সামরিক আদালতে জবানবন্দি

ফন্ট সাইজ:

স্পেশাল মার্শাল লকোট নং ৭ এ প্রদত্ত ৩৪২ সি.আর.পি, সি-র অধীনে ৮ই অক্টোবর ১৯৮৪ জনাব অলি আহাদ এর জবানবন্দীর বঙ্গানুবাদ

মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়,
আমি নির্দোষ।
আক্রোশ চরিতার্থ করার হীন উদ্দেশ্যেই এ মিথ্যামামলা আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে। ভারত সরকারের সম্প্রসারনবাদী পরিকল্পনাকে তরান্বিত করার সপক্ষে বর্তমান সরকারের নতজানু নীতির বিরুদ্ধে আমার আপোষহীন ভূমিকা এবং আমার সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকার মাধ্যমে প্রশাসনের উচু তলার দূর্নীতি সম্পর্কিত লেখনীই এ মিথ্যা মামলা সাজানোর মৌল কারণ। আমার পত্রিকায় প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের গুলশানের বাড়ীর ছবি ছাপানো হয়েছিল। ছবি সম্বলিত সে সংখ্যায় এবং এ মামলায় পেশকৃত পত্রিকার অন্যান্য সংখ্যার মধ্য দিয়ে পত্রিকার ভূমিকা অত্যন্ত পরিস্ফুট।
    বেআইনীভাবে মামলাটিকে চীফ মেট্্েরাপলিটন ম্যজিষ্ট্রেটের কোর্ট থেকে এ বিশেষ সামরিক আইন আদালতে আনা হয়েছে। এমনকি রেকর্ডকৃত তথ্য থেকেও এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে মামলাটি মিথ্য ও বানোয়াট; সর্বোপরি গত ৩রা অক্টোবর ৮৪ এক সরকারী আদেশে সাপ্তাহিক ইত্তেহাদের প্রকাশনাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
    উপরোক্ত বক্তব্য ছাড়াও আপনার অনুমতিক্রমে আরও কিছু বলতে চাই। শুনেছি, এক আদেশ বলে স্থির করা হয়েছে যে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের বিশেষ নির্দেশ ছাড়া সামরিক আইন বিধির অধীনে বিচার অনুষ্ঠিত হবে না। মনে হয়, আমার বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা ক্রোধ ও আক্রোশ প্রসুত এক ব্যতিক্রম। কিন্তু এ ব্যতিক্রমধর্মী ব্যবস্থা আমাকে বিস্মিত করে নি। একদিকে স্বৈরশাসকের ্ৎপীড়ন অন্যদিকে অগনিত মহৎ ব্যক্তিত্বের অবর্ননীয় আত্মত্যাগের ভুরি ভুরি নজীর ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা রয়েছে। অত্যাচারের বেদীতে নিঃশংক আত্মত্যাহারে ভিত্তিভূমিতেই গড়ে উঠেছে মানবীয় মূল্যবোধ ও সভ্যতার সুরম্য প্রাসাদ। সৃষ্টির আদি প্রত্যষ থেকেই শুরু হয়েছে ক্রুসেডারদের বিবা-সংকুল অভিযাত্রা, সভ্যতার অগ্রযাত্রার বেদীমুলে উৎসর্গীকৃত হয়েছেন। অগনিত মহৎ প্রান, অনেকের ভাগ্যে নেমে এসেছে উৎপীড়ন, আক্রোশ আর নির্যাতন কিন্তু কাফেলার অব্যাহত অগ্রযাত্রা বিঘিœত হয়নি, ভবিষ্যত বংশধরদের জন্যে তাঁরা উপহার দিয়ে গেছেন সভ্যতার মূল্যবান স্তম্ভ সমৃহ। অনাগত সভ্যতার জন্য তাঁরা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। এটা এক সদাপ্রবাহমান চিরন্তন ধারা আত্মত্যাগের অনির্বান আদর্শ পরবর্তী বংশধরদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ঘৃন্যে ও নীচ মানসিকতাসম্পন্ন ইতিহাসের খলনায়করা এ অভিযাত্রাকে স্তব্ধ করতে পারে নি। মহান প্রচারক, রাজনীতিক কিংবা মূল্যবোধের প্রবক্তারা তাঁদের বিশ্বাসের বিনিময়ে পার্থিব খ্যাতি ও প্রেক্ষিতে আমি অতি নগন্য কিন্তু সভ্যতার সেই প্রার্থিত মান ও গুনগত মর্যাদাকে সমুন্ন রাখার লক্ষ্যে যে মহান অভিযাত্রীরা আজও এই রৌদ্রস্নাত পৃথিবীতে বেঁচে আছে, আমি তাঁদের সেই অভিযাত্রার একজন অংশীদার। আমার কাছে ন্যায়ের সপক্ষে আত্মত্যাগের দুর্নিবার প্রেরনা এক অতীন্দ্রির সুষমায় অভিষিক্ত।    এখানে আমার সাথে আরও চারজন আছে, যারা তারুন্যের প্রদীপ্ত চেতনায় উজ্জীবিত। মৌল প্রশ্ন হচ্ছে, আমাকে সামরিক আইন বিধির অধীনে গ্রেপ্তর ও বিচার করার জন্য প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের এতটা আক্রোশের কারণ কি? ক্ষমতার শীর্ষদেশে অধিষ্ঠিত গুটি কতক ব্যক্তি বোধ হয় এই নিরেট সত্য বিস্মৃত হয়েছেন যে, তাদের চাকুরী প্রাপ্তি, প্রমোশন কিংবা বর্তমান অবস্থানের জন্য তারা আমাদের মত রাজনীতিকদের কাছে ঋণী, যারা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছেন। ‘৪৭ সালে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানের অভ্যুদয়ের ফলেই লেঃ কর্নেল আইউব খান ত্বরিত প্রমোশন পেয়ে রাতারাতি জেনারেল হতে পেরেছিলেন।
    অকৃতজ্ঞ আইউব খান তাঁর হাতে ন্যস্ত বন্দুক-ক্ষমতার মাধ্যমে সংবিধানক সরকারকে উৎখাত করে, এমনকি পাকিস্তানের স্রষ্টাদের উপর চাপিয়ে দেয় নির্যাতনের ষ্টিমরোলার এবং এর মধ্য দিয়েই পাকিস্তান বিভাজনের বীজও বপন করে। যদি কায়দে আজমের নেতৃত্বে রাজনীতিকরা পাকিস্তানের জন্ম না দিত, যদি দিল্লী সরকারই থাকত ‘অখন্ড ভারতের ভাগ্য নিরন্তা তাহলে লেঃ জেঃ এরশাদ তো দূরের কথা জেনারেল আইয়ুবেরমত ব্যক্তিবর্গও যে ঐশ্বর্য ও মর্যাদা ভোগ করেছেন বা করছেন তা তাদের ভাগ্য জুটত না। ভারতীয় দেশরাক্ষাবাহিনী রাজনীতিকদের ভূমিকা যেভাবেচ অনুধাবন করতে পেরেছেন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জেনারেলরা তা পারেন নি; ফলে সবকিছুকেই তারা লন্ডভন্ড করে ফেলেছেন। সে কারণেই শত বিচ্যুতি সত্বেও ভারত আজকের দিন পর্যন্ত সুয়েজের পূর্ব প্রান্তে গণতন্ত্রের এক সুরক্ষিত দূূর্গ।
    প্রাক ’৪৭ থেকেই রাজনীতিবিদদের অবর্ণনীয় ত্যাগ স্বীকারের ফল শ্র“তিতেই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধচলাকালে এইচ, এম, এরশাদ ছিলেন একজন লেফটেনান্ট কর্নেল, বাংলাদেশ সৃষ্টিতে তাঁর কোন অবদান নেই। এমন কি ’৭১ সনের ভয়াল ও রক্ষক্ষরা মুক্তিযুদ্ধের সময় অত্যন্ত চতুরতার সাথে তিনি সৈয়দপুর (রংপুর) থেকে তদানিন্তন পশ্চিম পাকিস্তানে বদলীর ব্যবস্থা করেছিলেন, উদ্দেশ্য ছিল ঝুঁকিপূর্ণ রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করা, কিন্তু বাংলাদেশের জন্মের পর অবাঞ্ছিতভাবে ত্বরিত প্রমোশন পেয়ে তিনি লেফটেনান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছেন, পরে তাঁকে সেনাবাহিনী প্রধান নিয়োগ করা হয়। জনশ্র“তি আছে, ৭১ সালের ১৫ই এপ্রিল তিনি তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন, আবার ৩০শে এপ্রিল (৭১) করাচী ফিরে যান। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার অনুরোধ সত্বেও তিনি তা করেন নি। ঘটনার সত্যতা পারলে তিনি অস্বীকার করুন।
    সেনাবাহিনীর চেইন অব কম্যান্ডের প্রধান থাকার সুযোগে এবং তাঁ হাতে ন্যস্ত বন্দুক ক্ষমতার পুরোপুরি সুযোগ গ্রহণ করে তিনি ১৯৮২ সনের ২৪শে মার্চ সমগ্র সংবিধানিক সিষ্টেমকে পদদলিত করে সামরিক অভুত্থান ঘটান। নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করে, সামরিক আ্ন জারি করে দেশ ও জাতির উপর চাপিয়ে দেন তার স্বৈরশাসন।
    জনাব চেয়ারম্যান, করাচী ও রাওয়ালপিন্ডির শাসকদের সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সুতরাং এ সম্পর্কে কোন উল্লেখ বা মন্তব্য নি®প্রয়োজন।
এখানে একটি তথ্যের অবতারনা বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ‘৮১ সনের নভেম্বরে তাঁর ষ্টাফের একজন কর্নেলের মাধ্যমে সেনাভবনে আহুত সম্পাদকদের এক সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য আমাকে আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন। বিনম্র ভাবে অথচ দৃঢ়তার সাথে সে আমন্ত্রন আমি প্রত্যাখ্যান করি। কারন দেখিয়ে বলিছিলাম যে, একজন সরকারী চাকরে হিসেবে দেশের প্রেসিডেন্ডের অনুমতি ব্যতিরেখে শান্তকালীন সময়ে (ফিচ টাইম) পত্রিকার সম্পাদকদের সম্মেলন ডাকার সাংবিধানিক অধিকার তাঁর নে॥ সার্ভিস কোডকে নিদারুনভাবে লঙ্খন করে তিনি ’৮৯ সালের শরৎকালে (২০.১১.৮৯ এবং ২৭.১১.৮১) ভারতীয় সাংবাদিক ও দেশীয় পত্রিকার সম্পাদকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য পেশ করেন। একাধিকবার অনুরোধ সত্বেও আমি এতে যোগ দেই নি।
    ১৯৮৯ সনের ১৫ই নভেম্বর বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই লেঃ জেঃ এরশাদের আচরন দেশপ্রেমিক, প্রজ্ঞাসম্পন্ন ও তথ্যাভিজ্ঞ মহলের কাছে সন্দেহের বিষয় ছিল। নির্বাচিত সরকার এবং সংবিধান উৎখাত করার জন্য যেন তিনি প্রয়াসী না হন সেজন্য পরোক্ষভাবে তাঁকে সতর্ক করে দেয়া আমার কর্তব্য বলেই মনে করেছি। সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছি, এই প্রয়াসে হয়ত তার সাময়িক ব্যক্তিগত সুবিধা হবে কিন্তু সমগ্র জাতির ভাগ্যে নিমে আসবে বিপর্যয়; পরিণতিতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংবিধানিক কাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে-সেটাই আজ ঘটেছে।
    সংবিধান বহির্ভূত পন্থায় ক্ষমতা দখলের পর থেকেই প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আমার বিরুদ্ধে তার অভিসন্ধি চরিতার্ঘ করার আয়োজন শুরু করেন। স্পেশাল পাওয়ারস এ্যাক্টের অধীনে আমাকে গ্রেপ্তার করে মাননীয় সেশনস জজের স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য নেয়া হয় কিন্তু তার দুভ্যাগ্য স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল আমাকে সসম্মানে মুক্তি দেন। তারপর আমাকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সচিবালয়ে (সাবেক পার্লামেন্ট হাউস, তেজগা, ঢাকা) লেঃ কঃ ফকির সালাহউদ্দিন সমীপে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। আমার পরবর্তী পরীক্ষা ছিল স্বরাষ্ট সচিব জনাব এম,কে, আনোয়ারের সামনে উপস্থিত হয়ে আমার আচরন ব্যাখ্যা করা। লক্ষ করুন, কি ধরনের হয়রানির শিকারে আমাকে পরিণত করা হয়েছে? আমি খোদাভীরু কিসের পরোয়া আমার?
    ৮২ সনের সেপ্টেম্বরে আমার সাপ্তাহিক ইত্তেহাদের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়, ৮৩ সনের নভেম্বরে গ্রেপ্তার করে আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং আমার ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে মামলা শুরু করে। গণআন্দোলনের চাপের মুখে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট আমাদের মুক্তির আদেশ দিতে এবং আনীত মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে সংলাপ শুরু হয়। ক্ষমতাসীন জেনারেলদের সাথে প্রাক সংলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে তাদের উদ্দেশ্যে আমাকে বলতে হয়েছিল যেহেতু ক্ষমতালিপ্সায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ফেলেছেন সেহেতু আপনাদেরকেই সাংবিধানিক নীতিমালার মধ্যে ফিরে আসতে হবে অন্যথায় দেশের সংবিধানকে নিদারুনভাবে লঙ্ঘন করার অভিযোগে আপনাদেরকে বিচারের সম্মুখিন হতে হবে, প্রশাসনের সাথে জনসাধারণের সহজাত আবেগমথিত সম্পৃক্ততা কেবল মাত্র ৭২ সংবিধানের পুনরুজ্জীবন ও নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা প্রত্যর্পনের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব। অন্যথায় দেশের ভাগ্যে থাকবে নৈরাজ্য ও উচ্ছৃংখলতা যা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কোন দেশপ্রেমিকের কাছে কাম্য হতে পারে না।
উপরোক্ত ঘটনাবলীই সরকার পক্ষের বিভিন্ন দলিল পত্রে বর্ণিত মিথ্যা, বানোয়াট, আক্রোশজনিত ও উদ্দেশ্য প্রনোদিত অমর্যাদাকর অভিযোগ নামক কাহিনীর ভিত্তিতে আমাকে গ্রেপ্তার করা ও বিচার অনুষ্ঠানের পটভূমি। আত্মপ্রবঞ্চনায় বিমোহিত একজন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশী কিছু আশা করা যায় না। কামনা করি, আল্লাহ তাঁর সহায় হোন ও আলোর পথ দেখান। যে ভদ্রলোক লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে অধিষ্ঠিত হয়ে দেশরক্ষবাহিনীকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবমাননা করেছে তাঁকে কে বোঝাবে? কোয়েটার অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে প্রশিক্ষন প্রাপ্ত তিনি, লেঃ কর্ণেল র‌্যাংকের উর্দ্ধে ্ন্নীত হওয়ার কোন যোগ্যতা তাঁর ছিল না। কিন্তু নির্মম পরিহাস তিনি আল লেফটেনান্ট জেনারেল।

মাননীয় চেয়ারম্যান,
    আপনার সামনে আমাকে উপস্থিত করানোর পটভূমি যাতে আপনি অনুধাবন করতে পারেন সে জন্য আমি আরও কিছু কথা বলতে চাই। ‘৮২ সনের জুনে ঢাকা টেলিভিশনে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দেয়া সাক্ষাৎকারের কতিপয় বিবৃতির সত্যতা সম্পর্কে আমি আমার সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ প্রশ্ন তুলেছিলাম; আমি তাঁর গুলশানের বাড়ীর নির্মান সম্পর্কেও প্রশ্ন করেছিলাম। সমগ্র রাজনৈতিক জীবন ধরে আমি বিভিন্ন সরকারের বিরুদ্ধে নীতি ও নীতি আশ্রয়ী রাজনীতির ভিত্তিতেই সংগ্রাম করেছি, কখনই ব্যক্তিগত কারণ কিংবা ব্যক্তি স্বার্থে বিরোধিতা করিনি। এটা আমার মর্যাদাবোধ, সততা ও সম্মানের পরিপন্থী।

নীতিগত পশ্নে আমার দৃঢ় ভূমিকা আমার সহোদরদের জন্যও ডেকে এনেছে ভোগান্তি। ভারতের সেবাদাস শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি আমার অনুজকে (উচ্চ সরকারী পদে অবিষ্ঠিত, সাবেক সি, এস, পি) জুলুমের শিকারে পরিণত করার পদক্ষেন নিয়েছেন, এমন কি সংস্থাপন বিভাগ ও জেনারেল এরশাদ নিয়োগকৃত ক্যাবিনেট সাব কমিটির তাঁর প্রাপ্য পদে নিয়োগের সুপারিশ সত্ত্বেও। সত্য ঘটনা উপস্থাপনের  স্বার্থে আমাকে বলতেই হয়, যদিও ১৯৭৬ সনে তকদানন্তন প্রেসিডেন্ট বিচার পত এ.এস.এম সায়েম আমার কথিত অনুজকে এডিশনাল সেক্রেটারী পদে নিয়োগ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে দিয়েছিলেন। তবুও জেন ারেল জিয়াউর রহমান তার প্রবর্তিত মার্শাল ডেমোক্রেসির প্রতি আমার নীতিগত বিরোধিতার কারণে তার নিয়োগ গেজেট না করার সিদ্ধান্ত নেন, এমন কি ১৯৮০ সালের ২৯-৩০শে মে রাত্রে নিহত হওয়া পর্যন্ত এ নিয়োগ গেজেট করা হয় নি। বিনা অপরাধে অযোগ্য চক্রান্তকারী শাসক ও প্রশাসকদের হাতে নির্যাতন ভোগের কি নির্মম পরিহাস। দিল্লী সরকারের কাছে বাংলাদেশেকে বিকিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আমার কঠোর ও আপোষহীন ভূমিকার জন্য আমার উপর নির্যাতনের ষ্টীম রোলার চাপিয়ে দেয়া ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেক মুজিবর রহমানের আক্রোশ নিম্নে বর্ণিত আমার সহোদরদের উপরও নিপাতিত হয় ঃ
(ক) জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা এ.কে.এম .এ সাত্তার, সাবেক পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অপট করেন।
(খ) দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আজিজুর রহমান, সাবেক পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অপট করেন।
(গ) অগ্রজ মরহুম ডঃ আবদুল করিম, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীন অব ফ্যাকল্টি অব এগ্রিকালচার একজন পোষ্ট ডক্টরেট নাফিল্ড স্কলার।
(ঘ) অনুজচ আমিরুজ্জামান সাবেক সি.এস.পি তিনিও বাংলা দেশের পক্ষে অপট করেন।
    ক্ষমতাসীন ব্যক্তির প্রতি সহোদরদের মধ্যে কেউ নীতিগত কারনে বিরোধী, সে কারনে সরকারী চাকুরী জীবনে এমন নিষ্ঠুর নির্যাতনের ঘটনা টোটালিটারিয়ান, কমিউনিষ্ট নাজী বা ফ্যাসিস্ট সমাজ ছাড়া অন্য কোন সমাজে অকল্পনীয়। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি সৈয়দ হোসেন সাবেক পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের একজন সেকশন অফিসার থেকে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সরকারের এডিশনাল সেক্র্টোরী পদে উন্নীত হইয়াছিলেন।
প্রধান মন্ত্রীর বোন জামাইর কি তরিত্ব প্রমোশন।
    উল্লেখ্য, ৪৮ সাল থেকে সব কটি সরকার আমাকে নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে কিন্তু আমি কখনই বিবেক বিক্রী করিনি; সে কারণেই আমাকে নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  হতে হয়েছে বহিস্কৃত, বারবার হতে হয়েছে কারারুদ্ধ।
    আবারও বলছি আমি খোদাভীরু, একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে মাথা নত করি না। আমার পরিবারের কেউ, শিক্ষায়তনের কেউ, রাজনৈতিক ইনষ্টিউশনের, কেউ তরুণ বয়সে আমাকে কারও কাছে মাথা নত করার শিক্ষা দেন দিন, যদিও বা তিনি দৈহিক বা আর্থিক শক্তির একচ্ছত্র অধিপতি হন, আকর্ষনীয় বা অভিশপ্ত কোন প্রকার প্রলোভনের কাছেই আত্মসমর্পণ করতে আমি শিখিনি। আমার বিবেক আর আজীবন রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের প্রতি বিশ্বস্থ থেকে আম বলতে চাই যে, তাত্বিক কিংবা আদর্শগত কোন দৃষ্টি থেকেই সামরিক আইন প্রশাসন আমার কাছে গ্রহনীয় নয়; যিনি এটা জারী করুন ন া কেন, হোন তিনি জেনারেল আইয়ুব অথবা জেনারেল ইয়াহিয়া অথবা মেজর জেনারেল জিয়ার রহমান অথবা জেনারেল আবুল মঞ্জুর কিংবা লেঃ জেঃ এইচ, এম, এরশাদ। বিচারাসনে উপবিষ্ট হওয়ার মাননীয় আদালতের ক্ষমতার উৎস হচ্ছে ১৯৮২ সনের ২৪শে মার্চের মার্শাল ল প্রক্লামশন। যেহেতু সামরিক আইন একটি বাস্তবতা, সেহেতু আমাকে মাননীয় আদালতকে মানতে হয়।
    আধুনিক ইতিহাস রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জেনারেলদের অধিষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেছে। তাঁদের শাসন তাাঁদের স্ব স্ব দেশ ও জনগণের জন্য বয়ে এনেছে বিপর্যয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, নবাব সিরাজদৌলার সেনাপতি মীর জাফর আলী খান বাংলাকে দাসত্ব শংখলে আবদ্ধ করার জন্যে দায়ী। এই শৃংখলের পথ ধরেই ভারত ১৯০ বছর পরাধীনতার শৃংখলে শৃংখলিত হয়। নেপোলিয়ান বোনাপার্টি ফ্রান্সের বিপর্যয় ডেকে আনে, জার্মানীর হিটলার সভ্যতাকে ধ্বংস যজ্ঞে পরিণত করে। গণতান্ত্রিক সিষ্টেমেও জেনারেলদের শাসন আকর্ষণীয় কিছ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রোর জেনালেল আইসেন হাওয়ার (আইখ) সোভিয়েত রাশিয়ার আকাশে ইউ-২ গোয়েন্দা বিমান পাঠিয়ে ৬০২ সনে প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য রাষ্ট্রধানদের শান্তি সম্মেলনে বিপর্যস্ত করে ফেলেন, জাপানের জেনারেল তোজো তার দেশ ও জনগণকে উপহার দিয়েছেন পরাজয় আর বিপর্যয়। সাম্প্রতিক কালের সমরনায়ক দের শাসনের ইতিহাস চরম ব্যর্থতার করুণ আলেখ্য। জেনারেল আয়ুব, আর্জেন্টিার জেনারেল গণতিয়ারী, বার্মার জেনারেল নে উইনের শাসন এই নির্মম বাস্তবতারই প্রমাণ গ্রহণ করে।
    আধুনিক মানব সম্পর্কের জটিল আবর্তে মানব সম্পর্কীয় বিষয়াবলী পরিচালনার গুনে বা বৈশিষ্ট্য একজন সমবিশারদের নেই। এর জন্যে প্রয়োজন মানব সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ধ্যান ধারণায় সমৃদ্ধ রাষ্ট্রনায়ক অথবা দার্শনিক রাজা  (Philossopher kings) । দমন করার ধারণা ও প্রশিক্ষণ কখনই বৈদগ্ধ্য ও সেবার স্থলভিষিক্ত হতে পারে না। তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে ক্ষমতাদখলকারী জেনারেলরা রাষ্ট্র পরিচালনার অনিবার্যভাবেই ব্যর্থ হবেন; সাম্প্রতিক ইতিহাসে তার সরব বর্ণনা ভূরি ভুরি।
    আমার শিক্ষা জ্ঞান ও বিবেকের নির্দেশ হচ্ছে যে কেবলমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরই রচিত সংবিধান মোতাবেক রাষ্ট্রপরিচালনার অধিকার রয়েছে এবং সংবিধান প্রসুত কোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ যদি সংবিধানের অংশ বিশেষ লঙ্ঘন করে তবে তাকে আইনানুগ বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। সামরিক আইন প্রশাসনকে মেনে য়োর অর্থ হবে উপরোক্ত বিশ্বাসের সরাসরি পরিপন্থি। উপরোক্ত অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টপ ৭ দলীয় জোট ১৫ দলীয় জোট এ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। বিজ্ঞ আইনজীবিবৃন্দও ’৭২ সংবিধান মোতাবেক বিচার বিভাগের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে লিপ্ত।
    রাষ্ট্র পরিচালনায় সাংবিধানিক আইন পুনঃপ্রতিষ্ঠার মহান সংগ্রামের আমি একজন কর্মী মাত্র। আমি নিজেকে বিপুলভাবে পুরস্কৃত বোধ করব যদি আমার ক্ষদ্র ও বিনীত প্রচেষ্টা দেশে সাংবিধানিক আইন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সামান্যতম অবদানও রেখে থাকে। আমি আবারও জোর দিয়ে বলছি আমি নির্দোষ এবং আনীত অভিযোগের সাথে কোন ভাবেই জড়িত নই।