৭২ সংবিধানই একমাত্র দিকদর্শন

ফন্ট সাইজ:

শুক্রবার, ২৮শে মে ’৮২-অলি আহাদ


    একটি দেশের স্থিতিশীলতা এবং জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলি পূরণের গ্যারান্টি হইল সংবিধান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নয়টি বছর সংবিধান ছিল না; কিন্তু ভারতে সংবিধান ছিল। এই সংবিধান থাকার জন্যই ভারতে আজ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক কাঠামো নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে বজায় রহিয়াছে। সরকারের পরিবর্তনের ধারা সেখানে গণতান্ত্রিক ধারায় চলিয়া আসিতেছে।
    সংবিধানবিহীন দেশে পাকিস্তানে ১৯৫৩ সালে গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনকে বরখাস্ত করিলে পাকিস্তানে কেউ টু শব্দটি করে নাই। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন সদ্য কারামুক্ত লুঙ্গীসর্বস্ব মজলুম জননেতা নির্লোভ মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি পল্টন ময়দানে দ্ব্যর্থহীনকণ্ঠে এই বরখাস্তকরণকে নিন্দা করিয়াছিলেন। রাজনীতিকদের পরিবর্তে দেশের ক্ষমতার কলকাঠি আমলাতন্ত্রের হাতে চলিয়া যায়।
    পাকিস্তানে সংবিধান না থাকার জন্যই মৌলিক অধিকারবঞ্চিত জনসাধারণ পরিস্থিতির নিকট অসহায় আত্মসমর্পণে বাধা হয়।
    গত ৩৫ বছরে আমাদের দেশের মানচিত্র দুইবার পরিবর্তন হইয়াছে। এই ৩৫ বৎসরের মধ্যে কোন সংবিধান স্থায়ী হইতে পারে নাই।
    তারপর নানা কুটিল চক্রান্তের আবরণ ভেদ করিয়া ১৯৫৬ সালের সংবিধান রচনা করেন জনপ্রতিনিধিগণ। কিন্তু এই সংবিধানের কার্যকারিতাকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র কখনো থামিয়া থাকে নাই। আমরা সামরিক শক্তির আঁতাত প্রতিষ্ঠিত হয়। ইস্কান্দার মীর্জা ও সেনাপতি আইয়ূবের মারফত পর্দার অন্তরালে চলিতে থাকে ষড়যন্ত্র। জনপ্রতিনিধিগণের নিকট হইতে সংবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনার সুযোগ কাড়িয়া লওয়া হইল। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে জেনারেল আইয়ূব খান দেশে সামরিক শাসন জারী করিলেন। দেশের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সাংবিধানিক পন্থায় না করিয়া স্থিতিশীলতার দোহাই দিয়া নেপথ্যে থাকিয়া আইয়ূব খানের ষড়যন্ত্রের অন্যতম শরিক ইস্কান্দার মীর্জা প্রেসিডেন্ট থাকাকালে কন্ট্রোলড ডেমোক্রেসির তত্ত্ব আওরাইতে থাকেন। সামরিক শাসন জারীর তিন সপ্তাহের মধ্যে আইয়ূব খান নিজেই ক্ষমতার মসনদ দখল করিয়া নিলেন!
    দেশবাসী ইহার পর আইয়ূব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের সহিত পরিচিত। দেশের মানুষের প্রতিভার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ’ কথার দোহাই দিয়া এই অভিনব গণতন্ত্র আইয়ূব খান প্রচার করিলেন এবং ’৬২ সালে আইয়ুব খান একটি সংবিধান দেশবাসীকে চাপাইয়া দিলেন। এই সংবিধানে জনসাধারণের মতামত প্রতিফলিত হয় নাই। আইয়ুবের সংবিধান ও মৌলিক গণতন্ত্র কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারে নাই। তৃতীয় বিশ্বের বহু নেতাই জনগণের ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতায় গিয়া একচ্ছত্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করিয়া দেশবাসর রক্তদানের মর্যাদা ও তাহাদের প্রতি প্রদত্ত প্রতিশ্র“তি লঙ্ঘন করিয়া ক্ষমতায় ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ চালু করিয়া দেন। ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণো, ঘানার নক্রুমা, হাইতির ডোভেলিয়ার তথা তৃতীয় বিশ্বের সামরিক একনায়করা গণতন্ত্র বিধ্বংসী শ্লোগান দেন গণতন্ত্রের আগে একটি অভিনব বিশ্লেষণ যোগ করিয়া। কখনও গাইডেড ডেমোক্রোসি, কখনও কন্ট্রোল্ড ডেমোক্রাসি, কখনও মৌলিক গণতন্ত্র, কখনও বা গ্রসব্রƒট (খাসমুল অর্থাৎ বুনিয়াদী ডেমোক্রাসীর শ্লোগান শোনা যায় ইহাদের মুখে। ইহারা নিজেদের স্বার্থে দেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলিয়া দিতে ইতঃস্তত করেন না।
    তারপর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে জনপ্রতিনিধিগণের দ্বারা রচিত একটি সংবিধান তার সমস্ত সবলতা ও দুর্বলতা লইয়াই জাতির সামনে একটি পথ নির্দেশ করিয়াছিল। একটি সংবিধানকে উহার প্রয়োগের মধ্য দিয়াই ত্র“টি-বিচ্যুতি দূর করা সম্ভব কিংবা জনসাধারণের ইচ্ছা আকাঙ্খা ও লক্ষ্যের প্রতি মর্যাদা দিয়া প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যাইতে পারে। এবং একমাত্র জনপ্রতিনিধিরাই সংবিধান সংশোধনের অধিকারী। ডিক্রী জারী করিয়া সংশোধন করার পরিণতি দেশে একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা। যেমন জিয়া করিয়াছে।
    জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা রচিত ৭২ সালের সংবিধান এক ব্যক্তির ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য এবং একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের নামে আবার জবাই করা হইল। শেখ মুজিবুর রহমান পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা এবং চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হইয়াও তৃপ্ত হইলেন না। কবি শৈলীর “স্বৈরতন্ত্রের মুখোশ” কবিতায় স্বৈরাচারীর ভাষায় আই এ্যাম দ্য গড এণ্ড কিং এ্যাণ্ড ল (আমিই ঈশ্বর, রাজা আমি বিধান)। এই স্বৈরাচারের দম্ভোক্তি অনুকরণ করিয়া সংবিধানের উপর শেখ মুজিব কসাইর ছুরি চালাইলেন সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর নামে পুরা সংবিধানের চেহারা পাল্টাইয়া দিয়া। এই দেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য বার বার রক্ত দিয়াছে, কারাগারে নির্যাতন সহিয়াছে, মাথার উপর রাজরোষ লইয়া সংসার জীবনের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়াছে। জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া শেখ মুজিব কলমের এক খোঁচায় ক্ষমতার দপ্তে গণতন্ত্রকে হত্যা করিয়াছেন এবং একনায়কত্বের আত্মঘাতী পথ বাছিয়া লইয়াছেন এবং উত্তরসূরীদের জন্য একই আত্মঘাতী পথ দেখাইয়া গিয়াছেন।
    আমাদের দুঃখ-দুর্দশা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আত্মার দারিদ্যের সূচনা সেইখান হইতেই। গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা এক ঝলক সুর্যোদয়ের মত দেখা দিয়া ক্ষমতার চক্রান্তের ঘন মেঘের দুর্যোগের আড়ালে অস্ত গিয়াছে। এরপরে ’৭৫ সালের ১৫ আগষ্টে জাতীয় বিবেককে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কর্ণেল রশীদ, কর্ণেল ফারুকের নেতৃত্বে এক বিপ্লব ঘটে। যার মধ্য দিয়া ’৭২ সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার অবকাশ পায়। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী ৪র্থ সংশোধনীর উপর নতুন চুনকাম করিয়াছে। একনায়কত্বের আসন পাকা করা হইয়াছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের ছাড়পত্র দেওয়া হইল ঠিকই। কিন্তু পঞ্চম সংশোধনী এবং উহার বলে বলীয়ান একব্যক্তির শাসন ব্যবস্থার স্বার্থে স্তাবক শক্তি সৃষ্ট করিয়া এই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে সেই ইংরেজী প্রবাদবাক্য অনুসরণে নির্দেশ দেওয়া হইল ঃ ইউ ক্যান চুজ এ্যানি কালার, প্রোভাইডেড ইট ইজ ব্যাক অর্থাৎ যে কোন রং বাছাই করার অধিকার দেওয়া হইল কিন্তু গ্রহণ করিতে হইবে কাল রঙের জিনিস। দেখা গেল এইভাবে পরিবর্তনের পর পরিবর্তন দেশের মানুষের ইচ্ছার মূল্যকে ও অধিকারকে পাঠাইয়াছে নির্বাসনে। ক্ষমতার মৌরসীপাট্টা লইয়া একনায়কত্ব জনগণের ভাগ্যকে পীড়িত করিয়াছে। দুর্নীতি ও ক্ষমতার রাজনীতি দেশের মানুষের স্বস্তি কাড়িয়া লইয়াছেল। অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও দল-ভাঙ্গাভাঙ্গির রাজনৈতিক আসরে দেশের মানুষের অধিকার ও আশা-আকাঙ্খা ছিল অপাংক্তেয়। ক্ষমতার শিখর বেশ উচ্চ ও লোভনীয়। কিন্তু খুবই সংকীর্ণ। সেখানে সমাসীন থাকা যায় না স্থায়ীভাবে। ক্ষমতার শিখর হইতে ভয়াবহ, মর্মাকিন্ত আর দুঃখ জনক পতন অনিবার্য। ইহাই ইতিহাসের শিক্ষা।
    আরোগ্যের প্রতিশ্র“তি লইয়া নতুন সরকার ক্ষমতায় আসিতে বাধা হইয়াছেন। স্বাভাবিকভাবেই সামরিক শাসন জারীর পর সংবিধান স্থগিত রাখা হইয়াছে। আরোগ্যের যে সমস্ত কাজ যেমন কৃচ্ছতা সাধান, অফিসে সময়ানুবর্তিতা, দুর্নীতি রোধ, শৃংখলা আনয়ন এগুলি অভিনন্দনযোগ্য। এগুলি নির্বাচিত সরকারেরই দায়িত্ব ছিল।
    এখন আমাদের ভবিষ্যৎ সংবিধান কী হইতে উহা নিয়া বিভিন্ন মহলে জল্পনা কল্পনা ও কানুঘুষা শুরু হইয়াছে।
    দেশের সামনে বহু সমস্যা। বারংবার ভাঙ্গা গড়ার খেলায় নিজেদের খেয়াল চরিতার্থ করার মত অতীতের দুর্বূদ্ধির পরিণতি আমরা দেখিয়াছি। উহা দেশের কল্যাণ করে নাই--কল্যাণ করিতে পারে না। সেখানে সময় ও শক্তি অথবা ব্যয় না করিয়া আমাদের কাম্য আমাদের সাংবিধানিক ভিত্তি পুনরুদ্ধার।    আশা করি বর্তমানে স্থগিত জনপ্রতিনিধি রচিত ’৭২ সংবিধানই আগামী দিন দেশকে পরিচালনা করিবে। জনপ্রতিনিধি রচিত এই সংবিধানই জাতির অগ্রগতির পথে একমাত্র দিকদর্শন। এখানে বিতর্কের বা কমিশন নিয়োগের কোন অবকাশ নাই। সংশ্লিষ্ট মহলের জ্ঞাতার্থে বাধ্য হইয়া বলিতেছি যে, আমাদের নগণ্য কর্মীবাহিনী জনগণের সহায়তায় কায়েদে আজমের নেতৃত্বে শত্র“ পক্ষীয় শত ভ্রুকুটিকে অস্বীকার করিয়া পাকস্তান প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। চরিত্রহীন দালাল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আবার আমাদের মত অগণিত অসংখ্য ত্যাগী কর্মীবাহিনীই বিভিন্ন সংগ্রামের ধাপে ধাপে সর্বস্ব ত্যাগ ও জেলজুলুম সহ্য করিয়া রক্তস্বাক্ষরে বাংলাদেশ ভূ-মণ্ডলের মানচিত্র প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। অতএব দেশবাসীর মন মানসিকতা কি চায় তাহা আমরা জান। ইহার পরিপন্থী কোন কিছুই দেশ ও জাতির জন্য কখনও শুভ বা কল্যাণকর হইতে পারে না। বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী বরাবরই সংবিধান রক্ষ করার জন্য আগাইয়া আসিয়াছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চয় ইহা অবগত আছেন। সেই সাথে আরেকটি কথা অধিকার দিলেই অধিকার অর্জিত হয় না-অধিকারকে দেশপ্রেম, চরিত্র, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, নিয়মানুবর্তিতার সাথে সম্পৃক্ত করিতে হইবে।