এই ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে জাতি রুখিয়া দাঁড়াও

ফন্ট সাইজ:

শুক্রবার, ২৪শে এপ্রিল ’৮ -    অলি আহাদ


বিদ্রোহী কমি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় মানুষের মহত্ব সম্পর্কে আশাবাদী ইইয়া বড় গলায় ঘোষণা করিয়াছিলেন, “হয়তো তোমাতে এসেছে মেহেদী ঈসা”। কিন্তু আজ বিংশ শতকের প্রান্তিক প্রহরে দেশের তরণ সমাজের প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলিতে হয়, “হয়তো তোমাতে এসেছে পাচপাত্তূ আর আমাদের ঘরে লুকায়ে এসেছে খোকা।” কিন্তু হায়, এরা দু’জনই আমাদের তরুণদের একমাত্র উপাস্য নয়। আমাদের তরুণদের মধ্যে এদের চেয়েও রক্তহিম করা কাণ্ড-কারখানার নায়কদের স্বাধীনতার পর  স্বাধীন মুক্ত সমাজ প্রত্যক্ষ করিয়াছে। পাকিস্তানে আইয়ূব মোনেমী আমলে তরুণদের মধ্যে সঞ্চারিত বিষ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডীর মধ্যে, ছাত্র রাজনীতির মধ্যে অনেকখানি সীমিত ছিল। সেখানে শিক্ষক লাঞ্ছনা, হলের কক্ষে কক্ষে সুরার স্রোত অলক্ষ্যে বহিয়া যাইত। ছোরা আর হকিষ্টিক ছিল প্রধান অস্ত্র। আজ ষ্টেন, পিস্তল, বোমা আসিয়াছে স্বাধীনতার বদৌলতে। একদিন পাকিস্তানীদের আদর্শের অভিশাপকে সবকিছুর জন্য দায়ী করিয়াছি। বাঙালীর বুদ্ধি চিরদিনই পরের ছিত্রান্বেষনে আনন্দ পায়।
    বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর পরই শেখ মুজিবের শাসনামলে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম হইতে “রাব্বি জিদনী এলমান” শব্দগুচ্ছ উঠাইয়া দেওয়া হয়, তখনই আমরা অনাগত অশুভের আশংকায় আশংকিত হইয়াছিলাম, তখনই আমরা বুঝিয়াছিলাম যে, বিশ্ববিদ্যালয় ব্যভিচার কবলিত হইবে, বিশ্ববিদ্যালয় অস্ত্রের ঝনঝনাতি প্রকম্পিত হইবে। বিদ্যাপীঠ বধ্যভূমিতে পরিণত হইবে। তালা লাগাইয়া বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করিবার মহড়া চলিবে। কথাটা শুনিলে অনেকে আৎকাইয়া উঠিবেন যে, আমাদের স্বাধীনতার পাপবিদ্ধ আদর্শের পাশাপাশি ছিল, দুর্নীতিগ্রস্ত উচ্চাভিলাষী একটি শ্রেণীর বাঙালী তথা পাঞ্জাবীদের প্রভুত্ব মুক্ত হইয়া তাদের স্থান দখল করা। যে শ্রেণী এখানে পাঞ্জাবী তথা অবাঙালী পশ্চমা শাসকদের সহায়তায় ধানমণ্ডীর অভিজাত এলাকায় জাতে উঠিয়াছে, তাদেরই স্বাধীন ও শোভন সংস্করণ আজ গুলশান ও বনানীতে রূপান্তরিত। এক কথায় দুর্নীতিবাজ শ্রেণী, তাকে পাকিস্তানী, বাঙালী বা বাংলাদেশী য্ াবলা হোক না কেন তাদের চরিত্রে কোন হের ফের হয় নাই। গত ২৩বছরে এই শ্রেণী দুই দফায় তাদের ভাগ্যোন্নয়ন সাধন করিয়াছে এই ভূখণ্ডের নাম পরিবর্তনের বদৌলত। ........ নাম যদি শিকার দেওয়া হয়, তবে কাজটার নিষ্ঠুরতা কমে না, এর ্পর পড়ে বীরত্বের প্রলেপ। দুর্নতিবাজ শ্রেণীর স্বার্থ উদ্ধারকে স্বাধীনতার মোড়কে ব্যবহার করা হইয়াছে বলিয়া জন জীবনে আজও স্বাধীনতা আশীর্বাদ হইয়া দেখা দেয় নাই।
    পশ্চিমা প্রভুত্বমুক্ত হওয়া অর্থাৎ পরিত্যক্ত ঘর-বাড়ী, কলকারখানা মোট কথা পরের দিকে দ্রুত উঠার রকেটগতি অর্জনের ব্যবস্থাটা স্বাধীনতার আদর্শের আড়ালে দুর্নীতিবাজ শ্রেণীর রক্তে খেলা করিয়াছে। সাধারণ মানুষের মুক্তির আকাংক্ষাকে আমাদের সমাজের একটি খণ্ডাংশ নিজেদের ভাগ্য গড়ার কাজে লাগাইয়াছে।
    স্বাধীনতার পর লালবাহিনী, নীলবাহিনী, রক্ষীবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নেতাদের ভূমিকা পাচপাত্তু ও খোকার চাইতে অনেক বেশী নৃংস্রতর ছিল। পাকিস্তান আমলে তরুণ সমাজের দুই চারজনকে অর্থ ও নেতার ছায়ায় লালিত হইতে আমরা দেখিয়াছি। আর স্বাধীনতার পর সেই সেচ্ছাবাহিনীর পোড়ো সর্দার ছিল প্রধানমন্ত্রী মুজিব নন্দনরা। সেদিন আমাদের বুদ্ধিজীবীর আঁৎকাইয়া উঠেন নাই। তাঁদের কন্ঠে সোনার বাঙলার মুজিবের কণ্ঠস্বরের মাদকতা মুক্তিযুদ্ধ্যের ত্যাগের মহিমা, বন্ধুকের ভূমিকা আর  দেশে দেশে তীর্থযাত্রার হিড়িক মিলাইয়া এমন এক উৎসবের আসর গড়িয়া উঠিয়াছিল, যেখানে অর্কেষ্ট্রার সুর বাজিয়া চলিয়াছে সপ্ত-গ্রামে। ভক্তিবাদের এই উচ্ছাসের মধ্যে শেয়ানা লোকেরা বাহির হইয়া আসিল বুক ফুলাইয়া, আমরা তাদের অভিনয়ে খুশী। আমাদের দুর্নীতিবাজ উচ্চ শ্রেণীর (কি রাজনীতিক, কি সরকারী আমলা) স্বার্থ যেখানে ব্যাহত হয় না, সেখানে তো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মতো “বাস্তবতা” সৃষ্টি হয় না। ‘শত্র“পক্ষের’ সবটা রটনা বলিয়া আত্মপ্রবঞ্চনা করিয়াছি। আর কর্তার কীর্তনে মাতিয়া উঠিয়াছি। সেটা যদি আন্তকি হইত তবে দুঃখ ছিল না। কিন্তু দশায় পড়ার আগে সেই বিখ্যাত সুর ভাঁজলো আমাদের বাম রাজনীতিক, সাহিত্যরথী ও কবিদের কণ্ঠে ঃ
“ধর বোষাল চশমা ঘড়ি
আমি এখন দশায় পড়ি।”
সুতরাং দশাগ্রস্ত হইয়া চশমা-ঘড়ি নিয়া মাটিতে গড়াইয়া পড়ে কেউ-চশমা, ঘটি অর্থাৎ স্বার্থান্ধ শ্রেণীর স্বার্থ ত্যাগের মহিমায় ক্ষতি হয় নাই। সেই স্বার্থান্ধ শ্রেণীর ভণ্ডামির মধ্যে যে অশুভ পেশীশক্তি ক্ষমা ছত্রচ্ছায়ায় সেদিন নাগরিক জীবনকে সন্ত্রস্ত রাখিয়াছিল।, আজ তার বিস্ময় দেখিয়া ত্রাসিত হইলে চলিবে কেন ?
    স্বাধীনতার পর যখন আদর্শ ছিল অমলিন, রক্তে ভেজা জনপদ দেশের বিবেকবান বুদ্ধিজীবীদের মুখের দিকে তাকাইয়া ছিল, তখন তার ক্র্যাচে ভর দেওয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার মত অসহায় দর্শক হিসাবে তাকাইয়াছিলেন। একমাত্র এই ‘ইত্তেহাদ’ সেদিন সকল হুমকি আর মুষ্টি পীড়ার মুখেও প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসাবে জনতার ইচ্ছাকে উর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়াছিল। সেদিন যদি ধিক্কারবাণী উচ্ছারিত হইত বুদ্ধিজীবীদের কণ্ঠে, তাহলে তা প্রকাশ্য দিবালোকে বাজারের মধ্যে খুনের দৃশ্যের এই “বাস্তব অভিনয়ে মর্মান্তিক দৃশ্যের দর্শক হইতাম না।
    কারা স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের শহীদ মিনারে মেয়েদের অপমান করিয়াছে ? তাদের কী কেউ চিনে না ? তারা তো রাজাকার আলবদর নয়। দু’একটি ব্যতিক্রমী কণ্ঠ ছাড়া কোন প্রতিবাদী কণ্ঠ সেদিন উচ্চারণ হয় নাই। সবাই সেদিন মৌনীবাবা সিদ্ধি সেবনে শিবনেত্র হইয়াছিল। তারাই আজ রূপ পাল্টাইয়া আসিয়াছে এবারের নববর্ষে ঢাকার ছাত্রী নিবাসে, বরিশাল আর রাজশাহীর ছাত্রী নিবাসে। এসবকিছু রাজনীতি বহির্ভূত হয়। হলের অন্যান্য ছাত্ররা এদের চেনে না, এমন নয়। যদি দলীয় রাজনীতির স্বার্থে উদ্ধার হইত, গতবে তার পরদিনই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সাজ সাজ ভাব পড়িয়া যাইত। দুর্যোধনের অনুচর ও দুঃশাসনের ফসল নিয়া আমাদের আজকে দিনগত পাপক্ষক করিতে হয়। ঢাকা শহরে অন্ততঃ গণ্ডাখানেক মহিলা সংস্থা রহিয়াছে, তারা কী ঘটনার প্রতিবাদে  রাস্তায় নামিয়াছে? ছেলেরা, নামার কথা ভাবে নাই। কারণ ছেলেরা তো তাদের ঘর হইতেই আসিয়াছে। রাতারাতি বাড়ী, গাড়ী, সন্ধ্যায় পার্টি সর্বস্ব যে জীবন, সেখানে পাকিস্তানদের ‘শুকদেব’ হইয়া ঘরে বসিয়া থাকিতে উপদেশ দেওয়া যেমন বৃথা, তেমনি দেওয়ার গরজও এদের নাই। বৃটিশ আমলে একজন বিচারপতি, পদস্থ সরকারী কর্মচারী সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়া ঢাকায় আসিয়া একটি দালানের ঘর অথবা একতলা বাড়ী করিয়া অবসর কাটাইতেনে। এভাবেই পুরানা পল্টনে ও শান্তিনগরে আমরা ‘৪৭ সালের দেশভাগের সময় অবসর প্রাপ্ত জজ, অধ্যাপক, সরকারী কর্মচারীদের দেখা পাই। অভিজাত এলাকার মধ্যে ছিল ওয়ারী আর স্বামীবাগ। পাকিস্তান আমলে উন্নতির গতি আর একটু তরান্বিত হইল আর স্বাধীন বাংলাদেশে তো গুলশান বনানীর বাড়ীর মালিক আর জমি বরাদ্ধপ্রাপ্তদের তালিকা প্রমাণ করে, কী সহজ দেশসেবা, কত দ্রুত গড়িয়া উঠিয়াছে সোনার বাংলা। সেই সোনার বাংলার সন্তানেরা রাতে ঘরে ফেরে না। বাপ-মা খুব বেশী একটা উদ্বিগ্ন নয় সব ক্ষেত্রে। এর উপর প্রগতিশীল ভাবধারা, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র , শোষিতের গণতন্ত্রের প্রতি প্রীতির সাথে সাথে স্বাচ্ছন্দ্য ও সাচ্ছল্যের প্রতি অনুরাগ প্রখর হইয়াছে। আমরা এখন জপ করিতেছি “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, সংঘং শরণং গচ্ছামির’ অনুকরণে জিয়া ও চিত্রনপি’র। একদা মুজিব অনুগমনে অভ্যস্ত ব্যক্তিদের অনেকের মুখ এ ভীড়ে চোখে পড়ে। 
    দেবতার বেলা যা লীলাখেলা, মানুষের বেলা তা পাপ- একথাতো আমরা কায়মনোবাক্যে স্বাধীনতার পর হইতেই বিশ্বাস করিয়া আসিতেছি। তাই ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনেতার কন্যার পরীক্ষা গ্রহণ করা হয় আলাদা কক্ষে, নির্ভুল উত্তর লেখায় যেন ব্যঘাত না হয়। তথাকথিত সমাজতন্ত্রী নেতা জেল খানায় বই খুলিয়া পরীক্ষা দিয়া আইন ডিগ্রী প্রাপ্ত হন। আপন সন্তানকে দ্বিতীয় শ্রেণী হইতে প্রর্থম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ দেখাইয়া সাবেক টেক্সট বুক বোর্ডের চেয়ারম্যানের অনুরূপ ধরনের অপরাধ নিয়া গলাবাজি করিতেছে আমরা লজ্জিত নই, কারণ তিনি তো আমার দলের নয়।
    সুতরাং আজ অভিজাত ঘরের ছেলেরা ডাকাতি করতেছে, ছিনতাই করিতেছে, লাভের কড়ি গুনিতেছে আর রাজনৈতিক বৈরিতা শোধ করিতেছে তপ্ত বুলেটে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ নিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছেন; কিন্তু প্রতিকারের পথ খোলা নাই। কারণ “পাপের দুয়ারে পাপ সহায় মাগিছে।”
    আমরা মোনেম খানের প্রেতাত্মাকে গাল পাড়ি, কারণ ওটা নিরাপদ। কিন্তু আয়নায় নিজের দিকে তাকাইয়া দেখিলে আমরা মোনেম খাঁকে লজ্জা দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করিয়াছি। স্বাধীনতার ‘ডাকসু’র নির্বাচনের কথা স্মরণ করুন। ‘গামা-লেলিন’ পরিষদ সেদিন অস্ত্রের ঝনঝনানি তুলিয়া কি করিয়াছিল। আজ তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রের খেলার নিন্দায় মুখর। জনগণের স্মৃতিশক্তি বড় শিথিল। মৃতদের জন্য বিলাপে তো পাপ মরে না। ক্ষমতার নদীর এ কূল ভাঙ্গিয়া যে চর জাগে সে মাটির প্রকৃতি তো একই। তাহলে আমরা কার নিন্দা করিব?
    ক্ষমতাসীনরা এই অপরাধকে লালন করিতেছেন। উন্নতিতে অপারগতা বলিয়া হুজুগ সৃষ্টি করেন প্রেসিডেন্ড ফুটবল লেখা, শিল্প সংস্কৃতি প্রদর্শন করিয়া অর্থাৎ দেশটাকে জুয়াড়ীর আড্ডায় পরিণত করিয়া। একটার পর একটা “বিপ্লব” বাহির হইয়া আসিতেছে ঝোলা হইতে। শুধু ফসল হইতেছে হত্যার বিপ্লব। আর ঘরে ঘরে রঙীন টি, ভি, তে (অবশ্য সচ্ছল) শারীরিক লক্ষ্যের প্রখরতা আমদানী করিয়া আদর্শ যুবসমাজ গড়ার চেষ্টা চলিতেছে। সেখানে নর্দমার পাশে লাশ পড়িয়া থাকা বীভৎস হইতে পারে বেমানান নয়। গ্রামে গ্রামে টি, ভি, সেটের প্রতিশ্র“তি শ্রেণী বৈষম্য তে কমাইয়া আনিতেছে -এই লাস্য-হাস্যের মাঝখানে নেতার হাত পা ছোড়াছোড়ির গ্রামোন্নয়নের কমিক অভিনয় দেখার ক্ষেত্রে ভি, সি, আর-এস, এল, আর- এর গণতন্ত্র এখন আমরা কায়েম করিয়াছি।
    ইহার পরেও কী জাতির বিবেক সুপ্ত থাকিবে ? এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে, এই ব্যভিচারের বিরুদ্ধে, এই হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে জাতির বিবেক কি রুখিয়া দাঁড়াইবে না ?