দৈনিক ইনকিলাবের গোল টেবিল বৈঠকে অলি আহাদ

ফন্ট সাইজ:
[১৫ই মে‘৯৯ জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভি,আই,পি লাউঞ্জে দিনব্যাপী “বাংলাদেশঃ রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্কট” শীর্ষক দৈনিক ইনকিলাবের গোল টেবিল বৈঠকে অংশ নিয়েছেন দেশের বরেণ্য রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমরনায়ক ও সাংবাদিক যাঁরা বক্তব্য রাখেন তাঁরা হলেনঃ সর্বজনাব অলি আহাদ, কাজী জাফর আহমদ, আনোয়ার জাহিদ, সাদেক খান, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, হাসানুল হক ইনু, লেঃ জেঃ (অবঃ) মাহবুবুর রহমান, প্রফেসর আবদুল গফুর, প্রফেসর ডঃ মাহবুব উল্লাহ, প্রফেসর ডঃ আফতাব আহমদ, মোবায়দুর রহমান, প্রফেসর আবদুন নূর, ডঃ মোহাম্মদ আবদুর রব। স্বাগত ভারণ রাখেন- এ.এস.এম. বাকী বিল্লাহ, সমাপনী বক্তব্য রাখেন-এ,কে,এম মহিউদ্দিন, গোলটেবিলের মডারেটর ছিলেন আবদুল হাই শিকদার।]
আবদুল হাই শিকদারঃ আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান জননেতা চিরবিদ্রোহী, আপষহীন অলি আহাদের বক্তব্য আশা করছি। 
অলি আহাদঃ মাফ করবেন, একটু সময় নিলাম। আমার তো ক্রনিক ব্রংকাইটিস। ফলে আমার লাঞ্চ কাজ করে না, কষ্ট হয়। আজকে শ্রদ্ধেয় গুণীজন, বিজ্ঞজন, আপনারা উপস্থিত। আপনাদের বক্তব্য শুনতে পেরে আমি নিজেকে এডুকেটেড ফিল করি। আমার তরফ থেকে আপনাদের দেয়ার কিছু নেই। শেখাবার মত কিছু নেই। আমার শিখবার ছিল, আমি শিখেছি। একটি কথা আজকে বলতে হয়, ইনকিলাব- আজাদী যুদ্ধে কায়দে আযমের নেতৃত্বে যেদিন আমরা পাকিস্তান আন্দোলন করি, ছাত্র অবস্থায় তখন আজাদ ছিল সমগ্র মুসলমান বাঙালীদের একমাত্র পত্রিকা এবং সেই পত্রিকা ঘরে ঘরে আলো জ্বেলে দিয়েছিল। যে স্বাধীনতা-আজাদীর ফলে আমরা পাকিস্তান লাভ করি। পরবর্তীকালে মুসলিম লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনি করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি পত্রিকার আবির্ভাব হয়, তার নাম ইত্তেফাক। দৈনিক ইত্তেফাক, মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা। সেই পত্রিকাও ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে ঘরে ঘরে পৌছে গিয়েছিল এবং স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত, ৬ দফা আন্দোলন পর্যন্ত নেতৃত্ব দিয়ে গেছে এবং জনগণ তার বাণীকে গ্রহণ করেছে। সে অনুযায়ী একাত্তরের যুদ্ধে জয়লাভও করেছে। আজকে আবার যখন ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, আগ্রাসনবাদের বিরুদ্ধে, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দেশের জনগণ সংগ্রামে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছে তখন একটি পত্রিকার আবির্ভাব আমাদের চোখের সামনে সেটি হল দৈনিক ইনকিলাব। দৈনিক ইনকিলাব না হলে, যেভাবে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ দেশকে গ্রাস করে ফেলেছে, এমনকি ইত্তেফাককে পর্যন্ত গ্রাস করে ফেলছে, সেখানে বাংলার জনগণের কথা বলার কোন সুযোগ থাকত না এবং সেই কথা ঘরে পৌছাবারও কোন সুযোগ থাকত না। সেই ইনকিলাব আজকে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় অস্তিত্ব এই প্রশ্নে একটা গোলটেবিল বৈঠক আজকে ডেকেছে, ইনকিলাবের কর্তৃপক্ষকে, ইনকিলাবের সাথে যারা জড়িত সেই বন্ধুদেরকে, শ্রদ্ধেয় বন্ধুদেরকে আমি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই এবং ধন্যবাদও জানাই। প্রতিপাদ্য বিষয়ে আমি যা বলব তার চেয়ে অনেক বেশী বলে ফেলেছেন জ্ঞানী ব্যক্তিরা, আমি তো জ্ঞানী নই। কিন্তু যেহেতু বিভিন্ন সময়ে রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম বলে আমার নিজের ব্যক্তিগত কিছু কিছু ধ্যান-ধারণা কিন্তু-চেতনা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন, একটি কথা মনে রাখতে হবে ৬ দফা আন্দোলনে যখন সমগ্র বাংলাদেশের জনগণ ভোট দিয়ে সমর্থন জানিয়ে গণপরিষদ অর্থাৎ জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদে সদস্যদের পাঠিয়ে তখনি ৬ দফা ঘরে ঘরে পৌছে গেল। এখন এই ৬ দফাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে গ্রহণ করার বাধা আসার ফলে, সামরিক জান্তাদের কারণেই পাকিস্তান ভেঙ্গে গেল। এখন আমার প্রতিপাদ্য বিষয়ে আমি যাই, মুক্তিযুদ্ধ যখন মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়, ৬ দফার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন জনগণের আন্দোলন সশস্ত্র যুদ্ধে পরিণত হয়, তখনি আসে ইন্দিরা গান্ধী আমাদের চোখের সামনে। হানাদার বাহিনী ২৫শে রাতে আঘাত হানার পরে গণপরিষদ সদস্যরা একে একে দেশ থেকে হিন্দুস্থানে আশ্রয় গ্রহণ শুরু করে, তার সাথে কিন্তু হানাদার বাহিনীর আক্রমণের সামনে তাদের বিরুদ্ধে বৈদ্যনাথপুরের গণপরিষদের শপথনামায় সেখানে বলা হয়েছে, আমরা গণপরিষদের সদস্য যারা জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলাম এবং প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলাম; সমন্বিতভাবে একটা গণপরিষদ গঠন করেছি। সেই গণপরিষদের শপথনামায় এই স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। তার মধ্যে লেখা ছিল, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। এ কথা সর্বৈব মিথ্যা। এ কথা তিনি ঘোষণা করেননি। তা সত্ত্বেও এই মিথ্যা কথাটা ক্রমাগত প্রকাশ করা হয়। তিনি আত্মসমর্পণ করেন হানাদার বাহিনীর কাছে এবং পাকিস্তানের ভূখণ্ডে চলে গেলেন। আমাদের সামনে তখন সংগ্রামের যুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর সদস্যরা, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা, আনসার বাহিনীর সদস্যরা মিলিতভাবে সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হন। এই সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সাথে সাথে মার্চ মাসের ৩০ তারিখে বনগাঁয়ে জনাব তাজউদ্দিন সাহেব গিয়ে উপস্থিত হলেন। খবর পাওয়া মাত্র বিএসএফ এসে স্যালুট দিয়ে বললেন, স্যার আপনার অপেক্ষায় ছিলাম। তারপর স্যারকে দিল্লীর আদেশে হেলিকপ্টারে করে দিল্লীতে নিয়ে যাওয়া হয়। ২ তারিখে মহারানী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা হয় তার। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, কে প্রধানমন্ত্রী হবে, প্রভিশনাল গভর্নমেন্টের কে রাষ্ট্রপতি হবে। ইন্দিরা গান্ধী ভাল করেই জানতেন শেখ মুজিবুর রহমান আত্মসমর্পণ করেছে এবং পাকিস্তানে আটকে আছে, তা সত্ত্বেও ইন্দিরা গান্ধী সিদ্ধান্ত করে দিলেন রাষ্ট্রপতি হবে শেখ মুজিবুর রহমান। আর সিদ্ধান্ত করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী হবেন জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ। কলিকাতার ১নং ক্যার্মাক স্ট্রিটে ৬৭৬ জন সদস্যের যে সভা হয়, সে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, আর বাকি ৫ জন হবে এডভাইজার। কিন্তু দেখা গেল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন এখানে নেমে এসে তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাহির করে দিলেন এবং ইন্দিরা গান্ধীর আদেশের অনুসরণ করলেন। অর্থাৎ তিনি সিলেকটেড হয়ে গেলেন ইন্দিরা গান্ধীর দ্বারা। আমার মনে পড়ে ১৭৫৭ সালে সেই আম্রকাননে যেখানে মীর জাফর আলী খানের দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার ফলে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাবকে পরাজিত হয়ে হয়। তারপরের ইতিহাস আপনাদের জানা। এরপরের ইতিহাস পরাধীনতা আমাদের। সে ছিল কাইভের মনোনীত, ঠিক তোমনি ইন্দিরা গান্ধীর রাষ্ট্রপতি এবং ইন্দিরা গান্ধীর মনোনীত প্রধানমন্ত্রী তার ফল যা হবার তাই হয়েছে। তার ফল হল, আমরা আমাদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিপতি নই। বদ্যনাথপুরে গিয়ে যে শপথনামা নেয়া হয়, তার সেই সদস্যদের মেনে নিতে হয়, তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী আর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে। বাকী চারজন মন্ত্রী। এজন্যই আমরা যুদ্ধ করেছি, অর্থাৎ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বে আমরা সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলাম, আমাদের প্রতিপক্ষ শক্তি ছিল সশস্ত্র বাহিনীর পাকিস্তানের সর্বাধিনায়ক ইয়াহিয়া খান। আর তার প্রতিভূ হিসেবে এখানে ছিল জেনারেল নিয়াজী। সেজন্যই এই মক্তিযুদ্ধের পরে অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পরে ঐ যে কথাটি আমি বলে আসলাম, ইন্দিরা গান্ধীর মনোনীত প্রধানমন্ত্রী ১৬ তারিখে ঢাকায় আসেননি। তার শক্তি ছিল না কথা বলার। সশ্রস্ত্র যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে জেনারেল ওসমানী, এই সর্বাধিনায়কের সাথে ১৬ তারিখের আত্মসমর্পণের যে অনুষ্ঠান, সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবে সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী আর তাদের তরফে জেনারেল নিয়াজী আর সহকারী হিসেবে জেনারেল অরোরা। জেনারেল অরোরা হল সহকারী শক্তি নেতা। ভারতীয় সৈন্যরা আমাদের সাহায্য করেছে, এ নিয়ে কোন প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু সহায়ক শক্তি হিসেবে, প্রধান শক্তি হিসেবে নয়। এখানে আরম্ভ হল বিড়ম্বনা। এভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দিল্লীশ্বরীর পায়ে নৈবেদ্য হিসেবে দিয়ে দেয়া হয়। তারই ফল পরবর্তীকালে এসে দাঁড়ায়। ২০ তারিখে আসলেন তিনি। তাজউদ্দিন সাহেব তো দালাল। কিন্তু তার আগে জেনারেল ওসমানী সর্বাধিনায়ক, তিনি সেই আত্মসমর্পণ করার ডকুমেন্টে সই করার জন্য তার যে উপস্থিতি দরকার ছিল, তিনি তাতে আসেননি। এসেছেন জেনারেল অরোরা। অর্থাৎ এখানে আমার বলার অর্থ হল পেশীশক্তি মাসল পাওয়ার ইস পাওয়ার উইথ মেটার। যার ফলে নৈতিক শক্তি জনগণের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সেখানে পরাজিত হয়ে যায়। জেনারেল অরোরা আসে হিন্দুস্থানের রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে এবং পাকিস্তানের রিপ্রেজেনটেটিভ জেনারেল নিয়াজীর সাথে আত্মসমর্পণের ডকুমেন্টে সই করার জন্য। এর চেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার আর কিছু হয় না। সেই দুঃখ নিয়েই জেনারেল ওসমানী পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে গেছেন। সেই দুঃখ নিয়ে আমরাও এখনো বেঁচে আছি। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে যখন তাজউদ্দিন সাহেব এসে ক্ষমতা নিলেন ২০ তারিখে, পহেলা জানুয়ারী প্রথম কাজটি তিনি করলেন। আমাদের মুদ্রামানকে হ্রাস করে দিলেন ৬৬% ভাগ। আর এ ফলে দাঁড়িয়েছে কি? যেখানে আমাদের টাকার মূল্য ভারতীয় টাকার চেয়ে অনেক বেশী ছিল, হঠাৎ করে তা কমে গিয়ে শেষে দেখা গেল মুদ্রাস্ফীতি আমাদের দেশে, এই অর্থনীতি আজো গড়ে উঠে নাই। তারপরে তিনি ঘোষণা করলেন, ভূলে যান আমরা পাটের রাজা ছিলাম। হ্যাঁ আমরা পাটের রাজা ছিলাম-এটা তো ভুলে যেতেই হবে, দালালী নিয়ে যখন এসেছেন। প্রধান দালালী হলো। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পরে পাক-ভারত যুদ্ধের পর ভারতের রফতানী করা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভারতকে তার মিল চালাবার জন্য ১০ থেকে ১৫ লক্ষ বেল পাট প্রতি বছর আমাদের নিকট থেকে সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে আমদানী করতে হয়েছে। তার মিল প্রায় সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। 
সর্ব উৎকৃষ্ট পাটের অভাবে তখনি এ ঘোষণা আসল যে, আমরা ভারতে পাট রফতানী করতে পারব এবং এর উপর কোন নিষেধাজ্ঞা থাকবেনা। মারোয়ারী লুটেরা এসে গেল। ফল হল সেখানকার পাট কলগুলো যেগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল দুই/তিন শিফটে সেগুলো পরিচালিত হতে লাগল। ফল হল আমার এখানে এমন সব লোককে দায়িত্ব দেয়া হল, যারা লুটেরা, যারা পাঠ বলতে পাটের কিছুই জানে না। ইন্ডাস্ট্রি জানা তো দূরের কথা। ফলে কলকারখানা ধ্বংস হয়ে গেল। তারপর তিনি ঘোষণা করলেন, ইন্দিরা গান্ধীর কথা নিয়ে আমি যাব না। আমার প্রধানমন্ত্রী আমার দেশে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, আমরা কমপ্লিমেন্টারী ইকনমী, আমরা কোন কমপিটেন্ট ইকনমী নয়। ভারতের সাথে   পাকিন্তান জুট এক্সপোর্ট কমপিটিশিনে ভারত অনেক বাজার দখল করে নিয়েছিল। সেই বাজারগুলো পুনরায় তারা উদ্ধার করে। ভারতের সাথে চামড়া আমরা রফতানী করি তারাও রফতানী করে, আমরা হলাম কমপিটেটিভ। এই ভাবে কমপিটেটিভ ইকোনমীটাতে যা ভারত উৎপাদন করে, আমরাও উৎপাদন করি, আমরাও রফতানী করি, তারাও রফতানী করে। সুতরাং সেটা কমপিটিটিভ মার্কেট ছিল। 
বস্ত্রের যে তুলার প্রয়োজন, তুলা ভারত আমদানী করে, আমরাও আমদানী করি, সেখানে দামেও কমপিটিশনের প্রশ্ন আছে। অতএব কমিপটিটিভ ইকনোমীটাকে ধ্বংস করে দেয়া হল, অর্থাৎ মাড়োয়ারী আসলো এই মিলগুলো দখল করে, এ মিলগুলো ধ্বংস করল। তারপর তাজউদ্দিন সাহেব ঘোষণা করলেন, ভারতে কোন অস্ত্র যায় নাই। ঐ দালাল তো তখন জানতো, অমৃতবাজার পত্রিকা রিপোর্ট অনুযায়ী দুইশত হতে আড়াইশত ওয়াগন ভরা অস্ত্র-শস্ত্র, আধুনিক অস্ত্র হিন্দুস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। অথচ এই দালালেরই অন্য মন্ত্রী আমার তখন বলে, তাহের উদ্দিন ঠাকুর ভারতে আমাদের অন্ত্র নিয়ে গেছে। অস্ত্র এখন ফেরত দেয়ার প্রস্তাব হয়েছে। লুটেরা, ভারতীয় সেনাবাহিনী এসেছে লুট করার জন্য মনে হয়। শুধু সফরই সেদিন করে নাই, আমার মুক্তি বাহিনীকে কেবল নাকচ করে দেয় নাই। আমার জেনারেল ওসমানীকে শুধু নাকচ করে নাই। আমার জেনারেল জিয়াকে শুধু নাকচ করে নাই। আমার জেনারেল শফিউল্লাকে শুধু নাকচ করে নাই, আমার জয়নাল আবেদিনকে শুধু নাকচ করে নাই। তাদের সবাইকে নাকচ করে দিয়ে, তাদেরকে অপমান করে হিন্দুস্থানের কাছে আমার স্বাধীনতাকে বিক্রি করে দেয়া সেদিন। এর অর্থ এ দাঁড়ায় যে পরবর্তী কালে তাজউদ্দিন সাহেব দেশটাকে সম্পূর্ণ বিক্রি করে দেয়। আসলেন শেখ মুজিবুর রহমান। কি বিক্রি করলো? ঐ যে আমি বলেছি আমরা যে আমদানী করি বিদেশ হতে, সে আমদানীকৃত মাল সেগুলোকেও ট্রাকে ভরে হিন্দুস্থানে নিয়ে গেছে। অর্থ কোথাকার ? এখানকার মাল কেনার জন্য এখানকার টাকা। ঐ ৯৩,০০০ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর লোক যারা লুট করেছিল আমাদের ঘরে ঘরে, সোনা-দানা, টাকা পয়সা সব কিছু তাদের সেই সোনা, দানা টাকা পয়সা নিয়ে এরা দেখা গেল শেষ পর্যন্ত, এ টাকা দিয়ে বায়তুল মোকাররম প্রভৃতি এলাকা হতে সোনা কিনে কিনে, চট্টগ্রাম বন্দর হতে, খুলনা বন্দর হতে কিনে কিনে হিন্দুস্থান পাঠিয়ে দেয়। এভাবে সম্পদ চলে গেল। টাকা রয়ে গেল। মুদ্রাস্ফীতি হতে বাধ্য। প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে এমনকি আমার কলকারথখানার মাল পর্যন্ত তখন লুট করে নিয়ে যায়, যন্ত্রপাতি পর্যন্ত লুট করে নিয়ে যায়। তারপরে তারা সর্বস্তরে লুট করে দেশটাকে একটা ফোঁকড়া দেশে পরিণত করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। এবং তাই হয়েছে। তাই শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়েছে। ১০ তারিখে পাকিস্তান থেকে ফিরে এলেন জনাব শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব। শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব লন্ডন হতে কমেট বিমানে সরাসরি আমার ঢাকা না এসে দিল্লীতে নামতে বাধ্য হয়েছিলেন। ‘ইন্দরা গান্ধী, মা দেবী, তোমাকে সালাম না করে যেতে পারি না।’ এবং মা দেবীকে সালাম করে তাকে আসতে হয়েছিল। সেখানে তার কানে মন্ত্রণা দেওয়া হয়। 
কৃতজ্ঞ শেখ মুজিবুর রহমান, আত্মসমর্পণকারী শেখ মুজিবুর রহমানকে ইন্দিরা গান্ধী গ্রহণ করে নিয়েছে, আর বাংলাদেশের রাজত্ব যায় কোথায় ? সুতরাং কৃতজ্ঞ শেখ মুজিবুর রহমান দেশেই ফিরে আসলেন। ফিরে আসার পরে তাজ উদ্দিন সাহেব যে কাজগুলো করেছেন, সেগুলোর উপরে তার সীল-ছাপ্পার দিয়ে দিলেন। কিন্তু ক্ষমতার খেলা। তিনি জানেন যে, কনস্টিটিউশান করা হয়েছে। গণপরিষদের প্রভিশনাল কনস্টিউটিশনে আছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা। অতএব তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্যই চারপাশে ঘুরতে ফিরতে আরম্ভ করলেন। কিছুতেই রাষ্ট্রপতি তিনি আর থাকবেন না। তখন জ্যাস্টিস আবু সাঈদ চৌধুরীকে এনে রাষ্ট্রপতি করা হয়, আর তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাজ উদ্দিন সাহেবের হাতে অর্থমন্ত্রীর ভার দেন। ফাইনান্স মিনিস্টার করেন। তার কাজ হলো ১৯ মার্চে ২৫ সালা চুক্তি সই করা। দাসত্ব চুক্তি যাকে আমরা বলেছি। আমার মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী যাকে দাসত্ব চুক্তি বলেছেন। পার্ক-মার্কিন সামরিক চুক্তিকে, সিয়াটো সেন্টো, বাগদাদ চুক্তিকে আমরা একদিন আমেরিকার বশংবদ দালালদের এগ্রিমেন্ট মনে করতাম। সাম্রাজ্যবাদের একটা প্রতিভূ হিসাবে মনে করতাম। সেই সাম্রাজ্যবাদ যেটা করেছিল তার জন্য পাকিস্তানে বলা হয় এখন, তার যে প্রচার মন্ত্রী যিনি আছেন, তিনি এখন বলেন, ব্রড কাস্টিং এন্ড ইনফরমেশন মিনিস্টার ‘পাকিস্তান ওয়াজ রুল বাই আমেরিকান ভাইসরয়’ অনেকে হয়ত ভাইসরয় কি তা জানেন না। ভারত বর্ষ যখন ইংরেজদের দখলে ছিল, ইংরেজদের তরফ থেকে যিনি শাসন করতে আসতেন, সমগ্র ভারতে তার নাম ছিল ভাইস রয়। পাকিস্তানেও ৪০% টাকা আর্মী চালাবার জন্য আমেরিকা দেয়ার ফলে তাকে এগ্রিমেন্ট করতে হয়েছে তার কথামত চলার। ফলে ৫৪ সালের নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়। ফলে ৫৪ সালে আরম্ভ হয় আমাদের বিরুদ্ধে আঘাত। এর পরবর্তীকালে যা আছে সব তাকেই লক্ষ্য করে বলেরছেন। পাকিস্তান ওয়াজ রুলড বাই আমেরিকান ভাইস রয়। এখানেও শেখ মুজিবুরের সময় ইন্ডিয়ান হাই কমিশনার ওয়াজ দি ভাইস রয়। ফলে তাদের কথাই, তাদের স্বার্থেই সব কিছু করতে হয়েছে। তারই ফলশ্র“তিতে ৭ দফা চুক্তিতে সই করে এসেছেন জনাব তাজউদ্দিন সাহেব। সেই আদলেই ২৫ সালা চুক্তিকে ১৯ মার্চে মহরাণী ভারতের প্রধানমন্ত্রী দিল্লীশ্বরীর সাথে শেখ মুজিবুর রহমান সই করেন। 
তার পরবর্তী কাজ কিছুকাল পরেই ২৭ মার্চে বাংলাদেশ এবং ভারতীয় সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করা হয়। অবাধ বাণিজ্য চুক্তি। তার ফলে যে স্মাগলিং অবারিতভাবে আমার বাংলাদেশে আসতে থাকে, তা আজো বন্ধ হয়নি। সেজন্য একটা কথা আছে আমার গ্রামে। আমি তো গ্রামের লোক। ‘হাসতে হাসতে পাগল হইলাম ভালো আর হইলাম না’ হিন্দুস্থানের কাছে এমনভাবে বিক্রি করে দিলাম আর দেশের অর্থনীতি উদ্ধার করার প্রশ্নই ওঠে না। তারপর শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসের ২১ তারিখে সই করলেন ট্রায়াল ওপেনিং অফ দ্যা ফারাক্কা বাঁধকে ট্রায়াল ওপেন করে দেয়া হল ৩১ মে পর্যন্ত সময়ের জন্য। কিন্তু সেটা আর কোন দিন বন্ধ হয় নাই। এর ফলশ্র“তিতে দাঁড়িয়েছে কি? ইতিহাসে শেখ মুজিবকে বার বার জবাব দিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে মরুকরণ আরম্ভ হয়েছে। গঙ্গা বাঁধ যে তৈরী করার দরকার ছিল, নির্মাণ করার দরকার ছিল, ব্রহ্মপুত্র বাঁধ করার দরকার ছিল, পাকিস্তানের সময় যে প্ল্যান করা হয়, সিক্সটিতে সেটাকে কার্যকরী করা হল না। বিএম আব্বাস সাহেবের শত চেষ্টা সত্ত্বেও মধ্য থেকে মরুকরণ কেবল নয়, পানির অভাবে, দেখা গেল যে এখন, ঢাকা শহরে যেখানে ১৬ থেকে ২০ ফুটের মধ্যে নলকুপ বসানোর পরে পানি পাওয়া যেত, এখন ৬০ থেকে ৭০ ফুট বসানোর পরেও পানি পাওয়া যায় না। তার অর্থ হল আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন্ড অব ওয়াটার রিসিট করে-গেছে, অনেক নিচে নেমে গেছে। এর ফলে আজকে আর্সেনিকের দোষ আসছে। তাহলে প্রয়োজন কি? প্রয়োজন সার্ভিস অর্ডারকে ব্যবহার করা। এবং সার্ভিস অর্ডার ব্যবহার করতে হলে কি দরকার? গঙ্গা বাঁধকে নির্মাণ করার জন্য একটি মাত্র পুরুষ এ পর্যন্ত যত সরকার হয়েছে, তার মধ্যে দাঁড়িয়েছিলেন যদিও সামরিক বিভাগ থেকে এসেছেন, তিনি জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি গঙ্গা বাঁধের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করেন ১৯৮০ সালে। সেবারেই তাকে হত্যা করে ফেলা হয়। গঙ্গা বাঁধ আর হল না। গভর্নমেন্টের পর গভর্নমেন্ট এসেছে, একটি পয়সা কেউ বাজেট হতে দেয় নাই গঙ্গা বাঁধ করার জন্য। জেনারেল জিয়াউর রহমান একমাত্র লোক, গঙ্গার পানি পাওয়ার জন্য যে প্রচেষ্টার কথা আপনারা বলেছেন তার সাথে একটু যোগ করতে হয়। তিনি পাঁচ বছরের যে চুক্তি করেছেন, তার মধ্যে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল। জেনারেল এরশাদ সেপ্টেম্বর মাসে ১৯৮২ সালে গিয়ে রেড কার্পেট অভ্যর্থনা নিলেন ইন্দিরা গান্ধীর হতে এবং সেখানে পানি চুক্তি নবায়ন হয়েছে বটে। কিন্তু গ্যারান্টি ক্লজকে তুলে দিয়ে আসলেন। ফলে পানি আমরা পাই না। তারই ফলশ্রুতিতে আজকে ৩০ সালা চুক্তি এসেছে, গ্যারান্টি ক্ল ছাড়া। কোন দেবদূতে কি বলল আর কে সেখানে কি করেছে- এটা আমার বিবেচ্য বিষয় নয়। আমার বিবেচ্য বিষয় হাসিনা সরকারের সময় যে চুক্তি সই করা হয়েছে, সেই চুক্তিতে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসের চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ আছে কি নাই। গ্যারান্টি ক্লজ নাই। অতএব এখানে পানি পাব না। এবং পানি না পেলে অবস্থা যা হওয়ার, আরো খারাপ হবে। এ থেকে মুক্তির কোন নেই। এর একটাই মাত্র উপায়। গঙ্গা বাঁধকে অবিলম্বে নির্মাণ করা। তার পরে দেখুন, দেশের অর্থনীতি একে একে ধ্বংস করার পরে এখন দেখা গেল আমার দেশ মোটামুটিভাবে হিন্দুস্থানের খপ্পরে পড়ে গেছে। এরপর ঐ যে করিডোরের প্রশ্ন আসে। এখন পার্বত্য চট্টগ্রামে যে চুক্তি, আমি যদি আজকে প্রশ্ন করি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করার ফলে যদি আমার কনস্টিটিউশান ভায়লেটেও হয়ে থাকে, তাহলে আপনারা কনস্টিটিউশান ভায়োলেশনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের একটা অংশকে আগামী দিন তাদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য ইউনেস্কো পুরস্কার যদি দিতে পারেন, তাহলে আগামী দিনে বাংলাদেশকে তাদের হাতে তুলে দিলে নোবেল প্রাইজ দিবেন নাকি। আজকে সেই অবস্থায় দেশটাকে নিয়ে আসা হয়েছে। আমি যদি পাশাপাশি একথা তুলি, সেভেন সিস্টারসের কথাটাও নিশ্চয়ই আসে। তারা আমার মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে। আমি তাদেরকে সাহায্য করতে চাই। তাদের মুক্তিযুদ্ধে আমি অংশিদার হতে চাই। বয়স আমার ৭০-এর উপরে, শরীর ভাল নয়; তো মন এখনো আমার সে দিকে আছে। আজকে আমার পাশাপাশি যদি ত্রিপুরা রাজ্যের কথা বলি। সেখানে আন্দোলন হচ্ছে। ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব টিপরা। সে আন্দোলনে তারা মরেছে। যে মুক্তিযুদ্ধ তাদের। সে মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করতে আপনারা কেন কার্পণ্য করেছেন? ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আমার এই প্রশ্ন, প্রশ্ন ইংল্যান্ডের কাছে। আমার এ প্রশ্ন বৃটিশদের কাছে। আমার প্রশ্ন আমেরিকানদের কাছে। আপনারা পার্বত্য চট্টগ্রামে কনস্টিটিউশনকে রেইড করার পরে ইউনাইটেড স্টেটকে ভেঙ্গে ফেডারেল
স্টেট বানাবার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হওয়ায় আগামী দিন কাজী লেনদুপের মত সিকিম যেভাবে, কাশ্মীর যেভাবে; কাশ্মীরের শেখ আবদুল্লাহ বেশী লাফালাফি করেছিল, স্বাধীনতা ঘোষণা করবে। স্বাধীনতা ‘ইন্দিরা গান্ধী তাকে দিয়েছে। জেলে রেখে দিয়েছে বার বার। ঠিক তেমনি সিকিমে স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে আজকে ভারতের অংশ বানানো হয়েছে। আমার প্রশ্ন হল আগামী দিন যদি-অবশ্য দুর্জয় শক্তি জনতার আছে। একথা আমি বিশ্বাস করি। সুতরাং দেশকে রক্ষা করার জন্য, স্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্য জনগণের আজকে নেমে আসা প্রয়োজন।
ইন্দিরা গান্ধীর কাছে শেখ মুজিবুর রহমান বেরুবাড়ী তুলে দিলেন, আনলেন কি ‘নাকের বদলে নোরন’ কি সেটা ৩ বিঘা। ৩ বিঘাও যখন সুপ্রীম কোর্ট শেষ পর্যন্ত আদেশ দিয়ে দিল বাংলাদেশকে হস্তান্তর করার জন্য, কিন্তু সে ৩ বিঘা হস্তান্তর করে নাই। আমার সরকাররা দয়া করে সেই ৩ বিঘা দিয়ে আসলেন কয়েক ঘন্টার মাঝে আল্টিয়ে পাল্টিয়ে এখানে আসা যাওয়ার জন্য। ওরা সিকিউরিটি বুঝে, আমরা বুঝি না। তেমনি বাংলার অর্থনীতিকে ভারত ‘৭২ সাল থেকে ‘৯৮ সাল পর্যন্ত ২৭০০০ কোটি টাকা তারা এখানে রফতানী করেছে। সরকারীভাবে সারপ্লাস ২৭০০০ কোটি টাকা বেসরকারীভাবে স্মাগলিং হিসাবে। তাদের আর একটি হিসাব আমার কাছে আছে। ২৭০০০ থেকে ৩০০০০ কোটি টাকা। এর জন্য দায়ী কে। সরকার এটা বলুক। দায়ী আমাদের সরকার। সাপটা এগ্রিমেন্ট। হোয়াট ডু ইউ মিন বাই সার্ক। ফাইনান্স মিনিস্টার সাইফুর রহমান সাহেব সাপটা সই করলেন। শুক্ল ট্যারিফ যেটাকে বলা হয়, সেটাকে যে পরিমাণে আমরা কমিয়ে দিলাম, ভারত তার কাছেও যায় নাই। ফলে ভারতীয় দ্রব্য বিনা শুল্কে আসে। কিনা ট্যারিফে আসে, তার এক্সপোর্ট তার দেশে বাড়ে না। এর জন্য দায়ী কে? সে জন্যই প্রশ্ন করেছিলাম তখন মাহবুব উল্লাহ সাহেবকে। রাজনৈতিক দল যদি স্বচ্ছ না হয়, চরিত্রবান না হয়, নেতৃত্ব যদি চরিত্রবান না হয়, নেতৃত্বই মেটার করে, নেতৃত্বই দেশকে বিক্রি করে, যেমন শেখ মুজিব বিক্রি করেছে। যে কাজী লেন্দুপ দর্জি বিক্রি করেছে। যেমন তাজউদ্দিন আহমদ বিক্রি করেছে। সুতরাং নেতৃত্বের উপরই সব কিছু নির্ভর করে। জনগণ নিরাপরাধ, জনগণ নিরূপায়, তারা নেতৃত্বের ওপর ভার দিয়ে দেয়। এখন আমার একটা প্রশ্ন এই গোলটেবিলে উপস্থাপনা করা প্রয়োজন মনে করি। কোটি কোটি টাকা খরচ করে, যারা নির্বাচিত হয়ে গিয়ে সরকার গঠন করেন বা অপজিশনে যান, পার্লামেন্ট দখল করেন বা পার্লামেন্টে বিরোধী দল হিসেবে থাকে, তারা কি দেশকে কিছু দিতে পারে? যে ৪ কোটি, ৫ কোটি, ১০ কোটি টাকা খরচ করে, সে উপার্জন করে সেই পথে এবং সেই পথেই পরবর্তীতে সবকিছু করবে দেশকে। আজকে কে শাসন করে? এক দিকে কোটিপতিরা আর একদিকে সরকারী-বেসরকারী দুই আমরা মিলে। গুটি কয়েক এক্সস্পোশন যাদেরকে ব্যতিক্রম বলা হয়। বলে হিন্দুস্থানের পক্ষে তাদেরকে কিনে নেয়া কিছু কঠিন নয়। যখন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাইয়ের জন্য রাউজানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসানো হয়, দেখা যায় ১০০ মেগাওয়াটের ওপর উৎপাদন উঠতে পারে না, সেখানে ২০০ মেঘাওয়াট লেখা আছে। কারণ যে টাকা জিয়াউদ্দিন বাবলু থেকে আরম্ভ করে সবাই খেয়েছে, তারা যে টাকা লুট করেছে, সেই পরিমাণে মেশিনারী খারাপ আনতে হয়েছে। আমার যেই টাকা লুট করেছে, কাফকোর নামে সেই এগ্রিমেন্ট সবাই আপনারা দেখতে পারছেন। হাজার কোটি টাকা এভাবে উপার্জন করবেন, আর দেশের অর্থনীতি থাকবে তার প্রশ্নই উঠে না। দেশের অর্থনীতি এখন নেই। অতএব আমরা নিজেরাই নিজেদের অর্থনীতি হিন্দুস্থানে হাতে তুলে দিচ্ছি। সাঙ্গুর যে এগ্রিমেন্টে হয়েছে, সেই এগ্রিমেন্টের গ্যাস আমরা সেভেনটি নাইন পার্সেন্ট পাব না। টুয়ান্টি ওয়ান পার্সেন্ট পাব এক হিসেবে, এক হেসেবে সেভেনটি সিক্স পার্সেন্ট পাবে তারা, আমরা পাব মাত্র টুয়ানটি ফোর পার্সেন্ট। আমার দেশের গ্যাস আমি উত্তোলন করি, আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারবো না, আমার টাকা লুট করে এখান থেকে নিয়ে যাবে। এভাবে অর্থনীতি চালালে পরে হিন্দুস্থানকে মোকাবিলা করার জন্য যে মানসিক শক্তি ও শারীরিক শক্তি দু’টা প্রয়োজন এটা কি সম্ভব? অতএব প্রশ্ন হলো আজকে এদেশে প্রেসিডেন্ট নাসের ক্ষমতা দখল করেনি, যে সুয়েজ খালের জন্য মন প্রাণ দিয়ে জান বাজি রেখে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। পাশে এসে গিয়েছিল সোভিয়েত রাশা। সুতরাং আজকে প্রশ্ন পরিস্কার আমি কখনো সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে চিলাম না, এখনো না। কিন্তু কসোভো আমার। কসোভোতে যারা বাস করে তারা আমার মত, ধর্ম বাদ দিলেও তাদের প্রতি যে নির্যাতন করা হচ্ছে, বাড়ী হতে তাড়ানো হচ্ছে, মারা হচ্ছে, রেফ করা হচ্ছে, এদের পক্ষে কেউনা কেউ দাঁড়াতে হবে। শক্তিশালী হিসেবে আমেরিকা ন্যাটো দাঁড়ানোয় আমি খুব খুশী এবং ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কে দাঁড়িয়েছে আজকে। সোভিয়েত, রাশা, ভারত। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় চীন। সুতরাং আন্তর্জাতিক ন্যায়নীতি কোথায় সেটা আমরা দেখতে পাই। এখানে যেমন গণতন্ত্র হয় না, কয়েকজনের লুটপাটের ব্যবস্থা হয়, ঠিক সমগ্র পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক আইনেও বড়দের পক্ষেই থাকে। আজকে যদি সোভিয়েত রাশা পারত তাহলে প্রিমাকভ সাহেব চুপ করে থাকতেন না। উনি শ্লোভাকদের নাম দিয়ে পরিস্কারভাবে সৈন্য সেখানে পাঠিয়ে দিতেন। পরিস্কারভাবে জেট বিমান পাঠিয়ে দিতেন। সেই শক্তি নেই বলে ন্যাটোর বিরুদ্ধে কিছু করতে তিনি সাহস পাচ্ছেন না। কিন্তু আনাগোনা তিনি করছেন। এজন্যই আজকে আমার দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রক্ষার দায়-দায়িত্ব জনগণের ওপর। আমার জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার আছে, অতীতে যাদের সংগ্রামী হিসেবে জেনেছি, যেমন ড. মাহবুব উল্লাহ, যেমন ড. আফতাব আহমাদ যেমন আনোয়ার জাহিদ সাহেব, জনাব সাদেক খান সাহেব, তাদেরকে আমি নিজে দেখেছি। তাদের সাথে সংগ্রাম করার ব্যাপারটা আমার কাছে একটা আনন্দের ব্যাপার ছিল। তাদের ওপরও অনেকটা নির্ভর করে।
দেশে চরিত্র বলে কিছু নেই। দুর্নীতিবাজে দেশ ভরে গেছে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। রাজনীতি স্বচ্ছ কখনো হবে না। দুর্নীতি যদি দূর না হয়। কি সব মামলা দেন, গডফাদাররা সবই বেঁচে যায় আর তরিকুল ইসলাম সাহেবের মত একজন ভদ্রলোক তাকে আসামী করা হয় রানার পত্রিকার সম্পাদক মুকুলকে হত্যা করা দায়ে। অতচ জনকন্ঠের রিপোর্ট অনুযায়ী হাসান বলে এক লোক, গডফাদার পরিচালিত এক সন্ত্রাসী, যে হত্যা করেছে সে এখন ঢাকায় আছে। কাদের বাড়ীতে আছে সেটা বেরা করা হোক। মন্ত্রীর বাড়ীতে আছে কি না? এগুলো ইনভিসটিকেশন হয়ে বের হওয়া দরকার। আলমগীর কবিরের মত ভদ্রলোক এবং সংগ্রামী, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তিনি খুন করতে যাবেন? হ্যাঁ যুদ্ধে খুন করবেন। কিন্তু একটা লোককে গুণ্ডামী করার মানসিকতা নিয়ে হত্যা করবেন, এ প্রশ্ন তার বেলায় উঠতেই পারে না। কিন্তু তাকে আজকে জেল খাটতে হয়। পানি নিয়ে, বিদ্যুৎ নিয়ে ঢাকা শহরের রাস্তা থরথর করে কাঁপে। খারাপ বললেও আজকে একটি কথা বলতে হয়, যদি শেখ মুজিবুর রহমান আজকে এ অবস্থায় থাকতেন তখন তিনি জনসভা ডেকে দিয়ে স্ট্রাইক ঘোষণা করে দিতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত পানি পাবো না, যতক্ষণ পর্যন্ত বিদ্যুতের ঝামেলা যাবে না এবং পারলে যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা পদত্যাগ করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে আমার স্ট্রাইক চলবে। এ রকম কর্মসূচী আমরা দিতে পারি না। আমরা আসি সুন্দর জায়গায় ফ্যানের নিচে বসি কথা বলি, পত্রপত্রিকায় ছবি ওঠে। চলে যাই। সেরে যায়, এটা আন্দোলন নয়, এটা আন্দোলন আন্দোলন খেলা। অত্যন্ত দুঃখ লাগে ‘৪৮ সালের কথাই বলি, যেদিন আমাদেরকে কুফর বলতো। কাফের বলত। হিন্দুস্থানের সন্তান বলতো। সেই ‘৪৮ সালে যদি আমরা মাঠে না নামতাম, রাস্তায় না নামতাম, নাজিমুদ্দিন সাহেবের সেক্রেট্রারিয়েটকে ঘেরাও না করতাম, পিটুনী সেখানে না খেতাম, জেলে না যেতাম, তাহলে আজকের অবস্থা ফিরে আসতো না। ‘৫২-এর কথা তো বলার প্রয়োজনই নেই। আমি গোড়ার কথাই বলে গেলাম। তাই আজকে আমাদের কাছে প্রশ্ন সংগ্রাম করে বাঁচব, চরিত্র নিয়ে বাঁচব, চরিত্রবানদের সাথে উঠাবসা করব, নীতিনষ্ঠ যারা তাদের সাথে উঠাবসা করব, না কি গডফাদারদের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাদের নিকট থেকে টাকা নিয়ে নির্বাচন করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে তাদেরও দেব নিজেও খাব। সেটারই কি ব্যবস্থা হবে? এ রাষ্ট্র ব্যবস্থা আমি মানি না। 
পরিতাপের বিষয়, গত নির্বাচনে ড. কামাল হোসেন ধানমন্ডি এলাকাতে দাঁড়িয়েছিলেন, ড. কামাল হোসেনর সাথে আমার রাজনৈতিক দ্বিমত থাকতে পারে কিন্তু উনার লেখাপড়া সম্পর্কে আর জ্ঞান সম্বন্ধে আমার কোন সন্দেহ নেই। তিনি পরাজিত হয়েছেন। তান জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। সেখানে কে নির্বাচিত হয়েছেন? দুর্নীতির জন্য, চোরাকারবারের জন্য ব্লাক মার্কেটিংয়ের জন্য যার সাজা হয়েছিল, সেই মুকবুল আহমদ গ্রেফতার হয় না। তরিকুল ইসলামের হয়। যে না কি হত্যা করেছে সজলকে। যার মামলাও হয়েছে। গ্রেফতার হয় না বোমা রাখার জন্য, বোমা তৈরীর জন্য সুনামগঞ্জের সেই সরকারী দলের সংসদ সদস্য। এ অবস্থা শেখ হাসিনা সরকার তো করবেই। শেখ হাসিনা যে অবস্থায় দেশকে আজকে নিয়ে আসছে, যেভাবে পাবনার নির্বাচন করেছে। আমরা তো আন্ডার ডেভেলপড কান্ট্রি। চরিত্রও খারাপ। টাকা পয়সাও নাই। আমরা চোরও। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নেই। কিছুই নেই। ডেভেলপড কান্ট্রিতে যা হয় না আমাদের এখানে তাই দেখান হয়। সাহেব তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হাবিবুর রহমান সাহেব আপনি কি লেখাপড়া মোটেই জানেন না? আমি যে তথ্য দিলাম এটা কি আপনি অস্বীকার করতে পারবেন? আপনি কি কোন দিন বলেছেন, এ নির্বাচন আমি গ্রহণ করি না। ডেভেলপড কান্ট্রিগুলো আমার সামনে উদাহরণ। আপনার চজরিত্রতো আমার জানা আছে। আপনার তকদির ভাল, আমারই ওয়ার্কার ছিলেন, সেটা বলব না, আল্লাহ মাফ করুক। একসঙ্গে কাজ করেছি সেটাই বলব। আপনি সুপ্রীম কোর্টের মেম্বার কি করে হলেন? সেটাও জেনারেল এরশাদের দয়া, একটার জায়গায় দু’টা প্রমোশন দিয়ে আপনাকে সুপ্রীম কোর্টের মেম্বার করেছে। আপনি ভুলে যেতে পারেন, আইনকে ভুলতে পারেন, জাস্টিসকে ভুলতে পারেন। কিন্তু ভুলা ঠিক হয়নি। 
‘৯৬-এর নির্বাচনও তাই, ১৫ ফেব্র“য়ারীর নির্বাচন আমি সমর্থন করি না। আমার কাছে গিয়েছিল আমি অস্বীকার করেছি। কথা বলতে পর্যন্ত অস্বীকার করেছি। কাউকে কাউকে রাজাকার বলে গালিও দিয়েছি। সে আমার সাথে তো দেখা করার প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু তাই বলে জনাব হাবিবুর রহমান সাহেব জাস্টিস হয়ে আপনি এই ধরনের নির্বাচন করে তাগের ক্ষমতায় বসিয়ে গেলেন, আপনার কি বিবেকে লাগে নাই, সার্ভিস রুল অনুযায়ী জনতার মঞ্চে মহিউদ্দিন খান আলমগীর এবং অন্যেরা যারা বক্তৃতা করেছে, আন্দোলন করেছে, তারা এক দিনের জন্য এমনকি এক মিনিটের জন্যও সরকারী চাকরিতে থাকতে পারে না। তাদেরকে সাসপেন্ড করা, ইনকোয়ারি করা, তারপর ব্যবস্থা গ্রহণ করা- এটাই ছিল আপনার দায়িত্ব। হাবিবুর রহমান সাহেব, সে দায়িত্ব কি আপনি পালন করেছেন? পালন করবেন না বলে ডেইলী স্টারে দুইটা লেখা আমি দিয়েছিলাম। তার মধ্যে আপনার নামে পরিস্কারভাবে সেখানে আপনাকে বলেছি এর সাথে অবশ্য প্রশ্ন আছে জাড়িত। তখনকার মন্ত্রী সভা- তাদেরও দায়িত্ব আছে। যেই মাত্র আলমগীর মহিউদ্দিন সেখানে গেল জনতার মঞ্চে, তখনই তাকে সাসপেন্ড করা উচিত ছিল। ফলে আজকে সামগ্রিকভাবে চরিত্রের ধস হয়েছে। কেবল মন্ত্রী হওয়ার জন্য পাগল হয়ে যাই, মন্ত্রিত্বের ভাগ হতে লুট করতে পারলে আরো বেঁচে যাই। এর ফলটা কি দাঁড়িয়েছে? সার্বিকভাবে দেশ আজ ধ্বংস আর দেশ যখন ধ্বংস হয় আমার মত লোক গরীব মানুষ যে নাকি পালাতে পারবো না, আমাকে মরতে হবে। যুদ্ধ করার মত প্রাণ শক্তি থাকা সত্ত্বেও শারীরিক শক্তি না থাকার কারণে সেটা করতে পারবো না। কিন্তু মাহবুব সাহেব উঠে দাড়ালে আমি তো তা পারব না। এই জন্য আমার প্রশ্ন, আমরা দেশকে রক্ষা করার জন্য যে দায়-দায়িত্ব বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ করি, সেই দায়-দায়িত্ব কি আমরা পালন করি? সুন্দর শব্দ কিছু শিখেছি। জনাবা প্রধানমন্ত্রী আপনি একাউন্টেবিলিটির অর্থ বোঝেন? আপনার নকলের কথা কি আপনার মনে পড়ে ? কেউ বলে দেয়, সাথে সাথে বলা শুরু করে। আবার ট্রান্সপারেন্সী এ শব্দ তো আপনার পিতাও শোনে নাই। আবার ট্রান্সপারেন্সীও বলে। সুতরাং দেশটাকে এভাবে ধ্বংস করা উচিত নয়। 
আপনার বোন যখন বিচিত্রার মালিক হয়, পঞ্চাশ লক্ষ টাকার গুডউইল নিয়া কয় টাকা জমা দিয়েছেন? তথন লজ্জা করে নাই আপনার? আপনার বোন যখন বাহারাইন ব্যাংকের ডাইরেক্টর হয়, সেই টাকা কোথায় পেলেন? বাইরাইনে কি করে এ টাকা গেল ? এর উত্তর কি আপনি দিতে পারবেন? আরো আমার কাছে ফিরিস্তি আছে অনেক বড় কে কি করছেন। তারা আজকে দেশটাকে করাপশানে ধ্বংসের মুখে নিয়ে গেছে, এখন খালি টাকা চাই। স্মাগলিং চাই। গডফাডার চাই। মারো, লুটো এটাই একমাত্র কাজ। এর বিরুদ্ধে দরকার এক শক্তি গড়ে উঠার। কবি আবদুল হাই শিকদার সাহেব, আমার মত নগন্য লোক আপনাকে প্রশংসা করার উপযুক্ত নই। আপনার কলমে যা বের হয়, এ শক্তিও আমার নেই। আপনার সংবেদনশীল মন যা চায় তেমন করে কিছু করার আমার শক্তি নেই। কিন্তু আমার মনটা হয়ত কাঁদে। মনটা হয়ত চায়, কিন্তু বলার মত শক্তি আমার নেই। আমি মনে করি, এ ধরনের আরো অর্গানাইজ করবেন। কিন্তু অর্গানাইজেশনটা যেন বৃথা যায় না। এখানে আসলাম, দু’কথা বলে গেলাম, পত্রিকায় ছবি উঠলো, পত্রিকায় নাম ছড়ালো, সেটাই যেন একমাত্র লক্ষ্য না হয়। আজকে সবচেয়ে বেশী দরকার যুব সম্প্রদায়কে, যাদের বেরিয়ে আসতে হবে, তারা কেবল ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি বন্ধ করলে চলবে না, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির প্রফেসরকে মারলে চলবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে নকল করতে না দিলে তার জন্য যন্ত্রপাতি ভাঙ্গতে হবে; স্টাইক করতে হবে-এটা কখনো হয়ে দেয়া যায় না। গুণ্ডা গুণ্ডাই- সে যে দলের হউক না কেন। আজকে ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিকে ধ্বংস করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এটা আলটিমেটলী ভারতে লাভ। এটা বন্ধ করার ওদের প্রয়োজন আছে। কোন পত্রিকা ছাপাবে না কথা বলবো কোথায়? আবার রোড ট্রান্সপোর্টের কথা বলেছেন, কলিকাতা 
থেকে বাস আসে, কলিকাতা বাস যায়। রোড ট্রান্সপোর্ট এগ্রিমেন্ট হয়, আমার তো সে শক্তি নাই। সেই অর্থের জোর নাই যে আমি বাস ভরে লোক নিয়ে আসবো। আমি পল্টনে দাঁড়িয়ে বলবো এই এগ্রিমেন্ট মানি না। এই এগ্রিমেন্টের বিরুদ্ধে আমি স্ট্রাইক ঘোষণা করলাম। শক্তি যার আছে, তারাতো করেন না। তাহলে আমাকে বলেন, আপনাদের কি জবাব আছে। এর বেশী কি আমাদের কোন লাভ আছে? হয়ত একদিন শুনবেন আমিও বিদায় নিয়েছি। ইচ্ছাকৃতভাবে এভাবে বাঁচার কোন দাম নেই। যে বাঁচায় বার বার আত্মসমর্পণ করতে হয়, নিজের বিবেককে বিক্রি করতে হয়, নিজের বিবেক অনুযায়ী দাঁড়াতে পারি না, যুদ্ধ করতে পারি না, সংগ্রাম করতে পারি না, কিলাকিলি করতে পারি না। এর চেয়ে দুঃখের ব্যাপার আমার জন্য কিছু নয়। সুতরাং আজ যারা বড় বড় দল করেন, তাদের দায় দায়িত্ব রয়েছে, আমরাও বড় দল কোন দিন করেছি, যেদিন পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি নিয়ে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে লেগে গেল, সোহরাওয়ার্দী সাহেব ক্ষমতা দিতে চাইলেন-নিলাম না। সেদিন কিন্তু বেরিয়ে এসেছিলাম, বরং আমাকে বের করে দিয়েছিল। এবং সেটাকে স্বাগত জানিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। এভাবে বাকী সব বলে লাভ নাই। কত জনে কি দিতে চেয়েছেন, কতজনে কি অফার দিয়েছেন, সেগুলো বলে লাভ নাই। এটা হলো নিজের বাগাড়ম্বর। এই বাগাড়ম্বরের মধ্যে আমি ঢুকতে চাই না। কিন্তু এটা ঠিক, দেশকে রক্ষা করার জন্য আপনাদের সাংবাদিকদের দায়-দায়িত্ব আছে। এবং কোদালকে কোদাল বলতে হবে। এটা করতে পারলেই আজকে সেভেন সিসটারকে সাহায্য করা সম্ভব হবে। সেভেন সিসটারও আমাদের সাহায্য করতে পারবে। আমার চট্টগ্রাম পোর্ট কিছুতেই হিন্দুস্থানের দখলে যাবে না। লিখিত- অলিখিত যে দলিলই থাকুক না কেন, যদি সেই তারিখে যে তারিখে সই করেছে, ডিসেম্বরের ২ তারিখে, ১৯৯৭ সালে আমরা যদি নেমে যেতাম চট্টগ্রামে ডাক দেবার পরে, তবে ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত। যখন সব স্তিমিত হয়ে যায়, মরে যায়, মনের সাহস চলে যায়, দুর্বলতা এসে যায়, তখন হঠাৎ ঘোষণা করা হয় সাধারণ ধর্মঘট। ড. মাহবুব উল্লাহ সাহেব, আপনারা তো আন্দোলন করেছেন, ড. আফতাব আপনারা তো আন্দোলন করেছেন, রক্তের বদলা রক্ত নিতে চেয়েছেন, যার জন্য বাংশাদেশের জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশকে ঠিকানো আপনাদেরও কর্তব্য। আপনাদের দায়-দায়িত্ব ডিপ্লোমেটিক ফন্টে যে রকম, পিপলস ফন্টেও তেমনি। পিপলস আপনাদের পক্ষে আছে এটা হলো দুর্জয় সত্য। ভারত তার সৈন্য আনুক আর যাই আনুক না কেন, আমার জনতা যখন হাটে-মাঠে, জলে-স্থলে তাকে আঘাত করতে আরম্ভ করবে, তার পক্ষে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে না। সেমন হয় নাই হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর পক্ষে। তারাও চেয়েছে তাদের চোখের সামনে ধুলা দিয়ে চলে গেছি আগরতলা। আপনারাও বার বার এসেছেন, গেছেন। কারণ পিপল ছিল আমাদের সাথে। ঘরে ঘরে আমাদের দুর্গ ছিল। সেই দুর্গ আজকে আমাদের গড়ে তুলতে হবে। সে দুর্গ গড়ার উপর নির্ভর করতে আগামী দিনের সংগ্রামে আমরা বাঁচব কি বাঁচব না। হিন্দুস্থান বড় হউক, ছোট হউক, ফিজিক্যালী বড় হউক, মাসল পাওয়ার হউক, সব সত্য। কিন্তু হিন্দুস্থান শ্রীলংকাকে কি করছে? সবাই জানেন। হিন্দুষ্টান ভুটানে কি করে, সেটাও আপনারাও জানেন। আমি একমাত্র বলি, আপনাদেরও বলা উচিত সবাই, পিতপক্ষিয় চুক্তি চাই পানির। পানির পলিসি ওয়ার্ল্ডে একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং এই কথা হচ্ছে যদি কোন যুদ্ধ হয়, ওয়াটার ফ্রন্ডে যুদ্ধ হবে। পানির জন্য যুদ্ধ হবে। দেশে দেশে, এলাকায় এলাকায়। সেই পানি আজকে আমাদের প্রয়োজন। মরি-বাঁচি পানি আদায় করতে হবে। গঙ্গা বাঁধ করতে হবে। মরি-বাঁচি ব্রহ্মপুত্র বাঁধ করতে হবে। মরি-বাঁচি আজকে তিস্তা ব্যারেজকে চোরেরা কোটি কোটি টাকা লুৎ করে ধ্বংস করে দিতে চাইছে, সেই তিস্তা ব্যারেজকে বাঁচাতে হবে। তার জন্য যা করণীয় তা করতে হবে। 
নাহলে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা হবে না। দেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। অর্থনৈতিক অধিকার যদি প্রতিষ্ঠিত না হয়, রাজনৈতিক অধিকারের এক পয়সারও দান নাই। রাজনৈতিক অধিকার তো সবারই আছে। যেমন আছে নেপালে। কি ভাবে ঐ ইন্ডিয়ান কারেন্সীতে আমার দেশের মাল কিনে নিয়ে যেত। আমার নিজের চোখের দেখা, সুতরাং রাজনৈতিক অধিকারের সাথে সাথে আমাদের অর্থনৈতিক অধিকার, আর্থিক শক্তি বাড়াবার জন্য যে প্রচেষ্টা, সেটা আমার চাই। কেন মিল আমার টিকবে না, কেন জুট মিল লুটেরারা লুট করে নিয়ে যাবে। কেন জুট মিলের মধ্যে স্টাইক চলবে? কেন পলিথিন চলবে? পলিথিন ব্যাগ বন্ধ করা হয়েছিল না? আদেশ দেয়া হয়েছিল বোধ হয় ১৯৯৩ সালে যে পলিথিন ব্যাগ আর ইউজ করা যাবে না। কয়েক দিনের মধ্যে ইনশাল্লাহ, টাকা খেয়ে অর্ডার বদলিয়ে দিলেন। আজও পলিথিনের ব্যাগ হয়। অতএব এই যে ঘুষের খেলা, এই যে টাকার খেলা, এই যে ঘর বাঁধার খেলা, এই যে গাড়ী করার খেলা। সামান্য পুলিশ অফিসার কয় পয়সা বেতন পায়, তার নাকি এসি, দুইটা বাড়ী, দুইটা গাড়ী, ১৫ হাজার টাকা নাকি ভাড়া, ৪ হাজার টাকা নাকি সার্ভিস চার্জ। আবার আরেক পুলিশ অফিসার, সিআইডিতে চাকরি করে, ইন্সপেক্টর। তারও দেড় কোটি টাকার বাড়ী। তারও গাড়ী, ড্রাইভার। কোথা থেকে টাকা আসে এগুলো হাসিনা দেখে না? এগুলোর জন্য এমন আইন হতে পারে না? এদের জামিন দেয়া যাবে না, ফাঁসী দেয়া হবে। কয়েকটা ফাঁসী দিয়ে দেখুক। দেখি আবার সন্ত্রাস হয় কি না। দেখি আবার করাপশান হয় কি না। এভাবে সার্বিকভাবে দেশটাকে একটা রাস্তায় নিয়ে আসতে হবে। গ্যাস বিক্রি করবা? তুমি আমেরিকা, তুমি গ্যাস বিক্রি কর না কেন? তোমার মজুদ গ্যাস, তোমার মজুদ পেট্রোল বিক্রি কর না কেন? তুমি কেন আরব দেশে যাও? ওখানকার পেট্রোল লুট করার জন্য। কারণ ভবিষ্যতে যে পেট্রোল ফুরিয়ে যাবে তখন তোমার এই পেট্রোলের প্রয়োজন। তোমার এ গ্যাসের প্রয়োজন। তাই আমার দেশের গ্যাস লুট করে নিয়ে যাওয়ার জন্য আজকে চেষ্টা চলছে এবং সেটা ভারতকে দেয়ার জন্য। তারা এক্সপোর্ট করার কথা বলে। আমার গ্যাস আমি এক্সপোর্ট করব কি করবো না, আমার গ্যাস আমার প্রয়োজন মিটাতে পারবে কি পারবে না, আমার বাপেক্স রয়েছে, আমার পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন রয়েছে, তারাই ভাল করে বলতে পারে, সেখানে কেন যাবে সেটা?
এই যে সার্বিকভাবে দেশটাকে বিক্রি করার জন্য নেতাদের কম্পিটিশান, ক্ষমতা দখলের কম্পিটিশান, ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট খাওয়ার কম্পিটিশান। হংকং ব্যাংকে টাকা জমা হয়। তার বিরুদ্ধে স্বয়ং ডাইরেক্টর জেনারেল নাম বলবো না এখন, তিনি একজন সিএসপি অফিসার, এখন অবশ্য হাসিনাও তাকে এডিশনাল সেক্রেটারী থেকে সেক্রেটারী কিছুতে করে না, কারণ তার পক্ষের লোক নয় সে। তিনি কারো পক্ষের লোক নয়। তিনি হলেন এডমিনিস্ট্রেশনের পক্ষের লোক। তিনি তাকে প্রসিকিউট করেছেন। এভাবে তো দেশ চলতে পারে না। সেজন্য সাদেক খান সাহেব সম্পর্কে আমার বক্তব্য, একদিন আপনার সাথে আমি কাজ করেছি, এবং আপনার সিনসিয়ারেটি আমি দেখেছি। আজকের কথা আমি বলতে পারি না। তখনকার সিনসিয়ারেটি আমি দেখেছি। শিক্ষা সম্মেলনে আপনার যে দান, আমি তো ‘ব’ কলম লিখতে জানি না। আপনি লিখে দিতেন, সেগুলো আমার মনে আছে, আপনারও একটা ভূমিকা, শুধু পত্রিকায় লেখা না। অন্য জায়গাও একট নামা দরকার হয়ে পড়েছে। আর বাঁচবেন কত। বেঁচেই বা লাভ কি ? দেশই যদি না থাকে, জনতাই যদি না থাকে, লটেরাই যদি থাকে, লুটেরাই যদি শোষণ করে। লুটেরাই যদি বাড়ী-ঘর করে, লুটেরাই যদি অত্যাচার করে, লুটেরাই যদি রেপ করে বেড়ায়। তার বিরুদ্ধেই যদি আমরা কিছু না বলতে পারি, দাঁড়াতে না পারি, দুঃখজনক হবে। আমি আমার বক্তব্য অনেক বড় করে ফেলেছি বোধ হয় খুব অন্যায় করে ফেলেছি। আমি আপনাদের সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে আমার বক্তব্য আজকে এখানেই শেষ করলাম। তো আগামী দিনে আশা করি এ ধরনের অনুষ্ঠান আরো হবে, কিন্তু অ্যাকশন প্রোগ্রাম সম্পর্কেও সবাই একটু চিন্তা করেন। এই বলে আমার বক্তব্য শেষ করছি। খোদা হাফেজ।
আবদুল হাই শিকদারঃ অনেক দীর্ঘ এবং প্রাঞ্জল, প্রাণবন্ত, সময়োপযোগী বক্তব্যের জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।