একুশের ঘটনাপঞ্জী -খোন্দকার গোলাম মুস্তফা

ফন্ট সাইজ:
[প্রবন্ধটি বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত খন্দকার গোলাম মুস্তফার ‘যেন ভুলে না যাই একুশের ঘটনাপঞ্জী প্রবন্ধের অংশ বিশেষ। প্রবন্ধটি কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বহুশোক প্রথম সংকলনে প্রথম প্রকাশিত হয়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের সামনে একুশের ঘটনা প্রবাহের চিত তুলে ধরার প্রয়োজনে এই প্রবন্ধটি ‘দৈনিক দেশ পত্রিকার ২১ ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৮ প্রকাশিত হয়।]
জাতীয় স্বাধীনতার প্রধান উপাদান ভাষার অধিকার এবং বোধকরি সেই জন্যই নব্যশক্তিকে শুদ্ধ করার গর্জন শোনা গেলঃ উর্দু এণ্ড উর্দু অনলি শেল বি দি স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান। উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।
১৯৪২ সালের ইতিহাসের বিকৃতি পর্যায়ে থেকে বৃটিশ সরকারের ৩ জুনের (১৯৪৭) ঘোষণা কাল পর্যন্ত পাকিস্তান আন্দোলনের অন্তর্নিহিত নব্য শক্তির প্রস্তুতি পর্য। কোলকাতা সিটি মুসলিম ছাত্রলীগ, শহীদ-হাশিম গ্রুপের উদারপন্থী মুসলিম লীগ মহল এবং সমাজ-তান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ মুসলিম তরুণ বুদ্ধিজীবীদের একাংশ সম্মিলিত প্রচেষ্টা গ্রহণ করলেন আসন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়ার জন্য। পূর্ব পাকিস্তানের একটি গণতান্ত্রিক যুব সংস্থা ও একটি প্রগতিশীল ছাত্র সংস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনায় পরবর্তীকালে জন্ম দিল পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুব লীগ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ। 
প্রবীণ চিন্তাধারা ১৪ আগষ্টের পর যেমন পেলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক শক্তির উৎসাহ, নবীন চিন্তাধারা পেলো সাংগঠনিক শক্তির হাতিয়ার ও উন্নততর সুস্পষ্ট সংকটে রূপান্তরিত হলো। এবং সে সঙ্কটের গভীরতার অভিব্যক্তি ঘটলো কার্জন হলের সেই সুধী সমাবেশে একমাত্র উর্দুর আস্ফালন স্তব্ধ হয়ে গেলো বজ্রকন্ঠের “না” ধ্বনির তরংগাঘাতে।
২১শে ফেব্রুয়ারী ’৫২ আন্দোলনের পথিকৃত ১১ই মার্চের ৪৮ আন্দোলন ছিল এই ঐতিহাসিক না-ধ্বনির উত্তাল তরংগ। ঢেউ লাগলো সারা প্রদেশে। স্বাধীনতাকামী জনসমষ্টির যেনো নব যাত্রা শুরু হলো। তরুণ সমাজ স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর থেকে বেরিয়ে এলো রাস্তায় পুলিশের মুখোমুখী। কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে এরা পাকিস্তানের নবশক্তি স্বাধীনতা লাভের পূর্বে এরা উপরতলার চক্রান্ত উপেক্ষা করে কোলকাতার দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি মিছিলের সালি হয়েছে, বৃটিশ বিরোধী শ্লোগানের কোলকাতার রাজপথ কাঁপিয়ে তুলেছে, ২৯শে জুলাইয়ের ১৯৪৬ সর্বাত্মক হরতাল সফল করেছে, রশিদ আলী দিবসের যৌত নেতৃত্বে অংশ গ্রহণ করেছে। 
 
১০ই জানুয়ারী ১৯৭১ কুমিল্লা টাউন হলে অনুষ্ঠিত বাঙলো জাতীয় লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ভাষন দান করছেন সাধারন সম্পাদক জনাব অলি আহাদ।
 
১৯৮২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারী ডিডিএস মিলনায়তনে ভারনরত ভাষা আন্দোলনের সিপাহসালার অলি আহাদ মঞ্চে বাম থেকে ভাষা সৈনিক ‘সর্বজনাব কাজী আজিজুর রহমান, সামছুল আলম, মজদুর ফেডারেশনের সভাপতি আনিসুর রহমান, ভাষা সৈনিক মোঃ সুলতান, নারায়নগঞ্জের সফি হোসেন খান ও গাজীউল হক। ১১ই মার্চ এদের ত্যাগের পরীক্ষা, ঈমানের পরীক্ষা, নবলব্ধ চেতার অগ্নিপরীক্ষা। এরা জয়ী হলো চারদিন সংগ্রামের পর।
একদিকে মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন। অন্যদিকে সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৪৮ সালের ১৫ই মার্চ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। নাজিমুদ্দিন সরকার অংগীকার করলেন, বাংলাকে প্রদেশের সরকারী ভাষা করা হবে এবং দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য সরকার সুপারিশ করবেন কেন্দ্রের নিকট।
লিয়াকত আলীর পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ফজলুর রহমান ভিন্ন পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলেনঃ বাংলা ভাষা লেখা হবে আরবী হরফে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা তো দূরের কথা, বাংলাদে আর বাংলাই রাখা হবে না। মাথা কেটে মাথা ব্যথা দর করে দাও- ফজলুর রহমানের সহজ বুদ্ধি (?) অতি সহজেই ছাত্র-জনতার নিকট বোধগম্য হলো। আবার প্রতিরোধ। আবার তাদের পশ্চাদপসরণ।
আরী হরফে বাংলার প্রস্তাবনার বিরুদ্ধে অসন্তোষ তখনও স্তিমিত হয়নি। ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের অধিবেশন। ২৬ শে জানুয়ারী, ১৯৫২। সভাপতির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।
১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ আর ১৯৫২ সালের ২৬শে জানুয়ারী মাঝখানে কয়েকটি বিশ্বাসঘাতক বছর আর খাজা নাজিমুদ্দিন। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চের সংগ্রামের কথা স্মরণ করলো। আর স্মরণ করলো ১৫ই মার্চের চুক্তিপত্র ও লংঘন। স্মরণ করল লিয়াকত-রিপোর্ট, ফজলুর রহমান ভাষা সংস্কার প্রচেষ্টা।
পাঁচটি বছর যেন বৃথা চলে গেছে। এতো প্রতিবাদ, এমন দাবি, কোনও ফল নেই? প্রত্যয় দৃঢ়তর ছয় ছাত্র সমাজের আবার আন্দোলন। অধিকার হরণকারীর বিরুদ্ধে মরণপণ প্রতিরোধ।
মাত্র চারদিনের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এক প্রতিবাদ ধর্মঘটের আয়োজন করে, পুরাতন সংগ্রাম পরিষদকে সক্রিয় করে তোলে এবং ব্যাপক ভিত্তিতে একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠনের জন্য সর্বদলীয় সম্মেলন আহ্বান করে।
৩০শে জানুয়ারী ছাত্ররা ক্লাসে যোগদানে বিরত থাকে। বিকালে ডিষ্টিক্ট বার লাইব্রেরী হলে জনাব আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলন পরিচালনার জন্য সভায় একটি কমিটি গঠিত হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগ, যুবলীগ, খেলাফতে রব্বানী, ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ থেকে দু’জন করে প্রতিনিধি এ কমিটিতে নেয়া হয়। কাজী গোলাম মাহবুব কমিটির আহ্বায়ক নিযুক্ত হন। তাছাড়া এ কমিটিতে ছিলেনঃ জনাব আবুল হাশিম, আতাউর রহমান খান, কমরুদ্দিন আহমদ, শামসুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আবদুল মতিন ও খালেক নেওয়াজ খান প্রমুখ। শেখ মুজিবুর রহমান তখন জেলে ছিলেন। ১৯৪৯ সালের মার্চ মাস থেকে তিনি জেল খাটছিলেন। এই কমিটি প্রথম সভাতেই স্থির করে, সভা-শোভাযাত্রা ও হরতালের মাধ্যমে সারা প্রদেশে ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে। 
        এ দিবসের কর্মসূচী সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ ৪ঠা ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ধর্মঘট পালন, শোভাযাত্রা ও ছাত্র-জনতার মিলিত সভা
অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। অর্থ সংগ্রহের জন্য ছাত্ররা ১১ ও ১৩ই ফেব্রুয়ারী পতাকা দিবস ঘোষণা করে।
৪ঠা ফেব্রুয়ারীর কর্মসূচী বিপুল সাফল্যের সাথে পালন করা হলো। স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত ঢাকার রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শনে নেমে পড়ে। পুলিশ ঐ দিন কোন বাধা দেয়নি। সবকিছু শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। মওলানা ভাসানী ছাত্র-জনতার মিলিত সভায় বক্তৃতা দেন। পতাকা দিবসও শান্তিপূর্ণভাবে অতিবাহিত হলো। 
১৩ই ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান অবজার্ভারের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়। অজহাতটি ছিল ধর্মীয়। কিন্তু বুঝতে কারো অসুবিধা হয়নি সরকারের উদ্দেশ্যেঃ ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের শক্তিশালী একমাত্র প্রচার যন্ত্রকে ধ্বংস করতে হবে পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করার সংগে সংগে সম্পাদক আবদুস সালামকেও গ্রেফতার করা হয়। (এ সময়ে ‘সাপ্তাহিক’ ইত্তেফাক এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে)।
২০শে ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যা ৬ টায় ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হলো। ১৪৪ ধারা ঘোষণার সাথে সাথে সারা শহর উত্তেজনায় থম্ থম্ করতে লাগলো। ছাত্ররা বিক্ষব্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলগুলিতে জরুরী সভা হলো। বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে মিলিত হলো। 
      ইতিমধ্যে পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনা করার জন্য জনাব আবুল হাশেমের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদও এক বৈঠকে মিলিত হলো। সভায় আলোচনা চলতে লাগলো। অধিকাংশ সদস্যই পরের দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে মত দিলেন। একমাত্র যুবলীগ নেতা অলি আহাদ যে কোন পরিস্থিতিতে পূর্ব কর্মসূচী বহাল রাখার পক্ষে, অর্থাৎ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে মত দিলেন। ছাত্র প্রতিনিধিগণ তখন ছাত্রীবাসের সভাগুলিতে ব্যস্ত। অন্যরা বললেন “আমরা যদি ১৪৪ ধারা ভংগ করি তাহলে দেশে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে সরকার জরুরী অবস্থার অজুহাতে সাধারণ নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। আমরা সরকারকে সে সুযোগ দিতে চাই না। 
কমিটির অন্তর্ভূক্ত প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নির্বাচন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় বড়ো করে দেছেছেন। কিন্তু সভা শেষ হওয়ার আগেই ‘বিক্ষব্ধ তরুণ সমাজের’ মনোভাব জানাতে এলো ছাত্র প্রতিনিধিবৃন্দ। ছাত্রগণ আগামীকাল ১৪৪ ধারা ভংগ করবে, এটা ছাত্রদের সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত। এ সম্পর্কে ২১শে ফেব্রুয়ারী ১২ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। 
ছাত্ররা এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় সর্বদলীয় পরিষদের রাজনৈতিক দলভূক্ত সদস্যগণ বিক্ষুব্ধ হন। কমিটি সিদ্ধান্ত করলেন কমিটির পক্ষ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব শামসুল হক ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভংগ না করার যৌক্তিকতা বুঝাতে চেষ্টা করবেন। কিন্তু যতি ছাত্ররা তা মেনে না নেয়, তবে এ সর্বদলীয় কমিটি তখন থেকেই বিলুপ্ত হবে।
২১শে ফেব্রুয়ারী ছাত্ররা পূর্ণ ধর্মঘট পালন করে ‘বেলতলায়’ মিলিত হন। তখন ইদানীং কালের সর্বজনবিশ্রুত ‘আমতলার’ খ্যাতি ছিল না। এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ছাত্র-জনতা অতঃপর আমতলায় সমবেত হলো। গাজিউল হক সে মহতী সভায় সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। ছাত্ররা শামসুল হকের বক্তব্য শুনলো, কিন্তু তারা সর্বদলীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মানতে রাজি হল না। তারা পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী শোভাযাত্রা বের করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ 
করল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটেÍ সামনে কড়া পুলিশ পাহারা। 
এ সময়ে নিখিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের আবদুস সামাদ একটি আপোষ প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। তিনি প্রস্তাব করলেন, ছাত্ররা দশজন দশজন করে বের হবে। এটা এক ধরনের সত্যাগ্রহ। প্রস্তাবটির অর্থ হলো এই যে, এতে একদিকে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করা হবে, অপর দিকে ব্যাপক আকারের গোলযোগ এড়ানো সম্ভবপর হবে। 
ছাত্ররা এ প্রস্তাব মেনে নিল শেষ পর্যন্ত। দশজন করে ছাত্র বের হতে লাগলো আর পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে লাগল। এইরূপ পরিস্থিতিতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। কাঁদুনে গ্যাসের এক একটি শেখ ছাত্রদের উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিল। এরপর পুলিশ বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর নিরস্ত্র ছাত্র আর সশস্ত্র পুলিশের এ খণ্ড যদ্ধের স্থান বদলে গেল। মেডিকেল কলেট গেট, মেডিকেল কলেজ হোস্টেল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হোষ্টেল ও তার চারদিকের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল সংঘর্ষ। এসব স্থানে বেপরোয়া লাঠি চার্জের ফলে বহু ছাত্র আহত হলো। 
বেলা তিনটা থেকে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন। বাইরে সদস্যদের নিকট ছাত্ররা পুলিশী জুলুমের প্রতিবাদ জানানোর এই সময়। আনুমানিক বেলা ৩টার সময় পুলিশ মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে গুলী চালায়। গুলীতে জব্বার আর রফিক উদ্দিন প্রাণ দেয়। এদের মধ্যে একজন ছিল নিকটবর্তী একটি হোস্টেলের ‘বয়’।
এরপর ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন দিক মোড় দেয়। এম.এ[রাষ্ট্র বিজ্ঞান] ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র আবুল বরকত মেডিকেল কলেট হোস্টেলের এক নম্বর শেডের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল প্রথম গুলীর আওয়াজ শুনে। বুলেট তার উরুদেশ বিদ্ধ করে। প্রচুর রক্তপাতের পর রাত আটটায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর প্রাণ বিয়োগ হয়। 
বরকত আর অন্যান্য শহীদদের মৃত্যুর খবর দাবাগ্নির মতো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে পরিষদ ভবনেও বাইরের ঢেউ লাগে। উত্তেজিত পরিষদে খয়রাত হোসেনের মুলতবী প্রস্তাব সমর্থন করেন সরকার পক্ষীয় সদস্য মওলানা তর্কবাগীশ ও আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাহেব।
কিন্তু মূখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন নির্লজ্জভাবে পুলিশের গুলী চালনা সমর্থন করেন। ফলে মওলানা তর্কবাগীশ ও আবুল কালাম শামসুদ্দিন তৎক্ষণাৎ মুসলিম লীগ পার্টি থেকে পদত্যাগ করে খয়রাত হোসেনসহ পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে আসেন। শামসুদ্দিন সাহেব পরদিন পরিষদ সদস্যপদের ইস্তফা দেন। 
ওদিকে বিক্ষব্ধ ঢাকা নগরী ভেংগে পড়ে শোকে। হাজার হাজার মানুষ চলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিকে। সারা বিকাল, সারারাত জনস্রোতের আর বিরাম নেই। শোকাভিভূত জনতা শ্রদ্ধা জানায় শহীদদের প্রতি। মেডিকেল কলেজ নয়, যেনো তীর্থস্থান। 
২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র সভার পর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ আর মিলিত হতে পারেনি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে মেডিকেল কলেজের ছাত্ররাই তখন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকে। তারা হোস্টেলে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করে এবং সম্ভাব্য পুলিশী হামরাল বিরুদ্ধে কড়া পাহারা দিতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় হলগুলিতেও কন্ট্রোলরুম স্থাপিত হয়। এবং বিভিন্ন ছাত্রাবাসের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারী সকাল বেলায় শহীদরে গায়েবী জানাজায় শরিক হয় কয়েক লাখ লোক। এত বড় বিরাট জন সমাবেশ ঢাকায় আর কেউ কখনো দেখেনি। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হোস্টেল প্রাংগণ থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত তিল ধারণার স্থান ছিল না। নাগরিক জীবন সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। জানাজার পর উপস্থিত আবাল বৃদ্ধ-বণিতা এক বিরাট শোভাযাত্রায় সামিল হয়। পুলিশ শোভা-যাত্রায় বাধা দেয় এবং হাইকোর্টের সামনে আবারও গুলী চালায়। ফলে শফিকুর রহমান নামে জনৈক সরকারী কর্মচারী ও আইন ক্লাসের ছাত্র নিহত হয়। 
এদিকে সদরঘাট এলাকায় দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। সেদিনকার মনিং নিউজে এমর্মে এক খবর ছাপা হয় যে, ভারতীয় দালাল আর হিন্দুরা পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্যে এ আন্দোলন চালাচ্ছে। শোভাযাত্রা সহকারে সদরঘাট এলাকা থেকে আগত জনতা এ খবরে ক্ষব্ধ হয়ে উঠে। তারা মনিং নিউজে আগুন লাগিয়ে দেয়। তৎকালীন মুসলিম লীগ পত্রিকা সংবাদ আন্দোলন বিরোধী ভূমিকা ছিল। উক্ত শোভাযাত্রা নবাবপুরে পৌছলে পুলিশ গুলীবর্ষণ করে। তাতে একজন রিকশাওয়ালা নিহত হয়। 
ঐদিন রেলওয়ে কর্মচারীরা ও রেল ওয়ার্কশপের শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেয়নি। ঢাকা রেল স্টেশনে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। সেক্রেটারিয়েটের কর্মচারীরাও অফিস থেকে বেরিয়ে এসে শোভাযাত্রায় অংশ গ্রহণ করে। 
বিকাল ৩টায় পরিষদের অধিবেশন বসে। কিন্তু সরকারী দল সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অতঃপর বাংলাকে পাকিস্তানের সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সুপারিশ করে এক প্রস্তাব পাস করা হয়। 
এসব সত্ত্বেও মেডিকেলের ছাত্ররা বরকত যেখানে খুন হয়েছিল সেখানে রাতারাতি (একুশে ফেব্রুয়ারির রাতে) একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে। ২২ ফেব্র“য়ারি ভোরে শহীদ শফীকুর রহমানের পিতা সে শহীদ মিনারের উদ্ভোধন করেন। যারা মাতৃভাষাকে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান বলে মনে করেছিল তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে হাজার হাজার লোক শহী মিনারে সমবেত হতে লাগল। 
একই দিন সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ আবার মিলিত হলো এবং ২৫ ফেব্রুয়ারী প্রতিবাদ দিবস হিসাবে ঘোষণা করল। শহরে সাধারণ ধর্মঘট প্রধান কর্মসূচী বলে ঘোষণায় নির্দেশ দেয়া হলো। 
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ও শহরের মহিলা সমাজ এক বাক্যে পুলিশের গুলী চালনার তীব্র নিন্দা করলেন। 
ইতিমধ্যে পুলিশ নিরাপত্তা আইনে আবুল হাশিম, খয়রাত হোসেন, মাওলানা তর্কবাগীশ, অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, অধ্যাপক অজিত গুহ, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক পুলিন দে ও গোবিন্দলাল ব্যানার্জি প্রমুখ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। 
মওলানা ভাসানী ২২ ফেব্র“য়ারি ঢাকা থেকে তাঁর গ্রামের বাড়িতে যান। তাঁকে সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয়। 
প্রকৃতপক্ষে ২২ ফেব্রুয়ারীই ছিল আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়। ২৩ ফেব্রুয়ারি শহরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়। ইতিমধ্যে শহরের অবস্থা শান্ত হয়ে আসে। মাঝে পুলশ মাত্র একবার নাজিরাবাজারে লাঠিচার্জ করেছিল। সাধারণতঃ আন্দোলনে ভাঁটা পড়লে গভর্ণমেন্ট তার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে থাকে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২৩ তারিখ থেকে সরকারী আক্রমণ নবোদ্যমে আরম্ভ হলো। প্রত্যেক হল থেকে মাইক কেড়ে নেয়া হলো ধর- পাকড়ও ব্যাপক।
২৪ ফেব্রুয়ারি পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের মুলতবী ঘোষণা করা হয়। পুলিশ ছাত্রাবাসগুলিতে হামলা চালায়। বহু সংখ্যক ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয় এবং মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনের শহীদ মিনার ভেঙ্গে ফেলা হয়। 
সরকারের এরূপ কার্যকলাপের ফলে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের এক বৈঠকে ৭ মার্চ প্রদেশব্যাপী শহীদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আতাউর রহমান খান পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। 
২৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয় এবং ছাত্রদের জোর পূর্বক হল থেকে বের করে দেয়া হয়। 
২৭ ফেব্রুয়ারি যুব লীগের মোহামদ তোয়াহা ও অলি আহাদসহ বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হয়। একই রাতে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন বেতারে ঘোষণা করেন যে, ভারতীয় এজেন্ট ও নাশকতা কাজে লিপ্ত রাষ্ট্রবিরোধী ব্যক্তিদের তিনি সাফল্যের সাথে দমন করেছেন। শহরে ৫ মার্চের ধর্মঘট আংশিক মাত্র সাফল্য লাভ করে। শহরে ভাটা পড়লেও, জেলা শহরগুলিতে আন্দোলনের অভূতপূর্ব ঢেউ ওঠে। প্রদেশের দূরবর্তী অঞ্চলগুলিতে এ ঢেউয়ের কাঁপন লাগে। 
এ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে দেখা যায়, প্রদেশে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সংগ্রাম পরিষদের জনৈক তরুুণ সদস্যদের কাছে নূরুল আমীন পরাজয় বরণ করেন। 
প্রকৃত বিচারে দেখতে গেলে, এ আন্দোলনের সাফল্যজনক ফলশ্রুত হলো ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র। কারণ এ শাসনতন্ত্রেই বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। নতুন চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ প্রবীণদের এক অংশ এবং নব শক্তির বিরাট অগ্রগতির ফলে এ মহৎ কর্ম সম্পাদক সম্ভবপর হয়েছিল। ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র ইতিহাসের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতির চাকা পিছিয়েও গেছে। কিন্তুু কিভাবে এটা ঘটলো ? পূর্ব পাকিস্তানের তরুণ সমাজকে এ প্রশ্নের যথাযথ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। 
২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে নতুন করে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরষদ গঠিত হয়। জনাব অলি আহাদকে নতুন সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়। এই পরিষদই পরবর্তী কয়েক দিবসের আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করে।