চক্রান্তের রাজনীতি ছিন্ন করিয়া যাত্রা হউক শুরু

ফন্ট সাইজ:

শুক্রবার, ১৬ ই অক্টোবর ’৮১-অলি আহাদ


    নীতিভ্রষ্ট আত্মস্বার্থসর্বস্ব যে কুট রাজনীতি মাত্র ২৪ বছরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিভাজন ডাকিয়া আনিয়াছিল, সেই একই স্বার্থান্ধ নীতির অক্টোপাসে আবদ্ধ আজিকার বাংলাদেশ। সেদিন উপমহাদেশের ভাগ্যাহত মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বপ্নিল আকাঙ্খা পাকিস্তান কায়েমের মধ্য দিয়া বাস্তবে রূপায়িত হওয়ার অবকাশ খুঁজিয়া পাইয়াছিল, কিন্ত ক্ষমতার গদিতে আসীন রাজনীতিকদের বলদর্পিতা, অমিত ক্ষমতা লোভের পথে সৃষ্ট দুর্নীতি, ব্যভিচার, আর ষড়যন্ত্র সেই স্বপ্নসাধকে ধূলিস্মাৎ করিয়া দিয়াছিল। আবার গণতন্ত্র তথা স্বাধীনতা অর্জনের যে তেজোদৃপ্ত চেতনা ’৭১-এর অগ্নিক্ষরা দিনগুলিতে একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে এ জাতিকে প্রণোদিত করিয়াছিল, সেই চেতনার পৃষ্ঠে ছুরিকাঘাত করিয়া নবলব্ধ বাংলাদেশে সেই একই ব্যভিচার, নীতিভ্রষ্টতা আর চক্রান্তের করুণ পুনরাবৃত্ত শুরু হয়। করাচী পিণ্ডির শোষণের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম পরিচালিত হইয়াছিল, সেই সংগ্রামের আসনে অগণিত মানুষের আত্মহুতির বিনিময়ে সাফল্যের যে সৌধ নির্মিত হয়, সেই সৌধের ওপর দাঁড়াইয়া শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে দিল্লীর মসনদের তলে বিকাইয়া দেয়। দিল্লীর দাসত্বের বিরুদ্ধে জাতীর প্রতিবাদী কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করিবার জন্য জনপ্রতিনিধি রচিত ১৯৭২ এর সংবিধানের ব্যবচ্ছেদ সাধনপূর্বক শেখ মুজিব কায়েম করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাছিয়া নেয় ফ্যাসিষ্ট নিপীড়নের মাধ্যমে ব্যক্তিশাসন প্রতিষ্ঠার পথ। কিন্তু যে জাতি রক্তস্মানের মধ্য দিয়া সচেতনতা অর্জন করিয়াছে, তাহাকে দীর্ঘকাল প্রতারণা করার ক্ষমতা কাহারও থাকে না।
    সেই ঘোর অমানিশায় ইতিহাসের অনিবার্য ধারায় আসিল ’৭৫ এর ১৫ ই আগষ্ট। কর্ণেল ফারুক, কর্ণেল রশীদের নেতৃত্বে কয়েকজন অসম সাহসী সূর্যসৈনিক দেশের বৃহত্তর স্বার্থ ও দিল্লীর শৃংখল হইতে স্বদেশে ক মুক্ত করার বাসনায় এক মহান বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ মুজিবের একদলীয় শাসনের অবসান ঘটান। জনতার সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পথে এই প্রথম ও সার্থক পদক্ষেপ। কিন্তু এই মহৎ প্রচেষ্টা বিদ্যুতের চমকের মতই দেশের ভাগ্যাকাশকে আলোকিত করিয়াছিল। তারপর চক্রান্তের কৃষ্ণমেঘে পুনরায় জাতর ভাগ্যগগণ আচ্ছন্ন হয়। যে তিমির হনন করিয়া ১৫ই আগষ্টের যাত্রারম্ভ, সেই তিমিরেই আবার নিক্ষিপ্ত হয় জাতির ভাগ্য। উচ্চাভিলাষী সমরনায়কের ক্ষমতা দখলের পথে ধুলিস্মাৎ হইয়া যায় এক মহান বিপ্লবের চেতনায় যে ব্যারাক রাজনীতির বাংলাদেশী সংস্করণ মঞ্চস্থ হয় এদেশের বুকে- সেই একই পুরাতন ঘটনার পুনরাবৃত্তি। জনতার বিরুদ্ধে পরিচালিত এই নাটকের পোর্শচরিত্রে যারা অভিনয় করেন তারা প্রচলিত সংজ্ঞায় সকলেই রাজনীতিবিদ-ক্ষমতার মোহে অন্ধ সেই পরজীবী শ্রেণী- আপন স্বার্থই যাদের একমাত্র আরাধনা।
    তারপর বহুুপথ পাড়ি দিয়া গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে এক নায়কের রাজনৈতিক লুকোচুরি খেলা চলে। সেই লুকোচুরি খেলার রেশ আজও অব্যাহত। সর্বগ্রাসা নৈরাজ্য, দুর্নীতি, সম্প্রসারণবাদী দিল্লীর সেবাদাসত্ব এই গণবিরোধী খেলার উপজীব্য। নৈরাজ্যের নাগিনীকে ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। গত বছর (’৮০) ২৩শে মে ডেমোক্রেটিক লীগের জনসভায় দিল্লীর তল্লীবাহক বাকশাল চক্র গ্রেনেড নিক্ষেপ করিয়া ৯টি প্রাণকে ধরাপৃষ্ঠ হইতে বিদায় দেয়। চক্রান্তের রাজনীতির [এই বীভৎস রূপ দর্শনে এই] দেশের তথাকথিত গণতন্ত্রের উপাসকদের ভ্রুবুঞ্চন পর্যন্ত ঘটে নাই। ঘটনাটিকে রহস্যাবৃত্ত রাখিয়া ধামাচাপা দিয়া রাখা হইয়াছে।
    আজ গণতন্ত্রের বাহক ও জাতীয় জীবনে সুস্থ্যতার জন্য জেহাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ ইত্তেহাদ নেব পর্যায়ে ৬ষ্ঠ বর্ষে পদার্পণ করিয়াছে। শাসকের রক্ত শাসানি আর নৈরাজ্যের উপাসক ‘দিল্লী-মস্কোর’ এজেণ্টদের বৈরিতা আর হুমকি ইত্তেহাদের বিদ্রোহী চেতনাকে বিভ্রান্ত করিতে পারে নাই। আমরা দেশের স্বার্থে নির্ভীক ভাবে ভূমিকা পালনে দৃঢ়সংকল্প।বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গত ৩৪ বছরে এই দেশের ইতিহাসের পর্বে পর্বে চক্রান্তের রাজনীতির বহুরূপী অভিনয়ের একটি চিত্র তুলিয়া ধরিবার প্রয়াস পাইব। আমাদের উদ্দেশ্য এদেশের মানুষকে এই চক্রান্তের রাজনীতির আওতামুক্ত করিয়া দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করা।
    গত ৩৪ বছর ধরিয়া কখনো স্বৈরতন্ত্র, কখনো ব্যারাক রাজনীতি, কখনো বা উভয়ের অদ্ভুত সংমিশ্রণ, আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা ও প্রশাসনক স্থবিরতা নানা ছলে এদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়া ছিনিমিনি খেলিয়াছে। ক্ষমতা লাভ ও ভোগের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট কুটিল রাজনীতির ফলশ্র“তিতে জন্ম হইয়াছে স্বার্থান্ধ রাজনীতিকের দেশ ও জাতির ভবিষ্যত দ্রষ্টা ষ্টেটসম্যানের জন্ম হয় নাই এ দুর্ভাগা দেশে।
    দুর্নীতি আজ প্রশাসনের সর্ব অঙ্গে দগদগে ঘায়ের মত বিরাজ করিতেছে। স্বাধীন দেশে প্রাসাদ চক্রান্তের রাজনীতির দৌলতে বিরাসিতা ও দুর্নীতির পাল স্রোত বহিয়া চলিয়াছে এবং অন্যদিকে দুর্বিষহ দারিদ্র্য জাতিকে পঙ্গু করিয়া ফেলিয়াছে।
    ক্ষমতার মেসনদ আঁকড়াইয়া থাকার জন্য দিল্লীর নিকট দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব পদে পদে খর্ব করা হইতেছে। দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতার ঘটনা, শেখ মুজিবের আমলে বেরুবাড়ী হস্তান্তর এবং সাম্প্রতিককালে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপে ভারতের আগ্রাসনকে কুটনৈতিক ধাপপাবাজি দিয়া ঢাকিবার ব্যর্থ চেষ্টা নতুন কোন ঘটনা নয়। ফারাক্কা বাঁধকে কেন্দ্র করিয়া গঙ্গার পানির হিস্সার ক্ষেত্রে বৈষম্যনীতি আমাদের দিয়াছে খরা, অজন্মা এবং ইদানীংকালে ভারতের ধৃষ্ট আচরণ। ফারাক্কা সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী কালীন চুক্তিতে প্রদত্ত ছিলেফোঁটা পানিও না দেওয়ার সদম্ভ ঘোষণা এবং প্রকারান্তরে ভারতের সেই গভীর চক্রান্তের রূপায়নের ফাঁদে বাংলাদেশকে আজ আটকানো হয়েছে। এটা হইল পানি সমস্য সমধানের জন্য গঙ্গা ব্রহ্মপত্র খান খননের ভারতীয় প্রস্তাব বাংলাদেশকে দিয়া গিলানো।
    ইন্দিরার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ভারতের পূর্বপ্রান্তে বিদ্রোহ দমনের নামে বাংলাদেশের উপর দিয়া জলে-স্থলে সৈন্য পরিচালনার দুরাভিসন্ধি হিসাবেই গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র খান খননের প্রস্তাব ভারত দিয়াছে। আমাদের পররাষ্ট্রীতির ক্ষেত্রে ব্যর্থতার স্থলে দিল্লীর আশীর্বাদ পুষ্ট হইয়া আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে স্বৈরশাসনের ষ্টীমরোলার চালানো এবং এইভাবে ক্ষমতার মসনদ চিরস্থায়ী করা। পাকিস্তান আমল হইতেই ছাউনির উচ্চভিলাষ চক্রান্তের জন্ম দিয়াছে। জাতির ভাগ্যে যে দুর্দৈব চলিতেছে, উহার প্রতিকারের সহিত ইহার কোন সংশ্রব নাই এবং থাকিতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে তথাকথিত চাকমা বিদ্রোহকে উস্কানি দিয়া বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে ইন্দিরা গান্ধী। এই আগ্রাসী উদ্দেশ্যেই অনুষ্ঠিত হইয়া ইন্দিরা গান্ধী মানবেন্দ্র লারমা বৈঠক। এই আগ্রাসী তরবারীর একদিক দিয়া বাংলাদেশকে স্থিতিহীনতার গহ্বরে নিক্ষেপ করা হইবে, আর এ দিক দিয়া কিছু সংখ্যক চাকমাকে বিভ্রান্ত করিয়া অশান্ত মিজোরামে বসতি স্থাপন করাইয়া মিজোচাকমা কোন্দল সৃষ্টি করা হইবে-যাহাতে অশান্ত পূর্ব ভারতকে দিল্লীর বাগে রাখা যায়।
    যে পেশীশক্তি ১৯৭৫ সনের ১৫ই আগষ্ট দেশকে দিল্লীর ছোবলমুক্ত এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সূচনাকে চক্রান্তের মাধ্যমে উচ্ছেদ করিয়াছে, উহাই বারংবার জাতির ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের অশনিপাত ঘটাইয়াছে। আমরা বারংবার বলিয়াছি, জাতির নিকট এই হুশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছি, রাজনীতি জনপ্রতিনিধিদের চর্চার বিষয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোথাও রাজনীতি ক্ষেত্রে ব্যারাকের স্থান নির্দেশ করা হয় নাই। আমাদের এই সুপরামর্শ দেশের বলদর্পী ক্ষমতাসীনদের বধির কর্ণে আজও প্রবেশ করে নাই।
    জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ এবং ক্ষোভ আজ ধর্মঘট, বিক্ষোভ আর বোমাবাঝি অস্ত্রের ঝংকারের মধ্য দিয়া ফুঁসিয়া উঠিয়াছে। আন্দোলনের নামে এই অসুস্থ্য বিকার দেশকে এক নৈরাজ্যের দিকে ঠেলিয়া দিতেছে।
    স্বৈরাচরী সরকার ক্ষমতার আসনকে পাকাপোক্ত করার জন্য প্রথম দিকে বেশ কিছু চমকপ্রদ কার্যকলাপের অবতারণা করে। ঘটা করিয়া মন্ত্রী, উপদেষ্টা, ক্ষমতাসীন দলের নেতা, কিছু উপনেতা নিজেদের সম্পত্তি ঘোষণা করেন। জাতীয় সংসদের বাহিরে এই ঘোষণা দেওয়ার অর্থ জাতিকে ধোকা দেওয়া। বাকশালী মন্ত্রী, এমপিদের হিসাব দেওয়া সংক্রান্ত তথাকথিত ফরমান জারির বিষয়টিও ছিল সাধারণ মানুষের চক্ষে ধূলিনিক্ষেপ। আজ এ সম্পর্কে কোন উচ্চবাচ্য শোনা যায় না। চারিদিক হইতে আটঘাট বাঁধিয়া এখন সমস্ত সাধু সংকল্প হিমাগারে রাখা হইয়াছে।
    আমলা-মন্ত্রীর দুর্নীতি আজ কোন বিরোধী পক্ষের প্রচারনা নয়। খোদ মন্ত্রীদের কেউ কেউ দুর্নীতির বহর দেখিয়া দিশাহারা হইয়া পড়িতেছেন। বঙ্কিম চন্দ্রে ‘কমলাকান্তোর’ ভূমিকার এ অভিনয়ে ভবী ভুলিবার নয়।
    সারাদেশকে লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করিয়া এবং ছাউনির গণতন্ত্রের নেশায় বুঁদ ক্ষমতাসীন চক্র ভালমন্দের আদর্শের পরিবর্তে চোখ বুঁঝিয়া মানিয়া চলার মর্তাভজা আদর্শ ঢাকঢোল সহকারে প্রচার করিতেছে। ডান হাত দিয়া গণতন্ত্রের টুঁটি চাপিয়া ধরিয়া বাম হাতে গণতন্ত্র দেওয়া কেবল ব্যক্তি বিশেষের অধিকার এই সর্বনাসা মত  দেশের বিবেককে বন্ধক রাখিয়াছে অর্থ লোভ আর দুর্নীতির নিকট।
    আমরা ইহার বিরুদ্ধে সকল শক্তি লইয়া প্রতিশ্র“তবদ্ধ হইয়া দেশবাসীকে আহ্বান জানাইঃ বলীর পদে দুর্বলের আত্মদানের পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলুন-১৫ই আগষ্টের সফল বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া ক্ষমতার মঞ্চ যে প্রতারক শক্তি দখল করিয়াছে, তাহার অবসান চাই। বিপ্লবের নায়কদের সসম্মানে দেশে ফিরাইয়া আনিতে হইবে। ফারাক্কা বাঁদের বিকল্প গঙ্গাবাঁধ নির্মাণের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সর্বপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। দহগ্রাম আঙ্গরপোতার ছিটমহাল লইয়া ভারতীয় চক্রান্ত ব্যর্থ করিতে হইবে। বেরুবাড়ী পুনরুদ্ধার ছাড়া জাতীয় সার্বভৌমত্ব অর্থহীন। তালপট্টির অধিকারকে আলোচনার কুয়াশার আড়াল দিয়া ঢাকা দেওয়া চলিবে না।