তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ

ফন্ট সাইজ:

অলি আহাদ-শুক্রবার, ৫ই ডিসেম্বর ’৮০


    আজ গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সপ্তদশ মৃত্যু বার্ষিকী।

    উত্তাল সমুদ্রে জাহাজের ক্যাপ্টেনের চিন্তায়, কর্মে ও ভাবনায় যেমন গন্তব্য বন্দরে পৌঁছানোই একমাত্র লক্ষ্য, তেমনি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পথে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সকল কর্ম, চিন্তা ও চেতনা নিয়োজিত ছিল।
    সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে উপেক্ষিত এবং দারিদ্রাভাবে ন্যৃজদেহ মুসলিম সমাজের মধ্যে আত্মস্বতন্ত্র্যবোধ জাগ্রত করিয়া জাতিগত নিপীড়নের রিুদ্ধে তাহাদের সংঘবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁহার অবদান জাতি আজ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করিবে। বিশেষভাবে বৃটিশ ভারতে তৎকালীন বঙ্গীয় প্রদেশে মুসলিম লীগের পতাকাতলে সমগ্র মুসলিম অধিবাসীকে তিনি যেভাবে সংঘবদ্ধ করিয়াছিলেন, উহা হইতে তাহার সংগঠন শক্তি, দূরদর্শিতা ও তীক্ষ্মবুদ্ধির পরিচয় মেলে।
    সেদিন তিনি সকল প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে জাতিকে পরিচালিত করিয়াছেন। রাজনীতিক্ষেত্রে পশ্চাদপদ মুসলিমদের সংগঠিত করার পিছনে কোন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী কিংবা বিদ্বিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি প্রশ্রয় দেন নাই। জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্মগত অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সেদিন তিনি অবতীর্ণ হইয়াছিলেন।
    যে ব্যক্তি পাকস্তান প্রতিষ্ঠালগ্নে অবিভক্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তিনিই সেদিক আর্তমানবতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতির কোন্দল থেকে দূরে সরিয়া দিয়া দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলিকাতার বুকে হিন্দু, মুসলমানের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপনে গান্ধিজীর সহিত একযোগে কাজ করিয়াছেন।
    আজ স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁহার এই সপ্তদশ মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতি একথা শ্রদ্ধা ও কতৃজ্ঞতার সহিত স্বীকার করিবে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা তিনিই প্রথম ছিলেন। তাঁহার এই উদ্যোগের সহযাত্রী ছিলেন শ্রী শরৎ বসু ও জনাব আবুল হাশিম।
    শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহিত যাঁহাদের কাজ করার সৌভাগ্য হইয়াছে তাঁহারা একবাক্যে স্বীকার করিবেন যে, গণতন্ত্রের প্রতি অকুণ্ঠ নিষ্ঠা, আদর্শের প্রতি আন্তরিকতা, দেশের মানুষের কল্যাণ সাধনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অবিচল। নিন্দা যেমন তাঁহাকে বিচলিত কিংবা হতোদ্যম করিতে পারে নাই, তেমনি প্রশংসাবাক্যে আত্মহারা হইয়া তিনি কখনও নিজের চারিপাশে বিভূতিবাদ সৃষ্টিতে প্রয়াসী হন নাই। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে পটুয়াখালীতে বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ করিলে তিনি ঘোরতর আপত্তি করিয়াছিলেন।
    যেখানে তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক নেতারা নিজেকে অমরতœলোভী ফারাও এর মতো প্রতিষ্ঠা করার জন্য উন্মত্ত হইয়া উঠে, সেখানে তাঁহার এই ব্যতিক্রমধর্মী মানসিকতা প্রমাণ করে যে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে তাঁহার দৃষ্টিভঙ্গী ছিল স্বচ্ছ। ক্ষমতার মোহ তাঁহার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করিতে পারে নাই।
    এই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্যই বৃটিশ আমলে তিনি বাংলাদেশে মুসলিম লীগকে গণসংগঠনে পরিণত করিতে পারিয়াছিলেন। সেদিন মুসলিম লীগ বৃটিশ খেতাবদারী নবাব, স্যার, খাজা, খান বাহাদুরদের কবল থেকে উদ্ধার করা তাঁহার পক্ষে সম্ভব হইয়াছিল বলিয়া ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট প্রদেশগুলির  মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই মুসলিম লীগ অভূতপূর্ব বিজয় অর্জন করিয়াছিল। মুসলিম ছাত্র ও যুুবশক্তিকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁহার অনন্য ভূমিকাই পাকিস্তান আন্দোলনকে সফল করিয়াছিল। মুসলিম লীগের রক্ষণশীল ও গণতন্ত্রবিরোধী অংশের চক্রান্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মানবতাবাদী ভূমিকাকে প্রসন্ন মনে গ্রহণ করিতে পারে নাই।
    তিনি দেশ ত্যাগের পর বাংলাদেশের উভয় অংশে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে আস্থার ভাব ফিরাইয়া আনার জন্য কর্মক্ষেত্রে ঝাপাইয়া পড়েন। উভয় বাংলার সংখ্যালঘুদের স্ব স্ব সরকারের উপর আস্থা ফিরাইয়া আনার কাজে তিনি কলিকাতায় থাকিয়া যান। এই সময় জিন্নাহ সাহেব তাঁহাকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার পনর্বাসন মন্ত্রী হিসাবে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান, তিনি মন্ত্রীত্ব গ্রহণের অক্ষমতা জানাইয়া শান্তি মিশনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করিয়াছে যে, ক্ষমতার লোভ নয়, দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে তিনি সর্বোচ্চ স্থান দিতেন। মোহাম্মদ আলী চৌধুরী (বগুড়া) মন্ত্রীসভায় আইন মন্ত্রীর পদ গ্রহণকে সেদিন যাহারা বিরূপ সমালোচনা করিয়াছিলেন, তাহারা খণ্ডিত বিচার বিশ্লেষণের জন্যই ভ্রান্তির শিকার হইয়াছিলেন। ইহার পূর্বে যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং উহার নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে দেশবাসী তাঁহার গণতন্ত্রের প্রতি নিষ্ঠার পরিচয় পাইয়াছেন।
    ঢাকায় শান্তি মিশন লইয়া আসিলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব তাঁহাকে দেশ হইতে বহিষ্কার করেন। কায়েদে আজম দ্বিতীয় বার তাঁহাকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদমর্যাদা দিয়ে জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি মন্ত্রীত্বের গিলটি করা নয়নশোভন সরকারী ফাঁদে পা দেননি।
    শহীদ সোহরাওয়ার্দী কখনও কোন ব্যক্তিগত কৃতিত্বের দাবী উচ্চকণ্ঠে করেন নাই বলিয়া তাঁহার বিরুদ্ধে বেনিয়া হিন্দু নেতাদের কলরব মুখরিত নিন্দার কণ্ঠ এবং বিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ হইতে প্রবল বিদ্রুপধ্বনি এমনই প্রবাল হইয়া উঠিয়াছিল যে, অনন্ত সিংহ সহ বাংলাদেশের অগ্নিযুগের দেশপ্রেমিকের মুক্তিদানের ক্ষেত্রে তদানীন্তন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর আন্তরিকতা বহু অমৃত ভাষণের তলে চাপা পড়িয়া গিয়াছে।
    মুসলিম লীগের গণতন্ত্রমনা মধ্যবিত্ত, কৃষক ও গ্রামের সাধারণ মানুষের কথাকে ভাষা দেওয়ার জন্য মরহুম শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইত্তেহাদ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ইত্তেহাদ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে এই দেশের মুসলিম সাংবাদিকতার জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করিয়াছিলেন।
    আজিকার ইত্তেহাদ সোহরাওয়ার্দী প্রদর্শিত এই প্রগতিশীলতার পতাকা বাহী এবং শ্রদ্ধার সাথে আমৃত্যু সকল বৈরিতার বিরুদ্ধে আপোষহীন ভূমিকা পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
    পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কায়েদে আজমের অঙ্গুলী হেলনে চলার মত নতজানু মানসিকতার অধিকারী না হওয়ার জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গণপরিষদের সদস্যপদ বাতলের জন্যই পা-গণপরিষদে এই আইন পাশ করা হইল যে, পাকিস্তানে যেসব সদস্যের বাড়ী নাই কিংবা সরকারের নিকট হইতে বাড়ীর এলটমেন্ট লহেন নাই, তাঁহাদের গণপরিষদের সদস্য থাকিতে দেওয়া হইবে না। শহীদ সাহেব বিলের বিরোধিতা করিয়াছিলেন। ভারতে বা পাকিস্তানে কোথায়ও তাঁহার কোন বাড়ী নাই। সেদিন এই নির্লোভ, পশ্চাতের বন্ধন মুক্ত মানুষটিকে শান্তনগরের জনাব ফরমুজুল হক।
    এই নির্ভীক উন্নতির দৃঢ়মনা মানুষটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারের জন্য নাজিমুদ্দিন সাহেবের ভূমিকা, পূর্ব পাকিস্তান হইতে তাঁহার বহিস্কার, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান কর্তৃক তাঁহাকে ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর বলে গালি দেওয়া ও শির কুচাল দেঙ্গে বলে হুমকি দান এবং তাঁহার বিরুদ্ধে যুক্তবাংলা গঠনের প্রচেষ্টার মিথ্যা অভিযোগ আনিয়া তাঁহাকে এদেশের রাজনীতির অঙ্গন হইতে নির্বাসিত করার চক্রান্তের কাহিনীর পুনরুল্লেখের প্রয়োজন রহিয়াছে।
    আজ রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজির আখড়ার পোড়ো সর্দারের গণতন্ত্রমনাদের সম্পর্কে কুৎসা রটনার সহিত সেদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে বিকৃত মিথ্যা ও অপ প্রচারে মিল রহিয়াছে।
    আজ দুর্গ মপখের যাত্রী তরুণদের শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বের বলিষ্ঠতা, কর্মীর নষ্ঠা, দেশের মানুষের প্রতি অপরিসীম ভালবাসা বুকে লইয়া ধুল্য ভলুন্ঠিত গণতন্ত্রের পতাকা দৃঢ়মুষ্ঠিতে ধরিয়া তাঁহার নির্দেশিত পথে অগ্রসর হইতে হইবে।
    আমৃত্যু এই অক্লান্ত কর্মবীর দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তে রাষ্ট তরণীকে দিকনির্দেশ করিয়াছেন। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেতে তিনি সমাজ ব্যবস্থা নির্বিশেষে সকল দেশের সহিত মৈত্রির দ্বার খুলিয়া দিয়াছিলেন। তিনিই প্রথম গণচীনের সহিত মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপন করিয়া এদেশের পররাষ্টনীতিতে গতানুগতিকতার ধারা বদলাইয়া দিয়াছিলেন।
    পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শহীদ সোহরাওয়াদী ইহার শাসনতান্ত্রিক কাঠামো রচনায় চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে সহযোগিতা করিয়াছিলেন। তাহার চেষ্টার ও পরিশ্রমে ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধান প্রণীত হয় ও গৃহীত হয়। নির্বাচনের প্রস্তুতির মুখে ১৯৫৮ সালে ইস্কান্দার মীর্জা কর্তৃক নির্বাচন বাতিল, সামরিক শাসন ও কয়েক দিনের ব্যবধানের মারফত আইয়ূব খানের ক্ষমতা দখল এবং পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মূলে এই কুঠারাঘাতের বিরুদ্ধে শহীদ সোহরাওয়ার্দী নতুন উদ্যমে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। সকল বিরোধীদলকে লইয়া এক সফল ঐক্যবদ্ধ মোর্চা এনডিএফ গঠন করিলেন। তিনি এখানেই তাহার নেতৃত্বের যোগ্যতা। কর্মদক্ষতা এবং স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে সমগ্র দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার মতো দূরদর্শিতা ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের তখত তাউস কাঁপাইয়া তুলিয়াছিল।
    পাকিস্তান আন্দোলন এবং বর্ণ শ্রেষ্ঠ অভিমানী ও ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের আঘাতের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া পাকিস্তান আন্দোলন সফলপূর্বক শত্র“কে পরাস্ত করিতে পারেন যিনি, সেই দক্ষ সেনানী শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে আইয়ুব সরকার কারাগারে নিক্ষেপ করিলেন। যে দন্ত রোম সাম্রাজ্যের ধ্বংসের কারণ হইয়াছিল, যে দম্ভ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম জিন্নাহকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজের কাছে অপ্রিয় করিয়াতুলিয়াছিল, সেই অপরিনামদর্শী দম্ভের বশবর্তী হইয়া আইয়ুব খান শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো একজন যুগপ্রবর্তক রাজনীতিকালে সকল ন্যায়ধর্ম লঙ্ঘন পূর্বক কারাগারে নিক্ষেপ করিয়া স্বীয় পতনকেই ত্বরাণ্বিত করিয়াছেন।
 
সরকারের ও আমরাতন্ত্রের পকেটস্থ মুসলিম লীগের রাজনীতির বিরুদ্ধে পাকিস্তানে গঠনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মানসিকতা ও দৃষিভঙ্গী লইয়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী যে আওয়ামী মুসলীম লীগ ও পরে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করিয়াছিলেন, গুরুমারা বিদ্যায় পটু শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী মারফত গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়া ১৯৭২ সালে আপনার জন্মের ইতিহাসকে অস্বীকার করিয়াছে। ১৯৬২ সালে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফন্ট (এডিগ্রফ) গঠন করিয়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব উপলব্ধি করিয়া ছিলেন। তিনি দিব্যদৃষ্টতে অনুধাবন করিয়াছিলেন যে, সামরিক শাসনই পাকিস্তানের একিলিস হিলস। সেই দর্বলতাকে মুছিয়া ফেলিয়া প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে স্বাধীন বাংলাদেশ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্র“তি বহন করে।
    বৈরুতে আত্মীয় স্বজনহীন পরিবেশে গণতন্ত্রের সংগ্রামের সিংহপুরুষ শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইন্তেকাল করেন আজ হইতে সতের বৎসর পূর্বে। কিন্তু ক্ষমতার গর্বে অন্ধ নেতৃত্ব ৭২ সনের সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনী আনিয়া গণতন্ত্রের কবর দিয়াছে। সেইখান হইতে শুরু হইয়াছে আমাদের গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামী কাফেলার নতুন যাত্রা। তারপরে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট সেনাবাহিনীর অমিতবিক্রম সদস্য কর্ণেল ফারুক, কর্ণেল রশীদের নেতৃত্বে সংঘটিত সিপাহী বিপ্লবের মধ্য দিয়া হৃতগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বর্ণদ্বার পুনরায় খুলিয়া গেল। কিন্তু মাত্র তিন মাসের ব্যবধানেই দুর্ভাগ্যের অমানিশা সেই সম্ভাবনাকে গ্রাস করিল। ইহার পর বেসামরিক পরিধেয় আবৃত সামরিক উর্দির গণতন্ত্র সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী পাস করাইয়া বাংলাদেশের মানুষের রক্ত দানের ইতিহাসকে অপমানিক করিয়াছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হএত শহীদ সোহরাওয়ার্দী কে বহিষ্কারাকালে তিনি তৎকালীন পুলিশ ইন্সপেক্টর জেনারেল জাকির হোসেনকে বলিয়াছিলেন ‘টেল ইওর নাজিমুদ্দিন দ্যাট সোহরাওয়ার্দী ইজ নট ইয়েট ডেড।’ আজ যে তরুন দল শহীদ সোহরাওয়ার্দী কে দেখেন নাই, যাহাদের কাছে তাঁহার প্রেরণা দরগাওয়া গানের মত তাহাদের আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মতই দাবী তুলিতে হইতেছে ’৭২ সালের সংবিধানের ৪র্থ ও ৫ম সংশোধনী বাতিলের জন্য। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় তখনই যখন জাতির ইতিহাসে কোন ভাড়ের উদয় হয়। গণতন্ত্রের সকল সাচ্চা কর্মীকে একত্রিত করিয়া গণতন্ত্রের মানস সন্তান সোহরাওয়ার্দীর মত দৃঢ়তা, ত্যাগ, নির্ভিকতা ও দূরদৃষ্টি লইয়া অগ্রসর হইতে হইবে অকম্পিত পদে। তরুনদের বজ্রকণ্ঠে হিংস্রতার ঠগিধর্ম উপাসক এবং ফ্যাসিষ্ট মুষ্ঠি পীড়নে বিশ্বাসী একনায়কত্বকে জানাইয়া দিতে হইবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মত তেজোদৃপ্ত কণ্ঠে, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আদর্শের আজও মৃত্যু হয় নাই। বাংলাদেশের তরুন তাহার আদর্শের পতাকাবাহী।
    শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হইবে তাঁহার অসমাপ্ত কার্য এবং আমাদের হৃত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য কঠোর দৃঢ়পণ লড়াই। যে দর্পী অহংবোধ ’৭২ সালের সংবিধান হইতে গণতন্ত্রের নাম নিশানা মুছিয়া দেশের মানুষকে এক যুথবদ্ধ আজ্ঞাবাহী অনুচরে পরিণত করিবার জন্য ৪র্থ সংশোধনী আনিয়াছে এবং সংবিধানের ৫ম সংশোধনী যাহার সামরিক বিধি বেসামরিক লেবাসে আবৃত করিয়াছে সেই গণতন্ত্র সংহারী প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত রাখিতে হইবে। একমাত্র তরুনরাই পারেন গণতন্ত্রের মর্যাদা পুনঃ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আগাইয়া নিতে। সেদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সংঘবদ্ধ শক্তির যে সম্ভাবনার দ্বার খুলিয়া দিয়াছিলেন এন ডি এফ গঠনের মধ্য দিয়া, সেই আরদ্ধ কর্ম আজ নতুনরূপে তরুনদের দৃষিভঙ্গির প্রসারতা, তাহাদের দূরন্ত আত্মবিশ্বাস ও ইচ্ছা শক্তির দুয়ারে উপনীত। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে আত্মদানকারী উজ্জল নক্ষত্রের সারিতে যাহার আসন নির্দিষ্ট হইয়া গিয়াছে তাহাকে শ্রদ্ধা জানাইবার অনন্য ভঙ্গীটি সংগ্রামের পথেই সম্ভখ, আবেদন নিবেদনের ন্যুব্জদেহ রাজনীতির ক্লীবতার পথে নয়।
    তাই, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু দিনে হৃত অধিকার পুনরুদ্ধার এবং ভ্রষ্টাচার রাজনীতির প্রতি ধিক্কার মুখর প্রতিবাদ আন্দোলনের অগ্নিদীপ্ত শপথ গ্রহণ করিয়াই আমরা তাঁহার প্রতি সর্বোত্তম শ্রদ্ধা নিবেদন করিতে পারি।