দুনীতির পক্ষস্রোত হইতে দেশকে উদ্ধার কর

ফন্ট সাইজ:

শুক্রবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর ’৮১-অলি আহাদ


    পাকিস্তান হইতে বাংলাদেশ। মানচিত্রের পরিবর্তন ঘটিয়াছে। চরিত্রের কোন পরিবর্তন হয় নাই। ৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মলগ্ন হইতে এদেশে নীতিনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে অভাব দেখা দিয়েছিল, তাহার ভাঙ্গন ধরানো দুবুদ্ধির নাগপাশে জড়াইয়া মুসলিম লীগ ক্ষমতা লাভের চোরাগলিতে নেতৃত্বের ধারাকে লইয়া গিয়াছে। পরিণতি ভাল হয় নাই। পাকিস্তান ভাঙ্গিয়াছে। সেই ভাঙ্গনের সূত্রপাত হইয়াছিল আমলাতন্ত্র ও সমরতন্ত্রের অশুভ আতাতের মধ্য দিয়া। দুুই দুইটা সামরিক অভ্যুত্থানের পেশী শক্তি নিজেকে জনগণ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইয়াছে। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সামরিক শাসনের মধ্য দিয়া তাহারা শুধু ক্ষমতাই করায়ত্ত করে না, অমিত লোভ ধনভাণ্ডার খোঁজে শক্তি সঞ্চয়ের অজুহাতে দেশ রক্ষার জন্য সমরাস্ত্র ও সাজ সরঞ্জাম ক্রয় করার নামে কোটি কোটি টাকা নানাভাবে আত্মসাৎ করে। সামরিক অফিসারদের মধ্যেও সংক্রামিত হয় দুর্নীতি।
    পাকিস্তানের এই আত্মবিন্যাসের পথেই অভ্যূদয় ঘটিয়াছে স্বাধীন বাংলাদেশের। মানুষের মনে আশা জাগিয়াছিল, রক্তস্নাত শুভ্রজ্যোতি পবিত্র প্রভাত দেখা দিবে দিগন্তে। কিন্তু মরীচিকার মত তাহা মিলাইয়া গেল শেখ মুজিবের লাল-নীল বাহিনীর বর্বরতা এবং দুর্নীতির মধ্যে। দুুর্নীতির এক বিশাল আবর্তে দেশকে ঠেলিয়া দিয়া শেখ মুজিব এক প্রতিবাদহীন মুখবদ্ধ জনসাধারণকে চালানোর জন্য কায়েম করে বাকশালী একনায়কত্ব।
    ’৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টের সফল বিপ্লবের মধ্য দিয়া জনতার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা হইয়াছিল। কয়েকজন নিঃস্বার্থ ক্ষমতালিপ্সাশূন্য সূর্যসন্তানের মধ্য দিয়া জনগণের বিবেক নিজেকে প্রতিষ্ঠা করিতে অগ্রসর হয়। তাহারা চেষ্টা করিয়াছিল আইয়ুব, ইয়াহিয়া, মুজিবের দুর্নীতি ও ফ্যাসিষ্ট মষ্টি নিপীড়নের শ্বাসরোধী অবস্থা হইতে দেশবাসীকে মুক্ত করিতে। কিন্তু আমলাতন্ত্র ও শোষক ছাউনীর উচ্চাভিলাষ আমার পথে বাধা হইয়া দাঁড়াইল। সঙ্গে সঙ্গে সেই দুর্নীতি, উ॥কোচ আর ক্ষতাপ্রিয়তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাঁকিয়া বসিয়াছে। চক্রান্তের পথে ক্ষমতার হাতবদল হইয়াছে। পরিবর্তন হইয়াছে দণ্ডধরের। কিন্তু দুর্নীতির জোয়ার বহিয়াছে অবাধে। বর্ষার স্ফীত নদীর মত দু’কূল প্লাবিত করিয়া দুর্নীতি আজ সমাজের সর্বস্তরে ব্যাপ্ত
    লোভের লোল জিহ্বা লেহন করিয়া লইয়াছে আমাদের অর্থনীতির সম্ভাবনাময় সকল পুস্পিত শাখা প্রশাখা। জাতীয়করণের নামে সেদিন শেখ মুজিব সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক-বীমায় দলীয় লৎপাটের ছাড়পত্র দিয়াছিল। সেদিন ডঃ মাজহারুল হক এই লুটপাটোর অর্থনীতি সম্পর্কে একটি গভীর মন্তব্য শঙ্কাভাবে উচ্চারণ করিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, “আমরা তীব্র বেগে রসাতলের দিতে ধাবিত হইতেছি।” সেদিন ক্ষমতাদর্পী বুদ্ধিভ্রংশ রাজনীতির পাণ্ডারা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে গুণ্ডামির আখড়ায় পরিণত করিয়াছিল। ইহার উদ্দেশ্যে হইল সর্বস্তরে আমলাদের কব্জা দৃঢ় করণ। ইহার পিছনে শক্তির উৎস হিসাবে সামরিক শাসন প্রত্যক্ষ অথবা বেসরকারী ছদ্মবেশে রাজনীতিতে আসর জমাইয়া বসিবার সুযোগ পাইয়াছে।
    দুর্নীতি আজ তাই দেশের একটি স্বাভাবিক ও সর্বগ্রাসী আইনে পরিণত হইয়াছে। অর্থনীতিবিদ ডঃ আবদুল্লাহ ফারুক যথার্থই বলিয়াছেন যে, আমাদের অর্থনীতি রাষ্ট্রয়াত্ত কয়েকটি খাতের মাধ্যমে অযোগ্যতা ও দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করিয়াছে। ইহাতে বাজার কেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার যেমন স্থান নাই, তেমনি ইহা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির নিয়ম শৃংখলারও অধীন নহে। দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের জন্যই শিল্পকারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বপ্রকার নিয়োগ সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিকোন হইতে দেওয়া হইয়াছে। অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ, কর্মবিমূখ লোক গুলি সকল প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে জাঁকাইয়া বসিয়াছে। এই দুর্নীতির বদ্ধপথ ধরিয়াই দেশে রাজনৈতিক অস্তিরতা বাড়িয়াছে, অর্থনীতি বিপর্যস্ত হইয়াছে। বিদেশী সাহায্য আসিয়াছে কয়েকজন আমলা রাজনীতিক ও ব্যারাক রাজনীতির ব্যক্তিগত স্বার্থের নিরিখে। দেশের জন্য উহার ব্যবহারের চেষ্টা হয় নাই। বিদেশী উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞদের সাথে নিজেদের আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-ভাই-ব্রাদারদের বিদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে চাকুরীর সাথে বিনিময়ের ভিত্তিতে এদেশের প্রকল্পসমূহের কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়।
    এই অনিশ্চিত অবস্থা ও অর্থনৈতিক বিশৃংখলা সৃষ্টির সুযোগে ক্ষমতাসীনরা ও ভ্রষ্টাচার রাজনৈতিক দলগুলি পারস্পরিক দ্বন্দে শ্রমিক সংগঠনগুলি ব্যবহার করে। ঘর ঘর ধর্ম ঘট, আর শ্রমিক আন্দোলনের নামে বোমাবাজি ও সন্ত্রাসের রাজত্ব শিল্পাঞ্চলে চলিতেছে, উৎপাদন কমিতেছে। আমাদের পণ্যের বাজার যত সংকুচিত হইতেছে ততই বিদেশী পণ্য এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র হএত বিপুল পরিমাণ চোরাচালানকৃত দ্রব্য সামগ্রী আমাদের অর্থনীতিকে একেবারে পঙ্গু করিয়া ফেলিয়াছে। চক্রাবর্ত নিয়মে দুর্দশাগ্রস্ত ও মুদ্রাস্ফীতির জন্য বেতনভূক্ত কর্মচারীরা ধর্মঘট করিতেছে। সেক্টর কর্পোরেশন ও ব্যাংকের ধর্মঘটে উভয় পক্ষের বল প্রয়োগের হুমকি এবং দমন নীতি একে অন্যের সম্পূরণ হিসাবে কাজ করিতেছে।
    এই পরিস্থিতির মুখে সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তোড়জোর চলিতেছে। ক্ষমতাসীন দলের সুযোগ সুবিধা সীমাহীন। প্রচারযন্ত্র তাহাদের কুক্ষিগত। অর্থবল হইতে শুরু করিয়া লোকবল রাষ্ট্রীয় উৎস হইতে গ্রহণ করিয়া ক্ষমতাশীন ব্যক্তির জয়লাভ অবধারিত। গণতন্ত্রের এই প্রসেসের সহিত যক্ত হইয়াছে মরহুম প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সংশোধিত সংবিধানের একটি ধারা। সামরিক প্রসাশক পদে থাকিয়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা যাইব। রাষ্ট্রের পেশীশক্তিকে এভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রদর্শনীতে বাজীমাৎ করা চলে, গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য উহাতে রক্ষা পায় না। ক্ষমতার সংক্রমণ গণতন্ত্রের ভিত্তিকে টলাইয়া ফেলে।
    এই ক্ষমতার রাজনীতির জন্যই দুর্নীতি আজ আমাদের সমাজ জীবনের সর্বস্তরে ব্যাপ্ত হইয়াছে। অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করিয়া বাংলাদেশকে মুষ্টিমেয় লোকের স্বার্থে ভারতের বাজারে পরিণত করা হইয়াছে। এক অর্থনৈতিক দাসত্বের ফাঁস আমাদের গলায়। জনশক্তি রফতানী করিয়া প্রাপ্ত আয় জমিজমা ক্রয় ও বিলাস-ব্যাসনে নিঃশেষিত হইতেছে।
    জাতীয় চরিত্রের অধঃপতনের সুযোগে ভারতে ৬ বছর ধরিয়া লালিত-পালিত মুজিব তনয়াকে এখানে পাঠানো হইয়াছে। আওয়ামীলীগের কর্ণধার হিসাবে তাহার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে ইন্দিার স্পর্ধিত ঘোষণা “নিউমূর (দক্ষিণ তালপট্টি) হামারা হ্যায়”। চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যা ও ক্ষমতা দখলের জন্য সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্ঠা শুধু কাকতালীয় কোন ঘটনা নহে। পরবর্তী ঘটনাবলী তাহার সাক্ষ্য।
    দেশ আজ ধ্বংসের আবর্তে পতিত। সর্বত্রই অনিশ্চিয়তা বিরাজ করিতেছে। এই অনিশ্চয়তাই রাজনীতি ক্ষেত্রে অরাজনীতিবিদ পেশীশক্তির আবির্ভাবকে সাহায্য করে। গণতন্ত্রের সামান্য নাম-নিশানাটুকু মুছিয়া অতীতের পরিত্যক্ত ব্যবস্থাগুলিকে ফিরাই্য়া আনে। কাহারও কোন প্রতি বাদ করার জো থাকে না। পাকিস্তান আমলে বিরোধী কণ্ঠস্বর মানেই ছিল দেশদ্রোহী ও ভারতীয় দালাল। বাংলাদেশে উহার এখন ভাষান্তর ঘটিয়াছে। মুক্তিযোদ্ধা-অমুুক্তিযোদ্ধা হিসাবে চিহ্নিত করিয়া প্রতিপক্ষকে গালি দেওয়া এবং অস্ত্রের ঝনঝনানীর মুখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করার রাজনীতি চলিতেছে।
    অস্ত্রের হুমকি দিয়া সমগ্র দেশবাসীকে জিম্মি করিয়া রাজনীতিতে যে নতুন অশুভ ধারার সূচনা হইয়াছে, উহা দেশের পক্ষে মঙ্গলজনক হইবে না, হইতে পারে না।
    একদিকে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়িতেছে। সেন্সাস রিপোর্টের প্রকৃত তথ্য আসে নাই। আসিলে পরিবার পরিকল্পনার নামে প্রভূত অর্থ সাহায্যের উৎস শুকাইয়া যাইবে। আই এম এফ আমাদের কৃষি উৎপাদন সংক্রান্ত তথ্য সত্য বলিয়াছে। সরকারের প্রদত্ত তথ্যের প্রতি তাহাদের সন্দেহ উড়াইয়া দিবার নহে। জনসংখ্যার তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া হয় নাই। এমতাবস্থায় কেউ কি উহা অস্বীকার করিতে পারিবে। আই এম এফ ঋণদানে (প্রস্তাবিত ঋণের চলতি ত্রৈমাসিকের কোটা) অস্বীকার করিয়াছে। অনুৎপাদন খাতে ব্যয়ের অভিযোগ ও অপব্যয়ের অভিযোগও আই এম এফ করিয়াছে। বিদেশী সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রশংসাপত্র লইয়া মন্ত্রীদের দেন দরবারে তাহাদের মন টলে নাই।
    দেশের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কাহারও কাম্য হইতে পারে না। ক্ষমতাসীন দলের কর্ণ প্রশংসা বাক্যে বধির। শুভবুদ্ধির পরামর্শ প্রশংসার কোলাহল ভেদ করিয়া তাহাদের কর্ণকুহরে পৌঁছিবে না। তাই আহবান জানাই পশ্চাতের বাধাবন্ধনহীন তরুণদের। অকৃতার্থ অতীতের বোঝায় তাহারা যুক্তদেহ নহে। একমাত্র তাহারাই সাহসের সহিত বুক ফুলাইয়া গর্ব করিতে পারে। তাই একমাত্র তাহারাই জনতাকে সমবেত করার গুরু দায়িত্ব বহনে সক্ষন। আপনারা সংগঠিত হন এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করিয়া জনতার শাসন কায়েমের সংগ্রামে অগ্রসর হউন। আপনাদের সংগঠন শক্তি এবং চেতনার মশাল চারিদিকের দুর্যোগের ঘনান্ধকার দূর করিয়া আলোকিত পথের সন্ধান দিতে পারে। দুর্যোগ ও দুঃশাসন হইতে এই মুহূর্তে দেশবাসীকে মুক্ত করিতে না পারিলে, হতাশার মধ্য দিয়ে শক্তি উপাসক এবং পেশীনির্ভর রাজনীতি পুনরায় রঙ্গমঞ্চে নতুন অভিনয়ে অবতীর্ণ হইবে। পোশাকের পরিবর্তন হইবে, চরিত্রের পরিবর্তন ঘটিবে না; জাতীর ভাগ্য ফিরিবে না। আসুন ঐক্যবদ্ধ জনতাকে লইয়া তিমিরাভিসারী তরুণরা এই সর্বনাশী পুনরাবৃত্তিকে রুখিয়া দাঁড়ান। জয় আমাদের সুনিশ্চিত, কারণ আমরা ন্যায়ের পক্ষে।