সুপ্রীম কোর্ট বার আয়োজিত সেমিনারের বক্তব্য

ফন্ট সাইজ:

ইত্তেহাদ সম্পাদক ও ডেমোক্রেটিক লীগ সিনিয়র
সহ- সভাপতি জনাব অলি আহাদের ইংরেজী
নিবন্ধের বঙ্গানুবাদঃ

    মাননীয় সভাপতি, শ্রদ্ধেয় আইনজীবিবৃন্দ, সমাগত মহিলা ও সুধীবৃন্দ

    শ্রদ্ধেয় আইনজীবিদের এই মহতী সম্মেলনে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, সেজন্য আমি নিজেকে সম্মানিত বোধ করছি। এই বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন পেশাজীবি সম্প্রদায় থেকেই উত্থিত হয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পন্ডিত জওহার লাল নেহরু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, এ,কে,এম, ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মত স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব যাঁরা এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান স্থপতি।
    জনাব সভাপতি, আজকের এ সেমিনার অনুষ্ঠানের সাহসী উদ্যোগ এসেছে বিচার বিভাগের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ আইনজীবী সমিতির কাছ থেকে এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই। নিকট অতীতে বর্তমান সামরিক শাসক কর্তৃক তথাকথিত বিকেন্দ্রীকরণের নামে বিচার বিভাগের শ্রেষ্ঠত্ব খর্ব করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, নির্যাতন বরন করেছেন এবং এর মধ্য দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদী শিখাকে প্রজস্বলিত করেছেন; যেমনটি পাকিস্তানে স্বৈরাচারী সেনাপতি শাসনের বিরুদ্ধে করেছেন সেখানকার আইনজীবীবৃন্দ।
    জনাব সভাপতি, আমার মাতৃভূমি থেকে ব্যক্তি স্বাধীনতা নির্বাসিত। সামরিক শাসনকর্তার বুটেÍ তলার নিস্পিষ্ট বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর সেই ৫৬টি (১৯৮২ পর্যন্ত) দেশের একটি যারা সামরিক শাসনের অধীনে দুঃসহ রজনী যাপন করছে। সামরিক শাসনের চেহারা মোটামোটি সর্বত্র এইরূপে অস্ত্রের জোরে গণ আকাংখাকে নস্যাৎ করা, সংবিধানকে ভুলুণ্ঠিত করা, নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা, সংবাদ পত্রের কণ্ঠবোধ করা। আমরা এমন এক দেশের নাগরিক যেখানে ক্ষমতালিপ্সু সেনাপতি ক্ষমতা দখল করেই ক্ষান্ত হননি, ক্ষমতাকে স্থায়ী করার লক্ষ্যে সরকারী কর্মচারী হিসাবে সেনাবাহিনীর একজন সক্রিয় সদস্য থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মানসে আমি কোড সংশোধন করেছিল। আর এই গর্হিত কাজ করা সম্ভব হয়েছিল ক্যান্টনমেন্ট নামক বিশেষ কনস্টিটিউয়েন্সীর বন্দুকের জোরে। নিছক এই বন্দুকের জোরে জনগণের নিকট থেকে বৈধতার ছাড়পত্র আদায়ের এই বিরাট প্রহসনের আয়োজন করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁরই উত্তরসূরী লেঃ জেঃ এইচ, এম, এরশাদ পূর্বসূরীরকে অনুসরণ করলেন। সার্ভিস কোডকে লঙ্ঘন করে দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করলেন। ১৯৭২ এর জনপ্রতিনিধি সমবায়ে গঠিত কনসেম্বলী কর্তৃক গৃহীত সংবিধানকে স্থগিত ঘোষণা করলেন, স্বীয় বশংবদ হিসাবে কর্মরত থাকা এবং তারই ইচ্ছানুযায়ী বরখাস্ত করার শর্তাধীনে দেপের রাষ্ট্র পতি নিয়োগের ঔদ্বত্ম্য প্রদর্শন করলেন, সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে কর্মচ্যুত করলেন-তাও আমার মাননীয় প্রধান বিচার পতি জানতে পারলেন যখন বিচারাসনে উপবিষ্ট ছিলেন। বন্দুকে ক্ষমতার বিভৎস প্রয়োগের মাধ্যমে জনতার সার্বভৌমত্ব এবং বিচার বিভাগের মর্যাদাকে ভুলুণ্ঠিত করার কি ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। অত্যন্ত চাতুর্ষের সাথে উচ্চাভিলাষী সেনাপতি স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার এই ধরনের ঘৃণ্য প্রায়াসে সমগ্র সেনাবাহিনীকে জড়িত করেন। এই ঘৃণ্য প্রয়াসে উচ্চাভিলাষী সেনাপতি সুযোগ গ্রহণ করেন প্রচলিত  “চেইন অব কম্যান্ডের” ডার অর্থ হচ্ছে সেনাবাহিনী উচ্চতর শ্রেণীভূক্ত অফিসারের যে কোন আদেশ নিম্নস্তর অর্থাৎ “জোয়ান” পর্যন্ত পরিপূর্ণ আনুগত্য ও নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়। কারণ সৈনিকদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত নীতি হচ্ছে “আদের্শ পালন করা হয় অথবা মৃত্যুবরণ করা প্রশ্ন করা হয়।” যেহেতু বিনা প্রতিবাদে মান্যতাই হচ্ছে সৈনিকের আচরণের প্রধান মন্ত্র সেহেতু সেনাপতির উচ্চাভিলাষের বেদীমূলে সমগ্র সেনাবাহিনীর মর্যাদা ও খ্যাতি হয় বিপর্য্যস্ত।
    ১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্টের সামরিক অভ্যুত্থান হচ্ছে এক সম্মান জনক ব্যতিক্রম। মেজর র‌্যাংকভুক্ত কতিপয় অফিসার কর্তৃক সংঘটিত সেই সফল অভূত্থান ১৯৭২ সংবিধানের পবিত্রতাকে উর্দ্ধে তুলে ধরেছে, এক দলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। ’৭২ সংবিধানের মূল দলিলে সন্নিবেশিত ক্যানিনেট পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অঅবাধ বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনঃ প্রতিষ্ঠা করে, এবং প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি, এক দলীয় রাজনীতি ও এক দলীয় বাকশালের মাধ্যমে সমর নায়কদের রাজনীতিতে ট্রেনে আনার প্রচেষ্টা বাতিল করে। ১৯৭২ মালে নির্বাচিত পার্লামেন্টের ফ্লোরে ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারী জাতির উপর একনায়কতন্ত্র চাপিয়ে দেয়ার এই পদক্ষেপকে যথার্থই পার্লামেন্টারী ক্যু হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৯৭৫ এর আগষ্টের পট পরিবর্তন বৈশিষ্টগত দিক দিয়ে এক ব্যতিক্রম কারণ একজন বেসামরিক ব্যক্তিত্ব ও পার্লামেন্ট সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমাদকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণে আহ্বার জানান হয়। তিনি আবার নিয়োগ করলেন একটি বেসমারিক সরকার। ঝুঁকি গ্রহণকারী সামরিক অফিসারদের কেহই না হলেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, না হলেন চীফ অব ষ্টাফ বা না হলেন মন্ত্রী সভার সদস্য এমন কি বেসামরিক প্রেসিডেন্টের নীতি ও কার্যক্রম তদারক করার জন্য কোন বিপ্লবী কাউন্সিলও তাঁরা গঠন করেননি। প্রকৃত প্রস্তাবে ‘৭৫ এর আগষ্ট এর পরিবর্তন ছিল এক বিপ্লবী পদক্ষেপ।
    
    জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য নানা ধরনের শ্লোগান দেওয়ার ব্যাপারে সামরিক শাসকরা কম পারদর্শী নন। সকল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে পদদলিত করে ক্ষমতা দখল করার পর পরই তারা জনগণের মেধা সম্পর্কে বক্তব্য পেশ করেন। পরিচালিত গণতন্ত্র (Guylided Democracy), নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র (Controlled Democracy), মৌলিক গণতন্ত্র (BaicDemocracy) প্রভৃতি নানা ধঘরনের কথা বলে গণতন্ত্রের লেবাসে স্বেচ্ছাচারী শাসনকে উপস্থাপনের প্রয়াস পান। এই স্বেচ্ছাচারের সমগোত্রীয় হচ্ছে পৃথিবীর এক বিশাল অংশে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি কিংবা দলীয় একনায়কত্ব যা নাকি কখনও কখনও দুর্নীতিপরায়ন ও নিবর্তনমূলক সরকারের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যূত্থানে মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত অথবা কখনও কখনও সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল যা নাকি বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করা হয় তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। তৃতীয় বিশ্বের এই ক্রুর ক্ষমতা লোভী সামরিক শাসকরা আদর্শিক বিশ্বাস বিবর্জিক একটি বিশেষ শ্রেণী। তারা গণতন্ত্রের আগে পিছে বিশেষণ জুড়ার কাজে বিশেষ দক্ষ-যেমন Neo Democrecy Peooples Democracy কমিনিষ্ট বিশ্বে প্রায়শঃশ্র“ত এই প্রবচন গুলো হচ্ছে জনগণকে তাদের জন্মগত সার্বভৌম অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার এক চতুর ফাঁদ। ইতিহাসে ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত আছে সেখানে জনগণের সার্বভোমত্ব বিনষ্ট হয়েছে সেখানে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বও হয় বিনষ্ট। কম্বোডিয়া, ইস্তেনিয়া, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, বুখারা, সমরকন্দ এবং একনায়ক শাসনাধীন সমগ্র পূর্ব ইউরোপ তাদের স্বাধীনতার উপর বিদেশী শক্তির তদারকির করুন দৃষ্যে প্রত্যক্ষ করছে।
    এবার ফিরে আসা যাক আমাদের নিজস্ব ইতিহাসে। ১৯৪৭ এর স্বাধীনতা আইনের মাধ্যমে এই উপমাহাদেশে দুইটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট আত্মপ্রকাশ করে -ভারত ও পাকিস্তান। এটা ভারতীয় নেতৃবৃন্দের বিশ্বাসের অঙ্গ ছিল যে ভারতীয় সংবিধান মোতাবেক জনসাধারণ বহুদলীয় রাজনীতির মাধ্যমে তাদের সার্বভৌম অধিকার অবাধে প্রয়োগ করবে। এরই ফলশ্র“তিতে ভারত আজ শুধুগণতন্ত্রের এর পীঠভূমিই নয়- বিশ্ব পরিসরে একটি সম্মানিত ও অন্যতম বৃহৎ শক্তি। পক্ষান্তরে পাকিস্তানের দুরদৃষ্টিহীন শাসকবৃন্দ জনগণকে তাদের সার্বভৌম অধিকার থেকে বঞ্চিত করলেন। ফলতঃ জন্ম নিল ক্ষমতার চক্রান্ত। ক্ষমতা লোভী সমরনায়করা লিপ্ত হলেন ষড়যন্ত্রে এবং ক্ষমতার আসন দখল করলেন। এরই কারণে পরিনতিতে পাকিস্তান হল বিভাজিত, পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করল বাংলাদেশ। যদি পাকিস্তানে জনগণ তাদের সার্বভৌম অধিকার অবাধ ভাবে প্রয়োগ করতে পারতেন অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে পাকিস্তান এ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হত না। এটা এক ঐতিহাসিক সত্য যে, জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকার ১৯৭১ সালের নয় মাসের সফল স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিচালনা করেছিলেন। এটা আমাদের প্রতি এক ধিক্কার সমগ্র বিশ্বের প্রতি ধিক্কার যখন লেঃ জেঃ এইচ, এম, এরশাদ সেই সব সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের নামে অজুহাত উপস্থাপন করেন- যারা সম্মুখে সমরে লড়েছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন। ‘৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের দক্ষ ও সম্মানিত সেনাপতি জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী বার বারই ১৯৭২ সংবিধান মোতাবেক পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবী জানাচ্ছেন। অথচ সেই ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধে অনুপস্থিত যোদ্ধা লেঃ জেঃ এইচ, এম, এরশাদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে আওয়াজ উঠান। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ভুলে গেছেন যে, তিনি সংবিধানেরই সৃষ্টি। সংবিধান সর্ব উর্ধ্বে। সংবিধান কর্তৃক সৃষ্ট বিভিন্ন অঙ্গের ভূমিকা সংবিধানেই বর্ণিত আছে, সংবিধান এই বিভিন্ন অঙ্গকে আপন আপন স্তরে নির্দিষ্ট গন্ডীর মধ্যে ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়েছে। সেই সংবিধানিক নীতিকে লঙ্ঘন করে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ক্ষমতা দখল করলেন, সংবিধান স্থগিত ঘোষণা করলেন, বিচার বিভাগকে অবমাননার শিকারে পরিণত করলেন আবার তিনিই গণতন্ত্রের বুলি আওড়ান।
    যা নাকি অন্য কোন ইউনিটারী দেশে নাই তাই তিনি করেছেন। হাইকোর্টের বিকেন্দ্রিকরণ করা হয়েছে- সর্বোচ্চ বিচারালয়কে একটি সাধারণ বস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। এটা উৎসাহ ব্যঞ্জক ও অভিনন্দন যোগ্য যে, দেশ প্রেমিক ও জ্ঞানী আইনজীবিবৃন্দ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উপর এই হস্তক্ষেপকে প্রতিবাদহীন যেতে দেননি। তাঁরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং এ প্রতিবাদ নিয়ে এসেছে নির্যাতন। সমরনায়করা বিচার বিভাগকে ভীতির চোখে দেখেন কারণ স্বাধীন বিচারবিভাগ হচ্ছে সামরিক শাসন কর্তার স্বেচ্ছাচারের পথে এক বিরাট বাধা এবং সেজন্যই জনগণের মৌলিক অর্ধিকার সংরক্ষণের স্বপক্ষে এই বিশাল প্রাচীরকে অপসারিত করা হয়েছে।
    এটা অনস্বীকার্য যে, এমন এক অবস্থায় যখন অত্যাচারের শাণিত তরবারি মাথার উপর উদ্যত, রাজনৈতিক দলগুলোর মুখ বন্ধ তখন রাষ্ট্রনায়কের পবিত্র দায়িত্ব বর্তায় সংবাদপত্রের উপর। কারণ স্বাধীনতার স্বপক্ষে সংবাদপত্র হচ্ছে এক অত্যাবশ্যক অস্ত্র এবং সেজন্যই ক্ষমতাদখলকারীর কাছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিষবৎ। একটি ক্ষুদ্র পত্রিকা হওয়া সত্ত্বেও ইত্তেহাদ সামরিক শাসন জারী সংবিধানে বর্ণিত সীমা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক কর্তৃক লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠানোর নৈতিক দায়িত্ব বোধ করে। সেজন্যেই কল্পনাপ্রসুত কারণে তথাকথিত সর্বাজ্ঞ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক কর্তৃক জারীকৃত স্বেচ্ছাচারী আইনকে উপক্ষো করে ইত্তেহাদ সার্বভৌম জনগণের কাছে গণতান্ত্রিক নীতিমালার একটি সৎ ও নিষ্ঠাবান বাহক হওয়ার সকল প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। সকল প্রকার ব্লেকমেইল, তোষামোদ এবং জাগতিক সুবিধা আদায়ের কুৎসিৎ প্রতিযোগিতা থেকে ইত্তেহাদ দূরে থাকে। দেশ প্রেমিক ও বিবেক প্রসুত ভূমিকা পালন করতে গিয়ে এই পত্রিকা মুহুর্তের তরেও কোন চাপ ও ভীতি প্রদর্শনের কাছে নতি স্বীকার করে নি।
    সাংবিধানিক সরকারকে পদদলিত করে বন্দকের শাসন গ্রহণ করতে ইত্তেহাদ অস্বীকৃতি জানায়। এটাই সামরিক শাসনকর্তাদের ক্রোধের কারণ। এরই ফলে ইত্তেহাদের সম্পাদক হিসাবে আমাকে ১৯৮২ সনের ২৬ শে এপ্রিল রাত আট টায় লেঃ কঃ শাহ ফকির লালাউদ্দীনের সাথে সি.এ.এল.এ হেডকোয়াটারে এবং এর পরে ২৭ শে জুলাই ১৯৮২ সকাল ৯ টায় বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিবের সাথে সাক্ষাৎ করার তলব পাঠান হয়। জনতার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের আনুগত্য ও নিষ্ঠার পরিমানে সন্ত্রস্থ হয়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের এক আদেশ বলে গত ১লা সেপ্টেম্বর (১৯৮২) ইত্তেহাদের পরবর্তী সংখ্যা সমূহ প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা হয়। এটা দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যেখানেই স্বেচ্ছাচার সেখানেই এ ধরনের ঔদ্ধতের শিকার হয় সৎ ও দেশপ্রেমিক পত্রিকা। সত্য কথা, জয়যাত্রা, খবর, সোনার বাংলা একই পরিনতির শিকার। দ্ ুএকটি সমকালীন দৃষ্টান্ত হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। নিকারাগুয়ায় স্যান্ডনিষ্ট বিপ্লবীদের অগ্রাভিযানের সম্মুখে পলায়নপর ডিকেটটর এনাসটিসিও সমোজার এজেন্টরা বিরোধী পত্রিকা লা প্রেমসার মালিক সম্পাদক পেডরা জোয়াকুইন কামোরোকে ১০ই জানুয়ারী (১৯৭৮) হত্যা করে। তুরস্কের ইস্তাবুল থেকে প্রকাশিত কাম হুরিয়েট নামক খ্যাতনামা দৈনিকের প্রকাশক এবং প্রধান সম্পাদকীয় রচনাকারী এবং সেখানে ডীন অব জার্নালিজম হিসেবে পরিচিত মিঃ নাদের নাদির সামরিক আদালতে বিচার হচ্ছে। ফার ইষ্টার্ন ইকনমিক রিভিউর প্রতিনিধ মিঃ সালামত আলী খানকে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউল হক সরকার কারাগারে নিক্ষেপ করেছে।

    আজ দেশের ভাগ্য অনিশ্চিত অবস্থায় নিপতিত। ক্ষমতা দখলের পরিণতি সম্পর্কে অজ্ঞ অথবা বিস্মৃত সামরিক আইনের প্রধান পুরোহিত দেশকে এক সংগীণ অবস্থায় নিয়ে এসেছেন। সমরনায়কের বুটের তলায় নিষ্টিষ্ট পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশের নেতা মিঃ ওয়ালি খানের একটি মন্তব্য অবস্থার বিশদ অনুধাবনের জন্য উদ্ধুত করা যথার্থ বলে মনে করছি। দেশ পরিচালনা একটি সার্বক্ষণিক কাজ, দেশ রক্ষ একটি সার্বক্ষণিক কাজ, জনমতের প্রতিধ্বনি করা একটি সার্বক্ষণিক কাজ, তার পূর্বসূরী জেনারেল আইয়ূব ও জেনারেল ইয়াহিয়ার মত বিচক্ষনতাবজিত সেনাপতি জেনারেল জিয়া অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন যে জনগণের সমালোচনা ও বিচার বিবেচনা হইতে মুক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ কি অশুভ পরিণতি ডেকে আনে এমন একটি অবস্থা দেশকে কেবল এমন এক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয় -যখন প্রতিকারের উপায় থাকে না।

    শেষবারের মত ক্ষমতা লিপ্সু সমরনায়ককে সন্বিৎ ফিরিয়ে আনতে হবে-তাকে এটা স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে মানুষের উপর আইনের শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে সভ্য সমাজের নিদর্শন। আর সামরিক বাহিনীর উপর বেসামরিক কর্তৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে গণতন্ত্রের মৌল উপাদান। জেনারেল সাহেব নিজের ও দেশের জন্য ভাল করবেন যদি থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী থেকে তিনি উপদেশ গ্রহণ করেন-গত ১৮ই এপ্রিল (৮৩) এর সাধারণ নির্বাচনে জনতার সার্বভৌমত্ত্বের স্বপক্ষে জনতার রায় সেখানে ঘোষিত হয়েছে।

    অধিক বিলম্ব হওয়ার আগেই, কোন সাহসী এবং ত্যগী ব্যক্তিত্ব অথবা সাহসী শ্রেণীর এগিয়ে এসে এই বন্দুরে ক্ষমতাধারী জেনারেলের পদচারণার ইতি টানার আহ্বান জানাতে হবে। এই ক্ষমতা লেপ্সু জেনারেলের আচরণ সেনাবাহিনীর আচরনকেও বিনষ্ট করবে যা নাকি অধীনাতামূলক মিত্রতার মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেয়ার প্রয়াসের বিরুদ্ধে এক দুর্ভেদ্য প্রতিরোধের দুর্গ হিসেবে চিহ্নিত। আমরা বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছি। সুতরাং আমাদের হৃদয় ভেঙ্গে যায় যখন আমরা দিব্য চোখে দেখি সহসাই জনতা ও সেনাবাহিনী এক সর্বনাশা সংঘর্ষে লিপ্সু হবে যেমনটি হয়েছে জেনারেল ইয়াহিয়ার শাসনামলে। আমরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারি না। এবং এ অশুভনীলনকশার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে। সবচাইতে বড় প্রয়োজন, চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব এগিয়ে আসুন ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন। গণতন্ত্রের প্রশ্নে যেহেতু আইনজীবিরা সচেতন সেহেতু আইনজীবি সম্প্রদায়কেও এ অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে যা নাকি এককভাবেই জনতার সার্বভৌম অধিকার খর্বকরার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সমগ্র দেশে এক বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে।
    হীরক উজ্জল ও হীরক দৃঢ় প্রত্যাশা নিয়ে আমি উপসংহারে বলব মহান জয়প্রকাশ নারায়ণের মানসিকতাও সাহস নিয়ে কেউ একজন আসবেন যিনি জনগণকে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সংরক্ষণে উজ্জীবিত করবেন যেমনটি করেছিলেন শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণ ১৯৭৫ এর ভারতে জরুরী অবস্থাচলাকালীন সময়ে। জনাব সভাপতি, আমি প্রার্থনা করি, ন্যায় বিচার ও গণতান্ত্রিক আদর্শ সমৃদ্ধ সমাজে যাতে আমরা বাস করতে পারি সে মহান লক্ষ্যে নিবেদিত আপনাদের মহৎ ও উৎসাহব্যঞ্জক প্রচেষ্টা সফলতামন্ডিত হবে।

অলি আহাদ
২০-৫-৮৩ ইং

[বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবি সমিতি আয়োজিত ‘গণতন্ত্র পনঃ প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা” শীর্ষক সেমিনারে ২০-৮-৮৩ ইং তারিখের বৈকালিক অধিবেশনে প্রদত্ত ইংরেজী নিবন্ধের বঙ্গানুবাদ]