খালেদা জিয়া আমার কথা শুনলে অনেক আগেই হাসিনা পড়ে যেতো -অলি আহাদ

ফন্ট সাইজ:

  প্রবীণ রাজনীতিক জনাব অলি আহাদ জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যোগ দেয়া উচিত বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
বিরোধী দলীয় নেত্রীর উদ্দেশ্যে প্রাধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক আহবানের ব্যাপারে বর্ষীয়ান জন নেতা জনাব অলি আহদেও মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মনে করি, শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে সংসদে গিয়ে  খালেদা জিয়ার বলা দরকার, প্রধানমন্ত্রীর কথায় সংসদে এসেছি। অমুক তারিখের মধ্যে  আমরা ইলেকশন চাই। এখন সরকারকে এই মুহুতে পদত্যাগ করে ওই তারিখের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ খোলাসা করতে হবে। বিরোধী দল অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ এবং  জাতীয়  সংসদেও নির্বাচন আগাম অনুষ্ঠানের  যে দাবি তুলেছে সে সম্পর্কে প্রতি ত্রিুয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে অঙ্গীকার করেছেন যে, বিরোধী দলীয় নেত্রী সংসদে এসে যে তারিখে ইলেকশন চাইবেন সেদিনই নির্বাচন দিতে সরকার প্রস্তুত। জনাব অলি আহাদ মনে করেন, বিরোধী দল এ কথার সুযোগ নিলেই প্রমাণ হবে যে, প্রধান মন্ত্রী তার অঙ্গীকার রাখেন কি-না।
ডেমোত্রেুটিক লীগ প্রধান, সাত দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষনেতা জনাব অলি আহাদ গত ২২ ফেব্রুয়ারী বৃহস্পতিবার তার বাস ভবনে একান্ত  আলাপচারিতার ব্যক্ত করেছেন ওই মতামত। ভাসা শহীদের মাসে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা জনাব অলি আহাদের একটি সাক্ষাৎকার সাপ্তাহিক ঊষার পাঠকদের জন্য নেয়ার সিদ্ধান্ত আমার নিয়েছিলাম। তবে প্রচারবিমুখ এই প্রাজ্ঞ রাজনীতিকের যে খানিকটা অনীহা রয়েছে পত্রপত্রিকায় হুটহাট করে  সাক্ষাৎকার দেয়ার ব্যাপাওে, সে কথা ও জানা ছিলো। আর তাই জনাব অলি আহাদের স্নেহভাজন ওবিশ্বস্ত একজন সাংবাদিকের সহায়তা নেয়া।
'ষাটের দশকের খ্যাতিমান ছাত্রনেতা ওই সাংবাদিক ফোন করলেন অলি আহাদ ভাইকে। কিন্তু তাতেও সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে সম্মতি মিললো না। তবে তার বাসায় গিয়ে আলাপ করার অনুমতি দিলেন।
কথামতো বিকেল তিনটায় আমরা পৌছলাম ল্যাবরেটরি রোডে জনাব অলি আহাদের চার তলার ফ্ল্যাটে। তখন লিফট চালু ছিলনা। হেঁটে উঠে ডোর বেল বাজাতে নিজেই দরোজা খুললেন ‘বায়ান্নোর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অগ্রসেনানী অলি আহাদ। ইতিহাসের অনেক চড়াইউৎরাই পেরিয়ে এখন তিনি প্রৌঢ়ত্বেও ছায়ায় এসে পৌছেছেন। পাকিস্তানী শাসনামালের গোড়ার দিকে ছাত্র অবস্থাদেই রাজনীতিতে হাতে খড়ি হয় ব্রা‏‏‏হ্মণ বাড়িয়ার এই কৃতি সন্তানের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নপর্বে তখনকার নিষিদ্ব কমিউনিস্ট পার্টির যুব শাখা পূর্ব পাকিস্তান যুব লীগ গঠনে পালন করেন নেতৃস্থানীয় ভূমিকা। সেই থেকে ভূখন্ডের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ রাজনৈতিক ইতিহসের মোড়ে মোড়ে বারবার সাহসের ফুলকি হয়ে জ্বলেছেন তিনি। নির্যাতন ,কারাবরণওত্যাগের জীবন্ত এক দীর্ঘ উপাখ্যানজনাব অলি আহাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভ্রুকুটি ও হাতছনি দুই-ই অবহেলা ভরে উপেক্ষা করেছেন বারবার। অভিজ্ঞতা চারিত্রিক দৃঢ়তা, আদর্শনিষ্ঠা ও সততা তাঁকে করেছে খানিকটা অহং কারমন্ডিত। স্পষ্টবাদিতা তার চরিত্রে রুক্ষতা ও কাঠিন্য ও এনে দিয়েছে কিছুটা। অবয়বে বয়সের ছাপ নিয়েও নিজস্বতায় অটল, দীর্ঘদেহী ওঋজু এই ব্যক্তিত্বেও পিছু পিছু আমরা তার ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসলাম। হেসে বললেনঃ স্ত্রী অসুস্থ। নিজেই বাসন কোসন ধুচ্ছিলাম। কাজটা সেরে আসি। ভেতরে গেলেন তিনি। ছিমছাম, ছোট্ট ড্রয়িংরুমে বসা আমরা। অল্প ফার্নিচার, সুরুচির ছাপ স্পষ্ট। দেয়ালে টাঙানো বিদেশী পেইন্টিং। এককোণে বাঁধাই করা একটি পারিবারিক ফটোতে স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে জননেতা অলি আহাদ। মিনিট দশেকের মধ্যেই তিনি এলেন। সাক্ষাৎকারের কথা আরেকবার বিনীতভাবে তুলতেই প্রবল আপত্তি কওে বললেনঃ না না।ওসবে কোনো লাভ নেই। এমনিই বসে কথা বলি।
আমরা বললামঃ ঠিক আছে। সাক্ষাৎকার দরকার নেই। কিন্তু আপনার কথা তো মূল্যবান। দেশবাসী জানতে চয়---
বাজে কথা। কেউ জানতে চায় না। আর আমার মূল্য কি আছে না আছে সেটা আমি বেশ ভালো বুঝি। তাছাড়া সাংবাদিক তো আজকাল অনেকেই অসৎ। লিখবে কী? একটু থেমে বললেন, এই যে, দেখেন এটা একটা রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া। এখানে রোগী থাকতে পাওে, পরীক্ষার্থী আছে, নানা রকম সমস্যার মানুষ থাকতে পারে। অথচ এখানে প্রচন্ড শব্দে রাতভর নির্মাণ কাজ চলছে। আমার এখন ৭৩ বছর  বয়স। সারারাত ঘুমাতে পারি না ভয়ংকর শব্দের জন্য। মেয়ের পরীক্ষা সে পড়তে পারে না। কিন্তু হু কেয়ার্স? এখানে সিভিক সেন্সে আছে ক’জনের? ক’জন আইন মানছে? রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ায়  এরকম কান্ড এতোদিন ধরে চলছে ,কেউ দেখছে? এভাবেই প্রতিটি ক্ষেত্রে আস্তে আস্তে সব অন্যায় সকলের গা–সওয়া হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদ করতে পারছে না কেউ। করলেও লাভ হচ্ছে না।
উপরে ওঠার সময় আমরা দেখে এসেছিলাম, সামনেই অনেকখানি জায়গা উচু টিন দিয়ে  ঘিরে নিমার্ণ কাজ চলছে। বিশাল বহুতল ভবন হচ্ছে। নিচে শপিং সেন্টার এবং ওপরে এপার্টমেন্ট হবে। টিনের ঘেরাওয়ের গায়ে বড় বড় ইংরেজি হরফে লেখা আছেঃ মাল্টিপ্লান লিমিটেড। কিন্তু রাতভর কাজ। জনাব অলি আহাদের কথায় বিস্মিত আমরা। কিন্তু এই মহানিমার্ণযজ্ঞের নামে এলাকার বাসিন্দাদের রাতের ঘুম হারাম করার অধিকার  তারা কোথায় পেয়েছে --- সে প্রশ্নের জবাব আমরা দিতে পারিনি। তাই প্রসঙ্গ দ্রুত পাল্টে রাজনীতির কথা তুললাম। সঙ্গে সঙ্গে গগণে আগুনের আঁচ পেলাম। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ঋদ্ধ রাজনীতিক তিক্তকণ্ঠে বললেনঃ রাজনীতিতে আর কোনো নীতি- নৈতিকতা  আছে কি ? কি লাভ হচ্ছে বারবার সরকার বদল করে ? আমার মস্তবড় মুক্তিযুদ্ধ করলাম। অথচ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা  আমাদের গলার মালা। আওয়ামী লীগ এতো অপকর্ম করলো। তাদেরকে কি বাদ দেয়া গেলো। এরশাদের বিরুদ্ধে এতো দীর্ঘ আন্দোলন হলো। আবার সব পক্ষের কাছেই সে গ্রহণ যোগ্য হয়ে গেলো সহজেই। বিএনপির ড.মোশাররফ সে দিন ধানাই পানাইকরছিলো। আমি বললাম, মিয়া বেশি বড় বড় কথা বোলো না। মিনিস্টার থাকতে৩০ টির মধ্যে সাংগুভ্যালিসহ ৮টি গ্যাস ফিল্ড তোমারই বিদেশীদের ইজারা দিয়েছো। ঘুষ কতো খেয়েছো জানি না। সাইফুর রহমানই কি ইন্ডিয়াকে কম কনসেশন দিয়েছেন? এই সব সত্য কথা বললে আমাকে কে পছন্দ করবে? মওলানা মান্নানের ইনকিলাবও এখন পলিটেক্সে ফ্যাক্টর হতে চায়। ভেবে ছিলো, আমি তাদের সমর্থন দেবো। আমি সেই লোক নই। সাদ্দামের বিরুদ্ধে কথা বললাম, অমনি ওরা পিছিয়ে গেলো। সাদ্দাম তো ওদের গডফাদার। বাগদাদ থেকে দিল্লিতে ফোন আসে, দিল্লী থেকে হাসিনার কাছে –মওলানা মান্নানের যেন অসুবিধা না হয়। এসব খেলা আমার জানা আছে। আমি শুনেছি, সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরীকে এরশাদ সবার সামনে জিজ্ঞাসা করেছে, আমার টাকায় বাড়িটা হয় নাই? সেই গিয়াস কামাল আবার খালেদা জিয়ার কাছ থেকে চাকরি নিয়েছে, বেনিফিট নিয়েছে। এখানে নীতি –আদর্শ কোথায় ? খালেদা জিয়ার সঙ্গেও তো আমার যথেষ্ট খাতির আছে। কিন— আমার ওপর দুষ্কৃতকারীরা গুলি করার পর উনি একটা স্টেটমেন্টও তো দিলেন না। বলেন, এখন কার সাথে বসবো ?
কিন্তু আপনি তো বেগম জিয়াকে আপনার নেএী বলে মেনে নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। গাঁইয়্যা চালাকি করবেনা। আমিও গাঁয়ের পোলা। খালেদা জিয়াকে আমি আমার নেএী বলি নাই। বলেছি, দেশনেএী। দেশের বর্তমান মুহূর্তে জনগন তার নেতৃত্ব চায়, সে কথা বলেছি। আমার নেতা তিনজন। এক ইমাম আবু হানিফা (র:)। রাজার কথায় প্রধানমন্ত্রী হননি, নির্যাতন সয়েছেন। দুই, কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। গান্ধীর মতো হাঙ্কি পাঙ্কি করেন নি, ফজলুল হকের মতো সুবিধাবাদীও ছিলেন না। তিন, মওলানা ভাসানী। রাষ্ট্র চালাবার যোগ্যতা তার ছিলো না। তবে দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সততাও আন্তরিকতা ছিলো।
মওলানা ভাসানীর কথা উঠতেই কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে গেলেই জনাব অলি আহাদ। অর্ধশতাব্দিব্যপ্ত রাজনৈতিক জীবনে ‘হুজুরের’ সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা টুকরো স্মৃতি রোমন্থন করলেন। হিরন্ময় সেসব স্মৃতিকথা শুনতে ভালোই লাগছিলো। মাঝে একবার বেগম অলি আহাদ অসুস্থ শরীর নিয়েই আমাদের জন্য নিয়ে এলেন চা-বিস্কুট। বিদুষী পত্নীকে দেখে খানিকটা অনুযোগ করলেন অলি আহাদ। বলরেনঃ আমাকে ডাকলেই হতো, চা নিয়ে আসতাম। কঠিন মানুষটির কথায় মমত্ববোধ ও ভালো বাসা ঠিকরে বেরুলো। আমার চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে শুনছিলাম। বললেনঃ মওলানা ভাসানী ছিলেন শিক্ষিতেরও বাবা। হয়তো হ্যারল্ড লাস্কি খুলে পড়েননি।  তবে তার ‘সিক্সথ সেন্স’ ছিলো প্রখর । জেলখানায় তাকে নিয়মিত দেখেছি ‘স্টেটসম্যান’ কাগজ পড়তে। যা হোক হুজুর লেখাপড়া কত টুকু জানতেন সেটা বড় কথা নয়, তার প্রজ্ঞা ও জ্ঞান ছিলো অনেকের চেয়ে বেশি।
প্রচন্ড এন্টিএস্টাব্লিশমেন্ট হিসাবে খ্যাত চিরবিদ্রোহী রাজনীতিক অলি আহাদ নিজের সম্পর্কে বললেন, আমি মুক্তি যুদ্ধেও পক্ষের জানবাজ লোক। ১৯৭১-এগোলাম আযমের চাচাতো ভাই শফিকুর রহমান আমাকে মারতে চেয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এদেশে মুক্তিযুদ্ধের নামে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের যে খেলা চলছে তাতে ব্যথিত হই। শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধেও কথা বলে রাজনীতি করেছেন। জিয়াউর রহমানও সেটা করেছেন। কিন্তু পাবলিক কোনো সুবিধা পায়নি। তবে একটা কথা সত্য, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকার মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপারটা একেবারে আড়ালে ঠেলে দিয়েছিলো। হাসিনার সময়ে আর কিছু না হলেও মুক্তি যুদ্ধের কথা লোকে শুনছে।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জিয়ার অবদানের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে জনাব অলি আহাদ অকপটে বলেন, আমি জিয়াউর রহমানের যতো বিরোধিতাই করি, একথাসত্য যে, জিয়াই রেডিওতে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। সেই দুঃসময়ে সাংবাদিক, আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রথম আমাকে এ সংবাদ দিয়েছিলো। গাফফার এসে বললোঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়া হয়েছে। রেডিওতে মেজর জিয়া ঘোষনা দিচ্ছেন। গাফফারই রেডিও খুলে আমাকে জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষনার বক্তৃতা শোনালো। তখন জিয়াকে চিনতাম না আমি। কিন্তু দেখলাম, তার ঘোষনা শুনে মানুষ আপ্লুত। সবাই তার প্রশংসা করছে। এমনকি আমি আগর তলা যাবার পথে , লঞ্চে যানবাহনে সবখানে লোকমুখে শুনছিলাম জিয়ার সুখ্যাতি । তাঁর ঘোষণা লোকজনকে উৎসাহিত ও উজ্জীবিত করেছিলো।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রধান স্থপতি হওয়া সত্ত্বেও অলি আহাদ রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতির কাছ থেকে তার প্রাপ্য সম্মান, মর্যাদা ও স্বীকৃতি পাননি। এর জন্য তার কোনো খেদ বা গ্লানি নেই। নিজেকে ব্যর্থ রাজনীতিকও মনে করেন না তিনি। বললেনঃ আমাকে কে কি দিলো, না দিলো সেটা কোনো ভাবনার বিষয় নয়। জিয়া এবং হাসিনার একুশে পদক দেয়ার প্রস্তাব আমি ফিরিয়ে দিয়েছি। জিয়াউর রহমান এস. এ বারী এটি কে আমার বাসায় পাঠিয়েছিলেন। আমি তখন বাসায় একা। চা খাওয়াবার লোকও নেই। বাসায় ছিলো বসার মতো চারটা বেতের চেয়ার মাত্র। ওগুলো আমাকে প্রেজেন্ট করেছিলো তাহের উদ্দীন ঠাকুর। তো,বারী আসলো আমার বাসায়। বললো, জিয়াউর রহমান পাঠিয়েছেন তাকে। আমাকে একুশে পদক দিতে চায়। আমার তো আবার ঘাড়ের রগ ত্যাড়া আছে। বললাম,বারী তুমি তো একসময় আমার ওয়ার্কার ছিলে। ধান্ধাবাজ মশিউর রহমানের লোক হয়ে এখন জিয়ার প্রস্তাব নিয়ে এসেছো আমার কাছে। এরকম প্রস্তাব আমাকে মুজিব ভাই দিলে কথা ছিলো। তার সঙ্গে রাজনীতির মিল ছিলো না। ঝগড়া মারামারি হয়েছে। তবুও তার কথা আলাদা। আর,আমাকে কথা বলে রাজী করাতে পারতেন মওলানা ভাসানী। হুজুর বললে  অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক সময় তার কথা মানতাম। তোমার কথায় আমিরাজী হবো ভাবলে কি করে?
হাসিনাও ক্ষমতায় এসে আমাকে একুশে পদক দেয়ার চেষ্টা করেছিলো। একদিন গাজীউল হক গাঁইগুঁই করে বলার চেষ্টা করলো। পরে ফোন করলো মোস্তফা সরোয়ার। ওকে ছোটো ভাইয়ের মতো স্নেহ করি। ফোনে বললোঃ অলি আহাদ ভাই, আপনাকে পদক দিতে চায হাসিনা। কেউ প্রস্তাব নিয়ে আপনার কাছে যেতে সাহস পায় না। আবার  অনুমতি ছাড়া দিলে আপনি প্রত্যাখ্যান করবেন, সেটা সবাই বোঝে। তাই আপনার সম্মতি চাই্। আমি ওকে বললাম, আমি এখন –হু-না কিছু ই বলবোনা ঘোষনার পর বলবো নেব কি-না। আমার এই কথার পর, আর দেয় নাই। তবে,হাসিনার আমলে একুশে উপলক্ষে আমাকে টেলিভিশনে প্রতিবারই দেখিয়েছে। খালেদা জিয়ার আমলে একবারও দেখায় নাই।
বেগম জিয়ার সরকার আপনার সঙ্গে কোনো যোগাযোগই রাখেনি? উনি আমাকে কেন পাওা দেবেন? রান্নাঘর থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত হতে তো উনার কোনো সাহায্য নিতে হয়নি  আমার কাছ থেকে। কাজেই ক্ষমতায় থেকে আমাকে কেন কেয়ার করবেন? অবশ্য কোনো যোগাযোগ কেউ করেনি তা ঠিক না। বেয়াদব নাজমুল হুদা একবার আমাকে ফোন করে বললোঃ অলি আহাদ ভাই, আমারা আপনাকে ইউজ করতে চাই। আমি ফোন রেখে দিলাম। হুদা আসলে লোক খারাপ নয়। ওর অনেক গুণও আছে। তবে কথাটা ভালো করে বলতে জানে না। মীর্জা আব্বাসও একবার আমাকে ফোনে কি কি জানি সব বলার চেষ্টা করেছিল, ভূলে গেছি। তাছাড়া বিএনপি’র আবদুল্লাহ আল নোমান জাতীয় কেউ কেউ আমার বাসায় এসে বিভিন্ন সময়ে নানারকম কথা বলেছে, পরে কথা রাখতে পারেনি। আর আসেওনি। শুনেছি বিএনপি’র কেউ কেউ নাকি খালেদা জিয়াকে প্রস্তাব দিয়েছিল জাস্টিস সাহাবুদ্দীনের বিরুদ্ধে আমাকে প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডিডেট করার। ওরা বলেছিল, সাহাবুদ্ধীন সাহেব জিতলে জিতুন, তবুও আমাদেও উচিত হবে অলি আহাদ ভাইকে দাঁড় করানো। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তারা ক্যান্ডিডেট না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আমার কাছেও কেউ প্রস্তাব নিয়ে আসেনি। 
শেখ হাসিনার সরকার একুশের পদক দেয়ার প্রস্তাব ছাড়া আর কোন ব্যাপারে কি কখনো আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ?
করেছে। তবে আমি ডিটেইল বলবো না। শুধু এটুকু বলবো, গাড়ি-ঘোড়ায় বসে আলোচনা করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমার কথা পরিষ্কার। কোনো আলোচনার আগে আমার টার্মস মানতে হবে। টার্মস মানলে পরে আলোচনা। আমি সাফ বলেছি, শেখ হাসিনা আমার ভাতিজি হিসাবে যে কোন সময় আমার বাসায় বেড়াতে আসতে পারে। তবে আমার সঙ্গে কোনো ব্যাপারে আলোচনা করতে হলে তাকে আগে আমার টার্মস মানতে হবে।
দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জনাব অলি আহাদের স্পষ্ট অভিমত হচ্ছে, আমরা এখন ইন্ডিয়ার পায়ের তলে চলে গেছি। সেখান থেকে বের হওয়া কঠিন। আমার অর্থ নেই। টাকার অভাবে জনসভা করতে পারিনা। কিন্তু আমি জানি, তিন মাসের মধ্যে আমি যদি ৭/৮ টি জনসভা করতে পারি তাহলে দেশের রাজনীতির চেহারা পাল্টে যাবে। খালেদা জিয়াও তখন মরিয়া হয়ে ময়দানে নামবেন। অথচ উনি যদি আমার কথা শুনতেন তাহলে দেশের অবস্থা এতোটা খারাপ হতো না। অনেক আগেই ক্ষমতা থেকে হাসিনা পড়ে যেত। কিন্তু একটার পর একটা মিস্ট্রেক করলেন খালেদা জিয়া। গ্রাসরুট ইলেকশন বর্জনের আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিলো বিএনপি’র মতো একটা পার্টি। সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরীর কথায় পার্লামেন্ট থেকে রিজাইন করার মারাত্মক ভুল উদ্যোগও একবার নেয়া হয়েছিল। সে সময় বদরুদ্দোজা চৌধুরীরা বেঁকে বসলেন। পদত্যাগপত্র সাবমিট করা হবে না-এই শর্তে পওে তারা সই করলেন। এগুলো কি পার্লামেন্টারী পলিটিক্স ? সাধারণ লোক পার্লামেন্ট বর্জন পছন্দ করেনি। আর আন্দোলন করতে পারলে, গণঅভ্যূত্থান সৃষ্টি করতে পারলেও একটা কথা ছিলো। যাদের পার্টির ১১৬ জন এমপি তারা ১৪৪ ধারা ভাংতে পারে না---এটা কোনো কথা হলো ? ওই রকম শক্তি-সমর্থন ও অর্থ আমার থাকলে আমাকে কেউ আটকাতে পারতো না।
মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ ছিলো জনাব অলি আহাদের। তবুও মুজিবের প্রতি অগাদ শ্রদ্ধা তাঁর। বললেন, আমার নেতা মাওলানা ভাসানীর জন্য মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেক ঝগড়া হয়েছে, মার মার কাট কাট হয়েছে। তবুও মুজিব ভাই মুজিব ভাই-ই। উনি আমাকে জেলে পর্যন্ত দিয়েছেন কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল অটুট। হুুজুরকে ছেড়ে গিয়ে একাই সফল হয়েছিলেন মুজিব ভাই। তাঁরও সিক্সথ সেন্স ছিলো প্রখর। নেতৃত্বেও যোগ্যতা ছিলো। আমি রাজশাহী জেলে। মুজিব ভাই জনসভা করতে গিয়ে রাজশাহীতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এখানে আমার নেতা অলি আহাদ কারাগারে।’ এমন কথা কেবল তাঁর পক্ষেই বলা সম্ভব। মুজিব ভাই বিভিন্ন সময় আমাকে দেখতে জেলখানায় যেতেন ভাবীকে সঙ্গে নিয়ে। ভাবী নিজ হাতে তৈরি খাবার নিয়ে যেতেন। কেবিনেট নেয়ার জন্য তিনি আমাকে কম টেনেছেন? তিনি বলতেনঃ ‘মুজিব ভাই ছাড়া তোমাকে কেউ কিছু দেবে না।’ কথা তো সত্য। আমার নেতা ভাসানীও তো আমারে না জিগাইয়া আইয়ুবের সঙ্গে কথা বলতে চলে গেছেন। 
শেখ মুজিবের শাসনামলে জনাব অলি আহাদ ‘আজাদ বাংলা’র ডাক দিয়েছিলেন্। তাঁর আহ্বান ছিলোঃ ‘দিল্লীর দাসত্বের শিকল থেকে এ বাংলাকে আজাদ করতে হবে।’ তিনি বলতেনঃ পিন্ডির গোলামীর শৃঙ্খল ভেঙ্গেছি, দিল্লীর শেকলও ছিঁড়তে হবে।’ ওই আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি কারারুদ্ধ হয়েছেন। সে সব প্রসঙ্গ তুলতেই মুজিব ভাইকে রেসপেক্ট করি। তিনি না আসলে ভারতীয় সৈন্য একান থেকে যেতো না। উনি না আসলে আমাদের যে সমস্ত অফিসার ‘৭১-এ ভারতে যায়নি তারা সবাই ডিস্মিস্ড্ হতেন। শূন্যস্থান পূরণ করতো ভারতীয় অফিসাররা। প্ল্যানমাফিক তারা বর্ডারে এসে পৌছেও গিয়েছিলো। বাঙ্গালী মুসলমানদের শতকরা ৯৫ জন চাকরি হারাতেন। আমি মুজিব ভাইকে শ্রদ্ধা করবো না তো কাকে করবো? জনাব অলি আহাদ বললেন, হাতির আসল দাঁত থাকে ভেতরে। সেগুলো দেখা যায় না। বাইরে যে দু’টো দাঁত দৃশ্যমান থাকে তা’ শোভামাত্র। এ দু’টোকে আসল ভাবলে ভূল হবে। রাজনীতিতেও এরকম ব্যাপার আচে। মুজিব ভাই ক্ষমতায় থাকতে রাতের বেলা গাড়ির ফ্ল্যাগ নামিয়ে চুপিসারে টাঙ্গাইলে যেতেন মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করতে, হুজুরের পরামর্শ নিতে। ৭৫-এর ক্যু’র পর আমি জেল থেকে বেরুবার সময় পুলিশ এস্কর্টের লোক আমাকে সে কথা বলেছে। তখন তো মুজিব ভাই নেই। পুলিশের কোনো লাভও নেই মিথ্যা বলে। আমি তার কথা বিশ্বাস করেছি। তাছাড়া অন্য প্রমানও পেয়েছি আমি। হুজুর বিভিন্ন বিষয়ে মুজিব ভাইকে সাপোর্ট করতেন। আমরা ক্ষুব্ধ হতাম। পরে বুঝেছি, হুচুর ঠিক কাজই করেছেন। তাঁর সঙ্গে মুজিব ভাইয়ের গভীর সম্পর্ক ছিলো। 
কিন্তু আপনি তো কিছুদিন খন্দাকার মোশতাক আহম্মেদের সঙ্গেও দল করেছেন। 
হ্যা, করেছি। একত্রে ডি. এল করার আগে তাকে আমি খুব ভালো চিনতাম না। দিল্লীর বিরোধিতার প্রশ্নে আমি মোশতাককে সমর্থন দিই। পরে দেখলাম, মোশতাক একটা আস্ত চোর। রাজনীতি নয়, ষড়যন্ত্রই তার কাছে মুখ্য। 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে অলি আহাদের মন্তব্যঃ ওর সাহস আছে। ভূল-শুদ্ধ যাই হোক, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সিদ্ধান্ত কার্যকরও করতে চায় তাড়াতাড়ি। বাবার প্রতি তার ফিলিং প্রবল। এটা দোষের কিছু নয়, মানবিক ব্যাপার। পাকিস্তানের বেনজরেরও সেটা আছে। তবে বেনজীর ‘মোর পলিটিক্যাল।’ পরিবার ও নিজের লোকের প্রতিও হাসিনার একপ্রকার গভীর ভালোবাসা ও আবেগ আছে। মিছিলে গুলি করে, মানুষ মারায় নেতৃত্ব দেয়া সত্ত্বেও ডাক্তার ইকবালকে সে  ধরতে পারছে না তার ছোট বোনের জন্য। অবশ্য সব কিছুর উর্ধ্বে থেকে কঠোরভাবে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য অনেক বড় প্রশাসক হতে হয়। হাসিনা তো সেটা নয়। এখানে ব্যক্তি সম্পর্কের ভিত্তিতে সবকিছু চলে। কিন্তু ভালভাবে চালাতে মেরিটএর ভিত্তিতে সিলেকশন এবং পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে সব ক্ষেত্রে। নিক্তিটা ঠিক রাখতে হবে। কিন্তু কেউ সেটা ঠিক রাখছে না। এখানকার চীফ জাস্টিস পর্যন্ত বেশি কথা বলেন, ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারেন না। কারণ হাবিবুর রহমান শেলীর মতো লোক জিয়ার আমলে জজ হন। অন্যদের আমলেও একই রকম ঘটনা ঘটেছে, ঘটছে। এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন। কেননা পরিবর্তনের কথা যারা বলে তাদেরও লক্ষ্য, পরিকল্পনা ঠিক নেই। কনসেপশন ক্লিয়ার নয়।
তাহলে কী করা দরকার ?
সেটা আমি বলবো কেন ? বললেই সেটা শুনবে কে ? আর এরকম কাগজে আমার কথা ছাপা হলেই বা কয়জন পড়বে ? যুগান্তরের মতো একখানা কাগজ বের করেন, তারপর --
কিন্তু যুগান্তরের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে তো আপনার আদর্শ মেলে না।
এইসব ইংরেজী- বাংলা কথা আমারে বুঝায়েন না। আমি বুঝি। দিনকালের মতো লিফলেটে কাম হইতো না। শয়তানি-বাঁদরামি যাই করুক, অপোজিশনের একমাত্র কাগজ এখন ইনকিলাব। এরপর যুগান্তর। ডাঃ ইকবালের নেতৃত্বে বিরোধী দলের মিছিলে গুলি চালাবার ফটো ছাপলে সেই গুলি যে হাসিনার বুকেই লাগে সেটা আমি বুঝিনা মনে করেন ? যুগান্তর অলারাও বোঝে। বুইঝাই ছাপছে। আপনি কইবেন, সার্কুলেশন ধরার জন্য। যে জন্যই হোক, সেটা জাইন্যা আমার কাম নাই। ছাপছে ব্যস।
ঠিক আছে। অলি আহাদ ভাই এখন বলুন দেশের বর্তমান যে সংকটজনক অবস্থা সেখান থেকে মুক্তির পথ কি ?
বললাম তো, কথায় কাজ হবে না। মুক্তির জন্য কাজ করতে হবে। এখন এখানে আমরা ‘র’ এবং ‘আইএসআই’-এর, খেলার মধ্যে পড়ে গেছি। দু’দিকে দুই পক্ষ। ছাগলের তিন বাচ্চার দুইটা দুধ খায় আরেকটা তিড়িং বিড়িং করে লাফায়। আমি সেই লোক নই। আমাকে গভর্নমেন্টে বসান। দেখবেন, সমস্যা দ্রুত সমাধান হবে।
ক্ষমতায় বসে কি করবেন আপনি ?
কী করবো আপনাকে বলে লাভ কী ? আগে বসান, তারপর দেখেন কী করি। আমি জানি কী করতে হয়। কিন্তু আমাকে কেউ ক্ষমতায় বসাবে না। লোকজন আমার জন্য কাজও করবেনা। জনসভা করার জন্যও আমাকে কেউ টাকা দেবে না। কেননা সবাই জানে অলি আহাদ ক্ষমতায় গেলে ব্যক্তিসম্পর্কে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে না। চাকরি, ব্যবসা, ফেভার বিতরণ করবে না। কাজেই আমার কাছে লোক আসবে না। যারা ক্ষমতায় গেলে ফেভার করবে, মানুষ তাদের কাছেই যাবে। কাজেই তারা ক্ষমতায় আসবে। আমি কথা বলে লাভ কী ? উপদেশে তো কাজ হবে না। ভেরি আন্ডারডেভেলপ অ্যান্ড করাপ্ট কান্ট্রি আমাদের। এখানে চোর, ডাকাত, মুর্খরা, পার্লামেন্টে বসে। সফিস্টিকেটেড পার্লামেন্টারী সিস্টেম এখানে চালানো কঠিন। আমি প্রধানমন্ত্রী হতে পারলে অবশ্য পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারতাম। তবে আলটিমেটলি আমি প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের পক্ষে। তবে এসব কথা এখন বলে লাভ নেই। ক্ষমতায় যেতে পারলে সুবিধামতো সময়ে সেটা করার পক্ষপাতি আমি। একনাগাড়ে কথা বলছিলেন জনাব অলি আহাদ। মাঝে মধ্যেই আমাদের দু’একটি প্রশ্নের টোকায় রাজনীতির এই বাণীয় ঝংকার উঠছিলো; কখনো উচ্চ কখনো ধীরলয়ে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র ব্যাপারে অনেক ক্ষোভ তাঁর। বললেন, বিএনপি বলবেন না, বলুন খালেদা জিয়া। বিএনপি কিছু না। খালেদা জিয়ার প্রতিই মানুষের যা কিছু আস্থা। দেখেন, বিএনপি আমাকে একুশের আলোচনায় টেলিফোনে দাওয়াত করে। আমি যাইনি। নোমানকে বললাম দায়সারা দাওয়াতে যাওয়ার লোক নই আমি। আমি ৭ দলে আছি। পল্টনের জনসভায় পোস্টার, পত্রিকার বিজ্ঞপ্তিতে আমার নাম থাকেনা। আমাকে ফোনে ডাকে। আমি যাই না। চেয়ার খালি থাকে। ঘরোয়া মিটিং টিটিংয়েও কম যাই। আজেবাজে লোক আর মোল্লাদের সঙ্গে বসে কথা বলে লাভ কি ? খামোখা সময় নষ্ট করা। আমি তো মাওলানা ভাসানী, নাজিমউদ্দিন, সোহরাওয়ার্দী ও মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করেছি। ফজলুল হককেও ঘনিষ্ট ভাবে দেখেছি। তবে তাকে ঘৃণা করতাম। বর্তমানে দেশের জন্য খালেদা জিয়ার কিছুটা আন্তরিকতা আছে বলে মনে করি। উনি ক্ষমতায় থাকতে আমার খবর না রাখলেও এখন মাঝে মাঝে খোঁজ নেন। আমার কথা তেমন না শুনলেও যোগাযোগ রাখেন। কেন রাখেন জানিনা। সেটা তিনিই ভালো জানেন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথায় বুঝেছিলাম, এরশাদ ও মোল্লাদের ব্যাপারে তার রিজার্ভেশন আছে। উনি নিজে আমাকে বলেছিলেন, মোল্লাদের সঙ্গে নিলে ক্ষমতায় আসা যাবেনা। ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড সমর্থন করবে না। পরে তাদের সঙ্গে জোট কেন করলেন বুঝি না। আমার ধারণা, বিএনপিতে এখন রাজাকাররা আপার হ্যান্ডে আছে। ওরা বেগম জিয়াকে কব্জায় রাখতে চায়। আমি মান্নান ভূঁইয়াকে বলেছি, ‘ও মিয়া, তুমি তো মুক্তিযোদ্ধা। অন্যরা যাই করুক। তোমরা রাজাকারদের লগে দহরম-মহরহম করো কিভাবে ? মান্নান ভূঁইয়া আমারে কয়, ‘অলি আহাদ ভাই, এই বয়সেও আপনার যে সাহস সে সাহস আমার নাই।’ আসলে এরা পদ-পদবীর জন্য কম্প্রোমাইজ করে চলছে। তবে আমি মনে করি, ক্ষমতায় থাকতে খালেদা জিয়া যাই করুন এখন উনি অনেক বেশি মেচিউরড। শেষ পর্যন্ত উনি রাজাকারদের কব্জা থেকে বেরিয়ে আসবেন।
চলমান রাজনীতি সম্পর্কে জনাব অলি আহাদ বললেন, এখন সময় বদলে গেছে। শুধু জিয়ার নামে রাজনীতি চলবে না। মাওলানা ভাসানীর আদর্শকে সামনে রাখতে হবে। আমি মনে করি দিল্লীর আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হচ্ছেন মাওলানা ভাসানী। ভাসানী-জিয়া-খালেদার নামে রাজনীতি হলেও আমার আপত্তি নেই। তবে হুজুরকে বাদ দিয়ে নয়। তাছাড়া এতোটা জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা পাবার ক্ষেত্রেও জিয়ার পেছনে ছিলো হুজুরের সমর্থন।
জনাব অলি আহাদ বলেন, জিয়া রাজনীতি শুরুর আগে মোশতাকের পক্ষ থেকে ন্যাশনাল ইউনিটের একটা প্রস্তাব নিয়ে আমি আর মশিউর রহমান গিয়েছিলাম সন্তোষে। হুজুর আমার কম বুদ্ধিমান তো ছিলেন না। আমাদের দেখেই মতলব বুঝে ফেলেছেন। কথা পাড়ার আগেই বললেন, ‘জিয়া আইছিলো হেলিকপ্টার লইয়া। কাইল আবার আইবো।’ আমরা বুঝে গেলাম, মোশতাকের প্রস্তাবে কোনো কাজ হবে না। জিয়া আগেই হুজুরের সমর্থন ও আর্শীবাদ পেয়েগেছেন। সেই ইশারাই তিনি আমাদের দিলেন। কাজেই, প্রস্তাবে ক্ষ্যান্ত দিয়ে হুজুরের বাড়িতে ভাত খেয়ে আমরা চুপচাপ ফিরে এলাম।
কিন্তু অলি আহাদ ভাই, খালেদা জিয়া এখন বিরোধী দলের নেত্রী। আপনিও বললেন, জনগণের যা কিছু আস্থা সেটা তার ওপরেই। তাঁর সাফল্যের ওপর দেশের ভবিষ্যৎও অনেকখানি নির্ভরশীল। সুতরাং আপনার মতে কি করা উচিত তাঁর ?
সে সাজেশন আমি কেন দেবো ? আমি তো তার উপদেষ্টা নই। সোহরাওয়ার্দীকে একবার জিজ্ঞসা করা হয়েছিলো লিয়াকত আলীর এখন কী করা উচিত? সোহরাওয়ার্দী সাহেব বললেন, ‘আই অ্যাম নট হিজ অ্যাডভাইজার। উনি সরে যাক, আমাকে ক্ষমতায় বসাক। আমি করে দেখিয়ে দেব কী করতে হবে।’
কিন্তু সোহ্রাওয়ার্দী ছিলেন লিয়াকত আলীর প্রতিদ্বন্দ্বী। আপনি তো আর বেগম জিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী নন। 
সেইটা ঠিক কইছেন। কিন্তু কথা হলো উনি আমার কথা শুনবেন কেন? দেখেন, এর আগে যতো কথা কইছি শোনেন নাই তো। আমি বলেছিলাম, পার্লামেন্টারি পলিটিক্স যদি করেন তাহলে এক কথা। না করলে আপনাকে গণঅভ্যূত্থানের পথে যেতে হবে। কোনোটাই  করবেন না কিংবা দু’টোই খাপছাড়া ও আনাড়িভাবে করতে যাবেন, হবে না। আমি বেগম জিয়াকে বলেছিলাম, পার্লামেন্টে গভর্নমেন্টের ‘বিরুদ্ধে নো-কনফিডেন্স’ মোশান মুভ করার প্রস্তুতি নিতে। আমি নিজে খোঁজখবর করে দেখলাম, নানা কারণে ক্ষুব্ধ ট্রেজারি বেঞ্চের ৪০ থেকে ৪৫ জন একেিপ পাওয়া যাবে। অবশ্য গোড়াতেই তারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বসার ঝুকি নিতো না। আমি কাদের সিদ্দিকীকে বললাম, ‘ডোন্ট রিজাইন।’ ওরা ৪০/৪৫ জনকে একত্র করতে পারতো। কিন্তু বেগম জিয়াই আগালেন না। বললেন, ওতে লাভ হয় না। ওরাও আমাদের আমলে ‘নো কনফিডেন্স’ প্রস্তাব এনে ফেল করেছে। আমি বললাম, খেলায় হারজিত থাকে। শতকরা একশ’ ভাগ সাফল্যের গ্যারান্টি নিয়ে কেউ খেলতে নামে না। 
তারপর অপোজিশন পার্লামেন্টে থাকতে পারলো না। আমি মনে করি, থাকা উচিত ছিলো। বিদেশেও পার্লামেন্টে কতো উত্তেজনা, হট্টগোল হয়। বিদেশের অনুকরণ দরকার নেই। প্রতিবাদের নিজস্ব ধারা তৈরি করে সরকারের ওপর চাপ রাখার জন্য পার্লামেন্টে বিরোধী দল থাকলেই ভালো হতো। যা হোক, তারা পার্লামেন্ট ছাড়া হবার পর আমি বললাম গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টির পথে আগাতে। বললাম, আপনাদের কমপ্লেইন হচ্ছে সরকারী সন্ত্রাসের ভয়ে নেতা-কর্মীরা রাস্তায় নামতে পারে না। ঠিক আছে, প্রেসক্লাবের মতো কোনা জায়গায় আপনি আমরণ অনশন শুরু করেন। নেতা-কর্মীরা সেখানে ভিড় করবে। তিনদিন, পাঁচদিন, সাতদিন অনশন করুন। দেখবেন ১০-২০-৫০ করে লাখো লোক জড়ো হয়ে যাবে। তাদের বলুন এখানে এসে আমাকে চেহারা দেখিয়ে লাভ নেই, রাস্তায় নামো। তারা নামতে বাধ্য হবে। আপনার অনশন আন্তর্জাতিক সংবাদ হবে। সারা দেশে নাড়া পড়ে যাবে। সরকারের ভিত কাঁপবে। আমি খালেদা জিয়া হলে তাই করতাম। কিন্তু তিনি শুনলেন না। পরে বললাম, ঠিক আছে অনশন না করেন পল্টনে জনসভা করার ব্যবস্থা করে দেন আমাকে। আমি সভা করবো। আপনি থাকবেন চিফ গেস্ট। আপনার জন্যই সভায় লোক আসবে। একের পর এক সভা হবে। সভা থেকে কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলনকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নেয়া হবে। সেটাও উনি করলেন না। 
তাহলে বিরোধী দল ব্যর্থ হয়েছে বলে কি আপনি মনে করছেন?
ব্যর্থ বলবো না তবে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। তারা ভুল না করলে সরকার অনেক আগে পড়ে যোতো। এটা আমার বিশ্বাস। কারণ, আওয়ামী লোকের পেছনে মানুষ নেই। তবে তাদের শক্ত কিছু পকেট আছে। এনজিও, সাংস্কৃতিক সংগঠন, নারী সংগঠন, সংখ্যালঘু, মিডিয়া ও অফিসার পকেট। এদের দিয়ে ছক সাজিয়ে আওয়ামী লীগ নেক্সট ইলেকশনেও মিডিয়া ক্যু করে জিততে চায়। এরকম একটি সরকারকে সংসদে অনাস্থার মাধ্যমে কিংবা রাস্তায় গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অনেক আগেই নামানো যেতো। বিরোধী দল সেটা করতে পারেনি সাহস ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে। তবে, আমার ধারণা পরবর্তীতে ক্ষমতায় যাবার ব্যাপারে খালেদা জিয়ার প্ল্যান ঠিকই আছে। নৈতিক প্রশ্নে জাপা-জামায়াতের সঙ্গে জোটকে আমি সমর্থন না করলে কি হবে? ক্ষমতায় যাবার ব্যাপারে এটা একটা মোক্ষম কৌশল। বুদ্ধি করে খালেদা জিয়া জাপা-জামায়াতকে আটকে রেখেছেন। এখনো ওরা কেউ দেড়শ’ কেউ ৮০ সীট নিয়ে দরকষাকষি করছে। কিন্তু তিনশ’ সীটে বিএনপির নিজেদেরই অন্ততঃ দু’হাজার প্রার্থী আছে। ঠিকমতো গেইম খেলতে পারলে জাপা-জামায়াত জিরো হয়ে যাবে। তাছাড়া খালেদা জিয়ার একটা বড় শক্তি হলো বিরাট জনসমর্থন আছে তার। তার মাথায় এখন ভোটের পলিটিক্স, ক্ষমতায় যাবার চিন্তা। ভোটের সময় গুণ্ডা এবং টাকা লাগে। খালেদা জিয়ার তাও আছে। ভুট্টোর মতো ওই শক্তিও তিনি কাজে লাগাবেন এবং জিতে আসবেন। নৈতিকতার প্রশ্নে এগুলো আমাদের কাছে ভালো না লাগলেও নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে এটাই। 
নিজের রাজনৈতিক আদর্শ সম্পর্কে জনাব অলি আহাদ বলেন, আমি নিজে থিওক্র্যাটিক লোক নই। মোল্লাতন্ত্রে বিশ্বাস করি না। পিওর ডিমোক্রেসি চাই আমি। ইসলামিক  স্টেট চাই না। তবে দেশে মুসলমানের স্বার্থ চাই- জিন্নাহ সাহেবের মতো। বাংলাদেশে এখন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বলতে গিয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাম বারবার আসে ভারতকে খুশি করবার জন্য, অথচ প্রিন্সিপ্যাল আবুল কাসেমের নাম থেকে যায় অনুচ্চারিত। এই মনোবৃত্তি দুঃখজনক। এটা ইতিহাসের বিকৃতি তো বটেই, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরও পরিপন্থী। কেননা এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই মুসলমান।
লেখক, সাংবাদিক, অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ সম্পাদক জননেতা অলি আহাদ বললেন, নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমিনের মতো লোক দিয়ে রাজনীতি হয় না এদেশে। অতোটা নিরীহ, কোমল, ভদ্রলোক দিয়ে সুবিধা হবে না। সফিসটিকেশন আমারও আছে। তবে সেটা অজায়গায় দেখিয়ে লাভ কী? এদেশে প্রভাবশালী লোকেরা নিজের স্বার্থটা ভালো বুঝলেও তাদের মুর্খতা প্রকট। ‘আ’ বললেই যদি আকাশ’ না বোঝে তাহলে সেসব ‘মোটা মাথার’ লোকের সঙ্গে কথা বলা আমি পছন্দ করি না। 
কথায় কথায় অনেক সময় গেলো। তিনটায় এসেছিলাম, ঘড়িতে তখন সোয়া ৬টা। সোয়া তিন ঘন্টা সময় এর মধ্যে চলে গেছে টেরই পাইনি আমরা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বললামঃ অলি আহাদ ভাই, দেশ এক মহাদুঃসময় পার করছে। চারদিকে আতঙ্ক, মানুষ অসহায়। এই দুর্দিনে আপনার মতামত ও পরামর্শ খুবই মূল্যবান। রাজনৈতিক অঙ্গনে অর্ধশতাব্দি ধরে বিচরণ করে আপনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন তার নিরিখে আপনি বলুন, বিরোধী দলের এখন কী করা উচিত ?
বিনয় কাজে লাগলো। কিছুটা নরম হলেন তিনি। বললেন, খালেদা মাস্ট গো টু দ্য পার্লামেন্ট। হাসিনার আহ্বানের পর যে সুযোগ এসেছে সেটার সদ্ব্যবহার করতে হবে। উনি পার্লামেন্টে গিয়ে বলবেন, তুমি বলেছো, আমি এসেছি। আমি ভোট চাই অবিলম্বে।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যদি না মানেন?
হাসিনা না মানলে? খালেদা জিয়া সব বিরোধী দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে আমার নেতৃত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি করে দেবেন। ক্ষমতায় উনিই যাবেন। শুরু আন্দোলনটা আমার নেতৃত্বে করার নির্দেশ দেবেন সবাইকে। দেখুন আমি কি করি। 
প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথাগুলো বলেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বললেনঃ অনেক কথা হয়েছে, আর নয়। আমার আসরের নামাজও কাজা হয়ে গেছে।
দুঃখ প্রকাশ করে এর জন্য দায় স্বীকার করলাম আমরা। অলি আহাদ ভাই বললেন, ঠিক আছে, আপনারা দায়ী নন। তবে শোনেন, নামাজ কাজা হলে আল্লাহ মাফ করতে পারেন কিন্তু মোনাফেককে মাফ করেন না। আমাদের দেশে মোনাফেকের সংখ্যা বেশি।
সিঁড়ির গোড়া পর্যন্ত আমাদেরকে এগিয়ে দিয়ে বিদায় জানালেন। চার তলা থেকে নিচে পর্যন্তই আসতে চাচ্ছিলেন। স্পষ্টভাষী মানুষটির সৌজন্যে মুগ্ধ হয়ে আমরাই আপত্তি করলাম। রাস্তায় নামতেই ফাগুনের দক্ষিনা হাওয়ায় শরীর জুড়িয়ে গেলো। ব্যক্তিত্বের প্রখরতায় আচ্ছন্ন আমরা দু’জন প্রেসক্লাবের উদ্দেশে রিকশা নিলাম। চারদিকে তখন সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার ফুঁড়ে একের পর এক জ্বলে উঠছে উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলো। সব কোলাহল ছাপিয়ে মসজিদের নগরীর দিক-দিগন্ত মুখর করে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসছে সুউচ্চ আজান ধ্বনি হাইয়্যা আলাল ফালাহ্। কল্যাণের পথে এসো। 
[২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০০২ সাপ্তাহিক উষা পত্রিকায় সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়। পত্রিকার সম্পাদক বিশিষ্ট সাংবাদিক মারুফ কামাল খান সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন।]