একুশের শাশ্বত আবেদন বিদ্রোহের, বিপ্লবের

ফন্ট সাইজ:

শুক্রবার, ২১শে ফেব্র“য়ারী ’৮২-অলি আহাদ


    বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য শহীদানের আত্মদানে অমর ২১শে ফেব্র“য়ারীর আবেদনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তানে ৯ বৎসর পর্যন্ত সংবিধান ছিল না। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্র“য়ারী ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়া জনতার রুদ্ররোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে। গণঅভ্যুত্থানের এক উত্তার ঢেউ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনপদ ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করিয়া প্লাবিত করে। এই আন্দোলনের মর্মমূলে জনতার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দাবী সেই দিন ধ্বনিত হইয়াছিল।
    ভাষা আন্দোলনের গণতান্ত্রিক চরিত্র এই শ্লোগান হইতে স্পষ্টতর হয় যে, পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি দিতে হইবে। উর্দু ভাষার প্রতি কোন বিদ্বেষ ছিল না বলিয়াই ‘উর্দু বাংলা ভাই ভাই রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ সেই শ্লোগানও সেদিন উচ্চারিত হইয়াছে। সমস্ত প্রকার সংকর্ণতামুক্ত ছিল বলিয়াই আন্তর্জাতিক কাজে কর্মে ইংরেজী ভাষাকে ব্যবহারের কথাও বলা হইয়াছিল।
    পাকিস্তানের শাসকদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বিপ্লবের সমুদ্র গর্জন শোনা গিয়াছিল ২১শে ফেব্র“য়ারী। ইহা কোন আকস্মিক আবেগ কিংবা উত্তেজনার ফসল ছিল না। অগণতান্ত্রিক শাসক ব্যবস্থার প্রতিকারের জন্য বিরোধী দল হিসাবে ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানে তথা সমগ্র পাকিস্তানে বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা হয়। এই দল গঠনের অব্যবহিত পূর্বেই সংগঠণের সম্পাদক জনাব শামসুল হক উপনির্বঅচনে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও নানা অযুহাতে শাসক শ্রেণী কর্তৃক তাঁহাকে প্রাদেশিক পরিষদে বসিতে দেওয়া হয় নাই। এই প্রতিবাদী শক্তির ইতিহাসকে বুঝিতে হইলে আমাদের আরও পিছনে দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন।    আমাদের উদার মানবতাবাদ অথচ অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও লড়াইয়ে, পরাধীনতার বেদনা এবং স্বাধীনতার আকুতি আমাদের শিল্প সাহিত্যে প্রকাশ করিয়াছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সাহিত্যের অঙ্গনে যে মুক্তবাণী জ্বলিয়া উঠিয়াছিল, তাহারই অগ্নিগর্ভ প্রকাশ ঘটিয়াছে মধ্যযুগের প্রদোৎ আলোয় এবং আধুনিক যুগের উষালগ্নে তিতুমীর শরীয়তুল্লাহর ইসলামী সাম্য ও মৈত্রীর বাণী লইয়া ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এবং নিঃশেষে প্রাণ দানের মধ্যে। বিংশ শতকের প্রথম দিকে ফরাসী বিপ্লবের ভাবধারায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, পর শাসনের গ্লানির বিরুদ্ধে, বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে, ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, সূর্যসেনের আত্মদান সেই রক্ত পিছল পথেই আসিয়াছে। তাহারই উজ্জল উত্তরাধিকার লইয়া বরকত, সালাম, জব্বার, রফিক এই দেশের বুকে নতুন ইতিহাসের সূচনা করিয়াছে। রক্তে রক্তে আঁকা এই প্রচ্ছদপট কালক্রমে জাতীয় স্বাধীনতার গৌরবময় অধ্যায় সূচনা করিয়াছে।
    এদেশের ইতিহাস গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে সাহসিক লড়াইয়ের। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আমাদের পথ নির্দেশের দ্রুবতারা হিসাবে মহান একুশে ফেব্র“য়ারী দুর্যোগের দিনে জাতিকে পথ দেখাইয়াছে, নির্ভীক নিঃশঙ্কাচিত্তে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইবার আহ্বান বারংবার জানাইয়াছে।
    স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বহুরণক্ষেত্রে অস্তিত্বের সারথী হিসাবে ২১শে ফেব্র“য়ারীর অন্তর্নিহিত শক্তি জাতিকে চালিত করিয়াছে। গণতন্ত্র আজ চক্রান্তের বিষ নিঃশ্বাসে নির্জীব। জাতীয় অর্থনীতির সংকট আরও তীব্র হইয়াছে ফারাক্কা বাঁধের অভিশাপে। শস্ব্য শ্যামলা ছায়া সুনিবিড় বাংলাদেশে পদ্মার মত্ততা আজ স্মৃতিলীন। নদীতে নদীতে চর জাগিয়াছে, নাব্যতা ব্যাহত। ্ত্তরাঞ্চলের সহিত রাজধানীর যোগাযোগ ক্ষীন হইয়া আসিতেছে। মরু সদৃশ্য প্রান্তর পিপাসার্ত। ভারতের ইন্দিরা সরকার মানবেন্দ্র লারমার তথাকথিত শান্তিবাহীনিকে অস্ত্রসজ্জায়, অর্থবলে বলীয়ান করিয়া অকপর্ণভাবে ভারত ভূমিকে ব্যবহারের সুযোগ প্রদান করিয়া, বেকায়দা অবস্থায় আশ্রয়স্থলের নিশ্চয়তা দিয়া কাপ্তাইয়ের পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস করার জন্য যে ষড়যন্ত্র জাল বিস্তার করিয়াছে, জাতিকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা দূরে থাকুক, ক্ষমতালোভী সরকার প্রতিপদে ভারতের নিকট আত্মসমর্পন করিয়া চলিয়াছে। বেরুবাড়ী ফেরত পায় নাই বাংলাদেশ, দহগ্রাম আজ ভারতের ভ্রƒকুটিতলে রুদ্ধশ্বাস প্রহর গুনিতেছে, দক্ষিণ তালপট্টি নিয়া আমাদের সরকার টালবাহানা করিতেছে। একমাত্র মহান একুশের মৃত্যুঞ্জয়ী আন্দোলনের দীক্ষা লইয়া এই দুর্যোগোর মোকাবেলায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা যাইতে পারে।
    পার্বত্য চট্টগ্রামে মাতৃভূমির অখণ্ডত্ব রক্ষর পবিত্র লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বি, ডি, আর এর যে সমস্ত সদস্য শাহাদাৎ বরণ করিয়াছেন, তাহাদের প্রতি দেশবাসীর অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। আমরা কায়োমনোবাক্যে আল্লাহর দরগাহে কামনা করি তাঁহারা যেন জান্নাতুল ফেরদৌসে প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করেন।
    বাইরের এই চক্রান্তের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে সংসদীয় গণতন্ত্রকে ক্ষমতার দ্বন্ধ এবং প্রবলের মুষ্টিপীড়নে বলহীন করার চক্রান্ত চলিতেছে। সেনাপতি জেনারেল এরশাদ সংবিধান লংঘন করিয়া বক্তব্য রাখিতেছেন। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, পাকিস্তানের ইতিহাস হইতে শিক্ষা লাভ করিতে আমরা ব্যর্থ হইয়াছি। এক গণতন্ত্রহীন পরিবেশে দেশ শাসন করিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার প্রচেষ্টায় পাকিস্তান দ্বিখন্ডিত হইল। জাতি কি অতীত অভিজ্ঞতা হইতে শিক্ষা লাভ করিবে না? এ প্রশ্নের জবাব এই শহীদের রক্তস্নাত একুশের স্মরণীয় দিনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করিয়াই জাতি দিতে পারে। শুধু আবেগ সর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতা আত্মপ্রবঞ্চনাকে স্ফীত করিবে, জাতিকে বিভ্রান্তির পক্ষে নিমজ্জিত করিবে।
    জাতীয় জীবনে এই সংকট দেখা দিয়াছে সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ততধিক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী, ক্ষমতার প্রতি উদগ্র মোহ, আতœস্বার্থ উদ্ধার, জনতার মুখের গ্রাস কাড়িয়া বিলাসের স্রোতে গা ঢালিয়া দিবার মানসিকতা হইতে। জীবনকে যদৃচ্ছ উপভোগের দৃষ্টিভঙ্গীই সমাজের স্তরে স্তরে দুর্নীতি বাসা বাধিয়াছে। সরকার যে ইহার প্রধান পৃষ্ঠপোষক উহা বহু সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ ও দুর্নীতির দায়ে মন্ত্রিসভা বাতিলের সিদ্ধান্ত হইতে প্রমাণত। ইহা ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে আত্মকলহের পরিণতি। রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করিয়া প্রকৃত পক্ষে দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ হইবে না। জিয়ার আমলে নির্বাচনের টাকা পয়সা এদিক ওদিক করিবার জন্য যাহাকে সরিয়া যাইতে হইয়াছে তাহারই নতুন করিয়া মন্ত্রিসভায় প্রবেশ প্রমাণ করে দুর্নীতির রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দল কতখান দক্ষ। এইভাবে দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ সম্ভব নয়। আর এই দুর্নীতি এবং অপচয় ও আমলাতান্ত্রিক গদাই লস্করী চাল দেশের খাদ্যাভাবের জন্য প্রকৃত পক্ষে দায়ী। সরকারী নীতি, প্রবঞ্চনামূলক প্রচারধর্মিতা প্রকৃত অবস্থা গোপন করিয়া দেশকে এক ভয়াবহ খাদ্য সংকটের দিকে ঠেলিয়া দিয়াছে।
    স্বাধীনতার এক যুগ পর মহান একুশে ফেব্র“য়ারীর এই দিনটিকে আমাদের জাতীয় আশা আকাঙ্কার স্মারক হিসেবেই দেখিব না, যে অন্তর্নিহিত লক্ষ্যে সেদিন তরুণরা রাজপথে রক্ত দিয়াছে, জাতীয় মুক্তির সেই সঠিক লক্ষ্য হইতে আমরা ভ্রষ্ট হইব নাÑ এই শপথই গ্রহণ করিব এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য গণতন্ত্রের পতাকা, যাহা ইতিমধ্যেই শাসকের ক্ষমতার দর্পের হাতে প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হইতেছে, তাহা বহন করিবার দায়িত্ব জাতিকে আজ গ্রহণ করিতে হইবে।
    একুুনেশ ফেব্র“য়ারীর আবেদন শাশ্বত। এই আবেদন বিদ্রোহের, বিপ্লবের। যুগে যুগে এই বিদ্রোহ ও বিপ্লবের আবেদনই সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাতিকে উজ্জীবিত করিবে।