একুশে ফেব্রুয়ারীর ইতিহাস সত্যাগ্রহীর সাক্ষ্য -আমীর আলী

ফন্ট সাইজ:
যদি বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে একথাগুলো আমাকে না লিখতে হতো তাহলেই বোধ করি ভালো হতো। কারণ এ লেখায় আমি নিজেও একটি চরিত্র। যেসব সত্যাগ্রহী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে কারাবরণ করেছিল তাদের কথা গত সাতচল্লিশ বছরের মধ্যে কেউ লেখেনি। কোনো প্রতিষ্ঠান (বাংলা একাডেমীসহ) এদের স্বরণ করেনি। একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে এদের ভাষা সম্পর্কে কোনো ঐতিহাসিক, কোনো সাংবাদিক বা কোনো বুদ্ধিজীবীই উৎসাহ তো দূরের কথা ঔৎসুক্য পর্যন্ত দেখাননি। একুশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভূমিকা শহীদদের। তারপরেই এই সত্যাগ্রহীদের। ঘটনাচক্রে এদের দলের পেছনে আমিও ছিলাম।
একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে বাংলাদেশে যথেষ্ট লেখা ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও আরো হবে। এই লেখকদের মধ্যে যারা একুশে ফেব্রুয়ারীর আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন তাঁরা হচ্ছেন অলি আহাদ (জাতীয় রাজনীতিঃ ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫ ঢাকা); আবদুল মতিন (বাঙালী জাতির উৎস সন্ধান ও ভাষা আন্দোলন, ঢাকা, ১৯৯৫); গাজীউল এবং এম আর আখতার মুকুল (বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন) ও এম আর আখতার মুকুল (একুশের দলিলঃ ঢাকা, ১৯৯০)। এরা সবাই ছিলেন একুশের নেতা। অলি আহাদ আর আব্দুল মতিন ছিলেন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য। গাজীউল হক আমতলার সেই ঐতিহাসিক সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন। একুশের আন্দোলনে অলি আহাদ আর আবদুল মতিন কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন।
এঁদের বই ছাড়াও বাংলাদেশে একুশে ফেব্রুয়ারীর ওপর আরো অনেক বই লেখা হয়েছে। বেশ কয়েকটি বই আমিও পড়েছি। তবে সব কটি বই নিয়ে আলোচনা এই লেখার পরিসরে সম্ভব নয়। কিন্তু একটি বইকে উপেক্ষা করলে এই লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বইটি হচ্ছে বদরুদ্দিন উমরের ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, তৃতীয় খন্ড, চট্টগ্রাম, ১৯৮৫।
ওপারে যাঁদের কথা বলেছি তাঁদের অধিকাংশই ভাষা আন্দোলনে হয় নেতৃত্ব প্রদান করেছেন অথবা নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দাবিদার। উমর এ দাবি করেননি। তবে ভাষা আন্দোলনে এঁরা এবং আরো যাঁরা একুশের ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন তাঁদের ভাষ্যের ভিত্তিতে উমর তাঁর ইতিহাস রচনা করেছেন। এর মধ্যে শুধু রাজনৈতিক নেতারাই যে ছিলেন তা-ই নয়, ছিলেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, শিক্ষক, পুলিশ ও বিভিন্ন সরকারি আর বেসরকারী কর্মচারীরা। উমরের বইটি এঁদের সবারই ভাষ্যকে ভিত্তি করে রচিত।
ঘটনাচক্রে ভাষা আন্দোলনের এই ছাত্রনেতাদের সবার সঙ্গেই পরিচিত হওয়ার এবং কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। অলি আহাদ আর আমি দুজনই ১৯৫৬ সালে ‘কমিটি ফর ডেমোক্রেটিক কনস্টিটিউশন’- এর সদস্য ছিলাম। সেই সময় পাকিস্তানে একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের জন্য এই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এর সভাপতি ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (আওয়ামী লীগ)। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান ও অলি আহাদ (আওয়ামী লীগের)। অলি আহাদ সে সময় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। উপদেষ্টা ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। অন্য সদস্যের মধ্যে ছিলেন আবদুল মোমিন তালুকদার ও আবদুল আউয়াল (ছাত্রলীগ), মোহাম্মদ সুলতান (যুবলীগ) ও প্রাণেশ সমাদ্দার (গণতন্ত্রী দল), সুফিয়া খানম ও কামরুন্নাহর লাইলী (ছাত্রী সংসদ) এবং আবদুস সাত্তার, বোরহানউদ্দিন  খান জাহাঙ্গীর ও আমি আমীর আলী (ছাত্র ইউনিয়ন)। এই কমিটিতে আওয়ামীলীগের পাঁচটি ভোট ছিল। বাকি সবারই একটি করে। আবদুল মতিন ১৯৫৫- ৫৬ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। আমি ছিলাম সহকারী সম্পাদক। গাজীউল হক আর আমি দুজনই ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এম আর আখতার মুকুল আর আমি পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধে একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি। এরা সবাই আমার সহকারী বা বন্ধু ছিলেন। উমরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সমসাময়িক। কিন্তু তখন তিনি ছিলেন আমার বিপক্ষে শিবিরে। তিনি তখন মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদী রাজনীতি করতেন। 
আমরা ইতিপূর্বে ‘পার্টিসিপেটরি আবজারভেশন’ বা ‘অংশগ্রহণকারীর পর্যবেক্ষণ- এর কথা উল্লেখ করেছি। এই পদ্ধতি অনুযায়ী কোনো প্রপঞ্চ বা ঘটনায় অংশগ্রহণকারী সেই প্রপঞ্চ বা ঘটনাকে যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছে তার খতিয়ান। অলি আহাদ, আবদুল মতিন, গাজীউল হক, এম আর আখতার মুকুল এই পদ্ধতিটিই ব্যবহার করেছেন। অপরদিকে উমর যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন সেটাকে ‘কী ইনফমেন্ট’ বা বিশিষ্ট তথ্য সরবাহকারী’ পদ্ধতি বলা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতি অনুযায়ী লেখক বা গবেষকের কোনো প্রপঞ্চ বা ঘটনাতে অংশগ্রহণ করা অপরিহার্য নয়। এতে বিশিষ্ট অংশগ্রহণকারী বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ‘ইন্টারভিউ’ বা সাক্ষাৎকার অবলম্বন করে একটি অ্যাকাউন্ট বা খতিয়ান প্রণয়ন করা।
এ দুটি পদ্ধতির প্রধান ত্রুটি হচ্ছে ‘ইমপর্টেন্ট’ বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ওপর এর নির্ভরশীলতা। অংশগ্রহণকারীরা শুধু নিজেদেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে মনে করেন না, ওই ঘটনায় অন্য ব্যক্তিদেরও ‘ইমপর্টেন্ট’ ব্যক্তি বলে মনোনীত করেন। কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব প্রতিপত্তিশীল ব্যক্তিরাই মনোনয়ন লাভ করেন। উল্লিখিত ছাত্রনেতাদের বইগুলোতেও এই প্রবণতাগুলো লক্ষ্য করা যায়। অলি আহাদ তার বইতে যে চিত্র উপস্থাপিত করেছেন তাতে এ কথা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, একুশের আন্দোলনে তিনি নিজেকেই নেতা হিসাবে মনোনীত করেছেন। তিনি যে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তার সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও এ কথা কারো বুঝতে কষ্ট হয় না। অবশ্য তিনি একা ছিলেন না। তার সঙ্গে ছিল একটি ‘ফেসলেস’ অবয়বহীন ‘সাধারণ ছাত্র’ ও ‘জনতা’।
আবদুল মতিনের লেখায় ঘটনাপঞ্জি আর কিছু বিশ্লেষণ সন্নিবেশিত হয়েছে। তবে ঘটনাপঞ্জি আর বিশ্লেষণ ঘটেনি। আর তাছাড়া আব্দুল মতিন তার লেখার সিংহভাগ নিয়োজিত করেছেন বায়ান্ন সালের আন্দোলনের ওপর নয়, ‘৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের ওপর। বায়ান্নর একুশের আন্দোলনে তার নিজের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তার কোনো উল্লেখ তার লেখায় নাই। তিনি অলি আহাদকে নেতা হিসাবে মনোনীত করেছেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা বা না করার আদর্শগত বিরোধকে আবুল হাশিম আর অলি আহাদ এই দুই নেতার ব্যক্তিগত মতবিরোধ বলে তার কাছে প্রতিভাত হয়েছে।
অপরপক্ষে গাজীউল হক আর এম আর আখতার মুকুলের রচনায় তাদের নিজেদের ভূমিকা ছাড়াও অন্যদের ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে। তারা নেতা হিসাবে ‘১১ জন প্রগতিশীল  ছাত্রনেতাকে মনোনীত করেছেন। তাদের মূল বক্তব্য হচ্ছে যে, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ২০ ফেব্রুয়ারী রাতে ফজলুল হক হলের পুকুর পাড়ে ১১ জন প্রগতিশীল ছাত্রনেতার গোপন বৈঠকে। এই ‘১১ জন প্রগতিশীল ছাত্রনেতা’র মধ্যে তিনজন- গাজীউল  হক, কমরুদ্দিন শহুদ এবং স্বয়ং এম আর আখতার মুকুল পরের দিন গাজীউল হককে আমতলার সভায় সভাপতি করার মাধ্যমে একুশের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সূচনা করেছিলেন। এম আর আখতার মুকুলের ১১ জন প্রগতিশীল ছাত্রনেতার’ মধ্যে পরবর্তীকালে ১০ জনই তাদের নিজস্ব এলাকায় প্রভাব, প্রতিপত্তি, যশ, খ্যাতি অর্জন করেছেন। করেননি শুধু একজন, আনোয়ার হোসেন। মুকুল ‘পরিচয় অজ্ঞাত’ বলে তার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। আর তাছাড়া তার ‘নেতা’ শব্দটির প্রয়োগও এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয়।
এই ‘হিস্ট্রিওগ্রাফি’র অনুক্রম বদরুদ্দিন উমরের বই। কিন্তু যেহেতু ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বের তিনি একটি ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, এই পদ্ধতিকে ‘কী ইনফর্মেন্ট মেথড’ বলা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করার ফলে যাদের ভাষ্যের ওপর উমর নির্ভর করেছেন তারা শুধু ‘কী ইনফর্মেন্ট’ই নন তাদের নিজস্ব এলাকায় এলিটও বটে। ফলে উমরের ক্ষেত্রে একটি ডাবল নমিনেশন ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছে। তার লেখার জন্য কারা গুরুত্বপূর্ণ সেটা উমর প্রথমে নিজেই নির্ধারণ করেছেন। পরে উমরের নির্বাচিত ব্যক্তিরা শুধু অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিই নয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তার লেখায় বিস্ময়করভাবে কিছু নন- ইস্যু ইস্যু হিসেবে গুরুত্ব লাভ করেছে কিন্তু সত্যিকারের ইস্যুগুলো কোনো গুরুত্ব লাভে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে একটি নন- ইস্যু আওয়ামী লীগ বা কমিউনিস্ট পার্টি একুশে ফেব্রুয়ারীতে ১৪৪ ধারা ভাঙার ব্যাপারে নেতৃত্ব দিয়েছিল কি দেয়নি- সেটা তার লেখার একটি প্রধান বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। যারা সত্যিই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েই বসে থাকেনি, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছিল, তারা অনুরুপ গুরুত্ব লাভে অসমর্থ হয়েছে। আমাকে তার যে বক্তব্য সবচেয়ে বিস্মিত করেছে সেটি হচ্ছে এ লাইনটি; ‘এই পরিস্থিতিতে হাবিবুর রহমান শেলীর নেতৃত্বেই প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী স্কোয়াডটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়ে। (পৃঃ ২৭০)। বিস্মিত এই জন্য হয়েছি যে, শেলী যে স্কোয়াডে বেরিয়েছিলেন সে স্কোয়াডে আমিও বেরিয়েছিলাম। এই স্কোয়াডের অন্য সদস্যদের তালিকা আর আনুক্রমিক অবস্থান সম্পর্কে তথ্য আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই দিচ্ছি। এখানে আমি শুধু ‘নেতৃত্ব’ শব্দটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। একুশে ফেব্রুয়ারীতে যে অবস্থা বিরাজ করছিল সেই পরিস্থিতে এমনকি হাবিবুর রহমান শেলীও যদি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার বিরোধিতা করতেন তাহলেও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হতো। একুশে ফেব্রুয়ারীতে দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে নেতৃত্বের প্রশ্নটি অবান্তর হয়ে পড়েছিল। কারণ নেতারা সবাই আমাদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার বিরুদ্ধে আমাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারীর বিদ্রোহ শুধু সরকার বা সরকারী দলের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ছিল না, বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ ছিল। এ বিদ্রোহে নেতারাই জনসাধারণের পেছনে ছিলেন। উমরের মতো মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবীর নজরেও ব্যাপারটা পড়েনি। আমার বক্তব্য হচ্ছে, এথনোগ্রাফিক পদ্ধতি নেতা বা নেতৃত্ব ছাড়া কোনো ঘটনার কথা চিন্তাই করতে পারে না। উমরসহ উপরোক্ত সব- লেখকই নিজেদের অজান্তেই এ পদ্ধতির বলি হয়েছেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যে ইতিহাস রচিত সেটা এলিটিস্ট ইতিহাস। অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, গাজীউল হক, এম আর আখতার মুকুল এমনকি বদরুদ্দিন উমর একুশের যে ইতিহাস রচনা করেছেন সেটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং একাডেমিকদের দৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। এখানে সাধারণ মানুষ এবং সাধারণ কর্মী যারা সত্যিই একুশের ইতিহাস রচনা করেছিল তাদের কোনো ভূমিকা নেই। আর সে কারণেই একুশের সত্যাগ্রহীরা এই ইতিহাস থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। অবশ্য ব্যতিক্রম হচ্ছেন আবদুস সামাদ আজাদ, হাবিবুর রহমান শেলী আর এস এ বারী এটি পরবর্তীকালে যারা ক্ষমতা এবং প্রসিদ্ধ দুটোই অর্জন করেছেন। আর বাদবাকি সবাই হারিয়ে গেছেন। আমি তাদেরই কথা স্মরণ করতে চেষ্টা করেছি। এ কথা আমি অবশ্যই দাবি করছি না যে, আমি একুশের একটি বিকল্প ইতিহাস রচনা করেছি। একটি গণভিত্তিক ইতিহাসের তথ্য সরবরাহের এটা একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মাত্র।
আমার কাহিনী শুরু বায়ান্ন সালের ২০ ফেব্রুয়ারীর অপরাহ্নে। আমি তখন জগন্নাথ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট আর্টসের ছাত্র। আমার সহপার্ঠী আর বন্ধুদের মধ্যে ছিল আনিসুজ্জামান (অধ্যাপক/সাহিত্যিক), নেয়ামাল বসির (প্রয়াত/বেতার ঘোষক), আব্দুর রহিম (সাংবাদিক), সৈয়দ আহমদ হোসেন (ইউনা সেক্রেটারি জেনারেল প্রয়াত), মৃণাল বারুরী (যুবলীগ কর্মী/প্রয়াত), খোন্দকার আলী আশরাফ (সাংবাদিক), আনোয়ার হোসেন (বর্তমান পেশা অজ্ঞাত) ও মশিউর রহমান (ব্যাংকার)। আমরা সবাই তখন জগন্নাথ কলেজ রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের সদস্য অথবা কর্মী ছিলাম। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের তরফ থেকে ইসলামপুর, পাটুয়াটুলী, সদরঘাট ও নবাবপুর অঞ্চলে পরের দিন একুশে ফেব্রুয়ারী হরতাল ও ধর্মঘট সফল করার জন্য আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমরা সেই উদ্দেশ্যে ২০ ফেব্রুয়ারী দু’টিমাত্র চোঙা সম্বল করে প্রচারে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। ইসলামপুর পাটুয়াটুলী আর সদরঘাট অঞ্চলে প্রচারকার্য সম্পাদন করে আমরা প্রায় বেলা সাড়ে ৩ টার দিকে রথখোলার মোড়ে এসে পৌঁছাই। আমাদের মধ্যে নেয়ামাল বসির ভালো উর্দু জানত। রথখোলা অঞ্চলে তখন বেশকিছু উর্দুভাষী  অবাঙালী বাস করত। নেয়ামাল বসির এই উর্দুভাষীদের সুবিধার্থে চোঙা সহযোগে উর্দু ভাষায় একুশে ফেব্রুয়ারীতে হরতাল ও ধর্মঘট পালন করার প্রয়োজনীয়তা ও মাহাত্ম্য প্রচার করেছিল। ঠিক এই সময় আমাদের সামনে একটা জিপ গাড়ি এঁসে দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে মাইকযোগে ঘোষণা করা হলো যে, ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (কোরায়শী) পরের দিন একুশে ফেব্রুয়ারী থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছেন। এই ধারাবলে ঢাকায় জনসভা, মিছিল, ধর্মঘট, হরতাল ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই ঘোষণা একবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। এই পরিস্থিতিতে আমরা আদৌ প্রচারকার্য চালাব কিনা সে সম্পর্কে আমাদের প্রচার চালিয়ে যাব। যেসব স্থানে জিপ থেকে ১৪৪ ধারার ঘোষণা করা হচ্ছিল, ঘোষণার কিছুক্ষণ পরেই আমরা সেই সব স্থান থেকেই পরের দিন ধর্মঘট আর হরতাল পালনের আহ্বান জানাচ্ছিলাম। বেলা ৫টার দিকে আমাদের প্রচার শেষ করে নবাবপুর রোড লেভেল ক্রসিংয়ের কাছে ক্যাপিটাল রেস্টুরেন্টে এসে উপস্থিত হই। পরের দিনের কর্তব্য সম্পর্কে নির্দেশের জন্য আমরা আনোয়ার হোসনকে অলি আহাদের কাছে পাঠাই। আনোয়ার হোসেন যুবলীগ কর্মী ছিল। অলি আহাদ ছিলেন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে যুবলীগের প্রতিনিধি। কথা হলো যে, আনোয়ার হোসেন যদি ঘন্টা খানেকের মধ্যে নির্দেশ নিয়ে ক্যাপিটাল রেস্টুরেন্টে ফিরে আসতে না পারে তাহলে কাছেই বামাচরণ চক্রবর্তী রোডে আনিসুজ্জামানের বাড়িতে আমাদের সঙ্গে দেখা করবে। আনোয়ার হোসেন যুগীনগর লেনে ইয়ুথ লীগ অফিসে অলি আহাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। যুগীনগর লেন বামাচরণ চক্রবর্তী রোডের কাছেই ছিল।
এক ঘন্টার মধ্যে আনোয়ার হোসেন ফিরে এলো না। আমরা আনিসের বাসায় নিজেদের স্থানান্তরিত করলাম। তবুও আনোয়ার হোসেন এলো না। যাহোক রাতের দিকে আমরা রণে ভঙ্গ দিলাম। আমি আর আহমদ হোসেন আনিসের বাড়ি থেকে নবাবপুর রোডে আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে রওনা দিলাম। আওয়ামী লীগ অফিস পর্যন্ত যেতে হলো না। নবাবপুর রোডের ওপরেই অলি আহাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। অলি আহাদ বললেন, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরের দিন একুশে ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা যাবে না। বললেন যে যারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন তারা ছিলেন, অলি আহাদ (যুবলীগ), আব্দুল মতিন (বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি), গোলাম মাওলা  মেডিক্যাল কলেজ) আর শামসুল আলম (ফজলুল হক মুসলিম হল)। পরে শুনেছিলাম যে, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় আসার আগে ফজলুল হক হলের সাধারণ ছাত্রদের এক সভা হয়েছিল। এই সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, ফজলুল হক হলের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষপাতী। সভায় শাহাবুদ্দিন আহমদের এক প্রস্তাবে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদে ফজলুল হক হলের প্রতিনিধি শামসুল আলম আর আনোয়ারুল হক খানকে ফজলুল হক মুসলিম হলের এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ার ম্যান্ডেট দেওয়া হয়। এই সাহাবুদ্দীন আহমদই বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম মোহাম্মদ তোয়াহা কোনদিকে ভোট দিয়েছেন। অলি আহাদ বললেন, তোয়াহা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তের পক্ষে ভোট দেননি। আমার তাই বহুদিন ধরে ধারণা ছিল যে, মোহম্মদ তোয়াহা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সপক্ষে ভোট দিয়েছেন। আসলে তিনি ভোটাভুটির সময় ‘নিরপেক্ষ’ ছিলেন। অলি আহাদ আরো বলেন, ‘আমরা ইডা মানি না মিয়ারা। কাইল তৈয়ার হৈয়া আইও’। কথা ছিল সংগ্রাম পরিষদের এই সিদ্ধান্ত পরের দিন একুশে ফেব্রুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমতলার ছাত্রসভায় ঘোষণা করা হবে।
পরের দিন একুশে ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টার দিকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় উপস্থিত হলাম। সভায় যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল সেটা বর্ণনা করার মত শক্তিশালী ভাষা আমার জানা নেই। সভা শুরু হলো গাজীউল হকের সভাপতিত্বে। সভারম্ভে গাজীউল হক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামছুল হককে আহ্বান জানালেন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিসদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে। শামসুল হক ঘোষণা করলেন যে, যেহেতু সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাস করে তাই তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা অনুচিত হবে। মুসলিম লীগ সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার জন্য একটা অজুহাত খুঁজছে। যদি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয় তাহলে মুসলিম লীগ নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার জন্য এই অজুহাতটিই ব্যবহার করবে। আমি অগ্নিগিরির বিস্ফোরণ দেখিনি। কিন্তু শামসুল হকের বক্তৃতার ফলে যা ঘটল সেটা অগ্নিগিরর বিস্ফোরণ থেকে বিন্দুমাত্র ভিন্ন বলে আমার মনে হয়নি। আমার বন্ধু প্রয়াত কবি হাসান হাফিজুর রহমান। ‘ইউ ট্রেইটর’ হুঙ্কার দিয়ে শামসুল হকের দিকে ধাবিত হলেন। কে যে তাকে সংযত করল এখন আর মনে করতে পারছি না। সভার মাঝ থেকে একজন যুবক তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। প্রায় ছয় ফুট লম্বা। পরনে পাজামা, হাতকাটা শার্ট আর হাতকাটা সোয়েটার। গর্জন করে বললেন, ‘আমরা প্রেসক্রিপশন চাই না, সাজেশন চাই’। পরে খবরের কাগজে সেই যুবকের ছবি দেখেছিলাম। তিনিই শহীদ আবুল বরকত। যা হোক এই প্রতিবাদ আর প্রতিকুলতা সত্তেও শামছুল তার বক্তৃতা শেষ করলেন। আমাদের তখন কোনো চেতনা বা সম্বিত বলে কিছু ছিল না। আমরা শুধু ‘না’ ‘না’ বলে চিৎকার করছি। এই অগ্নিপাতের মধ্যে গাজীউল হক ঘোষণা করলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি একটি ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার জন্য তিনি আব্দুল মতিনকে আহ্বান জানালেন। আব্দুল মতিন উঠে দাঁড়ালেন । পরনে সাদা মাখনজিন্সের ট্রাউজার আর সাদা শার্ট। কিছুটা ইতস্তত করে তিনি তার বক্তৃতা শুরু করলেন। তিনি বললেন যে, ১০ জনের ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে হবে। ভঙ্গকারী সত্যাগ্রহীদের উদ্দেশ্য হবে পূর্ব পাকিস্তান বিধান পরিষদের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা। আবদুল মতিন যা বলছিলেন সেটা আমাদের সবারই মনের কথা ছিল। কিন্তু তিনি এমন নিরুত্তেজ, নির্বিকার আর নিস্তেজভাবে বলছিলেন যে, তার কথা আমাদের ওপর রকমের প্রবাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। আমরা তখন এত উত্তপ্ত যে বক্তাদের কাছ থেকে চরম উত্তেজনা ও নাটকীয়তা আশা করছিলাম। আব্দুল মতিন সে উত্তেজনা, সে নাটকীয়তা সৃষ্টি করতে সক্ষম হননি। ইতিহাস সে দায়িত্ব অর্পণ করেছিল গাজীউল হকের উপর। তিনি তার সভাপতির চেয়ারের ওপর  লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। দুহাত একসঙ্গে আকাশের দিকে জুড়ে গর্জন করে উঠলেন, ‘আমরা ১০ জন ১০ জন করে বেরিয়ে যাব। আমরা দেখতে চাই পূর্ব বাংলা সরকারের কত জেল আছে।’ আজ প্রায় ৫০ বছর পরেও এ কথাগুলো স্মরণ করে রোমাঞ্চিত হই। অনেকে দাবী করেছেন যে, গাজীউল হকের পরে আরো কয়েকজন বক্তৃতা করেছিলেন। কথাটা আদৌ সত্যি নয়। গাজীউল হকের বক্তৃতার পর কোনো রকমের বক্তৃতা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। এই বক্তৃতার পর দুর্বর লাভাস্রােতের প্রবাহ নামল। কেউ বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, তবে বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারীতে কে আগে ১৪৪ ধারা ভাঙবে এ নিয়ে আমাদের মধ্যে কিন্তু সত্যিই যেন একটা প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে গিয়েছিল।
এখানে একটা বিষয়ের উপস্থাপনা প্রয়োজনীয় বলে  মনে করছি। পরবর্তী সময়ে যারা একুশের ইতিহাস রচনা করেছেন তাদের ইতিহাসে কে কোন গ্রুপ বের হয়েছিল এ নিয়ে একটা বিতর্ক লক্ষ্য করেছি। এদের সংজ্ঞা অনুযায়ী সত্যাগ্রহীরা যে গ্রুপে বেরিয়েছিল তাদের সেই গ্রুপেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। আমার ধারণা এই বিতর্ক অর্থহীন। কারণ, যেভাবে গ্রুপগুলো বেরিয়েছিল তারা ঠিক সেভাবে ধরা পড়েনি। গ্রুপ সম্পর্কে আমার সংজ্ঞা হচ্ছে, যারা একসঙ্গে বেরিয়ে একই সঙ্গে ধরা পড়েছিল। আমার হিসাব অনুযায়ী আমি দুনম্বর গ্রুপে বেরিয়েছিলাম কিন্তু অন্যদের হিসাবে সেটা তিন নম্বরেও হতে পারে। আবার চার নম্বরেও হতে পারে।
যেটাকে প্রথম গ্রুপ বলা হয়ে থাকে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে বেরই হতে পারেনি। পুলিশ এদের ধাক্কা দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এই গ্রুপের সত্যাগ্রহীরা পরে দুই নম্বও বা তিন নম্বও (চার নম্বর) গ্রুপের সঙ্গে যোগদান করে গ্রেফতার হয়। এই বিভ্রান্তির আরো একটা কারণ হচ্ছে এই গ্রুপ গুলো সম্পর্কে যারা রেকর্ড রেখেছিলেন, সেই মোহাম্মদ সুলতান আর হাসান হাফিজুর রহমানের স্মৃতিক্ষীণতা।
এ নিয়ে বিতর্ক বাড়িয়ে লাভ নেই। পূর্বের কথায় ফিরে যাই। বিশ্ববিদ্যালয় গেটের বাইরে আামাদেও জন্য অপেক্ষামান পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকার পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট ইদ্রিস আর ঢাকার সিটি এসপি মাসুদ। প্রথম গ্রুপটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর গ্রুপটি বের হয়। এই গ্রুপে ছিলেন ইব্রাহিম মোহাম্মদ তাহা (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল/ব্যবসায়ী/প্রয়াত), আনোয়ারুল হক খান (ফজলুল হক মুসলিম হল/উপপ্রধানমন্ত্রী/প্রয়াত), সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়/লেখক প্রয়াত), জাকারিয়া খান চৌধুরী (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল/বিএনপি পার্লামেন্টারি ক্যান্ডিডেট), মীর হোসেন (যুবলীগ কর্মী), মোহাম্মদ মোর্তজা (যুবলীগ কর্মী); জহির রায়হান (ঢাকা কলেজ/চিত্র পরিচালক), মোতাহার হোসেন ভূইয়া (ঢাকা কলেজ/ লন্ডন প্রবাসী শিক্ষক), নেয়ামাল বসির (জগন্নাথ কলেজ/বেতার ঘোষক/ প্রয়াত) ও মজরুল (নজরুল নয়) ইসলাম (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)। এই গ্রুপটিকে গ্রেপ্তার করে লালবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয় ।
পরের গ্রুপে বেরিয়েছিল ছাএীরা। এদের মধ্যে ছিলেন শফিয়া খাতুন ,সুফিয়া ইব্রাহীম, হালিমা খাতুন , শামসুন্নাহার ও আরো অনেক যাদেও নাম এখন আমার মনে পড়ছে না। এই গ্রুপটিকে পুলিশ প্রথমে  কর্ডন  কওে রাখে। পরে ছেড়ে দেয়।
এর পরের গ্রুপে আমরা  বের হয়েছিলাম। আমাদের গ্রুপে ছিলেন আবদুস সামাদ আজাদ (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল / বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ), হাবিবুর রহমান শেলী (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল/বিচারপতি/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা) খাজা (ফজলুল হক মুসলিম হল/এর আসল নামটি এখন আর মনে করতে পারছি না) আলী তৈয়ব (মেডিকেল কলেজ), আজহারুল ইসলাম (ভেটেরিনারি কলেজ) ,মনিরুল ইসলাম পাটোয়ারী (ভেটেরিনারি কলেজ), মোহাম্মদ বখতিয়ার (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), ও আমি আমীর আলী (জগন্নাত কলেজ )। যিনি আমাদের গ্রেপ্তার করলেন তিনি ছিলেন আমার বাবার বন্ধু আবদুল জব্বার, ঢাকা সিটি ডিএসপি। আমাদের গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানায় নিয়ে যাওয়া হলো।
পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি একটিটাউন সার্ভিসের বাসে কাউন করে বিচারের জন্য আমাদের ঢাকার জেলা কোর্টে নিয়ে যাওয়া  হয়। কিন্তু সাধারণ ধর্ম ঘটের ফলে জজ ম্যাজিস্ট্রেট কেউই সেদিন কোর্টে এসে উপস্থিত হতে পারেননি। ফলে আমাদের বিচারের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ঠিক করা হয় যে, আমাদের বিচারাধীন বন্দি হিসেবে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তরিত করা হবে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল ট্রান্সপোর্ট নিয়ে। ঢাকায় তখন একটি মাএ প্রিজন ভ্যান ছিল। সেটা এতই ব্যস্ত ছিল যে, আমাদের জেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেটা সময়মতো পাওয়া গেল না। যে টাউন সার্ভিসের বাস  আমাদের কোর্টে নিয়ে গিয়েছিল সে বাসের ড্রাইভার আমাদের জেলে নিয়ে যেতে অস্বীকার করল। তাকে বলা হয়েছিল যে তেজগাঁও থানা থেকে আসামীকে কোর্টে নিয়ে যেতে হবে। কোর্টে নিয়ে যাওয়ার সময় সে আমাদের আসল পরিচয় জানতে পারে। ফলে সে আমাদের জেলে নিয়ে যেতে অস্বীকার করে। তাকে পয়সার লোভ দেখানো হলো। গাড়ির লাইসেন্স কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হলো। পরে পুলিশ কর্তৃক বেদম পিটুনি দেওয়া হলো। কিন্তু তা  সত্ত্বেও আমাদের জেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে রাজি করানো  গেল  না। তার একটাই কথা ,আমি এই পোলাগো কোর্টে আইন্যা, ভূল করছি। জেলে লইয়া গুনা করুম না। প্রিয়জন ভ্যান পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের ঢাকা জেলা কোর্ট প্রাঙ্গণে বেলুচ রেজিমেন্ট দিয়ে ঘিরে রাখা হলো। বেলা দেড়টার  দিকে আমাদের প্রিজন ভ্যনে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। এর মধ্যে আমরা জানতে পারি যে, কোর্টে কাছেই ‘মর্নিং নিউজ’অফিস ওপ্রেসকে বিক্ষুব্ধ জনতা অগ্নি সংযোগে ভস্বীভূত করেছে।
ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে আমাদের- ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিল। এই ওয়ার্ডের ওপারেই ছিল উর্দু রোড। এই রাস্তার ওপর একটি মসজিদের মিনার থেকে লোকেরা আমাদের প্রত্যেক দিন খবরের কাগজ, খাবার -দাবার এমন কি কাপড় চোপড়ও ছুড়ে দিত। এক দিন আমার পরিবারের লোকদের সঙ্গে জেল গেটে দেখা করতে যাওয়ার সময় পুরানা হাজত ওয়ার্ডে আমার অকৃত্রিম বন্ধু মশিউর রহমানের (ব্যাংকার) সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল। সে যে জেলে ছিল সেটা আমি জানতাম না। সে বললো যে, নারায়ণঞ্জ থানার বেদম মার দিয়ে ঢাকা জেলে পাঠানো হয়। একুশের আন্দোলনে অনেকেই ধরা পরে ছিল। কিন্তু কাউকেই পেটানো হয়নি। মশিউর আর তার সহকর্মী মোয়্জ্জাম হোসেন জামিল(চাঁদ) আর শামসু্েজ্জাহাকে পিটিয়ে সানাউল হক সাহেব বিশিষ্টতা অর্জন করেছিল। মশির পিঠে  বহুদিন পর্যন্ত এই পিটুনির দাগ ছিল। এই সানাউল হকই পরবর্তীকালে বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নির্বাচিত হয়েছিলেন। যা হোক প্রায় দেড় মাস জেলে থাকার পরে আমরা ছাড়া পাই।
                   [আমীর আলী: ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারীদের একজন। বর্তমানে লন্ডনে বসবাসরত। নিবন্ধটি১৯ ফেব্রুয়ারী,২০০০ থেকে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় । আলোচ্য নিবন্ধে ভাষা আন্দোলনের অনেক তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে বিধায় এখানে সংযোজন করা হল ।]