পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি হিসাবে জনাব অলি আহাদের অভিভাষণ

ফন্ট সাইজ:
[২৪শে সেপ্টেম্বর ১৯৫০ সালে শিক্ষা সম্মেলনে অলি আহাদ সাহেব সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষাঙ্গনের সংকটময় যে চিত্র তুলে ধরেছেন তার গুরুত্ব এবং উপযোগিত এখনও ফুরিয়ে যায়নি। সমস্যার নানা শাখা প্রশাখা বৃদ্ধি পেয়ে আজ তা সংকটের মহীরুহে পরিণত হয়েছে।]
শিক্ষা ও জাতীয় স্বার্থরক্ষার্থে এই বাংলার ছাত্র ও তরুণেরা সাম্রাজ্যবাদী আমলের শুরু থেকেই অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে। একদিকে অনেক মহাত্মার আত্মত্যাগ ও অক্লান্ত প্রচেষ্টা, অপরদিকে বহু তরুণ ও স্বদেশ প্রেমিকের আত্মবলি ও রক্তের ওপর গড়ে উঠেছে আমাদের জাতীয় শিক্ষার বুনিয়াদ। জাতীয় শিক্ষার জন্য সেই সুপ্রাচীন সংগ্রাম আজও শেষ হয়নি, সেই লড়াইয়ের জের টেনে চলতে হচ্ছে। তাই প্রাদেশিক শিক্ষা সম্মেলনের প্রারম্ভেই আমি গণতান্ত্রিক শিক্ষার জন্য সেই গৌরবময় আন্দোলনের ঐতিহ্যকে স্মরণ করে পূর্বগামীদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি। 
বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ কি চেয়েছিল
সাম্রাজ্যবাদ এদেশের সহযোগীতা সমাজ-ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছে তার ঔপনিবেশিক শোষণের ঘাঁটি। তাই এদেশে শিক্ষার প্রসার সে কোনদিন চায় নি। তার প্রয়োজন ছিল এক সংকীর্ণ শিক্ষা-ব্যবস্থার মারফৎ কতিপয় শিক্ষিত আমলার সৃষ্টি করা-যারা এদেশে বৃটিশ শাসনের ভিত্তি দৃঢ়তর করবে। জনসাধারণকে অজ্ঞ রাখাই ছিল সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষা-ব্যবস্থার গূঢ় উদ্দেশ্য-তাই সে এক অতি ব্যয়সাধ্য আমলাতান্ত্রিক শিক্ষা-ব্যবস্থা চালু করে জনগণকে শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার সব রকম ব্যবস্থাই করে রেখেছিল। যুদ্ধোত্তর “সারজেন্ট স্কীমে’র ধোঁকাবাজীও আজ কারো কাছে অস্পষ্ট নয়।
সাম্রাজ্যবাদ যা পারেনি 
কিন্তু স্বদেশ প্রেমিক মহাত্মাদের বহু ত্যাগ ও অনেক চেষ্টার ফলে ইংরেজের চালু করা ‘মেকলীয়’ শিক্ষা পদ্ধতির মোড় ফিরতে লাগল। গ্রামে, শহরে, সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষালয়ে জাতীয়তার বীজমন্ত্র ঢুকতে শুরু করল। সাম্রাজ্যবাদ অনেক চেষ্টা করল এই জাতীয়তার ভাব-ধারার বন্যা রুখতে। কিন্তু প্রবল স্বাধীনতা আন্দোলনের সামনে তাদের সব অপচেষ্টাই ভেস্তে গেল। সজাগ ছাত্র সমাজ ও জনসাধারণ বুকের রক্ত ঢেলে একটি একটি করে তাদের শিক্ষার দাবী আদায় করে নিতে লাগল; দিনে দিনে এও তারা বুঝলো যে, সত্যিকাজেরর স্বাধীনতা না পেলে জাতীয় ও গণতান্ত্রিক শিক্ষা-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হইতে পারে না- সাম্রাজ্যবাদ কোন দিনই তা দেবে না। তাই দূর্বার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ছাত্রসমাজ স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ‘৪৬-এর ভিয়েৎনাম দিবস, রশীদ আলী দিবস তার জ্বলন্ত সাক্ষ্য। 
‘৪৭ -এর পরে
তারপর ঘোষিত হল আজাদী-ক্ষমতা হস্তান্তর হল‘৪৭-এর ১৪ই আগষ্ট। জনসাধারণ ভাবল, ইন্সিত পরিবর্তন এবার হবে। তাই সংগ্রামে ঢিলে দিয়ে তারা নির্ভর করে রইল নয়া সরকারের উপর। 
ছাত্র ও জনসাধারণের এই অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে একটির পর একটি করে সাধারণের শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ সুবিধা সাম্রাজ্যবাদ আড়ালে থেকে কেড়ে নিতে লাগল। এই ছুতো ঐ ছুতোর নামে জাতীয় শিক্ষার গোড়ায় সুপরিকল্পিত হামলার অধ্যায় শুরু হল। 
শুরু হল নয়া রাষ্ট্রের পত্তনের নামে শিক্ষার খরচ কমানো। শুরু হল সরকারী অফিস ও ঊর্ধ্বতন অফিসারদের জন্য স্কুল কলেজ বিল্ডিং রিক্যুইজিশন। শুরু হল এক এক করে কায়েমী বা ‘সাময়িকভাবে স্কুল কলেজের দ্বার বন্ধ করা।
অল্প বেতনের দায়ে অনন্যোপায় হয়ে অনেক শিক্ষাগত প্রাণ ‘ভাল-মানুষ’ শিক্ষকও শিক্ষকতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। একজন বোট অফিসার বা বর্ডার অফিসারের মাহিনাও তাদের থেকে দেড়গুণ দুগুণ বেশী। এ অবস্থায় শিক্ষকতা শুধু বিড়ম্বনা নয়, অসম্মানজনক হয়ে দাঁড়ায় না কি ? জাতির শিক্ষা স্পৃহার প্রতি একি বর্বর পরিহাস!
সরকারী স্কুল কলেজগুলির সংস্কারের প্রশ্ন তুলতেই সরকার তা ধামাচাপা দিতে একটি বড় ওজর তুলেছে-‘শিক্ষক পাওয়া যায় না।’ কিন্তু সঠিক খবর নিলে জানা যাবে যে, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল কলেজগুলি থেকে এ্যালাউন্স কেটে নেওয়া, নিয়ম মোতাবেক বর্ধিত বেতন মঞ্জুর না করা ইত্যাদি পরোক্ষ শিক্ষক ছাটাই নীতির চাপে, এমন কি সরাসরি চাকুরীতে জবাব পেয়ে বেকারত্ব বরণ করেছেন এমন শিক্ষকের সংখ্যা নগণ্য নয়। সরকারী স্কুল কলেজগুলিতে অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষককেও যতদিন খুশী অস্থায়ী পদবাচ্য করে রাখা হয়েছে ও হচ্ছে। অনেক সময় তিন চার মাস ধরে গরীব শিক্ষকদের মাইনে বাকী ফেলে রাখা হয়েছে। এই অবহেলার দরুণ সর্বত্র সরকারী বেসরকারী স্কুল কলেজগুলি ভেঙ্গে পড়তে লাগল। হিন্দু শিক্ষকগণ অনেকেই পশ্চিমবঙ্গে চলে গেলেন। আর, শিক্ষিত মুসলিম যুবকেরা টাকাওয়ালা সিভিল সাপ্লাই বা অন্যান্য বিভাগ ছেড়ে শিক্ষার ঘানি ঘাড়ে পেতে নিয়ে অনাহার ডেকে আনতে চাইবে কেন? 
এই ব্যাপক শিক্ষা বিরোধী অভিযান যে কারো মনে প্রশ্ন জাগায়নি, তা নয়। ১৯৪৮ সালের ২রা নভেম্বর দৈনিক ইত্তেহাদের সম্পাদকীয় প্রবন্ধে মন্তব্য করা হয় “পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই আজ চরম দুরবস্থার সম্মুখীন হইয়াছে। শিক্ষার মত একটি জরুরী বিষয় লইয়া পূর্ববঙ্গে যে হেলা খেলা চলিতেছে, তাহা শুধু আপত্তিকর নয়- অত্যন্ত মারাত্মক।”
একই প্রবন্ধে অন্যত্র লেখা হয় “শিক্ষা বিভাগের যাঁহারা কর্ণধার, তাঁহারা আজ পর্যন্ত শিক্ষা বিস্তারের একটা প্ল্যান তৈরী তো করলেনই না, উপরন্তু সাম্রাজ্যবাদী আমলের সেই ভাঙ্গাচোরা শিক্ষা ব্যবস্থাটাও ভাঙ্গিতে বসিয়াছেন।”
সংগ্রামের ভিতর দিয়ে আদায় করা সমস্ত অধিকারই আবার এক এক করে ছিনিয়ে নেওয়া হল। শুধু তাই নয়, এই সুযোগে এদেশের গণশিক্ষা ও জাতীয় স্বার্থের আন্দোলনের মহীরূহ সমূলে উৎপাটনের অভিসন্ধি নিয়ে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে মুছে ফেলবার চক্রান্ত আঁটা হল। তারই প্রথম ধাপ হিসাবে আক্রমণ এল বাংলা ভাষার উপর। চক্রান্ত করা হল ভবিষ্যতের বাঙগালীকে মুক করে দেবার-যাতে সে মুখ ফুটে শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে না পারে, যাতে সে ভুলে যায় তার জাতীয় ও সামাজিক অস্তিত্বের মর্যাদা, ভুলে যায় তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।
অনেক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঐতিহ্যর উত্তরাধিকারী পূর্ব বাংলার বলিষ্ঠ ছাত্র সমাজ এ আক্রমণ চোখ বুজে বরদাস্ত করল না। যে ভাষা এদেশের লোকের আশা আকাংখা, ভাব ও ভাবনার ঐতিহাসিক পরিণতি ও ঐতিহ্যকে বহন করছে; যে ভাষায় বাংলার প্রতিটি শিশুর প্রথম বুলি ও প্রথম পাঠ শিক্ষার মাধ্যমে হিসাবে, সরকারী পরিভাষা হিসাবে “আজাদ বাংলা” কেন তাকে পাবে না? চারদিকে আওয়াজ উঠল- “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।” মিছিলের মুখে তথাকথিত গদিনশীন নেতাদের ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার জবাবদিহি তলব করা হল। সমগ্র প্রদেশ জুড়ে পূর্ব বাংলার বৃহত্তম ছাত্র ও গণ-আন্দোলন গড়ে উঠল। কালাকানুন এখানে প্রাদেশিক সরকারের একটি গোপনীয় সার্কুলারের রহস্য উদঘাটন করতে চাই।
স্পষ্টতঃই এই কালা নির্দেশের ভিত্তিতে ছাত্রদের স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করার সমস্ত অধিকার কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা সরকার ও শিক্ষা বিভাগের কর্তৃপক্ষ যথেচ্ছ চালিয়ে যেতে কসুর করেন নি। শিক্ষকদের স্বাধীন গতিবিধির তো প্রশ্নই উঠে না। কেউ তার ন্যায়সঙ্গত দাবী দাওয়া পেশ করলেই তাকে রাষ্ট্রের শত্র“, ইসলামের শত্র“ আখ্যা দিয়ে দমননীতির প্রকোপে ফেলে দেওয়া হয়। এই কালা কানুনের প্রকাশ্য ও গোপন প্রকোপে জরিমানা, বহিষ্কার ও গ্রেফতারের ঝড় বয়ে গেছে ছাত্র সমাজের বুকের ওপর দিয়ে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বগুড়ার অধ্যাপক গোলাম রসুল সাহেব, গাইবান্ধা ও নড়াইলের কয়েকজন শিক্ষকের বহিষ্কার, মেডিকেল কলেজের জনৈক ছাত্রের বহিষ্কার, বিশিষ্ট ছাত্রকমীদের কারাবাসের ইতিহাস কারও অজানা নয়। এ ছাড়া কথায় কথায় স্কুল কলেজে পুলিশ পিকেট বসিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কয়েদখানায় পরিণত করা হয়েছে। তবু ছাত্র আন্দোলন দমেপি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নবেতনভূক্ত কর্মচারীদের ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন-দমননীতি ও ছাত্র বহিস্কারের বিরেুদ্ধে। তার পরে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে নয়া চক্রান্ত পাকানো হল- আরবী হরফে বাংলা লেখার চক্রান্ত। ঢাকা ও মফঃস্বলের ছাত্রদের ধ্বনি চক্রান্তকারীদের হকচকিয়ে দিয়েছিল। তারপর এল সর্বশেষ ব্যাপক আক্রমণ স্কুল-কলেজে বেতন বৃদ্ধি। এর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্বে সক্রিয় প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই আজ আমরা এই শিক্ষা সম্মেলনের দ্বারে এসে পৌঁছেছি।
(ক) স্কুল কলেজ বিল্ডিং রিকুইজিশন
একমাত্র ঢাকাতেইঃ ইডেন কলেক-এখন সেক্রেটারিয়েট, কলেজিয়েট স্কুল, ষ্টেট ব্যাঙ্ক, জগন্নাথ হল- এসেমব্লি হাউস, ইডেন গার্লস স্কুল ও কামরুন্নেসা কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 
এ ছাড়া নবকুমার হাইস্কুল, নারী শিক্ষা মন্দির, প্রিয়নাথ হাই স্কুল, সলিমুল্লাহ কলেজ, আর্মানীটোলা গার্লস স্কুল ও জগন্নাথ কলেজ অনেক বার রিকুইজিশন করে মাসাধিককাল বন্ধ রাখা হয়।
সিলেটঃ সরকারী মহিলা কলেজ, সরকারী আলিয়া মাদ্রাসা, মুরারীচাঁদ কলেজ হোষ্টেল এবং আরো কয়েকটি বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হুকুম দখল করা হয়। 
১৯৮৪ সালে জননেতা অলি আহাদের সংবর্ধণা সভায় প্রতিবেদন সম্পাদক মশিউর রহমান, ফারুক আহমেদ ভুইয়া, এডভোকেট সিদ্দিকুর রহমান, মাওলানা আশরাফ আলী (ধর মন্ডলী), এডভোকেট এম এ করিম, আনোয়ার হোসেন, যুবনেথা শিশু মিয়া, শেখ মোঃ আবু তাহের, কাজী রফিক প্রমুখ।
২২শে নভেম্বর’৯৫ ঢাকা অটো রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের মাহাবুব আলী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সাধারণ সভায় ভাষনরত জননেতা অলি আহাদ। বাদিক থেকে মঞ্চে বসে আছেন সংগঠনের কেশিয়ার নূরুদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক মোঃ গোলাম ফারুক, ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আজিজুল হক মুক্ত, ইউনিয়নের আইন উপদেষ্টা এডভোকেট মাহবুবুল হক, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমান খাঁ, ইউনিয়নের উপদেষ্টা মুন্সি আবদুল মজিদ। পেছনের সারিতে; খোকন চন্দ্র দাস, আব্দুল হামিদ, মফিজুর রহমান, আবুল হাসেম, মজিবুর রহমান মাষ্টার সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। 
চট্টগ্রামঃ রাজশাহী ও অন্যান্য জেলাতেও নির্বিচারে অনুরূপ হুকুম দখলের মহড়া চলেছে। এই যথেচ্ছ হুকুমদখলের বিরুদ্ধে ছাত্র প্রতিরোধের নজীর হিসাবে অল্পদিন পূর্বে সিলেটের ছাত্র-ছাত্রীর সার্থক “হুকুম দখল প্রতিবাদ ও মেয়ে কলেজ’ আন্দোলন, ঢাকায় কামরুনন্নেসা স্কুলের ছাত্রীদের আন্দোলন ও কুষ্টিয়ার হোষ্টেল আন্দোলনের উল্লেখ করা যেতে পারে। 
সিলেটঃ সরকারী মহিলা কলেজ, সরকারী সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল এবং ময়মনসিংহের ভটপুরা ও অন্যান্য কয়েকটি বিদ্যালয় আজও মিলিটারীর কবলে। এমনি করেই মিলিটারীর খাতিরে শিক্ষাকে বলি দেওয়া হচ্ছে।
কতকগুলো ভাঙ্গা চোরা বাড়ীতে ঢাকা কলেজের প্রাণপ্রদীপ মিট মিট করে জ্বলছে। গত ‘৪৮ সনের নভেম্বরে উক্ত কলেজের ছাত্রদের অনশন ধর্মঘট ও প্রবল আন্দোলনের চাপে সরকার অবিলম্বে উপযুক্ত স্থানে উক্ত কলেজ স্থানান্তরিত করার প্রতিশ্র“তি দেন। আর্টস স্কুলের ছাত্ররা স্কুল বিল্ডিং- এর সংস্কার বা স্থান পরিবর্তনের জন্য বহুদিন ধরে আবেদন নিবেদন করে আসছে। প্রত্যুত্তরে এসব প্রশ্নতো ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছেই উপরন্তু ইস্পাহানীর জন্য ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুল বিল্ডিং হুকুম-দখলের নির্লজ্জ প্রস্তাব তোলা হচ্ছে। 
(খ) প্রাইমারী স্কুল ও প্রাইমারী শিক্ষক 
অবিভক্ত বাংলার শিক্ষামন্ত্রী মোয়াজ্জেম উদ্দিন সাহেব ‘অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার’ আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত কয়েকটি অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে প্রাথমিক শিক্ষার একটি বিল রচনা করেন। দেশ বিভাগের পর সেই পরীক্ষামূলক বিলটিকেও ধামাচাপা দিয়ে নতুন স্কীমের নামে চালানো হল প্রাথমিক শিক্ষার বিরুদ্ধে এক নির্লজ্জ অভিযান। 
১৯৪৮-এর ১৫ই অক্টোবর পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সম্পাদক মওলবী আহমদ হোসেন বিটি সাহেবের বিবৃতি থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করছিঃ নুতন স্কীম চিজটি কি তাহা খুলিয়া বলিলেই থলি হইতে বিড়াল বাহির হইয়া পড়িতঃ আসলে ডি পি আই- এর নির্দেশ ছিল যে, ১৯৪১ সালে ‘আদম শুমারীর হিসাব মত প্রতি দুই হাজার লোকের জন্য একটি স্কুল রাখিয়া বাকী স্কুল উঠাইয়া দিতে হইবে। এই হিসাব মত সিরাজগঞ্জ মহকুমায় মোট স্কুলের সংখ্যা থাকিবে ৪৯৩। বর্তমানে স্কুল বোর্ড পরিচালিত স্কুলের সংখ্যা ৬৪১। ইহার পর সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল’ বালিকা স্কুল, এম, স্কুল এবং মাদ্রাসা সংলগ্ন প্রাইমারী বিভাগের সংখ্যা মোটামুটি ১৩৭। সুতরাং সরকারী নির্দেশ মত ২৭৫ টি স্কুল তুলিয়া দিতে হইবে। 
মোটামুটি উপরোক্ত স্কীমের দৌলতে সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানে শতকরা ৪০ হইতে ৫০ ভাগ প্রাথমিক স্কুল তুলে দেয়া হয়। একমাত্র নাটোর চট্টগ্রামেই অবলুপ্ত প্রাইমারী স্কুলের সংখ্যা ৮৪৪। আর রাজশাহীতে একমাত্র নাটোর জেলায় ৪০০।
উপরোক্ত হিসাব থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, কত হাজার প্রাইমারী শিক্ষক বেকার হয়ে পথে দাঁড়াল। অপরদিকে প্রাইমারী শিক্ষকের বেতনের হার তৃতীয় শিক্ষক-মাসিক ১৯১১ টাকা, দ্বিতীয় শিক্ষক মাসিক ২৭ টাকা, প্রথম শিক্ষক মাসিক ২৯ টাকা। প্রাইমারী শিক্ষকদের সরকারের এই চুড়ান্ত অবহেলার প্রত্যক্ষ ফল চট্টগ্রামের ঈদগাঁও স্কুলের শিক্ষক নাজিমুদ্দিনের অনাহারে হাসপাতালে মৃত্যু। মৃত্যু কালে তার ৩ মাসের মাহিনা বাকি ছিল। ঐ জিলাতেই আরো ৪ জন প্রাথমিক শিক্ষকের মৃত্যু ২ জনের আত্মহত্যা। গো মাধ্যমিক বোর্ড- ঢাকায় ৪ জন প্রাথমিক শিক্ষক রিক্সা চালকের কাজ করে।
সাধারণভাবে মাধ্যমিক শিক্ষকদের অভাব অভিযোগ সম্পর্কে কিছুদিন আগে ‘ইনসাফ’
পত্রিকায় প্রকাশিত জনৈক ব্যক্তির লিখিত চিঠির উদ্ধৃতি দেওয়া গেল।
‘দেশ বিভাগের পরে যাহারা সরকারী স্কুলে নিযুক্ত হইলেন তাহাদের সকলেই এবং সমগ্র শিক্ষক সংখ্যায় নূন্যধিক এক চতুর্থাংশ শিক্ষক গত তিন বৎসর যাবৎ অস্থায়ীভাবে কাজ করিয়া আসিতেছেন। ইহাদের কেহ কেহ আবার বিভাগ পূর্ব সময় হইতেই চাকুরীতে নিযুক্ত আছেন। দেশ বিভাগের পর আজ তিন বৎসর সময়, তবু তাহারা বিভাগীয় তালিকাভুক্ত হয় নাই। ইহাদের সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। শতাধিকের কম হইবে না একথা এক রকম নিশ্চয় করিয়াই বলা চলে। এপর্যন্ত বিভাগীয় তালিকায় ইহাদের নাম উঠিল না- এ কেমন কথা। সরকারী নিয়ম মোতাবেক এর ভিতরে ইহাদের চাকুরী পাকা হওয়া উচিত ছিল কিন্তু পাকা হওয়াতো দূরের কথা; ইহারা যে চাকুরী করিতেছেন এবং একটা সঙ্গীন মুহূর্তে সরকারের প্রয়োজনে ইহারা যে সাড়া দিয়াছেন তাহারও একটা নিশানা বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা করেন নাই। ইহা নিশ্চয়ই বিস্ময়জনক অবস্থা যাহার কথা ভাবিয়া অনেক শিক্ষকই হয়ত হাল ছাড়িয়া দিয়াছেন।”
গত তিন বছরের প্রবেশিকা ও আই এ পরীক্ষায় পাশের হার ক্রম হ্রাসমান, স্কুলের ছাত্র- সংখ্যা হ্রাস ইত্যাদি মাধ্যমিক শিক্ষার চরম দুর্গতির প্রত্যক্ষ নজীর।
এ অবস্থায় মাধ্যমিক শিক্ষাকেও নূতন সিলেবাস প্রবর্তনের নেশায় ইসলামী শিক্ষার ধূয়া তুলে যা চালু করছেন তা ভীতিপ্রদ, স্কুলে ছাত্রদের মাথায় চারটি ভাষা শেখার বোঝা চাপানো হয়েছে, উর্দুকে বাধ্যতামূলক করে; পাঠ্য পুস্তক প্রবর্তন নিয়ে শিক্ষাবোর্ডের কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রীতিমত ব্যাখ্যা শুরু করে দিয়েছেন। সত্যিকারের শিক্ষণীয় অনেক বইই নয়া পাকিস্তানী শিক্ষার নামে অনেক সময় ব্যক্তিগত বা গলগত ব্যবসার খাতিরে বাতিল করে দিয়ে বাজে বই বাজারে চালু করা হচ্ছে।
সিলেবাসের বোঝা সম্পর্কে নীচের উদ্ধৃতিটি যথেষ্ট। “সিলেকসন বোর্ডের বিবেচনা শূন্য সিলেবাস মনোনয়নের ফলে আগামী ৫১ সনের প্রবেশিকা পরীক্ষার্থীদের পাশ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কেন না, উর্দু সিলেবাসে নয়টি গদ্য তেরটি পদ্য, ষাটটি হেকায়েত ছাত্রদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হইয়াছে। বলা বাহুল্য, এত বড় কোর্স মাত্র দুই বৎসরে শেষ করা অধিকাংশ ছাত্রের পক্ষেই অসম্ভব।”
“দ্বিতীয়তঃ ইংরাজী ফার্স্ট পেপারের ম্যান-ইটার্স অব কুমাউন নামক যে পুস্কটি রহিয়াছে, উহার ভাষা এবং বিষয়বস্তু বি এ ষ্টান্ডার্ড এর চাইতেও কঠিন বলিলে অত্যুক্তি হয় না। যথেষ্ট অত্যাচার করা সত্ত্বেও ছাত্রবৃন্দ যে উহা হজম করিয়া খাতার পাতায় দু’কলম চালাইয়া পাশের হার বাড়াইবে, তেমনি আশা স্বর্গের সিঁড়ির মতই অসম্ভব বলা চলে। অথচ পাশের হার কমিতে থাকিলে ছাত্র ও অভিভাবক মহলে যে নৈরাশ্য জাগিবে সম্প্রতি উহার প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়াছে, এই কারণে দিন দিন বিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা কমিয়া যাইতেছে।”
(২০শে আগষ্টের ‘ইনসাফে’ প্রকাশিত জনৈক ছাত্রের চিঠির একাংশ)
সকল ব্যাপারেই মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের অব্যবস্থা চরমে উঠেছে। পরীক্ষক নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষার ফল প্রকাশে অবহেলা ও দীর্ঘ সূত্রতার অভিযোগ প্রতিদিনকার সংবাদপত্রের “চিঠিপত্রের স্তম্ভ” খুঁজলেই মেলে। গত তিন বছর ধরে ম্যাট্রিক ও ইন্টার-মিডিয়েট পরীক্ষার ফলাফল বের হতে প্রতিবারই সেপ্টেম্বর পেরিয়ে যাচ্ছে- অর্থাৎ প্রায় পরো একটা শিক্ষা বৎসর ক্ষতি-হচ্ছে। তাছাড়া বোর্ডের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির অনেক তথ্যই আজকাল প্রকাশ হয়ে 
পড়েছে। সরকারী শিক্ষাপদ্ধতির অব্যবস্থা ও ঔদাসীন্যের ফলে গত কয়েক বছরে পাশের হারের অধোগতি নিম্নরূপ দাঁড়িয়েছে। 
১৯৪৭ সালের ম্যাট্্িরক পাশের শতকরা হার ৭৩। ১৯৪৮ সালে ৫৯। ১৯৪৯ সালে ৩৫। এবার শোনা যাচ্ছে শতকরা ২০ থেকে নেমে ২৫ নাকি পাশ করতে পারে। এই অগণিত হতভাগ্য যুবকদের সামনে এক মাত্র ভবিষ্যৎ হিসেবে খোলা রাখা হয়েছে আনসার-বাহিনী, পিএনজিএ, আরপি ইত্যাদি প্রতিক্রিয়াশীল যুদ্ধের বাহিনীতে যোগদানের পথ তাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সঙ্কুল। এমনি করে পূর্ববঙ্গের তরুণদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধে এদের কামানের খোরাক হিসেবে ব্যবহার করার এ এক সুস্পষ্ট পরিকল্পনা 
কারিগরী শিক্ষা
বিভিন্ন স্কুল কলেজের লেবরেটরীর অবস্থা সঙ্গীন। বার্ণারের গ্যাস, এসিড ও অন্যান্য মাল মসলার অভাবে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রদের হাতেকলমে কিছু দেখা যা শেখার কাজ প্রায় কিছুই হচ্ছে না বললে অত্যুক্তি হবে না। 
গত বছর কয়লার অভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগারের কাজ মাসাধিকালকাল বন্ধ থাকে। মেডিক্যাল শিক্ষা ক্রমবর্ধমান তাগিদকে সরকার চোখ বুজে উপেক্ষ করে যাচ্ছে। গত সেশনে মিটফোর্ডে মেডিক্যাল শিক্ষাপ্রার্থী ১২০০ দরখাস্তের ভেতর মাত্র পৌনে দুশকে অনুমোদন করা হয়। আর মেডিক্যাল কলেজে ৭৫০ খানা দরখাস্তের ভেতর ১২৫ জন ছাত্রকে ভতি করা হয়।
এদের ভিতরও আবার কারিকুলাম সিষ্টেম, অটোমেশন সিষ্টেম ইত্যাদির দৌলতে কাটছাট হয়ে বাৎসরিক ৪/৫ জনের বেশী ছাত্র ডাক্তারী ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে না। কিন্তু এ ডিগ্রিকেও সরকারী স্বীকৃতি না দেওয়ার ফলে বিদেশে উচ্চতর মেডিক্যাল শিক্ষা বা সরকারী চাকুরীর সম্ভাবনা এদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ঢাকাতে মেডিক্যাল শিক্ষা তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটিই মেডিক্যাল কলেজ ও ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুল- অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান। সরকারী মিটফোর্ড স্কুলের এল এম এফ ডিগ্রি অনুমোদিত কিন্তু সংক্ষিপ্ত এম বি কোর্সের প্রবর্তন না করার ফলে ঐ স্কুলের ছাত্রদের উচ্চ শিক্ষার পথে বিরাট বাধা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। 
কুমিল্লাতে সরকারী মেডিক্যাল স্কুল স্থাপনের জন্য বহুদিন ধরে আবেদন নিবেদন চলছে। সম্পতি তথাকার দুইটি বেসরকারী মেডিক্যাল স্কুল একত্র করে একটা করা হয়েছে- কিন্তু তার জন্যও কোন সরকারী সাহায্য বা সহানুুভূতি পাওয়া যাচ্ছে না। 
ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ একদিন সারা ভারতের প্রথম শ্রেণীর ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম ছিল। আজ তার আভ্যন্তরীণ অবস্থা বিশৃঙ্খলা ও স্বৈরাচারে জর্জরিত। শিবপুর হতে প্রত্যাগত ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রদের এখানে পড়া ও পরীক্ষার সুবন্দোবস্তের অভাব পীড়াদায়ক। ইঞ্জিনীয়ারিং স্কুলে অপর দিকে সংক্ষিপ্ত বি ই কোর্স পড়ার কোন ব্যবস্থা নাই। 
(ঙ) বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্দশা অকথ্য। বেয়ারা, শিক্ষক, লাইব্রেরীয়ান, কেরাণী ইত্যাদির অভাব লেগেই আছে। পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধিকাংশ শিক্ষক এবার পি এ এস এ চলে যাচ্ছেন। বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর দুর্যোগ এক স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেকেন্ড ইয়ারের অনার্স প্র্যাকটিক্যাল ফিজিকসের কাজ বন্ধ হয়ে আছে। সায়েন্স বিল্ডিং-এ যথেষ্ট সংখ্যক রুম না থাকার ফলে অনেক সময়েই ক্লাস করতে গিয়ে বিরত হতে হয়। 
লাইব্রেরীতে আধুনিক প্রকাশিত মূল্যবান পুস্তকের একান্ত অভাব। দু এক কপি ‘শো’ পুস্তক কদাচিত ছাত্ররা পড়বার সুযোগ পায়। লাইব্রেরী সংক্রান্ত অভিযোগ কমিয়ে বললেও স্থান সংকুলান হবে না। 
বিশ্ববিদ্যালয় বাজেটে ১৯৪৭ সাল থেকে প্রতি বছর মঞ্জুরীকৃত সরকারী বরাদ্দের হার নিম্নে দেওয়া হইলঃ
সেশন ১৯৪৭-৪৮ ৮৮৭০০০/-
১৯৪৮-৪৯ ৭৩৬৪০০/-
১৯৪৯-৫০ ৭০৭০০০/-
উপরোক্ত হিসাব অনুযায়ী ১৯৫০-৫১ সেশনের যে প্রাপ্য বরাদ্দ ছিল তা থেকেও এক লাখ টাকা কেটে রাখা হয়েছে। 
কেন্দ্রের ‘বিশ্ববিদ্যালয় সাহায্য তহবিল’ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্য সাড়ে দশ লাখ টাকা ‘শর্তাধীন সাহায্যের’  ধূয়া তুলে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ও- দিকে বিনা শর্তে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া হয়েছে সাড়ে দশ লাখ টাকার ভেতর হতে সাত লাখ টাকা সাহায্য (বাকী অংশ সম্ভবতঃ শর্তাধনি রাখা হয়েছে।)
পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার উপর এই বিশেষ রাজ-রোষ কেন? কারণ কাঁচামাল উৎপাদনের উপনিবেশিক শোষণের ঘাটি হিসাবে পূর্ববঙ্গকে সাম্রাজ্যবাদ এখনও ব্যবহার করছে, আর সেই লুটের বখরাদারী করছে ইস্পাহানী প্রমুখ পাঞ্জাবী, সিন্ধী বৃহৎ ধনিকগোষ্ঠী। তাই এদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেবার প্রসায় -যাতে এখানে জাতীয় শিল্প গড়ে তোলার চেতনা ও সংগ্রাম দানা বেধে না উঠতে পারে। 
মোহাজের ছাত্র সমস্যা
মোহাজের ছাত্রদের অভাব অভিযোগের অনেক খবর দৈনিক সংবাদপত্রগুলির চিঠিপত্রের স্তম্ভে চোখ বুলালেই চোখে পড়ে। মোহাজের ফান্ডে টাকা তোলার এত আরম্বর দেখানো হচ্ছে অথচ মোহাজের ছাত্রদের থাকা ও পড়া ও উপযুক্ত বৃত্তির কোন সুবন্দোবস্তই করা হয়নি। 
পরীক্ষার্থী মোহাজেরদের সার্টিফিকেট ইত্যাদির ধূয়া তুলে বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে অস্বীকার করে পরীক্ষা দেওয়া অসম্ভব করে তোলা হচ্ছে। 
গত বছর পুরাপুরি পরীক্ষার ফী না দিলে কোন মোহাজের ছাত্রকে পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয়নি-পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ হঠাৎ বদান্য হয়ে উঠলেন এবং জমা দেয়া পরীক্ষার ফী রি-ফান্ড দেয়া হল। এতে যারা টাকার অভাবে পরীক্ষা দিতে পারছিল না তাদের সুবিধাটা কি হোল? এবারও পরীক্ষার ফী প্রাক্তন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট ছাড়া মোহাজের ছাত্রদের পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে না। 
(ছ) নারী শিক্ষার অবরোধ 
নারী শিক্ষার প্রসার তো দূরের কথা, প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি মেয়ে স্কুল, কলেজ তুলে দেওয়া হয়েছে। বরিশালের একমাত্র মেয়ে হোস্টেল উঠে যাওয়ায় গ্রামের মেয়েদের শহরে থেকে পড়াশুনা করার উপায় নেই। সমস্ত পূর্ব পাকিস্তনে মাত্র দুটি মেয়ে কলেজ অবশিষ্ট। তার মধ্যে সিলেটের কলেজটিকে সম্প্রতি তুলে দিয়েছিল, কিন্তু প্রবল গণবিক্ষোভের চাপে শেষ পর্যন্ত সরকারী সাযায্য মঞ্জুর করার ফলে কলেজটি অব্যাহত থাকে। ওদিকে মেয়েদের বিজ্ঞান শিক্ষার পথ বন্ধ করতে জগন্নাথ কলেজে মেয়েদের বিজ্ঞান বিভাগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। 
(জ) ছাত্রা বাস সমস্যা 
ছাত্রাবাস সমস্যা সার্বজনীন। পাইকারী ভাবে যে সমস্ত ব্যারাক তৈরী হয়েছে তারও সিট রেন্ট করা হয়েছে ৫ টাকা বা ততোধিক। এছাড়া নানা প্রকার আনুসাঙ্গিক ফী-এর উপসর্গ তো আছেই। এক রুমে ৬/৭ জন করে থাকে। আর মেডিকেল কলেজের অনেক ছাত্রই মাথা গুজবার স্থানের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে মাথা খুড়ছে।
অপরদিকে ইস্পাহানী প্রমুখ পুজিপতিদের বাড়ী রিকুইজিশন করে দিয়ে তোষামোদ বা লেহন করতে সরকারের নিরলস উদ্যম সকলের চোখে পড়ে। ১২ লক্ষ টাকা খরচ হয় বড় বড় আমলাদের জন্য বালাখানা তৈরী করতে, সরকারী টাকায় কম পড়েনা, মন্ত্রীদের ভ্রমণবিলাস মেটাতে পাবলিকের লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখে কে?
(ঝ) বেতন বৃদ্ধি
সর্বাধুনিক ব্যাপক আক্রমণ হচ্ছে ছাত্রবেতনের বৃদ্ধি। অধিকাংশ অভিভাবকের আয়ের একটা বিরাট অংশ আসে কৃষি পণ্যদ্রব্য থেকে; কিন্তু ইস্পাহানির জুুট বোর্ডের কৃপায় আজ সারা বাংলার পাট চাষী ভীষণ আর্থিক সঙ্কটের সম্মুখীন। অপর দিকে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বেড়ে যাচ্ছে- এদেশে বৈদেশিক পুঁজি বাজার ফেঁপে উঠছে। ফলে অভিভাবকদের অবস্থা সঙ্গীন। ছাত্রজীবনের আর্থিক সংকটের প্রত্যক্ষ নজীর খবর কাগজের অফিসগুলোতে ঘুরলেই পাওয়া যায়। অনেক ছাত্র আজ খবরের কাগজে নাইট ডিউটি দিয়ে পড়াশুনোর খরচ চালাচ্ছে। কমার্স ও আর্টসের বিরাট সংখ্যক ছাত্র চাকুরী বা প্রাইভেট টিউসানী করে পড়ে। অনেক ছাত্র কাগজ ফেরী করে, অনেকে রাত্রে রিকশা চালায়। 
এই যখন আজকের ছাত্রদের আর্থিক দশা তখন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য স্কুল, কলেজে শতকরা ২৫ জনের পড়া খতম, তা সহজেই অনূমেয়।
ভগ্নাদশা বেসরকারী স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘাটতির বোঝা পুরাবার দায়িত্ব নিজের ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ছাত্র ও অভিভাবকদের ঘাড়ে চাপাবার এক অভিনব পদ্ধতি। এতে তার একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা হ্রাস ও অন্যদিকে শিক্ষা বাজেটের ব্যয় কমিয়ে মিলিটারী ও পুলিশ খাতে টাকা বাড়ানোর উভয়বিধ উদ্দেশ্য সফল হয়। এই বেতন বৃদ্ধির যাতাকলে পড়ে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে এমন বহু ছাত্রের খবর চারদিক থেকে ইতিমধ্যেই আসতে শুরু করেছে। 
(ঞ) দমননীতির প্রকোপ
কালা কানুনের মারপ্যাঁচে বহিস্কৃত ছাত্রের সংখ্যা একমাত্র ঢাকাতেই, মিটফোর্ড-৬ জন ছাত্র। ১ জনের উপর পাকিস্তান থেকে বহিস্কারাদেশ)
সম্প্রতি আরো ১ জন ছাত্রী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়- ৬ জন (গত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে মোট ২৭ জনের উপর বিভিন্ন শাস্তি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়)
ঢাকা কলেজ- ৪ জন (মোট ১১ জনকে ফোর্স টি, সি, ইত্যাদি দ্বারা কলেজ থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়, ৯৭ জনের স্কলার শিপ ষ্টাইপেন্ড বাতিল করার হুমকি দেওয়া হয়, ১ জনের উপর ঢাকা থেকে বহিস্কারাদেশ জারী করা হয়)।
 ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে-৫ জন
এছাড়া মোট জরিমানা, বাধ্যতামূলক টি, সি, বৃত্তি বাতিলইত্যাদি দৈনন্দিন ব্্যাপার। ’৪৮ সালে রাজশাহী কলেজের বিখ্যাত ছাত্রদলন- বিভীষিকার ইতিহাস ভয়াবহ। সোজা কথায় ছাত্রের বিরুদ্ধে তোড়ন, বহিস্কার, গ্রেপ্তারী ইত্যাদি নানা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়। 
পূর্ব বঙ্গের জেলে মোট ছাত্র-বন্দীর সংখ্যা প্রায় ১৫০ জন। এদের মধ্যে আছেন শেখ মুজিবর ও ১২/১৪ বছরের কয়েকজন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী।
জেলে নিহত ছাত্র নেতাদের নাম যথাক্রমেঃ ঢাকা জেলে- কুষ্টিয়ার শিবেন রায়।রাজশাহী জেলে- খুলনার আনোয়ার হোসেন।
ছাত্র ও শিশুদের স্বাস্থ্যে প্রতি কোন দৃকপাতই করা হয় না। ঘৃণিত গচাইলড লেবারের সংখ্যা বিস্ময়কর অনুপাতে বৃদ্ধি পেয়েছে। তার নজীর সিলেটের চা বাগানে, সদরঘাটের হকারদের ভীড়ে, তার নজীর ষ্টীমার ও ষ্টেশনের কুলী বস্তীতে, কাঁচ ইত্যাদির কারখানায়। এই আমাদের দেশের শিশু।
১৯৪৮ সালের মাঝামাঝি পূর্ব পাকিস্তান অধ্যাপক শিক্ষা সংকটের কথা উল্লেখ করেন এবং এ ব্যাপারে সরকার আদৌ সচেতন কি না জিজ্ঞাসা করায় উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, শিক্ষা বিভাগের এক্সপার্টরা যে প্লান দিচ্ছেন তা ব্যয়বহুল, কিন্তু সরকারের হাতে টাকা নাই। কাজেই কিছু করা যাচ্ছে না। তখন একজন অধ্যাপক প্রশ্ন করেন যে, সরকার কেন বিনা খেসারতে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ না করে জমিদারকে কোটি কোটি টাকা নগদ জোগাচ্ছেন? সরকার কেন অতিরিক্ত মুনাফার এবং ব্যবসাকর ইত্যাদি বসিয়ে ঐ সকল অর্থ জনস্বার্থে কল্যাণকর পথে, শিক্ষা সম্প্রসারণের পথে ব্যয় করছেন না? প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যান। যে কোন প্রকার ব্যাপক গঠনমূলক পরিকল্পনা কার্যকরী করতে হলেই আজ মুনাফা শিকারীদের অতিরিক্ত মুনাফায় টান পড়ে। তাই সরকার সব কম শিক্ষা সংস্কারের পরামর্শই ধামা-চাপা দিয়ে জমিদার ও মুনাফাখোরদের স্বার্থ সযতেœ রক্ষা করে চলেছে। 
পূর্ব বাংলার শিক্ষাকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র
বাংলা ভাষা বিরোধী চক্রান্ত আজ চারদিক থেকে পাকিয়ে তোলা হয়েছে। ১ নম্বর-ঢাকা রেডিও ও “মাহে নও” এর মারফৎ মীজানুর রহমান পরিকল্পিত উর্দু মিশ্রিত এক বিকৃত বাংলার প্রচলন। এ এক অভিনব ফন্দী। বাঙ্গালীর কৃষ্টি, বাঙ্গালীর রুচিবোধকে পিষে মারতে ভাষার উপর ছুরি চালানোর এক জঘন্য অত্যাচারের অস্ত্র। ২ নম্বর- আরবী হরফে বাংলা লেখার ষড়যন্ত্র। বাংলা ভাষার অস্তিত্বের গোড়াটিতে আঘাত হানতে সরকার অবিচল ভাবে সুনির্দিষ্ট পথে এ ঘৃণ্য পরিকল্পনা কার্যকরী করার দিকে এগিয়ে চলেছে। জনসাধারণের টাকা এভাবে অপব্যয় করে খরচ জোগান হচ্ছে আরবী হরফে লেখার ১৭টি পরীক্ষমূলক কেন্দ্রের। বিশেষজ্ঞ কমিটি ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে অবিলম্বে চালু করার যে সুপারিশ দাখিল করেছিল তাও কেন্দ্র থেকে নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। 
প্রাদেশিক সরকারের বাজেটের চেহারা দেখলে এই আক্রমণের অর্থ আরো পরিষ্কার হয়ে যায়। বাজেটের শতকরা মাত্র ৫,২৬ ভাগ দেওয়া হয়েছে শিক্ষা-খাতে, আর মিলিটারী ও পুলিশ খাতে গিয়েছে ৭২ ভাগ।
এই বিভিন্নমুখী আক্রমণ ব্যর্থ করে শিক্ষা ও জাতীয় স্বার্থকে রক্ষা করতে হলে আমাদের গড়ে তুলতে হবে লৌহদৃঢ় ছাত্র ঐক্য এবং ছাত্র-শিক্ষক বুদ্ধিজীবী ও সকল দেশপ্রেমিক জনসাধারণের সম্মিলিত জাতীয় প্রতিরোধ দুর্গ।