এট ল’ পড়তে পারিনি। কিন্তু আপনা কোনটা খাননি ? কোন কলাটা, মূলাটা খাননি ? পরাধীন থাকতেও আবার কলাটা, মূলাটা পাবেন। এখানে আইসা আমাদের দয়া করে জ্বালাতন না করে বাঙ্গালী দাবী করেন, তা না করে দয়া করে পশ্চিমবঙ্গে যান, পশ্চিমবঙ্গে গিয়া ঐটাকে স্বাধীন করে আসেন। জ্যোতি বসুর সাথে কথা বলেন। আমি দেখতে চাই কেমন ব্যাটাডা হয়েছেন আপনারা। আমাকে বলেন, আমি পারবো। আমি আগরতলায় আপনার মত পন্ডিতদের বলেছিলাম যে, আমরা একটা কথা জিজ্ঞেস করি। আমরাও রাওয়ালপিন্ডি, করাচীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে, আপনাদের এখানে আশ্রয় নিতে এসেছি যুদ্ধ করার জন্য। আপনারা এখন পশ্চিমবঙ্গের সাথে, পশ্চিমবঙ্গকে বলেন, আপনারা ত্রিপুরায় বাঙ্গালী বেশী, আপনারা বলেন, আমরা দিল্লীর অংশ হিসেবে থাকবনা। আমরা অখন্ড ভারতের অংশ হিসাবে থাকবনা । আমরাও স্বাধীনতা চাই, সার্বভৌমত্ব চাই, বাঙ্গালীদের জন্য। যেমন শরৎচন্দ্র চেয়েছিল, যেমন সোহরাওয়ার্দী সাহেব চেয়েছিলেন। যেমন কিরণ শংকর রায় চেয়েছিল, যেমন এস এম দাশ গুপ্ত চেয়েছিল। আপনারা দয়া করে এটা করেন। এখন সুযোগ আছে। কিন্তু সাহেব বলে, না এটা আমরা করবো না। আমরা অখন্ড ভারতের সদস্য হিসাবে নিজেদেরকে গর্ববোধ করি।
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা একটি জিনিস তাহলে দেখছি, আপনার কথায় আমরা এটা বুঝতে পারছি, পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির আন্দোলনের সবগুলো ঘটনা একটার সাথে একটা ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।
অলি আহাদঃ নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই জড়িত।
আবদুল গফুরঃ তাহলে লাহোর প্রস্তাবের সাথে আমাদের বাংলাদেশের যে ইমার্জেন্স এটার একটা অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
অলি আহাদঃ নিশ্চয়ই আছে, লাহোর প্রস্তাব না হলে তো পাকিস্তানই হতো না। অখন্ড ভারত থাকতো। ভারত খন্ডিত হতো না। লাহোর প্রস্তাব না হলে পূর্ববাংলা স্বাধীন হতো না। আমরা চেয়েছি বঙ্গদেশকে, আমরা চেয়েছি আসামকে, একত্রে মিলে লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী। কিন্তু আমরা আসাম, বেঙ্গল দুইটার কোনটাকে পাইনি, না পেলেও তো এইটুকু আমরা স্বাধীন হয়েছি। আমার এই জায়গাটুকুতে আমি আজকে স্বাধীন। যে স্বাধীনতার ফল, আজকে ধানমন্ডিতে বসে কথা বলি, এটা একটা বাজার ছিল। ধানমন্ডি অর্থ্যাৎ ধানের বাজার। আর চতুর্দিকে ছিল ধানক্ষেত। সে জায়গা আজকে অট্টালিকাপূর্ণ। আমার দেশে আজকে যে অবস্থা চট্টগ্রামে হয়েছে মংলা পোর্টে হয়েছে। এমনকি সমস্ত দেশব্যাপী যে উন্নতি হয়েছে, এটা একটি মাত্র কারণ, পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল। লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী পাকিস্তান  হওয়ার পরে বাংলাদেশ স্বাধীন আজো আছে, যদিও নানা ষঁড়যন্ত্র চলছে, দিল্লীর পদতলে পুরাপুরিভাবে নিয়ে নেওয়ার জন্য।
আবদুল গফুরঃ আচ্ছা এ ধরনের কি একটা ষড়যন্ত্র আপনি মনে করেন, এই যে সম্প্রতি পার্বত্য চুক্তি একটা স্বাক্ষরিত হয়েছে আজকে একুশের মাসে একুশে ফেব্রুয়ারীতে, আপনি একুশের একজন ভাষা সংগ্রামী, আপনার দৃষ্টিতে চুক্তির সাথে একুশের চেতনার সম্পর্কটা কি ?
অলি আহাদঃ একুশের চেতনা স্বাধীনতার দিকে আমাদের ধাবিত করে। সার্বভৌমত্বের দিকে ধাবিত করেছে। বাঙ্গালী এক জাতি প্রমাণ করার জন্য। আর আমাদের কাছে সে একুশের চেতনাকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে নিভিয়ে দেয়ার জন্য এই পার্বত্য চুক্তি করা হয়েছে। এ চুক্তির অর্থ আগামী দিন সেই গেট ওয়ে টু, কি বলে এটাকে ?
আবদুল গফুরঃ  সেভেন সিস্টারস।
অলি আহাদঃ গেট ওয়ে টু সেভেন সিস্টারস হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং গেট ওয়ে চিটাগাং পোর্ট, এ বিবেচনায় গেট ওয়ে টু চিটাগাং পোর্ট বলেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে আমাদের অংশ হিসাবে দিয়েছে। আজ এটাকে বিশ্বসঘাতকতা করে হিন্দুস্থান যাতে নাকি একটা পর্যায়ে গিয়া সার্কেল চীফ এবং যে সকল চুক্তি করা হয়েছে চুক্তিগুলির ধারা অনুযায়ী এক জায়গায় গিয়ে দাড়াবে যে তারা বলবে, আমরা সেন্ট্রাল গভর্ণমেন্ট ঢাকার নির্দেশ আর মানবো না। তারপর তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকবে দিল্লী। দিল্লী সঙ্গে সঙ্গে তাকে রিকোগনেশন দিয়ে দিবে। মানতে হবে, তাই মানতেছে, তাদের কোন ইন্ডিপেডেন্ট, স্বাধীন কোন ভূমিকা নাই।
আবদুল হাই শিকদারঃ স্বাধীন কোন ভূমিকা নাই বলতে চাচ্ছেন, কিন্তু আপনারা যারা বিরোধী দলে আছেন তাদের কাছ থেকেও তো আমরা তেমন কোন কার্যকর যেমন, জনসভার কথা বলতে পারি আমরা, জনসভার ব্যাপারে কিছু প্রেসক্রিপশন দিয়েছিল গভর্নমেন্ট, এখানে করতে পারবে, এখানে করতে পারবে, এখানে করতে পারবে না, রাস্তায় নামলে লাঠিপেটা এবং প্রচুর সংবাদপত্রের উপর দমন হয়েছে, দৈনিক বাংলার মত পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনেকে আমরা ছুরিকাহত হয়েছি, কাউকে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এ রকম টোটাল বাংলাদেশে মানবাধিকারের উপরে যুক্তরাষ্ট্রের যে পররাষ্ট্র দফতর তারাও একটা রিপোর্ট পেশ করেছে, কিন্তু ৭ দল থেকে এ রকম কার্যকর মানবাধিকারের ব্যাপারে আপনাদের ভূমিকাটা আপনি বলবেন ? এগুলো প্রতিরোধের ব্যাপারে আপনারা কি করেছেন ?
অলি আহাদঃ মন্তব্য করার সময় আসে নাই।
আবদুল হাই শিকদারঃ না, আমরা যেটা জানতে চাচ্ছি সেটা হলো যে, টোটালী আপনারা কি করতে যাচ্ছেন, রাজনীতি, গণতন্ত্র ও দেশের জন্য ?
অলি আহাদঃ করতে তো চাই একুশে ফেব্রুয়ারীর মত, পারছি কোথায় ?
আবদুল হাই শিকদারঃ তাহলে আপনি কি আশাবাদী না হতাশ ?
অলি আহাদঃ আমি যখন বাচ্চাকাল থেকে বিভিন্ন আন্দোলনে সংগ্রামী ভূমিকা মোটামুটি রেখে আসছি, আমার তো হতাশ হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
আবদুল হাই শিকদারঃ আচ্ছা আর একটা ব্যাপার এই পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে যেহেতু প্রসঙ্গটা এসে গেছে, ঐ প্রসঙ্গেই কথা বলি, সেটা হলো যে পার্বত্য চট্টগ্রামের চুক্তিটাকে আপনারা বলেছেন যে, এটা স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সংবিধান বিরোধী, এখন এ চুক্তি প্রতিরোধের ব্যাপারে একজন রাজনীতিবিদ হিসাবে আপনার নিজের দল এবং বিএনপি, জামায়াতসহ ৭ দলের তেমন কোন কার্যকর ভূমিকা আমরা দেখলাম না। আপনারা হরতাল করেছেন অবশ্যই, কিন্তু জাতীয়ভাবে যেদিন চুক্তিটা হলো সে দিন থেকে শুরু করে কথা ছিল যে, বাতিল না হওয়া পর্যন্ত হরতাল চলবে, অর্থ্যাৎ সেদিন হরতাল থাকবে। এবং ঈদের পরে কঠোর কর্মসূচী দেবেন, তো আমরা কোথাও কোন পর্যায়ে এরকম কোন আলামত দেখছি না। এর মানে কি এই যে, এটা মেনেনিয়েছেন, না কি ?
অলি আহাদঃ এর উপরে মন্তব্য করার সময় এখনো আসে নাই।
আবদুল হাই শিকদারঃ তাহলে এটা কি আমরা এটুকু আশ্বস্ত হতে পারি, এই যে, আপনারা এ চুক্তিটাকে মেনে নিচ্ছেন না, না কি মেনে নিয়েছেন ?
অলি আহাদঃ মেনে নেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা। মেনে না নেওয়ার পরে যে ধরনের সক্রিয় কাজ অর্থ্যাৎ একুশে ফেব্রুয়ারীর মত করা সেটা হয়ত আমরা করতে পারি নাই। বা করি নাই। কিন্তু মেনে নেওয়ার কোন প্রশ্নই উঠেনা।
আবদুল হাই শিকদারঃ বর্তমান সরকারের এ পার্বত্য চুক্তি করার পরে আপনি মানে  
আপনাকে যদি বলতে বলা হয়, এ ব্যাপারে টোটাল একটা মন্তব্য করেন, তো এ সরকার সম্পর্কে আপনি কি বললেন ? এ চুক্তি শত বিরোধিতা সত্ত্বেও তো তারা করলো।
অলি আহাদঃ দিল্লীর বশংবদের পক্ষে আর কি উপায় ছিল ? এ সরকার দিল্লীর বশংবদ এটা মানেন কি না ? এটা মানার উপর নির্ভর করবে সব কিছু। আমি মনে করি, সেবাদাস সরকারের পক্ষে, যেমন মীর জাফরের পক্ষে সম্ভব ছিল না ইংরেজের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার যেমন চেষ্টা করে ও আ করেও (মীর জাফরের জামাইটার নাম কি ভূলে গেলাম) মীর কাসেম, চেষ্টা করে ও আ করেও শেষ পর্যন্ত মাইনা নিতে হয়েছিল। এ জন্যই শেষ পর্যন্ত মাইনা নিতে হয়েছে। টিকে নাই। আমার বক্তব্যটা হলো; এখন ধরেন সিকিমে লেন্ডুপ দর্জি যে অপজিশানটা বিল্ডআপ করে, তারাও পার্লামেন্টে আসে, সে পার্লামেন্ট দিয়েই সিকিমকে ভারতের অংশ হিসাবে ঘোষণা করা হয়। আজ এখানেও শেখ হাসিনা লেন্ডুপ দর্জির যে ভূমিকা সে ভূমিকাতে অবতীর্ণ হয়েছে অর্থ্যাৎ তার পক্ষে বা দিল্লীর দালালের পক্ষে অন্য কিছু চিন্তা করার কোন স্থানই নাই।
আবদুল হাই শিকদারঃ এই যে পানি চুক্তি যেটা হয়ে গেল, এর আগে এই পানি চুক্তি করিডোর, ট্রানজিট এসব নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, আপনার নিজের বক্তব্যও আমরা পাঠ করেছি, তা এই সবটা টোটাল বিচারে বাংলাদেশের বর্তমান সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপারে আপনার মূল্যায়নটা আমরা জানতে চাচ্ছি।
অলি আহাদঃ সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিটা হলো, বিদেশের দালালী করা যা দিল্লী সিদ্ধান্ত করে দিবে, তাই তাদের। দিবে এ জন্য যে, দিল্লীর এই চিটাগাং পোর্টের প্রয়োজন আছে। বে অফ বেঙ্গলের উপর যে চিটাগাং পোর্টের তাদের প্রয়োজন আছে। বে অফ বেঙ্গলের উপর যে চিটাগাং পোর্ট এই চিটাগাং পোর্টের তাদের প্রয়োজন আছে। তাদের এই সেভেন সিস্টার-এর ৭টা রাজ্য, এই ৭টা রাজ্যের জন্য ইমপোর্ট বলা হউক এক্সপোর্ট বলা হউক, এগুলো সম্পূর্ণ চিটাগাং পোর্টের মারফত করতে হবে। সুতরাং চিটাগাং পোর্টের তাদের প্রয়োজন আছে। এখন তারা একটা পর্যায়ে গিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাধীনতা পর্যন্ত দেওয়ার পরে চিটাগাং পোর্ট আমাদের ব্যবহার করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সেটা লিখে দিবে। এখানে বিগ ব্রাদার এটিচুড যেটা সে বিগ ব্রাদার এটিচুডটাই কাজ করবে যা আমাদের সমূহ ক্ষতি। বাংলাদেশকে পরাধীন করার জন্য এটা একটা সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র এবং এ ষড়যন্ত্রই কার্যকর হতে যাচ্ছে। কোশ্চেন অব টাইম, কত দিনে হবে, সেটা হবে বক্তব্য।
আবদুল হাই শিকদারঃ বাংলাদেশের ভবিষ্যত সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি ? কি হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ, একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ ? বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তের দেশের প্রবীণতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কন্ঠে এর মূল্যায়ন কি হবে একটা ভবিষ্যদ্বাণী জানতে চাই।
অলি আহাদঃ বাংলাদেশের কিছু ভবিষ্যৎ নেই। আপামর চরিত্রহীনতায় ভরা। স্বার্থপর চরিত্রহীনতা কোন দিনও জাতিকে গড়তে দিবে না। এটা আমি জানি, আমার এ কথাতে অনেকে খুব রাগ হবে, গালাগালিও করবে, তারপরেও আমি যে অবস্থা দেখছি, চারিত্রিক পরিবর্র্তন না আসলে, আসবে বলে আমি দেখতেছি না। এ দেশের পরিবর্তন হবে না। হ্যাঁ পরিবর্তন একটা হয়েছিল ১৫ আগস্ট। সেই বীররা যদি, তারা বীর কি-না জানি না, লেখাপড়া কতদূর জানতো জানিনা। তবে ১৫ আগস্টে যে পরিবর্তন আসছিলো, সে পরিবর্তন ধরে রাখলে আজকে এ অবস্থা হতো না। ১৫ আগস্টের আগে ও পরে যে সকল সরকার আসছে, সবাই চোর ছিল এবং লুটপাটের পুরা অংশীদার ছিলেন। লুটপাটও করবো, আদর্শও প্রতিষ্ঠা করবো, জাতিও বাঁচাবো, সেটা কখনো হয় না। অতএব, আমার এ সকল মন্তব্য থেকে আপনারা বুঝে নেন, কি বলতে চাই আমি।
আবদুল হাই শিকদারঃ এখানে তাহলে একটা কথা আপনি নিজে বলেছেন যে, আপনি আজীবন আশার রাজনীতি করেছেন। কিন্তু আপনি এখন যে মন্তব্য করলেন, এটার মধ্যে আমরা আশার কোন আলো দেখতে পাচ্ছি না।
অলি আহাদঃ কারণ, আমি সেই কায়েদে আজমের নেতৃত্বও দেখি না, যে নেতৃত্বে পাকিস্তান করেছি। আমরা জয় প্রকাশের নেতৃত্বও দেখছি না, যে নেতৃত্বে চরিত্রও দেখা যায়। আমরা আবুল হাসিম সাহেবের নেতৃত্বও দেখি না, যে নেতৃত্বে আমরা আদর্শ শিখেছি। আদর্শের যে হাওয়া ছিল, সেটা পুরাপুরি বিদায় নিয়েছে। এখন রাজনীতির অর্থই হল চরিত্রহীনদের রাজনীতিক কাজ। এ হলো সাধারণ লোকের ধারণা। সাধারণ লোকের ধারণা হউক আর না হউক, যে অবস্থায় আছে, সেখান থেকে চরিত্রহীনতা প্রকাশ পাচ্ছে। এ হলো দেশের অবস্থা এ অবস্থায় দেশের কাছে কোন পরিবর্তন আশা করাটা অন্যায়। সেই একনিষ্ঠ সংগ্রামী চরিত্র, সেই চরিত্রবান পুরুষের স্থান কোথায় ? কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ থাকলে এবং এই আন্দোলনে তিনি গাইড করলে পরে তাহলে হয়ত চরিত্র আমরা কিছু দেখতে পেতাম। আন্দোলন মানে পাকিস্তান হওয়ার পরও কিছুকাল যদি বেঁচে থাকতেন, শেখ সাহেব দুর্নীতির দায়ে তো তখন তারও মামলা হয়েছিল, সাজাও হয়েছিল। শেখ সাহেবের সময় ৩ পয়সার পোস্টকার্ডে দুর্নীতি দমন করা হবে, গ্রেফতার করা হবে বলা হয়েছিল, ৩ পয়সার পোস্ট কার্ড বহু লেখা হয়েছিল। কোন কিছু হয় নাই মধ্যে থেইকা যারা চিঠি পোস্টকার্ড লিখেছিল, বরং তাদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেলেন। এ রকম চরিত্রহীনতা, সেই দেশে বৈপ্লবিক চিন্তা করা, চরিত্রের কথা চিন্তা করা, আদর্শের কথা চিন্তা করা, খোলাফায়ে রাশেদিনের সমাজ ব্যবস্থার কথা চিন্তা করা, সে কথা কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।
আবদুল হাই শিকদারঃ উদ্ধারের উপায়টা কি ? একটা নির্দেশনা আমরা আপনার কাছে চাই। কি রেখে গেলেন পরবর্তী নিশানবরদারদের জন্য ?
অলি আহাদঃ যারা জিয়াউর রহমানের সরকার করেছেন, শেখ সাহেবের সরকার করেছেন। উল্টিয়ে দে মা লুটেপুটে খাই, এ অবস্থা শেখ সাহেবের সময় হয়েছে। শেখ সাবের পরে জিয়উর রহমান সাহেব। খন্দকার মোস্তাকের অল্প কয়দিন ৮৩ দিন এটা হইলো স্বর্ণযুগ। আবার সাত্তার সাবের সময়, তখন একটা এডমিনিস্ট্রেশন এসেছিল। তারপর তাকে বিদায় দেয়া হলো। জিয়াউর রহমানের সময় কোন এডমিনিস্ট্রেশন ছিল না। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সৎ ছিলেন এর মধ্যে কোন সন্দেহ নাই। আমরা যতটুকু শুনেছি। কিন্তু এডমিনিস্ট্রেশনে ছিল চোর, দুর্নীতিবাজ। আবার এরশাদের সময় তো এটা প্রশ্নই উঠেনা দুর্নীতি ছাড়া তো কোন কথাই ছিল না। সেখানে তার পরের সরকার, আমার বলার দরকার নাই, আমি না বললেও যারা বুঝার, যারা জানার তারা জানে। আমি সে সম্পর্কে কোন মন্তব্য করবো না। তারপরে যে সরকার, একজনে তো এক মন্ত্রী ৮০০ কোটি টাকা হোয়াইটইট করে নিয়েছেন। কোথায় পাইলো টাকাটা ? ৮০০ কোটি টাকা হইয়া গেল কেমনে ? উনি তো কার পোলা আমি জানি, তিনিও জানেন। কি আরম্ভ হয়েছে ? বিশেষ করে গ্যাস এবং তেলের ব্যাপার নিয়া, টাকার খেলা কি জিনিস-সে জিনিসটা আর কিছু দিন পরে, সবাই জানতে পারবে। এটা জানার বোধহয়  বিশেষ বাকীও নাই বর্তমানে। বর্তমানে সেই জন্য আমি বলেছি যে, এ সরকার গণভোট দিলে ৯০% ভোট তার বিরুদ্ধে যাবে। মুসলমানরা তার বিরুদ্ধে থাকবে। তার পক্ষে ভোট পড়বে না একটাও। জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে। মাফ চেয়ে পার পাওয়া যাবেনা। এর মধ্যে নির্দেশনা একটাই, এখন সেই চরিত্র চাই, কিভাবে আসবে আমি জানিনা। আমি কোন পথ দেখি না। আর কি বলবো। 
আবদুল হাই শিকদারঃ আরেকটা কথা, আপনি আজাদ বাংলার কথা বলছিলেন, দেশ স্বাধীনতার পরে। সে আজাদ বাংলার কারণ ছিল কি ? ফিলোসোফিটা কি ছিল ?
অলি আহাদঃ আজাদ বাংলার ফিলোসোফিটা ছিল যে, হিন্দুস্থানের পদতল হতে বের করা এবং আজাদ শব্দটা একটা কনোটেশন আছে। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের কনোটেশান একটা শব্দই কেরি করে। তার সাথে জীবনের মূল্যবোধ জড়িত আছে। তার সাথে আরো অন্যান্য মূল্যবোধ জড়িত। সব মিলাইয়া সামাজিক মূল্যবোধ, জীবনের মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক মূল্যবোধ, এসব কিছু মিলেই আজাদ শব্দটার আমরা ডাক দিয়েছি। আমরা তখনকার দিনে ভারতের যে দাপট আমাদের ওপর দেখতে পেরেছি, সেই দাপটকে বাধা দেয়ার জন্য একটা শ্লোগান দেয়ার দরকার ছিল। একটা অল্প শব্দে, এটা আজাদ বাংলা শব্দটাতে ডাক দিয়েছিলাম। দিল্লীর দাসত্ব হতে মুক্তি চাই। দিল্লীর দাসত্ব এসে গিয়েছিল বলেই আজাদ বাংলা শব্দটা এসেছিল।
আবদুল হাই শিকদারঃ সে প্রেক্ষাপট কি এখনো আছে বলে মনে করেন ? নাকি শেষ হয়ে গেছে ?
অলি আহাদঃ না না শেষ হয় নাই। শেষ হয়েছিল, ১৫ আগস্টের পরে কিছু কাল। স্থগিত ছিল। বর্তমানে পুরোপুরি আবার সেই দাসত্ব।
আবদুল হাই শিকদারঃ এখন কি আপনি আবার আজাদ বাংলা আন্দোলন শুরু করবেন ?
অলি আহাদঃ আমি তো চাই। আজাদ বাংলার ডাক আমি দিতে চাই। কিন্তু আমি ডাক দিলেই কি বিএনপি শুনবে ? কারণ, তাদেরই টাকা আছে। এখনকার সংগঠন মানে টাকা, যার টাকা নাই সে সংগঠন করতে পারবে না। সংগঠন না করতে পারলে ডাক দেয়া যাবে না। ডাক দিলে সে ডাক কার্যকরী হবে না। আমার ডাক দেয়ার খুব ইচ্ছা আছে, কিন্তু আমার দেয়ার ওপর ইচ্ছার উপর সব কিছু নির্ভর করে না।
আবদুল হাই শিকদারঃ আপনার জীবনের শেষ ইচ্ছা কি ?
অলি আহাদঃ জীবনের শেষ ইচ্ছা ? শেষ ইচ্ছাটা হল, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই হইল আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা।
আবদুল হাই শিকদারঃ অবির্ভক্ত ভারতের ‘৪৭-এর আগে যেসব জাতীয় নেতৃবৃন্দ ছিলেন, কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, জওহরলাল নেহরু, লিয়াকত আলী খান, গান্ধী, শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী এদের মধ্যে গান্ধীজি ও কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র মধ্যে যদি তুলনা করতে বলা হয়, তাহলে কি রায় হবে আপনার ?
অলি আহাদঃ কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন সত্যবাদী, স্পষ্টভাষী। ধোঁকা কাকে বলে তা তিনি জানতেন না। গান্ধীজি, পন্ডিত জওহরলাল নেহরুসহ ভারতের নামকরা প্রায় সব রাজনীতিবিদেরই জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তারা ছিলেন প্রতারক। মিথ্যা কথা বলতেন হরদম। ওয়াদা করেন একটা করে আর একটা। তারা অখন্ড ভারত চেয়েছিলেন। গান্ধীজি মাউন্ট ব্যাটনকে বলেছিলেন, জিন্নাহকে বলার জন্য, তাকে প্রধানমন্ত্রী করলে তিনি রাজি আছেন কি-না ? উত্তরে জিন্নাহ বলেছিলেন, গান্ধীজিকে জিজ্ঞাসা করুন, তার নেহরু এবং প্যাটেল রাজি আছে কি-না ? উত্তর সেখানেই হয়ে গেল গান্ধীও যা বুঝার বুঝলেন। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ অখন্ড বঙ্গদেশ স্বাধীন সার্বভৌম চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের অংশ হতে হবে তাও তিনি বলেন নাই। কিন্তু গান্ধীজি অখন্ড ভারত চেয়েও খন্ড বঙ্গদেশ চেয়েছিলেন। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ ১৯০৫ সাল থেকে শুরু করে বঙ্গ বিভাগের বিরুদ্ধে ১৯১১ সাল পর্যন্ত আন্দোলন করে এবং বঙ্গ বিভাগ রদ করে। অথচ সেই কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দের প্রায় সকলেই পরে ‘৪৭-এ বঙ্গভঙ্গের জন্য উঠে পড়ে লেগে গেলেন। সুতরাং কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সমস্ত অখন্ড ভারতে একমাত্র নেতা কোন প্রসঙ্গেই যার মধ্যে কোন দোদুল্যমানতা ছিল না। ছিল স্পষ্টবাদিতা, ছিল সত্যবাদিতা। ধোঁকা কাকে বলে তা তিনি জানতেন না। আমরা তার নেতৃত্বে কাজ করেছি। কায়েদে আজমের নেতৃত্বে কাজ করে আমাদের দুঃখ যে তাঁর প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে আমরা কাজ করেছি, কিন্তু আমাদের মধ্যে পরবর্তীকালে সে মানের নেতৃত্ব আমরা পাইনি। ফলে যা হবার দেশের তাই হয়েছে।
আবদুল হাই শিকদারঃ আপনি কি নিজেকে রাজনৈতিকভাবে কোন বিশেষ রাজনৈতিক নেতার অনুসারী মনে করেন ?
অলি আহাদঃ একমাত্র কায়েদে আজম মোহম্মদ আলী জিন্নাহর অনুসারী আমি।
আবদুল হাই শিকদারঃ মাওলানা ভাসানী সম্পর্কে আপনার সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন চাই।
অলি আহাদঃ দেশপ্রেমিক।
আবদুল হাই শিকদারঃ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
অলি আহাদঃ ক্ষমতা প্রেমিক।
আবদুল হাই শিকদারঃ শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ?
অলি আহাদঃ ক্ষমতা প্রেমিক।
আবদুল হাই শিকদারঃ জিয়াউর রহমান ?
অলি আহাদঃ জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কমেন্ট করতে হবে এটা শুনেই তো আমি আশ্চর্য হচ্ছি। তিনিও ক্ষমতা প্রেমিক।
আবদুল হাই শিকদারঃ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি ?
অলি আহাদঃ যদি আমরা বাংলাদেশে বাস করি, আর এর নাগরিক হই, তাহলে জাতীয়তাবাদ তো বাংলাদেশী হবেই। আবার আমি মনে করি বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদও হতে পারে। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মধ্যে কোন কনটেস্ট আছে বলে আমি মনে করি না। এটা শেখ হাসিনা মনে করে।
আবদুল হাই শিকদার আপনার স্নেহভাজন ভাতিজী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য আপনার কোন উপদেশ আছে কি-না ?
অলি আহাদঃ অরণ্যে রোদন, তা হবে অরণ্যে রোদন মাত্র।
আবদুল হাই শিকদারঃ অশেষ ধন্যবাদ আপনাকে।
অলি আহাদঃ আপনাদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ।
[বিঃদ্রঃ সাক্ষাৎকারটি তিন কিস্তিতে বিগত ২১ শে ফেব্রুয়ারী’ ২৫ শে ফেব্রুয়ারী ও ৪ই মার্চ ১৯৯৮ ইং দৈনিক ইনকিলাবে ছাপা হয়। কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ছিল এখানে তা সংশোধন করে ছাপা হয়েছে। -সম্পাদক]