উদ্ধত যৌবন এই দিনে শপথ গ্রহণ করবে

ফন্ট সাইজ:

শুক্রবার, ১ ই ডিসেম্বর ’৮১-অলি আহাদ


    ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। এই দিনে আমরা গর্বের সাথে স্মরণ করি দেশের স্বাধীনতার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য যাঁহারা শাহাদাত বরণ করিয়াছেন। পাকিস্তানের শোষণ হইতে দেশকে মুক্ত করার এবং গণতন্ত্র কায়েে মর স্বপ্ন চোখে লইয়া যাঁহারা হাসিমুখে জীবন দিয়াছেন, সর্বস্ব হারাইয়াছেন এবং আজ যাহারা পঙ্গু জীবন যাপন করিতেছেন, ব্যাথায় ও শ্রদ্ধায় তাঁহাদের আত্মত্যাগের গর্ব লইয়াই বিজয় দিবসে আমাদের চাওয়া ও পাওয়ার হিসাব নিকাশ মিলাইয়া লইতে হইবে।
    সেদিন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতসহ যে সকল দেশ সাহায্য করিয়া ছিল, তাহাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
    রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার লক্ষ্য ও আদর্শ ছিল বিশ্বের দরবারে মাথা উচু করিয়া দাঁড়াইবার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা। কাহারও করণা কিংবা প্রলোভনের নিকট আত্মবিক্রয় নহে, কিংবা কাহারও ভ্রুকুটির ভয়ে নতশীর ধিককৃত জীবন যাপন নহে।
    স্বাধীনতার ১০ বছরের পথ পরিক্রমা করিতে গিয়া আজ দেখিতেছি, স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্যদাতা ভারত আজ তাহার গুপ্তনখদন্ত বিকাশ করিয়া আমাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করিয়া তাহার করুণার ওপর নির্ভরশীল রাখিতে চাহিতেছে। ফরাক্কা বাঁধ দিয়া নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ করিয়া আমাদের ভাতে পানিতে মারার চক্রান্তের কাছে আজ আমরা অসহায়। দেশকে ভারতীয় বাজারে পরিণত করার চক্রান্ত অব্যাহত। পার্বত্য চট্টগ্রামের গোলযোগে উস্কানি দিয়া এক চরম বিশৃংখল ার মুখে কাপ্তাই হাইড্রোইলেকট্রিক প্রজেক্ট ষড়যন্ত্র চলিতেছে। উপজাতিদের ভারত গমন ও পুনর্বাসন লইয়া বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা বেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার কৌশল এবং দিল্লীও ইহাকে তাহার কৌশল অস্ত্র হিসাবে ভবিষ্যতে সুযোগমত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারে জন্য তুণে রাখিয়া দিয়াছে। আজ একাদশ বিজয় দিবসে দাঁড়িয়ে দুঃখ ব্যথা আর ক্ষোভে লক্ষ্য করিতেছি, যে অর্থনৈতিক শোষণ, অবিচার হইতে মুক্তি এবং গণতন্ত্রের জন্য আমাদের বীর সন্তানরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরিয়াছিল, আজ স্বাধীন বাংলাদেশে সেই গণতন্ত্রের নাম নিশানা নাই এবং অর্থনৈতিক শোষণের কেন্দ্র পরিবর্তন হইয়াছে। আমাদের সরকারের নীতি আমাদের ইসলামাবাদ হইতে দিল্লী নিয়া আসিয়াছে। এই পরিবর্তনের জন্য আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দেয় নাই, হুইল চেয়ারে ক্র্যাচের শরীরে ভর দিয়া চলিবার দুর্ভাগ্য বরণ করে নাই।
    গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত একটা দেশের সংবিধান। পাকিস্তানে সেই সংবিধানের যে করুণ ইতিহাস এবং তার যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের হইয়াছে, আজ স্বাধীন বাংলাদেশে সংবিধান সেই ক্ষমতার মুষ্টি নিপীড়নে বিবর্ণ, মূর্চ্ছিতবৎ।
    গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনী প্রত্যাহারের পরিবর্তে উর্দিপরা রাষ্টনায়কের নিকট হইতে পাইয়াছি ৫ম সংশোধনী সংবিধান লংঘনের এবং সেদিনের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে আমাদের ব্যাপক গণ আন্দোলন ও কর্মপন্থার প্রতি উপক্ষো প্রকাশ করিয়া যাহারা ক্ষমতাসীনের কথায় মুগ্ধ হইয়া রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচারের শিকার হইয়াছেন, আজ সেই বিপদ শত বাহু প্রসারণে গণতন্ত্রের সামান্য বাতাবরণটুকু ধ্বংস করিতে উদ্যত। গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতিফলন ঘটে সংবিধানের লক্ষ্য ও আদর্শের মধ্যে যখন সেই সংবিধানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতার সীমা ও জনগণের অধিকারের নিশ্চয়তা নির্দিষ্টট থাকে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণের বিশেষ সুযোগ সবিধার যে অধিকার, সেই ক্ষমতা বলে সংবিধান অনুযায়ী গৃহীত আইন কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারী আমলাদের। সামরিক বাহিনীও এই সাংবিধানের রীতিনীতি ও আইনে রক্ষক। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার সাংবিধানিক অধিকার সামরিক ও বেসামরিক কোন আমলার নাই। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সাংবিধানিক সুযোগ সুবিধার অধিকার দাবী করিয়া অধীনস্থ কোন কর্মচারী প্রকাশ্যে কোন রাজনৈতিক মত প্রদান বা বিতর্কে অবতীর্ণ হইতে পারেন না। জেনারেল এরশাদ এই ধরনের বক্তব্য সম্পাদকদের ডাকিয়া এক সম্মেলনে উপস্থিত করিয়াছেন। তিনি কি বলিয়াছেন, তাহারা যৌক্তিকতা বিচার বিবেচনার বিষয়টি আমাদের আলোচ্য নহে। আমাদের বক্তব্য অতি স্পষ্টঃ তিনি সংবিধান সংঘন করিয়া সম্পাদকদের সম্মেলন ডাকিয়া বক্তব্য দিয়াছেন। কোন সরকারী কর্মচারীর পক্ষে এ ধরণের কথা বলার অধিকার সংবিধান দেয় নাই। আমরা আশা করিয়াছিলাম, প্রেসিডেন্ট বিচারপতি গজনাব আবদুস সাত্তার সংবিধান রক্ষা করিবার জন্য অগ্রসর হইবেন। কিন্তু দঃখের বিষয়, তিনি সংবিধানের মর্যাদা রক্ষায় একটি আঙ্গুলও উত্তোলন করেন নাই। তাঁহার এই ব্যর্থতা আমরা গুরুত্বহীন মনে করি না। তাহাকে অবশ্যই দেশবাসীর নিকট জবাবদিহি করিতে হইবে যে, সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করার শপথ লইয়াই তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন। আজ কোন অজ্ঞাত কারণে তিনি সেই গুরু দায়িত্ব পালনে শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ হইলেন?
    কারণ, এই সমস্ত ঘটনাবলী ও কার্যক্রম অতীতে আমাদের গণতন্ত্রকে টুটি টিপিয়া হত্যা করিয়াছে। পৃথিবীর যে কোন গণতান্ত্রিক দেশে সামরিক বাহিনীর কোন কর্মকর্তা নির্বাচিত প্রতিনিধির সহিত রাজনৈতিক বিতর্কে লিপ্ত হইলে তাহাকে কাল বিলম্ব না করিয়া অপসারণ করা হয়। ১৯৬২ সালে চীন ভারত সীমান্ত যুদ্ধের সময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কৃষ্ণ মেনন ও সেনা প্রধান থিমিয়ার মত বিরোধ হয়। এই জন্য শেষ পর্যন্ত থিমিয়াকে বিদায় নিতে হয়। কোরিয়া যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাধ্যক্ষ জেনারেল ম্যাক আর্থারকে যুদ্ধের নীতিনির্ধারণী বক্তব্য দেয়ার জন্য পদত্যাগ করিতে হইয়াছিল। প্রেসিডেন্ট ট্টুম্যানের সহিত তাহার মতবিরোধের পরিণতির জন্য দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ফিলিপাইনে তাহার বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের গৌরব তাহার রক্ষাকবচ হইয়া দাঁড়ায় নাই। সাংবিধানিক মর্যাদা রক্ষার এই পূর্বশর্তের জন্যই ভারতে আইনের প্রতি, জনপ্রতিনিধিদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি আনুগত্যের ট্রাডিশান আজও চলিতেছে।
    আর আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সমগ্র জাতর শ্রদ্ধার সুযোগ নিয়া মুষ্টিমেয় পথভ্রষ্ট, লক্ষ্যভ্রষ্ট মুক্তিযোদ্ধা লুটতরাজ, হাইজ্যাক ইত্যাদি সমাজ বিরোধী কাজে লিপ্ত হয়। তাহাদের প্রতি সমর্থন জানাইয়া একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা নিজেদের হীনস্বার্থ উদ্ধার করিয়াছে। শুধু তাই নয়, এভাবে মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করা হইয়াছে। অপরাধ উৎসাহিত হইয়া সমাজজীবনের স্তরে স্তরে দুর্নীতি ও ক্ষমতার লোভ দুর্নিবার করিয়া তুলিয়াছে। ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগের জন্য কুৎসিত প্রতিযোগিতা উর্দি পরিহিত জিয়াকে সংবিধান লংঘনে সাহসী করিয়াছিল। তিনি সামরিক আইন প্রশাসক থাকিয়া নির্বাচনে অংশ নেন এবং এই ভাবে সংবিধান সংঘন করেন। রাজনীতিকদের একটা বড় অংশ তাহার সহিত হাত মিলাইয়াছিল। জিয়া সাহেব ৫ম সংশোধনী আনিয়া সংবিধানের যে রূপ পাল্টাইয়া দিয়াছেন উহা ৪র্থ সংশোধনী অপেক্ষা গণতন্ত্রের পক্ষে অধিক দুর্যোগ সৃষ্টি করে।
    স্বাধীনতা অর্জনের ১ বছরে ক্ষমতার কাড়াকাড়ি ও উচ্ছিষ্ট ভোগীদের কদর্য কলহের মধ্যে দিয়া দুর্নীতির পঙ্কিল স্রোতে লোক একশ্রেণীর অবগাহন করিয়াছেন। উর্দি পরা গণতন্ত্রের ভক্তিবিলাসের গদ গদ কণ্ঠের আবেদন এখন আর কাহারো মন কাড়িতে পারিতেছে না। স্বনির্ভর অর্থনীতি দুর্নীতি আর বিলাস বাসনের গহবরে নিমজ্জিত। অনুৎপাদন খাতে ব্যয় বহর দেশের বৈদেশীক মুদ্রার ভাণ্ডার প্রায় শুন্য করিয়াছে। আই, এম এফ উহার সম্প্রসারিত তহবিলের সুবিধা খাতে দুই কিস্তি ঋণ দিয়া এখন কিস্তি দেওয়া বন্ধ করিয়া দিয়াছে। আমাদের অর্থনীতি আজ দেউলিয়ার দারপ্রান্তে। মার্কি ‘নিউজউইকের’ ভাষায় “বাংলাদেশ এক দীর্ঘ মেয়াদী দুর্যোগপূর্ণ এলাকা।” আজ স্বাধীনতা অর্জনের ১ বছর পর পশ্চাতের দিতে তাকাইয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস পড়ে।
    নজরুলের ভাষায় গ্রাম বাংলার আহাজারি ঃ ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় শুধু ভাত নুন। চরিত্রভ্রষ্ট কিছু রাজনীতিক ও উর্দি পরা গণতন্ত্রের প্রবক্তারা স্বাধীনতাকে উপহাসের বস্তুতে পরিণত করিয়াছে।
    গত কয়েক বছর ধরিয়া শবলুব্ধ গৃধনুদের মত ক্ষমতার কাড়াকাড়ির মধ্যে যে স্বচ্ছদৃষ্টির অধিকারী তরুণরা গণতন্ত্রের দাবীতে অটল থাকিয়া ধৈর্য, বিশ্বাস ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়াছে, তাহারা এই বিজয় দিবসে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আদর্শ সমুন্নত রাখার শপথ গ্রহণ করিবে এবং উহা কার্ধে পরিণত করার জন্য সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দুর্বার আন্দোলন গড়িয়া তুলিবে, দেশবাসী তাহাদের মুখের দিকে এই আশায় তাকাইয়া আছে।
    সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ব্যতীত জনসাধারণের শক্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরানো সম্ভব নয় এবং এই দুইটি উপাদান ছাড়া দিল্লীমস্কোর আধিপত্যবাদী কুটজাল ছিন্ন করিয়া দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কেহ নিরাপদ করিতে পারিবে না। এক ব্যক্তির স্বৈর শাসন দেশের স্বাধীনতার ভিত দুর্বল করিয়া তোলে এবং প্রবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ছত্রচ্ছায়ায় গদি রক্ষার জন্যই সার্বভৌমত্ব বিকাইয়া দিয়া থাকে।
    দেশের যুব সমাজিক ইতিহাসের এই দৃষ্টান্ত হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিয়া সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দের উর্ধ্বে উঠিয়া সংগ্রামী কাফেলাকে বর্তমান মরীচিকালুবদ্ধ ভ্রষ্ট পথ হইতে ফিরাইবার দায়িত্ব নিতে হইবে।
    এজন্য ত্যাগ আর তিতিক্ষার প্রয়োজন রহিয়াছে। জাতীয় অর্থনীতি আজ রঙীন টেলিভিশান, নিয়ম আলোর বিভ্রম এবং অধিকাংশের অর্ধাহারশীর্ণ পৃষ্ঠে মুষ্টিমেয় ব্যক্তির প্রতিষ্ঠিত বিলাস সিংহাসন অটুট রাখার লক্ষ্যে পরিচালিত। তাই যক্ষারোগীর মুখের রক্তোচ্ছাসের মতোই দেশের আর্থিক চেহারা। কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং কুচ্ছতাসাধন ছাড়া জাতীয় অর্থনীতিক রাহুযুক্ত করা সম্ভব নয়। এজন্য চাই বলিষ্ঠ মনের অধিকারী যুবকদের কর্মশক্তি ও উদ্যোগ।    
    এই লক্ষভ্রষ্ট আত্মস্বার্থপরায়ণ শাসকশ্রেণী যব সমাজের শক্তি সম্পর্কে ভীত। তাই তাহাদের প্রলুব্ধ করার জন্য ইহারা নানা ফাঁদ পাতিয়াছে ছলনার জাল বিস্তার করিয়াছে। সচেতন যুবসমাজকে প্রভুর আহার্য শোভিত টেবিলের তলায় ছুঁড়িয়া দেওয়া উচ্ছিষ্ট আর হাড়ের টুকরার কাড়াকড়ির কুশ্রীতার বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে। এই বারের বিজয় দিবস দেশের যুব সমাজের কাছে নিষ্ঠা, ত্যাগ আর তিতিক্ষার দাবী নিয়া উপস্থিত হইয়াছে। শহীদদের রক্ষের সহিত যুব সমাজ বিশ্বাসঘাতকতা করিতে পারে না। এক যুগ আগে এই যুব সমাজই রক্ত দিয়াছিল একটি স্বপ্নকে বুকে লালন করিয়া। সেই স্বপ্নের ফুলটি আজ রিরংসাগ্রস্ত লোলচর্ম বৃদ্ধের লোভী করতলে পিষ্ট। উদ্ধত যৌবন এই লোভের মাথায় পদাঘাত হানিয়া এই দিনে শপথ গ্রহণ করিবে।