রাজনীতিবিদরা নয়-সেনাপতিরাই

ফন্ট সাইজ:

শুক্রবার, ২রা জুলাই ’৮২-অলি আহাদ


    সভ্যতার ইতিহাস যেমন রাষ্ট্রবিবর্তনের ইতিহাস তেমন রাষ্ট্রশাসন প্রক্রিয়ার বিবর্তনেরও ইতিহাস। এককালে অস্ত্রবলে, বাহুবলে ক্ষত্রীয় বা ক্ষাত্র শ্রেণী রাষ্ট্র শাসন করিত। কিন্তু সভ্যতার অগ্রযাত্রার অমোধ নিয়মে জনসাধারণের নেপথ্য মুক্তি ঘটল। রাষ্ট্রশাসনের ভূমিকা গ্রহণ করিল জনগণ যা নাজি রাজনৈতিক পরিভাষায় গণতন্ত্র হিসাবে আখ্যায়িত। গণতন্ত্র বা জনগণের শাসন অর্থ জনসাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধি কর্তৃক রাষ্ট্রশাসন।
    দার্শনিক রাজা (Philosopher king) যোগ্যতম বলিয়া প্লেটোর রিপাবলিকে বর্ণনা করা হইলেও ক্ষাত্রশক্তিই দেশ শাসন করিত ইহাই ছিল প্রাচীন ও মধ্যযুগের স্বীকৃত ব্যবস্থা। মিসর ও ভারতে প্রাচীন ও মধ্যযুগে দেশ শাসনের ক্ষেত্রে ক্ষাত্রশক্তির ভূমিকা ছিল অবিসংবাদিত। পুরোহিত শ্রেণীর অর্থাৎ তৎকালীন মুষ্টিমের শিক্ষিত অভিজাতদের সহিত রাজশক্তির সংঘর্ষ সত্ত্বেও দেশের শাসন ব্যবস্থায় সামরিক শক্তির প্রাধান্য প্রাচন ও মধ্যযুগের রাষ্ট্রদর্শনের মূলকথা, জনসাধারণের ভূমিকা ছিল অস্বীকৃত ও উপেক্ষিত। রাষ্ট্রব্যবস্থায় আধুনিক যুগের উষাকাল তখনই শুরু হয় যখন দেশের সাধারণ মানুষ দেশ শাসন ব্যবস্থায় নিজেদের কথা বলার অধিকার উত্থাপন করিতে থাকে।
    দেশ শাসন ব্যবস্থঅর ক্ষেত্রে অস্ত্রশক্তির পরিবর্তে জন ইচ্ছাশক্তি অর্থাৎ জনগণের শাসন ব্যবস্থাকায়েমের ইতিহাসই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষেত্রে আদর্শ বলিয়া সভ্য সমাজে স্বীকৃত হয়। রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়া আদর্শের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করা হয়। এই সত্যই সার্বজনীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, অস্ত্র যেমন জয় তেমনি পরাজওয় বরণ করে কিন্তু আদর্শ বা চিন্তার বিনাশ নাই ইহা চিরঞ্জীব।
    আধুনিককালে যেখানেই যাদুঘরের মত প্রাচীন কালের তথা দরবর্তী মধ্যযগে ক্ষাত্র শক্তি অর্থাৎ অস্ত্রশক্তিকে দেশ পরিচালনার কাজে ব্যবহার করার নীতি গ্রহণ করা হইয়াছে সেখানেই বিদ্রোহ, অসন্তোষ মাথাচাড়া দিয়া উঠয়াছে। গণতন্ত্রবিহীন পরিবেশে জনগণ অধিকারবিহীন নির্যাতনের শিকার হইয়াছে। প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিটলারের জার্মানী, মুসোলিনীর ইটালী, ফ্রাংকোর স্পেন, সালাজরের পর্তুগাল আর সমগ্র কমুনিষ্ট বিশ্ব।
    আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও কম কিসে? পাকিস্তান রাষ্ট্রের গত ৩৫ বছরের ইতিহাস সেই ক্ষাত্রশক্তি বা সেনাপতির দেশ শাসনের ফলে উদ্ভুত বিপর্যর ও স্থিতিহীনতার অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষদর্শী আমরাও। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র চার বছরের মধ্যে ১৯৫১ সালে বিখ্যাত রাওয়ালপিণ্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় দেখা গেল মেজর জেনারেল আকবর খান ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। এ বছরই রাওয়ালপিণ্ডিতে সেনাপতি আইয়ুব খানের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যান্টনমেন্ট এলাকার এক জনসভায় ভাষণদানকালে পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলীতে শাহাদাৎ বরণ করেন। লিয়াকত হত্যা রহস্য আজও উদঘাটন করা হয় নাই। এই হত্যা-রহস্য প্রকৃত প্রস্তাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় সেনাপতির জাকিয়া বসার সূচনাপর্ব। পরবর্তী ঘটনাবলী তাহারই সাক্ষ্য বহন করে।    তারপর ১৯৫৩ সালে গভর্ণর জেনারেলের পদ হইতে খাজা নাজিমুদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রীকরণ এবং প্রধানমন্ত্রী পদ হইতে তাঁহাকে সংবিধান বহির্ভুত অবৈধ উপায়ে গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক গদিচ্যুত করা একই ষড়যন্ত্রের ফসল। ফলতঃ ১৯৪৭ সালের ভার স্বাধীন আইন (Indian Independence Act) বা অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান বানচাল হইয়া যায়। আবার ১৯৫৪ সনে যখন জনপ্রতিনিধি কর্তৃক পাকিস্তানের সংবিধান প্রণীত হইতে যাইতেছিল তখনই গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ও সেনাপতি আইয়ুব খার আঁতে ঘা লাগে। সুুতরাং আঘাত হানা হয় আর অস্ত্রশক্তির মহড়ায় অন্যায়ভাবে গণপরিষদ ভাঙ্গিয়া দেওয়া হয়। গণপরিষদ ভাঙ্গিয়া দেওয়ার পর গোলাম মোহাম্মদ যে মন্ত্রীসভা গঠন করেন তাহাতে সেনাপতি আইয়ুব খাঁকে দেশরক্ষা মন্ত্রী হিসাবে নেওয়া হয়। এই ভাবেই সেনাপতি আর আমলাকুল শিরোমণিদের যৌথ চক্র পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করে, যাহা পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয় এবং তদনুযায়ী ৫৯ সালে পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ছিল। কিন্তু ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসেই সামরিক শাসন জারি করিয়া সেনাপতি আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে। ইহার পর পাকিস্তানের ইতিহাস উচ্চাভিলাষী সেনানায়কদের দেশ শাসনের ইতিহাস। বিভিন্ন সরকার পরিবর্তনের        অন্তর্বর্তীকালে যতটুকু বেসমারিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল তাহাও সেনাপতির কর্তৃত্বাধীন ছিল।
    আবার সেনাপতি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬২ সনে একব্যক্তি প্রণীত সংবিধান প্রবর্তন করেন। ১৯৬৯ সনে সেনাপতি ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসিয়া তাহা বাতিল করেন। সুতরাং ১৯৪৭ সনের অন্তবর্তকালীন সংবিধান, ১৯৫৬ সনের সংবিধান, ১৯৬২ সনের সংবিধান এবং ১৯৫৪ সনের গণপরিষদ রাজনৈতিক দল বাতিল করেন নাই-প্রত্যেকটি বাতিল করিয়াছে সেনাপতি এবং আমলা যৌত আঁতাত।
    পাকিস্তান আমলে বারংবার যে শাসনতান্ত্রিক শুন্যতা সৃষ্টি করা হইয়াছিল উহার পশ্চাতে ছিল জনসাধারণের রাজনৈতিক অধিকার হরণপূর্বক তাহাদের একনায়কত্ববাদী স্বৈরাচারী শাসনের নাগপাশে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ রাখা। দেশের অবস্থার অবনতির জন্য রাজনৈতিক দলকে দোষারোপ করা কোন নতুন তত্ত্ব বা আবিষ্কার নহে। তৃতীয় বিশ্বের যেখানেই অস্ত্রশক্তি ক্ষমতা দখল করিয়াছে সেখানেই পাইকারীভাবে রাজনৈতিক দলগুলির নিন্দা করিয়াছে। কোথাও কোথাও গণতন্ত্রের ভেক ধরিয়া কোন একটি রাজনৈতিক দলের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করিয়া কিংবা রাজনৈতিক দলের পত্তন করিয়া বেসামরিক পোষাকে হাজির হইয়াছে।
    গণতন্ত্র বর্জিত পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দুর্বার সংগ্রামই বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে। বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মাতৃভাষা আন্দোলন, মূলনীতি প্রনয়নের আন্দোলন হইতে আইয়ুুব বিরোধী আন্দোলন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বেই সংঘটিত ও পরিচালিত হইয়াছে। এই দেশের অধিবাসদের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামের এই সুদীর্ঘ ও বিঘœসংকুল ধারা বাহিকতাকে বাদ দিয়া ৭১ সালের নয় মাসের স্বাধীনতাযুদ্ধকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার অর্থ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সশস্ত্র সংগ্রাম যেন গ্রীকযুদ্ধের দেবী মিনার্ভা। গ্রীক উপকথায় বর্ণিত আছে, অস্ত্রসজ্জিতা মিনার্ভা জিউসের মস্তক বিদীর্ণ করিয়া ধরাধাম্যে অবতীর্ণ হন। অনেকে বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামকে মিনার্ভার জন্মগ্রহণের সাথেই কার্যতঃ তুলনা করেন, যখন তাহারা স্বাধীনতা যুদ্ধে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের ভূমিকা অস্বীকার করিয়া যুদ্ধক্ষেত্রকেই বাংলাদেশ সৃষ্টির আন্দোলন বলিয়া এক মনোরম চিত্র অঙ্কনের প্রয়াস পান। মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি সমবায়ে গঠিত প্রবাসী সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান অনুযায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়াছে এবং প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করিয়াছে। স্বাধীনতা লাভের পর আবার এই জনপ্রতিনিধিরাই ১৯৭২ সনের সংবিধান প্রনয়ন করেন। শেখ মুজিব স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ও পরে পার্লামেন্টারী পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থা ও জনতার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্র“তি ৭২ সংবিধানের ৪র্থ সংশোধন আনিয়া নিজেই ভঙ্গ করেন। এই ভাবে তিনি নিজের সর্বসাশের সহিত দেশ ও জাতর সর্বনাশ ডাকয়া আনেন। ৭২ সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭৫ সনের ১৫ই আগষ্টে যাহারা নিঃস্বার্থ ভাবে আগাইয়া আসিয়াছিলেন, তাহাদের প্রচেষ্টার পেছনে অস্ত্রবলের শাসন কায়েমের উদ্দেশ্য ছিল না। আগাষ্ট বিপ্লবের প্রধান নায়ক কর্ণেল রশীদ, কর্ণেল ফারুক এবং তাহাদের সহযোগীরা ক্ষমতার আসনে বসেন নাই বরং বেসামরিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমাদকে রাষ্ট্রপতি পদে অভিষিক্ত করেন। সেদিন সেই পরিবর্তনের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন সশস্ত্র বাহিনী প্রধান জেনারেল শফিউল্ল্যা, বিমান বাহনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ, কে, খন্দকার, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল এম, এইচ খান, বি ডি, আর প্রধান মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান ও পুলিশ প্রধান জনাব নূরুল ইসলাম।
    তাহারা ১৯৭২ সনের জনপ্রতিনিধি রচিত সংবিধানের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন, যদিও তাহাদের পক্ষে পাল্টা অভ্যুত্থান করা কিছুই ছিল না। বিশেষ করিয়া, জেনারেল ওসমানীর সর্বাধিনায়কত্বে জেনারেল শফিউল্ল্যা ও এয়ার ভাইস মার্শাল এ, কে, খন্দার মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়াছেন।
    ’৭২ সনের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা খন্দকার মোশতাক বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও পার্লামেন্টকে বাতল করেন নাই। সংবিধানকেই অক্ষন্ন রাখেন, এমনকি জাতীয় সরকার গঠন না করিয়া শেখ মুজিবের মন্ত্রীসভাকেই পুনরায় বহাল করিলেন, দেশবাসীর মনে এই মন্ত্রীসভা পনর্বহাল করা সম্পর্কে যদিও নানা প্রশ্ন ছিল। শুধু তাই নয়, ’৭২ সংবিধান মোতাবেক বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভিত্তিতে তিনি সাধারণ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষনা করেন ’৭৭ সালের ২৮শ্রে ফেব্র“য়ারী। কিন্তু উচ্চাভিলাষী সেনাপতি জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলের পথে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই উদাত্ত প্রতিশ্র“তি বানচাল হইয়া যায়। সেনাপতি জিয়াউর রহমান নানা কুটকৌশলে প্রেসিডেন্ট হওয়া ব্যক্তি শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে ৪র্থ সংশোধনীর উপর ৫ম সংশোধনী জারী করেন।
    সুতরাং গত ৩৫ বছরের ইতিহাসে এ সত্যই ষ্পষ্টভাবে প্রতিভাত হইয়াছে যে, সংবিধান বাতিল বা স্থগিত করার কোন ভূমিকা রাজনৈতিক দল পালন করে নাই, বার বার সেনাপতিদের উচ্চাভিলাষ রাজনৈতিক দল প্রণীত সংবিধানকে বাতল করিয়াছে খর্ব করিয়াছে।
    ১৯৮১ সনের ৩০শে মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিহত হওয়ার পর সেই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাত্তারের আহ্বানে সেদিন সন্ধ্যায় সাবেক রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমাদ, আতাউর রহমান খান, জাষ্টিস বি, এ, সিদ্দিকীসহ সবকয়টি রাজনৈতিক দলের নেতা। বঙ্গভবনে মিলিত হইয়া সাংবিধানিক সরকার অব্যাহত থাকার পক্ষে শর্তহীনভাবে সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করেন রাজনৈতিক নেতাদের শত ত্র“টি, বিচ্যুতি ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ইহা এক স্মরনীয় ঘটনা।
    দেশে রাজনৈতিক ইনষ্টিটিউশন গড়িয়া উঠে নাই-ইহা এক ট্র্যাজিক বাস্তবতা। কিন্তু কেন গড়িয়া উঠিল না? রাজনৈতিক কর্মীরাই ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। অবিভক্ত ভারতের মুুসলমানদের অবিসম্বাদিত নেতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ রাজনৈতিক কর্ম অশেষ নির্যাতন সহ্য করিয়া, অনেকে সর্বস্ব হারাইয়া পথের কাঙাল হইয়া পাকিস্তান সৃষ্টি করিয়াছে; কিন্তু সেনাপতিদের উচ্চাভিলাষ এই রাজনৈতিক কর্মীর স্বপ্নসাধকে দুঃ স্বপ্নে পর্যবসিত করিয়াছে। পাকিস্তানের ২৫ বছরের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুদীর্ঘ সংগ্রামী লক্ষ লক্ষ রাজনৈতিক কর্মীর আত্মদানে সৃষ্ট। সেই অগনিত কর্মীই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হইয়া এক রক্তের সাগর পাড়ি দিয়া বাংলাদেশকে স্বাধীন করিয়াছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর অবর্তমানতায় মুজিব-জিয়ার একনায়কত্ববাদী শাসনের মুখে সেই কর্মীরা বিভ্রান্ত, হতাশা ও নিরাশার সাগরে নিমজ্জিত। গত ৩৫ বছরে ব্যারাক রাজনীতির পৌনপৌনিক ছোবলে রাজনৈতিক কর্মীরা বিপর্যস্ত রাজনৈতিক ইনষ্টিটিউশন গড়িয়া না উঠার ইহাই প্রধান কারণ। ইহার ঠিক উল্টা হইয়াছে ভারতে। ১৯৪৭ সনে যাত্রা শুরু করিলেও ভারত জনপ্রতিনিধি কর্তৃক শাসত হইয়া আসিতেছে। সেনাপতির শাসন সেখানে অকল্পনীয় বিষয়। সে কারণেই যে লক্ষ লক্ষ রাজনৈতিক কর্মী ভারত স্বাধীন করিয়াছিল, তাহাদের সহিত অনুকুল পরিবেশে আরও লক্ষ লক্ষ কর্মীর সংযোজন ঘটিয়াছে। গড়িয়া উঠিয়াছে রাজনৈতিক ইনষ্টিটিউশন সুতরাং সেনাপতিদের ক্ষমতা দখলের প্রশ্নই সেখানে অবান্তর।
    বর্তমান যুগে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল কথা হইল “উইল নট ফোর্স ইজ দ্য বেসিস অব মডার্ন ষ্টেট” অর্থাৎআধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হইল জনমত বাহুবল নহে। এই জনমত শাসন ব্যবস্থায় কতখানি প্রতফলিত ্হার নিরিখেই গণতন্ত্রের সার্থকতা স্থির হ্য়া থাকে। সংবিধান সেই পথ নির্দেশের ধ্র“বতারা। অবশ্যই সেই সংবিধান জনপ্রতিনিধি রচিত হওয়া চাই। আমাদের সৌভাগ্য, যদিও বর্তমানে স্থগিত তথাপি আমাদের একটি সংবিধান রহিয়াছে। ১৯৭২ সনের সেই সংবিধান কার্যকর করার জন্য ৪র্থ ও ৫ম সংশোধনী বাতিল করা একান্ত প্রয়োজন। তৃতীয় বিশ্বের সমসাময়িক ইতিহাসে দেখা গিয়াছে শক্তির রাজনীতি “প্রতিবার শক্তি হস্তান্তরের আগে ও পরে জনহিতের ডঙ্কা পেটান বটে কিন্তু এই নিরন্তর পরিবর্তন সর্বসম্মতির অপেক্ষাও রাখে না। কেবল একাগ্র অনুচরদের পক্ষপাত দেখায়।” এজন্যই শক্তির রাজনীতি সংবিধানকেও প্রয়োজনীয় এবং উদ্দেশ্য সিদ্ধির অন্তরায় হিসাবে দেখে এবং উহা বাতল, স্থগিত বা পোষামানানো ভাষা ও শর্ত সন্নিবেশপূর্বক অধিকার কাটছাট করিয়া বাহুবল বা অস্ত্রবলের রাজনীতি নিশ্চিত করিতে চাহে।
    দেশে গণতন্ত্র তথা জনতার শাসন প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ ৪র্থ ও ৫ম সংশোধনী পরিহারপূর্বক ১৯৭২ সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তাহার ভিত্তিতে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান। সংবিধানের সংশোধনী প্রয়োজন হইলে জনপ্রতিনিধিরাই পার্লামেন্টে বসিয়া তাহা করিবেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্য কোন বিকল্প নাই।