একজন সেনাপতির সর্বনাশা দন্ড

ফন্ট সাইজ:

ঢাকাঃ শুক্রবার, ২৭শে আগষ্ট, ১৯৮২ ইং-অলি আহাদ
    সম্প্রতি একটি প্রভাবশালী দৈনিকে পাকিস্তানের সেনাপতি প্রেসিডেণ্ট জেনারেল জিয়াউল হকের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হইয়াছে। এই সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়া সেনাপতি শাসকের চরিত্র ও চিন্তাধারার পরিচয় পাওয়া গিয়াছে। যদি গণতান্ত্রিক সরকার প্রধান বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী মিসেস মার্গারেট থেচার, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান কিংবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎকার আমাদের পাঠকবৃন্দের কাছে তুলিয়া ধরা যাইত তাহা হইলে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বনাম সেনাপতি শাসন এ দুয়ের একটি তুলনা মূলক চিত্র পরিস্কার হইয়া যাইত।
    সেনাপতি প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক ’৭৭ সনে সংবিধান লঙ্ঘন করিয়া অভ্যুত্থান ঘটাইয়া নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত পূর্বক সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে  (Constitutional Democracy) হত্যা করেন। একদিন সেনাপতি মীর জাফরের উচ্চাভিলাষী ও কুটচক্রান্তে বঙ্গ বিহার উড়িষ্যা স্বাধীনতা হারায়। সেই মীরজাফরের উত্তরসূরী সেনাপতি আইয়ুব ও সেনাপতি ইয়াহিয়া সংবিধান লঙ্ঘন করিয়া পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে, যার পরিণামে পাকিস্তানই দ্বিখণ্ডিত হইয়া পড়ে। অবিভক্ত উপমহাদেশের মুসলমানরা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার দাবীতে কোটি কোটি মুসলমানের আশা আকাঙ্খার রূপায়ন হইয়াছে রাজনীতির পথে। সামরিক একনায়ককে কুর্ণিশ করিবার জন্য পাকিস্তানের জন্য হয় নাই। যতদিন পাকিস্তানে রাজনীতি ছিল ততদিন পাকিস্তান এক ও অখণ্ড ছিল। সেনাপতি যখন ক্ষমতা দখল করিল তখন হইতেই ধ্বংস আর বিনাশের বীজ রোপীত হইল- নিরবচ্ছিন্নভাবে তেরটি বছর দুই দুইটি সেনাপতির শাসনের পরিণামে পাকিস্তান ভাঙ্গিয়া দুই টুকরা হইয়া গেল। ইহাই সেনাপতি শাসন প্রতিভার ফসল।
    জিয়াউল হক সেই ক্ষমতালিপ্সু আইয়ুব-ইয়াহিয়ারই যোগ্য উত্তরসাধক। জিয়াউল হক আজ ঘন ঘন ইসলামের নাম উচ্চারণ করেন। তিনি পবিত্র কোরান শরীফ স্পর্শ করিয়া (সেনাবাহিনীতে থাকার সময়) রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ত্ব ও সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষার ওয়াদা করিয়াছিলেন। সংবিধান লঙ্ঘন করিয়া সংবিধান বহির্ভুত উপায়ে বন্ধুকের জোরে ক্ষমতা দখল করিয়া তিনি সেই পাক কালামের নামে গৃহীত ওয়াদার বরখেলাপ করিয়াছেন। একজন ওয়াদা ভঙ্গকারী কখনও ঈমানদার মুসলমান থাকিতে পারে না।
    ’৭৭ সালে ক্ষমতা দখলের পর তিনি ৯০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ অক্টোবর মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলিয়া ১৭্ নভেম্বর (৭৯) অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন আবার স্থগিত ঘোষণা করেন। এই ওয়াদা খেলাপ কি ইসলামের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ ?
    অথচ তিনি ইসলামী শাসন পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠার জন্য আদাপানি খাইয়া লাগিয়া পড়িয়াছেন। ওয়াদা খেলাপকারী কী ধরনের মুসলমান এ কথার জবাব কি ক্ষমতামদমত্ত জিয়াউল হক দিবেন ? পাক কালামে আছে মোনাফেক মুরশেকের চেয়েও নিকৃষ্টতর।
    তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির মানুষের দুর্ভাগ্য এ ধরণের মোনাফেক শাসক বার বার তাহাদের ভাগ্য নিয়া ছিনিমিনি খেলে। তাহারা সাধারণ মানুষের দুঃখের ভরাইপূর্ণ করে না।, রাষ্ট্রেরও ভরাডুবি করিয়া থাকে।
    বিদেশী সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ সকলের নিকটই তিন হরহামেশা নির্বাচন দিবেন বলিয়া থাকেন। আবার তিনি বলেন, “রাজনীতিবিদরা জানিয়া রাখুন, আমি ক্ষমতায় থাকিবার জন্য আসিয়াছি।” ক্ষমতা আঁকড়াইয়া থাকিবার এই গর্বান্ধস্পর্ধা আইয়ুব-ইয়াহিয়ার কী পরণতি ডাকিয়া আনিয়াছে উহা জেনারেল জিয়ার অজানা নয়।
    সেনাপতি শাসনে ক্ষমতা দখলের জন্য ক্যাঙ্গারু ফাইট চলে। ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়া এক বন্দুক সরকারকে হটাইয়া আরেক বন্দুক সরকার আসে। কখনও কখনও হত্যার মধ্য দিয়া “জনপ্রিয়” (?) সেনাপতির শাসনলীলার মধ্য অঙ্কেই যবনিকা পাত ঘটে। উহা হইতে শিক্ষা গ্রহণ দূরে থাকুক, বিজয়োল্লাসে অপর একজন সেনাপতি আসিয়া বসেন। এই ধরনের শাসন ব্যবস্থা যেহেতু জনসমর্থন বা কনসেন্টের তোয়াক্কা করে না সেহেতু সরকার পরিবর্তনে কোন ধারাবাহিকতা বা Continuity থাকে না। অনিশ্চয়তা, আকস্মিকতাই ইহার বৈশিষ্ঠ্য। সেনাপতি শাসনের ভিত্তি হইল ভীতি সঞ্চায় করিয়া জনসাধারণকে নতজানু করিয়া ক্ষমতায় টিকিয়া থাকা। তাই প্রখ্যাত সাংবাদিক সালামত আলীকে বেত্রাঘাত করার মত বর্বরতা দেখাইয়াছেন জিয়াউল হক। সালামত আলীসহ ৫ ব্যক্তিকে ১০ বর্গফুট জায়গায় আটক করিয়া রাখিয়াছেন।
    ৬৮ সালে সমগ্র পাকিস্তানে গণআন্দোলনে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রেসিডেন্ট আইয়ুব তৎকালীন সেনাপতি ইয়াহিয়া খানের সাহায্য চাহিয়াছিলেন, কিন্তু উচ্চাভিলাষী ইয়াহিয়া আইয়ুবের সেই বিপর্যয়ের মুখে উত্তর দিয়াছিলেন ঃ “সমস্যাটিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা উচিত।” আইয়ুবের ভাগ্য বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়া সেনাপতি ইয়াহিয়া পাকিস্তানের তখতে তাউসে বসেন। ৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে আখনুর রনাঙ্গনে ভারতীয় সৈন্যকে বিপর্যস্ত করিয়া যিনি রণকৌশল ও বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন সেই খ্যাতনামা মেজর জেনারেল আখতার হোসেন মালিককে সেনাপতি না করিয়া আইয়ুব খান ইয়াহিয়া খানকে সেনাবাহনীর সর্বময় কর্তৃত্ব প্রদান করেন। অকৃতজ্ঞ ইয়াহিয়া উহার উপযুক্ত প্রতিদান দিয়া ছেন। একইভাবে জিয়াউল হককে ৮জন জেনারেলকে ডিঙ্গাইয়া পাকিস্তানের সেনাপতি পদে বসাইয়া ভুট্টো প্রায়শ্চিত্ত করিয়াছেন প্রাণ দিয়া তাহার নির্মম ভুলের। এই নেমকহারাম চারিত্রের সহিত কোন সার্চ্চা মুসলমানের চরিত্রের মিল থাকিতে পারে না এবং নাইও।
    ৭১ সালে পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পর তদানীন্তন সেনাপত জেনারেল আবদুল হামিদ ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখেন। চোখে সর্ষেফুল দেখে ইয়াহিয়া তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে উদ্যত হন। কিন্তু তিক্ত অভিজ্ঞতায় বীতশ্রব্ধ আর্মি হেডকোয়ার্টার জেনারেল হামিদের উচ্চাভিলাষে বাদ সাধেন। ফলে ৭১ সালের ২০শে ডিসেম্বর জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি ভুট্টো ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
    পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বিকাশের এই ক্ষীণ সম্ভাবনাকে জেনারেল জিয়াউল হক ১৯৭৭ সালের ৫ই জুলাই ক্ষমতা দখল করিয়া হত্যা করেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সে সময় বাকশক্তিহীন অবস্থায় কম্বাইণ্ড মিলিটারী হাসপাতালে। অথচ জিয়াউল হক জাজ্জল্যমান মিথ্যার আশ্রয় নিয়া ইয়াহিয়া খানের নামে এই মর্মেবিবৃতি প্রকাশ করেন যে, ভুট্টোই পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করার জন্য দায়ী। গত ৫ বছর ধরিয়া জিয়াউল হক ইসলামী শাসনতন্ত্রের কথা বলিয়া পাকস্তানের সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়া চলিয়াছেন। ১৯৪৯ সালের অবজেকটিভ রিজিলিউশনে আছে “ইসলাম বিশ্বাস করে, বিশ্বভ্রহ্মান্ডের সার্বভৌমত্ত্বের একমাত্র মালিক সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালা এবং আল্লাহতায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত সীমার মধ্যে এই ক্ষমতা জনগণ প্রয়োগ করিবে। ৪৯ সালের গণপরিষদে গৃহীত এই প্রস্তাব অপরিবর্তনীয় এবং কোন সামরিক বা বেসামরিক সরকার আজ পর্যন্ত এর পরিবর্তন সাধন করে নাই। উপরোক্ত প্রস্তাব অনুযায়ী জনগণ ক্ষমতা প্রয়োগ করিবে অর্থাৎ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। ক্ষমতা দখলকারী সেনাপতি প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক কোন জনগণ দ্বারা নির্বাচিত ? তিনি পবিত্র কোরান শরীফের কথা বলেন, ইসলামের নামে তাঁ মুখে খৈ ফোটে, চার খলিফার উদাহরণ দিতে গিয়া ভুলিয়া যান যে, ইসলামের সেদিন গণতন্ত্রের আদর্শের যে ধ্বজা উন্নত ছিল তা মোনাফেক, অকৃতজ্ঞ বিশ্বাসঘাতকদের জন্য অপব্যাখ্যার শিকার হইয়াছে। খোলাফায়ে রাশেদীনের পর দামেস্কে ও বাগদাদ আজও মুক্ত হইতে পারে নাই। আজও সেখানে একনায়ক সেনাপতি শাসন অব্যাহত রহিয়াছে।
    ইসলামী বিচারের কথা বলিতেছেন জিয়াউল হক এখন জোরগলায়। একথা কেনো জানে ক্ষমতায় গিয়া আপনি তিন মাসের জন্য ১৯৭৩ সালের সংবিধান স্থগিত রাখিয়াছিলেন, বাতিল করেন নাই।
    পাকিস্তানের বিচার বিভাগ প্রয়োজনের মতবাদ (ডকট্রিন অব নেসেছিটি) অনুযায়ী এই পদক্ষেপ স্বীকার করিয়া নিয়াছিলেন। ১৯৮১ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান চালু করিয়া জেনারেল জিয়া বিচার বিভাগয় ক্ষমতা হরণ করেন। প্রধান বিচারপতি জনাব আনোয়ারুল হকসহ কতিপয় বিচারপতি এই অন্তর্বর্তী কালীন সংবিধান মানতে অস্বীকার করায় তাঁহাদের পদচ্যুত করা হয়। আর এই ব্যবস্থাকেই তিনি ইসলামী শাসনতন্ত্র বলেন। ইসরামের কথা কিভাবে তাহার মুখেভ শোভা পায়?
    জিয়াউল হকের স্বৈরশাসনে পাকিস্তানের আপাতঃ স্থিতিশলতার পিছনে রহিয়াছে আফগানিস্থানের রুশ সৈন্যের উপস্থিতি। আফগানিস্তানে রুশ সৈন্যের অত্যাচার ও ধ্বংসলীলা পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের পক্ষে শাপেবর হইয়া দেখা দিয়াছে। একবার পাকিস্তানী সীমান্ত রুশ সৈন্যমুক্ত হইলেই জিয়ার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ পাকিস্তানকে খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া ফেলিতে পারে। সিন্ধী, বেলুচ ও পাঠানদের মধ্যে পাচা অসন্তোষ আগ্নেয়গিরির উদগীরণের মত এমন এক ধ্বংস ও তাণ্ডব সৃষ্ট করিতে পারে যে, রক্ত এবং অশ্র“র বন্যায় নিপীড়িত গণউত্থান পাকিস্তানের অস্তিত্বকে বিপন্ন করিয়া তুলিতে পারে।
    সেখানে গণতন্ত্র কি শক্তি ধারণ করে, ভারত তাহার উদাহরণ। শত বৈচিত্র এবং শাসকদের বঞ্চনা, দারিদ্র্য এবং অধিকার সংকোচনের মধ্যেও জনমত প্রকাশ এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের তীব্রতা সত্ত্বেও ভারত গণতন্ত্রের শক্তিতেই বিপর্যয়ের অকল্যাণকে ঠেকাইতে সক্ষম। তাহার আত্মরক্ষার ক্ষমতা জনসাধারণের অধিকারের শক্তির উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।
    সেনাপতি শাসনে প্রতিমুহূর্তেই অনিশ্চয়তা বিরাজ করে। ১৯৮০ সালের মার্চে জেনারেল আব্বাসী এবং ডেপুটি চীফ অব স্টাফ জেনারেল হোসেন শেজহার, মেজর জেনারেল আব্বাসী  এবং ডেপুটি চীফ অব স্টাফ জেনারেল ইকবাল আহমদ জিয়াউল হককে উৎখাত করার জন্য অভ্যুত্থান ঘটাইবার প্রচেষ্টা নেন। সেই হইতে জিয়াউল হক বুলেট প্র“ফ পোশাক পরিধান করেন। বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করিলে বন্দুকের জোরেই আবার উৎখাত হওয়ার আতঙ্ক সর্বদা বিরাজ করে। সেনাপতি শাসনের অনিবার্য পরিণতিতে সেনাবহিনীর শৃঙ্খলা, সংঘবদ্ধতা এবং ত্যাগের আদর্শ বিনষ্ট হয় ক্ষমতাই হইয়া পড়ে একমাত্র আরাধনা। সেনাপতিরা পৃথিবীর দেশে দেশে ক্ষমতা দখল করিয়া কেবলমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতাই কুক্ষিগত করে নাই- অর্থনৈতিক ক্ষমতাকেও স্বীয় নিয়ন্ত্রণাধীন করিয়াছে। ইহার ফলে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য আর দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুপ্রবেশ করিয়াছে। সেনাপতি শাসিত তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি দেশ ইহার একেকটি উদাহরণ। দেশরক্ষা, দেশ পরিচালনা এবং জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন প্রতিটিই সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। একাধিক সার্বক্ষণিক দায়িত্ব একই সাথে পালন করা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়-তিনটির তো প্রশ্নই উঠে না। একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালাই সকল ত্র“টির উর্ধে  (Infallible)| এই ধরনের একনায়ক শাসন হিটলারের জার্মানীতে, ফাঙ্কোর স্পেনে বা কমু্যুনিষ্ট বিশ্বে চলিতে পারে; কিন্তু আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় তাহার স্থান ক্রমেই সংকুচিত হইয়া আসিতেছে। ক্ষমতার শিখরদেশ সুউচ্চ এবং জনগণের নাগালের বাইরে মনে হইলেও ওই শিখরদেশ এমনই সংকীর্ণ যে, দীর্ঘক্ষণ সেখানে টিকিয়া থাকা সম্ভব নয়। পতন অনিবার্য ও ভয়াবহ।
    গণতন্ত্রের বিস্তৃত সমভূমিতে পাশ ফেরার জায়গা থাকে, হাত-পা ছড়িয়ে সকলের সহিত যুক্ত হইয়া শক্তি বহুগুগিত হয়। আর একক ক্ষমতার সংকীর্ণ শিখরে অপর উচ্চ ভিলাসীর আরোহণ ঠেকাতে গিয়ে স্থান পরিবর্তন করিয়া আত্মরক্ষার অবকাশ থাকে না। সেখানে পরিবর্তন মানেই পদস্থলন। এক নির্মম নিষ্ঠুর রক্তাক্ত অবসান অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাহার ভাগ্যলিপি। সত্য কথা সেনাবাহিনীর রহিয়াছে শৃঙ্খলা, প্রশিক্ষণ এবং দেশপ্রেম। ত্বরিত সিদ্ধান্তের জন্য এই গুনাবলী অত্যাবশ্যক, কিন্তু আধুনিক জটিল সমাজে যেখানে ধীরচিত্ত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন সেখানে দরকার সমাজ ও সমাজদর্শন সম্পর্কে বিস্তৃত ধারনা যা নাকি সেনাপতির পেশাগত ট্রেনিং দ্বারা সম্ভব নয়।
    প্লেট্ োতাঁহার রিপাবলিকে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়া সংঘবদ্ধতার সহিত উহাকে সমাজের বিস্তততর পটভূমিকায় ক্ষমতার উৎস হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। তাই তিনি সেখানে ক্ষমতার সহিত জ্ঞানের সমন্বয়ের উপর জোর দিয়াছেন। তাঁহার ফিসসফার কিংবা দার্শনিক রাজার আদর্শ সমাজ মানসের সেই বিস্তৃত পটভূমির উপরই স্থাপিত। রাজনৈতিক ক্ষমতার সমস্যা সামরিক শাসনে সমাধান সম্ভব বলিয়া মনে করার স্পর্ধা সাময়িক সাফল্য বহণ করে, কিন্তু উহাকে রাজনৈতিক পদ্ধতি হিসাবে বিকল্প সরকার পরিচালনার পক্ষে উপযুক্ত একমাত্র নির্বোধরাই মনে করিয়া থাকে। রাজনীতিবিদরাই সংবিধানের স্রষ্টা, সামরিক ও বেসমারিক কর্মচারীরা সে সংবিধানের ফসল।