১৫ই আগষ্ট সংগ্রামের প্রেরণা, আদর্শের মর্মবাণী

ফন্ট সাইজ:

শুক্রবার ১৪ই আগষ্ট ’৮১-অলি আহাদ


    স্বৈরাচারের কবল হইতে রাহুগ্রস্ত গণতন্ত্র ও দিল্লীর আধিপত্যবাদের নিগড় হইতে স্বাধীনতাকে মুুক্ত করার দিনটি আজ আমাদের মাঝে ফিরিয়া আসিয়াছে। একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান গণতন্ত্রকে হত্যা করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট কয়েকজন তরুন সূর্য সৈনিক কর্ণেল ফারুক, কর্ণেল রশীদ, কর্ণেল ডালিম, কর্ণেল শাহরিয়ার, মেজর নর, মেজর বদিউল আলম এর নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও আদর্শের আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হইয়া আমাদের অপহৃত স্বাধীনতাকে আধিপত্যবাদের তাহার এদেশীয় আজ্ঞাবহ দুঃশাসনের কবলমুক্ত করে।
    এই দিনটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক অতুলনীয় আদর্শ স্থাপনের দৃষ্টান্ত হিসাবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পৃথিবীর দেশে দেশে দেখা গেছে, অভ্যুত্থানের নায়করা নিজেরাই ক্ষমতা করায়াত্ত করে। কিন্তু ক্ষাংলাদেশে এই অনুকরনীয় সিপাহী বিপ্লবের তরুণ নেতারা ক্ষমতা নিজেরা গ্রহণ না করিয়া পার্লামেন্টে মেজরিটি দল আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকেই সরকার গঠন করিতে দিয়াছেন। রাজনৈতিক দলগুলিকে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরাইয়া দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠা করা হয় জাতীয় সার্বভৌমত্ব। ১৯৭২ সংবিধান বাতিল না করিয়া, পার্লামেন্ট বাতিল না করিয়া, রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ অবারিত করিয়া তরুণ সৈনিকেরা সেদিন ক্ষমতার প্রকৃত উৎস জনসাধারণ বন্দুকের নল নয়, একথা প্রমান করিয়াছে। এই নির্লোভ কর্তব্যনিষ্ঠা, আদর্শবাদিতা, ক্ষমতার প্রতি বীতস্পৃহ থাকিয়া যে নৈতিক মূল্যবোধের পরিচয় সেদিন সূর্যসৈনিকরা দিয়াছে, এজন্য তাহাদের অভিনন্দন জানাই। চক্রান্তের মাধ্যমে ক্ষমতা করায়ত্ত করিয়া গণতন্ত্রের শত্র“রা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে অতীতের নেতিবাচক ধারাকে ফিরাইয়া আনয়াছে। তাই দেশে দেখা দিয়াছে জনজীবনের দুর্গশা।
    ক্ষমতা ভাগাভাগর রাজনীতি আর প্রাসাদ চক্রান্ত এবং একনায়কত্ব সুলভ দৃষ্টিভঙ্গী স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রতি মুহূর্তে খর্ব করিয়া চলিয়াছে।
    আমাদের দুর্ভাগ্য কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর আঙ্গুলী হেলনে আমাদের দেশে এযাবকাল রাজনীতির নেতিবাচক দিকটিকে প্রাধান্য দেওয়া হইয়াছে। অবিভক্ত ভারতে এই নেতিবাচক রাজনীতি হিন্দু মুসলিম এই দুই সম্প্রদায়কে এ হইতে দেওয়া হয় নাই। সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষা বৈষম্য দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়েছে, জন্ম দিয়েছে তিক্ততার ও বিদ্বেষের রাজনীতি। এই বৈষম্যের অস্ত্রের শিকার হইয়াছে সাধারণ মানুষ। ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত অগ্রসর হিন্দুদের সাথে প্রতিযোগিতায় মুসলমানদের হার হইয়াছে। শিক্ষা-দীক্ষা ও চাকুরীর সুযোগ হইতে বঞ্চিত বাঙালী মুসলমানগণ স্বীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই কায়েদে আজমের নেতৃত্বে পাকিস্তান কামিয়াবে সব চাইতে বেশী সোচ্চার থাকিয়া সর্বাধিক অবদান রাখিয়াছে। সেদিন পাঞ্চাবে ছিল ইউনিয়নিষ্টদের শাসন, উত্তর সীমান্ত প্রদেশে কংগ্রেসী শাসন এবং সিন্ধুতে মুসলিম লীগের অবস্থান ছিল নড়বড়ে। কায়েদে আজমের নেতৃত্বে বাঙালী মুসলমানই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে সার্থক করিয়াছিল।
    তারপর বাঙালী মুসলমানের অগ্রণী ভূমিকার জন্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে নতুন করে বাঙালী অবাঙালীর মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষায়, চাকুরী ক্ষেত্রে বৈষম্য বিভেদপূর্ব হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে বৈষম্যের ধারায় প্রবাহিত হইতে থাকে। এক কথায় মুষ্টিমেয় কয়েক ব্যক্তি ও পরিবারের স্বার্থে নতুন করে সৃষ্টবৈষম্যের মুখে দাঁড়িয়ে বাঙালী মুসলমান অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, পশ্চাদপদ থাকে। সিভিল সার্ভিসে বাঙালী মুসলমানের স্বার্থ নেই, সেনাবহিনীতেও তাহাদের অবস্থা এই প্রকার ছিল। যেখান থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আন্দোলনের সেখান থেকেই উঠে এলো ভাষা আন্দোলনের শক্তি। কালক্রমে সেই শক্তি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিল। পাকিস্তানের আদর্শ ছিল খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শ বাস্তবায়ন। কিন্তু সেখানে সম্পদের পাহাড় গড়ে এক শ্রেণী ইসলামের মৌলিক নীতির পরপন্থী জীবন ধারায় অবগাহন করে। দুর্নীতি, মদ, জুয়া ও ব্যাভিচারের স্রোত বইল দেশে।
    অপর দিকে বঞ্চিত বাঙালী মুসলমান স্বায়ত্বশাসনের দাবীর জন্য, গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। গণতন্ত্রের আদর্শ নিয়ে সৃষ্টি হইল স্বাধীন বাংলাদেশ। পাকিস্তানে ২৫ বছরে যে পরষ্পর নির্ভরশীল অর্থনীতি গড়িয়া উঠে, তা ভাঙ্গিয়া পড়ে। বাংলাদেশ খুব সহজেই স্বাধীনতার পর ভারতের বাজারে পরিণত হইল।
    পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারের দাবীতে সৃষ্ট বাংলাদেশ এভাবে অর্থনীতি ক্ষেত্রে কায়েমী সংকীর্ণ স্বার্থের কবলে পড়ে ভারতের  উপনিবেশে পরিণত হয় এবং রাজচনীতি ক্ষেত্রে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়।
    শেখ মুজিবই ফারাক্কা বাঁধ চালু করার জন্য ভারতে সুযোগ করিয়া দেয়। বন্ধুত্ব ও কতৃজ্ঞার নামে পলাশী যুদ্ধের পরে মুর্শিদাবাদের রাজদরবারের অভিনয় হল বাংলাদেশ। ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালুর সুযোগ পাইল। বেরুবাড়ী ভারতকে দেওয়া হইল, কিন্তু চুক্তিমোতাবেক দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা আমরা পাই নাই।
    যে কায়েমী স্বার্থ পাকিস্তানে শাসন ও শোষণ চালাইয়া বৈষম্য ও ঘৃণার জন্ম দিয়াছে, সেই একই কায়েমী স্বার্থে স্বাধীন বাংলাদেশকে দিল্লীর তখত তাউসের কাছে নজরানা হিসাবে তুলিয়া ধরিয়াছে। আমরা ও আমাদের তরুণরা উপনিবেশ হাত বদলের জন্য রক্ত দেই নাই। তবুও কেন  কায়েমী স্বার্থের চক্রান্ত আমাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করে? কেন নির্লোভ নিঃস্বার্থ তরুণদের আত্মদান বার বার ব্যর্থ হয় ? ইহার জবাব আমাদের রাজনৈতিক চরিত্রের মধ্যেই নিহিত। একদিন হিন্দুদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়াছি। আমরা পাঞ্জাবী ও অবাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়াছি, স্বাধীনতার জন্য শ্লোগান দেই নাই। আমরা সকল আন্দোলনই শুরু করি ‘না’ দিয়ে এটা চাই না, ওটা চাই না, কিন্তু কী চাই সেই শ্লোগান অগ্রাধিকার পায় না কিংবা তা জানিও না। আমরা আদর্শের  উপরে ঘৃণা ও বিদ্বেষকে অগ্রাধিকার দিয়াছি বার বার রাজনীতি ক্ষেত্রে। কায়েমী স্বার্থবাদীরাই উহাকে মূলধন করিয়া আমাদের অন্তরের আকাঙ্খাকে, আমাদের আদর্শকে আমাদের নিঃস্বার্থ নিষ্ঠাকে নিয়া বন্দুক ক্রীড়া করিয়াছে।
    ১৫ই আগষ্ট যে আদর্শ, নিষ্ঠা ও ত্যাগের মনোভাব নিয়া কয়েকজন সূর্য সৈনিক স্বাধীন বাংলাদেশকে রাহুমুক্ত করিয়াছেন, ক্ষমতা করায়ত্ত করার সুযোগ গ্রহণের পরিবর্তে জনগণের প্রতিনিধিদের নিকট, আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা এক লহমা দেরী না করিয়া ফেরত দিয়াছেনÑ সেখানে উচ্চভিলাষী ক্ষমতা প্রিয় একটি মহল প্রাসাদ চক্রান্তের মারফত সেই আদর্শ ও ত্যাগকে ধূলায় টানিয়া নামাইয়াছে। নতুন করিয়া এখন বিভেদের বীজ বোনা হইতেছে। সেই নেতীবাচক রাজনীতি আমার মাথা ছাড়া দিয়া উঠিয়াছে। মুক্তিযোদ্ধা অমুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় এবং অস্থানীয়, এপার ওপার ইত্যাদি বিভেদমূলক প্রশ্ন তুলয়া জাতীয় জীবন তথা রাজনৈতিক পরিবেশ কলুষিত করা হইতেছে। আমাদের সেনাবাহিনী প্রসঙ্গেও এই বিভেদমূলক প্রচার চালাইয়া এক শ্রেণীর রাজনৈতিক মহল ঘোলা পানিতে মৎস্য শিকারের অপচেষ্টায় লিপ্ত। এই বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী প্রবনতার বিরুদ্ধে রুখিয়া না দাঁড়াইলে দেশে যে কোন মুহুুর্তে ভয়াবহ গৃহ যুদ্ধ দেখা দিতে পারে। এই আত্মকলহের পরিণতি হইবে ভয়ংকর। আধিপত্য বাদ ও তাহার সেবাদাসরা এই সুযোগের প্রতীক্ষায় উৎ পাতিয়া আছে। ইহার বিরুদ্ধে এখনই রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে। এজন্য ১৫ই আগষ্টের সিপাহী বিপ্লবের নিঃস্বার্থ চেতনা ও আদর্শ লইয়া জনগণের পাশে দাঁড়াইতে হইবে। সেদিনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশবাসীর মনে আশার সঞ্চার হইয়াছিল যে, এতদিনে দাসত্বের গ্লানি মুছিয়া লুটপাটের অধ্যায় পার হইয়া আমরা উন্নত মস্তকে বিশ্বের দরবারে দাঁড়াইতে পারিব। বিপ্লবোত্তর সরকারের সে দিনের শাসনে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হইবার স্বর্ণ সম্ভাবনা দেখা দিয়াছিল।
    কুৎসিত ক্ষমতার দ্বন্দ, উচ্চভিলাষ ও প্রাসাদ চক্রান্ত সেই সম্ভাবনাকে ধুলস্মাৎ করিয়া দিয়াছে। ক্ষমতাসীনরা দিল্লীর অনুগ্রহ লাভে ধন্য হইয়া দেশের স্বাধীন সত্বা বিপন্ন করিয়া তুলিয়াছে। দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতায় বাংলাদেশী নাগরিকরা আজ প্রতিবেশীর বৈরী আচরণের মুখে অবরুদ্ধ। দক্ষিণ তালপট্টির বিরুদ্ধে মীমাংসার চেষ্টা না করিয়া স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাগান্ধী উহাকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলিয়া ঘোষণা করিবার পরও আমাদের পররাষ্ট্র দফতর আশ্বাসবাণী শোনাতে ব্যস্ত। সুদূর মেক্সিকোতে গিয়া ভারতের সদিচ্ছার খোজখবর লইয়া আমাদের অভয় দেওয়া হইয়াছে। কথায় আছে কূটনীতি প্রথম প্রতিরক্ষা লাইন, সেনাবাহিনী দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা লাইন। আমাদের সরকার জাতিসংঘে, ইসলামী সম্মেলনে বিশ্ব সমস্যা নিয়া ছুটিয়াছে। ইরাক ইরান যুদ্ধে সালিশী করিতে গিয়াছে কিন্তু ঘরের দুয়ারে ক্ষেত বেদখলের কথা কোথাও বলিবার সময় পাই নাই কিংবা স্পৃহা দেখায় নাই।
    রাজনীতি ক্ষেত্রে এই সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাতের লজ্জাজনক ভক্তি গদ গদ অবস্থান হইতে দেশকে বাঁচাইতে একমাত্র তরুণরাই পারে। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্র ভাষা আনোদালন হইতে স্বাধথীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রামে সর্বক্ষেত্রে তরুনরাই আদর্শকে সমন্নত রাখিয়াছে। লোভের হাতছানি, ক্ষমতার মোহ তাহাদের চিত্ত টলাইতে পারে নাই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতাশাচ্ছন্ন ইউরোপে ফরাসী লেখক আদ্রে জিদ তরুণদের আহ্বান জানাইয়া বলিয়াছিলেন, একমাত্র তোমরাই অভ্রান্তভাবে অগ্রসর হতে পার, কারণ তারুণ্যের শক্তির আদর্শ নিস্কলুষ। তাই, এই তরুণদের বিপথগামী করার জন্য স্বাধীনতার পর লুটপাট, হাইজ্যাক ইত্যাদি সমাজবিরোধী কাজে যেমন মুজিব সরকার প্ররোচিত করিয়অছিল, তেমনি বর্তমানেও কায়েমী স্বার্থ তাহাদের অর্থের লোভ ও ক্ষমতার শরিক করিয়া জাতির ভবিষ্য॥কে বন্ধক দেওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত।
    যে কায়েমী স্বার্থ ভারতে সর্বত্র বিদ্বেষ ও ঘৃণার বিষ ছড়াইয়া মোরাদাবাদ, হায়দ্রাবাদ, জামশেদপুর, আলীগড় ও বিহার শরীফে মুসলিম নিধনে উৎসাহ যোগাইয়াছে- তাহার সহিত গাঁটছড়া বাধিয়া এদশে যাহারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠানের স্বপ্ন দেখে, তাহাদের রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে। তরুণদের মধ্যে যাহারা এখনও দেশপ্রেমে অবিচল, ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে উঠিয়া যাহারা এই দেশের মাটি ও মানুষের মান রাখিয়াছে, ত্যাগে ও আতœবিসর্জনে তাহাদের আজ আগাইয়া আসিতে হইবে। জাতি আজ এক ক্রান্তিলগ্নে উপনীত। ধমান্ধ যাহারা তাহারাই বিদ্বেষ ও ঘৃণার জন্ম দেয়। প্রকৃত ধার্মিক যাহারা তাহারা মানুষে মানুষে ঐক্যের সেতু বন্ধন করিয়াছে যুগে যুগে। গরীব হিন্দু আর গরীব মুসলমান এক। যে নেতিবাচক রাজনীতি ইহাদের বিদ্বেষ, সংশয়, অবিশ্বাস ও ভয়ের মধ্যে নিক্ষেপ করে সেই নেতিবাচক রাজনীতি ভজনার দিন আজ শেষ হউক। ১৫ই আগষ্টে এই হউক তরুণদের শপথ। আমরা কি চাই তাহাই উচ্চ কণ্ঠে বলিতে হইবে। কারণ, এযাবৎ রাজনীতির ইতিহাসে আমরা ‘না’ মন্ত্র জানিয়া আসিয়াছি। ইহা চাই না, উহা চাি না, ইহার সাথে মিলে না, উহার সহি বনিবনা হয় না। এবার যাহাদের সহিত মিলিবে তাহাদের কথা বলব। আমাদের যাহা আদর্শ, আমাদের যাহা লক্ষ্য, তাহারা কথা বলিব ইহাই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টের সিপাহী বিপ্লবের শিক্ষা। বিদ্রোহী কবি নজরুলের ভাষায় ত্যাগ চাই, মর্শিয়া ক্রন্দন চাহি না’। এই ত্যাগের আদর্শ হইল ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর থাকা এবং ক্ষমতায় আরোহনের ফন্দি ফিকিরের জন্য চক্রান্তের রাজনীতির পরিপন্থী।
    জাতির দুর্ভাগ্য, ক্ষমতা লিপসু আত্মস্বার্থসর্বস্ব এক শ্রেণীর রাজনীতিক সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে টানিয়া নামাইয়া স্বার্থ সিদ্ধি করিতে চায়, ইহারাই সেনাবাহিনীর ভাবমুর্তি নষ্ট করিতেছে। আমরা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্তের অতন্ত্র প্রহরী সেনাবহিনীর প্রতি আহ্বান জানাই- আপনারা রাজনীতির আবর্তের মুখে দাবার ঘুটিতে পরিণত হবেন না। কিন্ত এই সাফল্য অসাফল্য শুধু ব্যক্তি বিশেষের নিরাপত্তা বা মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সেনাবাহিনীকে ক্ষমতার দ্বন্দে টানিয়া নামানোর ফলাফল জাতি ও দেশ তাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কারণ, এই ফলাফল সমগ্র জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে না, করে একটি মাত্র কোটারী কিংবা কোন কায়েমী স্বার্থের উদ্দেশ্য সাধন।
    ১৫ই আগষ্টের আদর্শের পথ হইতে বিদ্যুতি আমাদের জাতীয় জীবনে গত বছরে যে দুভোর্গ সৃষ্টি করিয়াছে, স্বাধীনতা ও সার্বভোমত্বকে যেভাবে বিপন্ন করিয়াছে, আধিপত্যবাদীদের প্রভাব এদশে যেভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে, তাহা রোধ করিবার পথ একটাই তাহা হইল ১৫ই আগষ্ট্রের আদর্শ ও লক্ষ্যকে সামনে রাখিয়া রাজনৈতিক কর্মসূূচী নিধারণ এবং আদর্শের জন্য সেদিন উৎসর্গিত তরণদের শিক্ষা অনুসরণ। তাহাদের হতমানের মধ্যে ফেলিয়া রাখিয়া এই লক্ষ অর্জনে কখন্ আমরা আন্তরিক থাকিতে পারি না। ১৫ই আগষ্টের এই দিনে এই কথাটা যেন স্বীকার করতে আমরা দ্বিধাগ্রস্ত বা লাজুুক না হই।